Bangla পাপ কাম ভালোবাসা [ Pap Kam Valobasha ] A Porn Serial Novel In Bangle { completed }
Views 13498
Replies 193
Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

[-]
Tags
a bangle in pap 18 serial porn completed পাপ কাম valobasha novel kam ভালোবাসা uponnas bangla

Users browsing this thread: 1 Guest(s)
Thread Description
18+ Bangla Uponnas
পর্ব ২৭ (#4)



অনুপমা খানিকক্ষন চুপ করে থাকার পরে মাইক নিয়ে বলে, “আজকে আমাদের সেন গ্রুপ অফ কোম্পানির প্রথম এনুয়াল মিট।” সবাই চুপ, সবার কান ওর দিকে। অনুপমা বলে, “আমি জানিনা এনুয়াল মিটে কি বলতে হয়, তাও সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। একটা ছাদ দাঁড় করাতে গেলে অন্তত পক্ষে তিন খানা থামের দরকার পরে। এই গ্রুপ কোম্পানির বিষয়ে জানি না তবে আমার জীবনের তিন খানা থাম, তিন মহিলা...” সবাই উৎকণ্ঠায় ওর দিকে তাকিয়ে। অনুপমা প্রথমে ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে ডেকে বলে, “আমার মা, মিসেস পারমিতা সেন, যার ভালোবাসায় এতদুর এসেছি।” পারমিতার চোখে জল চলে আসে। চোখের কোল মুছতে মুছতে মেয়ের দিকে এগিয়ে যায়। তারপরে অনুপমা, দেবশ্রীর দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে মঞ্চে ডেকে বলে, “আমার মামনি, মিস্টার দেবায়নের মা, যার আশীর্বাদে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি।” দেবশ্রী অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, কি বলছে মেয়েটা? অনুপমা কাতর চোখে মামনিকে মঞ্চে আসতে অনুরোধ করে। অগত্যা দেবশ্রী ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়। তারপরে অনুপমা, নিবেদিতার দিকে তাকিয়ে কাছে ডেকে বলে, “আমার বান্ধবী, মিস নিবেদিতা চৌধুরী যার অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য আজকে আমরা এইখানে একত্রিত হয়েছি।” হতবাক নিবেদিতা দাঁতের মাঝে আঙ্গুল কেটে চোখের জল সংবরণ করে অনুপমার দিকে নিস্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকে। অনুপমা ওকেও হাত নাড়িয়ে কাছে ডাকে। তারপরে মাইকে বলে, “মহিলারাই এই জগতের জন্মদাত্রী। আজকের রাত তাই মেয়েদের রাত। এই পৃথিবী সব মেয়েদের জন্য” হাত মুঠি করে হাওয়ায় উঁচিয়ে চিৎকার করে বলে, “লেডিস, ড্যান্স ফ্লোর অনেকক্ষণ থেকেই খালি পরে। আজকে নো ব্যালেন্স সিট, নো বড় এন্ড ছোট, কার কাছে কি আছে, কার কাছে কি নেই। একটা রাত এইসব ভুলে... লেটস পার্টি হার্ড...” মঞ্চে দাঁড়িয়ে চার মহিলাকে দেখে সবাই হাততালি দেয়। গুঞ্জনে ভরে ওঠে রেডিসনের লন, আকাশে মেঘের গুরগুর শুরু হয়ে যায়। সেই উপেক্ষা করে অনুপমা মাইক নিয়ে চেঁচিয়ে, “মেয়েরা দেখিয়ে দাও, ওই আকাশের কালো মেঘের গুরগুর চড়চড় ধ্বনি আমরা ভয় করিনা।” 

মঞ্চ থেকে নেমে এসেই দেবায়ন কে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা গুঁজে দেয়। ওর মাথা বুকে চেপে নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “কি হল তোর?”


মাথা নাড়ায় অনুপমা, “কিছু না।” ওর গলা ধরে এসেছে এতক্ষণে। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। মনে হচ্ছে, এই বুকের মধ্যে ঢুকে পড়লে ভালো হত। 

ওকে ওইভাবে দেবায়নের বুকে মাথা গুঁজে থাকতে দেখে নিবেদিতা ওদের দিকে এগিয়ে এসে ওর কাঁধে হাত রাখে। নরম হাতের পরশে অনুপমার সম্বিত ফিরে আসে। নিবেদিতাকে দেখে চোখের কোল মুছে মিষ্টি হাসি দেয়। নিবেদিতা স্মিত হেসে ওকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি ওইখানে উঠে একটু পাগল হয়ে গেছিলে?”

অনুপমা দেবায়নের বাজু দুই হাতে আঁকড়ে ধরে বলে, “আমাকে পাগল করার লোক আর ঠিক করার লোক আমার পাশেই আছে।”

মিটের সাথে পার্টি কিছুক্ষণের মধ্যে জমে ওঠে। পারমিতা আর নিবেদিতা পরস্পরকে অতি মার্জিতভাবে অতি সুকৌশলে এড়িয়ে চলেছে। পারমিতা, দেবশ্রীকে নিয়ে একপাশে গল্পে মেতে ওঠে। নিবেদিতা আর অনুপমা কথা বলতে বলতে ভিড়ের দিকে এগিয়ে যায়। কম বয়সী ছেলে মেয়েরা ততক্ষণে নাচের জায়গায় উঠে নাচ করতে শুরু করে দিয়েছে। 

ভিড়ের এক কোনায় হটাত করে ওর চোখ ধৃতিমানের দিকে চলে যায়। ধৃতিমানের হাতে একটা মদের গেলাস, ওর ঠাণ্ডা বরফের মতন চোখের সাথে চোখাচুখি হতেই ওর মেরুদন্ড দিয়ে হিমশীতল এক ধারা বয়ে যায়। একপাশে নিবেদিতাকে দেখে, অন্য পাশে দূরে দাঁড়িয়ে মায়ের সাথে মামনিকে দেখে। বাবার কোম্পানিতে চাকরি করছে ধৃতিমান, এই মিটে আসবে সেটা স্বাভাবিক কিন্তু ওর কথা একদম মাথায় ছিল না অনুপমার। এই সমাগমে কিছু করে বসবে না’ত? অতটা সাহস নেই তবে যদি মামনির সামনে পরে যায় তখন কি হবে? সঙ্গে সঙ্গে হন্তদন্ত হয়ে দেবায়নের কাছে দৌড় লাগায়। 

হাঁপাতে হাঁপাতে দেবায়নকে একদিকে টেনে নিয়ে গিয়ে বলে, “সর্বনাশ হতে একটু বাকি আছে রে।”

দেবায়ন অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে একটু খুলে বল।”

দূরে এক কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা ধৃতিমানের দিকে দেখিয়ে অনুপমা বলে, “ধৃতিমানের কথা একদম ভুলে গিয়েছিলাম। একদিকে মামনি অন্যদিকে নিবেদিতা। ওদের সামনে পরে গেলে কি হবে?”

দেবায়নের সাথে ধৃতিমানের চোখাচুখি হয়, ওর ওই চাহনি দেখে চিন্তায় পরে যায়। খানিকক্ষণ পরে কিছু একটা চিন্তা করে ওর কাঁধে চাপ দিয়ে অভয় প্রদান করে বলে, “চিন্তা করিস না, আমি ওকে কিছু করে হোক এখান থেকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

ঠিক সেই সময়ে রূপক ওইখানে চলে আসে। ওকে দেখে দুইজনে চুপ হয়ে যায়। রূপক ওদের ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কারন জিজ্ঞেস করাতে দেবায়ন জানায় ওরা এমনি দাঁড়িয়ে আছে। মঞ্চের বক্তৃতা দেওয়ার পরে অনুপমা একটু ভাবাবেগে গলে গিয়েছিল তাই ওর কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের ওইখানে ছেড়ে দিয়ে দেবায়ন ভিড়ের মধ্যে এগিয়ে যায়, ধৃতিমানের দিকে। 

রূপক সেটা লক্ষ্য করে অনুপমাকে প্রশ্ন করে, “হ্যাঁ রে ওই লোকটা সেই লোকটা না, যাকে আমরা মিস চৌধুরীর সাথে জলপাইগুড়িতে দেখেছিলাম?”

অনুপমার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়, ভেবেছিল হয়ত রূপক চিনতে পারবে না কিন্তু। অনুপমা মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানিয়ে বলে, “কই না’ত?”

হাতের গেলাসে চুমুক দিয়ে ধৃতিমানের দিকে ভালো ভাবে তাকিয়ে রূপক ওকে বলে, “আরে কিছু একটা লুকাচ্ছিস তুই। ওই ভদ্রলোক জলপাইগুড়ির সেই ভদ্রলোক, কিন্তু এই মিটে কেন?”

অনুপমা ধরা পরে গেছে তাই ওকে সত্যি বলে দেয়, “আসলে ওই ভদ্রলোক বাবার কন্সট্রাক্সান কোম্পানিতে চাকরি করে।”

রূপক মাথা দুলিয়ে বলে, “হুম, তাহলে মিস চৌধুরীর সাথে কিছু একটা হবে।”

অনুপমা ম্লান হেসে উত্তর দেয়, “না, নিবেদিতাকে ওর হাত থেকে বাঁচানোর জন্যেই দেবায়ন গেছে। এই মিটে কিছু যদি করে বসে সেই ভয়ে।”

রূপক ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “মানে? ওর সাথে মিস চৌধুরীর সম্পর্ক কেটে গেছে?”

অনুপমা মাথা দোলায়, “হ্যাঁ।”

রূপক হাতের গেলাস এক চুমুকে শেষ করে বলে, “ওই লোকটাকে কি এইখান থেকে তাড়াতে হবে? বল এখুনি লেগে পড়ছি।”

অনুপমা ওর বাজুতে ছোট চাঁটি মেরে বলে, “তুই আর পুচ্চু, মারামারি কাটাকাটি ছাড়া কিছু জানিস?”

ওর কাঁধে হাত রেখে কাছে টেনে কানেকানে বলে, “আরো একটা জিনিস করতে পারি কিন্তু শালা ছেলে না হলে ঠিক লাগিয়ে দিতাম।” বলেই হেসে ফেলে। 

অনুপমা ওকে নিয়ে বন্ধু বান্ধবীরা যেখানে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল সেই দিকে এগিয়ে যায়। শ্রেয়া, পায়েল, ভাই অঙ্কন, সঙ্গীতা প্রবাল, ধীমান ঋতুপর্ণা সবাই একদিকে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল। কিছু পরে দেবায়ন ফিরে এসে ওদের সাথে যোগদান করে। অনুপমার সাথে চোখের ইশারায় কথা হয়ে যায় যে ধৃতিমানকে ঠিক করে দিয়েছে। বহু লোকের মাঝে তারপরে আর ধৃতিমানকে দেখা যায় না। 

অনুপমা আর দেবায়ন আবার বন্ধুদের ছেড়ে সবার সাথে দেখা করার জন্য বেড়িয়ে পরে। এমন সময়ে ওদের দেখা অনন্যার সাথে হয়। অনন্যাকে দেখে অনুপমা বেশ আশ্চর্য হয়ে যায়, ওর পাশে আবার এক অচেনা আগন্তুক। 
অনন্যা ওর হাত ধরে হেসে বলে, “বাপ রে তুই একদম পাক্কা বিজনেস অম্যান হয়ে গেছিস দেখছি।”

অনুপমা স্মিত হেসে দেবায়নের বাজু আঁকড়ে ধরে বলে, “হ্যাঁ, এই ছেলেটার জন্য হতে হল।”

অনন্যা পাশের আগন্তুকের সাথে দেবায়নের পরিচয় করিয়ে বলে, “সত্যজিত, বলেছিলাম তোকে মনে আছে?”

অনুপমা হাত বাড়িয়ে সত্যজিতের সাথে হাত মিলিয়ে কুশল সম্ভাষণ আদান প্রদান করে। 

দেবায়ন অনন্যাকে প্রশ্ন করে, “তোমার মানে...”

অনন্যা কাতর চোখে ওর দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, “প্লিস আজকে নয়।” তারপরে অনুপমাকে বলে, “হ্যাঁ রে একটু সময় হবে তোর?” অনুপমা ভুরু নাচিয়ে প্রশ্ন করে কি ব্যাপারে কথা বলতে চায়। উত্তরে অনন্যা ওকে বলে, “তোরা দুইজনেই এইখানে আছিস আর সত্যজিত এসেছে। মানে ঐযে মিস্টার বসাক বলেছিল।”

অনুপমা বুঝতে পারে কি বিষয়ে অনন্যা ওর সাথে আলোচনা করতে চায় তাই হেসে ওকে বলে, “সরি অনন্যাদি, আজকে রাতে শুধু পার্টি। তুমি সময় করে একদিন আমার অফিসে এসো না হয় বাড়িতে এসো ওইখানে এইসব নিয়ে আলোচনা করা যাবে।”

দেবায়ন মিচকি হেসে ওকে জিজ্ঞেস করে, “কত টাকার ধাক্কা লাগাতে চাও?”

অনন্যা সত্যজিতের দিকে একবার দেখে বলে, “সেই রকম একটা প্লান করে নিয়েছি তবে হাতে টাকা নেই তাই শুরু করতে পারছি না।”

সত্যজিত ওকে উত্তর দেয়, “মানে এই ষাট থেকে আশি লাখ টাকার মতন লাগবে।”

অনুপমা আর দেবায়ন মুখ চাওয়াচায়ি করে। তারপরে দেবায়ন মিচকি হেসে সত্যজিতের সামনেই অনন্যার কাঁধে আলতো ধাক্কা মেরে বলে, “চার পাঁচ লাখ টাকা হলে না হয় এখুনি দিয়ে দিতাম। কিন্তু আশি লাখ টাকা, এটা বিনিয়োগের ব্যাপার। কি রকম রিটার্ন পাবো সেই বিষয়ে কিছু জানা নেই।”

অনুপমা ওকে মৃদু বকুনি দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলে, “প্লিস দেবায়ন এইখানে বিজনেস নয়।” অনন্যাকে হেসে উত্তর দেয়, “প্লিস ওর কথায় কিছু মনে কর না, তোমাদের লাইন অব বিজনেস, প্রোজেক্সান, স্ট্রাটেজি সব নিয়ে একদিন আমাদের বাড়িতে এসো আলোচনা করা যাবে।”

দেবায়ন মিচকি হেসে অনন্যাকে বলে, “আজকে প্রথম কিস্তির রিটার্ন পেলে বড় ভালো হত।”

অনন্যা ওর দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে বলে, “তুমি না বড্ড শয়তান...” বলেই ওকে আলতো একটা চাঁটি মারে। ওদের ওইভাবে মিশতে দেখে সত্যজিতের একটু কেমন কেমন মনে হয়। 

বহু মানুষের চোখ ওদের দিকে, ছোট পর্দার নায়িকা অনন্যাকে দেখে অনেকেই ওর সই নিতে এগিয়ে আসে। অনুপমা আর দেবায়ন ওদের ছেড়ে আবার অন্যদিকে এগিয়ে যায়। দেবায়নকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে, ধৃতিমানকে ও মৃদু শাসিয়ে রায়চক থেকে কোলকাতা পাঠিয়ে দিয়েছে। অনুপমা মাথা দোলায় আলতো করে। রাত যত বেড়ে ওঠে, তত বেড়ে ওঠে আকাশের গুরগুর চড়চড় ধ্বনি আর তত বেড়ে ওঠে নাচের তাল আর সঙ্গীত। নাচের ফ্লোরে অনেকেই উঠে নাচতে শুরু করে দিয়েছে। অনুপমার নাচের জায়গায়, বেশ কয়েক জন সুন্দরী ছোট চাপা আঁটো পার্টি পোশাক পরিহিত মেয়েদের দেখা পায়। গানের তালে তালে বিদেশী অথবা হোটেলের মালিকদের সাথে বেশ জড়াজড়ি করে নাচছে। ওদের অফিসের লোকজন, ছেলে মেয়েরা উদ্দাম নাচে ব্যাস্ত। সবাইকে দেখে আর দেবায়নের বাজু ধরে একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। 


Reply
পর্ব ২৭ (#5)



দেবায়ন এখন অফিসে আসেনি। বাবা এইবারে গোয়া গেছে একটা নতুন রিসোর্টের ব্যাপারে। দেবায়নকে সাথে নিয়ে যাবে বলেছিল কিন্তু অনুপমার অনুরোধে এইবারে আর দেবায়ন যায়নি। সকাল থেকে ঝিরঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। এই বৃষ্টিতে মামনির কাছে থাকলে, সোনামুগ ডালের খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজা খাওয়া যেত। এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছেলেটা কোথায় যে বের হল? সকালে ফোন করে বলেছিল যে অফিসে আসতে একটু দেরি হবে কিন্তু কত দেরি? লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে প্রায়। কোলকাতায় থাকলে এমন দেরি করে না, যদি কেনাকাটা কিছু করার থাকে তাহলে ওকে সাথেই নিয়েই বের হয়। কাজ থাকলে ওকে বলে যেত কোথায় যাচ্ছে। কিন্তু না, কি বলল, “এই একটু দোকানে যাবো।” কেন যাবি কোন দোকানে যাবি কিছুই বলল না। বৃষ্টির ভিজে হাওয়ায় হৃদয় বড় উদাস হয়ে যায় অনুপমার। পাগল বাউলের মতন খালি নেচে বেড়ায় এদিক ওদিক।

বেচারি অনুপমার খুব বড় অভিযোগ, সব প্রেমিকেরা তাদের প্রেমিকাদের নানান ধরনের উপহার দেয়, কিন্তু দেবায়ন ওকে আজ পর্যন্ত কিছুই দেয়নি। অবশ্য তাতে ওর ভুল ছিল না যে তা নয়, কলেজে পড়ার সময় থেকেই দেবায়নকে টাকা খরচ করতে দিত না, কিন্তু তাই বলে চাকরি পাওয়ার পরে ওকে একটা উপহার দেবে না? না না, এতটা ওর ওপরে অভিযোগ করা ঠিক নয়। গতবার যখন বিন্সার, ডালহৌসি কাজে গেছিল তখন ডালহৌসি থেকে ওর জন্য একটা সুন্দর ফারের জ্যাকেট কিনে এনেছিল। যদিও ওর কাছে প্রচুর জ্যাকেট তাও ওর দেওয়া জ্যাকেট খানা ওর বেশ পছন্দ হয়েছিল। 

এইসব ভাবছিল অনুপমা নিজের হাত দেখে, আঙ্গুল গুলো বড্ড খালি শুধু একটা সোনার আংটি ছাড়া কিছুই নেই। ঠিক তখন দেবায়ন কাঁচের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ওকে দেখে হাসে। কি ব্যাপার, চোখে যেন এক শয়তানি হাসি, আবার কোথায় কি করে এসেছে দেবায়ন? আর পারা গেল না এই ছেলেটাকে নিয়ে, নিশ্চয় কোথাও কোন মেয়ে দেখেছে আর সেই গল্প জুড়ে বসবে, না হয় কোন ডিল ফাইনাল হবে সেই নিয়ে আলোচনা। কিন্তু এই চেহারা আর এই মিচকি হাসি কেমন যেন ঠেকায়। কোনোদিন এমন ভাবে মাথা চুলকে হাসতে দেখেনি ওকে। না না, একবার ওর সামনে এসেছিল এই ভাবে মিচকি হাসতে হাসতে, সে বহুদিন আগের কথা।

ওর সামনে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে প্রশ্ন করে দেবায়ন, “কি রে কি করছিস?”

অনুপমা উঠে দাঁড়িয়ে ওর গলা জড়িয়ে নাকে নাক ঘষে মিষ্টি করে বলে, “তোর কথা ভাবছিলাম।” তারপরে কিঞ্চিত অভিমানী কণ্ঠে ওকে বলে, “সবার বয়ফ্রেন্ডরা কত কিছু দেয় ...”

ডান হাতে বাম হাত নিয়ে আলতো চেপে চোখ চোখ রেখে বলে দেবায়ন, “আমি সত্যি তোকে কিছু দেইনি কোনোদিন?”

ওই প্রগাঢ় ভালোবাসার চাহনির সামনে লজ্জায় পরে যায় অনুপমা, মাথা নিচু করে আলতো ঝাঁকিয়ে বলে, “না মানে...”

ওর বাম হাত ঠোঁটের কাছে এনে হাতের তালুতে ছোট চুমু খায় দেবায়ন। তপ্ত ভিজে ঠোঁটের পরশে অনুপমার শরীর শিহরিত হয়ে যায়। আপনা হতেই দেবায়নের কলারে হাত উঠে যায়। দেবায়ন ওর দিকে একভাবে চেয়ে রয়েছে, দুই চোখে প্রেমের ধিকিধিকি আগুন, ওকে ঝলসে দেওয়ার আগের মুহূর্তে নিয়ে যায়। নিজেকে ওর প্রসস্থ বুকের ওপরে আছাড় মারতে উদ্যত হয় অনুপমা। দেবায়ন ঝুঁকে ওর বাম হাতের আঙ্গুল একটা একটা করে মুখের মধ্যে নিয়ে গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত চুষে দেয়। কেঁপে ওঠে অনুপমা, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। কি করছে ছেলেটা, এটা যে অফিস। এইভাবে কতক্ষণ দাঁড়াতে পারবে, নিজেকে সংবরণ করে রাখতে পারবে? ওর দেহের প্রত্যেক স্নায়ু উন্মুখ হয়ে ওঠে দেবায়নের দেহের সাথে মিলিয়ে যাওয়ার জন্য। অনুপমার অনামিকা মুখের মধ্যে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে চুষে দেয় তারপরে অনামিকা বের করে আনে মুখের মধ্যে থেকে। 

তিরতির করে ভীষণ প্রেমের জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে দেবায়নকে গভীর আবেগজনিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “কি করছিস তুই?”

দেবায়ন ওর অনামিকা চেপে ধরে, আঙ্গুলে শক্ত ধাতুর গোলাকার কিছু একটা ঠেকে। দেবায়ন ওর চোখে চোখ রেখে খুব নিচু কণ্ঠে প্রশ্ন করে, “বুড়ি হয়ে আমার মাথার পাকা চুল তুলে দিতে দিতে আমার সাথে ঝগড়া করবি?”

দেবায়ন ওর অনামিকায় কিছু একটা ঠেলে দেয়। হাতের চাপের মধ্যে বুঝতে পারে ওর আঙ্গুলে একটা আংটি। চোখ জোড়া ভরে আসে অনুপমার। চোখের পাতার সাথে সাথে ঠোঁট জোড়া কেঁপে ওঠে অনুপমার। আলতো মাথা নাড়িয়ে প্রগাঢ় আবেগজড়িত কণ্ঠে বলে, “করব রে, খুব ঝগড়া করব। তুই তোর দাঁতের পাটি ভুলে যাবি আর আমি খুঁজে দেব।”

দেবায়ন আবেগজড়ানো কণ্ঠে বলে, “সত্যি তুই খুঁজে দিবি? আর তোর চোখের চশমাটার কি হবে?”

দেবায়নের নাকের ওপরে নাক ঘষে বলে, “তুই আমাকে দেখিয়ে দিবি আর কি। আমি ওষুধ খেতে ভুলে গেলে কি হবে?”

উত্তর দেয় দেবায়ন, “ঘড়িতে এলারম দিয়ে রাখব, মোবাইলে এলারম দিয়ে রাখব।”

অনুপমা ওর বুকের ওপরে মাথা রেখে জিজ্ঞেস করে, “কবে থেকে শুরু করব এই খোঁজাখুঁজি?”

দেবায়ন ওর মুখ আঁজলা করে ধরে বলে, “এই ডিসেম্বর থেকে শুরু করলে কেমন হয়?”

মাথা উঁচু করে ওর চোখের দিকে তাকায় অনুপমা। আলতো ঠোঁট মেলে এগিয়ে দেয় দেবায়নের দিকে। ওর চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে ওই কথা শুনে। দেবায়নের ঠোঁট নেমে আসে ওর লাল নরম ঠোঁটের ওপরে। মিশে যায় দুই জোড়া কপোত কপোতীর ঠোঁট। অনুপমার আঙ্গুলে একটা বড় সলিটায়ার হীরের আংটি। 

চুম্বন শেষে, ওর বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে চুপচাপ পরে থাকে অনেকক্ষণ। দেবায়ন ওকে আস্টেপিস্টে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে দেয়। এইবারে ওর রাত আর বড় হবে না, এই বারে ওর আর ঠাণ্ডা লাগবে না। ওর বুক আর খালি থাকবে না। আয়নার সাথে আর কথা বলতে হবে না। রোজ সকালে ওকে ফোন করে উঠাতে হবে না। রাতে “গুড নাইট” কিস হাওয়ায় দিতে হবে না। ওর জামা চুরি করে পড়তে হবে না। অনেক কিছু “হবে না” তালিকা শেষ হয়ে যাবে ওর জীবনে। 

আঙ্গুলের আংটিটা দেখে, সোনার আংটির ওপরে একটা বড় হীরে। এই কিছুক্ষণ আগেই কত অভিযোগ নিয়ে নিজের সাথে কথা বলছিল আর ঠিক তখনি... পুচ্চু কি ওর মনের কথা শুনতে পারে নাকি? ছলছল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে কাঁপা আবেগভরা কণ্ঠে বলে, “তুই কি আমার মনের কথা শুনতে পেরেছিলি?” 

দেবায়ন আলতো মাথা দোলায়, “হটাত করে আজ সকালে বৃষ্টি দেখে বুকটা বড় ফাঁকা হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল তুই কাছে থাকলে দুইজনে বাইকে করে এই বৃষ্টিতে ভিজতে বের হয়ে যেতাম।”

অনুপমা ওর বুকের ওপরে একটা কিল বসিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলে, “বললি না কেন?”

ওর গালে আলতো চুমু খেয়ে দেবায়ন উত্তর দেয়, “তাহলে এই সারপ্রাইস হত কি করে?”

আবার দেবায়নকে দুইহাতে জড়িয়ে ধরে বলে, “খুব সুন্দর হয়েছে রে আংটিটা। মামনিকে বলেছিস?”

দেবায়ন মাথা নাড়ায়, “না মানে এখন মাকে বলিনি ভাবছি তুই আমার সাথে বাড়ি চল, দুইজনে একসাথে মাকে বলব।”

একটু লাজুক হেসে বলে, “আর বাকিদের?”

দেবায়ন মাথা নাড়ায়, “এখন নয়, বাকিদের না হয় ওই ট্রিপে গিয়ে বলব যে ডিসেম্বরে আমরা বিয়ে করছি।” ওর কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে বলে, “চল কোথাও বেড়িয়ে পরি এই বৃষ্টিতে।”

সেই শুনে নেচে ওঠে অনুপমা, চোখ জোড়া চকচক করে ওঠে ওর, “কোথায় যাবো?”

দেবায়ন মিচকি হেসে বলে, “কোলকাতায় রাস্তার অভাব আছে নাকি? পারলে না হয় দুরগাপুর হাইওয়ে ধরা যাবে। যতদূর যাওয়া যায় যাবো তারপরে আবার বাইক ঘুরিয়ে বাড়ির পথ ধরব।”

“নক নক... কৌন হ্যায়? নক নক... কৌন হ্যায়?” অনুপমার ফোন বেজে ওঠে, এটা মায়ের রিং টোন। এই এমন সময়ে মা ফোন করল হটাত করে, কি ব্যাপার? হৃদয়ে প্রবল উচ্ছাস, ঠিক পেছনে থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে দেবায়ন ওর ঘাড়ের ওপরে নাক ঘষে উত্যক্ত করে তোলে ওকে। আঙ্গুলের আংটি দেখে মাকে বলার জন্য অধীর হয়ে ওঠে। 

ফোন তুলেই মাকে বলে, “জানো মা আজকে কি হয়েছে।”

পারমিতা ওকে জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে?”

লাজুক হেসে প্রবল উচ্ছাসে দেবায়নের হাত খানি বুকের কাছে টেনে বলে, “পুচ্চু আমাকে একটা সলিটেয়ার দিয়েছে।”

পারমিতা অন্যপাশ থেকে খুশি হয়ে বলে, “এতদিনে তাহলে তোরা বিয়েটা সারছিস।”

মাথা দোলায় অনুপমা, “হ্যাঁ...”

পারমিতা ওকে জিজ্ঞেস করে, “হ্যান্ডসাম কি কাছে আছে নাকি?”

দেবায়ন মিচকি হেসে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ মিমি, তোমার মেয়েকে এইবারে তোমার বাড়ি থেকে নিয়ে আমার কাছে রাখব ভাবছি।”

পারমিতা কিঞ্চিত ধরা গলায় বলে, “বারন কে করেছে, সে’ত অনেকদিন আগেই নিয়ে গেছ।”

দেবায়ন উত্তর দেয়, “এইবারে একদম পাকাপাকি ভাবে নিয়ে যাবো।”

পারমিতা জিজ্ঞেস করে, “দেবশ্রীদি জানে?”

অনুপমা উত্তর দেয়, “না এখন মামনিকে জানানো হয়নি। আজ রাতে জানাবো।”

দেবায়ন বলে, “তুমি আর মা একটা ভালো দিনক্ষণ ঠিক কর, আর তর সইছে না।”

পারমিতা অন্যদিক থেকে হেসে বলে, “ইসসস আর তর সইছে না, সব হয়ে গেল আর কি বাকি আছে?”

অনুপমা হেসে বলে, “অনেক কিছু বাকি, ওর মাথার পাকা চুল তুলে দেওয়া বাকি, আমার চশমা হারিয়ে যাওয়া আর ওর দ্বারা খুঁজে পাওয়া বাকি...”

পারমিতা হেসে বলে, “আচ্ছা হয়েছে, বুঝতে পারছি তোর মনে বিয়ের ফুল ফুটছে। যার জন্য ফোন করেছিলাম। তোরা দুইজনে একসাথে আছিস যখন ভালোই হল। অনন্যা আর সত্যজিত এসেছে, তোদের সাথে ওর পত্রিকার সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করতে চায়।”

অনুপমা কপালে করাঘাত করে, দুই দিন আগে অনন্যা ওকে ফোন করে বলেছিল যে প্রত্রিকার সম্বন্ধে আলোচনা করার জন্য ওর বাড়িতে আসতে চায়। অনুপমা একদম ভুলে গেছে, এমন কি দেবায়নকে বলতেও ভুলে গেছে। আসলে এনুয়াল মিটের পর থেকেই এয়ার বার্লিনের প্রোজেক্ট নিয়ে শ্রেয়ার সাথে এত ব্যাস্ত ছিল যে অন্য কোন বিষয় নিয়ে ভাবার সময় ছিল না ওর কাছে। 

মাকে উত্তরে বলে, “উফফফ একদম ভুলে গেছি... আচ্ছা এক কাজ কর ওদের কিছুক্ষণ বসতে বল আমরা এই এক ঘন্টার মধ্যে আসছি।” 

ফোন ছেড়ে দেবায়ন কে সবিস্তারে অনন্যার বিষয়ে জানায়। ফোনে ওর সাথে অনন্যার শুধু মাত্র একটু কথাবার্তা হয়েছিল। প্রোজেক্সান, লাইন অফ বিজনেস, স্ট্রাটেজি এইসব ওর মাথায় ঢোকে না তাই এই বিষয়ে বাবার সাথে আর দেবায়নের সাথে আলোচনা করার কথা বলেছিল। দেবায়ন সব শুনে একটু মন মরা হয়ে যায়, অনুপমাও একটু মন মরা হয়ে যায়। এই ভিজে আবহাওয়ায় ঘুরতে যেতে বেশি ভালো লাগে এর মধ্যে আবার ব্যাবসা সংক্রান্ত আলোচনা করতে বসতে হবে ভেবেই মন কিঞ্চিত ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। কিন্তু কি করা যাবে, অনন্যা একদম বাড়ি পৌঁছে গেছে, আবার মায়ের সাথে অনন্যার বেশ ভালো সম্পর্ক। দেবায়ন আর অনুপমা কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পথে যেতে যেতে অনুপমা জানায় ওদের আশি থেকে নব্বুই লাখ টাকার দরকার। 

বাড়িতে পা রাখতেই ওর মা ওকে জড়িয়ে ধরে, “বাপ রে শেষ পর্যন্ত আমার মেয়ে বড় হয়ে গেল।” আবেগ জড়িত, মাতৃস্নেহে দেবায়নের দিকে তাকিয়ে নিচু কণ্ঠে বলে, “মেয়েটাকে একটু দেখো।”

অনুপমা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “প্লিস মা, এখুনি শুরু করোনা’ত।”

হাতের বড় হীরের আংটি দেখে পারমিতা ওকে বলে, “তোর ভাগ্য সত্যি ভালো।”

দেবায়ন মিচকি হেসে বলে, “ভাগ্য আমার ভালো। যাই হোক এইবারে আগে কাজ সারি তারপরে বাড়ি ফিরতে হবে। মাকে এখন জানানো হয়নি। আজ রাতে অনু কিন্তু আমাদের বাড়িতে থাকবে।”

পারমিতা দেবায়নের গালে আলতো টোকা মেরে হেসে বলে, “আমার বাড়ির মেয়ে অনেকদিন আগেই শ্বশুর বাড়িতে পা রেখে দিয়েছে, আর কি কিছু বলতে পারি?”

অনন্যা আর সত্যজিত বসার ঘরে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ওদের সামনে এই বিষয়ে কিছু আর আলোচনা করা হল না। সামান্য কুশল সম্ভাষণের পরেই সোজা প্রত্রিকা সম্বন্ধে আলোচনায় বসে গেল। সত্যজিত ফাইল এনেছিল, ল্যাপটপে বেশ কয়েকটা প্রেসেন্টেসান বানিয়ে এনেছিল, সেই গুলো দেখাল। ইতিমধ্যে ওদের পাব্লিকেশানের একটা নাম ঠিক করা হয়েছে, পত্রিকার একটা নাম ঠিক করে নিয়েছে “ফুলের ঝুড়ি”। সত্যজিত নিজে ফটোগ্রাফার, এই পাব্লিকেসান লাইনে বেশ চেনাজানাও আছে, বেশ কয়েকজন সম্পাদক সম্পাদিকার সাথে ইতিমধ্যে কথাবার্তা আলোচনা সেরে নিয়েছে। আগামী বড়দিনে পত্রিকার শুরু করতে চায়। 

সব শুনে দেবায়ন স্মিত হেসে জানায়, “দেখো মিস্টার সত্যজিত, এমনিতে এই পাব্লিকেসান লাইনে বিনিয়োগ করা বেশ ঝুঁকির ব্যাপার। আজকাল ইন্টারনেটের যুগ, মানুষে বই খুব কম পড়ে। মাসে কয়টা কপি বিক্রি করতে পারবে? তুমি যে প্রোজেক্সান দেখিয়েছ সেটা পাঁচ বছরে এচিভ করতে পারবে বলে আমার সন্দেহ আছে।” সত্যজিত একটু দমে যায় ওর কথা শুনে। অনেক আশা ভরসা নিয়ে অনন্যার কাছে শুনেই এদের কাছে এসেছিল। দেবায়ন তাও ওকে বলে, “আশি লাখ টাকা বিনিয়োগ করা খুব বড় ঝুঁকি। এত টাকা বিনিয়োগের আগে আমাকে একবার সেন কাকুর সাথে বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে।”

অনন্যা মাথা নাড়িয়ে ওকে বলে, “বাঙ্গালী মেয়েরা এখন বাড়িতে বসে বই পরে। আর শুধু যে পত্রিকা বেচে আমাদের টাকা আসবে সেটা নয়। বিজ্ঞাপনেও টাকা আসবে সেই নিয়ে তোমার চিন্তা নেই, শুধু প্রাথমিক ইন্ধন আমাদের নেই।” 

পারমিতা দেবায়নের দিকে তাকিয়ে বলে, “প্লিস দেবায়ন, আমি সোমেশকে বুঝিয়ে বলে দেব, শুধু তুমি না কর না। অনন্যা অনেক করেছে, ওর জন্য এইটুকু করতেই হবে।” পারমিতা আর অনন্যা কি ভাবে ওদের কন্সট্রাক্সান কোম্পানিতে কাজ এনেছে সেই বিষয়ে দেবায়ন ভালো ভাবেই জানে।

অনুপমা এর মধ্যে নেই তাই স্মিত হেসে মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেয়, “আমি এই বিষয়ে কিছুই বলতে পারব না, অনন্যাদি। ও আর বাবা যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই চূড়ান্ত।”

দেবায়ন খানিক ভেবে স্মিত হেসে বলে, “কাকিমা যখন বলছে তখন দিতে পারি। তবে আমার কয়েকটা শর্ত আছে।” সত্যজিত জিজ্ঞেস করে, “কি শর্ত?” দেবায়ন উত্তরে বলে, “ব্রেক ইভেনে না পৌঁছান পর্যন্ত কাকিমা তোমাদের এই পাব্লিকেসানের এম ডি হয়ে থাকবে, তারপরে দেখা যাবে। আর বোর্ড অফ ডাইরেক্টরের মধ্যে পায়েল কে নিতে হবে। অনুপমার অত সময় নেই কিন্তু পায়েল মাঝে মাঝে তোমাদের অফিসে যেতে পারে।”

সত্যজিত আর অনন্যা মুখ চাওয়াচায়ি কর নিচু কণ্ঠে নিজেদের অধ্যে আলোচনা করে ওদের জানায়, এই শর্ত ওরা মানতে রাজি। দেবায়ন জানিয়ে দেয়, কিছুদিনের মধ্যেই মিস্টার সেনের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করে ওদের এই পত্রিকার টাকা দিয়ে দেবে। 

সেই সাথে দেবায়ন অনন্যাকে মিচকি হেসে বলে, “সেই দিন রাতে তুমি বলছিলে ষাট লাখ টাকা আর এই কয়দিনে একেবারে নব্বুই লাখ টাকা হিয়ে গেল?”

সত্যজিত হেসে বলে, “না না সেটা একটা ইনিসিয়াল এস্টিমেট মাত্র ছিল, আসলে আমরা সব অঙ্ক কষে নিয়ে তারপরে এসেছি। আর হাতে একটু বেশি থাকলে একটু ভালো হয়।”

দেবায়ন অনন্যাকে হেসে বলে, “বেশ’ত ভালো কথা, কিন্তু” চোখ টিপে হেসে বলে, “এত বড় অঙ্কের টাকার বিনিয়োগের পরিবর্তে আমার কিছু চাই।”

পারমিতা ওর কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে চোখ পাকিয়ে দেবায়নের দিকে তাকিয়ে বলে, “প্লিস দেবায়ন...”

অনন্যা পারমিতাকে থামিয়ে দিয়ে হেসে দেবায়নকে বলে, “না না, কি চাও বল? কোথাও যেতে হবে কি?”

দেবায়ন উত্তরে জানায়, “তুমি একবার মিস চৌধুরীর সাথে কথা বলে নিও।”

অনুপমা লক্ষ্য করে অনন্যা বেশ গলে পরে আদুরে কণ্ঠে দেবায়নের সাথে কথাবার্তা বলছিল। আলোচনা শেষে খাওয়া দাওয়া শেষে, সত্যজিত স্মিত হেসে দেবায়নের সাথে হাত মিলিয়ে বলে, “একদিন বাড়িতে ডিনারে এসো।”

অনুপমাকে চোখ টিপে হেসে বলে অনন্যা, “ব্রেকফাস্টের নেমন্তন্ন রইল কিন্তু, ভুলে যাস না...”

অনুপমা ওর গালে গাল ঠেকিয়ে নিচু কণ্ঠে বলে, “সত্যজিত থাকলে হবে না কিন্তু...”

উত্তরে অনন্যা নিচু কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে, “না না, ডিনারের পরে সত্যজিত থাকে, না বাড়ি চলে যায়। চিন্তা নেই ব্রেকফাস্ট আমরা একসাথেই করব।”

দেবায়ন হেসে সত্যজিতের সাথে হাত মিলিয়ে জানায়, “ঠিক আছে একদিন ডিনারে অনন্যার বাড়িতে দেখা হবে।”


Reply
পর্ব ২৭ (#6)



রেডিসনে এনুয়াল মিটেই রূপক, বন্ধুদের কাছে খাটলিং গ্লেসিয়ার ট্রেকিঙ্গের কথা বলেছিল। সেই শুনে অনেকে যেতে রাজি হয়ে যায়। পরাশর যেতে রাজি হয়ে যায়, জারিনা জানায় যাওয়ার জন্য ওর আব্বাজানকে রাজি করিয়ে নেবে। সঙ্গীতা লাফাতে শুরু করে দেয় ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে, অগত্যা প্রবালের তাই কিছু আর বলার থাকে না। ঋতুপর্ণা, ধীমান এক কথায় রাজি। শ্রেয়া আর পায়েল এই অজানা অচেনা জায়গায় যেতে একটু দ্বিধাবোধ ব্যাক্ত করে, কারন ওদের দলের মধ্যে কারুর ট্র্যাকিঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। দেবায়ন বুঝিয়ে বলে, কোন কিছুর প্রথমদিন সবার জীবনে একদিন না একদিন আসে। অনুপমার ভাই, অঙ্কন প্রেয়সী পায়েলের চাপে পরে আর না করে না, তবে বড়দের সাথে যেতে একটু দোনামোনা করে, বিশেষ করে জানে রূপক আর দেবায়ন কি রকমের ছেলে। ওর একবার কারুর পেছনে লাগলে তাকে না কাঁদিয়ে ছাড়ে না। রূপকের ওপরে সব কিছু পরকল্পনার করার ভার কারন ওই বেশ উৎসাহী। ইন্টারনেট ঘেঁটে একটা ট্রেকিঙ্গের সাইটে লগিন করে একজনের সাথে আলোচনা করে অনেক কিছুর খোঁজ খবর ইতিমধ্যে নিয়ে নিয়েছে। অনুপমা আর দেবায়ন জানায়, খরচের সিংহ ভাগ ওরা দিতে রাজি। সেই সাথে অনুপমা আরো জানায় একজন অভিজ্ঞ চেনাজানা লোক সঙ্গে থাকলে বড় ভালো হয়। অফিসে এই নিয়ে কথাবার্তা চলে, সেই সময়ে ওরা জানতে পারে যে শান্তনু দিল্লীতে থাকার সময়ে বার পাঁচেক বিভিন্ন জায়গায় ট্রেকিঙ্গে গেছে। ঠিক হয় যে শান্তনু আর মনীষাকেও সঙ্গে নেওয়া হবে। মনীষা পাহাড়ের মেয়ে কিন্তু কোনোদিন ট্রেকিঙ্গে যায়নি তাই বেশ উৎসাহী। সব মিলিয়ে চোদ্দ জনের দল, বেশ বড় দল হলে যাওয়া সুবিধা। শান্তনুকে দলের নেতা হিসাবে মনোনীত করা হয়, আর বড় কারন সে অভিজ্ঞ আর দ্বিতীয়, দলের সব থেকে বড়, ওদের চেয়ে চার বছরের বড়। দলে সব থেকে বড় শান্তনু আর সব থেকে ছোট জারিনা আর অঙ্কন, বাকিদের বয়স মোটামুটি এক সবাই কলেজের বন্ধু।

পুজোর আগেই একদিন বিকেলে অফিসের পরে অনুপমাদের অফিসের কনফারেন্স রুমে ট্রেকিঙ্গের আলোচনা পরিকল্পনার সভা বসে। ঠিক হয় একাদশীর দিনে ওরা সবাই কোলকাতা থেকে রওনা দেবে। শান্তনু আর রুপকের ওপরে সব কিছুর ভার। অনুপমা দেশ বিদেশে অনেক পাহাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছে, কিন্তু সুউচ্চ হিমালয়ের হাতছানি ওকে প্রবল ভাবে ডাক দেয়। শ্রেয়া, পায়েল ঋতুপর্ণা বেশ উৎসাহী ওদের কাছে পাহাড় বলতে দার্জিলিং, সিমলা কুলু মানালি আর সিকিম এর চেয়ে বেশি দুর কোথাও যায়নি। জারিনা আর সঙ্গীতা কোনোদিন পাহাড়ে যায়নি। ছেলেদের একমাত্র দেবায়ন ছাড়া মধ্যে অনেকে পাহাড়ে বেড়াতে গেছে। 

ওই টিম মিটিঙে দেবায়ন বিশেষ করে জারিনা আর অঙ্কনকে বলে, “দেখ ভাই আমরা বেড়াতে যাচ্ছি, ওইখানে কিন্তু কেউ বড় কেউ ছোট নয় আর জানিস ত আমাদের অবস্থা...”

রূপক ওর কথা টেনে নিয়ে বলে, “আমাদের কিন্তু কোন টাক্স নেই, না কথাবার্তার না ...”

পায়েল মুখ না খুললেও পাশে বসা অনুপমাকে আলতো ধাক্কা মেরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, “ওই সব হলে কিন্তু আমি আর অঙ্কন যাবো না।”

অনুপমা ওকে অভয় দিয়ে বলে, “আরে না না এইবারে ওইসব উল্টপাল্টা কিছুই হবে না সেই নয়ে তোর চিন্তা নেই।”

দেবায়ন সেটা শুনে ফেলে ইয়ার্কি মেরে বলে, “আমি তোর জন্য চার প্যাকেট কন্ডোম নিয়ে যাবো, হয়েছে?”

জারিনার কান লজ্জায় লাল হয়ে যায় সেই শুনে। মনীষা হেসে ফেলে দেবায়নের কথা শুনে। 

শান্তনু ওদের এই আলোচনা থামিয়ে বলে, “সব থেকে আগে আমাদের শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করতে হবে। খাটলিং গ্লেসিয়ার ট্রেকিং বেশ কষ্টকর ট্রেকিং, দিন দশেকের মতন তাঁবুতে থাকা আর হাঁটা। কখন উঁচু চড়াই কখন উতরাই। সেই মতন প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য প্রত্যেককে আমি মর্নিং অয়াক করতে উপদেশ দেব।” 

মনীষা ওকে আলতো ঠ্যালা মেরে বলে, “বাপরে, চোরের মায়ের বড় গলা, রোজদিন ঠিক সাড়ে আটটায় ঘুম থেকে উঠবে আর তড়িঘড়ি করে অফিসে আসবে। তোমার জন্য প্রায় দিন আমার লেট হয়ে যায়।”

শান্তনু কিঞ্চিত লজ্জা পেয়ে বলে, “যার বউ অফিসের এইচ আর সেই অফিসে লেট আসাতে ক্ষতি কি।”

ওই শুনে সবাই হেসে ফেলে। 

জারিনা জানায়, বাবার কাছ থেকে সব ওষুধপত্র যোগাড় করে একটা বড় ফার্স্ট এইডবক্স আর বেশ কিছু ঠাণ্ডার জন্য ইঞ্জেক্সান নিয়ে যাবে। সেদিনের মতন সভা শেষ হলে সবাই কেনা কাটা করতে ব্যাস্ত হয়ে পরে। রূপক আর শান্তনুর ওপরে সব ভার, দলের নেতা শান্তনু আর রূপক ডান হাত, অনুপমা আর দেবায়ন ওদের পকেট। সবার একটা করে রাকস্যাক আর একটা ছোট ব্যাগ কেনা হয়। অনুপমার কাছে প্রচুর ভারী জ্যাকেট ছিল তাই শ্রেয়া আর পায়েলকে কোন জ্যাকেট কিনতে হয় না, তবে বাকিদের জন্য জ্যাকেট দস্তানা ইত্যাদি কেনা হয়। তাঁবুর সরঞ্জাম ঘনসিয়ালি থেকে নিয়ে নেওয়া হবে, গাইড আর মালবাহক লোকের ব্যাবস্থা ঘুট্টু নামক গ্রামে হয়ে যাবে বলে শান্তনু জানায়। এডমিনে থাকার ফলে এইসবের খবর আর ব্যাবস্থা করার কৌশল ওর বেশ ভালো করেই জানা। 

ঠিক হয় একদশীর দিন বিকেলে প্লেনে চেপে সোজা দিল্লী। ধীরে ধীরে ঘুরতে যাওয়ার দিন কাছে চলে আসে। পুজো এক রকম হইহুল্লোড়ে কাটিয়ে একাদশীর দিন বিকেলে সবাই নিজেদের জিনিস পত্র নিয়ে কোলকাতা এয়ারপোর্টে উপস্থিত। ওদের ছাড়তে বাড়ির অনেকে এসেছে, বিশেষ করে জারিনার বাবা মা। প্রথম বার মেয়েকে এইভাবে একা বাইরে ছাড়ছে বলে একটু উদ্বেগ প্রকাশ করে। এয়ারপোর্টে পারমিতা এসেছিল, সেই জারিনার বাবাকে অভয় দিয়ে বলে এতগুলো ছেলে মেয়ে একসাথে যাচ্ছে কোন অসুবিধে হবে না। বিশেষ করে শান্তনু ওদের দলের মধ্যে সব থেকে বড়, বাকিদের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ। 

প্লেন কোলকাতার মাটি ছাড়তেই সবাই নেচে ওঠে, মুক্তির স্বাদ, সুউচ্চ হিমালয়ের হাতছানি, হিমশীতল গ্লেসিয়াররে ডাক, পনেরো দিন শুধু মাত্র প্রকৃতির কোলে কাটাবে। এই কয়দিনে অনুপমা আর পায়েল ছাড়া কেউই মর্নিং অয়াক করেনি সেই নিয়ে একটু হাসা হাসি হয় প্লেনে। প্লেনের বাকি যাত্রীরা চোদ্দ জনের একটা ট্রেকিং টিম দেখে ভির্মি খেয়ে যায়। সাধারনত যে ভারতীয়রা ট্রকিঙ্গে যায় তারা অধিকাংশ ট্রেনে যাতায়াত করে, তাই অনুপমাদের দেখে করে প্লেনের বাকিরা একটু তাকিয়ে থাকে। ওরা কি আর চুপ করে থাকার মানুষ? 

রূপক প্লেনে উঠেই পেছনে বসা পরাশরকে চেঁচিয়ে বলে, “এই শালা কেউ একটু জানালা খুলে দে বড্ড গরম লাগছে। এইখানে মনে হয় এসি নেই।”

সেই শুনে সবার হাসাহাসি শুরু হয়ে যায়। শ্রেয়া একজন বিমান সেবিকাকে ডেকে ইয়ার্কি মেরে বলে, “আচ্ছা, ওই টয়লেটে কেউ পটি করলে কি নীচে পরে যাবে?”

এয়ার হস্টেস হাসবে না কাঁদবে কিছু ভেবে পায় না। ভাবে এইগুলো একদম গেঁয়ো নাকি? ঋতুপর্ণা চেঁচিয়ে বলে, “না না তোর পটি এই শুন্যে উড়তে উড়তে পাখীদের খাদ্য হয়ে যাবে।”

শ্রেয়া হটাত শান্তনুকে বলে, “টিম লিডার আমাদের খিদে পেয়েছে। ডিনারের কি ব্যাবস্থা।”

শান্তনু পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলে, “সুন্দরীরা একটু চুপচাপ বসে থাকো, একটু পরেই খাবার সারভ করা হবে।”

মনীষা আর ঋতুপর্ণা চেঁচিয়ে ওঠে, “আজ আমাদের নিরামিষ।”

এক কোনা থেকে পরাশর চেঁচিয়ে ওঠে, “আমি কিন্তু মাছের ঝোল আর ভাত।”

দেবায়ন চেঁচিয়ে ওঠে, “টিম লিডার আমার হুইস্কি কোথায়?”

সেই সাথে তাল মেলায় রূপক আর ধীমান, “স্কচ অন রক্স বেবি।”

ওদের চেঁচামেচিতে প্লেনের বাকি যাত্রীরা রিতিমতন ভির্মি খেয়ে যায়। 

প্লেনে ওঠার পর থেকে প্রবাল মুখে কুলুপ এঁটে চুপ। হাওয়ার চাপ কমে যাওয়ার ফলে ওর কান ভোভো করছে। সঙ্গীতার হাত খানি মুঠি করে ধরে চুপচাপ সিটে বসে। সেটা ধীমান দেখতে পেয়ে মজা করে বলে, “ওরে বাল, তোর বউ নিয়ে কেউ পালিয়ে যাবে না। প্লেনের মধ্যে কেউ নিয়ে আর পালাবে কোথায়। এইবারে একটু ছেড়ে দে।”

সঙ্গীতা উল্টে ওকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে বলে, “চুপ কর, প্লেনে চাপলে ওর মাথা ঘোরে।”

দেবায়ন সিট থেকে উঠে ওর মাথায় চাঁটি মেরে ইয়ার্কি মেরে বলে, “তোর জিন্স নয় শাড়ি পরে আসা উচিত ছিল। ওকে আঁচলের তলায় লুকিয়ে রাখতিস তাহলে ভালো হত।”

অনুপমা ওদের বলে, “আরে আরে আঁচলের তলায় অনেক কিছু লুকানো আছে রে প্রবাল, লাগা একটু মুখ লাগা।”

এই ভাবে মজা করতে করতে ওরা রাতের বেলা দিল্লী পৌঁছায়। শান্তনু জানায়, ভোর বেলা একটা চোদ্দ সিটের বাস ওদের জন্য ঠিক করা হয়েছে। দিল্লী থেকে এই বাসে চেপেই ওরা হৃষীকেশ হয়ে ঘুট্টু যাবে। ঘুট্টু থেকে ওদের ট্রেকিঙ্গের শুরু। 

দিল্লীতে রাত কাটিয়ে তারপরের দিন সকাল বেলায় একটা ছোট বাসে চেপে সবাই হৃষীকেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দিল্লী ছাড়ার আগে, দেবায়ন রূপক আর ধীমান বেশ কয়েক বোতল হুইস্কি, রাম ইত্যাদি মদ কিনে নিয়েছিল। সারাটা রাস্তা হাসি মজা করতে করতে কেটে যায়। হৃষীকেশ পৌঁছাতে ওদের বিকেল হয়ে যায়। দেবায়ন, অঙ্কন আর অনুপমা ছাড়া বাকিদের হৃষীকেশ আগে থেকে ঘোরা ছিল। তাও সন্ধ্যের পরে সবাই হৃষীকেশ ঘুরে বেড়িয়ে দেখে। পুজোর পরে একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব এসে গেছে পাহাড়ের পাদদেশে। হৃষীকেশ থেকে পাহাড় শুরু, ওদের হোটেলের পেছনে পাহাড়, গঙ্গার জল এইখানে খুব ঠাণ্ডা। এর ওপরে গেলে জলের তাপমাত্রা কত কম্বে সেই নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়। হৃষীকেশে ওরা দশ দিনের খাবার দাবার কেনাকাটা করে নেয়। ম্যাগি, চাল ডাল, আলু ইত্যাদি। শান্তনু জানিয়েছে, রাতে যদি নিজেরা রান্না না করতে পারে তাহলে একটা রান্নার লোক সাথে নিয়ে যাবে। জারিনা আর ঋতুপর্ণা জানিয়ে দেয় ওরা রান্না করতে রাজি। পরাশর হেসে বলে, পাহাড়ি পথে হাটার পরে দেহে আর শক্তি থাকবে না যে রান্না করতে বসবে।

মেয়েদের মধ্যে বিশেষ করে শ্রেয়া, ঋতুপর্ণা আর অনুপমার খুব চিন্তা স্নান করবে কি করে। দেবায়ন মজা করে বলে, “ভিলাঙ্গনা নদীর ঠাণ্ডা জলে তোরা স্নান করে আমাদের কোলে চেপে যাস আমরা তোদের ঠিক গরম করে দেব।”

ধীমান একটু নেচে নেয় সেই শুনে, “এইবারে কে কার কোলে চাপবে সেটা কিন্তু আমি ঠিক করে দেব।”

রূপক হেসে শান্তনুর কাঁধ চাপড়ে বলে, “কি বস, আমরা সবাই কিন্তু ঠোঁট কাটা, মুখে কোন ট্যাক্স নেই।”

মনীষার দিকে চোখ টিপে উত্তর দেয় শান্তনু হেসে বলে, “তাতে অসুবিধে নেই শুধু আমার বউটা যেন বেঁচে ফিরে আসে।”

সেই শুনে লজ্জায় মনীষার কান গাল লাল হয়ে যায়। এমন একটা দলের সাথে আগে কোনোদিন কোথাও যায়নি। ওরা যে এতটা ঠোঁট কাটা আর এই সব বিষয়ে কথাবার্তা বলবে সেটা ভাবেনি। 

দেবায়ন চোখ টিপে শান্তনুকে জিজ্ঞেস করে, “বস, আজ রাতে কি কান খুচাবে না অন্য কিছু?”

শান্তনু মুখ গোমড়া করে বলে, “না রে ভাই কান খুচাবো, কি করি বল পাউরিটিতে জ্যাম লেগে আছে। আশা করি কাল শেষ হয়ে যাবে।”

মনীষা সেই শুনে ওকে মারতে শুরু করে দেয় আর বাকিরা সবাই হেসে ফেলে। 

হৃষীকেশ থেকে কাক ভোরে ওরা সবাই বাসে চেপে বেড়িয়ে পরে ঘুট্টুর উদ্দেশ্যে। একশো সত্তর কিলোমিটার পথ, এরপরে যেতে হবে তেহেরি, ঘনসিয়ালি হয়ে ওদের যেতে হবে ঘুট্টু। তেহেরি শহর আর নেই, বাঁধের ফলে গঙ্গার স্তর বেড়ে গেছে যার ফলে শহর উঠে গেছে। হৃষীকেশ ছাড়াতেই ওদের বাস ধীরে ধীরে সরু আঁকা বাঁকা পাহাড়ি পথে ধরে চড়াই উঠতে শুরু করে দেয়। সরু পথ, দুই ধারে উঁচু সবুজ পাহাড়। বাস একবার ডানদিকে মোড় নেয় কিছুপরেই আবার বাম দিকে মোড় নেয়। বারকোট পের হতেই পায়েল বমি করতে শুরু করে দেয়, সেই দেখাদেখি সঙ্গীতা আর শ্রেয়ার বমি পেয়ে যায়। বারকোটের পরে একটা ছোট বসতি জায়গায় থেমে জল খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু। প্রবাল, পরাশরের শরীর একটু খারাপ হয়ে যায় পাহাড়ের আঁকা বাঁকা পথে। শান্তনু দেবায়ন বেশ চিন্তায় পরে যায়। জারিনা সঙ্গে ওষুধ এনেছিল সেই গুলো খেয়ে মোটামুটি সবাই সুস্থ হয়ে যায়। তেহেরি ড্যাম ছাড়িয়ে, গঙ্গা পার হয়ে আরো দুর ওদের যেতে হবে। তেহেরি পৌঁছাতেই দুপুর, ঘনসিয়ালি পৌঁছাতে আরো বেশ কয়েক ঘণ্টা লেগে যাবে। ড্যামের জন্য বড় ভারী গাড়ি চলার ফলে তেহেরির পর থেকেই রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। ঘনসিয়ালির পরে বলতে গেলে রাস্তা আর নেই। কালী বাগি থেকে ছোট ব্রিজ পার করে ভিলাঙ্গনা নদীর ওপাড়ে যায় ওদের বাস। দুর উত্তরে সুউচ্চ তুষারে ঢাকা হিমালয় পর্বত মালা দেখে সবার দেহ মন ভালো হয়ে ওঠে। ওই দুরের তুষারে ঢাকা কোন এক শৃঙ্গের নীচে ওদের গন্তব্য স্থল। খাটলিং গ্লেসিয়ার গলে তৈরি হয়েছে ভিলাঙ্গনা নদী। 

ঘুট্টুতে একটা রেস্ট হাউসে ওদের থাকার ব্যাবস্থা করা হয়েছিল। মেয়েদের সেই রেস্ট হাউস বিশেষ পছন্দের নয় বিশেষ করে পায়েল আর অনুপমার। সেটা হওয়ার কথা, বড় লোকের মেয়ে সর্বদা ফাইভ স্টার হোটেলে থেকে এসেছে, ছোট রেস্ট হাউসে কি করে কাটাবে। 

এই নিয়ে অনুপমার সাথে শান্তনুর একটু বচসা হয়ে যায়, “এই খানে রাত কাটানো যায় নাকি? সবাই এত ক্লান্ত হয়ে এসেছে আর এই জায়গায় কিছুই পাওয়া যায় না।”

শেষ মেশ দেবায়ন ওদের বুঝিয়ে বলে, “পুচ্চি আমরা এইখানে ফাইভ স্টার রিসোর্টে কাটাতে আসিনি। এটাই শেষ রেস্ট হাউস এরপরে টেন্টে থাকতে হবে।”

অনুপমা ঝাঁঝিয়ে ওঠে, “বেশ’ত টেন্টে থাকব সেটা ভালো।”

দেবায়ন শান্তনুকে অন্যদিকে পাঠিয়ে অনুপমাকে শান্ত করে, “আচ্ছা বাবা, এর চেয়ে ভালো কিছু এইখানে পাওয়া সম্ভব নয়। একটা রাতের ব্যাপার, এরপরে যখন ঘুরে আসবি তখন দেখবি এই রেস্ট হাউস তোর কাছে ফাইভ স্টার মনে হবে।”

কথাটা না বুঝতে পেরে অনুপমা পায়েল ওকে জিজ্ঞেস করে, “কি করে?”

দেবায়ন হেসে বলে, “এরপরে শুধু মাত্র টেন্ট আর আমাদের মুখ দেখতে পাবি। এই ঘুট্টুর পর থেকে আমরা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরু পাহাড়ি রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাবো। দশ দিন পরে যখন ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসব তখন এই বিছানা দেখে মনে হবে, আহহহ... কি আরাম।”

দুইজনেই সেই শুনে হেসে ফেলে। উত্তরের তুষারে ঢাকা পর্বত মালা থেকে বয়ে আসা কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া ওদের কাঁপিয়ে দেয়। ঘুট্টুতে ওদের জন্য গাইড, রঞ্জিত আর জনা দশেক পোরটার তৈরি ছিল। রঞ্জিতের বাড়ি তেহেরিতে ছিল কিন্তু সেই শহর উঠে যাওয়ার পরে নিজের গ্রামে ফিরে যায়। এইখানে অথবা উত্তরকাশিতে গিয়ে বিভন্ন ট্রেকিঙ্গের গাইডের কাজ করে। মালবাহী ছেলে গুলো বাড়ি এই ঘুট্টু, গাঙ্গি, রীহ এইসব ছোট ছোট গ্রামে। রেস্ট হাউসের সামনের খোলা জায়গায় রাতের বেলা ক্যাম্প ফায়ার তৈরি করে সবাই গল্পে মেতে ওঠে। রঞ্জিত জানিয়ে দেয়, ঘুট্টু থেকে রীহ দশ কিলোমিটার পথ। রাস্তার প্রথম দিকে একটু চরাই তারপরে বন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে হাঁটা পথে ওদের এগোতে হবে। এতটা পথ বাসে যাত্রা করার পরে কারুর দেহে বেশিক্ষণ রাত জাগার শক্তি ছিল না। কোন রকমে খাওয়া সেরে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে সবাই সেঁধিয়ে যায়। 

ভোর পাঁচটায় ওদের গাইড রঞ্জিত এসে ওদের ঘুম থেকে উঠিয়ে দেয়। ঘুম ঘুম চোখে দেবায়নকে জড়িয়ে ধরে অনুপমা কাতর কণ্ঠে বলে, “উঠতে হবে নাকি? কটা বাজে?”

দেবায়ন গভীর নিদ্রায় ছিল তাই ওর কথা শুনতে পায়নি। স্লিপিং ব্যাগে অন্যদিকে ফিরে কাত হয়ে আবার ঘুমিয়ে পরে। অনুপমা ওকে আরো জড়িয়ে ধরে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়। এই ঠাণ্ডায় ওর গায়ের গরমে সকালের ঘুম আর কিছুতেই ছাড়তে চায় না। এমন সময়ে শ্রেয়া আর ঋতুপর্ণা এসে ওদের ধাক্কা দিয়ে তুলে দেয়। বেশি দেরি করলে রীহ পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে। সবার এই প্রথম বার ট্রেকিঙ্গে যাওয়া তাই সবাই বেশ উৎসাহী। গরম জলে স্নান সেরে, ব্রেকফাস্ট সেরে সবাই বেড়িয়ে পরে রীহের উদ্দেশ্যে। খাবারের ব্যাটারি, তাঁবুর সরঞ্জাম, বড় বড় ব্যাগ নিয়ে মালবাহী ছেলেরা অনেক আগেই রীহের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছে। ওরা আগে থেকেই একটা ভালো জায়গা দেখে তাঁবু খাটিয়ে দুপুরের রান্নার যোগাড় করবে বলে ওদের গাইড রঞ্জিত ওদের জানিয়ে দেয়। ছেলেদের পিঠে নিজেদের একটা ব্যাগ আর মেয়েদের কাছে ছোট ব্যাগে শুধু মাত্র জলের বোতল। ঋতুপর্ণা, অনুপমা আর জারিনা বেশ শক্তপোক্ত তাই নিজেদের ছোট ব্যাগ নিজেরাই বহন করে। অন্যদিকে শ্রেয়া নিজের ব্যাগ রুপকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে, মনীষা এক প্রকার খালি হাতেই নাচতে নাচতে যাত্রা শুরু করে। অঙ্কন পায়েলের পাশ আর ছাড়ে না, সেই নিয়ে ওদের সবার মধ্যে বেশ হাসাহাসি হয়। 


Reply
পর্ব ২৭ (#7)



রঞ্জিত জানায়, প্রথম কিছুটা খুব কষ্ট হবে তারপরে একবার হাঁটার ছন্দ পেয়ে গেলে তখন হাঁটতে আর কষ্ট হবে না। ঠিক তাই হল, শুরুতে চড়াই, আশেপাশে বিশেষ গাছ পালা নেই শুধু মাত্র উঁচু উঁচু পাইন গাছ ছাড়া। দুর উত্তরের কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া ওদের সামনে থেকে দৌড়ে এসে ওদের ঘায়েল করতে প্রস্তুত। একপাশে গভীর খাদের মধ্যে নিয়ে ভিলাঙ্গনা নদী কুলুকুলু শব্দে, মত্ত ছন্দে পাহাড় কেটে, পাথরের বাঁধা উপেক্ষা করে বয়ে চলেছে মোহনার পানে। তেহেরিতে গিয়ে এই নদী ভাগীরথীর সাথে মিশে নীচে নেমে যাবে গঙ্গা হিসাবে। চারাপাশের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে সবাই ধীর পায়ে এগিয়ে যায়। 

যাত্রা শুরুর পূর্বে রঞ্জিত ওদের সবার হাতে একটা লাঠি দিয়ে দিয়েছিল, বলেছিল এই লাঠির ভর দিয়ে পাহাড়ে চড়তে বেশ সুবিধা হয়। প্রথমে সবাই লাঠি দেখে হাসাহাসি করেছিল কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই লাঠিটাই সর্বস্ব সম্বল বলে মনে হয় সবার। দলের একদম শুরুতে রঞ্জিত চলছে আর একদম শেষে মনীষা আর শান্তনু। 

কিছদুর গিয়ে অনুপমার পা আর চলে না। এক হাত দেবায়নের কাঁধে ভর দিয়ে কোনরকমে হাঁটতে হাঁটতে বলে, “উফফফ মাগো এই জায়গায় কেউ আসে নাকি?”

শ্রেয়া ওইদিকে রুপকের ওপরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে, “তুমি বেড়ানোর আর জায়গা খুঁজে পেলে না?”

বাকি মেয়েদের চেয়ে ঋতুপর্ণা আর জারিনা বেশ উচ্ছল প্রানবন্ত, ওদের দেখে অনুপমা আর মনীষা বুকে বল পায়। অনুপমা জারিনাকে জিজ্ঞেস করে, “কি রে মেয়ে এত নাচছিস কেন?”

জারিনা ওর কথা শুনে হেসে বলে, “অনুদি, সত্যি বলছি এইরকম জায়গায় আনার জন্য অনেক ধন্যবাদ।”

অনুপমা হেসে বলে, “ওরে আমি আনিনি তোদের, এই সব প্লান ওই রূপকের।”

শ্রেয়া হেসে বলে, “এক বার কোলকাতা ফিরি তারপরে দেখি কে কাকে ধন্যবাদ দেয়।”

পেছন থেকে শান্তনু চেঁচিয়ে বলে, “একবার খাটলিং পৌঁছে এই কথা বল। তখন ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাবে না।”

হাঁটতে হাঁটতে অনেকেই হাঁপিয়ে ওঠে, একটু থেমে জল মুখের মধ্যে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু। এখন আর ওদের বিশেষ ঠাণ্ডা লাগছে না, অনেকেই জ্যাকেট খুলে দিয়েছে। ভোরের আলো সদ্য স্নান করিয়ে দেয় আশেপাশের সবুজে ঢাকা গাছ পালা ঝোপ ঝাড় কে। আরো একটু হেঁটে যাওয়ার পরে সামনে আসে ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গল দেখে অনেকের ভয় করে, এই রকম জঙ্গল ওরা শুধু মাত্র সিনেমাতে দেখে ছিল। ওদের মনে হয় সত্যি সত্যি ওরা কোন রোমাঞ্চকর সিমেনার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। 

অনুপমার এখন আর ক্লান্তি লাগে না, অন্য মেয়েদের সাথে গল্প করতে করতে হেঁটে চলে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। মনীষা শান্তনুকে ছেড়ে ওদের কাছা কাছি চলে এসেছে। একদম শুরুর দিকে ঋতুপর্ণা আর জারিনা, তাদের পেছনে শ্রেয়া, পায়েল অনুপমা সঙ্গীতা আর মনীষা। অনুপমা একবার পেছনের দিকে দেখে। ধীমান, দেবায়ন আর রূপক একদম পেছনে, নিশ্চয় কোথাও বসে সিগারেট ফুঁকছে ওরা। শান্তনু এগিয়ে গিয়ে ওদের হাঁটতে বলে, বলে যে ধীমান দেবায়ন একটু মদ্য সেবন করে আসছে। সেই শুনে অনুপমা একটু রেগে যায়, ঘুরতে এসেও মদ খেতে হবে নাকি? 

চেঁচিয়ে ডাক দেয় দেবায়নকে, “পুচ্চু তাড়াতাড়ি চলে আয়।”

গাছ পালা ভর্তি জঙ্গলের মাঝে সরু পায়ে হাঁটা পথ, রীহ, গাঙ্গি ওইদিকে আরো অনেক ছোট ছোট গ্রাম আছে সেই গ্রামের বাসিন্দারা বাইরের জগত থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন থাকে, এই পথে যেতে যেতে ওদের মনে হয় যেন কোন স্বপ্ন পুরীর মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে ওরা। এক মাস আগেই বর্ষা শেষে গাছ পালা সব সবুজ পাতায় ঢাকা, পায়ের তলায় স্যাঁতস্যাঁতে মাটি, চারপাশে ছোট ছোট জংলি ফুলের গাছ, লতাপাতা, কোথা থেকে কোন পাখীর ডাক শোনা যায়, একপাশে একটা ছোট নাম না জানা পাহাড়ি নদী গর্জন করতে করতে এগিয়ে চলেছে মোহনার পানে। 

শ্রেয়া ওকে বলে, “ইসসস আমার না গান গাইতে ইচ্ছে করছে।”

মনীষা বলে, “গাও, কে বারন করেছে।”

শ্রেয়া গেয়ে ওঠে, “ইয়ে কাঁহা আআআআ গয়ে হম” অনুপমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “তেরে সাথ চলতে চলতে... তেরি বাহো মে ইয়ে জানম... মেরি জিস্মোওও যা পিঘলতে...”

অনুপমা গায়, “তু বদন মেয় তেরা ছায়া, তু না হ’ত মেয় কাঁহা হু... ”

ঋতুপর্ণা সামনে থেকে চেঁচিয়ে বলে, “আরে আরে হল হল না, অমিতাভের কবিতা কেউ বলবে না নাকি?”

শান্তনু গেয়ে ওঠে, “ইয়ে রাত হ্যায় ইয়া তুমহারি জুলফে খুলি হুয়ি হ্যায়...”

মনীষা হেসে বলে, “ডার্লিং এটা আমার চুল...”

সবাই হেসে ফেলে। গান গাইতে গাইতে জঙ্গল পার করতে করতে ওদের রীহ পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যায়। পাহাড়ের কোলে একটা সমতল খাদের পাশে অবস্থিত পটে আঁকা ছবির মতন ছোট গ্রাম রীহ, বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এই গ্রামে ছোট একটা রেস্ট হাউস আর বেশ কয়েকটা বাড়ি ঘর আছে। ওদের জন্য আগে থেকেই ওদের গাইড জায়গা ঠিক করে রেখেছিল। মাল বাহকেরা ওদের অনেক আগেই ওইখানে পৌঁছে গিয়েছিল। ওরা সবাই এইখানকার বাসিন্দা, রোজদিন এই পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াত করে, ঘুট্টু থেকে রীহ, দশ কিলোমিটার পথ অনুপমাদের ছয় ঘন্টা লেগে যায়, কিন্তু মাল নিয়ে ছেলেগুলো অনায়াসে তিন ঘন্টায় সেই পথ পাড় করে উপস্থিত। মাল বাহক ছেলেরা তাঁবু খাটিয়ে দিয়েছে, একজন ওদের জন্য রান্নাও শুরু করে দিয়েছে। সবার আলাদা আলাদা ছোট ছোট তাঁবু, গোল করে বাঁধা হয়েছে, মাঝখানে খালি জায়গা। একপাশে টয়লেট করার তাঁবু, একপাশে রান্না করার তাঁবু, অন্যপাশে মাল বাহকদের জন্য তাঁবু খাটান হয়ে গেছে। 

ছয় ঘন্টা হেঁটে অনেকের পায়ের অবস্থা খুব খারাপ। ওদের একটু দূরে দুটো দল তাঁবু গেড়েছে। রঞ্জিত খোঁজ নিয়ে ওদের জানায়, একটা জার্মানি ফ্রান্সের দল, যারা অডেন’স কল যাবে, আর দ্বিতীয় একটা পাঞ্জাবী দল যারা মাসার তাল যাবে। বিদেশী দলটার সরঞ্জাম অনেক বেশি, কারন ওডেন’স কল নাকি রীতিমত মাউন্টেনিয়ারিং করে উঠতে হয়। অডেন’স কল হয়ে ওরা কেদারনাথ যাবে, অনেক দিনের পরিকল্পনা। 

তাঁবুর মাঝখানের খালি জায়গায় পৌঁছেই অনুপমা সবুজ ঘাসে ঢাকা মাটির ওপরে সটান শুয়ে পরে, ওর পাশে দেবায়ন শুয়ে পরে। দেবায়নকে জড়িয়ে ধরে প্রেমাবেগে বলে, “ইসসস জীবনটা এইভাবে কেটে গেলে বড় ভালো হত।”

দেবায়ন ওকে জড়িয়ে গালে ছোট চুমু খেয়ে বলে, “কি করতিস এইখানে?”

দুরের ছোট ছোট বাড়ি দেখিয়ে বলে, “ওর একটার মধ্যে আমাদের একটা বাড়ি হত, তুই ওই খেতে কাজ করতিস আমি তোর জন্য ঘরে বসে রান্না করতাম।”

দেবায়ন হেসে ওর বাম হাতের অনামিকা দেখিয়ে বলে, “আর এটার কি হত?”

অনুপমা স্মিত হেসে বলে, “তুই পাশে থাকলে এই হীরের আংটি জলে ফেলে দিতে পারি।” বলেই ওর গলা জড়িয়ে গালে একটা চুমু খায়।

ওদের ওইভাবে জড়াজড়ি করে ঘাসে শুয়ে থাকতে দেখে ঋতুপর্ণা আর শ্রেয়া কাছে এসে ফেরিওয়ালার মতন একটা সুর টেনে বলে, “চাই... নাকি কন্ডোম চাইইইই...। দশ টাকায় তিনটে কন্ডোম... বেশ ভালো কন্ডোম, ঢুকলে পরে মনে হবে না ...” 

দেবায়ন ঋতুপর্ণার হাত ধরে টেনে পাশে বসিয়ে বলে, “রাতে চলে আসিস কন্ডোম ছাড়াই ঢুকিয়ে দেব...”

গরম জলে হাত মুখ ধুয়ে সবাই খেতে বসে যায়। আলুসিদ্ধ আর খিচুড়ি রান্না করেছিল সঙ্গে আসা রান্নার লোক। সবাই বেশ ক্লান্ত, খেয়েদেয়েই সবাই ঘুমিয়ে পরে। তাঁবুতে ঢুকে অনুপমা দেবায়ন কে জড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিদ্রা দেবীর কোলে ঢলে পরে। 

ছেলেরা অনেক আগেই উঠে গিয়েছিল। অনুপমা উঠে দেখে পাশে দেবায়ন নেই, বাইরে ওদের হাসির আওয়াজ শোনা যায়। চোখ ডলতে ডলতে বাইরে বেড়িয়ে দেখে মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় অনেক শুকনো কাঠ জড় করা হয়েছে, রাত বাড়লে ওই কাঠে আগুন জ্বালিয়ে বনফায়ার করা হবে। বেশ মজা হবে। বিকেলে যখন সবাই ওঠে ততক্ষণে সূর্য পাটে বসার সময় হয়ে গেছে। চারপাশের ঘন জঙ্গল থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আরো কত রকমের পোকা মাকরের গুনগুন শব্দ, একপাশ থেকে ভেসে আসা একটানা নদীর কুলুকুলু ধ্বনি, পরিবেশ টাকে মোহাচ্ছন করে দেয়। 

রঞ্জিত জানায়, দুটো মাল বাহি ছেলের বাড়ি এই গ্রামেই তাই বাকি মাল বাহি ছেলেরা আজ রাতে ওর বাড়িতে থেকে যাবে। আগামী কাল সকালে রীহ থেকে গাঙ্গি যাওয়া হবে।

চা খাবার দাবার খেতে খেতে সন্ধ্যে নেমে যায়। শুকনো কাঠে আগুন জ্বালিয়ে বনফায়ার জ্বালানো হয়। চারপাশে গোল করে সবাই জোড়ায় জোড়ায় বসে গল্পে মেতে ওঠে। রূপক ধীমান ইতিমধ্যে মদ তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছে। মেয়েরা জানিয়ে দেয় ওর মদ খাবে না, তবে শ্রেয়া আর অনুপমার একটু রাম নিতে আপত্তি নেই। 

কি করা যায়, কি করা যায়, ঋতুপর্ণা বলল, “একটা খেলা খেললে কেমন হয়?” সবাই জিজ্ঞেস করে, “কি?” ঋতুপর্ণা উত্তর দেয়, “ট্রুথ ওর ডেয়ার।”

দেবায়ন বলে, “খেলতে পারি তবে যা বলা হবে সেটা যেন কেউ না না করে আর যা জিজ্ঞেস করা হবে তার যেন সঠিক উত্তর পাওয়া যায়।” সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ করে ওঠে, বেশ মজা হবে। 

ধীমান বাকিদের মানে, প্রবাল, অঙ্কন শান্তনু মনীষা এদের বলে, “দেখ ভাই আমরা সবাই বন্ধু আর খুব খোলামেলা। এইখানে সঙ্কোচ করলে কিন্তু চলবে না।” মনীষা আর জারিনা একটু দোনামনা করার পরে সম্মতি জানায়। 

সঙ্গীতাকে প্রবাল এক প্রকার পেঁচিয়ে ধরে। অনেকক্ষণ পরে প্রবাল মুখ খোলে, “ঠিক কি করতে হবে এই খেলায়?” সঙ্গীতা ওকে খেলার নিয়ম কানুন বুঝিয়ে দেয়। প্রবাল স্মিত হেসে মেনে যায়। 

দেবায়ন মনীষাকে দেখে বলে, “তুমি টিম লিডারের বউ সুতরাং তোমার থেকেই শুরু করা যাক।” মনীষা মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলে দেবায়ন ওকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি বল, ট্রুথ ওর ডেয়ার?”

মনীষা উত্তর দেয়, “ট্রুথ।”

রূপক হাঁ হাঁ করে হেসে ওঠে, “ওকে ম্যাডাম, শুনেছিলাম তোমার ব্রেডে গতকাল জ্যাম লাগানো ছিল সেটা কি এখন লাগানো চলছে না হয়ে গেছে?”

মনীষা মুখ কাঁচুমাচু করে মিচকি হেসে বলে, “লাগানো শেষ হয়ে গেছে।”

দেবায়ন শান্তনুর কাঁধ চাপড়ে বলে, “ব্যাস তাহলে পাঁচদিনের কাজ আজ রাতে পূরণ করে নিও।”

ওর পাশে শান্তনু বসে, রূপক ওকে জিজ্ঞেস করে, “ট্রুথ ওর ডেয়ার?” 

শান্তনু বলে, “ডেয়ার।”

ধীমান ওকে বলে, “আচ্ছা বেশ, তোমার সুপারম্যান পছন্দ না অরন্যদেব পছন্দ? যাকে পছন্দ সেই মতন কাপড় পর।”

শান্তনু হেসে বলে, “আরে বাবা এটা কলেজে অনেকবার হয়ে গেছে অন্য কিছু দাও।”

মনীষা হাঁ হাঁ করে ওঠে, “কলেজে হয়েছে ত কি হয়েছে। তোমাকে করতে হবে এটাই নিয়ম।”

উত্তর থেকে ভেসে আসা কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ায় ওরা সবাই পাশের সঙ্গীর কোলে সেঁধিয়ে যায়। দেবায়ন একপ্রকার অনুপমাকে কোলের মধ্যে বসিয়ে নিয়েছে। হাতে মদের গেলাসের সাথে সাথে সঙ্গে আনা মাংসের কাবাব খেতে খেতে সবাই হেসে ফেলে মনীষার কথা শুনে। 

অগত্যা শান্তনু উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “অরন্যদেব করতে পারি।” সবাই হেসে বলে তাই কর। শান্তনু প্যান্ট খুলে, জ্যাকেট খুলে জামা আর জাঙ্গিয়া পরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। ঠাণ্ডায় ওর লিঙ্গের অবস্থা খারাপ, সেটা আর নিজের জায়গায় খুঁজে পাওয়া যায়না। 

সেই দেখে ধীমান হেসে মনীষাকে বলে, “ম্যাডাম, ওর যে বাঁড়া নেই আজ রাতে কি করে কাটাবে?” আবার হাসির কলতান ওঠে।

তার পাশে ধীমান আর ঋতুপর্ণা। এইবারে মনীষা ঋতুপর্ণাকে জিজ্ঞেস করে, “ট্রুথ ওর ডেয়ার।” ঋতুপর্ণা উত্তরে ট্রুথ বলে। শ্রেয়া সঙ্গে সঙ্গে ওকে জিজ্ঞেস করে, “প্রথম বার তোর পেছনে কে ঢুকিয়েছিল?” 

ঋতুপর্ণা লজ্জায় পরে ধীমানের দিকে তাকায়। ধীমান ভুরু কুঁচকে ওকে বলে, “আমার দিকে এইভাবে তাকিয়ে কি হবে ডারলিং, উত্তর দাও।”

ঋতুপর্ণা মাথা চুলকে মুখ কাঁচুমাচু করে উত্তর দেয়, “নারসিং পড়ার সময়ে একটা বয় ফ্রেন্ড ছিল, সঞ্জীব।”

সবাই হিহি করে হেসে ওঠে। ধীমান চোখ বড় বড় করে বলে, “ওই ছোট্ট বাঁড়া শেষ পর্যন্ত তোমার পেছনে ঢুকিয়েছিল?” ঋতুপর্ণা ওকে মারতে মারতে বলে, “উত্তর দিয়ে দিয়েছি ব্যাস আর নয়।” 

এরপরে ধীমানের পালা, ধীমান সঙ্গে সঙ্গে ডেয়ার করতে রাজি হয়ে যায়। খেলা এইভাবে চলতে থাকে একের পর এক। প্রবালকে বলা হয়, সঙ্গীতার যোনি রসের ভিস্কোসিটি কত। জারিনাকে বলা হয়, পরাশরের লিঙ্গের ভলিউম মেপে জানাও। পায়েল বুঝতে পারে অঙ্কনকে ওরা সবাই বেশ ফাঁদে ফেলবে। এইভাবে এক এক করে সবাইকে বেশ বেকায়দায় ফেলে খেলা ঘুরে চলে।

খেলা চলতে চলতে অন্ধকার চিরে একটা ছেলের আবির্ভাব হয়। ভুর দেখার মতন সবাই চমকে ওঠে। ছেলেটা মনে হয় ওদের পোর্টার দলের কেউ, জ্যাকেট পরা, মাথায় টুপি। 

দেবায়নকে এসে বলে, “বাবু কিছু টাকা চাই।”

দেবায়ন অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, “তুই কে?”

রঞ্জিত ওদের সঙ্গে ছিল না, অনেক আগেই খেয়ে দেয়ে নিজের তাঁবুতে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়েছে। পোর্টার দের কারুর নামধাম ওদের জানা নেই। তাও ছেলেটাকে দেখে ওদের দলের পোর্টার বলেই মনে হয় দেবায়নের। ছেলেতা উত্তরে বলে ওদের দলের রাজু পোর্টার। মদ খাওয়ার জন্য একটু টাকা চায়। 
দেবায়ন পকেট থেকে টাকা বের করে দিতে গেলে ছেলেতা বলে, “না বাবু, মানে আপনাকে একটু আমার সাথে আসতে হবে। মানে ওইদিকে আমাদের পোর্টার দলের সর্দার দাঁড়িয়ে আছে, ওর হাতে টাকা দিলে ভালো।”

দেবায়ন অনুপমাকে কোল থেকে নামিয়ে বলে, “এই শোন আমি ওদের টাকা দিয়ে আসছি, ব্যাস এই যাবো আর আসব।” 

অনুপমা ওর হাত ধরে বলে, “তাড়াতাড়ি আসিস, তুই না থাকলে একদম ভালো লাগে না।”

ওর কপালে চুমু খেয়ে দেবায়ন চলে যায়। ট্রুথ আর ডেয়ার খেলা আবার শুরু হয়ে যায়। খেলা চলতে থাকে কিন্তু অনুপমার মন পরে থাকে দেবায়নের জন্য। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে এখন আসার আর নাম নেই। কোথায় গেল ছেলেটা, বলে গেল এখুনি আসছি। বাকিরা এখন খেলায় মত্ত, কিন্তু অনুপমা বারেবারে দেবায়নের যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে দেখে। নদীর কুলুকুলু ধ্বনি, পাহাড় থেকে ভেসে আসা কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া ওর মনের গভীরের উৎকণ্ঠা আরো চাগিয়ে দেয়। বারেবারে বাম হাতের অনামিকার জ্বলজ্বলে আংটির দিকে তাকায় আর পেছন ঘুরে যেদিকে দেবায়ন গেছে সেদিকে চেয়ে থাকে। সামনে আগুন জ্বলছে, সবাই বেশ মজা গল্প করছে কিন্তু অনুপমার মন আর কিছুতেই মানে না। পোর্টারদের টাকা দিতে এত দেরি লাগে নাকি? 

শ্রেয়া ওর পাশে এসে জিজ্ঞেস করে, “কি রে মন খারাপ লাগছে নাকি?”

অনুপমা ম্লান হেসে মাথা দুলিয়ে বলে, “হ্যাঁ রে এতক্ষণ হয়ে গেল এখন আসছে না।” আরো কিছুক্ষণ কেটে যায়। দেবায়ন গেছে প্রায় এক ঘন্টা হতে চলল, এত দেরি করা উচিত নয়। শুধু মাত্র টাকা দেবে আর চলে আসবে। শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরে রূপক আর ধীমানকে বলে, “এই প্লিস তোরা একটু দেখে আয় না দেবু কোথায় গেছে।”

রূপক হেসে ওর কথা উড়িয়ে দিয়ে বলে, “আরে বাবা এই নির্জন স্থানে আর কি হবে। শালা ওই পোর্টার দের সাথে হয়ত দেশী গিলতে বসে গেছে চলে আসবে।”

অনুপমা কাতর কণ্ঠে ওকে অনুরোধ করে, “প্লিস, একবার, এক ঘন্টা হয়ে গেল।”

ধীমান কিছু একটা বলতে যায়, ঋতুপর্ণা ঝাঁঝিয়ে ওঠে, “তোমাদের একবার যেতে কি হয়েছে? গিয়ে দেখো না দেবায়ন কোথায় গেল।”

পরাশর প্রবাল উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “আচ্ছা আচ্ছা আমরা যাচ্ছি।”

পরাশর চলে গেল, ধীমান রূপক চলে গেল। ওদের খেলা ভেঙ্গে গেল। অনুপমা প্রবল উৎকণ্ঠায় উঠে দাঁড়িয়ে যেদিকে ওরা গেছে সেদিকে একভাবে তাকিয়ে থাকে। একপাশে পায়েল অন্য পাশে শ্রেয়া ওকে প্রবোধ দেয়, এই ত চলে আসবে এত চিন্তা করছিস কেন? কিন্তু অনুপমার মন আর মানে না। বারেবারে আঙ্গুলের আংটি ঘষে দেখে আর বুকের মধ্যে চেপে ধরে। হটাত করে এক দমক ঠাণ্ডা হাওয়া ওকে এসে কাঁপিয়ে দেয়।

অঙ্কন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে দিদির সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “দিদিভাই দিদিভাই, দেবায়নদাকে পাওয়া যাচ্ছে না।”

শ্রেয়ার ভাবে অঙ্কন মজা করছে তাই জিজ্ঞেস করে, “কি উল্টোপাল্টা বলছিস তুই। কেন বেচারির সাথে এই সময়ে মজা করছিস?”

অনুপমা ওই কথা শুনে কেঁপে ওঠে, হটাত করে ওর বুক ফাঁকা হয়ে যায়। অঙ্কন হাঁপাতে হাঁপাতে ওদের বলে, “দিদিভাই ওদিকে চল...” বলে দুর নদীর দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়।

আপনা হতেই অনুপমার হাত মুঠি হয়ে যায়, ওর চোখ জোড়া ভরে ওঠে, গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। পুচ্চুকে পাওয়া যাচ্ছে না মানে? কি বলতে চাইছে ভাই? না, মদ খেয়ে কিছু হয়ে গেল না’ত? যদি অঙ্কন মজার ছলে বলে থাকে তাহলে ওকে মেরে ফেলবে। 

ধীমান এমন সময়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ওদের কাছে আসতেই অনুপমা কাঁপতে কাঁপতে ওকে জিজ্ঞেস করে, “দেবুকে পেলি?”

ধীমান মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়, “না রে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।”

শ্রেয়া ওকে জিজ্ঞেস করে, “রূপক আর শান্তনু কোথায়?”

ধীমান ওদের উত্তর দেয়, খাদের কিনারায়, নদীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে, ওরা। খাদের কথা শুনে অনুপমার মাথা ঘুরে যায়, শরীর টলতে শুরু করে দেয়। না, এটা হতে পারে না। মাথার ওপরে আকাশ বনবন করে পাক খেতে শুরু করে, ধীমানের চেহারা, শ্রেয়া পায়েলের চেহারা ধীরে ধীরে কেমন আবছা হয়ে যায় অনুপমার চোখের সামনে। টলতে টলতে পরে যাওয়ার আগেই ধীমান ওকে ধরে ফেলে। 




 পর্ব সাতাস সমাপ্ত। 


Reply
পর্ব ২৮ (প্রতিশোধ না পরিণতি) 



ট্রুথ এন্ড ডেয়ার ঘুরতে ঘুরতে, অনুপমার কাছে চলে আসে। রূপক ওকে জিজ্ঞেস করাতে অনুপমা একবার দেবায়নের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, “ট্রুথ।” 

সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীতা ওকে প্রশ্ন করে, “দেবায়ন অনেকের সাথে শুয়েছে, এইবারে বুকে হাত দিয়ে বল এই সব জানার পরে তোর কোনোদিন হিংসে হয়নি?”

অনুপমা বড় বেকায়দায় পরে যায়, দেবায়নের হাত বুকের কাছে টেনে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে একভাবে। সত্যি বলতে একবার খুব খারাপ লেগেছিল যখন জানতে পারে দেবায়ন ওর মায়ের সাথে সহবাস করেছে। ওর চোখের ভাষা দেবায়ন পড়ে ফেলে কানেকানে বলে, আসল সত্য বাঁচিয়ে অতি কৌশলে যেন উত্তর দেয়। 

অনুপমা মিচকি হেসে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ একবার হয়েছিল তবে আমি প্রান দিয়ে জানতাম যে পুচ্চু শত জনের সাথে শুয়ে আসার পরেও ওর বুকের মধ্যে শুধু মাত্র আমার জায়গা থাকবে, তাই পরে আর হিংসে হয়নি।”

রূপক, ধীমান একসাথে ওকে প্রশ্ন করে, কে কে। অনুপমা সুকৌশলে সেই প্রশ্ন এড়িয়ে বলে, “একবার প্রশ্নের উত্তর দেব ব্যাস হয়ে গেছে উত্তর এইবারে পুচ্চুর টার্ন।”

এমন সময়ে একটা অন্ধকার ফুঁড়ে একটা ছেলের আবির্ভাব হয়। ছেলেটাকে দেখে মনে হল ওদের মাল বাহকের মধ্যে কেউ। ছেলেটা দেবায়নের কাছে এসে অনুরোধ করে, “বাবু কিছু টাকা চাই।”

দেবায়ন একবার আপাদমস্তক ছেলেটাকে দেখে জিজ্ঞেস করে, “তুই কে?”

ছেলেটা অবাক হয়ে উত্তর দেয়, “বাবু আমি রাজু পোর্টার। আপনাদের খাবারের ব্যাটারি নিয়ে একদম আগে ছিলাম।”

দেবায়ন মাথা দোলায়, “আচ্ছা, কিসের জন্য টাকা চাই?”

ছেলেটা মুখ কাঁচুমাচু করে উত্তর দেয়, “বাবু আমরা একটু মদ খাবো তাই টাকা চাই।”

এতক্ষণ অনুপমাকে কোলে জড়িয়ে ধরে আগুনের সামনে বসে ছিল দেবায়ন, তাও পকেট থেকে পার্স বের করে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে, “কত টাকা চাই তোদের?”

ছেলেটা একটু হেসে আমতা আমতা করে বলে, “না মানে, ওইপাশে আমাদের দলের লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে। ওইখানে গিয়ে দিলে বড় ভালো হয়।”

“আচ্ছা” দেবায়ন মুখ কাঁচুমাচু করে অনুপমাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। অনুপমা কিছুতেই ওকে ছাড়তে চায় না, উল্টে ছেলেটাকে বলে, “তোমরা টাকা নিয়ে চলে যাও আবার ওকে ওইখানে কেন যেতে হবে।”

ছেলেটা আমতা আমতা করে বলে, “না মানে একটু কথা ছিল তাই।”

দেবায়ন মাথা নাড়িয়ে অনুপমাকে বলে, “আচ্ছা বাবা, দেখি না ওরা কি বলতে চাইছে।” বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলে, “তোরা চালিয়ে যা, আমি একটু আসছি।”

ছেলেটার সাথে দেবায়ন গ্রামের অন্যপাশে, ঘন জঙ্গলের দিকে হাঁটা লাগায়। যেতে যেতে এপাশ ওপাশ দেখতে দেখতে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে ওর বাড়ি কোথায়, কবে থেকে এই পোর্টারের কাজ করছে ইত্যাদি। ছেলেটা উত্তর দেয়, কিছু ওর কানে ভেসে আসে কিছু শুনতে পায়না। দেবায়ন একটু তাড়াতাড়ি হাঁটছিল আর ছেলেটা ওর পেছনে পেছনে হাঁটছিল। 

কথাবার্তা থামিয়ে দেবায়ন হাঁটতে হাঁটতে রাতের সৌন্দর্যে হারিয়ে যায়। একটা সিগারেট ধরিয়ে, চারপাশে তাকিয়ে দেখে। মাথার ওপরে ঘন কালচে নীল আকাশে কোটি কোটি তারার ঝিকিমিকি, আকাশ গঙ্গা পরিস্কার এই আকাশে দেখা যায়, যেটা শহরের আকাশে এক দুর্লভ দৃশ্য। উত্তরের সুউচ্চ হিমালয় থেকে ভেসে আসা কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া ওর শরীর কাঁপিয়ে দেয়। হাঁটতে হাঁটতে ওরা দুইজনে একটা খাদের কিনারায় চলে আসে। একপাশ থেকে ছোট ছোট ঝর্না বয়ে গভীর খাদের নীচে বয়ে চলা পাহাড়ি নদীর সাথে মিশে গেছে। সরু রাস্তার অন্যপাশে ঘন বন, রোহডেন্ড্রন, পাইন কেদার ইত্যাদি উঁচু উঁচু পাহাড়ি গাছপালায় ঘেরা, একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কানে ভেসে আসে। 

হাঁটতে হাঁটতে খাদের কিনারায় এসে দেখে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। পেছন ঘুরে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করতে যাবে, কি রে... কিন্তু পেছনে কেউ নেই। হটাত ওর বুক ছ্যাঁত করে ওঠে। আসলে কে এই ছেলেটা, কি কুমতলবে ওকে এই নির্জনে ডেকে এনেছে? দূরে গ্রামের ছোট ছোট ঘর বাড়ি গুলোর আলো অনেক আগেই নিভে গেছে। আরো দূরে ওদের বন ফায়ারের আলো দেখা যাচ্ছে। আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে অনেকদুরে চলে এসেছে সেটা বুঝতে বাকি থাকে না। 

হটাত ওর পেছনে জঙ্গলের মধ্যে থেকে খসখসে পাতার ওপরে কারুর পা ফেলার আওয়াজে চমকে ওঠে। ঘুরে গাছের দিকে তাকানোর আগেই ওর মাথার পেছনে কেউ একজন একটা লাঠি দিয়ে সজোরে বাড়ি মারে। এমনিতে চারপাশ অন্ধকার, তারপরে এই ঠাণ্ডায় আচমকা মাথার পেছনে লাঠির বাড়ি খেয়ে চোখে অন্ধকার দেখে দেবায়ন। 

মাথা ধরে পেছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে এক পুরুষের মূর্তি, হাতে একটা লোহার রড। মাথার পেছনে হাত দিয়ে গরম রক্ত অনুভব করতে পারে। হাত মুঠি করে দাঁতে দাঁত পিষে আগন্তকের দিকে এগিয়ে যায়, ঠিক তখনি ওই আগন্তুক দ্বিতীয় বার ওর মাথার ওপরে রড দিয়ে বাড়ি মারে। চোখে সর্ষে ফুল দেখে দেবায়ন। 

ওই অন্ধকারে ঢাকা আগন্তুকের দিকে চেঁচিয়ে ওঠে, “মাদারচোদ, তুই কে?”

পরিস্কার ইংরেজিতে গম্ভির চাপা কণ্ঠে গর্জে ওঠে অন্ধকারে ঢাকা সেই আগন্তুক, “তোকে মারার জন্য অনেকদিন থেকেই ফন্দি করছিলাম। শেষ পর্যন্ত এইখানে তোকে একা পেয়ে গেলাম।”

দেবায়ন মাথায় হাত দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে এটা কার কণ্ঠস্বর। বেশ চাপা গভীর কণ্ঠস্বর, শুনেই মনে হচ্ছে আসল আওয়াজ ঢাকার জন্য গলার স্বর ভারী করে কথা বলছে সেই আগন্তুক। ইংরেজিতে কথা বলছে, নিশ্চয় বুঝতে দিতে চায় না কোথাকার মানুষ, বাঙ্গালী হতে পারে অবাঙ্গালী হতে পারে। মুখের ওপরে মাফলার বাঁধা, অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছে না কিছুতেই, গায়ে লম্বা অভারকোট, কত বয়স সেটাও জানা সম্ভব হচ্ছে না। কপাল বেয়ে সরু রক্তের রেখা দেখা দেয়। টাল সামলাতে না পেরে দেবায়ন সামনের আগন্তুকের দিকে ঢলে পরে। 

সঙ্গে সঙ্গে ওই আততায়ী ওর কলার ধরে গলা টিপে ধরে চাপা ভারী কণ্ঠে বলে ওঠে, “সবাই ভাববে তুই পা ফসকে এই নদীতে পরে গেছিস। কেউ জানবে না তোর আততায়ী কে।” বলেই এক ধাক্কা মেরে খাদের মধ্যে ফেলে দেয়। 

হটাত করে শুন্যে ভাসমান মনে হয় নিজেকে। চোখের সামনে শুধু মাত্র অনন্ত অন্ধকার, তাও হাতড়ে হাতড়ে কিছু বুনো ঝোপ ঝাড় আঁকড়ে ধরে প্রানে বাঁচতে চেষ্টা করে দেবায়ন। ওপরে দিকে তাকিয়ে দেখে ওই আততায়ী খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে ঠিক ওর ওপরে। এক হাত বাড়িয়ে আততায়ীর পা ধরে নিচের দিকে টানতে চেষ্টা করে কিন্তু ওই আততায়ী লোহার রড দিয়ে ওর হাতে বাড়ি মারে এবং সেই সাথে হাতের ওপরে পা দিয়ে পিষে দেয়। 

ব্যাথায় আর্তনাদ করে ওঠে দেবায়ন সেই সাথে গর্জে ওঠে, “তোকে হাতে পেলে দেখে নেব।”

অট্টহাসিতে ফেটে পরে আততায়ী, “বাঁচলে তবে’ত দেখবি। আমার সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়েছিস, মৃত্যুই তোর আসল পরিণতি। এটাই আমার প্রতিশোধ।” বলেই ওর মাথায় রডের বাড়ি মারতে যায়, দেবায়ন মাথা সরিয়ে নিতেই রডের বাড়ি সোজা ওর কাঁধে এসে লাগে আর ওর কাঁধের একটা হাড় নড়ে যায়। ধরে থাকা ঝোপের ওপর থেকে ওর হাতের থাবা হাল্কা হয়ে যায়। লম্বা চওড়া দেহের ভার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নিচের দিকে টানতে শুরু করে দেয়। শেষ পর্যন্ত আর ধরে রাখতে না পেরে ওর হাত আপনা হতেই সেই মাটি ছেড়ে দেয়। শুন্যে ভাসমান হয়ে দেবায়নের দেহ নিচের দিকে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে দেয়। 

নীচে নদীর জলে পড়ার আগে একবার ওর বুক ডাক ছাড়ে, “পুচ্চি ইইইইইইইইই......” হয়ত এই আওয়াজ কোনোদিন ওর পুচ্চির কানে যাবে না, হয়ত এই রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে চলে যেতেও পারে। 

ঝপাং, করে দেবায়নের অর্ধ অচৈতন্য দেহ কনকনে বরফ গলা জলের মধ্যে গড়িয়ে পরে। ওর জ্যাকেট ভিজে যায়, ওর জামা ওর জিন্স ভিজে যায়। পিঠের পেছনে একটা পাথর এসে ধাক্কা খায়, মনে হল শির দাঁড়ার কয়েকটা হাড় নড়ে উঠল। প্রবল স্রোতস্বিনী পাহাড়ি নদী ওর দেহ ভাসিয়ে নিয়ে চলে এক অজানা পথের দিকে। জানে না কোথায় যাচ্ছে জানে না ওর পুচ্চি কোনোদিন ওর সন্ধান পাবে কি না। 

ধীরে ধীরে দেবায়নের চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। চারপাশে শুধু ঘন কালো অন্ধকার আর মৃত্যুর হাতছানি ছাড়া আর কিছু নেই। কানে ভেসে আসে নদীর গর্জন তা ছাড়া আর কোন আওয়াজ দেবায়নের অচৈতন্য কর্ণ কুহরে প্রবেশ করে না। এই জীবনে অনেক পাপ করেছে, নিজের প্রেমিকা অনুপমার মায়ের সাথে যৌন সহবাসে লিপ্ত হয়েছে। এক সময়ে নিজের গর্ভ ধারিনি মাকেও সেই চরম কামের বশে জড়িয়ে ধরেছিল। বড় পাপ, এযে বড় পাপ। কামের বশে অনেকের সাথে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছে। ব্যাবসার ক্ষেত্রে অনন্যার দেহ এমন অনেক মডেলের দেহ ব্যাবহার করেছে। পুনের হোটেলের মালিক রজত পানিক্করের থেকে ওর হোটেল ছিনিয়ে নিয়েছে, এমন ভাবে বহু জায়গায় ব্যাবসার মারপ্যাচে কাজ হাসিল করেছে। যেখানে টাকা দিয়ে কাজ হয়েছে সেখানে টাকা দিয়েছে, যেখানে মেয়েদের শরীর দিয়ে কাজ হয়েছে সেখানে অনন্যা, তনুজার মতন মেয়েদের ব্যাবহার করেছে, যেখানে ওকে হুমকি দিতে হয়েছে সেখানে রিতিমতন হুমকি দিয়ে কাজ হাসিল করেছে। অনেকের অনেক গোপন খবর জেনে ফেলেছে এর মধ্যে, তাহলে কি তাদের মধ্যে কেউ ওকে খুন করল? কে হতে পারে এই আততায়ী? সোমেশ কাকু? ধৃতিমান, সূর্য, সত্যজিত অনিমেশ না ভাড়া করা কেউ? কে ভাড়া করতে পারে একে? উত্তর জানা নেই দেবায়নের কারন ওই আততায়ী ওকে মারার আগে উত্তর দিয়ে যায়নি। ওই আততায়ীর পরিচয় পাওয়া আর সম্ভব নয় কারন ওর দেহ এই প্রবল নদীর ধারায় এক অজানা পথে পাড়ি জমিয়ে দিয়েছে। ওই আততায়ী আসলে কে? কি কারনে ওর এই ভীষণ পরিণতি ঘটল? কে নিল প্রতিশোধ, না ওর দুষ্কর্মের পাপের পরিণতি?

কনকনে ঠাণ্ডা জলে ভাসতে ভাসতে দেবায়নের শরীর নিস্বার হয়ে যায়। একটুক্ষণ না অনেকক্ষণ, সময়ের ঠিক পায় না। একসময়ে দেবায়ন চোখ মেলে অবাক হয়ে যায়। চারপাশের অন্ধকার কেটে ওর চারপাশে জোরালো সাদা আলো আর মৃদু কুয়াশায় ঢাকা। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে, হাল্কা মলায়ম মেঘের ভেলার ওপরে দেবায়ন বসে। চারপাশে তুলোর মতন হাল্কা মলায়ম মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেদিকে তাকায় সেদিকে শুধু মাত্র জোরালো সাদা আলোয় ভর্তি। নির্মল শীতল মলয় বইছে চারপাশে, আলোয় কোন ঠাণ্ডা ভাব অথবা গরম ভাব নেই, মনে হল যেন চির বসন্তের এক স্থানে পৌঁছে গেছে। হাতের দিকে তাকাতেই চমকে ওঠে, ছোট ছোট দুটো হাত, আঙ্গুল গুলো ছোট ছোট। পঁচিশ বছরের একটা ছেলের এত ছোট আঙ্গুল কি করে হতে পারে? মুখে গালে হাত দিয়ে দেখে, না এই চেহারা ওর নয়। এই গাল বেশ ফুলো ফুলো, বুকের দিকে, নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে বুঝতে পারে দেবায়ন আর পঁচিশ বছরের যুবক নয়, ছোট এক শিশু দেবায়ন শুধু মাত্র একটা লাল প্যান্ট আর একটা সাদা গেঞ্জি পরে মেঘের ভেলায় বসে। 

এমন সময়ে সামনের কুয়াশা কাটিয়ে এক সুঠাম পুরুষের আবির্ভাব হয়। সেই সুপুরুষ ব্যাক্তি কে দেখেই দেবায়ন চিনতে পারে, ওর বাবা, সায়ন্তন বসাক দাঁড়িয়ে। ওর বাবা ওর দিকে দুই হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসে সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পরে। মিষ্টি হেসে দেবায়ন ছোট ছোট পায়ে বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। 

ঠিক তখনি বহু দুর থেকে এক মিষ্টি নারী কণ্ঠের আর্তনাদ ওর কানে ভেসে আসে, “পুচ্চুউউউউউউ...... তুই কোথায়?”

শিশু দেবায়ন এদিক ওদিকে তাকিয়ে দেখে। ওই নারী কণ্ঠ কাকে ডাক দেয়? এই পুচ্চুকে? পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে ওর মা দুই হাত বাড়িয়ে ছল ছল চোখে ওর দিকে কাতর ভাবে তাকিয়ে হাত নাড়ছে। দুই বড় বড় কাজল কালো চোখে আশ্রুর বন্যা বইয়ে ওর মা ওকে ডাক দেয়, “আয় বাবা আমার কোলে ফিরে আয় সোনা। তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই রে...”

সামনে ওর বাবা ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। দেবায়ন একবার মায়ের দিকে তাকায় একবার বাবার দিকে তাকায়। কার কাছে যাবে কিছুতেই ঠিক করে উঠতে পারে না। শেষ পর্যন্ত বাবার দিকে তাকিয়ে আধো আধো কণ্ঠে বলে, “তুমি চকোলেট এনেছ?”

ওর বাবা হাতের মুঠি মেলে একটা চকোলেট দেখিয়ে মাথা দুলিয়ে ওকে ডাক দেয়। ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকায় দেবায়ন। মায়ের ঠিক পেছনে এক অতীব সুন্দরী বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে। মাকে চিনতে অসুবিধে হয় না কিন্তু পেছনে দাঁড়ানো, রুপোলী সুতোর বোনা জালের পোশাক পরিহিত সেই সুন্দরী কন্যের পরিচয় জানে না দেবায়ন। ওই সুন্দরী মেয়েটার টানাটানা চোখ জোড়া ছলছল করে ওঠে ওকে দেখে। 

ওর মা আবার ওকে ডাক দেয়, “বাবারে আমাকে ছেড়ে যাস না। তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই রে বাবা।”

পেছনে দাঁড়ানো মেয়েটার ঠোঁট জোড়া ফুলে ওঠে, গোলাপি গাল বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝড়ে পরে। দেবায়ন একবার বাবার হাতের দিকে দেখে, একটা ছোট চকোলেট হাতে ওর বাবা স্মিত হেসে ওর জন্য অপেক্ষা করছে।

দেবায়ন মিষ্টি হেসে মাকে বলে, “মা মা, বাবা আমার জন্য চকোলেট এনেছে। এই বারে আমি বাবার সাথে যাই।”

ওর মা আর্তনাদ করে ওঠে, “না বাবা দয়া করে আমাকে একা ফেলে যাস নে...”

দেবায়ন ধীরে ধীরে বাবার দিকে হাঁটতে শুরু করে দেয়। আবার কানে ভেসে আসে বহুদুর থেকে ভেসে আসা এক নারী কণ্ঠের আর্তনাদ, “পুচ্চুউউউউউউ তুই কোথায়?”

দেবায়ন জানে না কে এই পুচ্চু। দেবায়ন জানে না হটাত করে এত ছোট কি করে হয়ে গেল। দেবায়ন জানে না, কি করে বাবার দেখা পেল। দেবায়ন জানে না কি করে এই সাদা মেঘের রাজ্যে এসে পৌঁছে গেল। অনেক প্রশ্নের উত্তর দেবায়নের অজানা রয়ে যায় তাও বাবার দিকে এগিয়ে যায়। 


Reply
পর্ব ২৯ (#1)



মুখের ওপরে জলের ছিটা পরতেই অনুপমার জ্ঞান ফেরে। চোখ খুলে শ্রেয়াকে দেখেই ডুকরে কেঁদে ওঠে অনুপমা, “পুচ্চুকে পেলি?” 

শ্রেয়া ওর কপালে হাত বুলিয়ে মৃদু মাথা নাড়িয়ে বলে, “না রে এখন পাওয়া যায়নি। তবে তুই চিন্তা করিস না...”

চারপাশে সবাই ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে, সবার চোখে মুখে চাপা উৎকণ্ঠার ছাপ। সবাই এইখানে আনন্দ ফুর্তি করতে এসেছিল, আকস্মাত এই দুর্ঘটনায় সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। রূপক, শান্তনু রঞ্জিত খাদের চারপাশে খুঁজে খুঁজে কোন চিহ্ন না পেয়ে হয়রান হয়ে ফিরে এসেছে। অনুপমা চুপচাপ বসে ভাঙ্গা বুক আর অসীম বেদনা নিয়ে সবার দিকে ছলছল চোখে তাকায়। এক ধাক্কায় ওর সাধের পৃথিবী উজাড় হয়ে গেছে। ওর মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। দেবায়ন ছাড়া কোলকাতা ফিরে যাওয়া ওর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। দেবায়ন ছাড়া নিজেকে ভাবতে পারছে না কিছুতেই। ওর অঙ্গে, ওর হৃদয়ের সর্বত্রে ওর ভালোবাসার ছাপ অঙ্কিত। অনামিকার আংটি ওকে বারবার মনে করিয়ে দেয় এই ডিসেম্বরে ওদের বিয়ের কথা চলছিল। স্বপ্ন দেখেছিল এই পাহাড়ের কোলে ঘর বাঁধবে। শ্রেয়ার বাহুপাশ থেকে থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে কুঁকড়ে বসে যায়। ওকে ছাড়া ওর জীবনে রঙ উবে গেছে। 

অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পরে গাইড রঞ্জিতকে অনুপমা জিজ্ঞেস করে, “তোমার দলের একটা পোর্টার এসেছিল ওকে ডাকতে, সে নিশ্চয় জানে দেবায়ন কোথায়। তাকে ডাক।”

রূপক উত্তরে বলে, “না রে ওই ছেলেটা ভুয়ো। রাজু নামে আমাদের দলে কোন পোর্টার নেই। আমার মনে হয়...”

অনুপমা বিস্ফোরিত চোখে রূপকের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে, “ওই নামে পোর্টার নেই মানে? তাহলে পুচ্চুকে...” দৃষ্টি আবার ঝাপসা হয়ে আসে অনুপমার, কিছু আর ভাবতে পারছে। কম্পিত কণ্ঠে রূপককে জিজ্ঞেস করে, “তুই কোথায় কোথায় পুচ্চকে খুঁজেছিস?”

রূপক, শান্তনু সবাই জানায় ওরা চারদিকে দেবায়নকে খুঁজেছে কিন্তু কোথাও ওর চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অনুপমা নিজেই ওকে খুঁজতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকট করে। সবার মানা করা সত্ত্বেও অনুপমা একাই যেদিকে দেবায়ন গিয়েছিল সেদিকে হাঁটা দেয়। ওকে ওইভাবে উন্মাদিনীর মতন হাঁটতে দেখে পায়েল আর শ্রেয়া দৌড়ে এসে ওকে ধরে ফেলে। কিন্তু অনুপমা ওদের হাত ছাড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে খাদের কিনারায় চলে আসে। চারপাশ অন্ধকারে ঢাকা, শুধু মাত্র ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ আর গভীর খাদের নীচে বয়ে চলা পাহাড়ি নদীর গর্জন ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যায় না।

গলা ছেড়ে ডাক দেয় অনুপমা, “পুচ্চুউউউউউউ...... তুই কোথায়?”

ওর হৃদয় ভাঙ্গা বেদনা যুক্ত কণ্ঠস্বর সামনের পাহাড়ে আর জঙ্গলে প্রতিধ্বনি হয়ে ওর কানে ফিরে আসে। অনুপমা বারেবারে ডাক দেয় কিন্তু পাথরের পাহাড় থেকে কোন উত্তর আসে না। বাকিরা সবাই টর্চ নিয়ে খাদের নিচের দিকে খোঁজে কিন্তু কোথাও দেবায়নের চিহ্ন পাওয়া যায় না। এপাশ ওপাশ খুঁজতে খুঁজতে অঙ্কন কিছু একটা দেখতে পেয়ে বাকিদের ডাক দেয়। অনুপমা দৌড়ে যেতেই অঙ্কন ওর হাতে দেবায়নের পার্স ধরিয়ে দেয়। পার্স দেখেই অনুপমার চোখ ছলছল করে ওঠে, বুকের মধ্যে পার্স লুকিয়ে দেবায়নের নাম ধরে বারেবারে ডাক দেয়। কিন্তু ওর শূন্য ডাকের সারা আর পাওয়া যায়না। টর্চের আলোয় খাদের পাশে রক্তের দাগ দেখে অনুপমার বুক আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। শেষ পর্যন্ত পুচ্চু কি সত্যি সত্যি ওকে ছেড়ে চলে গেছে?

দেবায়নের বিরহে সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে যায় অনুপমা। বাম হাত বুকের কাছে চেপে পুনরায় গলা ফাটিয়ে ডাক দেয় অনুপমা, “পুচ্চুউউউউ প্লিস সোনা তুই এইভাবে আমাকে ছেড়ে যেতে পারিস না।”

টর্চের আলোয় চারপাশে খুঁজে দেবায়নের পার্স ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়না। খাদের কিনারা থেকে বেশ কিছু মাটি পাথর ধসে গেছে। ওই দেখে বাকিদের ধারনা হয় যে দেবায়ন এই খাদের মধ্যে হারিয়ে গেছে। কিন্তু অনুপমার হৃদয় কিছুতেই মানতে নারাজ যে দেবায়ন আর ওদের মাঝে নেই। অনুপমা খাদের কিনারায় চুপচাপ কুঁকড়ে বসে পরে, দেবায়নের পার্স বুকের কাছে চেপে ধরে উচ্চস্বরে বারেবারে ডাক দেয়। শ্রেয়া, পায়েল ওকে ধরে থাকে পাশে বেদনায় অনুপমা খাদের মধ্যে ঝাঁপ দেয় এই আশঙ্কায়। বাকিরা সবাই টর্চ নিয়ে এপাশ ওপাশ খুঁজে ক্লান্ত এক সময়ে তেন্টের দিকে হাঁটা দেয় কিন্তু অনুপমা ওই জায়গা থেকে কিছুতেই নড়তে চায় না। অনুপমা জেদ ধরে বসে থাকে, দড়ি নিয়ে আসো, এই রাতেই দড়ি বেয়ে ওই খাদের মধ্যে নামতে চায়। নদীর তীরে নিশ্চয় কোথাও দেবায়নকে খুঁজে পাওয়া যাবে। এই কনকনে ঠাণ্ডা জলে দেবায়ন বেশিক্ষণ থাকলে ওর হাইপোথারমিয়া হয়ে যাবে, ওর মৃত্যুর আশঙ্কা আরো বেড়ে যাবে। 

অনুপমাকে কিছুতেই শান্ত করা সম্ভব হয় না দেখে শেষ পর্যন্ত শ্রেয়া ওকে খুব বকুনি দিয়ে বলে, “এই রাতে এই খাদের মধ্যে নামবি, তুই পাগল হয়েছিস নাকি?” 


সারা রাত অনুপমা ওই খাদের কিনারায় কনকনে ঠাণ্ডায় বসে থাকে। নিরুপায় হয়ে শ্রেয়া আর পায়েল একটা স্লিপিং ব্যাগ ওর শরীরে জড়িয়ে দেয়। জানে ওই খাদে না নামা পর্যন্ত অনুপমাকে এইখান থেকে নড়ানো সম্ভবপর নয়। অগত্যা বাকিরাও সবাই পালা করে অনুপমাকে পাহারা দেয়। 
সারা রাত বসে ভাবে অনুপমা, কে ওর দেবায়ন কে এই নির্জন স্থানে এসে মারতে চেষ্টা করতে পারে। ওর সন্দেহের তালিকার মধ্যে অনেকের নাম আসে, কিন্তু কারুর দিকে সন্দেহের তীর হানার আগে তথ্য প্রমান সংগ্রহ করতে হবে। ওকে এই ভাবে কাঁদলে চলবে না। এই খবর মামনির কানে পৌঁছালে মামনি খুব ভেঙ্গে পরবে, মামনিকে সামলাতে হবে। 

সকালের সূর্য পুব দিক থেকে উঁকি মারতেই অনুপমা রঞ্জিতকে অনুরোধ করে দেবায়নকে খোঁজার জন্য। নিজেই খাদের কিনারা ভালো ভাবে তল্লাসি চালিয়ে বেশ কিছু তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। দেবায়নের পায়ে স্নিকার পরা ছিল, সেই পায়ের ছাপের সাথে সাথে আরো এক জোড়া জুতোর ছাপ পাওয়া যায়। জুতোর ছাপে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে দেবায়ন আর আততায়ীর মাঝে বেশ ধস্তাধস্তি হয়েছিল। আশেপাশে ঝোপ ঝাড়ে রক্তের দাগ দেখতে পেয়েই অনুপমার বুক কেঁপে ওঠে। খাদের বেশ নীচে বেশ কিছু ঝোপ ঝাড় উপড়ে গেছে, মাটি ধসে নিচের দিকে নেমে গেছে। একদিকের একটা ঝোপের মধ্যে একটা সিগারেট প্যাকেট আর একটা আধা খাওয়া সিগারেট পাওয়া যায়। সিগারেট প্যাকেট দেখে অনুপমা জানায় এই ব্রান্ডের সিগারেট দেবায়ন খায়। আততায়ীর পায়ের ছাপ জঙ্গলের দিকে মিলিয়ে গেছে। রূপক ধীমান প্রবাল সবাই জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পরে সেই আততায়ীকে খোঁজার জন্য কিন্তু পায়ের ছাপ কিছু দুর গিয়ে পাতা ভর্তি মাটির ওপরে হারিয়ে যাওয়াতে আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় না। সবাই ভীষণ উদ্বেগ নিয়ে ফিরে আসে জঙ্গল থেকে। 

রঞ্জিত গ্রাম থেকে আরো ছেলে জোগাড় করে দড়ি দিয়ে খাদের মধ্যে নদীর কিনারায় নামিয়ে তল্লাসি চালায়। শান্তনু জানায় এটা খুনের মামলা সুতরাং একবার পুলিসকে খবর দেওয়া উচিত। রীহ থেকে সব থেকে কাছের পুলিস স্টেসান, ঘনসিয়ালি পৌঁছাতে একদিন লেগে যাবে। শান্তনু আর পরাশর, একজন পোর্টার নিয়ে ঘুট্টু হয়ে ঘনসিয়ালি চলে যায় পুলিসকে খবর দিতে। 

সন্ধ্যের পরে অনুপমার বাবা, মিস্টার সোমেশ সেন রীহতে এসে হাজির হন। সেই সাথে শান্তনু আর পরাশর পুলিস নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। বাবাকে দেখে খুব অবাক হয়ে যায় অনুপমা। বাবাকে কে খবর দিয়েছে, বাবা কি করে এত তাড়াতাড়ি এইখানে এসে পউছাল। 

অনুপমা অবাক হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করে, “তোমাকে এই ঘটনার খবর কে দিল?”

শান্তনু জানায়, “আমি তোমার বাড়িতে ফোন করেছিলাম। কাকিমা জানালেন যে সেন কাকু দেরাদুনে কাজের জন্য এসেছিলেন।” অনুপমার মনে ভয় ঢোকে, যদি এই দুর্ঘটনার খবর মামনির কানে পৌঁছায় তাহলে কি হবে। চরম উৎকণ্ঠায় শান্তনুর দিকে ছলছল চোখে তাকাতে শান্তনু জানায়, “চিন্তা নেই দেবায়নের মাকে এই বিষয়ে কিছুই এখন জানানো হয়নি।”

অনুপমা হিমশীতল চাহনি নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “তোমার দেরাদুনে আসার কথা ছিল না। হটাত এমন কি কাজ পড়ল যে তুমি দেরাদুনে এসেছ?”

মেয়ের হিমশীতল কণ্ঠস্বর শুনে সোমেশবাবু অবাক হয়ে গম্ভির কণ্ঠে বলেন, “কি বলতে চাস তুই?”

অনুপমা একভাবে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দেয়, “না কিছু না, এখন কিছুই বলতে চাই না আমি।” 

পুলিস ইনস্পেকটর রোহন কাটিয়াল ঘটনা স্থল তল্লাসি করে সুত্র প্রমান একত্রিত করে ফেলেন। অনুপমা পুলিসকে জানায় একটা পাহাড়ি কম বয়সী ছেলে দেবায়নকে ডাকতে এসেছিল, ওকে খুঁজে বের করতে পারলে দেবায়নের খবর আর আততায়ীর পরিচয় জানা সম্ভব হবে। পুলিস খুনের মামলার দায়ের করে জানায় ওদের থানায় স্কেচ আর্টিস্ট নেই। আততায়ীর সাথের ছেলেটার স্কেচ তৈরি করার জন্য ওদের নিউ তেহেরি থানায় অথবা দেরাদুনে অথবা হৃষীকেশে যেতে হবে। রূপক একটু আধটু আঁকতে জানত, যে ছেলেটা এসেছিল তার একটা স্কেচ বানিয়ে পুলিসের হাতে তুলে দেয়। পুলিস ইন্সপেক্টর অনুপমাকে জিজ্ঞেস করে ওর কাকে সন্দেহ। অনুপমা ছলছল চোখে সবার দিকে একবার তাকায়। কাকে সন্দেহ করবে অনুপমা? ওর যে চিন্তা শক্তি লোপ পেয়ে গেছে। অনুপমা পুলিসকে জানায় ওদের ব্যাবসা অনেক বিস্তৃত, ব্যাবসা ক্ষেত্রে দেবায়নের প্রচুর শত্রু থাকতে পারে কিন্তু এই নির্জন স্থানে এসে একেবারে ওকে খুন করার মতন পরিকল্পনা করতে পারে এমন কাউকে ওর সন্দেহ হয় না। তবে কারুর দিকে সন্দেহের আঙ্গুল তোলার আগে নিজেই একবার খুনের উদ্দেশ্য যাচাই করে দেখতে চায়। প্রাথমিক তদন্ত সেরে পুলিস ইন্সপেক্টর জানায় এই ছেলেটার খোঁজ পেলে ওদের জানিয়ে দেবে।

সেদিন সারাদিনে নদীর দুইপাড় খানাতল্লাসি চালিয়েও দেবায়নের কোন খোঁজ পাওয়া যায়না। সন্ধ্যের পরেও অনুপমাকে কিছুতেই ওই খাদের কিনারা থেকে নড়ানো সম্ভব হয়না। দুইদিন টানা অনুপমা ওইখানে একভাবে বসে থাকে দেবায়নের প্রতীক্ষায়। ওর মন যে কিছুতেই মানতে নারাজ যে ওর পুচ্চু আর এই পৃথিবীতে নেই। 

শ্রেয়া আর পায়েল, ঋতুপর্ণা সঙ্গীতা সবাই ওকে একা ছাড়তে নারাজ। যা হবার সবাই একসাথে মোকাবিলা করবে বলে বদ্ধপরিকর। আশায় বুক বেঁধে বসে থাকে অনুপমা এই বুঝি হটাত করে ওর পুচ্চু ওর পাশে এসে দাঁড়াবে, ওকে জড়িয়ে ধরবে, ওর গালে চুমু খেয়ে বলে উঠবে, “এই একটু লুকিয়ে মজা দেখছিলাম।” কিন্তু না, আরো একদিন কেটে যায় দেবায়নের পরশ ওর কাঁধে আর স্পর্শ করে না। 

দেবায়নের নিখোঁজ হওয়ার দুর্ঘটনায় সবার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে, সবাই সারাদিন মন মরা হয়ে বসে থাকে। কেউই আর রীহতে ওইভাবে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে পরে থাকতে চায় না। পরের দিন পুলিসের লোকের সাথে রঞ্জিতের লোকেরাও খাদের মধ্যে নেমে নদীর দুই পাড়ে খানা তল্লাসি চালায় কিন্তু দেবায়নের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়না দেখে সবার সংশয় হয় যে দেবায়ন সলীল সমাধি নিয়েছে। সেই কথা অনুপমা কিছুতেই মানতে চায় না, ওর মন বলছে দেবায়ন এখুনি কোথা থেকে বেড়িয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরবে। পুলিস, রঞ্জিত শান্তনু সবাই অনুপমাকে অনুরোধ করে কোলকাতা ফিরে যেতে। সবার ধারনা বদ্ধমূল হয় যে দেবায়ন আর বেঁচে নেই, এই উঁচু খাদ থেকে ওই পাহাড়ি নদীতে পরে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। 

ভগ্ন হৃদয়ে চতুর্থ দিন সকালে সবাই রীহ থেকে ঘুট্টুর পথ ধরে। ভাঙ্গা বুক নিয়ে অনুপমা এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে আর বারেবারে দেবায়নের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে এগিয়ে চলে। বারেবারে ওর আর্ত কণ্ঠস্বর পাহাড়ের গায়ে লেগে ওর কানে ফাঁকা আওয়াজ হয়েই ফিরে আসে। ওদের গাড়ি ঘুট্টুতে অপেক্ষা করছিল। সেই গাড়ি করে সবাই হৃষীকেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। গাড়ি ঘুট্টু ছাড়তেই ডাক ছেড়ে কেঁদে ওঠে অনুপমা। শ্রেয়া আর পায়েল ওকে চেপে ধরে সিটে বসিয়ে দেয়। একদম সামনের সিটে চুপচাপ ওর বাবা বসে মেয়ের এই অবস্থা দেখে খুব মুষড়ে পরেন। কি কারনে মেয়ে অনাকে সন্দেহ করে বসল সেটা এখন তাঁর কাছে পরিস্কার হল না। 

হৃষীকেশ পৌঁছাতে ওদের বেশ রাত হয়ে যায়। সারা রাত অনুপমা চোখের পাতা এক করতে পারে না, যেই ওর চোখ বুজে আসে তখনি ওর মনে হয় এই বুঝি দেবায়ন এসে ওকে ডাকবে, ওকে জড়িয়ে ধরবে। সারা রাত শ্রেয়া আর পায়েল ওকে ঘিরে বসে থেকে থেকে শেষ রাতে দুইজনে ওর পাশে ঘুমিয়ে পরে। সকালের দিকে অনুপমা নিজের ব্যাগ ঘুছিয়ে নেয়, এই ভাবে দেবায়নকে ফেলে চলে যেতে ওর মন মানতে চায় না। 

সকালে অনুপমা শ্রেয়াকে ডেকে বলে, “আমি পুচ্চুকে ছাড়া এইখান থেকে এক পা নড়ব না।”

শ্রেয়া আর পায়েল প্রমাদ গোনে, একা একা ওকে এইভাবে এইখানে ছাড়তে কিছুতেই ওদের মন মানতে চায় না। শ্রেয়া মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেয়, “তুই না গেলে আমিও কোথাও যাবো না।”

শ্রেয়ার এই গভীর বন্ধু প্রীতি দেখে অনুপমার ভগ্ন হৃদয় আরো ডুকরে কেঁদে ওঠে। ওর হাত ধরে বলে, “তুই কেন এইখানে আমার সাথে পরে থাকবি? তুই বাড়ি যা।”

পায়েল ওর হাত ধরে ধরা গলায় উত্তর দেয়, “আমাকে দেবায়ন ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল, ওকে না ফিরিয়ে নিয়ে আসা পর্যন্ত আমিও তোর পাশ ছাড়ছি না।”

ম্লান হেসে উত্তর দেয় অনুপমা, “তুই একটা পাগলী মেয়ে।” ভাইয়ের হাত কাছে টেনে ওর হাতের মধ্যে পায়েলের হাত দিয়ে বলে, “তোর সাথে ভাই আছে রে পায়েল। পুচ্চু ছাড়া আমার আর কে আছে, বল? আমাদের সম্বন্ধে তুই অনেক কিছু জানিস না, সেইগুলো তোর অজানা থাকাই ভালো। শুধু এইটুকু জেনে রাখ পুচ্চু আর মামনি ছাড়া আমার নিজের বলতে এই পৃথিবীতে কেউ নেই। ওকে যদি ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারি তাহলে কোলকাতা ফিরব না হলে আর ফিরব না।”

পায়েল আর অঙ্কন কেঁদে ফেলে ওর কথা শুনে, “দিদিভাই প্লিস এই ভাবে আমাদের ছেড়ে যাস না।” 

শ্রেয়া ছলছল চোখে ধরা কণ্ঠে ওকে মৃদু বকুনি দিয়ে বলে, “ফিরবি না মানে? আমার মন বলছে দেবায়নের কিছু হয়নি, ওই শয়তানটা এইখানে কোথাও লুকিয়ে আমাদের সাথে মজা করছে।” চোখের জল মুছতে মুছতে বলে, “একবার শালাকে হাতের কাছে পাই পেদিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে তবে ছাড়ব।”

অনুপমা ওর হাত ধরে বলে, “শোন শ্রেয়া, তুই আমার একটা কাজ করবি?” শ্রেয়া ছলছল চোখে জিজ্ঞেস করে, “কি?” অনুপমা ওর হাত ধরে অনুরোধ করে, “লক্ষ্মীটি তুই বাড়ি ফিরে যা। আমি ওকে খুঁজে তবেই ফিরব। যদি আমি না ফিরি ...” বলতে বলতে ওর গলা ধরে আসে। শ্রেয়া আর পায়েল ওকে জড়িয়ে ধরে ভেঙ্গে পরে। অনুপমা শ্রেয়াকে বলে, “তাহলে তুই মামনির খেয়াল রাখিস। দেবায়ন ছাড়া মামনির আর কেউ নেই রে...” ভেঙ্গে পরে অনুপমা। ওর কানে মামনির হাহাকার আর্তনাদ ভেসে আসে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ওর মামনির কি অবস্থা হতে পারে সেটা অনুধাবন করতে পেরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে। চোখের জল মুছে শ্রেয়ার হাত ধরে অনুরোধ করে, “দয়া করে তুই পায়েল আর ভাইয়ের খেয়াল রাখিস আর অফিসের সবার খেয়াল রাখিস।”


Reply
পর্ব ২৯ (#2)


কথাটা শেষ করে নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হোটেল থেকে বেড়িয়ে পরে অনুপমা। শ্রেয়া আর পায়েল দৌড়ে এসে ওকে বাধা দিতে যায় কিন্তু অনুপমা মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেয় দেবায়নের আততায়ীকে শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত আর বাড়ি ফিরবে না। অনুপমা নিজের সিদ্ধান্তে অটল, সবাই কিঙ্করতব্য বিমুঢ়ের মতন ওর দিকে চেয়ে থাকে হাঁ করে। রূপক আর ধীমান এগিয়ে আসে ওর সাথে যাওয়ার জন্য। 

অনুপমা রূপককে থামিয়ে দিয়ে বলে, “না রে রূপক, শ্রেয়াকে পায়েলকে সামলাতে তোর দরকার পরবে। তুই চলে গেলে ওরা সবাই অথৈ জলে পরে যাবে।”

পরাশর তখন নিজের ব্যাগ কাঁধে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে, “তুই একা কেন যাবি, আমিও তোর সাথে যাব চল।”

অবাক চোখে অনুপমা ওর দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে জিজ্ঞেস করে, “তুই আবার কেন এত কষ্ট করবি?”

পরাশর ওর কাঁধ চাপড়ে নিচু কণ্ঠে উত্তর দেয়, “তোর অত মাথা ব্যাথা নিতে হবে না। চল বেড়িয়ে পরি অনেকটা পথ আমাদের যেতে হবে। ঘুট্টু পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধে হয়ে যাবে।” 

অনুপমা ওকে আর মানা করতে পারে না। গাড়িতে ওঠার আগে একবার সবার দিকে তাকিয়ে দেখে অনুপমা। পায়েল, অঙ্কন, শ্রেয়া সবার চোখে জল। জারিনা, সঙ্গীতা ঋতুপর্ণা চুপচাপ দাঁড়িয়ে। ওর বাবা, সোমেশ বাবু নির্বাক হয়ে গেছেন। অঙ্কন ছলছল চোখে দিদির দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকে, হয়ত দিদির সাথে এটাই শেষ দেখা। 

গাড়ি ছাড়ার আগে অঙ্কন দৌড়ে এসে দিদিকে জড়িয়ে ধরে বলে, “তুই কথা দে ফিরে আসবি।”

ভাইকে কি ভাবে সান্ত্বনা দেবে ভেবে পায়না অনুপমা। নিজেও জানে না যে পথে নেমেছে তাঁর শেষ কোথায়, তাও ভাইকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে প্রবোধ দেয়, “আমি ফিরব, নিশ্চয় ফিরব আর দেবায়নকে সাথে নিয়েই ফিরব।”

আর বেশি দাঁড়ায় না অনুপমা, জানে বেশি দাঁড়ালে ওদের দেরি হয়ে যাবে। পরাশর আর অনুপমা, হৃষীকেশ থেকে আবার ঘনসিয়ালির রাস্তা ধরে। গাড়ি আবার হৃষীকেশ থেকে পাহাড়ি সঙ্কীর্ণ পথ ধরে উঠতে শুরু করে দেয়। এইবারে এই পাহাড় আর ওকে টানে না। চুপচাপ অঙ্ক কষতে শুরু করে অনুপমা। দেবায়নের নিরুদ্দেশের পেছনে কার হাত হতে পারে। ওর বাবা সোমেশ সেন, এত তাড়াতাড়ি রীহতে কি করে পৌছাল? বাবার ওপর থেকে সন্দেহ দুর করার জন্য অনুপমা মাকে ফোন করে।

পারমিতা মেয়ের গলা শুনেই উদ্বেগ জনিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “তুই কেমন আছিস? কি হয়েছে।”

সংক্ষেপে মাকে সব কথা জানিয়ে এটা জানাতে ভোলে না যেন ওর মামনিকে কিছু না জানানো হয়। পারমিতা জানায় দেবশ্রীকে এখুনি কিছুই জানাবে না কিন্তু কতদিন এই সংবাদ দেবশ্রীর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবে। অনুপমা জানায় ঘন সিয়ালি থেকে ফিরে এসে নিজেই মামনিকে জানাবে সম্পূর্ণ ঘটনা তারপরে যা হবার নিজেই মোকাবিলা করবে। জানে একবার এই খবর মামনির কানে পৌঁছালে মামনি মূর্ছা যাবে, কিন্তু কিছুই করার নেই। বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে জানতে পারে, ওদের চলে যাওয়ার পরের দিন দেরাদুনের হোটেলের মালিকের সাথে কোন এক বিষয়ে আলোচনা করার জন্য সোমেশ বেড়িয়ে পরেন। যাওয়ার সময়ে বলে যান ফিরতে বেশ কয়েকদিন দেরি হবে। বাবা কি সত্যি দেরাদুনে গিয়েছিলেন না দেবায়নের পিছু নিয়েছিলেন? দেবায়ন বাবার অনেক ক্ষতি করেছে, চাকরি ছাড়তে হয়েছে, হয়ত বাবা এর মধ্যে জেনে ফেলেছে যে ওর মায়ের সাথে এক সময়ে দেবায়নের শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল। দেবায়নের নামে যদিও কোন কোম্পানি নেই তবুও দেবায়ন বাবার পথ থেকে সরে গেলে কোম্পানির সব কিছুর ওপরে বাবার এক ছত্র অধিপতি হবে। কিন্তু বাবার কাছে দেবায়ন সোনার ডিম দেওয়া হাঁস, এমত অবস্থায় কি বাবা সত্যি দেবায়নকে নিজের পথ থেকে সরাতে চাইবে? 

পরাশর ওকে জিজ্ঞেস করে, “এর পেছনে তোর কাকে সন্দেহ হয়।”

বুক ভরে শ্বাস নেয় অনুপমা, “সন্দেহ অনেক কিন্তু ঠিক ধরতে পারছি না কে হতে পারে।” 

পরাশর ওকে বলে, “সব সন্দেহ ভাজনদের একটা তালিকা বানানো যাক, তারপরে খুনের উদ্দেশ্য ঠিক করতে হবে।”

অনুপমা মাথা দোলায়, “হ্যাঁ ঠিক বলেছিস। ওকে খুন করার পেছনে আসল উদ্দেশ্য কি ছিল সেটা যদি সঠিক ভাবে জানা যায় তাহলে আততায়ীকে ধরা আমাদের পক্ষে সহজ হয়ে যাবে।”

ওদের গাড়ি বারকোট পৌঁছাতেই অনুপমার ফোনে ইনস্পেক্টর রোহণের ফোন আসে। ফোনে ইনস্পেকটর জানায় নদীতে একটা মৃত দেহ পাওয়া গেছে। সেই শুনে অনুপমার বুক কেঁপে ওঠে, চরম আশঙ্কায় থরথর করে কাঁপতে শুরু করে অনুপমা। পরাশর জানতে চায় সেই মৃতদেহের পরনে কি ছিল। জামা কাপড়ের বিবরন আর দেহের বিবরন শুনে অনুপমা শ্বস্তির শ্বাস নেয়, বুঝে যায় ওই মৃত দেহ দেবায়নের নয়। তাও ইনস্পেক্টর ওদের নিউ তেহেরির হসপিটালে এসে মৃতদেহ শনাক্ত করতে অনুরোধ করে। 

ঘনসিয়ালি থানায় গিয়ে সব থেকে আগে পুলিস ইন্সপেক্টিরের সাথে দেখা করে ওরা। তারপরে পুলিসের সাথে নিউ তেহেরির হসপিটালে গিয়ে মৃতদেহ সনাক্ত করে। অনুপমা আর মর্গে ঢুকতে চায় না, পরাশর শনাক্ত করে এসে জানায় ওই মৃতদেহ দেবায়নের নয়। ইনস্পেকটর রোহন জানায় এই দুইদিনে ওরা সেই ছেলের কোন সন্ধান পায়নি। অনুপমা জানায় নিজেই একবার রীহতে গিয়ে আবার দেবায়নের খোঁজ করবে। অনুপমা বদ্ধ পরিকর আগে দেবায়নের খোঁজ করবে তারপরে আততায়ীর খোঁজে যাবে। অনুপমা জানে এই অভিপ্রায় ইনস্পেকটরকে জানালে সে বাধা দেবে তাই আর তাকে কিছু না জানিয়েই পরাশরকে নিয়ে ঘুট্টুর উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরে। 

ঘুট্টূ পৌঁছে সব থেকে আগে গাইড রঞ্জিতের খোঁজ করে অনুপমা। রঞ্জিতকে জানায় দেবায়নকে খুঁজতে যেতে চায়। 

সব শুনে রঞ্জিত ওকে বলে, “ম্যাডাম, স্যার কে খুঁজতে আমাদের কোন আপত্তি নেই তবে আপনাকে একটা সত্যি কথা বলি। এই পাহাড়ি নদী আর ওই উঁচু খাদ থেকে কেউ পরে গেলে তার বাঁচার আশঙ্কা খুব কম। যদি বেঁচে থাকেন স্যার, তাহলে এতদিনে এই আশেপাশের গ্রামের কোন লোক ইতিমধ্যে খুঁজে বের করে নিত। কিন্তু এই চার পাঁচ দিনে আশেপাশের কোন গ্রামের কেউই স্যারকে দেখেনি। তবে আমি জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখছি একজন সন্দেহ জনক ব্যাক্তিকে কয়েকদিন আগে এই এলাকায় দেখা গিয়েছিল।”

অনুপমা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “সেই লোকের বিষয়ে কি কিছু জানতে পেরেছেন?”

রঞ্জিত ওদের নিয়ে একজনের বাড়িতে যায়। টালির ছাউনি দেওয়া পাহাড়ের এক গ্রাম্য বাড়ি। ওদের এত রাতে দেখে এক বৃদ্ধ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসে। রঞ্জিত ওই এলাকার লোক, সেই ওই বৃদ্ধের সাথে পাহাড়ি ভাষায় কথাবার্তা বলে অনুপমাদের জানায়, এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক কয়েকদিন আগে এক পাঞ্জাবী লোককে একা একা এইখানে ঘোরাফেরা করতে দেখেছিল। তারপরে অবশ্য সেই পাঞ্জাবী লোকের কোন হদিস পাওয়া যায়নি। সেই পাঞ্জাবী ভদ্রলোক এক একা একটা ব্যাগ তাঁবু ইত্যাদি নিয়ে একাই এইদিকে ঘুরতে এসেছিল বলে ওই বৃদ্ধকে জানায়। সোজা রাস্তা ছেড়ে গ্রামের পথ আর জঙ্গলের পথ ধরে রীহের দিকে যাত্রা করে। বৃদ্ধ জঙ্গলের মধ্যে ছাগল চড়াতে গিয়ে সেই পাঞ্জাবী লোকের দেখা পায়। আরো জিজ্ঞাসাবাদ করে ওরা জানতে পারে যে কয়েকদিন পরে, অর্থাৎ যেদিন এই দুর্ঘটনা ঘটে তাঁর আগের দিন পর্যন্ত ওই পাঞ্জাবী লোকটাকে জঙ্গলের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। সেই লোকের উচ্চতা মাঝারি, দেহের গঠন মাঝারি, বয়স আন্দাজ পঁয়তাল্লিশ পঞ্চাসের মাঝামাঝি। বৃদ্ধ এক উল্লেখযোগ্য তথ্য ওদের দেয়। দাড়ি গোঁফ থাকা সত্ত্বেও সেই পাঞ্জাবীটা ঘনঘন সিগারেট টানছিল। সাধারনত এত পাঞ্জাবীরা সিগারেট খায় না। সেই শুনে অনুপমা পরাশরের দৃঢ় বিশ্বাস হয়, আসলে বেশ ভুষা বদলে নকল দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে পাঞ্জাবী সেজে আততায়ী এই জায়গায় দেবায়নের অপেক্ষা করেছিল। বৃদ্ধ ওদের এর চেয়ে বেশি আর কিছু বলতে পারল না। 

সেই রাতে রঞ্জিতের অনুরোধে পরাশর আর অনুপমা ওর বাড়িতে রাত কাটায়। রঞ্জিত জানায় ওর পক্ষে যতদূর সম্ভব সাহায্য সে করবে। 

রাতের বেলা পরাশর ওকে জিজ্ঞেস করে, “তোর কাকে সন্দেহ হয়? কে দেবায়নের সব থেকে বড় শত্রু?” 

অনুপমা কিছুক্ষণ ভাবতে বসে, এমন প্রচুর গোপন বিষয় আছে যা গোপন থাকা বাঞ্ছনীয়। তাই পরাশরকে সব কিছু জানানো উচিত হবে না। বিশেষ করে বর্তমানে অনুপমার সন্দেহ নিজের বাবার ওপরে প্রবল। দেবায়ন বাবার সব থেকে বড় পথের কাঁটা হতে পারে, দ্বিতীয় সূর্য, নিজের আর স্ত্রী মনিদিপার অপমানের বদলা নিতে দেবায়নকে মারতে পিছপা হবে না। তৃতীয়, ধৃতিমান, দেবায়ন এক সময়ে একও অপদস্থ করেছিল তার বদলা নিতে ধৃতিমান নিশ্চয় মুখিয়ে থাকবে। চতুর্থ, ইন্দ্রনীল আর অনিমেশ আঙ্কেল, যে ভাবে ওদের হাত থেকে রূপক আর দেবায়ন সব কিছু ছিনিয়ে নিয়েছে তাতে তারাও দেবায়নের ওপরে প্রতিশোধ নেওয়ার ফাঁক খুঁজবে। পঞ্চম, পুনের হোটেলের মালিক রজত পানিক্কর, এক রকম ব্লাকমেল করেই ওর কাছ থেকে হোটেল হাতিয়ে নিয়ে পথে বসিয়ে দিয়েছে দেবায়ন। বাবাকে ছাড়া বাকি সবার নাম আর উদ্দেশ্য পরাশরকে জানায়। অনুপমা বলতে শুরু করে আর একটা পরাশর একটা প্যাডের মধ্যে সব কিছু লিখতে শুরু করে। 

সব শুনে পরাশর ওকে বলে, “এক বার ওই ছেলেটাকে পেলে বড় ভালো হত কিন্তু যখন ছেলেটাকে পাওয়া যাচ্ছে না তখন আমাদের মনে হয় রীহের ওই জঙ্গলে একবার যাওয়া উচিত। এক রাতে নিশ্চয় ওই আততায়ী রীহ থেকে ঘুট্টু হেঁটে আসেনি। এই রাস্তা ওর অজানা সুতরাং যতদূর মনে হয় এই কয়দিন ওই আততায়ী ওই জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়েছিল।”

অনুপমা মাথা দুলিয়ে বলে, “হ্যাঁ ঠিক বলেছিস। তবে আমাদের আসল উদ্দেশ্য দেবায়নকে খুঁজে পাওয়া। আগে আমরা দেবায়নকে খুঁজতে নামবো ওই খাদের মধ্যে তারপরে আততায়ীকে খুঁজবো।”

পরের দিন সূর্যের আলো ফোটা মাত্রই ওরা রীহের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এইবারে দশ কিলোমিটার যেতে ওদের আর ছয় ঘন্টা লাগলো না। অনুপমার বুকে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করে দেয়, ওর শরীরে নতুন রক্তের সঞ্চার হয়, দেবায়নকে খোঁজার এক নতুন সাহস আর শক্তি নিয়ে দুপুরের আগেই রীহ পৌঁছে যায় ওরা। সাথে দুইজন পোর্টার নিয়ে গিয়েছিল। 

রঞ্জিতের সাথে খাদের কিনারায় এসে পুনরায় ওই জায়গাটা তদারিকি করে দেখে। প্রথম দিনে যযে পায়ের ছাপ গুলো ওরা দেখেছিল এতদিনে বহু পায়ের ছাপের ফলে সেই ছাপ গুলো মাটিতে মিশে গেছে। তাও কিছুটা আন্দাজ করে যেদিকে আগে আততায়ীর পায়ের ছাপ গিয়েছিল সেদিকে ওরা হাঁটতে শুরু করে দেয়। বেশ কিছুটা দুর গিয়ে আন্দাজ মতন আততায়ীর পায়ের ছাপ অনুসরন করে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পরে। এদিক ওদিক ভালো ভাবে দেখতে দেখতে পরাশর আর অনুপমা এগিয়ে চলে, পেছনে রঞ্জিত আর দুটো ছেলে। ঘন জঙ্গল, উঁচু উঁচু দেবদারু পাইন ইত্যাদি গাছে ভরা, ভিজে মাটি নরম পাতা আর ঘাসে ঢাকা। বেশ কিছদুর গিয়ে একটা খালি জায়গা দেখে ওরা থেমে যায়। ঘন জঙ্গলের মাঝে বেশ কিছুটা জায়গা সদ্য পরিষ্কার করে তাঁবু খাটানোর আর থাকার চিহ্ন দেখতে পায়। অনুপমার সন্দেহ দুর হয়ে যায়, এই জায়গায় নিশ্চয় ওই আততায়ী বেশ কয়েকদিন থেকেছে। সঙ্গে সঙ্গে রঞ্জিত পরাশর আর অনুপমা চারপাশে তথ্য প্রমান যোগাড় করার জন্য লেগে পরে। খুঁজে খুঁজে একটা খালি সিগারেট প্যাকেট পায়, বেশ কিছু প্লাস্টিকের ব্যাগ, বেশ কিছু বিস্কুটের প্যাকেট ম্যাগির প্যাকেট জলের বোতল ইত্যাদি খুঁজে পায়। রঞ্জিত সব কিছু একটা প্লাস্টিকের ব্যাগের মধ্যে জড় করে অনুপমার হাতে তুলে দেয়। আরো বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক খুঁজে নদীর দিকে চলে আসে। রঞ্জিত জানায় বৃদ্ধের বিবরনের কোন পাঞ্জাবী লোককে নিচের দিকে নামতে দেখেনি সুতরাং ধরে নেওয়া যায় ওই আততায়ী রীহ ছাড়িয়ে উপরের দিকে হয়ত উঠে গেছে নয়ত আরো গভীর জঙ্গলের পথ ধরে অন্যপাশ দিয়ে নেমে গেছে। 

ওইখানে আরো বেশ কিছখন খোঁজাখুঁজি করার পরে তিনজনে তাঁবুতে ফিরে আসে। পরাশর ব্যাগের মধ্যে থেকে সিগারেট প্যাকেট বের করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে অনুপমাকে প্রশ্ন করে, “তোর জানাশোনার মধ্যে কেউ কি এই সিগারেট খায়?”

বেশ দামী সিগারেট প্যাকেট দেখে অনুপমা স্মিত হেসে বলে, “তুই নিজেই এই সিগারেট খাস...”

পরাশর হেসে ফেলে, “বেশ বলেছিস। সাধারন অথচ দামী সিগারেট। ধরে নেওয়া যেতে পারে আততায়ী বড়লোক, রুচিবোধ সম্পন্ন ব্যাক্তি। আমাদের সন্দেহের তালিকা অনুযায়ী কে কে এই সিগারেট ব্যাবহার করতে পারে?”

অনুপমা একটু ভেবে বলে, “সবাই এই সিগারেট ব্যাবহার করতে পারে। যদিও আমি রজত পানিক্করের সাথে আমাদের বিশেষ পরিচয় হয়নি তবে আমাদের সামনে সে কখন সিগারেট ধরায়নি। অনিমেশ, ধৃতিমান সূর্য সবাই এই সিগারেট খেতে পারে।” মনে মনে অঙ্ক কষে, ওর বাবা সাধারণত চুরুট খায়, তবে মাঝে মধ্যে সিগারেট খায়। বাবার নাম এখন পর্যন্ত পরাশরকে জানানো হয়নি। 

পরাশর জিজ্ঞেস করে, “এর পরের কি করনীয় আমাদের?”

অনুপমা বলে, “কাল রঞ্জিতকে বলে আমি নিজেই ওই খাদের মধ্যে রেপ্লিং করে নামবো আর নদীর কিনারা ধরে নিচের দিকে খুঁজতে খুঁজতে যাবো।”

পরাশর ওকে বলে, “খুব বিপদজনক হয়ে যাবে ব্যাপারটা।”

দুঃখিত, ভারাক্রান্ত মনে অনুপমা ওকে বলে, “বিপদ বলে আমার জীবনে আর কিছু নেই। যখন দেবায়ন আমার পাশেই নেই তখন আর বেঁচে থেকে কি লাভ।” বলতে বলতে ওর গলা ধরে আসে। বারেবারে হাতের আংটি গালে ঘষে বুকের মধ্যে চেপে ধরে দেবায়নের পরশ খুঁজতে চেষ্টা করে।

সারা রাত অনুপমা ঘুমাতে পারে না, পরাশর অনেকক্ষণ জেগে বসে ওকে পাহাড় দিয়েছিল কিন্তু শেষ রাতের দিকে পরাশরের চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। শেষ রাতের দিকে অনুপমা তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে দুর পাহাড়ের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকে। হয়ত ওই দূরে পাহাড়ে কোথাও ওর পুচ্চু লুকিয়ে আছে, হয়ত ওর সাথে লুকোচুরির খেলা খেলে যাচ্ছে। একবার যদি ছেলেটাকে ধরতে পারে তাহলে খুব বকুনি দেবে। কখন যে মাটিতে বসে বসে ওর চোখ লেগে গিয়েছিল সেটা আর টের পায়না। ঘুম ভাঙ্গে সকালের পাখীর ডাকে। পুবের আকাশের সূর্যের লালিমার ছটা সোজা ওর চেহারায় এসে পড়তেই চোখ খুলে যায়। সামনে বিস্তীর্ণ বনভূমি, একপাশে নদী। 

পরাশর তৈরি হয়ে ওর কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, “রাতে ঘুমোসনি নিশ্চয়। একা একা এইখানে বসে কি করছিলি?”

অনুপমা ম্লান হেসে বলে, “অপেক্ষা করা ছাড়া আর কি করার আছে আমার বল।”

এমন সময়ে রঞ্জিত দৌড়াতে দৌড়াতে এসে ওকে বলে, “ম্যাডাম একটা খবর পাওয়া গেছে।”

চাপা উত্তেজনায় অনুপমার বুকের ধুকপুকানি থেমে যায়। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, “কি খবর।”

রঞ্জিত ওকে বলে, “ঘুট্টুর নিচের দিকের এক গ্রামের একজন গত রাতে নদীতে একজন ছেলেকে ভেসে যেতে দেখে নিজের বাড়িতে এনে রেখেছে। এই মাত্র আমাকে একজন খবর দিল। যতদূর মনে হয় দেবায়ন হতে পারে।”


অনুপমার ওই শুনে রঞ্জিত আর পরাশর কে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বেড়িয়ে পরে গ্রামের দিকে। ওর পা আর মাটিতে পরে না, হাঁটার বদলে দৌড়াতে শুরু করে অনুপমা। কি অবস্থায় দেখবে, কি রকম আছে, বেঁচে আছে না শেষ দেখা দেখতে পাবে সেই আশঙ্কায় ওর হৃদপিণ্ড বারেবারে লাফিয়ে উঠে গলায় চলে আসে। 

রীহ থেকে ঘুট্টূ প্রায় ওরা দৌড়াতে দৌড়াতে আসে। ওদের ওই ভাবে দৌড়ে আসতে একজন দৌড়ে এসে রঞ্জিতকে খবর দেয় নদীতে ভেসে আসা লোকের ব্যাপারে। সেই ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে সেই বাড়ির মধ্যে যায় অনুপমা। নদীর পাশে পটে আঁকা ছবির মতন গ্রাম। একটা ছোট পাহাড়ের ওপরে একটা বাড়ি দেখিয়ে সেই ছেলেটা বলে ওই বাড়িতে নদীর থেকে উঠিয়ে আনা দেহকে রাখা হয়েছে। দৌড়াতে দৌড়াতে তিনজনে পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে বাড়িতে ঢোকে। ছোট বাড়ির মধ্যে লোকজন উপচে পড়ছে।

অনুপমাদের দেখে বাড়ির কর্তা বেড়িয়ে আসতেই ওকে জিজ্ঞেস করে দেবায়নের ব্যাপারে। বাড়ির কর্তা ওদের নিয়ে ভেতরের ঘরের মধ্যে ঢুকতেই বিছানায় শুয়ে থাকা দেবায়নকে দেখে অনুপমা কেঁদে ফেলে। চেহারা সাদা হয়ে গেছে, বাম পা দুমড়ে গেছে, কপালে গভীর ক্ষতের দাগ। বাড়ির কর্তা দেবায়নের শরীর একটা মোটা কম্বল দিয়ে ঢেকে দিয়েছে আর বিভিন্ন ক্ষতের জায়গায় পাহাড়ি জড়িবুটির প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছে। 

দেবায়নকে দেখেই অনুপমা ওকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে কেঁদে ফেলে। বারেবারে ওর গালে কপালে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে, “প্লিস একবার চোখ খোল সোনা, দেখ তোর পুচ্চি এসে গেছে, প্লিস একবারের জন্য চোখ খোল।”

বাড়ির কর্তা, রাজীব ওদের জানায়, “চারদিনের মতন মনে হয় এই নদীর জলে ভেসে এসেছিল। খুব শক্ত প্রান আর আপনার ভালোবাসা খুব প্রবল, নচেত কেউ ওই খাদের মধ্যে এই পাহাড়ি নদীতে পরে গিয়ে প্রানে বাঁচে না। এঁকে এখুনি কোন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। আমি যতদূর সম্ভব বাঁচাতে চেষ্টা করেছি কিন্তু পায়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে, হাত ভেঙ্গে গেছে, মাথায় গভীর চোট লেগেছে, মনে হয় শিরদাঁড়ায় চোট পেয়েছে। এক্সরে না করা পর্যন্ত ভেতরের ক্ষয় ক্ষতি কিছুই বুঝে ওঠা সম্ভব নয়।”

অনুপমা ওকে জড়িয়ে ধরে গালে কপালে চুমু খেয়ে বারেবারে ডাক দেয়, কিন্তু সেই ডাক আর দেবায়নের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। দেবায়ন অচৈতন্য অবস্থায় বিছানায় ঘাড় কাত করে শুয়ে থাকে। অনুপমাকে ওই অবস্থায় দেখে পরাশর কি করবে কিছুই ভেবে পায়না। দেবায়নকে ফিরে পেয়ে অনুপমার বুক ভরে ওঠে, শেষ পর্যন্ত ওর পুচ্চু আবার ফিরে এসেছে। 


Reply
পর্ব ২৯ (#3)



দেবায়নের অতি সঙ্গিন শারীরিক অবস্থা দেখে অনুপমার খুব ভয় হয়। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি খুব ধীরে ধীরে চলছে, মাথায়, হাতে পায়ে সব জায়গায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। ওর চঞ্চল পুচ্চুকে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে অনুপমার বুক কেঁপে ওঠে। অনেকক্ষণ দেবায়নের ঠাণ্ডা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে পাশে বসে থাকে। পরাশর ততক্ষণ রঞ্জিত আর বাড়ির কর্তার সাথে কথাবার্তা সেরে ফেলে। বাড়ির কর্তা ওদের জানায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেবায়নকে কোন বড় হসপিটালে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করে দিতে। রঞ্জিত জানায় দেরাদুনে ভালো হসপিটাল আছে সেইখানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেবায়নকে নিয়ে ওদের রওনা হওয়া উচিত। অনুপমা আর দেরি করেনা, রঞ্জিত দেরাদুনের একটা বড় হস্পিটালের সাথে কথাবার্তা সেরে ফেলে। ওদের সঙ্গের যে গাড়ি ছিল সেই গাড়িতে দেবায়নকে নিয়ে ওরা দেরাদুনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সামনের সিটে পরাশর আর রঞ্জিত পেছনে দেবায়নের মাথা কোলে অনুপমা। বাড়ির কর্তাকে অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে ওরা চারজনে দেরাদুনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। 

অসাড় দেবায়নের মাথা বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে অনুপমা চাপা আশঙ্কায় প্রহর গুনতে গুনতে দেরাদুনের দিকে যাত্রা শুরু করে। পথে যেতে যেতে পরাশরকে ভালো ভাবে বুঝিয়ে দেয়, “শোন এই খবর যেন কোন মতে কোলকাতা না পৌঁছায়, বুঝলি।” 

পরাশর জিজ্ঞেস করে, “কেন রে, দেরাদুনে কেমন চিকিৎসা হবে সেটা ঠিক জানি না। কোলকাতা নিয়ে গেলে ভালো হত না? আর কাকিমাকেও এই বিষয়ে জানাতে হবে ত নাকি?”

অনুপমার গলা ধরে আসে, বুকের কাছে দেবায়নের মাথা চেপে ধরা গলায় পরাশরকে বলে, “খুব ভয় লাগছে রে, কি করব?” 

পরাশর ওকে অভয় দিয়ে বলে, “কিছু হবে না। অত ওপর থেকে পরে যখন বেঁচে গেছে তখন ওর জীবন অনেক শক্ত। তুই চিন্তা করিস না দেবায়ন ঠিক হয়ে যাবে।”

দেবায়নের মাথায় হাত বুলিয়ে পরাশরকে উত্তর দেয়, “জানিনা রে, ওকে চোখের আড়াল করতে একদম ইচ্ছে করছে না। তুই একটা কাজ করবি?” পরাশর মাথা দুলিয়ে জানায় সব কিছু করতে রাজি। অনুপমা ওকে বলে, “ওকে হসপিটালে ভর্তি করে তুই কোলকাতা চলে যাস। মামনিকে বিশেষ কিছু এখন জানাস না। তুই প্লিস কিছু করে মামনিকে নিয়ে দেরাদুনে চলে আসিস।” কিছুক্ষণ থেমে বলে ভাবুক কণ্ঠে ওকে বলে, “কে আসল আততায়ী সেটা না জানা পর্যন্ত আমাদের খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। দেবায়ন বেঁচে আছে জানতে পারলে আততায়ী সতর্ক হয়ে যাবে, দ্বিতীয় বার ওর ওপরে হামলা করতে পারে। আমরা এখন জানিনা আততায়ী আমাদের নিজেদের কেউ না বাইরের কেউ সুতরাং এই খবর কোন মতেই যেন কোলকাতা না পৌঁছায়। আততায়ী নিশ্চয় আমাদের ওপরে কড়া নজর রেখে চলেছে না হলে আততায়ী এত দুর এসে দেবায়নকে মারতে চেষ্টা করত না। সুতরাং শ্রেয়া পায়েলকেও এই খবর জানানো যাবে না। ওরা জানতে পারলে নিশ্চয় এইখানে আসতে চাইবে আর ওদের পিছু নিয়ে আততায়ী এইখানে এসে পৌঁছে যাবে।”

পরাশর বলে, “কিন্তু সেটা কাকিমার খেত্রেও হতে পারে। আমি যদি কাকিমাকে নিয়ে বের হই তাহলে আততায়ীর সন্দেহ হতে পারে। তার চেয়ে ভালো আমি এইখানে থাকি আর তুই কোলকাতা ফিরে যা। তোকে একা কোলকাতা ফিরতে দেখলে আততায়ী সন্দেহ দুর হয়ে যাবে যে দেবায়ন আর বেঁচে নেই। আর কাকিমাকে বলে বুঝিয়ে আনা একমাত্র তোর পক্ষেই সম্ভব। এরপরে দেবায়নকে কোথাও লুকিয়ে রাখতে পারলে খুব ভালো হয়, মানে কোলকাতার বাইরে কোথাও যদি কোন বিস্বস্ত লোক থাকে তার কাছে হলে ভালো হয়।”

কিছুক্ষণ ভেবে অনুপমা ওকে বলে, “হ্যাঁ তুই ঠিক বলেছিস। দেখি একবার ব্যাঙ্গালোর ফোন করে। আমাদের এক হোটেলের মালিক দিলিপ বাবু নিশ্চয় আমাদের এই অবস্থায় সাহায্য করবেন।”

পরাশর ওকে বলে, “ঠিক আছে তুই দিলিপ বাবুকে ফোন করে দে আর আমি কাকুকে একটা ফোন করে দেই। আততায়ীকে খুঁজতে কাকুর সাহায্য আমাদের খুব দরকার পরবে।”

অনুপমা মাথা দোলায়, পরাশরের কাকা ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইনস্পেকটর নিরঞ্জন বাবু, পায়েলের সময়ে ওদের খুব সাহায্য করেছিল। পরাশর সঙ্গে সঙ্গে কাকাকে ফোনে দেবায়নের নিরুদ্দেশের বিষয়ে কিঞ্চিত খবর দিয়ে বলে এই বিষয়ে যেন কাউকে না জানায়। নিরঞ্জন বাবু ওদের জানায়, সব রকমের সাহায্য করবেন তিনি।

অনুপমা দিলিপ বাবুকে ফোন করে বিস্তারে সব ঘটনা খুলে বলে। সব শুনে দিলিপ বাবু খুব ব্যাস্ত হয়ে পরেন, তিনি জানিয়ে দেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি দেরাদুনে পৌঁছে যাবেন। এক সময়ে অনুপমা আর দেবায়ন তাঁর জন্য যা করেছিল তাঁর প্রতিদান এখন শোধ করা হয়নি। দেরাদুনে পৌঁছাতে ওদের বিকেল হয়ে যায়। হসপিটালে আগে থেকে কথা বলা ছিল তাই ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি ওদের। 

ডাক্তার দেবায়নকে পরীক্ষা করে জানায়, বেশ কয়েক জায়গায় হাড় ভেঙ্গে গেছে, চার পাঁচ দিন ঠাণ্ডা জলে থাকার ফলে হাইপোথারমিয়া আর ইন্টারনাল হ্যামারেজ হয়েছে। লিভারে আর ফুসফুসে জল ঢুকে গেছে। হৃদয় খুব ধীরে ধীরে চলছে। মাথার পেছনে আর ঘাড়ে বেশ জোর আঘাত পেয়েছে। দেবায়নকে বেশ কিছুদিন আই.সি.ইউ তে পর্যবেক্ষণের জন্য রাখতে চায়, জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত অথবা বাহাত্তর ঘন্টা না যাওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা অসম্ভব। সব শুনে অনুপমার কেঁদে ফেলে, দাঁতে দাঁত পিষে ছলছল চোখে দেবায়নের হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে ওর পাশে বসে পরে। পরাশরের সাথে ডাক্তারের কথাবার্তা হয়। অনুপমা চুপচাপ আই.সি.ইউ তে বসে থাকে। ওইদিকে ওর ফোনে শ্রেয়া, পায়েল জারিনা রূপক এরা সবাই ফোন করে করে হয়রান। পরাশর ভেবে পায়না কি উত্তর দেবে। কাঁচের ঘরের মধ্যে শায়িত অচৈতন্য দেবায়ন আর তার পাশে কঠিন রক্তশূন্য থমথমে চেহারা নিয়ে বসে অনুপমা। পরাশর সবাইকে এক কথা জানায় ওরা এখন দেবায়নের খোঁজ করছে। দেবশ্রীর খবর জানতে চাইলে সবাই জানায়, কেউই আর ভয়ে দেবায়নের বাড়ি যায়নি। 

পরেরদিন বিকেল নাগাদ দিলিপ বাবু দেরাদুনে এসে হাজির হন। পরাশর সংক্ষেপে দেবায়নের দুর্ঘটনার বিষয়ে জানায়। দেবায়নকে নিস্তেজ নির্জীবের মতন পরে থাকতে দেখে মাথায় রক্ত উঠে যায়। দেবায়নের চোখ আর খোলে না দেখে অনুপমা খুব চিন্তিত হয়ে পরে। ডাক্তারেরা যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যায় দেবায়নের জ্ঞান ফেরাবার জন্য কিন্তু দেবায়নের শারীরিক অবস্থার কোন উন্নতি হয়না। 

দিলিপ বাবুকে দেখে অনুপমার মনে কিঞ্চিত শক্তির সঞ্চার হয়, ছলছল চোখে দিলিপ বাবুর হাত ধরে অনুরোধ করে, “আমার খুব ভয় করছে। কার কাছে যাবো কিছুই ঠিক করতে পারছি না, একটু সাহায্য করবেন?”

দিলিপ বাবু ওর হাত ধরে অভয় দিয়ে বলে, “এই ভাবে কেন বলছ? আমার ওপরে তোমার অধিকার আছে, তুমি একবার আদেশ কর, সব কিছু করতে রাজি আছি আমি।”

পরাশর ওর হাত ধরতেই অনুপমা ভেঙ্গে পরে, “কি হবে রে, দুই দিন হয়ে গেল পুচ্চু যে চোখ খুলছে না।”

পরাশর ওকে জড়িয়ে ধরে অভয় প্রদান করে বলে, “এই মেয়ে, তুই চোখের জল ফেললে হবে কি করে? তোর বিয়ের পিঁড়ি উঠানো বাকি, ওর বিয়েতে নাচতে বাকি। এত তাড়াতাড়ি তুই ভেঙ্গে পড়লে কি করে হবে?”

অনুপমা কাতর কণ্ঠে দিলিপ বাবুকে বলে, “আপনি প্লিস দেবায়ন কে নিয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে যান, ওইখানে ওর চিকিৎসা করাতে শুরু করুন। আমি ওর মামনিকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোর পৌঁছে যাবো।” 

সারাটা রাত কঠিন চাপা উৎকণ্ঠায় আর বিনিদ্র রজনী কেটে যায়। অনুপমা ক্ষণিকের জন্য চোখের পাতা এক করতে পারে না। দেবায়নের পাশে ঠায় বসে থাকে, এই অপেক্ষায় কখন চোখ খুলবে। ভোরের দিকে অনুপমার চোখে একটু তন্দ্রা ভাব লেগেছিল কিন্তু ওর তন্দ্রার ঘোর একটা যান্ত্রিক আওয়াজে কেটে যায়। সঙ্গে সঙ্গে নার্সদের ডাক দেয় অনুপমা। নার্স এসে যন্ত্র দেখে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারকে ফোন করে। ডাক্তার নার্সদের দৌড়াদৌড়ি করতে দেখে অনুপমা জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে। অনুপমাকে বলা হয় রুমের বাইরে যেতে। ডাক্তারেরা বেশ কিছুক্ষণ অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা, ওষুধ পত্র ইত্যাদি চালিয়ে দেবায়নকে নিয়ে অপারেশান থিয়েটারে নিয়ে যায়। চাপা উৎকণ্ঠায় অনুপমার প্রান ওষ্ঠাগত। হটাত দেবায়নের কি হল? অপারেশান থিয়েটাররে সামনে পাথরের মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে থাকে অনুপমা। একজন ডাক্তার বেশ কয়েক ঘণ্টা বাদে অপারেশান থিয়েটার থেকে বেড়িয়ে এসে ওদের খবর দেয় দেবায়ন কোমায় চলে গেছে। সেই খবর শুনে অনুপমা চোখে অন্ধকার দেখে। তিন রাত ঠিক ভাবে ঘুমায়নি, ঠিক ভাবে খাওয়া দাওয়া হয়নি। এমনিতে নিজে খুব ক্লান্ত আর দুর্বল ছিল। তাই ওই খবর শুনে সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরে পরে যায়। পরাশর ওকে সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলে। 

জ্ঞান ফেরার পরে অনুপমা চোখ খুলে দেখে নিজেই একটা হস্পিটালের বিছানায় শুয়ে। চোখ খুলেই দেখে ওর পাশে মাথা নিচু করে পরাশর আর দিলিপ বাবু বসে। ওদের এইভাবে নত মস্তক হয়ে থমথমে চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনুপমার বুক কেঁপে ওঠে। পরাশর কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না। একা একা কত দিক সামলাবে কিছুই ঠিক করতে পারে না। 

অনুপমা ছলছল চোখে পরাশরকে জিজ্ঞেস করে, “ডাক্তারেরা কি বলছে রে?”

পরাশর আর দিলিপ বাবু দুই জনেই মাথা নিচু করে থাকে। ওদের ওইভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনুপমা নিজেই বিছানা ছেড়ে উঠে পরে। 


পরাশর ওকে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলে, “এখন আমাদের হাতে বিশেষ কিছু নেই রে অনুপমা।”

অনুপমা বুক ভাঙ্গা চিৎকার করে ওঠে, “না......”

দিলিপ বাবু ওর হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে প্রবোধ দিয়ে বলেন, “এইখানে এই অবস্থায় দেবায়নকে রেখে লাভ নেই। আমি তোমাদের ব্যঙ্গালোর নিয়ে যেতে চাই। ওইখানে ভালো ডাক্তার আছে, ওইখানে না হলে বাইরে যাওয়া যাবে। তুমি চিন্তা কর না, দেবায়ন ঠিক হয়ে যাবে।”

অনুপমা মাথায় হাত দিয়ে চুপচাপ বসে পরে। সবার মুখে এক কথা দেবায়ন ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু দেবায়ন যে কোমায় চলে গেছে। মামনিকে কি উত্তর দেবে, কতদিন পরে দেবায়ন চোখ খুলবে, আদৌ কি আর চোখ খুলবে? 

অনুপমা অনেকক্ষণ পরে চোখের জল মুছে পরাশরকে বলে, “আমি একাই আততায়ীকে এর শাস্তি দেব।”

পরাশর প্রমাদ গোনে, এই অবস্থায় অনুপমার পক্ষে একা সব দিক সামলানো অসম্ভব ব্যাপার, নিজেও একা কি ভাবে কি সামলাবে ঠিক করে উঠতে পারে না। পরাশর ওকে শান্ত করে বলে, “মাথা ঠাণ্ডা কর। তুই একা নস, আমি ও তোর পাশে আছি। যা হবার দেখা যাবে। আততায়ীর যদি সূর্য অথবা ধৃতিমান হয় তাহলে পরের আঘাত কাকিমার ওপরে আসবে। যত তাড়াতাড়ি কাকিমাকে কোলকাতা থেকে সরিয়ে ফেলা ভালো। আর আততায়ী যদি অন্য কেউ হয় তাহলে পরের আঘাত তোর ওপরে হানবে, সেই মতন আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।”

অনুপমা দাঁতে দাঁত পিষে উত্তর দেয়, “এর শেষ কোথায় দেখতে চাই।”

দিলিপ বাবু হসপিটাল কত্রিপক্ষের সাথে কথাবার্তা বলে, আলোচনা সেরে দেবায়নকে ব্যাঙ্গালোর নিয়ে যাওয়ার ব্যাবস্থা করে নেন। দিলিপ বাবু জানান ব্যাঙ্গালোরে তাঁর অনেক চেনাজানা ডাক্তার আর হসপিটাল আছে। সেখানে নিয়ে নিজেস্ব তত্তাবধনে দেবায়নের চিকিৎসা শুরু করবেন। 

পরেরদিন সকালে প্লেনে দেবায়নকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায় সবাই। দিল্লী হয়ে ব্যাঙ্গালোর পৌঁছাতে ওদের বিকেল হয়ে যায়। ব্যাঙ্গালোরে দিলিপ বাবুর চেনাশোনা একটা বড় হসপিটালে দেবায়নকে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করা হয়। এই কয়দিনে দেবায়নের আর অনুপমার খবর নেওয়ার জন্য সবাই কোলকাতা থেকে ফোন করে, কিন্তু অনুপমার নির্দেশ অনুযায়ী পরাশর সবাইকে এক কথা জানায়, যে এখন ওরা দেবায়নকে খুঁজে পায়নি। পারমিতা, সোমেশ বাবু মেয়ের জন্য বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন, কিন্তু অনুপমা কারুর সাথে কথা বলেনা। ওর মাথায় শুধু একটা চিন্তা, এই দুর্ঘটনার পেছনে আসল দোষী কে আর কি তার উদ্দেশ্য। 

পরেদিন চাপা উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনা নিয়ে পরাশরকে সঙ্গে করে অনুপমা কোলকাতার উদ্ধেশ্যে রওনা দেয়। বুকের মধ্যে চাপা ভয়, এই খবর শুনে ওর মামনির কি অবস্থা হতে পারে। ব্যাঙ্গালোর থেকে প্লেনে চড়ার আগেই ফেরার টিকিট কেটে নিয়েছিল পরাশর, জানে, একবার এই খবর দেবায়নের মায়ের কাছে পৌঁছালে তৎক্ষণাৎ এক মা তাঁর ছেলের কাছে আসতে চাইবে। প্লেনে ওঠা মাত্রই অনুপমার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে ওঠে। কোলকাতা নেমে মামনিকে কি বলবে, কি ভাবে মামনির সামনে দাঁড়াবে, কি বলে মামনিকে ব্যাঙ্গালোর নিয়ে আসবে, এই ভাবতে ভাবতে ওদের প্লেন কোলকাতা এয়ারপোর্টে নামে। পরাশর শুধু মাত্র জারিনাকে জানিয়ে রেখেছিল যে ওরা কোলকাতা আসছে। তাই জারিনা তার বাবাকে নিয়ে ওদের জন্য কোলকাতা এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করেছিল। পরাশরের মুখে দেবায়নের বিষয়ে সব কিছু শোনার পরে জারিনার বাবা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি জানান তাঁর জানাশোনা ডাক্তার দের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করবেন। 

গাড়িতে উঠে লেকটাউনে দেবায়নের বাড়ির সামনে আসতেই অনুপমার হৃদপিণ্ড গলায় এসে আটকে যায়। বাড়ির মধ্যে মামনি নিশ্চয় নিশ্চিন্ত মনে নিজের কাজে ব্যাস্ত। ছেলে বেড়াতে গেছে, যেখানে গেছে সেখানে মোবাইল টাওয়ার পাওয়া যায়না। ওদের কথা ছিল, খাটলিং থেকে ঘুট্টু ফিরে প্রায় দশ দিন পরে সবাই বাড়িতে ফোন করবে। ইতিমধ্যে যে এত কান্ড ঘটে গেছে সেই খবর দেবায়নের মাকে জানানোর সাহস কারুর মধ্যে কুলায়নি। পরাশর আর অনুপমা পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। 

পরাশর ওর কাঁধে হাত রেখে সাহস দিয়ে বলে, “ভেতরে যা, আমি পেছনে আছি।”

অনুপমা চোখ বুজে একবার দেবায়নের নির্জীব চেহারা বুকের মধ্যে এঁকে নেয় তারপরে কলিং বেল বাজিয়ে চাপা উৎকণ্ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে দরজা খোলার অপেক্ষায়। 

এই অসময়ে কলিং বেল বেজে উঠতে দেবশ্রী তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে অনুপমা কে দেখে বিস্মিত হয়ে যায়। স্মিত হেসে ওর গালে হাত দিয়ে আদর করে জিজ্ঞেস, “কেমন ঘুরলি রে তোরা? শরীর খারাপ করেনি ত?” তারপরে পেছনে পরাশরকে দেখে কিঞ্চিত অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, “হ্যাঁরে বাকিরা কোথায়?” মামনির মিষ্টি হাসি আর মাতৃসুলভ আচরন দেখে অনুপমার চোখ ফেটে জল চলে আসে। সেই মুক বেদনা দেবশ্রীর চোখ এড়াতে পারেনা। বুক কেঁপে ওঠে দেবশ্রীর কম্পিত কণ্ঠে অনুপমা আর পরাশরকে প্রশ্ন করে, “দেবু কোথায় রে? তোদের সাথে আসেনি কেন?”

বুক ভরে শ্বাস নেয় অনুপমা, এইবারে ওকে গভীর জলে ঝাঁপ দিতে হবে। কি ভাবে শুরু করবে, কোথা থেকে শুরু করবে কিছুই ঠিক করে উঠতে পারে না অনুপমা। মামনির দুই হাত ধরে বসার ঘরের সোফায় বসিয়ে বলে, “দেবায়ন কিছু কারনে আসতে পারেনি, মামনি।” 

অনুপমার ধরা গলা আর ছলছল চোখ দেখে দেবশ্রীর সন্দেহ হয়, ওকে প্রশ্ন করে, “কি হয়েছে দেবায়নের?” 

মামনির প্রশ্নের সঠিক উত্তর অনুপমার অজানা তাই চোয়াল চেপে অশ্রু সংবরণ করে চুপচাপ মাথা নিচু করে মামনির হাত ধরে বসে থাকে। 

পরাশর বুক ঠুকে দেবশ্রীকে বলে, “তোমাকে আমাদের সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।”

শূন্য চোখে একবার পরাশরের দিকে তাকায় একবার অনুপমার দিকে তাকায় দেবশ্রী। ওর চোখের সামনে সারা পৃথিবী নড়তে শুরু করে দেয়। দেবশ্রী কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “আমার দেবু, ঠিক আছে না...” আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে না দেবশ্রী। মায়ের হৃদয় ফাঁকা হয়ে যায় সামনের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে। খুব কম বয়সে নিজের স্বামীকে হারিয়েছে, এক মাত্র ছেলেকে বুকে করে ধরে মানুষ করেছে। চোখ বন্ধ করে ইষ্ট নাম নিয়ে কাতর প্রার্থনা জানায়, এক মাত্র সন্তানের চিতায় অগ্নি প্রদানের শাস্তি যেন ভগবান ওকে না দেয়।

পরাশর দেবশ্রীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত ধরে বলে, “তুমি গেলে দেবায়ন নিশ্চয় ঠিক হয়ে যাবে। তুমি চল আমাদের সাথে।”

দেবশ্রীর প্রশ্ন করার মতন কোন শক্তি ছিল না। চোখের সামনে সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসতে শুরু করে দেয়। মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে অনুপমার কোলে ঢলে পরে। পরাশর রান্না ঘর থেকে জল এনে চোখে মুখে জল ছিটিয়ে দিয়ে জ্ঞান ফেরায়। শূন্য চাহনি নিয়ে অনুপমা আর পরাশরের দিকে নিস্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকে দেবশ্রী, ওর পৃথিবী খন্ড খন্ড হয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে ওর চোখের সামনে। 

অনুপমার হাত ধরে দেবশ্রী প্রশ্ন করে, “সত্যি বল কি হয়েছে দেবুর?” 

অনুপমার জানে ও ভেঙ্গে পড়লে ওর মামনি ভেঙ্গে পরবে তাই অশ্রু রুদ্ধ কণ্ঠে অভয় দিয়ে বলে, “তুমি চল না আমাদের সাথে, তুমি গেলেই দেবায়ন ঠিক হয়ে যাবে।”

দেবশ্রী আর কথা বাড়ায় না, মেয়েটা ওকে কোথায় নিয়ে যাবে, সেটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে না। কোন রকমে একটা ব্যাগ গুছিয়ে ওদের সাথে বেড়িয়ে পরে। আসার সময়ে রাতের প্লেনে ব্যাঙ্গালোর ফিরে যাওয়ার টিকিট কাটা হয়েছিল। প্লেনে ওঠার আগেই পরাশর দিলিপ বাবুকে জানিয়ে দেয় যে ওরা দেবায়নের মাকে নিয়ে কয়েক ঘন্টার মধ্যে ব্যাঙ্গালোর পৌঁছে যাবে। ওদের নির্দেশ অনুযায়ী দিলিপ বাবু গাড়ি নিয়ে ব্যাঙ্গালোর এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করেছিলেন। এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি করে সোজা হসপিটালে নিয়ে যায় দেবশ্রীকে। একমাত্র ছেলেকে নির্জীবের মতন বিছানায় পরে থাকতে দেখে দেবশ্রীর পাথরের মূর্তি হয়ে যায়। ছলছল চোখে শুধু মাত্র অনুপমার রক্ত শূন্য বেদনা যুক্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। অনুপমা এক এক করে সবিস্তারে দেবায়নের দুর্ঘটনা মামনির সামনে তুলে ধরে। 

অনুপমার সাহস আর অনুপমার ধৈর্য শক্তি দেখে দেবশ্রী অবাক হয়ে যায়, ওকে প্রশ্ন করে, “তুই কি করে নিজেকে সামলে রেখেছিস?”

অনুপমা আর নিজেকে সামলাতে পারে না, “তোমার সামনে কি করে...” মামনিকে জড়িয়ে ধরে শেষ পর্যন্ত ভেঙ্গে পরে অনুপমা। ওর আশা ওর ভরসা ওর সব কিছু যেন জলে ভেসে যাচ্ছে বলে মনে হয়। 

পরেরদিন সকালে দিলিপ বাবু আর তাঁর স্ত্রী কণিকার তত্তাবধনে মামনি আর দেবায়নকে রেখে অনুপমা আর পরাশর আততায়ীর খোঁজে বেড়িয়ে পরে। কোলকাতা ফিরে আসার আগে দিলিপ বাবু ওদের জানিয়ে দেয় আর কোন সাহায্যের দরকার হলে যেন তাঁকে জানাতে না ভোলে। 

যাওয়ার আগে দেবশ্রীর পায়ে হাত দিয়ে সংকল্প করে অনুপমা, “আমি কথা দিচ্ছি মামনি...”

দেবশ্রী ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ছেলের কি হবে জানিনা তবে তোকে হারাতে আমি চাই না রে।”

পরাশর দেবশ্রীকে অভয় দিয়ে বলে, “আপনার ছেলেও হারাবে না আর অনুপমাও হারাবে না। দুই জনেই ভালো হয়ে ফিরে আসবে কথা দিলাম।”

প্লেনে উঠে অনুপমাকে প্রশ্ন করে পরাশর, “এই বারে কি করনীয়? কাকিমাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর ফলে তোর ওপরে আততায়ীর নজর আরো বেড়ে যাবে। যেভাবে আততায়ী জঙ্গলের পথে পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে পালিয়ে গেছে তাতে মনে হয় ওই আততায়ী এক নয় ভাড়া করা পাহাড়ি লোক না হয় অনেকদিন থেকেই দেবায়ন কে মারার ষড়যন্ত্র করেছে।”

অনুপমা ভাবতে বসে, “ঠিক বলেছিস, যে ভাবে আততায়ী সোজা রাস্তা না ধরে পাহাড়ি জঙ্গল ধরে পালিয়েছে তাতে দুটো তথ্য আমাদের সামনে আসছে। এক, আততায়ী ভাড়া করা পাহাড়ি লোক যে ওই এলাকা ভালো করে চেনে আর দ্বিতীয়, আততায়ী নিজেই ওই পাহাড়ে অনেক ঘুরে বেড়িয়েছে। কিন্তু এইভাবে ঘুরে বেড়াতে হলে আততায়ী নিশ্চয় অনেকদিন বাড়ির বাইরে কাটিয়েছে। কোলকাতা ফিরে সব থেকে আগে আমাদের এইটা দেখতে হবে কে কে কতদিন ধরে বাড়ির বাইরে কাটিয়েছে। আর তাঁর সাথে সাথে আমাদের দেখতে হবে দেবায়নকে খুন করার পেছনে আসল কি কি কারন হতে পারে। কয়েকটা কারন অবশ্য আমাদের জানা কিন্তু কয়েকটা বিষয় আমাকে নিজেই একবার খুঁজে বের করতে হবে।”


Reply
পর্ব ২৯ (#4)


এয়ার হোস্টেস এসে খাবার দিয়ে গেল, কিন্তু সেই খাবার কিছুতেই আর অনুপমার গলা দিয়ে নামতে চায় না। ওর মন পরে থাকে ব্যাঙ্গালোরে, ওর দেবায়নের পাশে আর ওর মামনির পাশে। কোলকাতা ফিরে নিজের বাড়িতে না দেবায়নের বাড়িতে, কোথায় উঠবে সেটা এখন ঠিক করে উঠতে পারেনি। চুপচাপ বসে খাবার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে উদাস চাহনি নিয়ে বাইরের কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

পরাশর ওর মনের অস্থিরতা বুঝতে পেরে ওকে বলে, “এই ভাবে খাওয়া দাওয়া যদি ছেড়ে দিস তাহলে কি হবে বল। কোথায় যাবি কিছু ঠিক করলি? এখন পর্যন্ত কাউকে জানানো হয়নি যে আমরা কোলকাতা ফিরছি।”

শূন্য চোখে পরাশরের দিকে তাকিয়ে কাতর কণ্ঠে প্রশ্ন করে অনুপমা, “হ্যাঁ রে, দেবায়ন ঠিক হয়ে যাবে’ত?”

পরাশর ওর হাতের ওপরে হাত রেখে শক্তি দিয়ে বলে, “হ্যাঁ ঠিক হয়ে যাবে। এক কাজ কর, আজকে আমার বাড়িতে চল। কাল সকালে দেখা যাবে কি করা যায়।” কিছুক্ষণ থেমে কিছু চিন্তা করে ওকে বলে, “আমি বলছিলাম যে...” অনুপমা ওর দিকে হাজার প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকে। পরাশর ওকে বলে, “কোন নিরপেক্ষ কাউকে দিয়ে তদন্ত করালে ভালো হয়, মানে কাকুকে বলে। আমরা এমনিতে এফ.আই.আর করে এসেছি। এইবারে ক্রাইম ব্রাঞ্চ অনায়াসে সেই তদন্তের ভার নিতে পারবে।”

কঠিন কণ্ঠে অনুপমা জানায়, “না, আমি একাই খুনিকে শাস্তি দেব।”

পরাশর ওকে বলে, “এতে অনেক ঝুঁকি আছে অনু। হিতে বিপরিত হতে পারে। আর সব থেকে বড় ব্যাপার, আমরা হয়ত এমন আসল লোককে এড়িয়ে যেতে পারি। হয়ত আততায়ী আমাদের খুব কাছের মানুষ যার ওপরে আমাদের সন্দেহ একদম হচ্ছে না।”

অনুপমা প্রশ্ন করে, “কি বলতে চাইছিস একটু খুলে বল।”

পরাশর উত্তরে বলে, “না মানে, এই দেখ। দেবায়ন কার পথ থেকে সরে গেলে সে বেশি লাভবান হবে।”

“বাবা” বলতে গিয়েও থেমে গেল অনুপমা, উল্টে প্রশ্ন করে, “কেন, ওকে সরাবার উদ্দেশ্য অনেকের থাকতে পারে। এই যেমন, ধৃতিমান, সূর্য, ইন্দ্রনীল, অনিমেশ, রজত পানিক্কর এরা।”

পরাশর ঠোঁটের কোনে বাঁকা হেসে বলে, “আরো একজন হতে পারে, রূপক আর শ্রেয়া।”

অনুপমা আঁতকে ওঠে, “না না, ওরা কখনই হতে পারে না। শ্রেয়া আমার সব থেকে ভালো বান্ধবী আমার জন্য অনেক করেছে।” 

পরাশর ওকে বলে, “জানি, কিন্তু সেটা একটা গভীর ষড়যন্ত্রের একটা চাল হতে পারে। একটু ভালো ভাবে চিন্তা করে দেখ। এই খাটলিং গ্লেসিয়ার যাওয়ার পরিকল্পনা কার? রুপকের। আর কি কেউ জানত যে আমরা খাটলিং গ্লেসিয়ার যাচ্ছি? হয়ত নয়।” মাথা নাড়ায় অনুপমা, সত্যি, ওদের এই ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপারে শুধু মাত্র ওর বাবা আর রূপক জানে। অন্য কেউ হয়ত জানেই না এই বিষয়ে। পরাশর আরো বলে, “কে সব থেকে বেশি লাভবান হল? রূপক আর শ্রেয়া। একটু ভালো ভাবে চিন্তা কর। তুই আসার আগে ওদের হাতে কোম্পানির ভার তুলে দিয়ে এলি। দেবায়ন না ফিরলে তোর কি হত সেটা অবশ্য জানা নেই। পায়েল প্রচন্ড শান্ত প্রকৃতির মেয়ে হয়ে গেছে আর অঙ্কন অনেক ছোট। ওদের অতি সহজে হাত করে নিতে পারবে রূপক আর শ্রেয়া। যদি বলি, ওরা এটাই চেয়েছিল?” 

বাকশুন্য হয়ে যায় অনুপমা, এত গভীর দুরাভিসন্ধি করবে ওর বিরুদ্ধে? অনুপমা মাথা ঝাঁকায়, “না না, এটা হতে পারে না। শ্রেয়া আমার সাথে এত বড় প্রতারনা করতে পারে না। কিন্তু দেবায়নের দুর্ঘটনার সময়ে, রূপক আর শ্রেয়া আমাদের সাথেই ছিল। ওদের চেহারা...”

পরাশর ওকে বলে, “আমি বলছি না যে এটাই হয়েছে, তবে এটা হতে পারে। সুতরাং সর্ব প্রথম ওদের ওপরে আমাদের খুব কড়া নজর রাখতে হবে। নিজে হাতে করেনি তবে টাকা দিয়ে ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে এই কাজ অনায়াসে করা যেতে পারে।”

অনুপমা চিন্তায় পরে যায়, “তাহলে কাকে বিশ্বাস করব, বল?”

পরাশর স্মিত হেসে উত্তর দেয়, “কাউকে নয়, এমন কি আমাকেও নয়।” ওর কাঁধে আলতো ধাক্কা মেরে ইয়ার্কির সুরে বলে, “দেবায়ন সরে গেলে আমার বড় লাভ হত, তোকে একা পেয়ে একটু প্রেম করতে পারতাম।”

অনুপমার চোখে অনেকদিন পরে খানিক হাসির ঝিলিক দেখা দেয়। পরাশরের কাঁধে আলতো ধাক্কা মেরে বলে, “হ্যাঁ, আর বলিস না তুই শয়তান ছেলে...”

অনেকদিন পরে অনুপমার চেহারায় হাসি দেখে পরাশরের বেশ ভালো লাগে, ওর হাতের ওপরে হাত রেখে মনে সাহস দিয়ে বলে, “এই হাসিটাকে আর লুকাস না প্লিস, দেবু বড় কষ্ট পাবে।”

চোখ জোড়া ছলকে ওঠে অনুপমার, “বলছিস? কিন্তু কোলকাতা নামলে আমাদের চেহারার অভিব্যাক্তি একদম বদলে ফেলতে হবে। দেবায়ন যে নেই এটা সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে।”

পরাশর স্মিত হেসে বলে, “এই হাসি ভেতরে রাখ সেটাই অনেক কাজে দেবে। মন মরা হয়ে থাকলে উৎসাহ খুঁজে পাবি না।”

কোলকাতা নেমেই ব্যাঙ্গালোরে ফোন করে দেবশ্রীকে জানিয়ে দেয় ওরা ঠিক ভাবে পৌঁছে গেছে, সেই সাথে দেবায়নের বিষয়ে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে এখন ওর শারীরিক অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। ডাক্তারেরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তবে... বাকিটা আর শুনতে ইচ্ছে হল না অনুপমার। ওইদিকে মামনির ভাঙ্গা কণ্ঠ এদিকে ওর ভগ্ন হৃদয়। অনুপমা ঠিক করে রাতে দেবায়নের বাড়িতে কাটাবে। দেবায়ন না থাকুক, ওর বিছানায় শুয়ে ওর জামা পরে ওর ছোঁয়া গায়দে মেখে এক রাতের জন্য দেবায়নের শরীরের পুরাতন ঘ্রাণ নিতে চায়।

দেবায়নের বাড়ির দরজা খুলে ফাঁকা ঘর দেখে অনুপমার হৃদয় হুহু করে কেঁদে ওঠে, কিন্তু নিজেকে শক্ত করে নেয় অনুপমা। আলো জ্বালিয়ে দেবায়নের ঘরে ঢুকে ওর জামা পরে চুপচাপ ওর বিছানার ওপরে শুয়ে ভাবতে বসে। সত্যি কি শ্রেয়া আর রূপকের চাল এটা না বাবার কোন ষড়যন্ত্র। দেবায়ন সরে গেলে শ্রেয়া আর রূপক সব থেকে বেশি লাভবান হবে অথবা হয়েছে। বাবাও প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে দেবায়নকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পারে। ওরা যে খাটলিং যাবে এই কথা শুধু মাত্র বাবার আর রূপকের পক্ষেই জানা সম্ভব। কিন্তু বাবা কি শুধু প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে দেবায়নকে সরিয়েছে না এর পেছনে আরো কোন গভীর কারন আছে? হয়ত বাবার কোন গোপন কথা দেবায়ন জেনে ফেলেছে আর তাই হয়ত বাবাকে ব্লাকমেল করেছে দেবায়ন যার ফলে ওর বাবা দেবায়নকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছে। কিন্তু যদি দেবায়ন ওর বাবাকে ব্লাক মেল করে থাকে তাহলে তার পরিবর্তে কি চেয়েছে? টাকা পয়সা, সম্পত্তি? দেবায়নের দুটো ব্যাংক একাউন্ট আছে যার মধ্যে একটা দেবায়নের নিজের। ল্যাপটপ খুলে সেই একাউন্ট চেক করে দেখে তাতে এমন কিছু টাকা নেই অথবা টাকার লেনদেন হয়নি। দ্বিতীয় ব্যাঙ্ক একাউন্ট ওর সাথে জয়েন্ট, সেই ব্যাঙ্ক একাউন্ট বেশির ভাগ সময়ে নিজেই চালায়। দেবায়নের টাকার দরকার পড়লে ওর কাছ থেকে চেয়ে নেয়। তাহলে কি সম্পত্তি চেয়েছে দেবায়ন? এতটা নীচ কাজ কি দেবায়ন করবে? ভাবতেই ওর শরীর ঘৃণায় শিউরে ওঠে। না, এতটা নীচ দেবায়ন হয়ত হবে না। আসল কারন জানতে হলে বাবার ওপরে আর রূপকের ওপরে কড়া নজর রাখা দরকার। 

সারাটা রাত দুই চোখের পাতা এক করতে পারে না অনুপমা, ওর মাথা আর কাজ করছে না। আলমারি খুলে কাগজ পত্র ঘেঁটে দেখে যদি কিছু তথ্য পাওয়া যায় এই সম্পত্তির বিষয়ে। কাগজ পত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে হটাত একটা ফাইলে ওর নজর পরে যায়। হলদে ফাইল, ওপরে লেখা “অফিস ওয়ার্কস” ভেতরে অজস্র কাগজ পত্র। ফাইল হাতে নিয়ে বিছানায় ছড়িয়ে বসে পরে। কাগজ গুলো সব ব্যাবসা সংক্রান্ত। একটা কাগজ হাতে নিয়ে অবাক হয়ে যায়। পুনের হোটেলের কাগজ। রজত পানিক্করের দুটো হোটেলের মালিকানার কাগজের জেরক্স। বহুদিন আগে মেহেকের সাহায্যে একটা হোটেল দেবায়ন হাতিয়ে নিয়েছিল কিন্তু তারপরে আরো একটা হোটেল কি ভাবে করায়ত্ত করেছে সেই খবর জানার জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে। হতে পারে সেই প্রতিশোধে রজত পানিক্কর দেবায়নকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে। বাবাকে জিজ্ঞেস করলে এর সদুত্তর পাওয়া যাবে, কিন্তু বাবাও সন্দেহের ঘেরে রয়েছে। 

কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করার পরে অনুপমা ঠিক করে একবার নিজের পরিচয় দিয়ে হোটেলে ফোন করবে। হোটেলের রিসেপসানে ফোন করে ম্যনেজারের সাথে কথা বলে অনুপমা জানতে পারে যে রজত পানিক্কর দুই মাস আগেই দেহ রক্ষা করেছেন। তাঁর দুই ছেলে রজত পানিক্করের দুটো হোটেল মিস্টার সোমেশ সেন কে বিক্রি করে দেন। এই খবর ওর জানা ছিল না, দেবায়ন অথবা ওর বাবা ব্যাবসার বেশির ভাগ খবর ওকে জানায় না। ওর সন্দেহের তালিকা থেকে রজত পানিক্করকে বাদ দিতে হয়। 

কাগজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে আরো একটা কাগজ উদ্ধার করে। ওদের কস্ট্রাক্সান কোম্পানির একটা ইনিসিয়াল ড্রাফট। কাগজ খানা পড়ার পরে আরো বেশি আশ্চর্য হয়ে যায়। নিবেদিতার কন্সট্রাক্সান কোম্পানির সাথে ওদের কন্সট্রাক্সান কোম্পানি মিলিত হয়ে একটা কোম্পানি হয়ে যাবে, এবং সেই কোম্পানির কর্ণধার স্বয়ং নিবেদিতা। যদিও ওই কোম্পানি ওদের গ্রুপ কোম্পানির অধীনে থাকবে কিন্তু সিংহ ভাগ মালিকানা, সত্তর শতাংশের মালিকানা নিবেদিতার হাতে। হটাত দেবায়ন নিবেদিতার ওপরে এতটা সহৃদয় কেন? ওর পেছনে কি নিবেদিতার সাথে দেবায়নের কোন গোপন সম্পর্ক গঠন হয়েছে? দুই কম্পানিকে মিলিত করার আসল চিন্তা ধারা কি নিবেদিতার না দেবায়নের? ওর বাবা কি আদৌ জানেন এই বিষয়ে? হয়ত এই বিষয়ে জেনে গেছেন ওর বাবা আর সেই জন্যেই দেবায়নকে সরিয়ে দিয়েছে। বহু প্রশ্ন ওর মাথার মধ্যে ভর করে আসে, কিন্তু সঠিক উত্তর কিছুতেই খুঁজে পায় না। দেবায়নের এই পরিনতির পেছনে কি আসলে দেবায়ন নিজেই দায়ী? ওর পুচ্চু কি সত্যি এক খলনায়ক? উত্তর গুলো ওকে জানতে হবেই। 

সকাল বেলা পরাশরের ফোনে ওর ঘুম ভাঙ্গে। অনেক দেরি করে ঘুমিয়েছিল, তাই ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে যায়। পরাশর জানায় গত রাতে কাকুর সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। ওর কাকা একবার অনুপমার সাথে দেখা করতে চায়। অনুপমা জানিয়ে দেয়, বিকেলের দিকে দেখা করবে। এখন নিজের বাড়িতে যেতে চায়। নিজের ব্যাগ গুছিয়ে, ব্যাঙ্গালোর ফোন করে মামনি আর দেবায়নের খবর নিয়ে নেয়। তারপরে বাড়িতে প্রথমে মাকে ফোন করে।

পারমিতা ওর ফোন পেয়েই প্রশ্ন করে, “এতদিন একটা খবর নেই। পরাশরকে ফোন করলে ঠিকঠাক উত্তর পাওয়া যায়না, তুই আমাদের কি ভেবেছিস? আমরা কি তোর পর যে আমাদের ফোন উঠাস না?”

মায়ের এই উদ্বেগজনিত কণ্ঠস্বরকে ক্ষান্ত করে উত্তর দেয়, “পর নয়, তবে...” মনে পরে যায়, কেউ জানে না দেবায়নের বিষয়ে সুতরাং সেই বেদনা ভাঙ্গা হৃদয় সবার সামনে প্রস্তুত করতে হবে। ধরা গলায় বলে, “মা ... ওকে...”

পারমিতা আশঙ্কা ব্যাক্ত করে প্রশ্ন করে, “কি হয়েছে? তুই কোথায়? দেবায়ন...”

অনুপমা বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলে, “না খুঁজে পাইনি। আমি এয়ারপোর্টে, একটু পরেই বাড়ি আসছি।”

পারমিতা মেয়েকে কি সান্ত্বনা দেবে ভেবে পায়না, “আচ্ছা... আয়... মনে হয় এটা আমাদের অদৃষ্টে ছিল, হয়ত আমাদে পাপের ফল যে ছেলেটা এইভাবে চলে গেল।”

দাঁতে দাঁত পিষে নিজের মনের ভাব সংবরণ করে নেয় অনুপমা, কার পাপের ফল জানা নেই তবে যদি বাবা অথবা রূপক দোষী হয় তাহলে ওর অনুপমা মরেও শান্তি পাবে না। তবে এই দুইজনার দিকে আঙ্গুল তোলার আগে ভালো ভাবে খুঁটিয়ে বিচার করে দেখতে হবে। 

সকালের দিকেই ট্যাক্সি ধরে সোজা বাড়ি পৌঁছায় অনুপমা। ওকে দেখে পারমিতা, পায়েল অঙ্কন সবাই দৌড়ে আসে। ওর বাবা সেদিন আর অফিসে যায়না। মেয়েকে এই ভাবে ভেঙ্গে যেতে দেখে পারমিতার বুক ফেটে যায়। অনুপমা কি করবে ভেবে পায় না। বাবার চেহারায় কঠিন চিন্তার ছাপ, মেয়ের এই অভাবনীয় কষ্ট দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করে। মনের এক কোনায় প্রশ্ন জাগে, বাবাও কি ওর মতন মুখোশ এঁটে না সত্যি মেয়ের জন্য চিন্তিত। 
সবাই ওকে চেপে ধরে জানার জন্য। অনুপমা মিথ্যে গল্প বানিয়ে ওদের জানায় ঘুট্টুতে, ঘনসিয়ালিতে বিভিন্ন জায়গায় অনেক খুঁজেছে, এমন কি রেপ্লিং করে খাদের মধ্যে নেমে নদীর দুই পাড়ে অনেকদিন ধরে তল্লাসি করেও দেবায়নের সন্ধান পাওয়া যায়নি, এমন কি আততায়ীর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে ঘনসিয়ালির পুলিসের কাছে এফ.আই.আর করা আছে, পুলিস আস্বাস দিয়েছে যে সেই ছেলেটার খোঁজ পেলে ওদের খবর দেবে। 

এই গল্প বলার সময়ে বারেবারে ওর সাথে পায়েলের চোখাচুখি হয়ে যাচ্ছিল। মনে হয় পায়েল কিছু বলতে চায় অথবা পায়েল হয়ত ওর মিথ্যে গল্প ধরে ফেলেছে। শ্রেয়া যে ইন্দ্রনীলের সাথে ছলনার খেলা খেলেছিল সেটা পায়েল জানত কিন্তু ওকে বলেনি, হতেও পারে এইবারে পায়েল অনেক কিছু জানে কিন্তু ওকে বলার কিছু সময় পায়নি। বাবা, মাকে সব ঘটনা বলার পরে পায়েল কে নিয়ে নিজের ঘরে চলে আসে অনুপমা। ওকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়েই পায়েল ওকে জড়িয়ে ধরে দুঃখ প্রকাশ করে কেঁদে ফেলে। অনুপমা কাকে সান্ত্বনা দেবে ঠিক করে উঠতে পারে না, পায়েল কে সত্যি বলবে কি না সেটাও ভেবে উঠতে পারে না। 

পায়েল ওকে বলে, “তুই চলে যাওয়ার পর থেকে শ্রেয়া আর রূপক বসে নেই জানিস।”

আবার ওর অবাক হওয়ার পালা, প্রশ্ন করে অনুপমা, “মানে?”

পায়েল উত্তর দেয়, “তুই ঘুট্টু চলে গেলি, আর শ্রেয়া আর রূপক সোজা জলপাইগুড়ি গিয়েছিল সূর্যের খবর নেওয়ার জন্য।”

অনুপমা মাথায় হাত দিয়ে বসে পরে, “এত কিছু করেছে ওরা?”

পায়েল আরো জানায়, “জলপাইগুড়িতে ওদের না পেয়ে আশে পাশের লোক জনের কাছ থেকে খব যোগাড় করে জানতে পারে যে সূর্য আর মনিদিপা কোলকাতা চলে এসেছে। তারপরে শ্রেয়া আর রূপক দুইজনে সূর্যের বাড়ি যায়। তুই নাকি কয়েকদিন আগে ওদের টাকা দিয়েছিলি?” বুক ভরে শ্বাস নেয় অনুপমা, “হ্যাঁ।” পায়েল ওকে বলে, “রূপকের রুদ্র মূর্তি দেখে সূর্যের অবস্থা খারাপ।”

অবাক অনুপমা ওকে জিজ্ঞেস করে, “সূর্যের সাথে আর কি করেছে ওরা?”

পায়েল মাথা নাড়ায়, “না না, মারপিট এই সবে যায়নি, শুধু মাত্র খুঁটিনাটি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কবে কোথায় ছিল, ইত্যাদি। তবে ওরা দেবায়নকে মারেনি ওদের সেই ক্ষমতা নেই। সূর্যের পরে রূপকের সন্দেহ ইন্দ্রনীল আর ওর বাবার ওপরে পরে। টালিগঞ্জে ওদের ফ্লাটে গিয়ে দেখে মিস্টার অনিমেশ শ্রেয়ার ওই ঘটনার পরে ফ্লাট বিক্রি করে জার্মানি চলে গেছে। সত্যি মিথ্যে যাচাইয়ের জন্য শ্রেয়া সঙ্গে সঙ্গে মিস্টার হেরজোগকে ফোন করে। মিস্টার হেরজোগকে শ্রেয়া সবিস্তারে সব কিছু খুলে বলে। মিস্টার হেরজোগ খবর লাগিয়ে ওদের জানায় যে ইন্দ্রনীল স্থায়ী ভাবে লন্ডনে চলে গেছে আর ওর বাবা মিস্টার অনিমেশ আবার ব্যাঙ্কে চাকরি করছে।”

অনুপমা শূন্য চাহনি নিয়ে পায়েলের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতদিন ধরে যাদের যাদের সন্দেহের তালিকাভুক্ত করেছিল তাদের সবাই সন্দেহের ঘের থেকে পার পেয়ে গেল। নিজের বান্ধবী শ্রেয়া, ওর সন্দেহের তালিকা থেকে মুক্তি পায়নি। শ্রেয়া আর রূপককে ওর বিষয়ে এতটা চিন্তিত জানতে পেরে ওর দুই চোখ ছলছল করে ওঠে। বাকি থাকে শুধু মাত্র একটা প্রশ্নের উত্তর। আততায়ী কি তাহলে আসলে ওর বাবা? 


Reply
পর্ব ২৯ (#5)



অনুপমার চিন্তার গতিতে বাধা প্রাপ্তি হয় পায়েলের হাতের ছোঁয়ায়, “কোথায় হারিয়ে গেলিরে? খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি রে। আমারো খুব দুঃখ লাগছে, কিন্তু কি করতে পারি বল। পুলিস কি কিছু করছে?”

অনুপমা ছলছল চোখে পায়েলের দিকে তাকিয়ে থাকে, একে কি দেবায়নের বিষয়ে বলা ঠিক হবে? শ্রেয়া আর রূপকের ওপরে সন্দেহ করেছে ভেবেই মনের ভেতরে কুণ্ঠাবোধ জেগে ওঠে। মন পরে থাকে নির্জীব শায়িত দেবায়নের পাশে। চোখ মুছে বহু কষ্টে হাসি টেনে বলে, “না রে, হারিয়ে যায়নি আমি। তোর সাথে একটু গোপন কথা আছে। ভাই ছাড়া আর কাউকে বলসি না যেন।” পায়েল অধীর চিত্তে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। অনুপমা বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ধরা গলায় বলে, “পুচ্চুকে খুঁজে পেয়েছি।” 

কথাটা কানে যেতেই দুই চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে পায়েলের, অধীর কণ্ঠে প্রশ্ন করে, “কোথায় কেমন আছে, আমাকে এখুনি নিয়ে চল আমি ওকে দেখতে চাই।”

নির্জীব দেবায়নের মুখ মনে পড়তেই কেঁদে ফেলে অনুপমা, “কোমায় চলে গেছে রে আমার পুচ্চু...”

আঁতকে ওঠে পায়েল, “না...” বলেই ওকে জড়িয়ে ধরে।

ধীরে ধীরে এক এক করে সব ঘটনা ব্যাক্ত করে পায়েলের কাছে। পায়েল ওকে প্রবোধ দেয় যে একদিন দেবায়ন ঠিক হয়ে ওর কাছে ফিরে আসবে। এই প্রবোধ নিশ্চিত কিনা জানা নেই তাও বান্ধবীর মুখে সান্ত্বনা বাক্য শুনে অনুপমার মনে কিঞ্চিত আশার সঞ্চার হয়। শ্রেয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে, পায়েল জানায়, অনুপমার নির্দেশ মতন ওদের দেখাশোনার ভার শ্রেয়া করে। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে বাড়িতে এসে পায়েলকে সঙ্গে নিয়েই অফিসে যায়। নিজেকে অনুপমার স্থানে বসাতে চেষ্টা করেনি অবশ্য কিন্তু বেশ ভালো ভাবেই অফিস আর পায়েল অঙ্কনকে সামলে রেখেছে। 

রোজদিনের মতন একটু পরেই শ্রেয়া ওদের বাড়িতে আসে। অনুপমাকে দেখে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, “কিরে তুই এলি আর আমাদের খবর পর্যন্ত দিলি না? কি হয়েছে? কেমন আছিস? দেবুকে খুঁজে পেলি?”

ঝড়ের মতন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে অনুপমা উত্তরের খেই হারিয়ে ফেলে। শ্রেয়ার ওপরে অহেতুক সন্দেহ করেছিল ভাবতেই ওর চোখে জল চলে আসে। কোনরকমে নিজেকে সামলে শেষ পর্যন্ত দেবায়নের বিষয়ে বিস্তারে সব কথা জানায়। সব কিছু শোনার পরে শ্রেয়াও পায়েলের মতন অধৈর্য হয়ে ওঠে ব্যাঙ্গালোর যাওয়ার জন্য। অনুপমা জানায় এখন ওর কোলকাতায় কিছু কাজ বাকি আছে। ওরা জানতে চাইলে সত্য লুকিয়ে জানায় যে ধৃতিমানের বিষয়ে বিস্তারে খোঁজ নিতে চায়। এখুনি সবাই মিলে ব্যাঙ্গালোর গিয়ে কিছুই করার নেই। পায়েল আর শ্রেয়াকে অফিসে চলে যেতে বলে। 

পায়েল আর শ্রেয়া অফিসে বেড়িয়ে যাওয়ার পরে অনুপমা ব্যাগ খুলে দেবায়নের বাড়ি থেকে আনা ফাইল খুলে বসে পরে। কন্সট্রাক্সান কোম্পানির কাগজ খানা বারেবারে পড়ে দেখে। এই কাগজের মধ্যে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে। এই কাগজের আসল অর্থ বের করতে পারলে দেবায়নের আসল উদ্দেশ্য অথবা খুনির আসল উদ্দেশ্য হয়ত জানা যাবে। দেবায়ন বিশেষ কিছুই জানায়নি নিবেদিতার সম্পর্কে। যদিও ওর বাবার সাথে নিবেদিতার অনেকদিনের পরিচয় কিন্তু কোনোদিন ওদের পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিল না নিবেদিতার। আর তার আসল কারন, মায়ের আর নিবেদিতার মনোমালিন্য। কি কারনে এই মনোমালিন্য, আর কি কারনে বাবার সাথে এত সুহৃদ সম্পর্ক। নিবেদিতার বিষয়ে বিস্তারে জানা দরকার। নিবেদিতার বিয়ে চোদ্দ বছর আগে একজন এন.আর.আই ইয়ের সাথে হয়েছিল, বিয়ের এক বছরের মধ্যেই ওদের ডিভোর্স হয়ে যায়। নিবেদিতার ছেলে, অঙ্কুশের জন্ম ডিভোর্সের এক দেড় বছর পরে হয়। অঙ্কুশের পিতার পরিচয় অনুপমার অজানা, হয়ত এই পৃথিবীর অজানা। কোন গুপ্ত প্রেমের ফল স্বরূপ অঙ্কুশের জন্ম। হয়ত দেবায়ন এই বিষয়ে জেনে গিয়েছিল আর নিবেদিতাকে ব্লাক মেল করেছে। তাই কি নিবেদিতা ওকে সরিয়ে দিয়েছে? কিন্তু কোম্পানির কাগজ অন্য কথা বলছে। এই কাগজ অনুযায়ী, দুটি কন্সট্রাক্সান কোম্পানি মিলিত করে একটা বড় কোম্পানির মালিক হতে চলেছে নিবেদিতা। কিন্তু কন্সট্রাক্সান কোম্পানি মালিকানা নিবেদিতার নামে তাহলে দেবায়নের কি লাভ এইখানে? 

ভাবতে ভাবতে হটাত মাথায় ঝিলিক খেলে যায় অনুপমার। অঙ্কুশ অবিকল ভাইয়ের ছোট বেলার মতন দেখতে, ঠিক সেই নাক সেই রকম কোঁকড়ানো চুল, গাল দুটো টোপাটোপা আর চেহারায় বুদ্ধিদীপ্তের ছটা। বাবার সাথে নিবেদিতার বেশ ভালো সম্পর্ক। অঙ্ক মেলাতে অসুবিধে হয় না। অঙ্কুশের পিতার সম্বন্ধে জানা দরকার। এই উত্তর পেয়ে গেলে ওর কাছে অনেক কিছুর উত্তর পাওয়া যাবে।

মা নিবেদিতাকে দেখতে পারে না। মানুষ বন্ধুর চেয়ে শত্রুর খবর বেশি রাখে। নিবেদিতার সম্বন্ধে মায়ের কাছ থেকে হয়ত অনেক কিছু জানা যেতে পারে ভেবেই অনুপমা কাগজ হাতে পারমিতার কাছে যায়।

পারমিতার ঘরে ঢুকে অনুপমা মাকে জিজ্ঞেস করে, “তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।”

মেয়েকে ওইভাবে বিদ্ধস্ত রূপে ঘরে ঢুকতে দেখে পারমিতা প্রশ্ন করে, “হ্যাঁ, বল কি হয়েছে?”

অনুপমা একটু খানি থেমে জিজ্ঞেস করে, “নিবেদিতার সম্বন্ধে কিছু জানার ছিল। তোমার সাথে নিবেদিতার কেন বনিবনা হয়না, তার কারন কি জানতে পারি?”

পারমিতা মেয়ের এই প্রশ্ন শুনে তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েকে জরিপ করে উত্তর দেয়, “হটাত নিবেদিতার সম্বন্ধে প্রশ্ন করছিস কেন? নিবেদিতার ওপরে কি তোর সন্দেহ হচ্ছে নাকি?” একটু থেমে, ওকে বসতে বলে, “দেখ অনু, পায়েলের কাছ থেকে এই দুর্ঘটনার ব্যাপারে আমি সব শুনেছি। আমি জানিনা আততায়ী কে। কিন্তু আর যাই হোক নিবেদিতা এই কাজ করতে পারে না ও সেই রকমের মেয়ে নয়।”

অনুপমা মাথা নাড়ায়, “না মা, আমি শুধু জানতে চাইছিলাম বাবার সাথে নিবেদিতার বেশ ভালো সম্পর্ক কিন্তু তোমার সাথে নিবেদিতার কেন বনে না?”

পারমিতা বুক ভরে শ্বাস নিয়ে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, নিবেদিতার সাথে কোনোদিন আমার সুহৃদ সম্পর্ক ছিল না। তোকে শুরু থেকে বলি তাহলে। শ্বশুর মশায় মানে তোর ঠাকুরদা বেঁচে থাকার সময় থেকেই নিবেদিতার বাবা, মিস্টার চৌধুরী আর তোর জেঠু, রাজেশ এই কোম্পানি চালাত। তারপরে এই কন্সট্রাক্সান কোম্পানি সম্পূর্ণ রূপে আমার হাতে চলে আসে। কি ভাবে আসে সেটা তোর অজানা নয়।” কথাটা বলার সময়ে কুণ্ঠাবোধে পারমিতার গলার স্বর ক্ষীণ হয়ে যায়। একটু থেমে আবার বলতে শুরু করে, “ততদিনে নিবেদিতার বিয়ে হয়ে গেছে। তারপরে নিবেদিতার বাবার হার্ট এটাক হয়। তারপরে নিবেদিতার ডিভোর্স আর নিবেদিতা কোলকাতা ফিরে এসে কোম্পানির ভার সামলায়। আমার মাথায় এই ব্যাবসার প্যাঁচ কলাকৌশল কোনোদিন ঢুকত না তাই আমি বিশেষ কোনোদিন অফিসে যেতাম না। আমার কাজ ছিল অন্য, ক্লায়েন্ট ধরার জন্য আমি কি করতাম সেটাও তোর অবিদিত নয়। তোর বাবা নিজের অফিস আর এই কন্সট্রাক্সান কোম্পানি নিয়েই পরে থাকত। তবে তোর বাবার চেয়ে নিবেদিতা নিজের ঘাড়ে পুরো কন্সট্রাক্সান কোম্পানির তত্তাবধনের ভার তুলে নেয়। এত কিছু করার পরেও ওর অংশ খুব কম ছিল আর সেই নিয়ে অখুশি ছিল। মাস গেলে আমার একাউন্টে মোটা টাকা আর তার তুলনায় যে সব কাজ করে তার একাউন্টে আমার চেয়ে অনেক কম টাকা। আমি অফিসে গেলেই আমার থেকে দূরে থাকত, আমার দিকে এক ঘৃণ্য দৃষ্টিতে তাকাত। এই নিয়ে অবশ্য আমাদের মধ্যে কোনোদিন কোন বচসা হয়নি কিন্তু নিবেদিতা আমাকে দেখতে পারত না। আমি অফিসের মালিক হয়েও কর্মচারীদের মধ্যে আমার বিশেষ কোন স্থান ছিল না। ওর এই নাক উঁচু ভাব, অফিসে সবাই ওকে সমীহ করে, সেই হিংসা, এইসব আমি সহ্য করতে পারতাম না। তবে নিবেদিতা খুব কর্মঠ মেয়ে, মার্জিত কিন্তু কঠোর, সুনিপুণ দক্ষতায় কোম্পানি দাঁড় করিয়েছে।”

মায়ের মুখে নিবেদিতার স্তুতি শুনতে পাবে সেটা অনুপমার পক্ষে আশাতীত ছিল। ভেবেছিল হয়ত মা, নিবেদিতাকে সন্দেহের চোখে দেখবে, কিন্তু নিবেদিতার চরিত্রে কোন খুঁত ওর মা ওকে জানাতে পারল না। সব শুনে অনুপমা একটু চিন্তায় পরে যায়, “হুম, বুঝলাম সব কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে যার উত্তর পাচ্ছি না। নিবেদিতার বিয়ে হয়েছিল আজ থেকে চোদ্দ বছর আগে, বিয়ের এক বছরের মধ্যেই ওর ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল, তাই না?” পারমিতা মাথা দোলায়, “হ্যাঁ।” অনুপমা জিজ্ঞেস করে, “ডিভোর্সের এক থেকে দেড় বছর পরে অঙ্কুশের জন্ম। অঙ্কুশের পিতা কে, সেই নিয়ে তোমার মনে কোনোদিন প্রশ্ন জাগেনি?”

পারমিতার চেহারা হটাত করে ফ্যাকাসে হয়ে যায়, গলা শুকিয়ে আসে। বার কতক ঢোঁক গিলে মেয়েকে প্রশ্ন করে, “হটাত এই নিয়ে প্রশ্ন করলি কেন? কি জানিস তুই?” 

মায়ের চেহারার এই ফ্যাকাসে রঙ অনুপমার তীক্ষ্ণ চাহনি এড়াতে পারে না। মায়ের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি জানো, অঙ্কুশের বাবা কে?”

পারমিতা কঠিন ভাবে অনুপমার দিকে তাকিয়ে উল্টে প্রশ্ন করে, “এই খবর তোর জেনে কি লাভ? অঙ্কুশের পিতার পরিচয়ের সাথে দেবায়নের এই দুর্ঘটনার কি সম্পর্ক?”

পারমিতার চোখের এই কঠোর চাহনির পেছনে অনেক কিছু লুকিয়ে। এর উত্তর জানার জন্য ওকে শেষ পর্যন্ত কোম্পানির কাগজ বের করতে হয়। কোম্পানির কাগজ হাতে নিয়েই পারমিতা রুদ্ধশ্বাসে অনুপমার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ জোড়া ছলকে ওঠে পারমিতার, অস্ফুট কণ্ঠে ওকে জিজ্ঞেস করে, “এই কাগজ কোথা থেকে পেয়েছিস তুই?”

অনুপমা মায়ের হাতের ওপরে হাত রেখে প্রশ্ন করে, “আমি শুধু এর উত্তর জানতে চাই মা। আততায়ী যেই হোক কিন্তু এই কাগজ পড়ার পরে আমার মনে একটা সন্দেহ হয়েছে। কে আসল দোষী। এই দেবায়ন কি আসলে আমার ভালোবাসার পুচ্চু নয়?”

পারমিতা মুখে হাত চাপা দিয়ে অস্ফুট আঁতকে ওঠে, “না, হ্যান্ডসামের মতন ছেলে হয় না। তোর পুচ্চু তোকে প্রচন্ড ভালোবাসে রে অনু।” ওর দেবায়ন যে ওকে খুব ভালোবাসে সেটা জানে কিন্তু সেই কথা মায়ের মুখ থেকে শোনার পরে ওর চোখ জোড়া ভেসে যায়। পারমিতা মেয়ের মুখ আঁজলা করে ধরে মনে শক্তি জুগিয়ে বলে, “হ্যান্ডসাম ওর বিশাল হাতের মাঝে সবাইকে আগলে রাখতে চায়। সবাইকে মানে, তোকে, আমাকে, তোর বাবাকে পায়েল অঙ্কন সব্বাইকে। কোন কিছু ভেঙ্গে যাক সেটা কিছুতেই হ্যান্ডসাম চায় না। এই সম্পর্কের সম্বন্ধে আর এই কাগজের ব্যাপারে কিছু নাই বা জানলি।”

মায়ের চোখের জল দেখে অনুপমার বুঝতে দেরি হয় না, অঙ্কুশ কেন অবিকল ওর ভাইয়ের মতন দেখতে। মায়ের হাত ধরে প্রশ্ন করে, “তাহলে তুমি জানতে আগে থেকে?”

সম্মতি জানিয়ে মৃদু মাথা দোলায় পারমিতা, “হ্যাঁ, আমি সব জানি তবে আগে জানতাম না। দেবায়ন কি ভাবে যেন এই সব কিছু জেনে গিয়েছিল আর সেই আমাকে বুঝিয়ে বলে। প্রথমে খুব দুঃখ পেয়েছিলাম কিন্তু হ্যান্ডসামের কথা শুনে মনে হল, ভালো কি শুধু একটা মাত্র মানুষ কেই বাসা যায়? তোর বাবা আগে আমাকে সেই ভাবে ভালবাসত না, আর সেই কারনেই নিবেদিতাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। আমি এতদিন তোর বাবার ভালোবাসা পাইনি। আমি এতদিন এরতার বিছানায় শুয়ে কাটিয়েছি। নিবেদিতা আর তোর বাবা একসাথে প্রচুর সময় কাটিয়েছে আর এই দীর্ঘ সময় একসাথে কাটাতে কাটাতে সাথে তোর বাবার সাথে নিবেদিতার প্রেম হয়ে যায়। আর...”

অনুপমা ছলছল চোখে কম্পিত কণ্ঠে মাকে জিজ্ঞেস করে, “অঙ্কুশ তাহলে আমার ভাই?” 

পারমিতা সম্মতি জানিয়ে মাথা দোলায়, “হ্যাঁ, অঙ্কুশ তোর ভাই, তোর রক্ত।” অনুপমার মাথার শিরা ঝনঝন করে ওঠে। পারমিতা মেয়ের চোখের জল মুছিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “তবে দেবায়ন কাউকে আঘাত করতে চায়নি তাই তোকে ধীরে ধীরে নিবেদিতার সাথে পরিচয় করায়। শুরুতেই যদি দেবায়ন তোকে সব কিছু বলে দিত তাহলে তুই কাউকেই ঠিক ভালো চোখে দেখতিস না তাই তোর সাথে নিবেদিতার ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠুক সেটাই চেয়েছিল হ্যান্ডসাম। তুই যেমন আমাকে ভালবাসিস, দেবায়ন চেয়েছিল অন্তত নিবেদিতার সাথে তোর বান্ধবীর মতন সম্পর্ক গড়ে উঠুক। অঙ্কনকে যেমন ভালবাসিস, দেবায়ন চেয়েছিল ঠিক সেই ভাবে অঙ্কুশের ওপরে তোর যেন সেই স্নেহ গড়ে ওঠে। তারপরে তোর হাত ধরে নিবেদিতার সাথে পায়েল আর অঙ্কনের সুহৃদ সম্পর্ক গড়ে উঠত। এই গ্রুপ কোম্পানি আমাদের পরিবারের মধ্যেই রয়েছে। নিবেদিতাকে কন্সট্রাক্সান কোম্পানির সম্পূর্ণ ভার দেওয়া দেবায়নের মাথার উপজ। তোর বাবা আর দেবায়ন হোটেল নিয়ে থাকবে এই ঠিক হয় আর তুই পায়েল আর অঙ্কন তোর আই.টি কোম্পানি নিয়ে থাকবি। এই ভাবেই দুই পরিবার এক করতে চেয়েছিল হ্যান্ডসাম। তোর বাবা সব শুনে সেদিন দেবায়নকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিল। সেই প্রথম সোমেশকে ওই ভাবে কাঁদতে দেখেছিলাম। ভালোবাসা বড় কঠিন বস্তু, তাই নয় কি অনু?”

সব কিছু শোনার পরে অনুপমা চোখ বন্ধ করে বসে পরে। ওর দুই চোখ বেয়ে অঝোর ঝারায় অশ্রুর বন্যা বয়ে চলে, এত ভালোবাসা রাখবে কোথায়? একটি মাত্র জীবন ওর কাছে। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার জানায়, অবুঝের মতন কিছু না জেনেই বাবাকে, নিবেদিতাকে, রূপককে সন্দেহ করেছিল। এরা সবাই ওর জন্য ভাবে, ওর জন্য চিন্তা করে, ওর দুঃখে দুঃখিত হয়, ওর হাসিতে হাসে। 

পারমিতা মেয়ের মুখ আঁজলা করে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “জানি দেবায়ন চলে যাওয়াতে তোর খুব কষ্ট হচ্ছে। জানি তোর জীবনে দেবায়নের জায়গা আমরা কেউই পূরণ করতে পারব না তবে আমরা সবাই তোর পাশে আছি রে অনু।”

অনুপমা ফুঁপিয়ে ওঠে, মায়ের সান্ত্বনা বাক্য শোনার পরে মনে হয় মাকে সত্যি বলা ভালো, “পুচ্চুকে খুঁজে পেয়েছি। তবে...” 

পারমিতা ওই শুনে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, “এই কথা কেন আমাদের জানাস নি?”

অনুপমা ধরা গলায় উত্তর দেয়, “তখন ঠিক বুঝতে পারিনি কে আসল দোষী তাই।”

পারমিতা ওকে প্রশ্ন করে, “দেবায়ন কোথায়, কেমন আছে?”

অনুপমা ছলছল চোখে ধরা কণ্ঠে উত্তর দেয়, “খুব খারাপ অবস্থায় আছে মা। জানি না কি হবে। ওর অনেক হাড় ভেঙ্গে গেছে। দেবায়ন কোমায় চলে গেছে, মা। আমি কি করব মা?” বলতে বলতে কেঁদে ফেলে অনুপমা।

মেয়ের মাথা বুকে জড়িয়ে ধরে পারমিতা। মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “দেবায়নকে যখন খুঁজে পেয়েছিস তখন কোমায় থাকুক আর যেখানেই থাকুক ও তোর কাছে ফিরে আসবেই। তুই চিন্তা করিস না। দেবশ্রীদি এই বিষয়ে জানে?” 

অনুপমা মাথা দোলায়, “হ্যাঁ জানে। মামনি খুব ভেঙ্গে পড়েছে।”

পারমিতা জিজ্ঞেস করে, “দেবশ্রীদি কোথায়, দেবায়ন কোথায়?”

চোখের জল মুছে অনুপমা উত্তরে বলে, “দেবায়নকে আমি দিলিপ বাবুর কাছে ব্যাঙ্গালোরে পাঠিয়ে দিয়েছি। মামনি দেবায়নের কাছে।” তারপরে মাকে সব কথা বিস্তারে জানায় অনুপমা।

সব কিছু শোনার পরে পারমিতা ব্যাস্ত হয়ে যায়, ওকে বলে, “আমি এখুনি তোর বাবাকে ফোন করছি। আমরা থাকতে এই সময়ে দেবশ্রীদি একা থাকতে পারে না। আমি এখুনি তোর বাবাকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোর যেতে চাই।”

পারমিতা সঙ্গে সঙ্গে, সোমেশ বাবুকে ফোন করে সব কিছু জানিয়ে দেয়। অনুপমার বাবা সব কিছু শুনে সঙ্গে সঙ্গে প্লেনের টিকিট কেটে বাড়িতে পৌঁছে যান। বাবাকে সন্দেহ করেছিল বলে বাবার সামনে যেতে দ্বিধা বোধ করে অনুপমা। কিন্তু ওর মা ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, এই কথা ওর বাবা জানতে পারবে না। পারমিতা ওকে সঙ্গে নিতে চায় কিন্তু অনুপমা জানায় ওর বদলে পায়েলকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে যাক। অনুপমা একটা শেষ চেষ্টা করতে চায়। ওর সন্দেহের তালিকার শেষ ব্যাক্তি, ধৃতিমানের বিষয়ে কিছুই তল্লাসি করা হয়নি। হয়ত এইবারে ওর তীর সঠিক স্থানে লাগবে। 


Reply


Forum Jump:

Users browsing this thread: 1 Guest(s)