Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

[-]
Tags
a bangle in pap 18 serial porn completed পাপ কাম valobasha novel kam ভালোবাসা uponnas bangla

Bangla পাপ কাম ভালোবাসা [ Pap Kam Valobasha ] A Porn Serial Novel In Bangle { completed }
Thread Description
18+ Bangla Uponnas
অষ্টদশ পর্ব। (#5)





ধৃতিমান দেবশ্রীর দিকে ঝুঁকে কানেকানে বলে, “তুমি এমন ভাব করছ যেন আমার আসার কারন জানো না। যেতে বললে চলে যাবো, চিন্তা নেই তবে গুটি কয় কথা জিজ্ঞেস করার ছিল তাই তোমাকে এত রাতে ডিস্টারব করতে এলাম।” 

দেবশ্রী হেসে বলে, “হ্যাঁ, তুমি ত রাতের ঘুম সকালের ঘুম কাড়তে ওস্তাদ। কি জিজ্ঞেস করতে চাও?”

ধৃতিমান রুমে ঢুকে সোজা বিছানায় বসে জিজ্ঞেস করে, “একটু কাছে আসবে না।”

দেবশ্রী হেসে মাথা নাড়িয়ে বলে, “তুমি না একদম যা তা, আচ্ছা বাবা আসছি।” বলে ধৃতিমানের পাশে গিয়ে বসে।

ধৃতিমান দেবশ্রীর হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে, “তুমি আমার ওপরে রেগে আছো তাই না।”

দেবশ্রী হাত না ছাড়িয়ে বলে, “তা আছি একটু রেগে। তুমি কেন দেবায়নের সাথে ওই চাকরির ব্যাপারে, দিল্লীর ব্যাপারে এখুনি কথা বলতে গেলে? তোমার মাথা খারাপ হয়েছে নাকি? প্রথম দিনে এমন ভাবভঙ্গি দেখালে ওদের মনে সন্দেহ হত না?” 

ধৃতিমান, “এই দেখ, আমি অতশত ভাবি নি। এই একটু দেবায়নের সাথে আলাপ করতে ইচ্ছে হল, ওর মনের অভিপ্রায় জানতে ইচ্ছে হল তাই জিজ্ঞেস করলাম।”

দেবশ্রী, “দেখ ধৃতি, আমি ওদের দিল্লীর কথা জানিয়েছি, চাকরির কথা জানিয়েছি। দেবায়ন আর অনুপমা কোলকাতা ছাড়তে চায় না। আমি হয়ত দিল্লীতে ট্রান্সফার নেব না।”

ধৃতিমান, দেবশ্রীর কথা শুনে একটু আহত সুরে বলে, “আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়ত দিল্লী আসবে। আমি প্লান করে নিয়েছিলাম যে তুমি এই অফিস জয়েন করলে আমি চাকরি বদলে অন্য চাকরি নিয়ে নেব। তুমি ডি.জি.এম আর আমি সামান্য একটা সিনিয়র মারকেটিং ম্যানেজার, এক অফিসে ঠিক ভালো দেখাবে না।”

দেবশ্রী ম্লান হেসে বলে, “পৌরুষতে লাগছে তাই না? না গো, দিল্লী আসা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।”

ধৃতিমান, “আমি এক কাজ করতে পারি, আমি চাকরি বদলে কোলকাতা চলে আসি তাহলে কেমন হয়। শ্বশুর বাড়ি বেহালা, তার পাশে একটা ফ্লাট কিনে নেব। মলি ওর ঠাকুমার কাছে থাকতে পারবে।”

দেবশ্রী, “ধৃতি, তুমি কি মল্লিকার সাথে এই সব ব্যাপারে আলোচনা করেছ?” 

ধৃতিমান মাথা নাড়ায়, “না করিনি, তবে মলি আমার কথার খেলাপ করবে না।” 

দেবশ্রী, “প্লিস ধৃতি, ছেলে মেয়েরা এখন আর ছোটো নয়। একবার মল্লিকার মতামত নিয়ে নিও। একরাতে যে স্বপ্ন তুমি দেখিয়েছ সেই নিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায় কিন্তু আমাদের মিলনে যদি আমাদের সন্তানেরা খোলা মনে না নেয় তাহলে আমি মরেও শান্তি পাবো না ধৃতি।” ধৃতিমান একটু চিন্তায় পরে যায়। দেবশ্রী আবার জিজ্ঞেস করে, “তুমি মল্লিকার সাথে কথা বলবে ত?” ধৃতিমান মাথা দুলিয়ে বলে, “হ্যাঁ।” দেবশ্রী, “তুমি যদি কোলকাতায় চলে আস তাহলে ও আমি ঠিক ভেবে উঠতে পারছি না, কি ভাবে ছেলের সাথে কথা বলব আমাদের বিষয় নিয়ে।” ধৃতিমান নিজেও জানে না কি ভাবে মেয়ের সামনে এই ব্যাপার প্রস্তুত করবে। ধৃতিমানকে চিন্তিত দেখে দেবশ্রী বলে, “ধৃতি, রাত অনেক হয়েছে মল্লিকা একা রুমে আছে। আমার পাশের রুমে দেবায়ন আর অনুপমা। তুমি চলে যাও, ধৃতি, প্লিস একটু বোঝার চেষ্টা কর।”

ধৃতিমান মৃদু হেসে দেবশ্রীর কপালে একটা গভীর চুম্বন একে রুম থেকে বেড়িয়ে যায়। হোটেলের পেছনের দিকে ওর রুম, বড় কাঁচের জানালা দিয়ে দুরে দেরাদুন শহরের আলো ঝলমল করতে দেখা যায়। জানালার পাশে সোফায় বসে অনেকক্ষণ সেই দূর আলো গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে দেবশ্রী, প্রেমের টান দ্বিতীয় বার ওর মনকে দোলা লাগিয়েছে কিন্তু তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চিত। ভেবেছিল দেবায়ন দিল্লীতে আসতে চাইবে, কিন্তু অনুপমা আর দেবায়নের কথা শুনে মনে হল সেই আশা দূর অস্ত। দেবশ্রী জানে না, মল্লিকা আদৌ দিল্লী ছেড়ে কোলকাতা আসতে রাজি হবে কি না। ওর হৃদয়ের ভালোবাসার নবীন কিরণ ফুটে ওঠার আগেই যেন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে।

পরের দিন সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে বেড়িয়ে পরে মুসউরি ঘুরতে। মল্লিকাকে সাথে ডেকে নেয় দেবশ্রী। অনুপমা জানায় যে মুসউরির অদুরে একটা জায়গা আছে অনেক উঁচু নাম নাগ টিব্বা। গাড়ি নিয়ে ওরা নাগ টিব্বার উদ্দশ্যে রওনা হয়ে যায়। নাগ টিব্বা বেশ উঁচু জায়গা, চারপাশে শুধু উঁচু উঁচু পাইন, দেবদারু বন। তার মাঝখান থেকে বেশ কিছু দূর ট্রেকিং করে গেলে পাহাড় চুড়ায় পৌঁছান সম্ভব। সময়ের জন্য আর দেবশ্রীর জন্য অনুপমা আর দেবায়ন সেই চুড়ার দিকে আর এগোয় না। 

মল্লিকার সাথে অনুপমা বেশ মিশে যায়, গল্পের ছলে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে ওর ব্যাপারে। মল্লিকা জানায় যে ওর মা ওর ছোটো বেলায় গত হয়েছে, মাকে ঠিক ভাবে মনে নেই ওর। সেই শুনে অনুপমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। ওর বাবা বাড়িতে বিশেষ থাকেনা বললেই চলে। মাসের দশ দিন বাড়ির বাইরে কাটায়, মল্লিকার দেখাশোনা ওর দিদা করে। ছোটো বেলা থেকে দিদার কাছেই মানুষ। মল্লিকা বলে যে ওর বাবা ওকে বিশেষ কোথাও ঘুরতে নিয়ে যায় না। গরমের ছুটির জন্য দিদা মামা বাড়ি, কোলকাতায় চলে গেছে। অনুপমা, মল্লিকাকে জিজ্ঞেস করে যে কোলকাতা কেমন লাগে। ছোটবেলা থেকে দিল্লীতে বড় হয়েছে মল্লিকা, মাঝে মাঝে ছুটি কাটাতে মামা বাড়ি বেহালা যায়। মল্লিকা জানাল যে কোলকাতা ভালো কিন্তু দিল্লীর মতন ওখানে ওর বন্ধু বান্ধবী নেই, কোলকাতা গেলে খুব একা একা মনে হয় ওর। মল্লিকার কথা শুনে দেবশ্রী ক্ষণিকের জন্য আহত হয়, মনের ভাব চেপে রেখে মল্লিকাকে বলে যে কোনদিন কোলকাতা গেলে যেন ওদের বাড়িতে যায়। মল্লিকা জানিয়ে দেয় যে পুজোর ছুটিতে মামা বাড়ি গেলে নিশ্চয় ওদের বাড়িতে বেড়াতে যাবে।

নাগ টিব্বা থেকে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যায়, মাঝপথে খাওয়া দাওয়া সেরে সোজা মুসউরি পৌঁছে একবার কেম্পটি ফলস ঘুরে আসে। বিকেলে মেয়েদের শপিং এ যেন নিত্য এককর্ম, অনুপমা একরকম জোর করেই দেবায়নকে নিয়ে যায়। কেনাকাটা সেরে রুমে পৌঁছায় ওরা। সারাদিন দেবশ্রীর সাথে কাটিয়ে মল্লিকা যেন এক নতুনত্তের স্বাদ খুঁজে পায়, এক স্বাধীনতার স্বাদ যেটা ওর বাবার কাছ থেকে পায়নি। হোটেলে ফেরার সময় মাতৃহীন মেয়েটার মুখের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকে দেবশ্রী, মল্লিকার মনে নেই ওর মা দেখতে কেমন ছিল। হোটেলে ফিরে নিজের রুমে যাওয়ার আগে, দেবশ্রীকে জড়িয়ে ধরে বলে পরেরদিন যেন ঘুরতে গেলে সাথে নিয়ে যায়। মাতৃহীন কুসুমকলির ছোঁয়ায় দেবশ্রীর বুক কেঁপে ওঠে, ঘাড় ঘুরিয়ে একবার অনুপমা আর দেবায়নের দিকে তাকায়। মিষ্টি হেসে মল্লিকার কপালে চুমু খেয়ে জানিয়ে দেয় পরেরদিন ওকে সাথে নিয়ে যাবে।

পরের দিন দেরাদুন ঘুরতে যায়, সেখানে সহস্র ধারা দেখে ফিরে আসে। এই কয়দিন ধৃতিমান হোটেলেই ছিল, মল্লিকা ওদের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছে। অনুপমার বেশ মনে ধরে যায় মল্লিকাকে, সুন্দরী ফুটফুটে মেয়ে। দেবায়নকে বলে যে অঙ্কনের জন্য একদম সঠিক মেয়ে, বড় হলে মল্লিকার সাথে অঙ্কনের বিয়ে দেওয়া যেতে পারে। দেবায়ন হেসে জানায় ওর শ্যালক বাবুর চারপাশে অনেক মেয়ে ঘোরাফেরা করে, কখন কাকে কি ভাবে মন দিয়ে ফেলবে এই কাঁচা বয়সে সেটা অঙ্কন নিজেই জানে না। অনুপমা হেসে ফেলে দেবায়নের কথা শুনে, ভাইকে ভালো ভাবে চেনে।

বুধবার খুব ভোরবেলা হোটেল থেকে চেক আউট করে বেড়িয়ে পরে দিল্লীর উদ্দেশ্যে। দেবশ্রী আর মল্লিকার সাথে দেখা করেনি, বুঝতে পেরে গেছিল মল্লিকার সাথে হয়ত আর কোনদিন দেখা হবে না, তাই মিছিমিছি একটা বাঁধন বাড়িয়ে কি লাভ। দেবশ্রীর ছেলে, দেবায়ন কোলকাতা ছেড়ে যেতে নারাজ, ধৃতিমানের একমাত্র কন্যে দিল্লী ছেড়ে আসতে নারাজ। এইমত অবস্থায় এই দুই তৃষ্ণার্ত নর নারীর মিলন দূর অস্ত। গাড়িতে উঠে দেবশ্রী অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিল, নিজের চিন্তায় মগ্ন ছিল, হৃদয়কে বেঁধে নিয়ে নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার প্রানপন চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল। চোখের কোণে একচিলতে অশ্রু টলমল করে আসে, বারেবারে মল্লিকার হাসি মুখ মনে পরে যায়। অনুপমা দেবশ্রীকে ওই টলমল অশ্রুর কারন জিজ্ঞেস করাতে, হেসে জানায় যে কিছু পুরানো কথা মনে পড়ে গেছে তাই এই অভাগির চোখে একটু জল এসে গেছিল। অনুপমা বেশ বুঝতে পারে তিনদিনে মল্লিকা ওর মামনির হৃদয় জয় করে নিয়েছে তার শিশুশুলভ বন্ধনে। কিছু প্রশ্ন করতে গিয়েও আর করে না অনুপমা, অনুপমা বুঝে যায় ওর মামনির লুক্কায়িত অশ্রুর আসল কারন। চিন্তায় মগ্ন অনুপমা, সুরাহা খুঁজে বেড়ায় চারপাশে, ওর মামনির হৃদয়ের কান্নার আওয়াজ ওকে তাড়িয়ে বেড়ায়। মুসউরি থেকে দিল্লী পর্যন্ত, বারো ঘন্টা গাড়িতে বিশেষ কারুর মুখে কথা ছিল না। দেবায়ন রাস্তার সৌন্দর্য দেখতে ব্যাস্ত ছিল, পেছনে বসে দুই রমণীর মনের আওয়াজ ওর কানে পৌছয় না। 

সন্ধ্যের কিছু পরে দিল্লী পৌঁছে যায় ওরা। মুসউরি থেকে দিল্লী পর্যন্ত সবাই চুপ করেছিল। গাড়ি দিল্লী ঢোকার পরে সবার মুখে কথা ফোটে। অনুপমা আর দেবায়ন এই ভ্রমণের গল্পে মেতে ওঠে। দেবশ্রী বসে ছেলে মেয়েদের কথা শোনে। গাড়ি আউটার রিং রোড দিয়ে যাওয়ার সময়ে, দেবশ্রী একবার সেই হোটেলের দিকে তাকায় যেখানে ও ছিল। গাড়ি এয়ারপোর্ট ঢোকার আগে একবার গুরগাওয়ের দিকে তাকায় যেখানে ওদের হেডঅফিস। অনুপমা বিষণ্ণতার কারন জিজ্ঞেস করলে দেবশ্রী এড়িয়ে যায় ওর উত্তর, হাসি মুখে জানিয়ে দেয় ওর মন খারাপ নয়। চোখের সামনে ছেলে আর হবু বউমা নিয়ে ঘুরতে এসেছে ওর মতন খুশি আর কে। 

প্লেনে, দেবায়নের সিট অন্য দিকে পড়ে। দেবশ্রী আর অনুপমা পাশাপাশি বসে। দেবায়ন চেয়েছিল অনুপমার পাশে বসতে কিন্তু অনুপমা বুঝিয়ে বলে যে ও ওর মামনির পাশে বসতে চায়। প্লেনে ওঠার আগেই অনুপমা বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল ওদের আসার কথা। পারমিতা জানিয়ে দিয়েছিল যে গাড়ি পৌঁছে যাবে এয়ারপোর্টে।

অনুপমা, দেবশ্রীকে জিজ্ঞেস করে, “মামনি একটা কথা জিজ্ঞেস করব কিছু মনে করবে না।”

দেবশ্রী, “কি জিজ্ঞেস করবি?”

অনুপমা, “মামনি, মুসউরি থেকে ফেরার পথে তুমি অত চুপচাপ ছিলে কেন?”

দেবশ্রী ভাবতে পারেনি অনুপমা এমন একটা প্রশ্ন করবে। কিছুক্ষণ অনুপমার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে অনুপমার মনের কথা। অনুপমার চোখ জোড়া বলে দেয় অনুপমা আর ছোটো মেয়ে নয়, চোখ কান খোলা রেখে অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। দেবশ্রীর বুক কেঁপে ওঠে অনুপমার চোখের প্রশ্ন দেখে, কথা ঘুরিয়ে বলে, “না মানে এমনি।”

অনুপমা বেশ বুঝতে পারে যে ওর মামনি কথা লুকিয়ে ফেলেছে, তাও মামনির মনের কথা জানার জন্য জিজ্ঞেস করে, “মামনি, তুমি ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে মল্লিকাদের বাড়ি গিয়েছিলে, তাই না?”

ধরা পরে যায় দেবশ্রী, মাথা দুলিয়ে বলে, “হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। আমার অফিস কলিগ, একসাথে টুরে ছিলাম, তার উপরে এবার বাঙালি, তাই ডিনারে ডেকে ছিল মিস্টার দেবনাথ।”

অনুপমা, দেবশ্রীর হাত ধরে বলে, “মামনি, মিস্টার দেবনাথকে তোমার ভালো লাগে?” সত্যি কথা বলতে দ্বিধা বোধ করে দেবশ্রী। অনুপমা, দেবশ্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করে, “মামনি, মিস্টার দেবনাথের সাথে মুসউরিতে দেখা হয়ে যাওয়া। সেটা নিশ্চয় কাকতালিয় নয় তাই না?” কি উত্তর দেবে দেবশ্রী, প্লেনের এ.সির ঠাণ্ডায় হাত দুটি হিম শীতল হয়ে যায়। অনুপমা যদি দেবায়নকে সব বলে দেয়, তাহলে খুব লজ্জার ব্যাপার। ওর মা কারুর প্রেমে পড়েছে আর সেই লোক মিস্টার ধৃতিমান দেবনাথ, যে দিল্লী থাকে। অনুপমা আসস্থ কণ্ঠে বলে, “মামনি এত ভাবছ কেন? ভাবছ আমি দেবায়নকে বলে দেব। না মামনি, তুমি যতক্ষণ না চাইবে, দেবায়ন কিছু জানতে পারবে না। তুমি সত্যি বল, মিস্টার ধৃতিমানকে তোমার ভালো লেগেছে, তাই না। সেই জন্য মুসউরিতে মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন মিস্টার দেবনাথ। যাতে আমাদের সবার সাথে দেখা হয়, দুই পরিবার যাতে পরস্পরকে চিনতে পারে জানতে পারে।” দেবশ্রী নির্বাক, সারা চেহারা রক্ত শূন্য হয়ে যায়। অনুপমা দেবশ্রীকে জড়িয়ে ধরে বলে, “মামনি তুমি কি চাও।” 

এর উত্তর ঠিক জানে না দেবশ্রী, কম্পিত কণ্ঠে অনুপমাকে জিজ্ঞেস করে, “তোকে কে বলেছে আমি মিস্টার দেবানাথকে...”

অনুপমা, “মামনি, তোমার চোখ বলেছিল সব কথা ওই ধনোলটি গিয়ে। মামনি, আমাকে একটু বিশ্বাস করে নিজের মনের কথা বলবে না?”

দেবশ্রী মনে বল জুগিয়ে বলে, “জানিনা ঠিক আমি কি চাই। তবে তোদের মুখে হাসি ফুটে উঠলেই আমার সব থেকে বড় পাওনা।”

অনুপমা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, “দিল্লী যেতে পারছ না বলে তোমার দুঃখ হচ্ছে তাই না? আচ্ছা মামনি, এই এক বছর পরে দেবায়নের নিজের কোম্পানি হয়ে যাবে, আমরা আমাদের জীবন নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে যাব। তুমি কি করবে?”

দেবশ্রী ম্লান হেসে বলে, “আমি চাকরি করে যাবো।”

অনুপমা দেবশ্রীকে জড়িয়ে ধরে বলে, “না মামনি, আমাদের কাজ শুরু হলে তোমাকে চাকরি করতে দেব না। তোমার সেবার জন্য সবসময়ে লোক থাকবে আর যাতে তোমাকে কষ্ট না করতে হয়। তোমার বাড়ির সামনে একটা বড় গাড়ি, একটা ড্রাইভার দাঁড়িয়ে থাকবে সব সময়ে।”

দেবশ্রী হেসে ফেলে, “রাম না হতেই রামায়ন গাইছিস? না রে। একটা ফুটফুটে নাতনী অথবা নাতি হবে, তাকে নিয়ে থাকব আমি। তোরা যাবি অফিসে আর আমি থাকব আমার কুট্টি নাতি নাতনী নিয়ে।”

অনুপমা হেসে ফেলে দেবশ্রী কথা শুনে, “মামনি তুমি কথা ঘুরিয়ে দিলে আবার। তুমি যেতে পারছ না দিল্লী তাই দুঃখ হচ্ছে তাই না। কিন্তু মিস্টার দেবনাথ কোলকাতা চলে আসতে পারে ত? ওনার শ্বশুর বাড়ি ত বেহালাতে? উনি এখানে কোন কাজ খুঁজে নিতে পারেন।”

দেবশ্রী, “একটা সমস্যা আছে রে মা। দেবু যেমন কোলকাতা ছেড়ে বাইরে যেতে চায় না তেমনি মল্লিকা দিল্লী ছেড়ে আসতে চায় না। তারপরে মিস্টার দেবনাথের সাথে মোটে কয়েক দিনের আলাপ, আমি এখন পর্যন্ত গভীর ভাবে কিছুই চিন্তা ভাবনা করে দেখিনি। কি করে করব বল, এই যে তুই আমার সাথে এত গল্প করলি, এত মনের কথা বললি, অন্য কেউ কি আমার কথা বুঝত রে। তোদের ফেলে কোথাও গিয়ে যে শান্তি পাবো না।”

অনুপমা, “মামনি আমি যদি দেবায়ন কে বুঝিয়ে বলি।”

দেবশ্রী, “তুই কি বলতে চাস?”

অনুপমা, “মামনি, মানে আমাদের কলেজের শেষে আমরা নিজেদের কাজে ব্যাস্ত হয়ে যাব। তুমি আরো একা হয়ে যাবে তখন। আমি যদি দেবায়নকে বুঝিয়ে বলি, তাহলে কি তুমি বিয়ে করবে মিস্টার দেবনাথকে?”

দেবশ্রী অথই জলে পরে যায় অনুপমার কথা শুনে, কোনদিন ভাবতে পারেনি এই টুকু মেয়ে এত বড় কথা বলবে। হাঁ করে অনুপমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে উত্তর দেয়, “না রে। আমার সূর্য পশ্চিমে ঢলে গেছে, তোদের সূর্য উদিয়মান। ওই একটা সুন্দর গান আছে না, তোমার হল শুরু আমার হল সারা। মিস্টার দেবনাথ আমার জীবনের পথের মাঝে এক পথিক মাত্র, ক্ষণিকের অতিথি, পথ চলতে একসময়ে হটাত দেখা হয়ে গেল, কিছু দূর একসাথে হাঁটলাম। তারপরে তার পথ অন্যদিকে বাঁক নেয় আমার পথ অন্যদিকে। আর আমাকে প্রতিজ্ঞা কর দেবুকে এই সব ব্যাপারে কিছু জানাবি না কোনদিন।”

অনুপমার চোখ ভিজে আসে ওর মামনির চোখের দিকে তাকিয়ে, একবার মনে হয় জড়িয়ে ধরে বলে মামনি তুমি চলে যাও, আমি দেবায়ন কে সব বুঝিয়ে বলে দেব। কিন্তু ওর মামনি নিজের হৃদয়কে বুঝিয়ে শান্ত করে নিয়েছে, মিস্টার দেবনাথ ওর জন্য নয়, ওর জীবনে একজন এসেছিল সেই শূন্য স্থান কেউ পূরণ করতে পারবে না। 


অনুপমা ওর মামনির হাত বুকের কাছে নিয়ে বলে, “মামনি আমি প্রতিজ্ঞা করছি, কেউ জানবে না এই কথা। তবে মামনি আমাকে একটা কথা দিতে হবে, যদি মিস্টার দেবনাথ কোলকাতা চলে আসেন তাহলে কিন্তু তোমাদের একসাথে করার দায়িত্ত আমার।”

দেবশ্রী চেয়ে থাকে অনুপমার মুখের দিকে, এক কন্যের অপূর্ণ ইচ্ছে অনুপমা ভরিয়ে দেয়। দেবশ্রী অনুপমার মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বলে, “তুই আমার সোনা মেয়ে, এইরকম যেন থাকিস। সেটা পরের কথা, পরে ভেবে দেখা যাবে।”

কোলকাতা নেমে এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়েই পারমিতার দেখা। অনুপমা অবাক হয়ে যায় মাকে দেখে, ভেবেছিল শুধু মাত্র গাড়ি পাঠিয়ে দেবে, ভাবতে পারেনি যে ওর মা ওকে নিতে আসবে। অনুপমা দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ওর মাকে, “কি ব্যাপার তুমি চলে এলে?”

এয়ারপোর্টে পারমিতাকে দেখে দেবশ্রী একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “বাপ রে তুমি নিজে চলে এলে আমাদের নিতে।”

পারমিতা, “কেন, তুমি ছেলে মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যেতে পারো আর আমি এই এয়ারপোর্ট থেকে তোমাদের বাড়ি পৌঁছে দিতে পারি না?”

দেবশ্রী হেসে বলে, “না না তা পারো। তুমি নাকি আমাদের বাড়িতে এসেছিলে? কি বলত, প্রথম বার এলে আর আমি ছিলাম না। এবারে কিন্তু একদিন আসতেই হবে।”

দেবশ্রীর কথা শুনে অনুপমা আর দেবায়ন মুখ টিপে হেসে ফেলে। ওদের হাসি দেখে পারমিতার কান লজ্জায় লাল হয়ে যায়। কোনোরকমে লজ্জা ঢেকে বলে, “তুমি আগে আমাদের বাড়িতে আসবে তারপরে আমি যাবো।”

দেবশ্রী, “ঠিক আছে, তা নাহয় গেলাম। কিন্তু তোমার জন্য যেগুলো এনেছি তাহলে সেগুলো নিতে কে আসবে?”

পারমিতা, “উফফ আর পারি না। ঠিক আছে পরের রবিবার আসব।” অনুপমার দিকে তাকিয়ে বলে, “তুই বেশ ভালো ঘুরেছিস মনে হচ্ছে? এই কয়দিনে একবার ফোন করিস নি, মামনিকে কাছে পেয়ে মাকে ভুলে গেলি।”
অনুপমা পারমিতাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “না মা, সেটা নয়।”

অনুপমার গাল টিপে পারমিতা বলে, “বুঝি রে, মেয়ে যে বিয়ের আগেই স্বাশুরির হাতে চলে গেছে।”

দেবশ্রী হেসে বলে, “না না, তোমার মেয়ে অনেক ভালো। কোন জ্বালাতন করেনি, একটু শুধু বড় হয়ে গেছে, মায়েদের মনের কথা একটু বেশি বুঝতে শিখে গেছে।” 

পারমিতা অবাক হয়ে অনুপমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, সত্যি মেয়ে অনেক বড় হয়ে গেছে। দেবায়ন আর দেবশ্রীকে লেক্টাউনে পৌঁছে দেয়। নামার আগে দেবশ্রী পারমিতাকে বলে যে আগামী রবিবার সপরিবারে নিমন্ত্রন রইল।
Reply
উনবিংশ পর্ব। (#1)





মুসউরি ভ্রমণের পরের রবিবার, সকাল থেকে দেবশ্রী খুব ব্যাস্ত। কাজের লোক দিয়ে সব ঘর আগের দিন পরিষ্কার করে রেখেছিল। দেবায়ন নিজের ঘর নিজেই পরিষ্কার করে। দেবশ্রীর চিন্তা, মিস্টার সেন আর পারমিতা অনেক বড়োলোক, ওদের এই ছোটো বাড়িতে কি ভাবে মানিয়ে নেবে। গ্রীষ্মকাল বাড়িতে এ.সি লাগানোর মতন শখ কোনদিন হয়নি ওর। বারেবারে ছেলেকে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁরে মিস্টার সেনের গরম লাগলে কি করা যাবে? দেবায়ন আসস্থ করে জানিয়ে দেয় অইসব অবান্তর ভাবনা চিন্তা দূর করে দিতে। দেবায়ন, মায়ের সাথে কাজে সাহায্য করে। দেবায়ন বারবার বলে যে মিস্টার সেন অথবা পারমিতা, ওদের বাড়িতে এসে কোন রকম অসুবিধেতে পড়বে না। দেবশ্রীর মন তাও মানে না। দুপুরের জন্য, মাটন বিরিয়ানি সেই সাথে কষা মাংস। রাধাবল্লভি, ছোলার ডাল, ইত্যাদি বেশ কয়েক প্রকার ব্যাঞ্জন তৈরি করা হয়ে গেছে। 

দুপুর বেলায় অনুপমা, বাড়ির সবাইকে নিয়ে পৌঁছে যায় দেবায়নের বাড়িতে। দুই পরিবারের মিলনে বাড়ি মুখর হয়ে ওঠে। গরমে ঘেমে যান মিস্টার সেন, সেই দেখে দেবশ্রী একটু ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে পরে। পারমিতা হেসে জানিয়ে দেয় একদিন ঘামিয়ে গেলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। দুপুরে খাবার সময়ে দেবশ্রী, মিস্টার সেনকে কম্পিউটার শিক্ষার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। অনুপমা আর দেবায়ন প্রমাদ গোনে, হয়ত দেবশ্রী মিস্টার সেনকে সব কিছু বলে দেবে। দেবশ্রী আর মিস্টার সেন একসাথে দেবায়নের দিকে তাকায়, দুইজনের চোখে ভিন্ন প্রশ্ন। দেবায়ন হাল্কা মাথা দুলিয়ে, “না” বলে। উত্তর একটা, কিন্তু ভিন্ন প্রশ্নের ভিন্ন অর্থ বহন করে সেই মাথা নাড়া। মিস্টার সেন দেবশ্রীকে বলেন, এই তথ্য প্রযুক্তির সময়ে সব ছেলে মেয়েদের কম্পিউটার শেখা একটু জরুরি। কোন শিক্ষা ফেলা যাবে না, ভবিষ্যতে কোন না কোন ভাবে কাজে লেগে যাবে। দ্বায়িতজ্ঞান পূর্ণ অভিবাবকদের মতন মিস্টার সেন আর দেবশ্রী, দেবায়ন আর অনুপমাকে কম্পিউটার শেখার জন্য অনুমতি দেয়। অনুপমা খাওয়ার পরে দেবশ্রীকে অনুরোধ করে যে ওদের ফার্মের প্লানের কথা এখুনি যেন ওর বাবাকে না জানায়। বুদ্ধিমতী দেবশ্রী জানিয়ে দেয় যে সময় হলে ওদের আই.টি ফার্মের কথা মিস্টার সেনের সাথে আলোচনা করবে। 

গ্রীষ্মের ছুটির মাঝে একদিন দেবায়ন আর অনুপমা, পার্ক স্ট্রিটের একটা নামকরা কম্পিউটার সংস্থায় যায় খোঁজ খবর নিতে। এক বছরের ফাস্ট ট্রাক কোর্স, তাড়াতাড়ি সব শেখানর জন্য একটু পয়সা বেশি লাগবে সেই সাথে জানিয়ে দেয় যে সময় একটু বেশি দিতে হবে। দুটো সেমেস্টারে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকার কথা শুনে দেবায়ন একটু ইতস্তত করে, মাকে ফোনে জানায় টাকার কথা। দেবশ্রী জানিয়ে দেয় যত টাকা লাগে তার জন্য তৈরি। দেবায়ন আর অনুপমা নিজেদের নাম নথিভুক্ত করে। শনিবার আর রবিবার সারাদিন ক্লাস, সেই সাথে সপ্তাহে দুই দিন, মঙ্গলবার আর বৃহস্পতিবার বিকেলে দুই ঘন্টার ক্লাস। একদিকে কলেজের ফাইনাল ইয়ার, সেইসাথে কম্পিউটার ক্লাস। দেবায়ন আর অনুপমা বুঝতে পারে সামনের দিন গুলো ওদের নিঃশ্বাস ফেলার মতন সময় থাকবে না। কম্পিউটার সংস্থা থেকে বেড়িয়ে দেবায়ন আর অনুপমা, ফ্লুরিস কাফেতে বসে।

অনুপমা কফির কাপে চুমুক দিয়ে দেবায়নকে জিজ্ঞেস করে, “হ্যাঁ গো, আমি জিজ্ঞেস করছিলাম, এইসব আমরা পারব ত? মানে কলেজ আর কম্পিউটার একসাথে।” 

এক প্রশ্ন দেবায়নের মাথায় ঘুরছিল, কিন্তু অনুপমাকে আসস্থ করে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ হ্যাঁ, সব পারবো। তুমি কলেজের পড়াশুনাতে মন দাও আর আমি কম্পিউটার ক্লাসে।”

অনুপমা, “মানে, তুমি কি কলেজের পড়াশুনা ছেড়ে দেবে নাকি? গ্রাজুয়েশান না করলে মামনি কিন্তু তোমাকে আস্থ রাখবে না।”

দেবায়ন হেসে বলে, “না রে পাগলি মেয়ে। আমি বলছিলাম, তুমি আমাকে কলেজের নোটস দিয়ে হেল্প করবে আর আমি তোমাকে কম্পিউটার শিখিয়ে দেব। পড়াশুনা বন্টন করে নেব আমাদের মাঝে।”

অনুপমা, “দেখ পুচ্চুসোনা, আমার কম্পিউটার না শিখলেও চলবে। আমি ত শুধু তোমার সাথে কাটাব বলে জয়েন করেছি। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখো, এই কম্পিউটার কিন্তু পরে করলেও চলবে। গ্রাজুয়েশানটা একটু ঠিক করে করে নাও।”

দেবায়ন, “উফফফ বাবা, সেই জন্য বলছি, তুমি ফিসিক্স পড় আর বাকি আমার ওপরে ছেড়ে দাও।”

অনুপমা, “তোমার মাথার মধ্যে কি ঘুরছে একটু পরিষ্কার করে আমাকে জানাবে?”

দেবায়ন একটু বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, “তোমাকে কতবার এক কথা বলতে হয় একটু বলত? আমরা কলেজের পরে একটা আই.টি সফটওয়্যার ফার্ম খুলব ব্যাস আবার কি।”

অনুপমা দেবায়নের হাত ধরে মিনতির সুরে বলে, “সোনা, বড্ড ভয় করছে।”

দেবায়ন, “কম্পিউটার শিখছি বলে ভয় করছে? কেমন মেয়ে তুমি?”

অনুপমা, “না সোনা, সেটা নিয়ে ভয় নয়। জানিনা, তোমাকে ঠিক বুঝাতে পারছি না। মাঝে মাঝে মনে হয় খুব বড় একটা ঝড় আসবে।” 

দেবায়ন অনুপমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে যে প্রেয়সীর চোখ দুটি ছলছল করছে, কাঁধের উপরে হাত রেখে কাছে টেনে জিজ্ঞেস করে, “কি হল তোমার?”

অনুপমা, “আচ্ছা পুচ্চু, এই কম্পিউটার শিখে তুমি কোন চাকরি করতে পারো না?”

দেবায়ন অবাক হয়ে অনুপমার কথা শুনে, “হটাত এই প্রশ্ন কেন? নিজের বাবাকে অবিশ্বাস করছ তুমি?”

অনুপমার মনে ঠিক সেই কথাই জেগেছিল, প্রানের মানুষ যে অলীক স্বপ্নে নিমজ্জিত হয়ে গেছে সেটা দেখে একটু আহত হলেও সেটা লুকিয়ে ঠোঁটে হাসি টেনে বলে, “না মানে কিছু না। মানে আমরা পারবো ত এই সব করতে?” কথা ঘুরিয়ে দেয় বুদ্ধিমতী অনুপমা, “আগামী সপ্তাহে কলেজ শুরু। কলেজে এবারে অনেক জোড়া পাখী দেখব। পরাশর জারিনা নতুন প্রেমে বিভোর, ওইদিকে আমাদের সেই পার্টিতে সঙ্গীতা আর মিচকে প্রবাল জুটি বেঁধে নিল। আচ্ছা একটা কথা বল, পরাশর আর জারিনা, ওদের সম্পর্কের কি হবে? না মানে আমার ত মনে হয় না দুইজনের বাড়ির কেউ মেনে নেবে। দুইটি ভিন্ন ধর্মের ছেলে মেয়ের সম্পর্ক। সমাজের চোখে খুব বড় ব্যাপার। ওদের পরিবার ওদের মেনে নেবে কি?”

দেবায়ন হেসে বলে, “চেষ্টা করতে দোষ কি? এই দেখ না, মানুষ আগে পাখী দেখে শুধু উড়ার স্বপ্ন দেখত। কেউ যদি এগিয়ে না এসে ডানা না লাগিয়ে চুপচাপ বসে থাকত তাহলে কি আজ প্লেন বলে কিছু হত? কাউকে ত পথ দেখাতে হয়, প্রেম কি আর ধর্ম, জাত পাত মানে? মানলে কি আর তুমি আর আমি এই জায়গায় বসে কফি খেতাম।” বলেই দেবায়ন অনুপমার গালে একটা ছোটো চুমু খেয়ে নেয়।

অনুপমা মিষ্টি হেসে বলে, “ধুত, তুমি না একদম শয়তান। এত লোকের মাঝে একি করলে? এটা কি লন্ডন নাকি?”

দেবায়ন হেসে বলে, “কাউকে একটা শুরু করতে হয়।”

অনুপমা, “এটা ভারতবর্ষ পুচ্চু। আরও এক হাজার বছর ধরে বয়ে যাবে এই গঙ্গার জল, কিন্তু এখানের মানুষের মনের বিচারধারা বদলাবে না পুচ্চু। এরা শিবলিঙ্গ পুজ করবে, ফুল বেল পাতা চড়াবে, দুধ মধু ঢালবে। কিন্তু সেই লিঙ্গ আর যোনির আসল অর্থ বুঝেও না বোঝার ভান করে পরে থাকবে, এই হল আমাদের দেশ। এরা খাজুরাহ, কোনারক দেখতে যাবে কিন্তু যৌনতা নিয়ে, যৌন শিক্ষা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে লজ্জা পাবে, এই হল আমাদের দেশ। এরা নারীহত্যা করতে পিছপা হবে না, নারীদের উপরে অত্যাচার করতে পিছপা হবে না, কিন্তু মা কালী, মা দুর্গার পুজোতে লাখ লাখ টাকা চাদা দেবে, এই হল আমাদের দেশ। এরা ভালোবাসার সন্মান দিতে জানে না কিন্তু রাধা গোবিন্দর পুজোতে নেচে কুদে বেড়াবে, এই হল আমাদের দেশ।”

দেবায়ন হেসে ফেলে অনুপমার কথা শুনে, “হটাত দার্শনিক হয়ে উঠলে? ছাড়ো এসব কথা, মিমি সুন্দরীর কি খবর?”

অনুপমা ভুরু কুঁচকে হেসে বলে, “ধুর বাবা, পাশে বৌ বসে তাও স্বাশুরির দিকে নজর। একে নিয়ে আর পারা গেল না।”

দেবায়ন অনুপমা গাল টিপে বলে, “আচ্ছা না হয় ওর কথা না জিজ্ঞেস করলাম, একবার আমার পায়েল সুন্দরীর কথা শুনি।”

অনুপমা, “পায়েল ভালো আছে, প্রত্যেকদিন কথা হয় ফোনে। ওর বাবা বাড়ি ফিরে এসেছে তাই বিকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়া এক প্রকার বন্ধ। কলজে খুললে আবার ওর দেখা পাবে।”

দেবায়ন অনুপমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে যায়। সেখানে পারমিতার সাথে দেখা। আজকাল পারমিতা মাঝে মাঝে অফিসে যাওয়া শুরু করেছে। দেবায়নকে বাড়িতে দেখে পারমিতা বেশ খুশি, অনেকদিন পরে দেবায়নের সাথে দেখা। অনুপমা, মায়ের চেহারার লালিমা দেখে বুঝে যায় মায়ের মনের অভিব্যাক্তি, মনে মনে হেসে ফেলে। পারমিতা দেবায়নকে বলে আজকাল আর ওর দিকে নজর দিচ্ছে না। দেবায়ন হেসে জানিয়ে দেয় যে সময় হলে নিশ্চয় দেবে, বর্তমানে দেবায়নের মাথায় অনেক চিন্তা, অনেক কাজের ভার। পারমিতা হাসে, অনুপমার গাল টিপে জানিয়ে দেয় যে দেবায়নকে কেড়ে নেবে না। অনুপমা, মাকে জড়িয়ে ধরে জানিয়ে দেয় সেই বিশ্বাস টুকু দেবায়ন আর মায়ের উপরে আছে। 

কলেজ শুরু হয়ে যায় এক সপ্তাহের মধ্যে। সেই সাথে শুরু হয়ে যায় কম্পিউটার ক্লাস। কম্পিউটার ক্লাসে বেশি ছাত্র ছাত্রী নেই, বিকেলে যাদের সাথে ক্লাস করে অনুপমা আর দেবায়ন, তারা সকলেই কর্মরত মানুষ, কাজের তাগিদায় আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি শিখতে এসেছে। ক্লাসের ম্যাডাম, মিস সুপর্ণা চ্যাটারজি বেশ ভালো মহিলা, কম ছাত্র ছাত্রী থাকায় তার পড়ানোর বেশ সুবিধা। কম বয়সি শিক্ষিকা দেখে দেবায়নের অতি পুরাতন স্বভাব মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ক্লাসে মাঝে মাঝেই সুপর্ণাকে অবান্তর প্রশ্নে ব্যাতিব্যাস্ত করে তোলে, আর অনুপমা পাশে বসে বকে মেরে চুপ করিয়ে রাখে। ম্যাডামের পেছনে লাগতে পিছপা হয় না দেবায়ন। 

প্রতিদিন সকালে পায়েল, অনুপমার বাড়িতে আসে সালোয়ার পরে, অনুপমার বাড়িতে ড্রেস বদলে, স্কার্ট টপ অথবা ছোটো জিন্স ফ্রিল শার্ট পরে দুই বান্ধবি গাড়ি নিয়ে কলেজে বেড়িয়ে পরে। কলজে খোলার বেশ কয়েক সপ্তাহ পরে পায়েলের চেহারায় এক খুশির ছোঁয়া ভেসে ওঠে। অনুপমা সেই হাসি সেই আনন্দের আলোক ছটা দেখে বুঝে যায় পায়েলের জীবনে এক নতুন ব্যাক্তির আগমন ঘটেছে। কলেজের পথে একদিন পায়েল জানায় যে একটা ছেলের সাথে ওর দেখা হয়েছে। অনুপমা সেই ছেলেটার সম্বন্ধে জানতে চাইলে পায়েল বলে যে ওর পিসতুতো দাদার এক বন্ধু, ডালহৌসিতে একটা অফিসে চাকরি করে। প্রেম প্রীতি পর্যন্ত কথা এখন যায়নি তবে ছেলেটাকে বেশ ভালো লেগেছে পায়েলের। অনুপমা মনে মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, তাহলে অঙ্কনের সাথে পায়েলের কোন সম্পর্ক নেই। অনুপমা জানতে চায় ছেলেটার সাথে কবে দেখা করাবে। পায়েল মিচকি হেসে জানিয়ে দেয় যে সময় হলে ছেলেটার সাথে দেখা করাবে। ছেলেটার নাম জানতে চাইলে জানায় যে অগ্নিহোত্রী বিশ্বাস, বাড়ি নৈহাটি। 

অনুপমা কলেজে এসে দেবায়নকে পায়েলের কথা জানায়। দেবায়ন পায়েলকে উত্যক্ত করার জন্য বলে শেষ পর্যন্ত কি হাত ছাড়া হয়ে গেল? পায়েলকে সেই রাতের কথা মনে করিয়ে দেয় মজা করে। সঙ্গম সম্ভোগের সময়ে কামাবেগে পায়েল বলেছিল যে দেবায়নের জন্য ওর শরীর অবারিত দ্বার। পায়েলের গালের রঙ লাল হয়ে যায় লজ্জায়। অনুপমা, পায়েলকে জড়িয়ে ধরে কানেকানে বলে যে কথা না রাখলে কিন্তু দেবায়ন একদিন ওকে ধরে নিয়ে জোর করে সঙ্গম করবে। অনুপমা কথায় পায়েল শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেয়। অনুপমা হেসে জানিয়ে দেয় যে ওরা মজা করতে চাইছিল।

গরমের ছুটির শুরুতে, দেবায়নের বাড়ির একরাতের পার্টি সব বন্ধু বান্ধবীদের মাঝে এক নতুন যোগসুত্র স্থাপন করে দেয়। সঙ্গীতা, ছোটো স্কার্ট, হাতা বিহীন টপ ছেড়ে সালোয়ার কামিজ অথবা লম্বা স্কার্ট পড়তে শুরু করে দিয়েছে। প্রবালের চোখ দেখলে বোঝা যায় দুই বছর আগেকার সেই প্রবাল এখন সঙ্গীতার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। শ্রেয়া, সঙ্গীতা, পায়েল আর অনুপমার বন্ধুত্ত আগে থেকেই বেশ ঘন ছিল, সেই এক রাতের পরে ওদের বন্ধুত্ত যেন আরো গভীর হয়ে উঠেছে। প্রবাল আগে কারুর সাথে বিশেষ কথা বলত না, ওর মুখে কথা ফুটেছে। ধিমান আর পরাশর আগে দেবায়নকে একটু অন্য নজরে দেখত কারন ওদের নজর অনুপমার দিকে ছিল, কিন্তু নিজেদের বান্ধবী পেয়ে যাওয়ার পরে আর সেই রাতের পার্টির পরে সবার মনের দ্বার যেন খুলে গেছে। ওদের ক্লাস একটু ছন্ন ছাড়া ছিল আগে, গ্রীষ্মের ছুটির পরে সবার রঙ সবার চালচলন পালটে যায়, দেখে মনে হয় যেন এক হাতের পাঁচ আঙুল সবাই, একটা আঙ্গুলে ব্যাথা পেলে সম্পূর্ণ হাত যেন ব্যাথায় ককিয়ে ওঠে।

একদিন লাঞ্চের পরে কোন ক্লাস ছিল না, সব বন্ধু বান্ধবীরা ফ্লুরিস কাফেতে চলে আসে আড্ডা মারতে। শ্রেয়া একবার অনুরোধ করেছিল রূপককে ডাকার জন্য, সবাই চেঁচিয়ে ওঠে যে বাইরের কাউকে ডাকা যাবে না। শেষ পর্যন্ত শ্রেয়া আর ধিমান চুপচাপ বসে পরে। গল্প চলাকালীন পায়েল কিছু পরে বাড়ি যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। অনুপমা আর সবাই কারন জিজ্ঞেস করাতে পায়েল জানায় যে তাড়াতাড়ি বাড়ি না ফিরলে ওর বাবা বকা দেবেন। পায়েলের বাবার সম্বন্ধে শ্রেয়া আর অনুপমা ভালো ভাবে জানে। পায়েল চলে যাবার জন্য প্রস্তুত, অনুপমা একবার মাথা উঠিয়ে আশেপাশে চোখ বুলায়। সাধারণত অনুপমা সাথে থাকলে পায়েল ওর সাথেই বাড়ি ফেরে, কারন পায়েলকে ওর বাড়িতে নেমে জামা কাপড় বদলে বাড়ি ফিরতে হয়। পায়েলের আচরনে অনুপমার মনে একটু সন্দেহ হয়, অনুপমা জোর করে জিজ্ঞেস করে পায়েলের বাড়ি ফেরার আসল কারন। এমন সময়ে পায়েলের মোবাইলে ফোন আসে। সবাই বুঝে যায় যে পায়েল কারুর সাথে দেখা করতে চলেছে। সব বান্ধবীরা পায়েলকে চেপে ধরে ওর মনের মানুষের কথা জিজ্ঞেস করে। চাপাচাপির ফলে শেষ পর্যন্ত পায়েল, সেই ব্যাক্তিকে জানিয়ে দেয় যে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বেড়িয়েছে তাই সেদিন আর দেখা করতে পারবে না। গল্পের মোড় ঘুরে যায় সবার প্রেম কাহিনীর দিকে। অনুপমা পায়েলকে তার প্রেম কাহিনী শোনানোর জন্য চেপে ধরে।

পায়েল মুখে লাজুক হাসি নিয়ে বলতে শুরু করে, “তোরা যখন মুসউরি বেড়াতে গেলি তার মাঝে একদিন আমি পিসির বাড়ি, নৈহাটি বেড়াতে গেছিলাম।”

সঙ্গে সঙ্গে সবার প্রশ্ন ছেঁকে ধরে অনুপমা আর দেবায়নকে, “এই কি রে তোরা কবে মুসউরি বেড়াতে গেছিলি? একা একা, তোদের সাহস কম নয় ত?”

দেবায়ন আর অনুপমা ফিকফিক করে হেসে ফেলে। পায়েল উত্তর দেয় অনুপমার হয়ে, “ওরে ছাগল, দেবায়নের মায়ের সাথে ওরা বেড়াতে গিয়েছিল। বিয়ের আগেই মেয়ে স্বাশুরিকে হাত করে নিয়েছে। দেবায়নের মা, বউমা বলতে একেবারে অজ্ঞান, পারলে কাল ওদের বিয়ে দিয়ে দেয়। আর ওইদিকে দেবায়নকে আর বলিস না, কাকু কাকিমা পারলে দেবায়নকে মাথায় করে রাখে। বর্তমানে দুই বাড়ির এমন সম্পর্ক, বুঝলি কিছু।”

অনুপমা একপ্রকার দেবায়নের কোলে শুয়ে ছিল, সেখান থেকে উঠে পায়েলের মাথায় চাটি মেরে জিজ্ঞেস করে, “ধুর শালা, তুই তোর গল্প বল না শুনি।”

পায়েল, “আমার গল্প বিশেষ কিছু না। পিসির বাড়ি নৈহাটি গেলাম সেখানে পিসতুত দাদার এক বন্ধুর সাথে দেখা হল। নাম অগ্নিহোত্রী বিশ্বাস, ডালহৌসিতে একটা এক্সপোর্ট কোম্পানিতে ভালো চাকরি করে তবে এই মাত্র কথা। দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে কয়েক বার, ভালো ছেলে, তবে প্রপোস করেনি এখন। যেদিন প্রোপস করবে তারপরের দিন তোদের জানিয়ে দেব।”

পায়েলের মুখে নাম শুনে সঙ্গীতা একটু ভাবনায় পরে যায়, পায়েলকে জিজ্ঞেস করে ছেলেটা নৈহাটির কোথায় থাকে। পায়েল জানায়, যে নৈহাটির মীরা বাগানে ওদের বাড়ি। পায়েল কারন জিজ্ঞেস করে সঙ্গীতাকে।

সঙ্গীতা জানায়, “আমার মামা বাড়ি মীরা বাগানে, আমি ছেলেটাকে ভালো ভাবে না হলেও একটু চিনি। ছেলেটা একটু বকাটে আছে, তুই শুধু একটু সাবধানে থাকিস। পুজোতে মামাবাড়ি বেড়াতে গেলে অনেক বার দেখেছি প্যান্ডেলে বসে শালা ঝারি মারছে। প্রবলেম শালা ঝারি মারা নিয়ে নয়, তবে ওর আচার ব্যাবহার আমার ঠিক মনে হয় নি। কেমন ইতর ছোটলোকের নজর ওর। ও ডালহৌসিতে চাকরি করে কি না জানিনা।”

পায়েলের সাথে দিনে চার পাঁচের আলাপ, “কই না ত আমার সেইরকম কিছু মনে হল না ওকে দেখে? পিসতুতো দাদার ভালো বন্ধু, দেখতে শুনতে ভালো, বেশ পয়সা ওয়ালা বাড়ির ছেলে। ওদের নাকি বেশ বড় ব্যাবসা আছে স্টেসানের কাছে।”

সঙ্গীতা ম্লান হেসে বলে, “জানিনা ভাই, তবে একটু বাজিয়ে নিস। ফাটা ঢোল কিনে ফেললে কিন্তু সারা জীবন সেটা কাঁধে বইতে হবে।”

সঙ্গীতার কথা শুনে সবাই পায়েলের দিকে তাকিয়ে সাবধান করে দেয়। পায়েল জানিয়ে দেয় যে একবার ভালো ভাবে জেনে বুঝে নেবে তারপরে না হয় ভালোবাসা প্রেমের কথা চিন্তা করে দেখবে। 
Reply
উনবিংশ পর্ব। (#2)






সঙ্গীতার কথা শুনে সবাই পায়েলের দিকে তাকিয়ে সাবধান করে দেয়। পায়েল জানিয়ে দেয় যে একবার ভালো ভাবে জেনে বুঝে নেবে তারপরে না হয় ভালোবাসা প্রেমের কথা চিন্তা করে দেখবে। 

পায়েলের পরে সবাই সঙ্গীতাকে ছেঁকে ধরে ওদের প্রেমের গল্প শোনার জন্য। সঙ্গীতা চোরা চোখে একবার প্রবালের দিকে তাকায়, অনুপমা সঙ্গীতার থুতনি নাড়িয়ে বলে, “বাপরে, যে মেয়ের মুখে কিনা সকাল বিকেল খই ফুটত সেই মেয়ের চোখে লাজুক হাসি। ও মা গো, রাখি কোথায় এই মেয়েকে।” প্রবালের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে, “মাল আমার জন্মদিনে রান্না করতে করতে আমার সুন্দরী বান্ধবীকে হাতিয়ে নিলি। আমি কি পেলাম? আমার প্রেসেন্ট চাই।”

প্রবাল মাথা নিচু করে লাজুক হেসে অনুপমাকে জিজ্ঞেস করে, “কি চাস বল।”

ধিমান চেঁচিয়ে ওঠে, “অনুপমার জন্মদিনের মতন একটা ধাসু পার্টি চাই।”

ওই দিনের পার্টির কথা সব বন্ধু বান্ধবীদের মনে গাঁথা। সঙ্গীতা আর প্রবাল ছিল না কিন্তু সঙ্গীতা জানে সেই রাতে পার্টিতে কি হয়েছিল। সেই কথা মনে পরে যেতেই সঙ্গীতার সাথে সাথে অনুপমার মুখ লাল হয়ে যায়। দেবায়ন অনুপমার কানেকানে জিজ্ঞেস করে যে পার্টি একটা করা যেতেই পারে। 

পেছন থেকে সমুদ্র চেঁচিয়ে ওঠে, “হ্যাঁ হ্যাঁ সেদিনের মতন পার্টি চাই।”

ধিমান আর দেবায়ন হেসে ফেলে সমুদ্রের কথা শুনে। দেবায়ন সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে, “শালা চুপ করে যা। বেশি বকলে যেখান থেকে বেড়িয়েছিস সেখানে ঢুকিয়ে দেব আবার। বোকাচোদা, নিজের মুরদ নেই ফাউ খেলে সেদিন পার্টিতে টিকে গেলি।” তনিমার দিকে সবার নজর চলে যায়। তনিমা কোন রকমে শ্রেয়ার পেছনে মুখ লুকিয়ে নেয় লজ্জায়।

অনুপমা, সঙ্গীতা আর প্রবালকে বলে, “তোদের বিয়ে যেদিন হবে সেদিন একটা প্রেসেন্ট নেব।”

দেবায়ন এবারে পরাশরকে জিজ্ঞেস করে, “কি রে বাল, তুই শালা কি চুপ করে থাকবি?”

রজত, “শালা প্রেম করলি ত করলি শেষ পর্যন্ত জারিনা, একজন মুসলিম মেয়েকে? তোর বাড়ির লোক ওর বাড়ির লোক মেনে নেবে? শালা তোকে কেটে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেবে দুই বাড়ির লোক, সেটা ভেবেছিস।” 

পরাশর, “প্রেম ভালোবাসা ভাই ধর্ম মানে না। জারিনা আর আমি ভালো ভাবে জানি আমরা কি করছি, এর পরিণতি তুই যা বলেছিস, সেটা ঘটার সম্ভাবনা আশি থেকে নব্বুই শতাংশ। তবে ওই যে বাকি থাকে দশ শতাংশ, আমরা আমাদের ভালোবাসা দিয়ে নিজেদের আত্মীয় সজ্জন পরিবারকে বুঝাতে চেষ্টা করব। যদি শেষ পর্যন্ত না হয় আমাদের মিল, তাহলে দেখা যাবে।”

সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ করে ওঠে। বাধ্য হয়ে পরাশর মাথা চুল্কিয়ে ওদের প্রেমকাহিনী গোড়া থেকে বলতে শুরু করে, “গত অক্টোবরে ঠিক পুজো শেষ হয়ে গেছে। এক সন্ধ্যেবেলায় আমি পার্ক সার্কাস ময়দানের কাছে দাঁড়িয়ে, বাড়ি যাবো বলে বাসের অপেক্ষা করছি। ঠিক পাশ দিয়ে একদল মেয়ে হেঁটে গেল, তার মধ্যে একজন ভারী সুন্দরী দেখতে। পাশের মেয়েদের সাথে দেখে বুঝলাম যে ও মুসলিম, কিন্তু জারিনাকে দেখে একদম মনে হয় না। জারিনাকে দেখে মনে হল যেন স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে একটা ডানা কাটা পরী, অরদিক থেকে আর চোখ ফেরাতে পারলাম না। হাতে স্কুলের ব্যাগ, পরনে স্কুল ড্রেস দেখে বুঝতে পারলাম যে স্কুলে পড়ে, কিন্তু বেশ ডাগর দেহের কাঠাম। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে কিছুদুর ওদের পেছন পেছন হাটলাম। ওদের কথাবার্তা শুনে বুঝলাম ওরা কোচিং থেকে ফিরছে। তারপরে কলেজ ছুটি হলেই আমি পার্ক সার্কাস মোড়ে চলে যেতাম। প্রায় দিন আমি ওখানে ওর জন্য দাঁড়িয়ে থাকতাম ওই সময়ে। কোনদিন দেখা হত, কোনদিন হত না। মাঝে মাঝে জারিনা হাঁটতে হাঁটতে পেছনে তাকাত, আমি মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম। আবার যেই ওরা হাঁটতে শুরু করত আমি ওদের পিছু নিতাম। ওই দুই পা চলেই ওর প্রেমে পরে গেলাম আমি, জানি না তখন কি করব। কিন্তু জারিনার চোখের অধরা ভাষা আর রুপের টান প্রতিদিন বিকেলে আমাকে টেনে নিয়ে যেত ওই পার্ক সার্কাস মোড়ে। রোজদিন চোখে চোখে কথা হত কিন্তু মুখে কিছু বলার সাহস পেতাম না।” 

অনুপমা, শ্রেয়ায় সবাই মাথা নাড়ায়, “তুই শালা সত্যি একটা সুন্দরীকে লাইন মেরেছিস। এবারে শালা বিয়ের পিঁড়িতে যাবি না কবর খানায় যাবি সেটাই দেখার।”

দেবায়ন অনুপমাকে থামিয়ে দিয়ে পরাশরকে বলে, “বাল, শুধু চোখেই দেখা না আরও কিছু হল। শালা, লাইনে আনলি কি করে?”

পরাশর, “বলছি বাড়া, বলছি। প্রত্যেক দিন ওর জন্য অপেক্ষা করতে যেন আমার ভালো লাগত। জারিনা মাঝে মাঝে হাঁটার গতি কমিয়ে দিত, আমি বুঝতে পারতাম বেশ। ওই শুধু চলার পথের সাথী হিসাবে একটু বেশিক্ষণ দেখা হত আমাদের। এর মাঝে ব্যাগড়া বাধায় চার পাঁচ খানা ছেলে, রোজ ওরা অইসময়ে ওই খানে দাঁড়িয়ে থাকে আর মেয়েদের দেখে কমেন্ট মারে। মেয়েগুলো কোনোরকমে ওদের না দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। মাঝে মাঝে জারিনা আমার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে থাকত যখন ওই ছেলেরা কমেন্ট করত। একদিন মাথা খারাপ করা ব্যাপার হল। রাস্তায় কিছু একটা পড়েছিল আর তাতে হোঁচট খেয়ে জারিনা পরে গেল। বইয়ের ব্যাগ হাত থেকে ছিটকে গেল ওই ছেলেদের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেগুলোর হাসি আর লুটপুটি। একটা ছেলে ব্যাগ তুলে দিতে এসে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বেশ উগ্র মন্তব্য করল। আমার মাথায় রক্ত চেপে গেল সেই দেখে। শালা একদম ফিল্মি হিরোর মতন একটাকে ধরলাম আর কষিয়ে গালে একটা চড় কসালাম। ছেলে গুলোর বয়স বেশি না তবে শালা বাঞ্চোতদের দেখে মনে হচ্ছিল চুল্লু খাওয়া মাল। একটা ছেলে ছুরি বের করে আমাকে মারতে তেড়ে আসে। আমি যাকে ধরেছিলাম, তার শ্বাস নলি চেপে বললাম ছুরি দেখালে ওখানেই ওর গলা টিপে দেব। হই হট্টগোলে মেয়েরা বেশ ভয় পেয়ে গেল। এমন সময়ে একজন মাথার পেছনে বাড়ি মারল, আমি তাও যে ছেলেটাকে ধরেছিলাম তাকে ছাড়লাম না। ততক্ষণে জারিনা আর বাকি মেয়েরা চিৎকার করে লোকজন জড় করে ফেলে। বাকি ছেলেগুলো পালিয়ে যায় কিন্তু একটাকে ধরে রেখেছিলাম। লোকজন জড় হয়ে যে ছেলেটাকে ধরেছিল তাকে মারতে মারতে চলে গেল। আমার মাথায় যে বাড়ি মেরেছিল সেখানে বেশ ব্যাথা করছিল, ফুলে উঠেছিল। মাথায় হাত দিয়ে দেখি রক্ত পড়ছে। জারিনা আর মেয়েরা আমার মাথা থেকে রক্ত দেখে ঘাবড়ে যায়। আমি মাথায় হাত দিয়ে রাস্তায় বসে পড়লাম, জারিনা দৌড়ে এল আমার দিকে। ওর ভয়ার্ত মুখ দেখে আমার রক্ত বন্ধ, ব্যাথা বন্ধ হয়ে গেল। জারিনা সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে আর একজনের জলের বোতল থেকে জল নিয়ে ভিজিয়ে আমার মাথায় চেপে ধরে। ওর নরম তুলতুলে আঙ্গুলের স্পর্শে, মাথার ব্যাথা উধাউ হয়ে বুকের ব্যাথা শুরু করে দেয়।” 

রজত, “উরি বাস, একদম শাহরুক খান স্টাইল মেরেছিস। তারপরে কি মাথা ফাটা নিয়ে বাড়ি গেলি নাকি?”

পরাশর, “না রে, একবার ভেবেছিলাম যে কাকাকে একটা ফোন করি। আমার ছোটো কাকা, লাল বাজার ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইন্সপেক্টর, তারপরে ভাবলাম এত ছোটো ব্যাপারে আর কাকাকে জ্বালাতন করা কেন। জারিনা জানাল ওর বাবা ডাক্তার, পাশেই ওদের বাড়ি। ওর বাবা বাড়িতেই আছেন। আমাকে নিয়ে ওদের বাড়িতে গেল। ব্যাস, একদম মাথায় বাড়ি খেয়ে রক্ত নিয়ে হিরোর এন্ট্রি নিলাম। জারিনাদের বেশ বড় দোতলা বাড়ি, পার্ক সার্কাস মোড় থেকে একটু ভেতরে। একতলায় ভাড়াটে আর ওর বাবার একটা চেম্বার। বিকেলে ওর বাবা চেম্বারে ছিলেন। বাড়িতে ঢোকার পরে জারিনার একদম অন্য রুপ। রাস্তায় বান্ধবীদের সাথে কোনদিন বেশি কথা বলতে শুনিনি কিন্তু বাড়িতে ওর মুখে যেন খই ফুটছে। ওর আম্মিজানের কাছে আমার কত তারিফ, কত কিছু। ওর আব্বাজান, ডক্টর মিসবাউল মতিন আন্সারি, পিজি হস্পিটালের মেডিসিনের প্রফেসার। ওর বড় ভাই সঙ্গে সঙ্গে নিচে গিয়ে ওর বাবাকে ডেকে নিয়ে আসে। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা হল, মিষ্টি খাওয়ান হল। পরিচয় পর্ব শেষ হল। ওর দাদা, দানিস আন্সারি, দুর্গাপুর আর.ই কলেজে মেকানিকাল নিয়ে ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে। ওর মা, নাজমা আন্টি খুব ভালো একদম মাটির মানুষ। কথায় কথায় জানতে পারলাম যে ঢাকায় ওদের মামাবাড়ি। ওর মায়ের সাথে কথাবার্তা পরিচয়ে বিশেষ গোঁড়া বলে মনে হল না। কেননা ওকে অথবা ওর মাকে বুরখা পড়তে দেখিনি। কথার ছলে একসময়ে জারিনা আমার ফোন নাম্বার নেয়।” 

দেবায়ন, “বোকাচোদা গাঁড় মেরেছে। প্রপোসালের আগেই শ্বশুর বাড়ি এন্ট্রি মেরে দিলি? তোকে কিমা বানিয়ে দেয় নি ওর বাবা? তুই মাল বাড়িতে কি বললি বে? তোর বাবা জেঠা কি বলল?”

পরাশর, “না রে ওদের বাড়িতে ওদের দেখে আমার সেই রকম মনে হয়নি। মেয়েকে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছি বলে আর জারিনার হাসির ফোয়ারা দেখে মনে হয় আঙ্কেলের আমাকে একটু ভালো লেগে যায়। বাড়ি ফিরে আসার পরে মা জিজ্ঞেস করল আমার মাথা ফাটার কথা, আমি বানিয়ে একটা গল্প বললাম। ঘুমাতে গেলাম কিন্তু চোখের সামনে জারিনার মুখ ভেসে ওঠে। কিন্তু আমার মনে সংশয় থেকে গেল, সত্যি কি জারিনা আমার প্রেমে পড়বে? সংশয় দূর হয় গভীর রাতে। প্রায় রাত একটা বাজে, এক অজানা নাম্বার থেকে ফোন এল আমার কাছে। অন্য দিকে একটা মেয়ের গলা, প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি কেমন আছি, আমার মাথার ব্যাথা কেমন আছে। আমি থ, রাত দেড়টার সময়ে একটা মেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছে আমি কেমন আছি। আমি তখুনি ভেবে দেখলাম মেয়েটা জারিনা ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। ব্যাস আর কি, শুরু হল আমাদের লুকিয়ে প্রেম। আমি রোজ কলেজ ফেরত পার্ক সার্কাস মোড়ে ওর জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম। ঠিক সময়ে ওরা যখন আসতো, তখন বাকিরা জারিনাকে ছেড়ে একটু এগিয়ে যেত। বাস স্টান্ড থেকে ওর বাড়ির দরজা পর্যন্ত পাশাপাশি হাটা। এই টুকু আমাদের হাতে প্রেমের সময়, গল্প করার সময়। আমি শুধু ওর সারাদিনের গল্প শুনতাম, কানের মধ্যে ওর গলার আওয়াজ ভরে উঠত কিন্তু মন ভরত না। তাই রাতে ওর বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরে আমি ওকে ফোন করতাম, রাত দেড়টা দুটো কোনদিন সকাল চারটে পর্যন্ত ফোনে গল্প করে কাটিয়েছি।”

অনুপমা জিজ্ঞেস করে, “উম্মম্ম দারুন প্রেম করেছিস মাইরি। প্রোপস করেছিস কবে? কি ভাবে করলি একটু শুনি?”

পরাশর, “দাঁড়া দাঁড়া, এত তাড়াহুড়ো করলে গল্পের ধারা মাটি হয়ে যাবে। প্রোপস করেছিলাম এক অধভুত ভাবে, ঠিক ভাবিনি সেদিন যে আমি ওকে প্রোপস করব। প্রথম দিকে একা বেড় হতে বেশ ভয় ভয় করত, ওই যা রাস্তায় কথা। আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম আমার সাথে একা ঘুরতে যেতে ওর কোন অসুবিধে আছে নাকি। একা আমি আর ও বেড়াতে যাবো শুনে ওর চোখেমুখে খুশির ছোঁয়া লাগে। আমি ওকে পরীক্ষার আগে একবার দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু একটু সংশয় ছিল, জারিনা যাবে কি না। ভয় ভয় আমি জিজ্ঞেস করলাম, মন্দিরে যাবার কথা। আমাকে হেসে বলল, নিশ্চয় যাবে বলল আমি ওকে নিয়ে যদি জাহান্নুমে যাই তাহলে ও সানন্দে আমার সাথে যেতে রাজি। সেদিন আমাকে আরেকটা কথা বলল, বলল যে ভগবান মানুষের বিশ্বাসে থাকে, ভগবান মানুষের ভালোবাসায় থাকে। ভালোবাসা যেমন মন্দির মসজিদ দেখে না, তেমনি ভগবান হিন্দু মুসলিম শিখ ক্রিস্টান দেখে না। অনেক বড় কথা বলেছিল ওই ছোটো মেয়েটা আমাকে। সত্যি বলছি, মন্দিরে গিয়ে আমি দেখলাম ওর ভক্তি। মন্দিরে বেশির ভাগ মানুষকে দেখলাম শুধু পাথরের মূর্তিকে প্রনাম করতে, সেখানে জারিনাকে দেখলাম যেন নিজের মাকে প্রনাম করছে। কপালে মন্দিরের সিঁদুরের টিপ পরে তাকিয়েছিল আমার দিকে, হাঁ হয়ে গেছিলাম ওর মুখ দেখে। সেদিন মনে হয়েছিল ওই মন্দির প্রাঙ্গনে ওকে জড়িয়ে ধরি। তারপরে ওর পরীক্ষা চলে এল মার্চে, খুব ভয়। সে কয়দিন আর দেখা হল না। পরীক্ষার পরে দেখা সাক্ষাৎ একটু কমে যায়, বাড়ি ছেড়ে বের হতে পারে না। বাড়ি থেকে বের হলে সাথে ওর এক বান্ধবী, আহীদাকে নিয়ে আসত। লুকিয়ে চুরিয়ে বেশ কয়েকবার সিনেমা দেখতে গেছি তিনজনে, ব্যাস আর কি। তবে মাঝে মাঝে আহীদা আমাদের ছেড়ে দিত, শুধু বলে দিত যে বাড়ি ফেরার আগে যেন ওকে একটা ফোন করে দেওয়া হয় তাহলে আহীদা পার্ক সার্কাস মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।” 

অনুপমা রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “ধুর বাড়া, প্রোপস করলি কি করে সেটা বল?” সবাই একসাথে চেপে ধরে পরাশরকে।

পরাশর হেসে বলে, “ওর পরীক্ষার পরে একদিন ওদের নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম। এক বিকেলে মেট্রোতে একটা হিন্দি সিনেমা দেখার পরে আউট্রাম ঘাটের স্কুপে বসেছিলাম আমরা তিনজনে। আহীদা নিচে গেছিল আমাদের আইস্ক্রিম নিয়ে আসার জন্য। বিকেলের সূর্য ঠিক দ্বিতীয় হুগলী সেতুর পেছনে পাটে বসতে চলেছে। ঘোলা গঙ্গার জলে কমলা রঙ লেগেছে, জারিনা চুপ করে বসে সেই গঙ্গার জল দেখে চলেছে। আমি আলতো করে ওর কাঁধে হাত ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে কি ভাবছে। আমার দিকে তাকিয়ে ওর মুখ শুকিয়ে গেল, আমি চমকে গেলাম ওর শুকনো মুখ দেখে। আমি ওকে শুকনো মুখের কারন জিজ্ঞেস করাতে ও বলল, যে কারন ওর জানা নেই। আমি ওকে নিজের দিকে টেনে নিলাম, বাম বাজুর উপরে মুখ ঘষে আমাকে বলল যে ওর খুব ইচ্ছে করছে এই ভাবে বসে থাকতে। আমি তখন ওকে জিজ্ঞেস করলাম যে সাড়া জীবন আমার সাথে এই রকম ভাবে বসতে চায় কি না। চুপ করে আমার দিকে না তাকিয়ে বুকের উপরে মুখ গুঁজে মাথা নাড়িয়ে বলে, ওই রকম ভাবে লুকিয়ে থাকতে চায়। আমি ওর মাথায় ছোটো চুমু খেয়ে বলেছিলাম যে ওকে আমি বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখব। সেদিন দুই জনেই জানতাম আমাদের ভবিষ্যৎ অত প্রসস্থ নয়, আমাদের সম্পর্কের ধারা অতি সহজে সাগর সঙ্গমে মিলিত হবে না। হয়ত কোনদিন হবে না, কিন্তু ওই টুকু প্রেম, ওই টুকু ভালোবাসা দিয়ে বুক ভরিয়ে নিয়েছিলাম আমরা। আহীদা এসে দেখে যে আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বসে। আহীদার হাতের ছোঁয়ায় জারিনার সম্বিৎ ফেরে। চোখ মুছে হেসে আহীদাকে বলে সব কথা। আহীদা চুপ করে শুনে বলে যে এই ভয় পেয়েছিল, জানত এইরকম কিছু একটা হতে চলেছে। সাবধান করে দেয় জারিনাকে কিন্তু সেই সাথে জানিয়ে দেয় যে আমাদের পালিয়ে বিয়ে করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। জারিনা পালিয়ে বিয়ে করতে নারাজ, ওর আব্বাজানের বুকের পাঁজর, আম্মির চোখের মণি। আমাকে বলে যে ওর বাড়িতে যেতে, বাড়ির সাথে কথা বলে সবকিছু ঠিক করতে। আমি তখন ওকে আমাদের বাড়ির ব্যাওয়ারে কিছুই জানাই নি।”

“আমাদের বাড়ি একদম গোঁড়া, জেঠু পুরানো দিনের মানুষ, বাবাকে হয়ত কিছু বুঝালেও বুঝবে কিন্তু জেঠুকে বুঝিয়ে ওঠা অসম্ভব। কাকার কথা কেউ কানে নেয় না বললেই চলে। আমি কাকিমাকে সব কথা জানিয়েছিলাম, কিন্তু কাকিমার কথা কেউ ধরতব্যের মধ্যে আনেনা। মাকে বলেছিলাম যে আমি যদি অন্য ধর্মের কাউকে ভালোবাসি তাহলে আমার বাড়ি কি সেই সম্পর্ক মেনে নেবে? মা এক কথায় মানা করে দিয়েছিল আমাকে। বলেছিল মায়ের ঠাকুর ঘরে ভিন্ন ধর্মের মেয়ের প্রবেশ নিষেধ। বাবাকে অথবা জেঠুকে জানাবার প্রশ্ন ওঠে না। একাত্তরে আমার ঠাকুরদাকে নাকি মুসলমানেরা মেরে ফেলে দিয়েছিল, সেই রাগ আজ পর্যন্ত বুকে পুষে রেখেছে। ওদিকে জারিনা এখন ওর বাবার কাছে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে কিছুই জানায় নি। জারিনার মা কিছুটা জানেন তবে আন্টি কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। আব্বাজানকে একদিন না একদিন জানাতে হবে, সেইদিনের আশঙ্কা দিন গুনছে জারিনা। জারিনা জানে ভালো ভাবে যে আঙ্কেলকে জানালে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে, জারিনা প্রস্তুত সেই বিশ্বজুদ্ধ সামাল দিতে। সব মিলিয়ে, আমার বাড়ি নাকচ করে দিয়েছে এক প্রকার আর ওইদিকে হয়ত আঙ্কেল জানলে কি হবে সেটা জানা নেই।”
Reply
উনবিংশ পর্ব। (#3)





ধিমান মাথা চুলকে বলে, “শালা, তুই বাল একটা প্রেম করেছিস। হ্যাঁ গল্প শুনে মনে হচ্ছে প্রেম কাহিনী হচ্ছে একদম। লুকিয়ে চুরিয়ে প্রথম দেখা, লুকিয়ে চুরিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া, আর বড় কথা হচ্ছে বাড়ির সাথে যুদ্ধ। আমি শালা তার মানে ঠিক মতন প্রেম করে উঠতে পারলাম না আর। ঋতুপর্ণাকে একটা বন্ধুর পার্টিতে দেখলাম, তারপরে সেই বন্ধুকে বললাম যে বাল একটু লাইন করিয়ে দে। ব্যাস, ঋতু প্রথম দেখাতেই গলে গেছিল তাই ঋতুকে কাবু করতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। বাবা মা জানে ঋতুর কথা, বাবার একটু আপত্তি আছে কারন ঋতু নার্স, মায়ের একদম চোখের মণি হয়ে গেছে ঋতু। বাবাকে বশ করতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না। অইদকে ঋতুর পরিবারের দিক থেকে বিশেষ বেগ পেতে হবে না আশা করা যায়। ওর বাবা নেই, ওর মা জানেন আমাদের ব্যাপার। ওর মায়ের সাথে দেখা হয়েছে একবার আমার। আমাদের একদম নির্জলা, নির্ভেজাল প্রেম। কোন টানাপড়েন নেই, সোজা সরল গাড়ি একদম হাইওয়ে দিয়ে হাঁকিয়ে চলেছে।”

দেবায়ন হো হো করে হেসে বলে, “ভাই আমার অবস্থা এক। কলেজের প্রথম দিনে শালা হুমড়ি খেলাম অনুপমাকে দেখে।”

ধিমান, “শালা তুই একা না বে, অনেকে সেদিন হুমড়ি খেয়েছিল অনুপমাকে দেখে। বাল, তুই হাত মেরে নিলি।”

অনুপমা ভুরু কুঁচকে হেসে বলে, “বাল ছেঁড় তোরা, আমার পেছনে কলেজের অর্ধেক কেন শালা সারা কোলকাতা আমার পেছনে। এবারে সবাই যে যার মনের মানুষ পেয়ে গেছে, ব্যাস আবার কি। এবারে তনিমার একটা হিল্লে হলে হয়।” দেবায়নের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি কি আমাদের গল্প বলতে শুরু করে দিলে নাকি?”

দেবায়ন, “সবাই যখন বলছে তাই একটু বলে দেই আর কি।” 

পায়েল হেসে বলে, “সেদিন শালা বৃষ্টি না হলে বড় ভালো হত। তাড়াতাড়ি ট্যাক্সি পেয়ে যেতাম আর এরা দুইজনে আটি চুষত।”

অনুপমা পায়েলের মাথায় টোকা মেরে বলে, “আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছিল ও। আর কেন অপেক্ষা করতাম। সেদিন যদি কিছু না বলত তাহলে ট্যাক্সির নিচে চলে আসতাম।”

পরাশর, “ওকে ওকে ঠিক আছে, যে টুকু আছে সেই টুকু শুনি একটু।”

দেবায়ন, “যাই হোক সিঁড়িতে ধাক্কা খাওয়ার কথা কারুর অজানা নেই। তারপরে একটু বন্ধুত হল, তারপরে একদিন কফি হাউসে করলাম প্রোপস, ডারলিং একবারে গলে মোম। আমার মাকে কয়েক মাস আগে জানিয়েছি, মা অনু বলতে অজ্ঞান। আর কাকু কাকিমার এক অবস্থা, বাড়ির লোকের সাথে যুদ্ধ নেই, কথা কাটাকাটি নেই, একদম হাইওয়ে দিয়ে চলছে আমাদের প্রেমের গাড়ি। একটু এবর খাবড় না থাকলে ঠিক বোঝা যায় না যে হ্যাঁ প্রেম করছি।”

পায়েল চেঁচিয়ে বলে, “শালা তোর গল্প আমি সব জানি। তুই বাড়া আর বুক ফুলিয়ে কিছু বলতে যাস না।”

দেবায়ন পায়েলকে মিচকি হেসে বলে, “কেন সেদিন রাতে কি ডোজ ঠিক পড়েনি? আবার চাই নাকি?” অনুপমা, দেবায়নের বাজুতে চিমটি কেটে চুপ করে যেতে অনুরোধ করে। 

গল্প করতে করতে সন্ধ্যে হয়ে যায়। বাড়ির উদ্দেশ্যে কিছু পরে সবাই রওনা দেয়। পথে যেতে যেতে অনুপমা পায়েলকে একবার অগ্নিহোত্রীর কথা জিজ্ঞেস করে। পায়েল সত্যি কথা বলে ফেলে, অনুপমাকে বলে যে অগ্নিহোত্রীর ব্যাপারে বিষদ কিছু জানা নেই তবে ওর পিসতুত দাদার বন্ধু হিসাবে ভালো লাগে এই মাত্র। পরিচয়ের পরের পর্বের দিকে এগোনোর আগে একবার অন্তত অগ্নিহোত্রীর ব্যাপারে সম্পূর্ণ জেনে নেবে। 



পরাশরের সাথে দেবায়নের কথা হয়। পরাশর জানায় যে কিছু দিনের মধ্যে ঈদ, ঈদে জারিনার বাড়িতে জারিনার মা ওকে ডেকেছে। নিজেদের সম্পর্কের সম্বন্ধে কিছু কথাবার্তা বলতে চায় পরাশর, বুকের মধ্যে যুদ্ধের দামামা বাজছে তাও ভালোবাসা থেকে পিছিয়ে যাবার ছেলে নয়। 

বাড়ি ফিরে অনুপমা দেখে যে ওর ভাই মুখ শুকনো করে বসে আছে। ভাইকে কারন জিজ্ঞেস করলে, অঙ্কন উত্তর দেয় যে একটা বাইকের বায়না ধরেছিল, বাবা বকে চুপ করিয়ে দিয়েছে। অনুপমা ভাইয়ের কথা শুনে হেসে ফেলে। মাকে জিজ্ঞেস করে বাইক না কিনে দেওয়ার কারন। পারমিতা জানায় যে অঙ্কনের ইদানিং পড়াশুনায় বিশেষ মন নেই। কোচিঙের স্যার নাকি একদিন পারমিতাকে ফোনে জানিয়েছে যে মাঝে মাঝে অঙ্কন কচিঙ্গে আসে না। অনুপমা সব শুনে রেগে যায়। অঙ্কনকে খাবার পরে নিজের ঘরে নিয়ে যায়, জিজ্ঞেস করে কচিঙ্গে না যাবার কারন। মুখ দেখে অনুপমা বুঝতে পারে যে অঙ্কন প্রেমে পড়েছে। লাজুক হেসে অঙ্কন জানায় যে কয়দিন কোচিং যায় নি, সেই কয়দিন এক বান্ধবীকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গেছিল। ভাইয়ের নতুন প্রেমের কথা শুনে অনুপমা উৎসুক হয়ে যায়। ভাইয়ের বান্ধবীর কথা জিজ্ঞেস করাতে, অঙ্কন জানায় যে স্কুলের এক বান্ধবী, নাম গরিমা মিত্তল, মাড়োয়ারি মেয়ে। অনুপমা গরিমার ফটো দেখতে চাইলে, মোবাইলে একটা মেয়ের ফটো দেখায় অঙ্কন। মেয়েটা বেশ সুন্দরী, পাতলা আর ছিপছিপে গড়নের, মুখের গঠন ডিম্বাকৃতি, গায়ের রঙ বেশ ফর্সা। অনুপমার কাছে অঙ্কন বায়না ধরে যে বাবাকে বলে কয়ে ওকে বাইক দিয়ে হবে। অনুপমা জিজ্ঞেস করলে জানায় যে বাইকে গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে কোলকাতা ঘুরবে। অনুপমা হেসে ফেলে ছোটো ভাইয়ের কথা শুনে। অনুপমা সঙ্গে সঙ্গে রাতে দেবায়নকে ফোনে ভাইয়ের সব কথা জানিয়ে দেয়। দেবায়ন বলে যে ছেলে বড় হয়ে গেছে, নিজের মনের মতন সাথী খুঁজে পাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। এখন খেলা ধুলা করে বেড়াবে কিছু দিন, মন ভরে গেলে হয়ত নতুন সাথী খুঁজতে বেড়িয়ে যাবে। 

কয়েকদিন পরে বাবাকে অনেক অনুরোধ করে অঙ্কনের জন্য বাইক কেনা হয়। বাইক পেয়ে অঙ্কন ভারী খুশি, সেই সাথে অনুপমা জানিয়ে দেয় যে, এবারে যেন পড়াশুনাতে মন দেয় আর যেন কোনদিন কোচিং পালিয়ে সিনেমা দেখতে না যায়। অনুপমা, মাকে একদিন রাতে জানায় যে ওর ভাই প্রেম করছে। সেই শুনে পারমিতা খুব খুশি, অঙ্কনকে বলে গরিমাকে বাড়িতে ডাকতে। উচ্চমাধ্যমিকে যাবার পরে অঙ্কনের বয়সের সাথে সাথে আচরনের অনেক পরিবর্তন ঘটে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কথা বলা। আগে শুধু দিদির সাথেই মন খুলে কথা বলতে পারত, মায়ের কাছে মন খুলে কথা বলার অবকাশ কোনদিন পায়নি। মায়ের মুখে গার্লফ্রেন্ডের কথা শুনে অঙ্কন জানিয়ে দেয় যে ভবিষ্যতে একদিন নিজের গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে বাড়িতে আসবে।

অনুপমা আর দেবায়নের জীবনে নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ বিদায় নেয়। মঙ্গলবার আর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যেন সাজ সাজ রব পরে যায়, সকালে উঠে কলেজে দৌড়ানো, তারপরে কম্পিউটার ক্লাস, অনেক রাত করে বাড়ি ফেরা। দেবায়নকে ওর মা জানিয়ে দিয়েছেন যে কম্পিউটার ক্লাসে অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে, তাই টাকা একটু সঞ্চয় করে নিয়ে পুজোর আগে দেবায়নের জন্য বাইক কিনে দেবে। দেবায়ন বোঝে মায়ের কষ্ট, তাই বাইকের জন্য বেশি আব্দার করেনি। দেবশ্রী একদিন বিকেলে অফিস থেকে এসে বলে যে এক শুক্রবার অনুপমাকে নিয়ে বাড়িতে আসতে, অনেকদিন দেখা পায়নি হবু বৌমার। সেই শুনে দেবায়ন বেশ খুশি। দেবশ্রী, পারমিতাকে ফোনে জানিয়ে দেয় যে আগামী শুক্রবার অনুপমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে, দিন দুই থাকবে দেবশ্রীর কাছে। রাতের বেলা দেবায়ন আর অনুপমা, ফোনে গল্প করে কাটিয়ে দেয়। 

পরেরদিন বিকেলে কলেজের পরেই দুইজনে বাড়ি পৌঁছে যায়। সেদিন দেবশ্রী তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফেরে। হবু শ্বাশুরিকে দেখে অনুপমা বেশ খুশি। দেবশ্রী অনেকদিন অনুপমাকে দেখেনি তাই বেশ খুশি। অনুপমা আর দেবশ্রী রান্না ঘরে রান্নায় ব্যাস্ত। দেবায়ন বসার ঘরে বসে ওর জীবনের প্রধান দুই মহিলাকে দেখে। 

অনুপমা মিচকি হেসে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কি দেখছ এমন ভাবে?”

দেবায়ন, “কেন তোমাদের দেখতে দোষ আছে নাকি?”

দেবশ্রী হেসে বলে, “আজকে কিন্তু অনু আমার কাছে শোবে। ভুলেও বেড়াতে যাবার কথা ভাবিস না যেন।”

হেসে ফেলে দেবায়ন, “না না, তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে কেউ তোমাদের আলাদা করতে পারবে না। এহেন অবস্থায় দুই সিংহীর মাঝে কেন এক ছোটো হরিণ শাবক নিজের প্রান দেয়?”

অনুপমা, “হ্যাঁ আর বলতে, তুমি হরিণ শাবক। তাহলে রাতে শুধু ঘাস খেয়ে থাকবে আর আমরা কষা মাংস আর লুচি খাবো।”

খাবার সময়ে দেবায়ন মাকে বলে, “মা, তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।”

দেবশ্রী ভুরু কুঁচকে দেবায়নের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আবার কি করলি তুই, না নতুন কিছু চাই তোর।”

দেবায়ন বলে, “না মা, এবারে প্রবলেম ঠিক আমার নয়। আমার এক বন্ধুর, পরাশর।”

অনুপমা দেবশ্রীকে বলে, “মামনি, তোমাকে কিছু একটা উপায় বের করতে হবে।”

দেবশ্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কি উপায়, কি ব্যাপার। সব কথা শুনি আগে তারপরে বিচার করা যাবে।”

দেবায়ন বলতে শুরু করে, “মা, আমাদের এক বন্ধু আছে পরাশর। আমাদের সাথে পড়ে। সেই ছেলে একটা মুসলমান মেয়েকে ভালোবাসে। মেয়েটার নাম জারিনা, বেশ মিষ্টি দেখতে। মুশকিল হচ্ছে, পরাশরের বাড়িতে কেউ জারিনাকে মেনে নেবে না। ওইদিকে জারিনার বাড়িতে জারিনার মা একটু নরম হয়েছেন। ঈদের পরে পরাশর জারিনার বাড়িতে গিয়েছিল। জারিনার আম্মিজান পরাশর আর জারিনার সব কথা জানে, মন মানতে চাইলেও সমাজ আত্মীয় সজ্জন যে মানতে চায় না। জারিনার বাবাকে জারিনার মা কথার ছলে পরাশর আর জারিনার ব্যাপারে কিছু আচ আগে থেকে দিয়েছিলেন। জারিনার বাবা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন এহেন সম্পর্ক সম্ভব নয়। পরাশরকে বলেছেন যে মেয়েকে সেই ছেলেগুলোর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে বলে যেন ভাবে না যে মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে। সেই কথা শুনে, পরাশর আর জারিনা খুব ভেঙ্গে পরে। জারিনা কান্নাকাটি জুড়ে দেয়, সেই সাথে আত্মহত্যার কথা বলে। মেয়ের মুখ দেখে ওর আব্বাজান কিছুটা নরম হন, কিন্তু জারিনার আব্বাজানের এক কথা, পরাশরকে ধর্মান্তরিত হতে হবে সেই সাথে জারিনার বাবা, পরাশরের পরিবারের সাথে কথা বলতে চায়। এখানে সমস্যা হচ্ছে যে, পরাশরের মা এক কথায় জানিয়ে দিয়েছে যে ভিন্ন ধর্মীর মেয়েকে বাড়ির বউমা করে আনতে নারাজ। কোন এক সময়ে পরাশরের ঠাকুরদাকে বাংলাদেশে মুসলমানেরা হত্যা করেছিল, সেই কথা নিয়ে আজো বসে আছে ওর বাবা জেঠা। পরাশর কি করবে কিছু ভেবে পাচ্ছে না।”

অনুপমা, “মামনি, তুমি আমাদের ডিক্সানারি, তুমি কিছু উপায় বলে দাও।”

দেবশ্রী হেসে ফেলে, “তোরা দুইজনে কি সারা পৃথিবীর সমস্যার সমাধান করতে বেড়িয়েছিস?”

অনুপমা বায়না ধরে, “না মামনি, কিছু একটা তোমাকে করতেই হবে। জারিনার বাবাকে কিছু করে বুঝাতে চেষ্টা করতে হবে আর সেই সাথে পরাশরের বাড়িকে। জারিনার বাবা কিছুটা নরম হয়েছেন, এবারে পরাশরের বাড়িকে কি করে নরম করা যায় সেটা বলে দাও।”

দেবশ্রী বলে, “কেন? যেমন ভাবে জারিনা ওর বাড়িকে নরম করেছে তেমনি ভাবে মানসিক চাপ দিয়ে পরাশর নিজের পরিবারকে চাপে ফেলুক।”

দেবায়ন, “মা, সে কাজ করা হয়ে গেছে। ওর বাবা আর জেঠা ওকে ত্যাজপুত্র করে দেবে বলেছে। অইসব আত্মহত্যার কথা ধোপে টেকেনি পরাশরের বাড়িতে। ওর কাকাও কিছু বুঝিয়ে উঠতে পারেনি ওর বাবা জেঠাকে।”

দেবশ্রী, “কাল একবার পরাশরকে বাড়িতে ডাক, আগে ওর সাথে কথা বলে দেখি। আর আমি একজন বাইরের মানুষ হয়ে কি মুখে দুই বাড়ির সাথে কথা বলব?”

দেবায়ন আর অনুপমা বেশ চিন্তায় পরে যায়। দুই পরিবারের সাথে যেচে কথা বলা ঠিক নয়, যেখানে দেবশ্রী দুই পরিবারের কাউকে চেনে না। দেবশ্রী জানিয়ে দেয় যে পরাশরের সাথে কথা বলে সব কিছু জেনে তবে কিছু একটা বিচার করবে। পরের দিন যথারীতি পরাশর, দেবায়নের বাড়িতে আসে। সেই সময়ে অনুপমা অথবা দেবায়ন, দুইজনেই কম্পিউটার ক্লাসে ছিল, তাই পরাশরের সাথে দেখা হয় না। বিকেলে বাড়িতে ফিরে দেবায়ন, মাকে পরাশরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। দেবশ্রী জানায় যে বর্তমানে ওদের পড়াশুনাতে মন দেওয়া উচিত। সময় মতন সব ঠিক হয়ে যাবে। 

অনুপমা জিজ্ঞেস করে, “মামনি, কি করে ঠিক করবে তুমি?”

দেবশ্রী হেসে বলে, “পরাশরের মুখে সব কিছু শুনলাম। ওদের যৌথ পরিবার, ওর জেঠা বাড়ির কর্তা। ওর জ্যাঠা পুরানো দিনের মানুষ, শুনে মনে হল ভাঙ্গবে তবু মচকাবে না। ওর বাবাকে হয়ত বুঝান সম্ভব হবে, তবে মাথা ঠাণ্ডা করে কথা বলতে হবে। ওর কাকা ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইন্সপেক্টর হলে কি হবে, বাড়িতে ভিজে বেড়াল। ওর মায়ের আর ওর কাকিমার কথা বলা যেতে পারে শুধু হেঁসেল ঠ্যালা ছাড়া আর কিছু নয়। এমন যৌথ পরিবার এখন এই কোলকাতায় আছে। ওর জেঠুর সামনে নাকি কারুর মুখ ফোটে না। অনেক ভালো ভালো শাল গাছ আমার সামনে নুইয়ে পড়েছে। যেখানে ছলকপটে কাজ হয় না, সেখানে ভালোবাসা দিয়ে কাজ হয়। ভাবছি একদিন দুই বাড়িকে আমাদের বাড়িতে নেমতন্ন করব। কিন্তু তার আগে কোন এক আছিলায় তোদের মধ্যে কাউকে পি.জি হসপিটালে গিয়ে জারিনার বাবার সাথে পরিচয় করতে হবে। তোদের দুই জনের মধ্যে কেউ এগিয়ে গেলে তারপরে না হয় আমি ওর বাবার সাথে পরিচয় করতে পারব। তারপরে, পরিচয় বাড়লে জারিনার পরিবারকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করতে অসুবিধে হবে না। এবারে পরাশরের বাড়ি কি করে যাওয়া যায়। দেবায়ন আশা করি ওদের বাড়িতে গেছে, তাই অনায়াসে একদিন ওদের ডেকে বাড়িতে খাওয়ান যায়। ওই দিনে জারিনার বাবা মা আর পরাশরের বাবা মায়ের সাথে এক সাথে কথা বলব। সামনা সামনি দুই অভিভাবককে বসিয়ে কথা বলে বুঝিয়ে দেখি।”

অনুপমা দেবশ্রীকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে বলে, “তোমার কাছে সব কিছুর সমাধান আছে, তাই না মামনি।”

দেবশ্রী হেসে বলে, “গত কাল থেকে অনেক তেল মেরেছিস, তাই ভাবলাম একটু চেষ্টা করে দেখি।”

দেবায়ন, “কিন্তু কি করে জারিনার বাবার সাথে পরিচয় হবে? সেটা একটু বলে দাও?”

দেবশ্রী, “সব বুদ্ধি কি আমি দেব নাকি? যেমন করে পরাশর জারিনার বাড়িতে গেছে, ঠিক তেমন করে তোমাকে ওর বাড়ির লোকের সাথে পরিচয় করতে হবে।”

অনুপমা হেসে বলে, “চিন্তা নেই মামনি, পার্ক সার্কাস মোড়ে দাঁড়িয়ে আমি ওর ঠ্যাঙ ভেঙ্গে দেব, ব্যাস আবার কি। পরাশর সাথেই থাকবে, অগত্যা ওকে নিয়ে জারিনার বাড়িতে যেতেই হবে।”

সেই শুনে দেবায়ন অনুপমার চুল টেনে বলে, “মা এবারে তোমার বউমা কিন্তু আমার ওপরে চড়াও হচ্ছে। মারপিট করলে কিন্তু আমি ছেড়ে দেব না।” দুইজনে মারামারি শুরু করে দেয়। 

দেবশ্রী মৃদু ধমক দিয়ে বলে, “ঠিক আছে, দেখা যাক, ওই ঠ্যাঙ ভাঙ্গতে হবে না। দেখি কাউকে পাই কিনা যে পি.জি হসপিটালে কাজ করে। তার মারফত একবার ডক্টর মিসবাউলের সাথে দেখা করে আসব।”

খাওয়া শেষ, দেবায়ন টিভি দেখতে ব্যাস্ত। মায়ের কড়া নির্দেশে অনুপমার ধারে কাছে যেতে পারেনি। গত রাতে ঘুমিয়ে যাবার পরে মায়ের রুমে উঁকি মেরেছিল দেবায়ন। যথারীতি, প্রেয়সীর অর্ধ নগ্ন শরীর দেখে ক্ষান্ত হয়ে থাকতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নিজের বিছানায় এসে, লুক্কায়িত বাক্স থেকে অনুপমা, পারমিতার প্যান্টি বের করে নাকের কাছে শুঁকে আত্মরতি করে ঠাণ্ডা করতে হয়েছে নিজেকে। 

সেদিন অনুপমা একটা পাতলা স্লিপ গায়ে দিয়ে দেবায়নের কোল ঘেঁসে বসে টিভি দেখছিল। টিভির দিকে বিশেষ মন ছিল না অনুপমার, মন বড় আনচান করছিল একটু দেবায়নের সান্নিধ্য পাওয়ার। দেবশ্রীর রুমের দিকে তাকিয়ে লুকিয়ে দুই জনে পরস্পরের ঠোঁটের মাঝে বিলীন হয়ে যায়। চুম্বনে মর্দনে কামাগ্নি জ্বলে উঠতে বিশেষ সময় নেয় না, কিন্তু কিছু করার উপায় নেই। দেবশ্রী নিজের রুম থেকে অনুপমাকে ডাক দেয়, বলে যে সোমবার ওদের কলেজ আর দেবশ্রীর অফিস, সুতরাং তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে যাতে সকাল সকাল উঠতে পারে। অগত্যা অনুপমা, দেবায়নের কোল থেকে উঠে শুকনো মুখে দেবশ্রীর রুমে ঢুকে পরে। দেবশ্রী কিছু অফিসের কাজে ব্যাস্ত। 

রাতে মামনিকে অফিসের কাজে ব্যাস্ত দেখে অনুপমা জিজ্ঞেস করে, “তোমার অফিসে ইদানিং কি কাজ খুব বেড়ে গেছে?”
Reply
উনবিংশ পর্ব। (#4)





রাতে মামনিকে অফিসের কাজে ব্যাস্ত দেখে অনুপমা জিজ্ঞেস করে, “তোমার অফিসে ইদানিং কি কাজ খুব বেড়ে গেছে?”

দেবশ্রী, ল্যাপটপ থেকে মাথা তুলে অনুপমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, “তা একটু বেড়ে গেছে।”

অনুপমা, “দিল্লীর কথা কি হল? তুমি কি ভেবেছ?”

ম্লান হেসে দেবশ্রী উত্তর দেয়, “তোরা যখন দিল্লী যাবি না তাহলে আমি গিয়ে কি করব? তাই আর সেই নিয়ে ভাবছি না। দেখি আরো কয়েক মাস এমনিতে আমি মিস্টার ঠাকুরকে একটু হিন্ট দিয়েছি যে আমার দিল্লী আসা হবে না। তাই মনে হয় আমার কাজ বেড়ে গেছে। কোলকাতা অফিসের সাথে সাথে অন্য অফিসের কাজ গুলো আমার ঘাড়ে ধিরে ধিরে এসে পড়ছে।”

অনুপমা জিজ্ঞেস করে, “মামনি একটা কথা জিজ্ঞেস করব?” দেবশ্রী জিজ্ঞাসু চাহনি নিয়ে অনুপমার দিকে তাকায়, অনুপমা জিজ্ঞেস করে, “মামনি, মিস্টার দেবনাথ অথবা মল্লিকা তোমাকে ফোন করে?”

প্রশ্ন শুনে দমে যায় দেবশ্রী, মুসউরি ভ্রমণের পরে বেশ কয়েক মাস খুব ফোনে কথা হত ধৃতিমানের সাথে। গত কয়েক সপ্তাহে সেই ফোনের কথা একটু কমে আসে। অনুপমার দিকে ম্লান হেসে বলে, “হ্যাঁ, কথা হয়, কিন্তু তুই কেন জিজ্ঞেস করছিস?”

অনুপমা হেসে বলে, “না এমনি জিজ্ঞেস করছি। মিস্টার দেবনাথ কিছু বলেছে তোমাকে, কোলকাতা আসছে কি ওরা?”

হেসে ফেলে দেবশ্রী, “তোর মামনিকে কি এই বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে চাস? তোর মাথা খারাপ হয়েছে নাকি?”

অনুপম হেসে দেয়, “না সেটা নয় মামনি, তবে তুমি বড্ড একা। আমি জানি অনেক কিছু তাই বলছিলাম। তুমি একবার মিস্টার দেবনাথ কে বলে দেখতে পারো কোলকাতায় আসার কথা। দেখো না কি বলে?”

দেবশ্রী, “আমার বলা কি সব? ওর একটা মেয়ে আছে না, মল্লিকার ইচ্ছে অনিচ্ছে বলে কিছু নেই নাকি?”

অনুপমা বলে, “হ্যাঁ তা আছে বৈকি। তুমি কি করবে কিছু ভাবলে?”

দেবশ্রী হেসে ফেলে অনুপমার কথা শুনে, “মেয়ে আমার অনেক বড় হয়ে গেছে। ছাড় অইসব আলোচনা, চল শুয়ে পরি।”

অনুপমা দেবশ্রীকে জড়িয়ে ধরে আব্দারের সুরে বলে, “মামনি প্লিস একটু দেবায়নের কাছে যাবো?”

দেবশ্রী ভুরু কুঁচকে হেসে বলে, “একদম দুষ্টুমি নয়। কাল সকাল সকাল ওঠা আছে, তোদের কলেজ আর আমার অফিস আছে।” 

পরেরদিন কলেজে পৌঁছান মাত্র, পরাশর দেবায়নকে দেখে জড়িয়ে ধরে বলে যে পায়ের ধুল দিতে। বাবা মায়ের কথা শুনে আর জারিনার বাড়ির কথা শুনে একপ্রকার দুই জনে আশা ছেড়ে দিয়েছিল। জারিনা ভেঙ্গে পড়েছে, চাইলেও দেখা করতে পারছে না পরাশরের সাথে। দেবায়নের মায়ের কথা শুনে একটা আশার ক্ষীণ আলো এই ঘন অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে। পরাশর বলে যে দেবায়নের মা বলেছেন কোন ভাবে নাম পরিচয় না জানিয়ে জারিনার সাথে পরাশরের মায়ের সাক্ষাৎ করাতে হবে। জারিনাকে দেখে এক মেয়ে হিসাবে পছন্দ হয়ে গেলে তারপরে পরাশরের মায়ের মন গলানো সোজা হয়ে যাবে। কিন্তু কি ভাবে সেটা সম্ভব হবে সেটাই বুঝে পাচ্ছে না পরাশর। অনুপমা বলে যে একটা উপায় করে দেবে যাতে পরাশরের মায়ের সাথে জারিনা সাক্ষাৎ হয়। পরাশর, অনুপমাকে বলে যদি ওদের পরিবার রাজি হয়ে যায় জারিনা আর পরাশরের সম্পর্কে, তাহলে সারা জীবনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকবে অনুপমা আর দেবায়নের কাছে। অনুপমা হেসে বলে, কাজের সময় যেন পাশে থাকে তাহলেই হবে। পরাশর বলে যে পি.জি হসপিটালে গিয়ে দেবায়নের মায়ের সাথে জারিনার বাবার পরিচয় করিয়ে দেবে। দেবায়ন, পরাশরের কানেকানে মজা করে জানায় যে জারিনার সাথে প্রথম রাত দেবায়ন কাটাতে চায়। সেই কথা শুনে পরাশর মারতে ছোটে দেবায়নকে। 

একদিন শ্রেয়া আর অনুপমা, জারিনার কলেজ যায় জারিনার সাথে দেখা করতে। ওদের দেখে জারিনা অবাক হয়ে যায়। অনুপমা আর শ্রেয়াকে দুঃখের কথা জানায় জারিনা। পরাশরের সাথে শুধু ফোনেই কথা হয়, মাঝে মাঝে কলেজের আছিলায় দুই একবার দেখা করেছে, কিন্তু ভয় ভয়, ওদের একসাথে কেউ দেখে জারিনার বাড়িতে যদি বলে দেয় তাহলে ওর আব্বাজান বকাবকি করতে পারে। অনুপমা ওকে শান্ত করে বলে যে পরাশরের বাড়িতে যেতে হবে। সেই শুনে জারিনা যেন আকাশ থেকে পরে, জারিনা জিজ্ঞেস করে কি ভাবে পরাশরের বাড়িতে যাবে। জারিনা জানে পরাশরের মায়ের মতিগতি, এক ভিন্ন ধর্মের মেয়েকে বাড়িতে ঢুকতে দেবে কিনা সন্দেহ। অনুপমা হেসে বলে যে ওরা সব বন্ধু বান্ধবীরা পরাশরের বাড়িতে যাচ্ছে, পরাশরের মায়ের হাতের পায়েস খাবার জন্য। সেই আছিলায় জারিনাকে ওদের সাথে নিয়ে যাবে। ওদের বাড়িতে যাবার পরে সবাইকে বন্ধু হিসাবে পরিচয় দেওয়া হবে, কারুর নাম ঠিক জানানো হবে না। জারিনাকে কিছু করে পরাশরের মাকে হাত করতে হবে, রান্না ঘরের কাজে, বাড়ির কাজে সাহায্য করে কয়েক ঘন্টার মধ্যে পরাশরের মায়ের মন জয় করতে হবে। সব পরিকল্পনা শুনে জারিনার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। শ্রেয়া আর অনুপমা, জারিনাকে সাহস জুগিয়ে বলে যদি পরাশরকে বিয়ে করতে হয় আর পরাশরকে যদি ভালোবাসে তাহলে অনেক কিছু করতে হবে। জারিনা রাজি হয়ে যায় পরাশরের বাড়িতে যাবার জন্য, মুখে হাসি টেনে বলে সব কিছু করতে রাজি এমনকি পরাশরের সাথে জাহান্নুমে যেতে রাজি। 

কলেজের বাইরে দেবায়ন, ধিমান আর পরাশর দাঁড়িয়ে ছিল। জারিনাকে নিয়ে বের হবার পরে ছয়জনে পরাশরের বাড়ির দিকে রওনা দেয়। সারা রাস্তা জারিনা পরাশরের হাত ছারেনা এক মুহূর্তের জন্য। দুইজনের বুকের ভেতরে ধুকপুকানি ক্রমশ বাড়তে থাকে। পরাশর আগে থেকে ওর মাকে জানিয়ে রেখেছিল যে কলেজের কয়েকজন বন্ধু ওর বাড়িতে দুপুর বেলা আসবে। সেই মতন পরাশরের মা সব বন্ধুদের জন্য পায়েস বানিয়ে রেখেছিল। 
বাড়িতে ঢোকার আগে, জারিনাকে জড়িয়ে ধরে পরাশর। জারিনা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে ওর মা অপমানিত করে তাড়িয়ে দেবে নাত? দেবায়ন আর অনুপমা পরস্পরের দিকে চাওয়াচায়ি করে। অনুপমা বলে যে কেউ এখুনি নিজেদের পরিচয় দেবে না, শুধু কলেজের বন্ধু বান্ধবী বলে পরিচয় দেবে সবাই, কারুর নাম এখুনি বলবে না পরাশরের মায়ের কাছে। পরিকল্পনা মতন পরাশরের বাড়িতে ঢোকে সবাই। পরাশরের মা সবাইকে বসার ঘরে বসতে বলে। জারিনা, অনুপমা আর শ্রেয়ার মাঝখানে চুপচাপ বসে থাকে। অনুপমা জারিনাকে ঠেলে বলে যে ঘরের কাজে পরাশরের মাকে সাহায্য করতে। জারিনার ছোটো বুকে বাজতে শুরু করে যুদ্ধের দামামা। একবার সবার দিকে তাকিয়ে নেয়। পরাশর পারলে লুকিয়ে যায় কোথাও, ওর মা একবার জানতে পারলে কেটে ফেলবে জারিনা আর পরাশরকে। জারিনা রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে যায় যেখানে পরাশরের মা ওদের জন্য খাবার প্লেটে সাজাচ্ছিলেন। জারিনাকে আসতে দেখে পরাশরের মা একটু হাসেন। জারিনা প্লেটের মধ্যে সবকিছু সাজাতে সাহায্য করে, সেই সাথে পরাশরের মায়ের সাথে গল্প করে মন ভুলানোর জন্য। প্লেটে খাবার সাজিয়ে বসার ঘরে আসে পরাশরের মা আর জারিনা। জারিনার কান লাল হয়ে গেছে, মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে আশঙ্কায় ওর বুকের খাঁচা ফেটে পড়ার যোগাড়। বসার ঘরে সবাইকে খাবার দেবার পরে পরাশরের মা চলে যান। 

অনুপমা জারিনাকে ঠেলে পরাশরের মায়ের পিছু নিতে বলে। জারিনা একবার উপরের দিকে তাকিয়ে আরেকবার পরাশরের দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। বসার ঘরে সবাই নিস্তব্ধ, কারুর মুখে কোন কথা নেই, আসন্ন আশঙ্কায় সবার বুক দুরুদুরু করে কাঁপছে। কিছু পরে ভেতর থেকে হাসির কলতান শোনা যায়, জারিনা বেশ গল্পে মশগুল হয়ে গেছে পরাশরের মায়ের সাথে। বেশ কিছু পরে পরাশরের মা জারিনাকে নিয়ে বসার ঘরে ঢুকে সবার দিকে তাকায়। সবাই চুপ। পরাশরের মা বলেন যে বেশ ভালো পরিকল্পনা করেছে জারিনার সাথে সাক্ষাৎ করানোর। সেই সাথে পরাশরের মা জানান যে জারিনাকে তার পছন্দ আছে কিন্তু ওর জেঠু আর বাবাকে মানাতে একটু কষ্ট হবে। জারিনা হবু স্বাশুরিকে জড়িয়ে ধরে বলে যে যদি ওদের সম্পর্কের সুস্থ সুরাহা না হয় তাহলে গঙ্গায় ডুবে মরবে দুইজনে। পরাশরের মা হেসে ফেলে জারিনার কথা শুনে, সেই সাথে জানিয়ে দেন যে কিছু একটা ব্যাবস্থা করা যাবে তবে ওনার একার পক্ষে সম্ভব নয় ওর বাবাকে বোঝানো। দেবায়ন জানায় যে ওর মা সেই কাজে সাহায্য করবে। পরাশরের বাড়ির সবাইকে একদিন নেমতন্ন করবে দেবায়ন সেই সময়ে দেবায়নের মা চেষ্টা করবেন পরাশরের বাবার সাথে কথা বলতে। পরাশরের মা, জারিনার গলায় একটা সোনার হার পড়িয়ে দেয়। জারিনার চোখে জল চলে আসে সেই সাথে পরাশরের মায়ের চোখে জল চলে আসে। পরাশরের মা, পরাশরকে বলে যে ওদের জন্য আরো একদিন নেমন্তন্ন রইল সেদিন ওর হবু বউমা রান্না করবে। সে যা রান্না করবে তাই পরাশরের মা ওর জেঠুকে আর বাবাকে রাতে খেতে দেবে। জারিনা বলে যে রান্না করতে সে এখুনি প্রস্তুত। 
বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে পরাশরের বাড়ি থেকে সবাই বেড়িয়ে আসে। যাবার আগে অনুপমা আর দেবায়নকে জিজ্ঞেস করে নেমন্তন্নের কথা। দেবায়ন জানায় যে মায়ের সাথে কথা বলে একটা দিন ধার্য করে ওদের সবাইকে ডাকা হবে। দেবায়ন জানায় না যে সেদিন জারিনার বাড়ির লোক কেও নেমন্তন্ন করা হবে। বাড়ি থেকে বেড়িয়েই জারিনা, অনুপমাকে জড়িয়ে ধরে ট্যাক্সির মধ্যে। জারিনা আর পরাশর খুব খুশি, একটা বাধা কাটল, বাকি বাধা কি করে কাটবে সেই চিন্তায়। দেবায়ন জানায় সময়ের সাথে সাথে বাকি বাধা ধিরে ধিরে লুপ্ত হয়ে যাবে। 

পরাশর এর মাঝে একদিন দেবায়নের মাকে পি.জি হসপিটালে নিয়ে জারিনার বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। দেবশ্রী, জারিনার বাবা, ডক্টর মিসবাউল আন্সারির সাথে কথা বলেন পরাশর আর জারিনার সম্পর্কের ব্যাপারে। ডক্টর আন্সারি দেবশ্রীর কথা শুনে প্রথমে অবাক হয়ে যান। তিনি জানিয়ে দেন যে হসপিটালে এই সব আলোচনা করা ঠিক নয়। দেবশ্রী বলেন নিরুপায় হয়ে হাতপাতালে আসতে হয়েছে যেহেতু দেবশ্রী ডক্টর আন্সারিকে চেনে না তাই। ডক্টর আন্সারি হেসে প্রতি উত্তরে দেবশ্রীকে নিজেদের বাড়িতে ডাকেন একদিন। হাস্পাতাল থেকে বেড়িয়ে দেবশ্রী পরাশরকে বলে, কথা বলে দেখবে কত টা কি করা যায়। দেবশ্রী পরাশরকে আসস্থ সুরে বলে পড়াশুনায় মন দিতে, বিয়ে শাদির জন্য এখন একটা বছর হাতে সময় আছে। তাড়াহুড়োতে কোন কিছুর সুস্থ সুরাহা হবে না। 

দেবায়ন আর পরাশরকে নিয়ে একদিন বিকেলে ডক্টর আন্সারির বাড়িতে যান দেবশ্রী। ডক্টর আন্সারি নিজের চেম্বারে সেদিন বেশ ব্যাস্ত ছিলেন। জারিনাকে দেখে দেবশ্রীর বেশ ভালো লাগে, সেই সাথে জারিনার মা, নাজমার সাথে কথাবার্তা হয়। নাজমা বলেন যে প্রথম দিন থেকেই পরাশর আর জারিনার ব্যাপারে তার সন্দেহ ছিল। তবে মেয়ের মুখে সব শুনে মায়ের মন শেষ পর্যন্ত গলে যায়। তার ভয় এই গোস্টি নিয়ে, এই গোসটির মাথারা এই শাদী নিকাহর বিরুদ্ধে যাবেন। ওইদিকে জারিনা বেঁকে বসে আছে, পরাশরকে বিয়ে না করতে পারলে গঙ্গায় ডুব দেবে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না নাজমা। দেবশ্রী, জারিনাকে মৃদু ধমক দিয়ে বলে আর যেন আত্মহত্যার কথা মুখে আনে না। ডক্টর আন্সারি কাজের ফাঁকে উপরে এসে দেবশ্রী আর বাকিদের সাথে দেখা করে যান। ডক্টর আন্সারি কি করবেন কিছু ভেবে পাচ্ছেন না। মেয়েকে খুব ভালবাসেন তবে এই গস্টি দ্বন্দের মাঝে পরে এক ঘরে হয়ত হতে হবে। ডক্টর আন্সারি বলেন পরাশর যদি ধর্মান্তরিত হয় তাহলে দুই জনের সম্পর্কের একটা সুরাহা হতে পারে। দেবশ্রী চিন্তিত, ওইদিকে নাজমা কিছু ভেবে পাচ্ছেন না। জারিনার চোখ ছলছল। দেবশ্রী বিশেষ কথা না বাড়িয়ে সপরিবারে নিজের বাড়িতে একদিন রাতের খাবারের নেমন্তন্ন করেন। দেবায়ন, পরাশর সবাই বেশ চিন্তিত, দেবশ্রী ওদের আস্বাস দিয়ে বলে যে কিছু একটা উপায় তিনি বের করবেন। ডক্টর আন্সারি জানিয়ে দেন যে পরাশরের বাড়ির সাথে দেখা করতে চান, দেবশ্রী জানিয়ে দেন যে সময় মতন সব ঠিক করে দেবেন। 

বর্ষা কাল কেটে গেছে, মুসউরি থেকে বেড়িয়ে আসার পরে বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। আকাশে থোকা থোকা পোজা তুলোর মতন মেঘ ভেসে বেড়ায়। কলেজের সাথে সাথে দেবায়ন আর অনুপমার কম্পিউটার ক্লাস পুরোদমে চলে। এর মাঝে এক রবিবার, দেবায়ন পরাশরের বাড়িতে গিয়ে বাড়ির লোককে রাতের খাবারের জন্য নেমন্তন্ন করে আসে। 

সকাল বেলাতেই অনুপমা দেবায়নের বাড়ি পৌঁছে যায় দেবায়নের মায়ের কাজে সাহায্য করার জন্য। পরাশর আর জারিনা বারেবারে অনুপমাকে ফোনে ব্যাতিব্যাস্ত করে তোলে। বারেবারে জিজ্ঞেস করে কোন অঘটন ঘটাবে কি না। পরাশর বেশ ভয়ে ভয়ে আছে, ওর বাবা গম্ভির প্রকৃতির মানুষ। পরাশরের মা একবার ওর বাবাকে বলতে চেষ্টা করেছিল জারিনার ব্যাপারে কিন্তু তিনি শুনতে নারাজ। 

বিকেলে জারিনার সাথে, জারিনার মা বাবা দেবায়নের বাড়িতে পৌঁছে যায়। ওদের আসার কিছু পরেই পরাশরের বাবা মা পৌঁছে যায়। জারিনা একটা সুন্দর সাদা রঙের সালোয়ার পরে এসেছিল। দেবায়নের মা সবাইকে বসার ঘরে বসিয়ে গল্প করতে শুরু করেন। পরাশরের বাবা সুরঞ্জন বাবু, দেবায়নের মাকে এই নিমন্ত্রনের কারন জিজ্ঞেস করে। ডক্টর আন্সারিকে দেখে তার বুঝতে বিশেষ দেরি হয় না এই নিমন্ত্রনের আসল কারন। সুরঞ্জন বাবু কিঞ্চিত রেগে পরাশরের মায়ের দিকে তাকায়। দেবশ্রী কিছুক্ষণ সবার দিকে তাকিয়ে দেখে। পরাশর দাঁত পিষে শ্বাস রুদ্ধ করে দেবায়নের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। জারিনা শক্ত করে অনুপমার হাত ধরে ওদের অদুরে দাঁড়িয়ে। দেবশ্রী দুই বাড়ির অভিভাবকদের দিকে তাকিয়ে বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।

দেবশ্রী বলেন, “পরাশর আর জারিনা, ওদের ব্যাপারে আমার কিছু বলার আছে আপনাদের কাছে।”

পরাশরের মা, রঞ্জিকা, দেবশ্রীর দিকে তাকিয়ে সব বুঝতে পেরে যায়। নাজমা একবার পরাশরের দিকে তাকায়, অন্যদিকে রঞ্জিকা তার হবু বউমা, জারিনার দিকে তাকায়। পরাশর আর জারিনা, শ্বাস রুদ্ধ করে আসন্ন ঝড়ের আশঙ্কায় উৎকণ্ঠায় কাঠ হয়ে গেছে। 

ডক্টর মিসবাহুল দেবশ্রীর উত্তরে বলেন, “দেখুন দিদি, আপনি জানেন যে দুই ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিবাহ আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। তাই আমি আপনাকে একটা উপায় বলেছিলাম যে যদি পরাশর ওর ধর্ম বদলে নেয় তাহলে এই নিকাহর ব্যাপারে আমার কোন অসুবিধে নেই।”

সুরঞ্জন বাবু চোয়াল শক্ত করে একবার পরাশরের দিকে একবার পরাশরের মায়ের দিকে তাকিয়ে হিম শীতল কণ্ঠে বলে, “তোমরা সব কিছু জানতে তাই ত? এই বিবাহ কিছুতেই সম্ভব নয়।” ডক্টর মিসবাহুলের দিকে না তাকিয়ে উত্তরে বলেন, “কেন আমার ছেলে ধর্মান্তরিত হবে? এই বিয়েতে আমার মত নেই, এই সম্পর্ক হতে পারে না।”

পরাশরের মা প্রমাদ গুনে পরাশরের বাবাকে চুপ করতে বলে। দেবশ্রী শীতল কণ্ঠে বলেন, “কেন এই বিবাহ সম্ভব নয়? জারিনা কি দেখতে খারাপ? জারিনার কি কোন দোষ আছে? জারিনা পড়াশুনায় ভালো, কমার্স নিয়ে একটা বড় কলেজে পড়ছে। ভালো শিক্ষিত বাড়ির মেয়ে। ওর দাদা, দুর্গাপুর আর.ই কলেজে মেকানিকাল নিয়ে পড়ছে। এমত অবস্থায় আপনার আপত্তি কোথায়?”

দেবশ্রীর উত্তরে ডক্টর মিসবাহুল বলেন, “দেখুন দিদি, আমি বিশেষ কোন তর্কে যেতে চাই না। আমি জানি পরাশর কি করেছে না করেছে। আপনার সাথে আমার এই নিয়ে কথা হয়ে গেছে। আমার এই একটা শর্ত যে পরাশরকে ধর্মান্তরিত হতে হবে, তবেই আমি আমার মেয়ের নিকাহ ওর সাথে দেব।”
Reply
উনবিংশ পর্ব। (#5)





সুরঞ্জন বাবু গম্ভির কণ্ঠে বলেন, “ছেলে ধর্মান্তরিত হলে আমি ওকে ত্যাজ্য পুত্র করে দেব। ওই রকম ছেলে আমার চাই না।”

পরাশর রেগে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, দেবশ্রী পরাশরকে শান্ত করে বাকিদের উদ্দেশ্যে বলেন, “রাগের বশে কিছু করে বসলে সেটা সমস্যার সুরাহা হয় না, বরং এক নতুন সমস্যা তৈরি হয়। আমার কথা একটু শুনুন, তারপরে নিজেদের কথা বলবেন।”

ডক্টর মিসবাহুল বিচক্ষণ ব্যাক্তি তিনি চুপ করে থাকেন। সুরঞ্জন বাবু, দেবশ্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনার এতে কি আসে যায়? ছেলে আমার, ও কাকে বিয়ে করবে না করবে সেটা আমরা ভেবে দেখব। পরাশর আমাদের বাড়ির বড় ছেলে। সেই হিসাবে ওর একটা কর্তব্য আছে কি নেই বাড়ির প্রতি।”

রঞ্জিকা এতক্ষণ চুপ করেছিলেন, কিন্তু সুরঞ্জন বাবুর এহেন মন্ত্যবে আহত হয়ে রাগত কণ্ঠে ধমকে ওঠেন, “প্লিস একটু মাথা ঠাণ্ডা করে কথা শোনো। এমন ভাবে রেগে গেলে কোন কিছুর সুরাহা হয় না।” সুরঞ্জন বাবু চুপ করে যান।

দেবশ্রী ম্লান হেসে বলেন, “হ্যাঁ, আমার এখানে কোন স্বার্থ নেই। আমার ছেলের বন্ধু হিসাবে, পরাশর আমার কাছে এসেছিল, ওদের ভালোবাসা দেখে আমার মনে হল এদের একটা সুস্থ সুরাহা করা উচিত। নাহলে দুটি প্রান হয়ত হারিয়ে যাবে এই পৃথিবী থেকে। অন্তিমে কেউ সুখী হবে না।”

ডক্টর মিসবাহুল অবাক হয়ে বলেন, “আপনি নিঃস্বার্থে এদের জন্য করছেন?”

দেবশ্রী হেসে বলে, “না না, আজকাল কেউ কি আর নিঃস্বার্থে কাজ করে। আপনার মেয়ে সুরঞ্জন বাবুর বউমা হলে, ঈদে ওর হাতের বিরিয়ানি খেতে পারবো, পায়া, মটন কোর্মা কত কিছু খেতে পারবো। সেই স্বার্থে আমি এই কাজে নেমেছি।” দেবশ্রীর কথা শুনে সবাই হেসে ফেলে শুধু মাত্র সুরঞ্জন বাবু ছাড়া। দেবশ্রী সুরঞ্জন বাবুর উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনি একজন সরকারি উচ্চপদস্থ অফিসার, আপনি শিক্ষিত আপনি একটা কারন আমাকে দেন কেন জারিনা আপনার বাড়ির বউমা হতে পারবে না।” 

সুরঞ্জন বাবু নিচু কণ্ঠে বলেন, “না মানে, বুঝতেই পারছেন কেন এই সম্পর্কে আমার অমত।”

দেবশ্রী, “ছেলে মেয়ে ভিন্ন ধর্মের সেই নিয়ে আপনার অমত। আপনি হিন্দু, ডক্টর মিসবাহুল মুসলমান, এই জন্য অমত।” সুরঞ্জন বাবু মৃদু মাথা নাড়ান। দেবশ্রী বলে, “আমি ভগবান মানি, তবে ধর্মের নামে এই আচার ব্যাবহার মানি না। আমি ধর্ম অথবা ভগবান একটু ভিন্ন ভাবে মানি, সময় আমাকে তাই শিখিয়েছে। আমি আপনাদের দুইজনকে আঘাত করতে চাই না, তবু বলি। এই ধর্ম আর তাঁর আচার ব্যাবহার মানুষের তৈরি, ভগবানের নয়। ভগবান গাছ পালা, নদী নালা, পশু পাখী মানুষ তৈরি করেছিলেন। তাই পৃথিবীর সব জায়গার গাছ পালা, নদী নালা, মানুষ এক রকমের দেখতে। সব জায়গার মানুষের একটা নাক, দুটো চোখ, দুটি হাত, দুটি পা। সবাই মুখ দিয়ে খায়, চোখ দিয়ে দেখে। একটা ছোটো বাচ্চা যখন জন্ম গ্রহন করে তখন সে জানে না তার ধর্ম কি। তার মুখ থেকে প্রথম শব্দ বের হয় কান্নার আওয়াজ, অ্যাঁ। সেই “অ্যাঁ” কান্নার আওয়াজ অনেকটা “মা” ডাকের মতন শোনায়। তাই “মা” ডাক পৃথিবীর সব ভাষাতেই এক। সেটা আলাস্কার কোন প্রত্যন্ত জায়গায় হোক, অথবা ইংল্যান্ডের রানীর বাড়ি হোক, অথবা চিনের দেয়ালের পেছনে হোক অথবা ভারতের কোন শহরে। মাকে সব বাচ্চা মা বলেই ডাকে। সেই ডাক তাদের শিখিয়ে দিতে হয় না, তেমনি ভালোবাসা কাউকে শিখিয়ে দিতে হয় না, সেটা বুকের ভেতর থেকে আসে। মানুষ যত বড় হয়, তারা নিজের সুবিধার্থে, পারিপার্শ্বিক ভৌগলিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের ভাষা, ধর্ম আচার ব্যাবহার, জীবন শৈলী ইত্যাদি গঠন করে।” দেবশ্রী সুরঞ্জন বাবুর দিকে তাকিয়ে বলেন, “ধরুন আপনার এক্সিডেন্ট হল, আপনাকে নিয়ে হাস্পাতালে যাওয়া হল। সেখানে আপনার রক্ত চাই, তখন কি আপনি জিজ্ঞেস করবেন রক্তদাতার নাম?” সুরঞ্জন বাবু মাথা নাড়িয়ে বলেন “না” দেবশ্রী বলেন, “আপনার শরীরে হয়ত ভিন্ন ধর্মীর রক্ত দিয়ে আপনাকে বাঁচিয়ে তোলা হল, সেখানে আপনার আপত্তি থাকবে না। আপনি কোনদিন রেস্তোরাঁতে খেতে যান না? সেখানে কোনদিন জিজ্ঞেস করেছেন যে শেফের ধর্ম কি? রেস্তোরাঁর সুস্বাদু খাবার আপনার ভালো লাগবে। যখন একটা জীবন অপারেশান থিয়েটারে ছটফট করে তখন এই সব কথা মাথায় আসে না। শুধু একটু ভালোবাসার সময়ে আপনাদের মাথায় আসে জাত পাত, ধর্ম বিদ্বেষ, উঁচু নিচু, বড়োলোক গরিব। এই সব জাত পাত ধর্ম বিদ্বেষ সব কিছু মানুষের মনের তৈরি। এই দুইজনের জন্য এই সব একটু দুরে রাখতে পারবো না আমরা?” 

সুরঞ্জন বাবু আর ডক্টর মিসবাহুল চুপ। ঘরের বাকি সদস্য চুপ করে দেবশ্রীর কথা শুনে যায়। জারিনা অনুপমার হাত ধরে পাথর হয়ে গেছে। অনুপমার কানেকানে বলে যে এত কথা কেউ কোনদিন ওর আব্বাজানের সামনে বলতে সাহস পায়নি। অনুপমা জানিয়ে দেয় যে ওর মামনি অন্য ধাতুর তৈরি মানুষ, যত কঠিন লোহা হোক না কেন, তাদের হৃদয় গলাতে তিনি সক্ষম।

দেবশ্রী, ডক্টর মিসবাহুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি একজন নামকরা ডক্টর। আপনি যখন একজনের চিকিৎসা করেন, তখন তার রোগ চিকিৎসা করেন না তাকে নাম দেখে চিকিৎসা করেন। আমি আর্টসের ছাত্রী ছিলাম, বিজ্ঞান পড়িনি তবে আমি ছোটবেলা থেকে ছেলেকে পড়াতে পড়াতে একটু বিজ্ঞান শিখে ফেলি আর তাই দিয়ে বিচার করেছিলাম এই মহামহিম শক্তি কে। বোঝার চেষ্টা করেছি আসল ভগবানকে। আমার মধ্যে, একটা গাছের মধ্যে, একটা কুকুরের মধ্যে, একটা মাছের মধ্যে বহিরাঙ্গের অনেক তফাত কিন্তু ধর্মে বলে ভগবান সর্বত্র বিদ্যমান। আমি ও বলি ভগবান সর্বত্র বিদ্যমান, কিন্তু একটু অন্য ভাবে মানি। আমরা সবাই অনু পরমানু দিয়ে গঠিত। সবার দেহে সেই প্রোটন নিউট্রন এলেক্ট্রন আছে। সেই এটমের মধ্যে যে শক্তি সেই ভগবান। অমান্য করতে পারেন?” ডক্টর মিসবাহুল মাথা নিচু করে বসে থাকেন। দেবশ্রী বলেন, “সেই শক্তি কিন্তু এই হিন্দু, মুসলমান, শিখ খ্রিস্টান, বৌদ্ধ তৈরি করেনি, করেছি আমরা কারন আমাদের মাথায় একটা ঘিলু বলে বস্তু আছে। আমরা ভাবনা চিন্তা করতে পারি আর তাই সকলকে হাতের মুঠিতে রাখার জন্য ভগবানের দোহাই দিয়ে একসময় তৈরি হয় এই ধরম। আমার বলার বক্তব্য এই টুকু, যে সামান্য একটা মানুষের তৈরি নিয়মের বাধা নিয়ে কেন দুই ছোটো ছেলে মেয়েকে আলাদা করে দেওয়া? তাতে কি ওরা সুখী হতে পারবে? একবার চেয়ে দেখুন ওদের চোখের দিকে তারপরে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবেন।” ডক্টর আন্সারি পরাশরের দিকে তাকায় আর সুরঞ্জন বাবু জারিনার দিকে তাকায়। দুই ছেলে মেয়ের চোখে জল, ছলছল থমথমে চেহারায় দুইজনে দাঁড়িয়ে। দেবশ্রী বলে, “তবে হ্যাঁ, আমি যখন বাড়িতে ডেকেছি ডিনারের জন্য তখন যেন না খেয়ে চলে যাওয়া না হয়।”

সুরঞ্জন বাবু হেসে মাথা নাড়িয়ে বলেন, “এত কথা আজ পর্যন্ত আমাকে কেউ বলেনি। আপনার সাথে যুক্তি তর্কে দার্শনিক তথ্যে পেরে ওঠা বড় কষ্টকর। আপনার বক্তব্য গভীর অর্থ বহন করে যা খন্ডন করা অসম্ভব। তবে আমাকে একটু ভাবতে সময় দেন।”

দেবশ্রী হেসে জিজ্ঞেস করে, “কি ভাবছেন? খাবার কথা না কবে বিয়ে দেবেন সেটার কথা?”

ডক্টর মিসবাহুল হেসে ফেলেন, “আপনার সাথে কথায় পেরে ওঠা বড় মুশকিল। কিন্তু সমাজ, আত্মীয় সজ্জনেরা কি বলবে?”

দেবশ্রী বড় নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন, “আপনারা কি ছেলে মেয়েদের শুকনো মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছেন? সত্যি কথা বলতে লোকেরা কি বলবে, আত্মীয় সজ্জনেরা কি বলবে সেই নিয়ে বড় মাথা ঘামাই। যাদের সুখ দুঃখে আমাদের দাঁড়ানো উচিত তাদের পাশে না দাঁড়িয়ে, তাদের কথা শুনতে ব্যাস্ত হয়ে যাই যারা হয়ত আমাদের খেয়ে আমাদের পেছনে নিন্দা করে বেড়ায়। আপনাদের কিছু হলে আপনার ছেলে বউমা, মেয়ে জামাই এসে দাঁড়াবে। দেবায়নকে নিয়ে আমি যখন অথৈ জলে পড়েছিলাম, তখন আমার কোন আত্মীয় আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় নি। আপনার দুই জনে একবার বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে আপনাদের কোন আত্মীয় আপনাদের পেছনে আপনাদের নিন্দা করে নি?” 

নির্বাক সুরঞ্জন বাবু, নির্বাক ডক্টর মিসবাহুল। দেবশ্রী হেসে বলেন অনুপমার দিকে দেখিয়ে বলে, “ওই যে আমার বউমা। সমাজ কে কি বলল না বলল তাতে আমার আসে যায় না। তবে ওই দুষ্টু মেয়েটার মুখের হাসির জন্য আমি সব কিছু করতে প্রস্তুত।”

সুরঞ্জন বাবু দেবশ্রীকে বললেন, “দিদি, সব বুঝলাম। আপনি যে যুক্তি দেখিয়েছেন সব মেনে নিলাম। আমাদের পরিবারের কথা একটু বলি আপনাকে। আমাদের যৌথ পরিবার, আমার দাদার দুই মেয়ে, তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। আমার ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে বছর আটেক আগে তার এক ছেলে এক মেয়ে। আর আমার ওই একটা ছেলে, পরাশর বাড়ির বড় ছেলে। সেই হিসাবে বউমা হবে বাড়ির বড় বউমা। ভবিষ্যতে তার কাঁধে সবাইকে পরিচালনা করার ভার আসবে। তাই আমি...”

কথা শেষ করতে দেয় না দেবশ্রী কারন তার অজানা নয়, তাই বললেন, “আমি সব জানি, পরাশর আমাকে সব কিছু বলেছে। দেখুন, আমি বলছি না আজকেই জারিনাকে আপনার বউমা করে নিয়ে যেতে। আপনি আপনার দাদাকে বুঝিয়ে বলুন, সময়ের সাথে সাথে মানুষের মতি গতি, মানুষের চিন্তা ধারা বদলায়। আশা করি আপনি সেই চেষ্টা করবেন। আর আসল কথা, বউমা কেমন লেগেছে সেটা আগে বলুন।”

নাজমা আর রঞ্জিকা এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন, কোন কথা না বলে শুধু দেবশ্রীর কথা শুনে গেছে। নাজমা বললেন, “জানেন দিদি, প্রথম যেদিন পরাশর মাথা ফাটিয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছিল, সেদিন আমি মেয়ের মুখ দেখে বুঝে গেছিলাম, ওই ফাটা মাথার কারন।” নাজমার কথা শুনে পরাশরের কান লাল হয়ে যায়, জারিনা পারলে অনুপমার পেছনে লুকিয়ে যায়।

সেই শুনে হেসে ফেললেন রঞ্জিকা, “আমার বাড়িতে দেবায়ন আর অনুপমা, জারিনাকে লুকিয়ে নিয়ে এসেছিল। আমি প্রথমে বুঝতেই পারিনি ওকে দেখে। তারপরে যখন দেখলাম যে ফুটফুটে মেয়েটা রান্না ঘরে এসে আমাকে সাহায্য করছে তখন আমার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। বড় মিষ্টি মেয়ে। এত পাকা যে আমাকে বলে চোখে কাজল পড়লে নাকি আমার চোখ দুটি বড় বড় দেখাবে।” রঞ্জিকা জারিনার দিকে দেখে হেসে ফেলে। জারিনা লজ্জায় অনুপমার পেছনে মুখ লুকায়। রঞ্জিকা সুরঞ্জন বাবুকে বললেন, “দেখো, সত্যি বলছি, বাড়িতে এই সব নিয়ে আলোচনা করা অসম্ভব। আমার আর কাকলির কথা কেউ শোনে না। দেবশ্রীদি’র মতন যুক্তি দিয়ে বুঝাতে আমি পারতাম না। আমি জানিনা তোমার কি মত, তবে বউমা আমার ভারী মিষ্টি।”

ডক্টর মিসবাহুল বললেন, “আমার একটু সময় চাই, মানে আমাদের পরিবার আরো গোঁড়া। সবাইকে বুঝিয়ে ওঠা, সবাইকে মানিয়ে ওঠা খুব দুষ্কর দুঃসাধ্য ব্যাপার। আমি যা ভেবে এসেছিলাম, সেই ভাবনা চিন্তা যুক্তি তক্ক আপনার দর্শন শাস্ত্রের কাছে নগন্য। আমি কোনদিন এই ভাবে ধর্মকে, ভগবানকে দেখিনি। আজকে আপনার কথা শুনে মনে হল আমরা কেন, পৃথিবীর সবাই যদি আপনার মতন চোখ খুলে একটু দেখতে পারত তাহলে পৃথিবী অনেক সুন্দর হয়ে উঠত। সত্যি বলতে আপনি আমার বিশ্বাস ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন, এই প্রথম পরাজয়ে আমি দুঃখিত নেই। কিন্তু বুঝতেই পারছেন।”

সুরঞ্জন বাবু সমস্বরে বলেন, “একই অবস্থা আমার পরিবারের। দুঃসাধ্য তবে আপনার কথা শুনে মনে হল অসম্ভব কিছুই নয়।”

দেবশ্রী, “আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি আপনাদের দুইজনের পারিবারিক সমস্যার কথা। অনেক সময় আছে, জারিনার কলেজ শেষ হতে আরো তিন বছর বাকি। পরাশরের কলেজ শেষ হতে এক বছর বাকি। সময়ের সাথে অনেক কিছু বদলে যায়, আপনার সেই চেষ্টা করুন।”

ডক্টর মিসবাহুল মৃদু হেসে মাথা নাড়িয়ে বলেন, “দুই জনের পড়াশুনা শেষ হোক আগে তারপরে ব্যাবস্থা করব।”

সুরঞ্জন বাবু বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে দেবশ্রীর দিকে তাকিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করেন, “এস্ট্রে নিশ্চয় আপনার বাড়িতে পাওয়া যাবে না?”

দেবশ্রী হেসে ফেলে, “আমি সিগারেট খাই নাকি?”

দেবায়ন তাড়াতাড়ি একটা কাপে একটু জল নিয়ে টি টেবিলে রাখে। সুরঞ্জন বাবু একটা সিগারেট বের করে ডক্টর মিসবাহুলের দিকে এগিয়ে দেয়। ডক্টর মিসবাহুল হেসে বলেন যে একটাই ধরাতে, জারিনা জন্মাবার পরে সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন, তবে বেয়াই মশাইয়ের অনুরোধ উপেক্ষা করা কঠিন। নাজমা, ডক্টর মিসবাহুলের দিকে তাকিয়ে সিগারেট ধরাতে বারন করে। সুরঞ্জন বাবু হেসে বলেন, আর রাগ কেন এবারে হয়ত দুই বেয়াই মিলে সিগারেট খেয়ে মনের গ্লানি দূর করবে।

রঞ্জিকা হেসে বলেন, “দিদি, আপনার ওই এটম, নিউট্রন শুনে আমার পেটের ইলেক্ট্রন কামড় দিচ্ছে। আমি আমার বেয়ানকে নিয়ে রান্না ঘরে চললাম। আপনি যা ভালো বুঝবেন সেটা করুন।”

পরাশরের মায়ের কথা শুনে সবাই হেসে ফেলে। এতক্ষণ বাড়িতে যেন ছোটো একটা ঝড় বয়ে গেল। দেবশ্রীর সামনে বসে ছোটো দুই সোফায় ডক্টর মিসবাহুল আর সুরঞ্জন বাবু পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলেন। দেবশ্রী, জারিনা আর পরাশরকে কাছে ডেকে সবাইকে প্রনাম করতে বলেন। জারিনা আর পরাশর, সুরঞ্জন বাবু আর ডক্টর মিসবাহুল কে প্রনাম করার পরে দেবশ্রীকে প্রনাম করে। 

রঞ্জিকা পরাশরকে বলে, “দিদিকে একদম সাষ্টাঙ্গ প্রনাম করিস, নাহলে এই যাত্রায় কিছু সম্ভব হতনা।”

দেবশ্রী, জারিনা আর পরাশরের মাথা চুম্বন করে আশীর্বাদ করেন। জারিনার মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। পরাশর দেবায়নকে কি বলে ধন্যবাদ জানাবে ভেবে পায় না। ডক্টর মিসবাহুল আর সুরঞ্জন বাবু নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করেন। চারপাশের বদ্ধ আবাহাওয়ায় একটা খুশির আমেজ। বসার ঘরের দেয়ালে দেবায়নের বাবা, সায়ন্তনের একটা বড় ছবি ঝুলান। দেবশ্রী একবার সেই ছবির দিকে জল ভরা চোখে তাকায়। তারপরে দেবশ্রী ছেলে মেয়েদের জিজ্ঞেস করে, তোরা সন্তুষ্ট? চার জনে দৌড়ে এসে দেবশ্রীকে জড়িয়ে ধরে। 






!!!!!!!!!!উনবিংশ পর্বের সমাপ্তি !!!!!!!!!!
Reply
বিংশ পর্ব। (#1)





কিছুদিন ধরে পায়েলের চরিত্রের বেশ পরিবর্তন ঘটেছে। আগে যেমন অনুপমার সাথে রোজ দিন গাড়িতে করে কলেজে আসত, সেটা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করলে বলে যে বাসে আসাই ঠিক কেননা সকালে অনুপমার বাড়ির নাম করে একটু আগেই বেড়িয়ে যায় আর অগ্নিহোত্রীর সাথে দেখা করে। অগ্নিহোত্রী ওকে নিতে আসে তাই অনুপমার সাথে কলেজে আসা কমিয়ে দিয়েছে। তবে বিকেলে কোন কোন দিন পায়েল, অনুপমার বাড়িতে কলেজ ফেরত চলে আসে, কোন কোন দিন একা একা কলেজ ছুটি হবার আগেই বেড়িয়ে পরে। অনুপমার বাড়িতে আড্ডা মারার সময়ে অঙ্কন মাঝে মাঝে ওদের সাথে গল্প করে। অঙ্কনের নতুন প্রেম, গরিমার কথা পায়েলকে জানায় অনুপমা। পায়েলের ব্যাপারে অঙ্কনকে একদিন জানায় অনুপমা। পায়েল ইদানীং ছোটো স্কার্ট, চাপা টপ ছেড়ে লম্বা স্কার্ট আর জিন্স পড়া শুরু করেছে। মাঝে মাঝে সালোয়ার কামিজ পরে কলেজে আসে। ওর এই পোশাক আশাকের পরিবর্তন সবার চোখে পরে। সবাই জিজ্ঞেস করলে লাজুক হেসে উত্তর দেয় যে অগ্নিহোত্রীর পছন্দের কাপড় পড়তে হয় এবং পায়েল তাতে বেশ খুশি। মাঝে মাঝে সপ্তাহ শেষে উধাউ হয়ে যায়, অনুপমাকে ফোনে বলে যদি ওর বাড়ি থেকে কেউ জিজ্ঞেস করে তাহলে যেন জানিয়ে দেয় যে পায়েল অনুপমার সাথেই আছে। পায়েলকে অগ্নিহোত্রীর কথা জিজ্ঞেস করলে পায়েল হাসি মুখে এড়িয়ে যায় সেই প্রশ্ন, জানিয়ে দেয়যে সময় মতন অগ্নিহোত্রীর সাথে দেখা করিয়ে দেবে, সেই সাথে পায়েল জানায় যে বাড়ি থেকে পালান হয়ত হবে না। অনুপমা একটু অবাক হয়ে যায় সেই সাথে খুশি হয় যে পায়েল তার পুরানো চিন্তা ছেড়ে দিয়েছে। পায়েল বলে যে ওর বাবা মা হয়ত ওদের সম্পর্ক মেনে নেবে না, তবে বিয়ের যখন সময় হবে তখন নিশ্চয় সবাই মেনে নেবে। কথাটা হেঁয়ালির মতন হলেও, অনুপমা খুঁচিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে না। 

দেবায়ন, অঙ্কনের কথা জিজ্ঞেস করে। অনুপমা জানায় যে অঙ্কন প্রেমে পরে অনেক বদলে গেছে। শনি, রবি বাড়িতে থাকে না বললে চলে। অনুপমা বার কয়েক গরিমার সাথে দেখা করার কথা বলেছিল, অঙ্কন কথা ঘুরিয়ে দেয়। অনুপমা বলেছে যে ওর জন্মদিনে বাড়িতে ডাকতে। অঙ্কন জানিয়েছে যে জন্মদিনে গরিমাকে বাড়িতে ডেকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। 

বর্ষার শেষে, শরতের মিষ্টি আভাসে আকাশ বাতাস মুখরিত। ইতিমধ্যে দেবায়ন বাইক কিনেছে, অনুপমার ইচ্ছে ছিল একটা স্টাইলিস্ট বাইক, কিন্তু দেবায়নের পছন্দ ছিল একটা ভারী বাইকের তাই শেষ পর্যন্ত বুলেট কেনে। বেশ ভারী গাড়ি, রাস্তা কাঁপিয়ে কলেজ কাঁপিয়ে আওয়াজ করে বের হয়। লম্বা চওড়া ছেলে দেবায়ন, পেছনে অনুপমাকে নিয়ে কলেজ থেকে বের হলে অনেকের চোখ ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতদিন পরেও অনুপমা ওই ছেলে গুলোর আর মেয়েদের চাহনি উপভোগ করে। 

সামনে পুজো, সবাই ঠিক করে যে পুজোতে একসাথে ঠাকুর দেখবে, একসাথে পুজোর জামা কাপড় কেনা কাটা করবে। অগত্যা দেবায়ন আর অনুপমার ঠিক সময় হয়ে আর ওঠে না। কলেজের পরে দৌড়াতে হয় সোজা কম্পিউটার ক্লাসে, শনি রবিবারেও ওদের ক্লাস থাকে। সঙ্গীতা, শ্রেয়া মন মরা হয়ে যায়। পায়েল জানায় যে ওর পুজোর শপিং করা হয়ে গেছে। অনেকদিনের বন্ধুত্ব অনুপমার আর পায়েলের। গত দুই বছরে পায়েল অনুপমাকে ছেড়ে পুজোর জামা কাপড় কিনতে যায়নি। এবারে পায়েলের কথা শুনে খুব আহত হয় অনুপমা। দেবায়ন অনুপমাকে বুঝিয়ে বলে যে পায়েল হয়ত ওর প্রেমিকের সাথে শপিং করে নিয়েছে, এতে দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। পায়েল নিশ্চয় চিরকাল অনুপমার পাশে থাকবে না। অনুপমা আহত হলেও বোঝে দেবায়নের কথা। 

কলেজে পালিয়ে একদিন সব বন্ধু বান্ধবী মিলে পুজোর শপিং করতে বের হয়। পায়েল লাঞ্চের আগেই উধাও হয়ে গিয়েছিল। সবাই ওর কথা জানে যে পায়েল অগ্নিহোত্রীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, একমাত্র সঙ্গীতা ছাড়া কেউ অগ্নিহোত্রীকে দেখেনি। ধিমান, ঋতুপর্ণাকে ডেকে নেয় সাথে। অনেকদিন পরে ঋতুপর্ণার সাথে সবার দেখা। 

দেবায়ন ঋতুপর্ণাকে দেখেই বলে ওঠে, “ডারলিং অনেক দিন পরে তোমার সাথে দেখা হল, কেমন আছো?” দেবায়নের স্বভাব সবার পেছনে লাগা। ঋতুপর্ণা কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই দেবায়ন ওর গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলে, “ডারলিং ওইদিন ঠিক জমল না। হবে নাকি একবার আরো।”

লজ্জায় ঋতুপর্ণার গাল কান লাল হয়ে যায়। ধিমান মারতে ছোটে দেবায়নকে, “শালা তোর বউকে গিয়ে কর না।”

দেবায়ন বলে, “ওরে ছাগল, বাঁশের চেয়ে কঞ্চির দর বেশি। শালী সবসময়ে একটু বেশি মিষ্টি হয়, সে যদি ঋতুর মতন সেক্সি হয় তাহলে কথা নেই।”

শ্রেয়া একটু রেগে যায় ওদের কথা শুনে, অনুপমাকে বলে, “এই তোর বরকে সাবধান করে দে।” 



অনুপমা হেসে দেবায়নের কান টেনে ধরে বলে, “তুমি থামবে না এখানে তোমাকে পিটাব।”

ধিমান হেস বলে, “পুচ্চিসোনা কিন্তু রেগে গেছে এবারে আর ঢুকাতে পারবে না পুচ্চু বাবু।”

দেবায়ন হেসে বলে, “কত মাল আছে, ঋতু আছে, সঙ্গীতা আছে। আর শ্রেয়ার কথাই নেই, রূপক ওকে ছেড়ে অন্য কারুর সাথে লাইন মারতে ব্যাস্ত।”

শ্রেয়া রেগে যায় ওই কথায় এমনিতে রূপক আসেনি বলে শ্রেয়া রেগেই ছিল, “ধুর বাল, রূপকের কথা ছাড়। আমাকে না জানিয়ে অন্য কোথাও গাড়ি গ্যারেজ করলে টায়ার ফাটিয়ে দেব।”

সবাই হেসে দেয় শ্রেয়ার কথা শুনে। এস্প্লানেডে ঘুরে ঘুরে ওরা সবাই শপিঙ্গে ব্যাস্ত হয়ে পরে। পুজোর মরশুমে এস্পালনেড ভিড়ে ঠাসা। সব দোকানে প্রচুর ভিড়, সারা কোলকাতা যেন উপচে এস্প্লানেডে এসে পড়েছে। মেয়েরা নিজেদের জামা কাপড় কেনার চেয়ে, গল্পে বেশি ব্যাস্ত। দশ খানা দোকান ঘোরার পরে কারুর একটা পোশাক পছন্দ হয়। প্রবাল চুপ করে সঙ্গীতার পেছন পেছন ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে। ধিমান আর দেবায়ন নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে প্রবালকে দেখে। 

ধিমান প্রবালকে বলে, “বাল এবারে সঙ্গীতার কামিজের নিচে ঢুকে যা একেবারে।”

প্রবাল চোখ পাকিয়ে তাকায় দেবায়ন আর ধিমানের দিকে। দেবায়ন হেসে ফেলে ওর চোখ পাকান দেখে, “ওরে, ওই রকম ভাবে তাকাস না সোনা। বড্ড ভয় করছে আমাদের।”

সঙ্গীতা, “এই তোরা থামবি একটু।”

ধিমান, “কেন ডারলিং? তোর মেনুপুষুকে আঘাত করেছি তাই এত লেগে গেল?”

সঙ্গীতা, “কেন, তোর ঋতুকে যখন দেবায়ন বলছিল তখন কেন মারতে ছুটেছিলি?”

অনুপমা সঙ্গীতাকে বলে, “ঠিক ত বলেছে। তুই যা তাঁর উলটো প্রবাল।”

সঙ্গীতা ম্লান হেসে, “শেষ পর্যন্ত তুই? আমি ভেবেছিলাম...”

অনুপমা, “আরে আরে না না... এখানে আবার কান্না কাটি জুড়ে দিস না। সামনে পুজো, এখানে বন্যা হয়ে গেলে মুশকিল আছে।”

আবার সবার মধ্যে হাসির কলতান ওঠে। রূপক কোন এক কাজের জন্য আসতে পারে না তাই নিয়ে শ্রেয়ার সাথে সকাল থেকে এক চোট রাগারাগি হয়ে গেছে।

অনুপমা শ্রেয়াকে জিজ্ঞেস করে, “হ্যাঁ রে রূপক কেন আসতে পারেনি? কি বলেছে তোকে?”

শ্রেয়া, “মাতৃ ভক্ত ছেলে, মাকে নিয়ে শ্যাম বাজার যাবে শপিং করতে।”

দেবায়ন, “গাঁড় মারিয়েছে। বিয়ের পরে দেখিস ভাই, মায়ের আঁচলের তলায় লুকিয়ে থাকবে।”

সঙ্গীতা হেসে বলে, “যারা মায়ের আঁচলের তলায় লুকায়, বিয়ের পরে তারা বৌয়ের আঁচলের তলায় লুকায়।” স্বর নামিয়ে অনুপমার কানেকানে বলে, “আমারটা দেখছিস না, একদম ভিজে বেড়াল। আমি যদি ওকে বলি, প্রবাল আমার এখুনি আম খেতে ইচ্ছে করছে তুই এনে দে যেখান থেকে পারিস। প্রবাল সারা ভারত ঘুরে এনে দেবে।”

ঋতুপর্ণা ধিমানের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমার টা বাবা একদম উলটো। ও যা ভাববে সেটা না হলে রণ মূর্তি ধারন করে।”

এমন সময়ে শ্রেয়ার কাছে রূপকের ফোন আসে। রূপকের ফোন পেয়েই শ্রেয়া রেগে যায়, “যাও তোমার সাথে আমার কোন কথা বার্তা নেই। সবাই বয়ফ্রেন্ড নিয়ে এসেছে আর তুমি তোমার মায়ের সাথে শপিং কর।” 

রূপক শ্রেয়াকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “আরে বাবা, তোমার ড্রেস কিনতে আমি আর তুমি একসাথে যাবো। আচ্ছা একটা কথা বল না, পায়েল কি তোমাদের সাথে?”

শ্রেয়া, “হটাত পায়েলের কথা জিজ্ঞেস করলে? কি ব্যাপার?”

রূপক, “মনে হল পায়েল কে দেখলাম একটা ছেলের সাথে শপিং করছে তাই জিজ্ঞেস করলাম।”

শ্রেয়া, “তা হতে পারে। পায়েল আজকাল খুব উড়ছে। লাঞ্চের আগেই কলেজ থেকে বেড়িয়ে গেছে। বলল যে অগ্নিহোত্রীর সাথে শপিঙ্গে যাবে তাই ত অনুর মুখ শুকনো।” শ্রেয়া উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস ওরে, “হ্যাঁ গো ওর সাথে যে ছেলেটা আছে সে দেখতে কেমন? পায়েলের চয়েস নিশ্চয় ভালো হবে।”

সঙ্গীতা মুখ বেঁকিয়ে বলে, “অগ্নিহোত্রী দেখতে একটা বাঁদর।”

রূপক, “দূর থেকে দেখলাম। ফর্সা গায়ের রঙ, ভালোই দেখতে মনে হয়। আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছেলেটা। ওর সামনে দাঁড়িয়ে পায়েল। তবে মনে হল ছেলেটার বয়স পায়েলের চেয়ে কম।”

অনুপম আর সঙ্গীতা মুখ চাওয়াচায়ি করে। সঙ্গীতা শ্রেয়ার কাছ থেকে ফোন নিয়ে রূপককে জিজ্ঞেস করে, “সঙ্গের ছেলেটা কালো নয়? ওর চুল একটু লম্বা হবে।”

রূপক জানায়, “না ত, কেন অগ্নিহোত্রী কি কালো? তাহলে অগ্নিহোত্রী নয় এই ছেলে অন্য কেউ। ছেলেটার বয়স মনে হয় পায়েলের চেয়ে কম হবে।”

সঙ্গীতা, “ছেলেটা অগ্নিহোত্রী হতেই পারে না।” 

অনুপমার দিকে দেখে সবাই। অনুপমা বলে, “আমাকে কেন দেখছিস তোরা? আমি প্রেম করেছি নাকি? দাঁড়া আমি পায়েল কে একটা ফোন করি।” অনুপমা পায়েলকে ফোন করে, পায়েলের ফোন বেজে যায় কিন্তু পায়েল ফোন উঠায় না।

রূপক বলে, “হ্যাঁ, ফোন বের করেছে কিন্তু ফোন কেটে দিল মনে হল।”

শ্রেয়া, “হবে ওর কোন ভাইয়ের সাথে শপিং করতে বেড়িয়েছে। এত টেন্সান নিচ্ছিস কেন তোরা?”

রূপক হেসে ফেলে শ্রেয়ার কথা শুনে, “আরে বাল, ভাইয়ের সাথে একদম গায়ে গা লাগিয়ে, হাতের আঙুল পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি? ধুর ওটা অন্য কেউ, ওর নতুন কোন বয়ফ্রেন্ড হবে। থাক ছাড়ো অসব কথা তোমাদের শপিং কেমন চলছে।”

অনুপম আহত হয় রূপকের কথা শুনে। রূপককে বলে এগিয়ে গিয়ে পায়েলের সাথে দেখা করতে। রূপক ফোন হাতে এগিয়ে যায় পায়েলের দিকে, ততক্ষণে পায়েল ওর সাথের ছেলেটাকে নিয়ে বাইকে করে বেড়িয়ে যায়। রূপক ওদের বলে, “ধুর বাল, পায়েল চলে গেল বাইকে।”

অনুপমা বড় আহত হয় পায়েলের ব্যাবহার শুনে। শ্রেয়া বলে, “ছাড় পায়েলকে, আমরা বাকি শপিং সেরে ফেলি। ও কার সাথে কি করছে সেটা সময় হলে জানা যাবে।”

সঙ্গীতা অনুপমা, দুইজনে চিন্তিত হয়ে বলে, “পায়েল এটা ভালো করছে না। আমাকে বলল অগ্নিহোত্রীর সাথে প্রেম করছে, কিন্তু ছেলেটা অগ্নিহোত্রী নয়। কি যে করছে মেয়েটা, ওর কপালে শেষ পর্যন্ত কি হবে ভগবান জানে।”

অনুপমা বাকি বন্ধুদের জানিয়ে দেয় যে ওর শরীর ভালো লাগছে না তাই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে চায়। সবাই একটু অবাক হয়ে দেবায়নকে প্রশ্ন করে। দেবায়ন জানায় যে সকালে তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিল তাই ব্রেকফাস্ট করেনি, কিছু দিন থেকে অনুপমার প্রেসার একটু লো চলছে তাই শরীর খারাপ। 

দেবায়ন অনুপমাকে নিয়ে বাড়ির উদ্দশ্যে রওনা দেয়। অনুপমা সারাটা রাস্তা মুখ ভার করে দেবায়নের পেছনে বসে থাকে। পায়েলের সাথের ছেল্টা যদি অগ্নিহোত্রী না হয়ে অন্য কেউ হয় তাহলে পায়েলের এত গোপনীয়তা কেন? শরতের ঠাণ্ডা বাতাসে অনুপমা, দেবায়নকে পেছন থেকে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে। বাইকে যেতে যেতে পিঠের উপরে চেপে যায় অনুপমার নরম শরীর। দেবায়নের পিঠ নরম তুলতুলে স্তনের পরশে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দেবায়ন ঘাড় ঘুরিয়ে অনুপমার গালে একটা ছোটো চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করে এই বারে পুজোতে কোথায় বেড়াতে যেতে চায়। অনুপমা হেসে জানিয়ে দেয় যে এবারে কোথাও বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা নেই, সবাই মিলে এইবারে পুজোতে আনন্দ হই হুল্লোড় করবে। অনুপমা জানায় যে, ওদের বাড়ির অদুরে ম্যাডক্স স্কয়ার, বলা যেতে পারে ওদের পাড়ার পুজো। ওর বাবা ওই পুজোতে অনেক টাকা চাদা দেয় সেই সাথে ক্লাবের সভাপতি। এবারে সারাদিন পুজোর প্যান্ডেলে বসবে আর সব বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা মারবে। অনুপমা বলে একটা গাড়ি করে অষ্টমীর দিনে সব বন্ধু বান্ধবী ঠাকুর দেখতে বের হলে বেশ ভালো হয়। সেই শুনে দেবায়ন বেশ খুশি। পুজোর সময়ে সবার বাড়িতে একটু ছাড় পাওয়া যায়, দেবায়ন আর অনুপমার বাড়ি থেকে কোন রকমের অসুবিধে হবে না। 

বাইক পন্ডিতিয়া থেকে ঘুরে অনুপমাদের বাড়ির দিকে ঢোকে। অনুপমা অনুরোধ করে একবার ম্যাডক্স স্কয়ারে নিয়ে যেতে, মাঠের মাঝে দুর্গা পুজোর প্যান্ডেল বানানো শুরু হয়ে গেছে। অনুপমাকে সবা চেনে, ওই খানে। দেবায়নের সাথে অনুপমাকে দেখে একটা লোক হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসে। অনুপমা সেই ভদ্রলোককে হাঁপাতে দেখে কারন জিজ্ঞেস করে।

আগন্তুক, রঞ্জিত দাস, ক্লাবের মেম্বার, হাঁপাতে হাঁপাতে অনুপমাকে বলে, “হ্যাঁ রে, বিশাল কান্ড ঘটে গেছে। তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি যা। আজকে মনে হয় সোমেশদা র কপালে দুঃখ আছে।”

অনুপমা আর দেবায়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেন? কার কি হয়েছে?”
Reply
বিংশ পর্ব। (#2)





আগন্তুক, রঞ্জিত দাস, ক্লাবের মেম্বার, হাঁপাতে হাঁপাতে অনুপমাকে বলে, “হ্যাঁ রে, বিশাল কান্ড ঘটে গেছে। তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি যা। আজকে মনে হয় সোমেশদা র কপালে দুঃখ আছে।”

অনুপমা আর দেবায়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেন? কার কি হয়েছে?”

রঞ্জিত বলে, “আরে আর বলিস কেন। তোর ভাই, অঙ্কন আর ওই সান্যাল ডাক্তারের মেয়ে পায়েল। কিছুক্ষণ আগে ওরা দুইজনে এখানে বসে গল্প করছিল। তোর ভাই আর পায়েল, দুইজনকে সেই ছোটো বেলা থেকে দেখে এসেছি। এই ত প্রেম করার বয়স, করুক না কে মানা করেছে। কিন্তু শালা, ওই বকাটে বাঞ্চোত শরত দে, সান্যাল ডাক্তারের পোঁদে তেল মারার জন্য ডাক্তারকে সব বলে দিয়েছে। তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি যা, কমলেশ মেয়েকে ধমক ধামক দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে আর তোদের বাড়ি গেছে। আজকে মনে হয়, সোমেশদাকে পারলে খেয়ে ফেলবে।” 

অনুপমা আর দেবায়ন সব কিছু বুঝে যায়। দেবায়ন বাইকে চড়া মাত্রই অনুপমার কাছে ওর মায়ের ফোন আসে, তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসার জন্য বলে। দেবায়ন তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে বাইক ছুটিয়ে দেয়। অনুপমা রাগে দুঃখে দেবায়নের কাঁধ খামচে ধরে থাকে। কোনোরকমে বাইক দাঁড় করিয়ে দেবায়ন দৌড় লাগায় বাড়ির দিকে। অনুপমা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যায় বসার ঘরে। বসার ঘরে ঢোকা মাত্র চোখ যায় সোফায় বসা বাবার দিকে। পারমিতা এক দিকে ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে। সবার চোখ মুখ থমথমে, কমলেশ নামের ঝড় বয়ে চলে গেছে ওদের বাড়ি ঢোকার আগেই। 

দেবায়ন আর অনুপমাকে দেখে, মিস্টার সেন গর্জে ওঠেন, “দ্যাখ তোর ভাইয়ের আর বান্ধবীর কান্ড। সাড়া পাড়ায় আমার মুখ ডুবিয়ে তবে ছাড়ল। এইবারে পুজোতে ভেবেছিলাম কোলকাতায় থাকব, কিন্তু ক্লাবের সবাই জেনে যাবে। কমলেশ যাতা বলে গেল আমাকে। আর কি বলি বল, আমি কি মানা করেছিলাম ওকে? শেষ পর্যন্ত কি না নিজের থেকে পাঁচ বছরের বড় একটা মেয়েকে প্রেম করেছে? পিটিয়ে ছাল খুলে দেওয়া উচিত। বাইক চাই, বাইক চাই, নাচানাচি দেখো ছেলের। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে, কোচিং ফাঁকি দিয়ে শুধু প্রেম করে বেড়িয়েছে।”

অঙ্কন চুপ করে ওর মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে। দেবায়ন মিস্টার সেনকে শান্ত করে বলে, “আপনি একটু শান্ত হন, আগে বলুন পায়েলের বাবা কি বলেছে আপনাকে?”

মিস্টার সেন, “আচ্ছা তুমি বল, আমি কি তোমাদের কোনদিন মানা করেছি? তুমি আর অনু তোমার মায়ের সাথে মুসউরি বেড়াতে গেলে, আমি মানা করেছিলাম? একবার অন্তত ওর মাকে জানাতে পারত যে ছেলে প্রেম করছে। প্রেম করেছে, সেটা বড় কথা নয় কিন্তু একটু দেখে শুনে করবে ত? অত বড় মেয়ে তার উপরে কমলেশ। আমি কমলেশকে অনেক দিন ধরে চিনি। একদম ইতর মনোবৃত্তির মানুষ। ডাক্তার হলে কি হবে মুখের ভাষা, মানসিকতা একদম ভালো নয়।”

অনুপমা অঙ্কনকে জিজ্ঞেস করে, “কি রে তোদের এতদিন ধরে জিজ্ঞেস করে গেলাম তোরা একটা উচ্চবাচ্চা পর্যন্ত করলি না।”

অঙ্কন চুপ করে পারমিতার পেছনে দাঁড়িয়ে ওর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। পারমিতা মেয়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, “কি বলছিস তুই? পায়েল আর অঙ্কনের ব্যাপারে তুই জানতিস না?”

অনুপমা কাষ্ঠ হেসে উত্তর দেয়, “জানলে কি আর তোমার কাছে গরিমার কথা বলতাম?” অনুপমা অঙ্কনকে বলে, “তুই উপরে যা, পরে তোর সাথে কথা হবে।” অঙ্কন উপরে না গিয়ে অদুরে দাঁড়িয়ে থেকে ওদের কথা শোনে।

মিস্টার সেন বলেন, “কমলেশ খুব রেগে মেগে ঘরে ঢুকে তোলপাড়। আমার ছেলে নীচ, আমার ছেলে ইতর, আমরা ব্যাভিচারি। আমাদের নাকি আত্মসন্মান বোধ কিছু নেই, টাকা পয়সা আছে বলে সব কিছু করতে পারি আমরা। আমার মেয়ে ওর মেয়ের মাথা খেয়েছে। অঙ্কনকে ত প্রায় কান ধরে টানতে টানতে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। আমি কিছু বলার আগেই যাতা বলতে শুরু করে দেয়।”

পারমিতা মাথায় হাত দিয়ে সোফার উপরে বসে পরে, “সব ঠিক আছে, ছেলে প্রেম করেছে পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু পায়েল?” দেবায়নের দিকে তাকিয়ে বলে, “না পায়েল নয়। তুমি ওকে কিছু করে বুঝাতে চেষ্টা কর দেবায়ন। পায়েল নয়, পায়েলকে মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।”

অনুপমা আর দেবায়ন পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করে। পারমিতার কথার অন্তর্নিহিত অর্থ ওদের অজানা নয়। দেবায়নের সাথে পায়েলের আর অনুপমার সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত পারমিতা। সেই মেয়েকে বাড়ির বউমা হিসাবে মানতে বড় কষ্ট হয়। 

নিরুপায় অনুপমা পারমিতাকে প্রবোধ দিয়ে বলে, “মা, আমাদের একটু ভাবতে দাও। সময় সব ঠিক করে দেবে, দাঁড়াও দেখি আগে পায়েল আর অঙ্কনের সাথে কথা বলে।”

পারমিতা, দেবায়ন আর অনুপমার দিকে কাতর কণ্ঠে বলে, “যাই কর, অঙ্কন প্রেম করেছে ভালো কথা কিন্তু আমি পায়েলকে ঠিক অঙ্কনের জন্য মেনে নিতে পারছি না। পায়েল ওর চেয়ে অনেক বড় আর পায়েলের ব্যাপার আমি সব জানি।”

অঙ্কন এগিয়ে এসে মাথা নিচু করে বলে, “দেখো তোমাদের জানাই নি সেটা আমার ভুল, তার ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তবে পায়েলকে আমি ভালোবাসি আর পায়েল আমাকে ভালোবাসে। আমি জানতাম মা, দিদি, দেবায়নদা কেউ আমাদের এই সব মেনে নেবে না। তাই আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দুইজনে লুকিয়ে রাখব আমাদের সম্পর্ক। এত তাড়াতাড়ি যে ধরা পরে যাবো সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি।”

অঙ্কনের কথা শুনে মিস্টার সেন রেগে যান, “তুই একটা নচ্ছার ছেলে। পড়াশুনার নাম নেই তোর। রক্তের দোষ আর কোথায় যাবে। ভালো হত যদি ...” কথাটা শেষ করল না মিস্টার সেন, চোখে মুখে ফুটে ওঠে এক অব্যাক্ত বেদনা। সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরে চুপ করে যান, কথাটা বলে খুব ভুল করেছে মিস্টার সেন।

পারমিতার চোখ ছলছল করে ওঠে মিস্টার সেনের সেই অব্যাক্ত বাক্য ভেবে। অনুপমা ওর বাবাকে ধমকে ওঠে, “তুমি কি বলছ ভাইকে? একটু ভেবে চিন্তে কথা বল।”

পারমিতা ছলছল চোখে মিস্টার সেনকে বলে, “এতদিন তোমার ছেলে খুব ভালো ছিল তাই না? আর একটা কথা বলবে না তুমি আমার ছেলের সম্বন্ধে।”

মিস্টার সেন বুঝে যান যে অব্যাক্ত ওই বাক্যবাণ বড় নিষ্ঠুর, মুখ থেকে বের হয়ে যায়নি সেটাই বড় কথা। অঙ্কনের দিকে তাকিয়ে মিস্টার সেন গম্ভির কণ্ঠে বলেন, “তোকে উপরে যেতে বলা হয়েছে তুই এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস?”

অঙ্কন মাথা নিচু করে বলে, “বাবা কি বলতে চাইছে আমার রক্তের ব্যাপারে আমি জানতে চাই।” 

সবাই নির্বাক হয়ে অঙ্কনের দিকে তাকিয়ে থাকে। পরিস্থিতির সামাল দেওয়ার জন্য দেবায়ন অঙ্কনকে বলে, “আরে বাবা কিছু না, রক্তের কথা কিছু না। তুই জানিস কাকু রাগের মাথায় মাঝে মাঝে উলটো পাল্টা বলে ফেলে। ব্যাপার হচ্ছে, তুই যখন খুব ছোটো ছিলিস, তখন তোর ব্লাডে হিমোগ্লোবিন কম হয়ে যায় একবার। সেই সময়ে বেশ কয়েক বোতল রক্ত চড়াতে হয়েছিল। সেসব কথা তোর মনে নেই। ওই রক্তের কথা বলা হচ্ছে আর কিছু না।”

অঙ্কন চুপ করে দেবায়নের দিকে তাকিয়ে বলে, “মা বাবাকে বলতে আমার কোন ভয় ছিল না। শুধু মাত্র দিদিকে ভয় ছিল বলে আমরা লুকিয়ে ছিলাম। আমি ভেবেছিলাম ওর কলেজ শেষ হলে আর আমার কলেজ শুরু হলে তারপরে আমরা তোমাদের আমাদের ব্যাপারে বলব। আমি পায়েলকে ভালোবাসি, ওকে ছাড়া আমি থাকব না। ”

ভাইয়ের থমথমে মুখ দেখে অনুপমা বলে, “তুই নিজের ঘরে যা, না হলে তুই আজকে দেবায়নের সাথে ওর বাড়ি চলে যা। আমরা আগে এই ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করে দেখি। আমি জানি কমলেশ কাকু যখন জেনে গেছে পায়েলের এই ব্যাপার তখন ওর ওপরে খুব অত্যাচার হবে। দেখি কি করা যায়।”

মিস্টার সেন অঙ্কনের দিকে করুন চোখে তাকিয়ে বলেন, “তুই উপরে যা। পরে তোর সাথে কথা বলব।” 

মিস্টার সেন মাথায় হাত দিয়ে চুপ করে বসে থাকেন। পারমিতা, মিস্টার সেনের পাশে বসে শান্ত হতে অনুরোধ করে। অনুপমা অথবা দেবায়নের মাথা কিছু কাজ করছে না, কি করবে কিছুই ভেবে পায় না দুইজনে। আগমনীর ঢাকের বাদ্যির জায়গায় বাড়ির পরিবেশ থমথমে হয়ে যায়। দেবায়ন, অঙ্কনকে বলে নিজের কাপড় গুছিয়ে নিতে। পারমিতা আর অনুপমা করুন চোখে দেবায়নের দিকে তাকিয়ে থাকে। অঙ্কন উপরে নিজের ঘরে চলে যাবার পরে দেবায়ন বলে, অঙ্কনের সাথে কথা বলে বিচার করে ওদের জানিয়ে দেবে। পারমিতা কিছুতেই পায়েলকে বাড়ির বউমা করতে নারাজ। অনুপমা মাথায় হাত দিয়ে বসে। মিস্টার সেন চুপ করে সোফায় বসে ড্রিঙ্ক করতে শুরু করে দেন। 

দেবায়ন কিছু পরে অঙ্কনকে নিয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। অনুপমা আর পারমিতা দুইজনে দেবায়নকে বারবার বলে যে করে হোক অঙ্কনকে বুঝাতে। দেবায়ন বলে যে চেষ্টা করবে, আগে অঙ্কনের কাছে সম্পূর্ণ গল্প শুনতে চায় দেবায়ন। অনুপমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে দেবায়ন ওর মাকে ফোন করে জানিয়ে দেয় যে সাথে অঙ্কন আসছে। অঙ্কনের কথা শুনে দেবশ্রী একটু অবাক হয়ে কারন জিজ্ঞেস করে। উত্তরে দেবায়ন জানায় যে বাড়িতে ফিরে সব কিছু মাকে খুলে বলবে। 

কয়েকদিন পরেই মহালয়া আর তার আগেই এই রকম একটা কান্ড ঘটে যাওয়াতে দেবায়ন বেশ চিন্তিত। অঙ্কন চুপ করে পেছনে বসে, দেবায়নকে বেশ সমিহ করে চলে তাই বুকের মধ্যে দুরুদুরু শুরু হয়ে যায় ওর। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কি জিজ্ঞেস করবে, কি করবে কিছুই ভেবে পায় না। 

বাড়িতে ঢুকতেই দেবশ্রী জানিয়ে দেয় যে পারমিতা ফোনে সব কিছু জানিয়ে দিয়েছে। দেবশ্রী একবার দেবায়নের দিকে তাকায় একবার অঙ্কনের দিকে। অঙ্কন চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। দেবশ্রী ওর মনের অবস্থা সামাল দেবার জন্য হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসতে বলে। অঙ্কনকে দেবায়নের রুমের মধ্যে পাঠিয়ে দিয়ে দেবশ্রী দেবায়নকে পায়েলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। উত্তরে দেবায়ন জানায় যে পায়েল ওদের কলেজের বান্ধবী। দেবশ্রী বলে যে পারমিতা খুব আহত হয়েছে পায়েল আর অঙ্কনের ব্যাপারে জেনে। বারবার বলে দিয়েছে যে ছেলেকে কোন ভাবে বুঝিয়ে যেন পায়েলের থেকে দুরে সরিয়ে রাখে। দেবায়ন নিজের ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে যে অঙ্কন ওখানে দাঁড়িয়ে। অঙ্কনের থমথমে চেহারা দেখে দেবায়ন ভাবনায় পরে যায়। মাকে বলে, আগে অঙ্কনের সাথে কথা বলে তারপরে কোন এক সিদ্ধান্ত নেবে। অঙ্কন জানিয়ে দেয় যে কোন রকম উলটো সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। দেবায়নের চোয়াল শক্ত হয়ে যায় অঙ্কনের কথা শুনে। অঙ্কনের অবস্থা সঙ্গিন দেখে দেবশ্রী বলে যে আগে খাওয়া দাওয়া সারতে তারপরে সব কিছু জেনে বুঝে একটা বিচার করা যাবে। 

খাওয়ার পরে দেবায়ন অঙ্কনকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। ঠিক সেই সময়ে অনুপমার ফোন আসে। চিন্তিত অনুপমা জানায় যে পায়েলের ফোন বন্ধ, পায়েলের বাড়ির ফোনে ফোন করেছিল কিন্তু কেউ ফোন তোলে নি। ওইদিকে মিস্টার সেন আর পারমিতা বেঁকে বসেছেন পায়েলের ব্যাপারে। অনুপমা, ওর মাকে অনেক বুঝাতে চেষ্টা করেছে, যে পায়েল মেয়ে হিসাবে খারাপ নয়। মন ভালো, মিষ্টি মেয়ে। বাড়ির প্রবল চাপে ওকে বাড়ির বাইরে উশ্রিঙ্খল করে দিয়েছে। বাড়িতে ওর বাবা মায়ের কাছে একটু ছাড় পেলে হয়ত পায়েল এতটা উশ্রিঙ্খল হয়ে উঠত না। কিন্তু পারমিতা কিছুই মানতে রাজি নয়। অঙ্কনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, দেবায়ন জানায় যে অঙ্কনের সাথে এখন কথা বলা হয়ে ওঠেনি। 

রাতে অঙ্কনকে দেবায়ন জিজ্ঞেস করে পায়েলের কথা। অঙ্কন চুপ করে থাকে, দেবায়নের বাঘের মতন কণ্ঠ স্বর শুনে গলা শুকিয়ে যায়। দেবায়ন স্বর নরম করে আসস্থ করে জানিয়ে দেয় যে ওর বাবা মা সবাই পায়েলের বিরুদ্ধে। অঙ্কন কি বলবে ভেবে পায় না। দেবায়ন ওদের গল্প শোনার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে, অঙ্কনকে বলে যে পুরো কাহিনী জানালে ওর জন্য কিছু করতে পারে। 

বুক ভরে শ্বাস নেয় অঙ্কন, “তুমি সত্যি বলছ?”

দেবায়ন, “তোর গার্লফ্রেন্ড গরিমা, কেউ আছে কি ওই নামে? আর পায়েল যে আমাদের অগ্নিহোত্রীর কথা বলে বেড়াত, কে সে লোক? সঙ্গীতার কাছে শুনেছি যে পায়েলের পিসতুত দাদার বন্ধু, মানে অগ্নিহোত্রী আছে।”

অঙ্কন বলে, “অগ্নিহোত্রী আর গরিমা, দুই জনেই বর্তমান। তবে আমার গার্লফ্রেন্ড গরিমা নয়। গরিমা আমার ভালো বান্ধবী, প্রনবেশের গার্ল ফ্রেন্ড। আমাদের কাজে সাহায্য করার জন্য ওকে আমি সব কথা জানিয়েছিলাম। তোমাদের সামনে কাউকে প্রস্তুত করতে হত তাই গরিমা আমার গার্ল ফ্রেন্ড সাজতে রাজি হয়। আমি ওকে জানিয়েছিলাম যে এই খেলা হয়ত বেশ কিছুদিন খেলতে হবে। গরিমাকে সন্তুষ্ট করতে ওকে একটা ল্যাপটপ কিনে দিতে হয়েছে। দিদি আমাকে সেই টাকা দিয়েছিল।”

দেবায়ন, “হুম, গরিমার কথা বুঝলাম। কিন্তু তুই কি করে পায়েলের প্রেমে পড়লি? একটু খোলসা করে বল, কিছু লুকাস না।” দেবায়নের ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে, “আমি জানি তুই বড় হয়ে গেছিস, আর পায়েল কি রকম মেয়ে সেটাও আমার অজানা নয়।”

অঙ্কন বলতে শুরু করে ওদের গল্প। পায়েল পাড়ার মেয়ে, ছোটো বেলা থেকে অঙ্কন দেখে আসছে তবে আগে কোনদিন পায়েলকে দেখে ওর মনে কিছু হয়নি। প্রথম যেদিন পায়েল ওর দিদির সাথে ওদের বাড়িতে আসে সেদিনও পায়েলকে দেখে ওর কিছু মনে হয়নি। দিদির বাকি বান্ধবীরা বাড়িতে আসত, গল্প করত কিন্তু তাদের মধ্যে পায়েলকে ওর বড় ভালো লাগে। ভালো লাগার কারন, পায়েলের খোলামেলা পোশাক আর নধর দেহের গঠন। হাঁটতে চলতে যেন এক ঝঙ্কার বেজে উঠত অঙ্কনের চোখের সামনে। ওই ঝঙ্কারের আর মত্ত চালে পায়েলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায় অঙ্কন। কিন্তু পায়েল ওর চেয়ে বয়সে অনেক বড় আর দিদির বান্ধবী তাই কোনদিন মুখ ফুটে পায়েলকে নিজের মনের কথা জানায় নি। দিদির সাথে মাঝে মাঝে পায়েল ওদের বাড়িতে থেকে যেত, রাতে গল্প করার সময়ে অথবা কোন আছিলায় পায়েলের সাথে গল্প করত। তখন পায়েলের হাবভাবে অঙ্কন বুঝতে পারত যে ওর প্রতি পায়েলের একটু সংবেদনশীল। কিন্তু বহুদিন ধরে দুই জনে শুধু চোখের দেখা আর কথা বলা ছাড়া নিজেদের মনের কথা কাউকে ব্যাক্ত করেনি। 
Reply
বিংশ পর্ব। (#3)





পায়েলের বাবা, ডক্টর কমলেশ সান্যাল খুব বদরাগী প্রকৃতির লোক। পায়েলের মা, সুজাতা, সেই তুলনায় অনেক নিরীহ আর রক্ষণশীল মহিলা। পায়েল অনেক বড় বয়স পর্যন্ত বাবা মাকে ঝগড়া করতে দেখেছে, এমনকি ওর বাবা ওর মায়ের গায়ে হাত তোলে, সেও দেখেছে। বাবাকে বাধা দিতে গেলে পায়েল অনেক বার মার খেয়েছে। কোন কারন ছাড়াই ওর বাবা ওর মাকে মারত, তরকারিতে নুন হলেও মারত, নুন না হলেও মারত। টাকা পয়সা সব কিছুই ছিল, কিন্তু কেন ওর মাকে ওর বাবা প্রায়দিন মারধোর করত সেই কারন ওর অজানা। একদিন পায়েল ওর মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ওর মা বলেছিল যে ওর বাবা বদরাগী, বাইরের কারুর কথা বলা, মেলা মেশা পছন্দ করে না, কোন কিছুতেই ভালো দেখে না। পায়েল স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখত, বাড়ির চার দেয়ালের বাইরে উন্মুক্ত পৃথিবীতে বিচরন করার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু ওর বাবার ভয়ে স্কুলে থাকতে কোনদিন সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। কোন ছেলের সাথে কথা বলা দুরের কথা, কারুর দিকে তাকালেই ওর বাবা যেন ওকে গিলে ফেলবে এমন করত। তাও পায়েল সেই সময়ে লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম করেছে। অচেনা ছোঁয়ার কিছু স্বাদ নিয়েছে। পায়েল ছোটবেলা থেকে মেয়েদের স্কুল, মহাদেবী বিড়লাতে দিদির সাথে পড়াশুনা করেছে। সেই সময় থেকেই দিদির আর পায়েলের চেনাজানা। কলেজে পড়ার সময়ে থেকে দিদি, অনুপমার সাথে পায়েলের বন্ধুত্ত প্রগাড় হয়ে ওঠে। দিদির খোলামেলা পোশাক আশাক দেখে পায়েল উন্মুক্ত আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখে। দিদির সাহায্যে পায়েল প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ পায়, প্রথম ডিস্কোথেকে যাওয়া, প্রথম কোন বড় রেস্টুরেন্টে খাওয়া, মন খুলে কেনাকাটা করা সব দিদির জন্য করে। পায়েলের এই খোলামেলা পোশাক, নধর গঠনের জন্য অনেক ছেলেরা ওকে কাছে পেতে চেয়েছে। পায়েল সেই সময়ে উড়তে উড়তে অনেকের কাছে ধরা দিয়েছে। পায়েল জানত ওর বাবা যদি এই স্বভাবের কথা জানতে পারে তাহলে ওকে আস্ত রাখবে না, তাই পায়েলের বেশির ভাগ পোশাক দিদির আলমারিতে রেখে দিত। কলেজে যাবার আগে ওদের বাড়িতে এসে পোশাক পালটে তবে দিদির সাথে কলেজ যেত। বাধা অবস্থায় থাকতে থাকতে পায়েল হটাত করে মুক্তির স্বাদ পায় দিদির হাত ধরে, তাই পায়েল একটু বেশি রকমের উশ্রিঙ্খল হয়ে যায়। যদিও অঙ্কন ওর সব উশ্রিঙ্খলতার কথা জানে না, তবে জানে যে পায়েল মাঝে মাঝে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বাড়িতে ফিরত দিদির সাথে। সেদিন আর পায়েল নিজের বাড়িতে যেত না, দিদি ওকে নিজের কাছে রেখে দিত। এক পাড়ায় বাড়ি, তাই দিদির সাথে মেলামেশা করাতে ওর বাবা ওকে বিশেষ কিছু বলত না। পায়েল বলেছিল যে কোনদিন যদি কাউকে ওর মনে ধরে তাহলে তার সাথে বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে যাবে আর ওর মাকে সাথে নিয়ে যাবে। বাড়ির ওই লোহার খাঁচা থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিল কিন্তু ওর অদৃষ্টে মনের মতন মানুষ জুটল না। সবাই ওকে শুধু ভোগের বস্তু হিসাবে ব্যাবহার করে গেছে। 

দেবায়ন চুপ করে অঙ্কনের কথা শুনে যায়। পায়েলের এই কাহিনী অনুপমা ওকে আগেই বলেছিল। অঙ্কনের মুখে সব শুনে একটু দমে যায়, অঙ্কন কি জানে যে ওর দিদির সাথে আর দেবায়নের সাথে পায়েলের শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে? অঙ্কনের কথা শুনে মনে হল, পায়েল এই ঘটনা লুকিয়ে রেখেছে অঙ্কনের কাছ থেকে। দেবায়ন, অগ্নিহোত্রীর কথা জিজ্ঞেস করে। 

অঙ্কন অগ্নিহোত্রীর কথা বলতে শুরু করে। পায়েল যত বড় হয়েছে, ওর দেহের গঠন তত সুন্দর আর লাস্যময়ী হয়ে উঠেছে। ওর পিসির বাড়ি নৈহাটি, পায়েলের যেতে ইচ্ছে করে না ওর পিসতুতো দাদার জন্য কিন্তু বাবার জন্য যেতে হয় পিসির বাড়িতে। ওর পিসতুতো দাদার কুনজর ছিল পায়েলের উপরে। পিসির বাড়িতে গেলে ওর পিসতুতো দাদা, বিনয়, কোন আছিলায় পায়েলের গায়ে হাত দিত, মাঝে মাঝে ওর বুকে পাছায় হাত দিত। আগে পায়েল কিছু বলত না, কিন্তু পরের দিকে পায়েলের এই সব ভালো লাগত না। পায়েল এই সব কথা কাউকে জানায়নি। এমনকি ওর পিসতুতো দাদা ওকে একদিন একা বাড়িতে পেয়ে, চুমু খেয়ে, স্তন টিপে পাছা টিপে আদর করেছিল। রাগে দুঃখে পায়েল কেঁদেছিল সারারাত, কিন্তু কাউকে বলতে পারে নি। 

দিদি আর দেবায়ন গরমের ছুটিতে মুসউরি ভ্রমনে যায়। পায়েলের বাবা, ওকে কয়েক দিনের জন্য ওর পিসির বাড়ি নৈহাটিতে রেখে আসে। পায়েল প্রমাদ গোনে, বুঝতে পারে যে ওর দাদার হাতে ওর ধর্ষণ হওয়া ছাড়া আর কোন গতি নেই। পায়েল এক মতলব আঁটে তখন, বিনয়ের বন্ধু অগ্নিহোত্রীর সাথে প্রেমের নাটক করে। পায়েল ভেবেছিল যে দুই বন্ধুর ভেতরে দ্বন্দ লাগিয়ে দেবে আর এই ভাবে ও বিনয়ের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে যাবে আর যদি অগ্নিহোত্রীকে ভালো লেগে যায় তাহলে অগ্নিহোত্রীর সাথে পালিয়ে যাবে। নারীর লাস্যময়ী রুপ সব কিছু করতে পারে, সব কিছু পরিকল্পনা মাফিক হয়েছিল। অগ্নিহোত্রীর সাথে বিনয়ের মনমালিন্য ঘটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল পায়েল। পায়েল অগ্নিহোত্রীকে নিজের প্রেমের জালে জড়িয়ে নিয়েছিল। কোলকাতা ফিরে আসার পরে, অগ্নিহোত্রীর সাথে বেশ কয়েকবার দেখা হয়। 

দেবায়ন মন দিয়ে অঙ্কনের কাছে এই কাহিনী শুনতে শুনতে জিজ্ঞেস করে পায়েলের ব্যাপারে এত কিছু জানল কি করে? অঙ্কন বলে যে পরে এই সব ঘটনা এক এক করে পায়েল ওকে জানিয়েছে। অগ্নিহোত্রীর সাথে প্রেমের কথা পায়েল ওর দিদিকে কিছুটা বলেছিল কিন্তু সম্পূর্ণ বলেনি। পায়েল আর অঙ্কনের মাঝে আগে থেকেই একটু হৃদ্যতা ছিল কিন্তু প্রেম প্রীতি পর্যায় ছিল না। মাঝে মাঝেই দুইজনে ফোনে বেশ গল্প করত। সেই গল্পের আওয়াজ, একদিন ওর দিদি শুনে ফেলেছিল আর সেই নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। তখন সেই কথা ঢাকার জন্য গরিমার নাম নেয় অঙ্কন। দেবায়নের কাছে এবারে চিত্র বেশ পরিষ্কার হতে শুরু করে। 

প্রথম যেদিন অঙ্কন পায়েলকে ফোন করেছিল তখন পায়েলের সাথে অগ্নিহোত্রীর দেখা হয়নি। একদিন রাতে সাহস জুগিয়ে দিদির ফোন থেকে পায়েলের ফোন নাম্বার নিয়ে পায়েলকে ফোন করেছিল। কাঁপা গলার আওয়াজ শুনে পায়েল রেগে নাম জিজ্ঞেস করেছিল। অঙ্কন ভয় পেয়ে ফোন কেটে দিয়েছিল। কিছু পরে আবার ফোন করেছিল অঙ্কন, তখন কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেছিল কেমন আছে পায়েল। পায়েল দ্বিতীয় বার ফোন পেয়ে আরও রেগে যায়, অঙ্কন নিজের পরিচয় দিতে দ্বিধা বোধ করে আবার ফোন কেটে দেয়। রাতে ঘুমাতে পারেনা অঙ্কন, বারে বারে শুধু পায়েলের মুখ ভেসে ওঠে ওর চোখের সামনে। অনেক রাতে ওর ফোনে ফোন আসে পায়েলের। এবারে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে অঙ্কন উত্তর দেয়, “আমি মানে তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাইছিলাম, পায়েল দি।”
“পায়েল দি” শুনে পায়েল হেসে ফেলে, “হি হি, তুই? আমি ভাবছিলাম কে না কে আমাকে এত রাতে ফোন করে জ্বালাতন করছে। হটাত করে ফোন করলি? ঘুম আসছে না তোর?”

অঙ্কন পায়েলের হাসির কলতান শুনে খুশি হয়ে বলে, “না গো পায়েল দি, একদম ঘুম আসছে না।”

পায়েল, “কেন আসছে না? গার্ল ফ্রেন্ডের কথা মনে পড়ছে?”

অঙ্কন, “হ্যাঁ বটে আবার না বটে। ঠিক জানিনা কেন ঘুম আসছে না, তবে মনে হল তোমার সাথে একটু কথা বলি।”

পায়েল, “বাঃবা এত রাতে ছেলের প্রেম জেগেছে নাকি? তোর দিদি জানতে পারলে কিন্তু ছাল ছাড়িয়ে দেবে।”

অঙ্কন, “আমার ঘরের দরজা সবসময়ে বন্ধ থাকে। দিদি এত রাতে দেবায়নদা র সাথে হয়ত আড্ডা মারছে, আমার কথা শুনতেই পাবে না।”

পায়েল, “তোর স্কুল কেমন চলছে? সামনে পরীক্ষা, পড়াশুনা করছিস ঠিক ভাবে?”

অঙ্কন, “যা বাবা, তুমি দেখি আমার পড়াশুনা নিয়ে বসে গেলে। দিদির মতন কথা বলতে শুরু করে দিলে দেখি। আমি ভাবলাম একটু গল্প করব।”

পায়েল হেসে বলেছিল, “আচ্ছা বাবা, বল কি বলতে চাস।”

অঙ্কন তোতলায় একটু, কি বলবে ঠিক ভেবে পায় না। ওর মনের মাধুরী যাকে দূর থেকে দেখে এসেছে, ফোনে তার গলার আওয়াজ বড় মধুর শোনায়। অঙ্কনকে চুপ থাকতে দেখে পায়েল নিজেই বলে, “তোর স্কুলের বান্ধবীদের কথা বল না হয়।”

অঙ্কন, “না গো পায়েল দি, সেইরকম কোন মনের মতন গার্ল ফ্রেন্ড খুঁজে পেলাম না।”

পায়েল খেলায় অঙ্কনকে, “কেমন গার্ল ফ্রেন্ড পছন্দ তোর?”

অঙ্কন মন বলতে শুরু করে “তোমার মতন সুন্দরী আর সেক্সি গার্ল ফ্রেন্ড পছন্দ আমার। তোমাকে আমার চাই” সেই কথা গলা পর্যন্ত এসেছিল কিন্তু ঠোঁটে আনতে পারেনি অঙ্কন। তার বদলে বলে, “এই একটু বেশ সুন্দরী হবে। স্কুলে সবাই যেন আমার উপরে হুমড়ি খেয়ে পরে। সবার নজর আমার টাকা উড়ানো আর দামী দামী গিফট পাওয়ার প্রতি। ঠিক মনের মতন কাউকে পাচ্ছি না।”

পায়েল, “আচ্ছা বাবা, একদিন দেখিস তোর মনের মতন কাউকে পেয়ে যাবি।”

অঙ্কন মনমরা হয়ে বলে, “জানিনা, তার সাথে দেখা হলে মুখ ফুটে বলতে পারব কি না?”

পায়েল, “কেন, কেন? এমন কে সে যে তাকে তুই মুখ ফুটে বলতে পারবি না?”

অঙ্কন, “না মানে, এখন দেখা পাইনি সেই রকম কাউকে তবে জানি না। ছাড়ো ওই সব, তোমার কথা বল।”

পায়েল হেসে দেয় অঙ্কনের আব্দার শুনে, “আমার কথা কি বলব তোকে? তুই কি আমার বন্ধু নাকি?”

অঙ্কন একটু আহত হয় পায়েলের কথায়, “তা যখন বলতে চাইছ না তাহলে ফোন রাখছি।”

পায়েল হেসে বলে, “বাপ রে ছেলের অভিমান কত। ফোন রাখলে কিন্তু কালকে বাড়ি গিয়ে নাক ফাটিয়ে দেব।”

অঙ্কন, “তাহলে শুনি তোমার বয় ফ্রেন্ডের কথা।”

অঙ্কন বিছানায় উঠে বসে, পায়েলের সাথে কথা বলতে বলতে ওর প্যান্টের ভেতরে লিঙ্গ টানটান হয়ে যায়। পায়েলের সাথে গল্প করতে করতে, মানস চক্ষে পায়েলের নধরকান্তি দেহ পল্লবের কথা চিন্তা করে অঙ্কন। ওর দিদির এ্যালবাম থেকে বেশ কয়েক দিন আগে লুকিয়ে আনা পায়েলের একটা ফটো দেখে রোজ রাতে বিনিদ্র রজনী কাটাত অঙ্কন। রোজ রাতে ভাবত নিজের প্রেয়সী হিসাবে। পায়েল মাঝে মাঝে ওদের বাড়িতে থাকলে ছোটো হাফ প্যান্ট আর হাত কাটা টপ পরে থাকত। পায়েলের নধর কোমল পাছার দুলুনি দেখে থাকতে পারত না অঙ্কন। রাতে কোনদিন ব্রা পড়ত না পায়েল, হাঁটা চলার সময়ে স্তনের দুলুনির সাথে নধর গোলগাল পাছার দুলুনি দেখে উন্মাদ হয়ে যেত। নিজের রুমের নিভৃতে একাকী পায়েলের নধর লাস্যময়ী অঙ্গ মানস চক্ষে উলঙ্গ করে সঙ্গমে রত হত অঙ্কন। 

সেই শুরু ওদের কথা কাহিনীর, তবে শুধু ফোনে কথা বলা ছাড়া এগোতে পারেনি অঙ্কন। পায়েল জানত যে অঙ্কনের সাথে ওর প্রেমের সম্পর্ক কোনদিন সম্ভব নয়, তাই পায়েল ইচ্ছে থাকলেও কোনদিন নিজের মনের কথা বলেনি। এর মাঝে একদিন রাতে গল্প করতে করতে পায়েল ওকে অগ্নিহোত্রীর কথা জানায়। সেদিন বেশ দুঃখ পেয়েছিল অঙ্কন, মনের মধ্যে জমা আগুন ফেটে বের হবার যোগাড় হয়েছিল। ঈর্ষা বোধ করেছিল ওই না দেখা অগ্নিহোত্রীর উপরে। সেদিনের পরে বেশ কয়েকদিন অঙ্কন আর পায়েলের সাথে অভিমান করে কথা বলেনি। তবে পায়েলের সাথে বেশ কয়েকদিন পরে আবার কথা শুরু হয়। অঙ্কন ক্ষমা চেয়ে নেয় আর পায়েল হেসে সেই সব কথা ভুলে যায়। পায়েল তখন অগ্নিহোত্রীর প্রেমে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। অঙ্কন শুধু ওদের প্রেমের গল্প শুনে যেত চুপ করে, বুক জ্বলে গেলেও কিছু বলতে পারত না। 

দেবায়ন, অঙ্কনের কথা শুনে হেসে ফেলে বলে, পায়েলের মতন মেয়েকে দেখলে মরা সাপ পর্যন্ত ফনা তুলে দাঁড়িয়ে যাবে। অঙ্কন সেই কথা শুনে হেসে দেয়। দেবায়ন জিজ্ঞেস করে কি করে তাহলে অগ্নিহোত্রীর কবল থেকে পায়েলকে ছাড়িয়ে নিজের করে নিল। 

অঙ্কন পরবর্তী ঘটনা বলতে শুরু করে। অগ্নিহোত্রী প্রচন্ড ইতর প্রকৃতির ছেলে, আসলে অগ্নিহোত্রী আর বিনয়ের মনমালিন্য কোনদিন ঘটেনি। অগ্নিহোত্রী পায়েলকে ফাঁসানোর জন্য নাটক করেছিল। বিনয় আর অগ্নিহোত্রীর মতলব আসলে অন্যকিছু ছিল, যেটা পায়েল ঠিক মতন জানে না। অগ্নিহোত্রী ওকে জানায় যে ডালহৌসিতে কোন এক্সপোর্ট কোম্পানিতে চাকরি করে। বেশ কিছুদিন অগ্নিহোত্রী পায়েলের সাথে বি.বা.দি বাগে দেখা করে। সঙ্গিতাদি পায়েলকে সাবধান করার পরে, পায়েল একবার অগ্নিহোত্রীর অফিস দেখতে চায়। আসলে বিনয়ের এক বন্ধু ডালহৌসিতে চাকরি করত, সেই অফিস দেখিয়ে অগ্নিহোত্রী বলে যে ওখানে চাকরি করে। পায়েল খুব খুশি হয়, একদিন পায়েল অগ্নিহোত্রীকে ওর বাড়ির কথা, বাবার কথা সব জানিয়ে বলে যে ওকে বিয়ে করতে হলে পালিয়ে বিয়ে করতে হবে। অন্ধ হয়ে গিয়েছিল পায়েল, দেখতে পায়নি অগ্নিহোত্রীর আসল চেহারা। 

অগ্নিহোত্রী ওকে জানায় যে পায়েলকে নিয়ে পালিয়ে যেতে রাজি আছে। পায়েল বেশ খুশি, বাড়ি থেকে পালাবে। যেদিন পায়েল পালাবে, তার আগের দিন রাতে অঙ্কনের সাথে অনেক গল্প করে। অঙ্কনকে জানিয়েছিল যে পায়েল পালাবে। সেদিন অঙ্কন নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। ফোন ছেড়ে খুব কেঁদেছিল পায়েলের জন্য। সকালেই কলেজের নাম করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পরে। দিদির সাথেই বেড়িয়েছিল পায়েল কিন্তু মাঝ পথে নেমে যায়। গাড়ি কলেজে চলে যাবার পরে পায়েল অগ্নিহোত্রীকে ফোনে জানিয়ে দেয় যে পালানোর জন্য তৈরি। অগ্নিহোত্রী জিজ্ঞেস করে যে পায়েল বাড়ি থেকে কিছু নিয়ে এসেছে না খালি হাতে বেড়িয়ে পড়েছে। পায়েল অত শত ভাবেনি। অগ্নিহোত্রীর সাথে পালাবার খুশিতে শুধু মাত্র কয়েকটা জামাকাপড় আর কলেজের ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিল। অগ্নিহোত্রী পায়েলকে শিয়ালদা স্টেসানের ওভারব্রিজের নিচে দাঁড়াতে বলে। পায়েল ওর কথা মতন ওভারব্রিজের নিচে অগ্নিহোত্রীর জন্য অপেক্ষা করে। বেশ কিছুক্ষণ পরে অগ্নিহোত্রী ওর সাথে দেখা করে, পায়েল ওকে দেখে বেশ খুশি। বুক ভরে শ্বাস নেয়, মুক্তির স্বাদ, স্বাধীনতার বাতাস, কে জানত ওর কপালে কি অদৃষ্ট অপেক্ষা করছে। পায়েল আর অগ্নিহোত্রী রাজাবাজারের দিকে হাঁটতে শুরু করে। অগ্নিহোত্রীকে জিজ্ঞেস করাতে উত্তর দেয় যে ওরা বম্বে পালিয়ে যাবে আর সেখানে অগ্নিহোত্রীর কোন এক বন্ধু আছে সে ওকে একটা কাজ দেবে। রাজাবাজারে আসার পরে অগ্নিহোত্রী পায়েলকে একটা গাড়িতে উঠতে বলে। গাড়ি দেখে পায়েলের সন্দেহ হয়, সেই সাথে অদুরে দাঁড়িয়ে থাকা বিনয় আর তার সাথে বেশ কয়েকটা ছেলেকে দেখতে পায় পায়েল। রাগে দুঃখে অপমানে পায়েলের চোখ ফেটে জল চলে আসে, অগ্নিহোত্রীর মুখোশ ছিঁড়ে কুটি কুটি হয়ে যায় পায়েলের সামনে। রাজাবাজার মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে পায়েলকে জোর করে গাড়িতে তুলতে পারে না অগ্নিহোত্রী। পায়েল, অগ্নিহোত্রীর গালে সপাটে এক চড় কষিয়ে বলে প্রতারক, নীচ। দিদির কথা, সঙ্গিতাদির কথা ওর অনেক আগেই শোনা উচিত ছিল। 

অঙ্কন সেদিন স্কুলে যায়নি। সকালে স্কুল যাবার নাম করে মাঠের একপাশে লুকিয়ে ছিল। পায়েল আর দিদি বাড়ি থেকে বের হবার পরেই একটা ট্যাক্সি নিয়ে ওদের গাড়ির পেছনে অনুসরণ করে। মাঝ পথে পায়েল নেমে যেতেই, ট্যাক্সি দুরে দাঁড় করায় অঙ্কন। ট্যাক্সি ড্রাইভার হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল তার কারন। অঙ্কনের মাথায় শুধু শেষ বারের মতন পায়েলকে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রবল ভাবে জেগে উঠেছিল। ড্রাইভারকে বলে যে যত টাকা লাগে দেবে কিন্তু ওকে অপেক্ষা করতে হবে একটু। ড্রাইভার দাঁড়িয়ে থাকে, কিছু পরে পায়েল আরেকটা ট্যাক্সি চেপে শিয়ালদা চলে আসে। অঙ্কন ওর পেছন পেছন শিয়ালদা আসে। ট্যাক্সি থেকে নেমে পায়েল হারিয়ে যায় ভিড়ে, অঙ্কন পাগল হয়ে যায় পায়েলকে দেখতে না পেয়ে। একবার ভাবে যে পায়েলকে একটা ফোন করে বলে দেয় ওর মনের কথা, কিন্তু যদি পায়েল ওর প্রেম নিবেদন নাকচ করে দেয় তাহলে, সেই ভয়ে ফোন করে না। কিছু পরে দেখে একটা ছেলের সাথে পায়েল রাজাবাজারের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। দূর থেকে পায়েলকে অনুসরণ করে সব দেখে।
অগ্নিহোত্রীকে চড় মারার পরে কাঁদতে কাঁদতে পায়েল রাস্তা পার করে, ঠিক তখন অঙ্কন ট্যাক্সি নিয়ে ওখানে পৌঁছে যায়। অঙ্কনকে দেখে পায়েল ভেঙ্গে পরে। ট্যাক্সিতে উঠে অঙ্কনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে পায়েল। 

অঙ্কন পায়েলকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আই লাভ ইউ পায়েলদি, আমি তোমাকে বড় ভালোবাসি পায়েলদি।”

পায়েল জল ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, “জানতাম অনেকদিন ধরে, যে তুই আমাকে ভালবাসিস। দুইজনে অন্ধ ছিলাম। তুই যার ভয়ে আমাকে বলিসনি সেই এক ভয়ে আমি ও তোকে বলিনি কোনদিন।”

অঙ্কন পায়েলকে জড়িয়ে ধরে বলে, “না গো পায়েলদি, আমি অন্ধ নয়, আমি অনেকদিন ধরে তোমাকে দেখে এসেছি। আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি শুধু বলতে পারিনি দিদির ভয়ে আর তোমার ভয়ে। যদি নিবেদন করতাম আর তুমি যদি নাকচ করে দাও তাহলে সেই ধাক্কা হয়ত সহ্য করতে পারতাম না। সেই কারনে আর মুখ ফুটে বলতে পারলাম না তোমাকে।”
Reply
বিংশ পর্ব। (#4)





অঙ্কন পায়েলকে জড়িয়ে ধরে বলে, “না গো পায়েলদি, আমি অন্ধ নয়, আমি অনেকদিন ধরে তোমাকে দেখে এসেছি। আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি শুধু বলতে পারিনি দিদির ভয়ে আর তোমার ভয়ে। যদি নিবেদন করতাম আর তুমি যদি নাকচ করে দাও তাহলে সেই ধাক্কা হয়ত সহ্য করতে পারতাম না। সেই কারনে আর মুখ ফুটে বলতে পারলাম না তোমাকে।”

পায়েল নিজেকে ছাড়ানোর কোন চেষ্টা করেনি। অঙ্কনের আনকোরা আলিঙ্গনে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। বড় লোকের ছেলে অঙ্কন, উপহার পাওয়ার লোভে অনেক মেয়েরাই ওর কাছে এসেছে। স্কুলে থাকতে বেশ কয়েক জন মেয়ের সাথে ছোটো খাটো শরীর নিয়ে খেলা, টপের উপর দিয়ে স্তনে আদর করা, চুমু খাওয়া এই সব করা হয়ে গেছে অঙ্কনের। কিন্তু যাকে ভালোবাসে, যাকে বুকে পেতে এতদিন ইচ্ছুক ছিল তাকে শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে ধরে অঙ্কনের শরীরে বিদ্যুতের ঝটকা লাগে। নরম তুলতুলে শরীর ওর শক্ত আলিঙ্গনের মাঝে গলে যায়। পায়েল ওর জামার কলার ধরে ওর মুখের দিয়ে চেয়ে থাকে আর দুই জনের উষ্ণ শ্বাস পরস্পরের মুখ মন্ডলে ভালোবাসার প্রলেপ ছড়িয়ে দেয়। 

পায়েল গভীর ভাবে অঙ্কনের হাসি হাসি চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “শেষ পর্যন্ত যা ভয় করছিলাম সেটাই হল। আমি শেষ পর্যন্ত আমার প্রানপ্রিয় বান্ধবীর ভাইয়ের প্রেমে পড়লাম।” দুইজনেই হেসে ফেলে।

ট্যাক্সি ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে কোথায় যেতে চায়। পায়েল আর অঙ্কন পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করে বলে শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেন যেতে চায়। ট্যাক্সি ড্রাইভার হেসে জিজ্ঞেস করে যে এতক্ষণ ধরে ট্যাক্সি ধরে রেখেছে, ভাড়া দেবার মতন টাকা ওদের আছে? অঙ্কন হাত খরচের জন্য অনেক টাকা পায়, শেষ হয়ে গেলে ওর ব্যাঙ্ক ওর দিদির পার্স আছেই। টাকার কথা চিন্তা করতে বারন করে দেয় অঙ্কন, ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলে যে, শিবপুরে গিয়ে ওরা ভাড়া মিটিয়ে ট্যাক্সি ছেড়ে দেবে। 

ট্যাক্সি চলতে শুরু করে। পায়েলকে জড়িয়ে ধরে অঙ্কন বলে, “আর কোনদিন পালাবার মতলব করবে না, তাহলে আমি মারা যাবো।”

পায়েল ম্লান হেসে বলে, “উভয় সঙ্কটে পড়েছিরে। যদি তোর দিদি জানতে পারে, তাহলে আমাদের অবস্থা সঙ্গিন করে তুলবে। আর যদি পালাই তাহলে দেবায়ন যা ছেলে, মাটির নীচ থেকে আমাদের খুঁজে বের করে নিয়ে আসবে। কিন্তু আমাকে পালাতে হবেই, মাকে ওই নরক থেকে বের করে আনতে হবে।” পায়েল জানে, অনুপমা আর দেবায়ন মিলে সূর্য আর মনিদিপার কি অবস্থা করেছিল। দুইজনের অনেক বুদ্ধি আর সেই সাথে দেবায়নের সাথে পেরে ওঠা অসম্ভব। অঙ্কন চিন্তায় পরে যায়। পায়েল ওকে, ছোটো ভাইয়ের মতন জড়িয়ে ধরে বলে, “তুই এত চিন্তা করিস না। কাউকে জানাব না এখুনি আমাদের ব্যাপার। আমার পালানো এখন ক্যান্সেল। বি.এস.সি.র পরে আমি পড়াশুনা চালিয়ে যাবো যতদিন না তোর পড়াশুনা শেষ হয়। আমার পড়াশুনা চলাকালীন আশা করি আমার বাবা আমাকে বিয়ে দেবে না আর যদি জোর করে দেয় তাহলে তখন না হয় তোর দিদির আর দেবায়নের শরণাপন্ন হওয়া যাবে। তুই কলেজ শেষ কর, ততদিনে তোর দিদি আর দেবায়নকে কিছু বুঝিয়ে রাজি করান যাবে। এবার থেকে আমি আর বিশেষ তোর বাড়িতে যাবো না, গেলেও আমরা খুব সাধারন ব্যাবহার করব যাতে কারুর সন্দেহ না হয়। যা কিছু করার বাড়ির বাইরে।”

অঙ্কন হেসে বলে, “জানো পায়েলদি, বড় কাউকে প্রেম করে মজা আছে। নিজেকে বিশেষ চিন্তা ভাবনা করতে হয়, বেশির ভাগ চিন্তা ভাবনা সেই করে। বেশ মিষ্টি আদর খাওয়া যায়।”

পায়েল ওর গালে ছোট্ট থাপ্পড় মেরে বলে, “ফাজিল ছেলে, শুধু আম খেলে কাজে দেবে? গাছে একটু জল দেওয়া চাই ত।”

সেদিন আর স্কুল যাওয়া হলনা অঙ্কনের। পায়েলের মুখের হাসি দেখে সব ভুলে গেল অঙ্কন। দুইজনে ট্যাক্সি চেপে বোটানিক্যাল গার্ডেন পৌঁছায় ঠিক দুপুরের দিকে। সারাটা রাস্তা দুইজনে হাত ধরে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে, যেন হারিয়ে যাওয়া মানিক খুঁজে পেয়েছে দুইজনে। বয়সের ব্যাবধান, পারিবারিক অসমানতা কাটিয়ে দুইজনে হারিয়ে যায়। বুকের ভেতরে দুরু দুরু, ওদের সব থেকে কাছের মানুষ, দিদি যদি জানতে পারে তাহলে তার মনের অবস্থা কি হবে। 

গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে যায়। অঙ্কন মিচকি হেসে চুপ করে বলে, ব্যাস এই শুরু ওদের প্রেমের। দেবায়ন মানতে রাজি নয়, আরও জানতে চায় কি হয়েছে। কবে প্রথম চুমু খেয়েছে পায়েলকে, শুধু চুম্বনে ক্ষান্ত ছিল না আরো কিছু হয়েছে পায়েল আর অঙ্কনের মাঝে। সেই কথা শুনে অঙ্কনের কান লাল হয়ে যায় লজ্জায়, মাথা নিচু করে পারলে বিছানার কোথাও লুকিয়ে যাবার চেষ্টা করে। দেবায়ন চেপে ধরে অঙ্কনকে, কারন দেবায়ন ভালো ভাবে জানে যে পায়েল কামুকি প্রকৃতির মেয়ে কিন্তু কয়েক মাস ধরে পায়েলের চরিত্রের যে পরিবর্তন ঘটেছে তাতে অত তাড়াতাড়ি নিশ্চয় পায়েল ধরা দেয়নি অঙ্কনের কাছে। আর অঙ্কনের প্রথম অভিজ্ঞতা জানতে বড় ইচ্ছুক দেবায়ন। অঙ্কন লজ্জায় পরে জানিয়ে দেয় যে আর কিছু হয়নি, শুধু মাত্র গল্প করত। বার কয়েক কোচিং পালিয়ে সিনেমা দেখতে গেছিল কিন্তু কোচিঙের স্যার বাড়িতে ফোন করে মাকে সব জানিয়ে দেওয়াতে সব পরিকল্পনা মাটি হয়ে যায়। তারপরে একদিন বাইকের জন্য বায়না ধরে। দিদির সাহায্যে শেষ পর্যন্ত বাইক কিনে দেয় ওর বাবা। বাইকে করে প্রতি শনি রবিবার কোলকাতার রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে। একবার ব্যান্ডেল চার্চ পর্যন্ত গিয়েছিল ওরা দুইজনে। 

দেবায়ন কিছুতেই মানতে রাজি নয় যে অঙ্কন পায়েল কে চুমু পর্যন্ত খায়নি। লাজুক অঙ্কন কি বলবে ভেবে পায় না। দিদির বন্ধু হিসাবে বরাবর দেবায়নকে খুব সমিহ করে চলে আর বলতে গেলে একটু ভয় পায় ওর চেহারা আর গলার আওয়াজের জন্য। দেবায়ন অভয় দিয়ে বলে যে সব কথা না জানালে ও কিছু করতে পারবে না। অগত্যা অঙ্কন ওর প্রেমের অভিজ্ঞতার খাতা খুলতে শুরু করে। 

সেদিন বোটানিকাল গার্ডেনে যখন ওরা দুই জনে নামল ট্যাক্সি থেকে, তখন অঙ্কনের খুব লজ্জা করছিল। কাঁধে স্কুল ব্যাগ আর পরনে স্কুল ড্রেস, পাশে পায়েল। পাঁচ বছরের বয়সের ব্যাবধান ওর চেহারার প্রতি বাঁকে আঁকা, খুব লজ্জা করছিল পায়েলের পাশে হাঁটার। মনে হচ্ছিল যেন এক দিদি তার ভাইকে নিয়ে গাছ পালা দেখাতে এসেছে। পায়েল দুই হাতে ওর হাত ধরেছিল। বাজুর কাছে পায়েলের নরম স্তনের ছোঁয়ায় শরীর গরম হয়ে গেছিল অঙ্কনের। পায়েল ওকে যতবার স্বাভাবিক হতে বলে তত যেন আড়ষ্ট হয়ে ওঠে অঙ্কন। পায়েল রেগে বলে যে এইরকম ভাবে হাঁটলে কিন্তু ও চলে যাবে। প্রথম দিনেই পায়েল কে বাঁচিয়ে নিয়ে প্রেমে পরে যদি হাত ছাড়া হয়ে যায় কি করবে অঙ্কন। শেষ পর্যন্ত ভয়ে ভয়ে হাতে হাত রাখে, আঙ্গুলের সাথে আঙুল পেঁচিয়ে যায়। অঙ্কনের দেহের প্রত্যেক রোমকুপ জেগে ওঠে। এতদিন কত মেয়ের সান্নিধ্য পেয়েছে তবে ঠিক এমনটি কোনদিন মনে হয়নি অঙ্কনের। 
হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে চলে আসে দুইজনে। বড় বড় ঘাসের আড়ালে নদীর দিকে একটা ছোটো খালি জায়গা পেয়ে বসে পরে। পায়েলের পরনে একটা লম্বা স্কার্ট আর ঢিলে টপ ছিল। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে দিদির কাছে এসে আর জামা কাপড় বদলানো হয়নি তাই আর ছোটো ড্রেস পড়তে পারেনি পায়েল। অঙ্কন অবশ্য বলেছিল যে পায়েল লম্বা স্কার্ট আর পুরো জিন্সে বেশি সুন্দরী দেখায়। সেই কথা শুনে পায়েল ছোটো পোশাক পড়া ছেড়ে দিয়েছিল তারপরে। দিদির আলমারিতে এখন পায়েলের ছোটো জামা কাপড় গুলো রাখা আছে, বাড়িতে নিয়ে গেলে ওর বাবা ওকে খুন করে দেবে। 

পায়ের কাছে গঙ্গার জল, সামনে চওড়া নদী কুলুকুলু বয়ে চলেছে। দুইজনে পাশাপাশি বসে, পায়েলের হাতের উপরে হাত রেখে চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ, কারুর মুখে কোন কথা নেই। পায়েল ওর হাত খানা মুঠি করে ধরে গালের কাছে নিয়ে যায়। নরম গালের হাতের স্পর্শে অঙ্কনের শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে। গালের ওপরে হাত ঘষে মিষ্টি করে অঙ্কনের দিকে তাকিয়ে থাকে পায়েল। লাল নরম ঠোঁট জোড়া অল্প ফাঁক করা, বড় বড় কাজল লাগানো চোখ যেন ওকে ডাক দেয়। অঙ্কন, বয়সের ব্যাবধান, দিদির সাবধান বানী ভুলে যায় ওই চোখের মুক আহ্বান শুনে। 

পায়েল মিষ্টি হেসে ওর ঠোঁটের উপরে আঙুল রেখে বলে, “কি রে কি দেখছিস ই রকম ভাবে?” 

অঙ্কনের কথা জড়িয়ে যায়, “তোমাকে দেখছি। তুমি ভারী সুন্দরী।”

পায়েল ওর হাত গালের উপরে চেপে বলে, “তাহলে পালাতে দিয়েছিলি কেন?”

অঙ্কন পায়েলের কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে, “পালাতে আর পারলে কই, সেই ত ধরে নিয়ে এলাম আমার কাছে।”

পায়েল হেসে বলে, “দুষ্টু ছেলে। অগ্নিহোত্রী যদি আমাকে নিয়ে চলে যেত তাহলে কি করতিস? আঙুল চুষতিস তুই?”

অঙ্কন, “কেন? দেবায়ন দা’র শরণাপন্ন হতাম। দিদি আর দাদার কাছে সব কিছুর ওষুধ আছে।”

পায়েল হেসে বলে, “জানি রে তোর দিদি আর দেবায়নের কথা।”

অঙ্কনের কথার অর্থ ভিন্ন ছিল। ঠিক জানে না তবে যেদিন দেবায়ন ওর মাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল সেদিনের পর থেকে মায়ের স্বভাবে বাবার স্বাভাবে অনেক পরিবর্তন দেখেছে। মা আর বাড়ির বাইরে বিশেষ যায় না, গেলেও নিজের গাড়ি নিয়ে অফিসে যায় আর বিকেলের আগেই বাড়ি ফিরে আসে। ওর দিদি আর মায়ের মধ্যে ছোটো বেলা থেকে যে ব্যাবধান দেখে এসেছে সেটা সম্প্রতি অনুপস্থিত। পায়েল জানে, দেবায়ন সূর্য আর মনিদিপার সাথে কি করেছিল। 

সেদিন আর চুমু খাওয়া হল না। পায়েল ওর বাড়ির কথা, বাবা মায়ের কথা, অগ্নিহোত্রীর কথা সব খুলে বলে। সব কিছু বলার পরে পায়েল বেশ খানিকক্ষণ চুপ করেছিল অঙ্কনের অভিব্যাক্তি দেখার জন্য। অঙ্কন পায়েলের কাঁধে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে বলেছিল যে সময় হলে ওকে এই সব পাঁকের থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসবে। পায়েল তারপরে বলে ওর বিগত উশ্রিঙ্খল জীবনের কথা। পায়েল বলতে চেয়েছিল যে ওর অনেক বয়ফ্রেন্ড ছিল আর তাদের সাথে পায়েল কি কি করেছে। অঙ্কন বলেছিল যার সাথে যা করেছে সেইগুলো সব অতীত। অঙ্কন কিছু শুনতে নারাজ, অঙ্কন বলে আর ওর অতীত জেনে কাজ নেই। পায়েলের বর্তমান, পায়েলের ভবিষ্যৎ সুন্দর করে তুলবে বলে প্রতিজ্ঞা করে অঙ্কন। পায়েল ছলছল চোখে জড়িয়ে ধরেছিল অঙ্কনকে, ভেবে পায়নি ঠিক কি বলবে। গল্পে অনেক সময় কেটে যায়। অতীতের সব কিছু ভুলে হাসিতে মেতে ওঠে পায়েল। পায়েলকে সেদিন বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে কোচিং চলে যায় অঙ্কন। 

তারপর থেকে মাঝে মাঝে পায়েলের সাথে ঘোরা। স্কুল কলেজের দিন গুলোতে বিশেষ ঘুরতে মানা করে দিয়েছিল পায়েল, তাই আর স্কুল পালানো হয় না। তবে শনি রবিবার ওদের একদম নিজেদের। দিদি আর দেবায়ন শনি রবিবার সকাল থেকে কম্পিউটার ক্লাসে ব্যাস্ত থাকে। পায়েল ওর বাড়িতে বলে যে অনুপমার বাড়িতে যাচ্ছে, তাই ওর বাবা মা নিষেধ করেনি। অঙ্কনের কথা ওর মা জানত যে গরিমার সাথে বেড়াতে যাবে ছেলে, তাই সেখানেও নিষেধাজ্ঞা ছিল না। সবার চোখে ধুলো দিয়ে সবার নাকের নীচ দিয়ে চুটিয়ে প্রেম করে গেছে।

সেদিন ছিল শনিবার, আকাশ সকাল থেকে মুখ গোমড়া করে বসে। দিদি কম্পিউটার ক্লাসে বেড়িয়ে যাবার পরেই পায়েলের ফোন আসে, বলে যে এই বৃষ্টিতে আর ঘুরতে গিয়ে কাজ নেই, বাড়িতে বসে আড্ডা মারবে। পায়েলের বাবা মা, কল্যাণী ওর মাসির বাড়িতে গেছে। ওর মাসতুতো দিদি বিয়ের জন্য ছেলে দেখা হচ্ছে, সেদিন ওর মাসতুতো দিদিকে দেখতে আসার কথা। পায়েল বৃষ্টির আছিলায় জ্বরের ভান করে সকাল থেকে বিছানায় পড়েছিল। বাবা মা বেড়িয়ে যাবার পরেই বাড়ি ফাঁকা দেখে পায়েলের মন নেচে ওঠে পেখম তোলা ময়ুরের মতন। ফাঁকা বাড়ি শুনে অঙ্কনের মন উতলা হয়ে ওঠে, মিলনেচ্ছুক হয়ে ওঠে প্রান। কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে সেদিনের পর থেকে, কিন্তু ঠিক ভাবে চুমু খেয়ে উঠতে পারেনি দুইজনে। অঙ্কন তাড়াতাড়ি স্নান সেরে জামা কাপড় পরে মাকে বলে বেড়িয়ে যায়। ওইদিকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু, মা বারন করার আগেই বাইক নিয়ে বেড়িয়ে পরে। 
পায়েলেকে কিছু উপহার দেওয়া হয়নি। গরিয়াহাটে গিয়ে একটা স্টোন অয়াসের লিভাইস কাপ্রি কেনে, সেই সাথে একটা দামী পারফিউম। মেয়েদের মন জয় করতে ওস্তাদ অঙ্কন। অনেক মেয়েদের উপহারের ছলে ভুলিয়ে স্তন, পেট নিয়ে খেলা করেছে তবে পায়েল ভিন্ন। পায়েলের সাথে খেলা নয়, পায়েলের হৃদয় অর্জন করতে চায় অঙ্কন। কেনাকাটা সেরে বাইকে চড়ে পায়েলের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তুমুল বৃষ্টি মাথায় করে পায়েলের বাড়ি যখন পৌঁছায়, ততক্ষণে অঙ্কন কাক ভিজে হয়ে যায়। 

দু’তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর জন্য অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল পায়েল। অঙ্কনকে বাড়ির গেট খুলে বাইক ঢুকাতে দেখে দৌড়ে নিচে নেমে আসে। কাক ভিজে অঙ্কনকে দেখে খিলখিল করে হেসে ফেলে পায়েল। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পায়েলের দিকে চোখ যায় অঙ্কনের। পরনে শুধু একটা ছোটো হাতার কামিজ, নিচে চুড়িদার পড়েনি তাই কামিজ খানা দুই পুরুষ্টু থাইয়ের মাঝখান অবধি এসে আর নেই। নধর দুই থাইয়ের নিচে ফর্সা পায়ের গুলি। বুকের দিকে দৃষ্টি যেতেই ছ্যাঁক করে ওঠে অঙ্কনের বুক। দুই নরম তুলতুলে স্তন জোড়া কামিজের ভেতরে যেন ছটফট করে ওর দিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কামিজের দুইপাশে কাটা, কোমরের একটু নীচ পর্যন্ত কাটা থাকার ফলে, থাইয়ের পাশ পুরো দেখা যাচ্ছে আর সেই সাথে গুরু নিতম্বের ফোলা নরম ভাব পরিষ্কার অনুধাবন করা যায়। অঙ্কন হাঁ করে দাঁড়িয়ে পায়েলের হাসি মুখ দেখে, মাথার চুল একটা পনি টেল করে মাথার পেছনে বাধা। একটা ছোটো চুলের গুচ্ছ, ডান গালের উপরে নেচে বেড়ায়। পায়েল ওর হাত ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে দুতলায় নিয়ে যায়। পায়েলের হাতে জিন্সের প্যাকেট আর পারফিউমের বাক্স ধরিয়ে দেয়। পায়েল ওইগুলো সোফার উপরে রেখে অঙ্কনের গলা জড়িয়ে ধরে বলে যে অইসব আনার কি দরকার ছিল। গলা জড়িয়ে ধরতেই, অঙ্কনের বুকে চেপে যায় পায়েলের নরম স্তন জরা। অঙ্কন আড়ষ্ট হয়ে যায় প্রেমিকার বাহুডোরে বদ্ধ হয়ে। 

পায়েল ওর মাথার চুলে আঙুল ডুবিয়ে ঝাঁকিয়ে বলে, “তুই একদম ভিজে গেছিস দেখছি। পাগল ছেলে, সোজা বাড়ি থেকে এখানে চলে আসা উচিত আর তুই কি আমার জন্য এই সব কিনতে গেলি? আমি চেয়েছিলাম নাকি তোর কাছে?”

অঙ্কন মাথা ঝাঁকিয়ে চুলের জল পায়েলের সারা মুখের উপরে ছিটিয়ে বলে, “বাঃরে, কিছু একটা আনতে হয় তাই আনলাম। খালি হাতে আসলে কি আর ভালো লাগত, বল?”

পায়েল ওকে সোফার ওপরে বসিয়ে একটা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছাতে মুছাতে বলে, “তুই এসে গেছিস আবার কি চাই আমার।”
Reply


Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)