Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

[-]
Tags
অঙ্ক dbitiyo দ্বিতীয় onko

Bangla দ্বিতীয় অঙ্ক | Dbitiyo Onko
Thread Description
adult bangla coti golpo
#31
দ্বাদশ পর্বঃ কলুষিত দেবী। (#2)




দেবস্মিতা কাপড় বদলে প্রসাধন সেরে ঘর থেকে বেড়িয়ে দেখেন যে বুধাদিত্য আর বাপ্পাদিত্য মিলে গল্প শুরু হয়ে গেছে। বুধাদিত্য ভদ্রমহিলাকে যত দেখে তত যেন আশ্চর্য হয়ে যায়। দেবস্মিতার পরনে গাড় বেগুনি রঙের দামী সিল্কের জাপানি কিমোনো, গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা, অপেক্ষাকৃত পাতলা কোমরে একটা বেল্ট দিয়ে বাঁধা। বুধাদিত্যকে হেসে জিজ্ঞেস করেন, “খুব জ্বালাচ্ছে তাই না। একটু বস আমি কফি বানিয়ে নিয়ে আসছি।” কালীনাথ দুধ এনে দেয়, দুধ গরম করে বাপ্পাকে দেন দেবস্মিতা। তারপরে নিজেদের জন্য চা আর কফি বানিয়ে আনেন।

বুধাদিত্যের সামনে বসে জিজ্ঞেস করেন, “তোমার বাড়ি সাজানোর রুচি বেশ আছে দেখছি।”

মনে মনে হেসে ফেলে বুধাদিত্য, বাড়ির আনাচে কানাচে ঝিলামের ছোঁয়া লেগে আছে। যেদিন চণ্ডীগড় গিয়েছিল বুধাদিত্য, ঝিলাম সেদিন নিজে লাজপত নগর গিয়ে শপিং করে এনেছিল, পর্দা, বিছানার চাদর, বেশ কিছু উইন্ড চাইম, বেশ কয়েকটা কাঁচের ফুলদানি। একটা ফল রাখার বেশ বড়সড় হাল্কা নীল রঙের কাঁচের বাটি, আরও অনেক কিছু। বুধাদিত্য হাসে চুপ করে। কিছু পরে জিজ্ঞেস করে দেবস্মিতাকে, “রাতে কি খাবে? বাইরে যাবে? যে হোটেলে ছিলে তার নিচে বেশ ভালো একটা বাঙালি রেস্টুরেন্ট আছে।”

দেবস্মিতা হেসে বলেন, “তোমাকে সেদিন রাতে খাওয়াতে পারিনি তাই আজ নিজে হাতে রান্ন করে খাওয়াব। বল কি খাবে।”

বাপ্পাদিত্য ওদিক থেকে চেঁচিয়ে বলে, “মাম্মা, মিত্তি খাব।” দেবস্মিতা মৃদু ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেন। বাপ্পার কান্না ভরা চোখ দেখে বুধাদিত্যের খুব খারাপ লাগে। ওকে কোলে টেনে বলে, “চল বাজারে, যেখানে হাত রাখবে সেটা তোমার।” বাপ্পা খুব খুশি হয়ে, দেবস্মিতাকে চোখ পাকিয়ে বলে, “আঙ্কেল আমাকে মিত্তি কিনে দেবে আমি একা একা খাব, তোমাকে মিত্তি দেব না।” ওর কথা শুনে দুজনেই হেসে ফেলে। 

বুধাদিত্য, “তোমাকে আর হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হবে না। প্রথম বার এসেছ, কাছেই একটা ভালো চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আছে, ইচ্ছে থাকলে সেখানে অর্ডার দিয়ে দিতে পারি।” 

বাপ্পাদিত্য বায়না ধরে, “মাম্মা ম্যাগি খাব।”

দেবস্মিতা ধমক দিতে যান বাপ্পাকে, বুধাদিত্য বাধা দিয়ে বলে, “আর বোকো না, আমি চাইনিজ অর্ডার দিচ্ছি। পারলে মিস্টার গুহ কে ফোন করে জানিয়ে দাও যে আমি তোমাকে বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছি।”

দেবস্মিতা হেসে ফেলেন ওর কথা শুনে, মাথা নাড়িয়ে বলেন, করে দিচ্ছি। বুধাদিত্য বাপ্পাকে নিয়ে বেড়িয়ে যায়, মিষ্টি, ঘুড়ি, কিছু খেলনা, কিছু চকলেট আর সি.আর.পার্কে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট থেকে খাবারের অর্ডার দিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে বুধাদিত্য চুপ করে বসার ঘরে বসে দেবস্মিতার আসার কারন খুঁজতে চেষ্টা করে। মাথার মধ্যে ঠিক খুঁজে পায় না কারন। বাপ্পাদিত্য খেলনা পেয়ে খুব খুশি, সে তার খেলনা নিয়ে খেলতে ব্যাস্ত। বুধাদিত্যের মন উৎকণ্ঠায় ভরে আসে, মনের ভেতরে হাজার প্রশ্ন ভিড় করে কিন্তু ঠিক কোথা থেকে শুরু করবে ভেবে পায়না। 

দেবস্মিতা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন যে বুধাদিত্যের মনের ভেতরে হাজার প্রশ্নের ভিড় করে এসেছে। সোজাসুজি জিজ্ঞেস করেন বুধাদিত্যকে, “তোমার নিশ্চয় কিছু জিজ্ঞেস করার আছে আমাকে, স্বচ্ছন্দে জিজ্ঞেস করতে পার।”

বুধাদিত্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেবস্মিতার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেন এসেছ এখানে?”

দেবস্মিতা ম্লান হেসে বলেন, “আমার উপরে নিশ্চয় তোমার খুব রাগ আছে, তাই না?” পাশে বাপ্পাদিত্য তার বেনটেন পুতুল আর গাড়ি নিয়ে খেলায় ব্যাস্ত। দেবস্মিতা বাপ্পার দিকে তাকিয়ে বলেন, “ওর নাম আমি দিয়েছি, তোমার নামের সাথে মিলিয়ে।”

বুধাদিত্যের মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে যায়, তাঁর মানে ভদ্রমহিলা সব আগে থেকে জানতেন। চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, রাগ বিদ্বেষ কোনোরকমে গিলে উত্তর দেয়, “তোমার উপরে রাগ করব না কি করব কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।”

দেবস্মিতা ধির গলায় জিজ্ঞেস করেন, “তুমি মিস্টার গুহ কে কত টুকু চেন?”

বুধাদিত্য দাঁত পিষে উত্তর দেয়, “তুমি বলতে চাও যে আমার চেয়ে তুমি ভালো করে মিস্টার গুহ কে চেন?” দেবস্মিতা মাথা নাড়েন, হ্যাঁ। বুধাদিত্য চিবিয়ে উত্তর দেয়, “আমি শুধু এই টুকু জানি যে যখন আমার দরকার ছিল, তখন আমার বাবা আমার পাশে ছিলেন না। সুতরাং আমার কাছে তিনি মৃত।”

দেবস্মিতার চোখের কোনে একটু জল চলে আসে, “তুমি নিশ্চয় ভাবছ যে আমি মিস্টার গুহ’কে তোমার কাছ থেকে, মঞ্জুষা’দির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছি?” বুধাদিত্যের মনে সেই ধারনাই ছিল এতদিন। দেবস্মিতা বলেন, “সত্যি বল, বুধাদিত্য, কতটুকু তুমি মিস্টার গুহ’কে চেন? আমি তোমার সাথে এখানে ঝগড়া করতে আসিনি, আমি শুধু এসেছি কিছু পর্দা সরাতে, আমি নিজের দিক স্পষ্ট করতে এসেছি বুধাদিত্য।” গলা ধরে আসে দেবস্মিতার। 

বুধাদিত্য, “সত্যি বলতে মিস্টার গুহ’কে আমি কাছে কোনদিন পাইনি। ছোটবেলায় তিনি কোনদিন আমার কাছে ছিলেন না, আমি ছিলাম হস্টেলে, বাড়ি ফিরে তাকে সবসময় মদে ডুবে থাকতে দেখেছি। মা আমাকে নিয়ে কোলকাতায় চলে আসেন, পরবর্তী জীবন মামাবাড়িতে আর মায়ের কাছে মানুষ হলাম।” চোয়াল শক্ত হয়ে যায় বুধাদিত্যের, “আজো এই বুকের মধ্যে মায়ের কান্না বাজে, আজো মনে পরে আমাকে বুকে করে মা লেকটাউনের ফ্লাটে চলে আসেন আর ধানবাদ ফিরে যাননি।” দেবস্মিতার চোখের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে বলে, “হ্যাঁ, আমার ধারনা যে তুমি আমার মায়ের কাছ থেকে মিস্টার গুহ’কে ছিনিয়ে নিয়েছ।”

বুধাদিত্যের কথা শুনে দেবস্মিতা চোখের জল মুছে বলেন, “সত্যি কথা শুনতে চাও?” বুধাদিত্য মাথা নাড়ায়, হ্যাঁ।

দেবস্মিতা বলেন, “মিস্টার গুহ’র সাথে আমার দেখা হয় প্রায় বারো বছর আগে, ঠিক মঞ্জুষা দি, তোমার মায়ের মারা যাবার দুই বছর পরে। আমি তখন ধানবাদ রেল হস্পিটালের একজন নার্স। তন্বী, সুন্দরী, সবে চব্বিশে পা রেখেছি। বুকের মাঝে অনেক স্বপ্ন গাঁথা, চোখের সামনে অনেক প্রজাপতি ডানা মেলে থাকত। আমার বাড়ি চিত্তরঞ্জনে, আমি বাড়ির ছোটো মেয়ে ছিলাম। আমার বাবা, চিত্তরঞ্জন লোকো তে সাধারন একটা চাকরি করতেন। আমরা বিশেষ বড়োলোক ছিলামনা।”

বুধাদিত্য চুপ করে শুনে যায় দেবস্মিতার কথা, “একদিন একটা কয়লার খনি দেখতে গিয়ে হটাত হার্ট এটাক হয় মিস্টার গুহ’র। পরে গিয়ে হাত ভেঙ্গে যায় তাঁর। হস্পিটালে ভর্তি হন তিনি। আমি সেই কার্ডিয়াক ওয়ার্ডে নার্স ছিলাম। সেখানে আমাদের প্রথম দেখা, একজন নার্স আর একজন রোগীর সম্পর্ক ছিল, তাঁর চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। সেই সময়ে তাঁর বয়স পঁয়তাল্লিশ প্রায়, আমার থেকে কুড়ি বছরের বড়, আমার ওনাকে দেখে শ্রদ্ধা হত, ভালোবাসা জাগেনি। আমি সেই সময়ে একজন কে ভালবাসতাম, তার নাম রথিন। মিস্টার গুহ অনেক বড়লোক ছিলেন। হস্পিটাল থেকে ছুটি পাওয়ার পরেও ঘরের জন্য একজনের দরকার ছিল তাঁর। হস্পিটালের একজন ডাক্তারের সাথে তাঁর চেনাজানা ছিল, তিনি আমাকে মিস্টার গুহ’র বাড়ি গিয়ে ওনার ড্রেসিং করতে বলেন। আমি মত দিয়েছিলাম।”

“মিস্টার গুহ চেয়েছিলেন একজন হাউস নার্স, আমি প্রথমে না করে দিয়েছিলাম। মিস্টার গুহ বলেছিলেন যে হস্পিটালের চেয়ে বেশি মাইনে দেবেন। সেই সময়ে আমার পয়সার দরকার ছিল, বাবা মাকে আমার পরাশুনার খরচ ফিরিয়ে দেবার ছিল। বাবা অনেক ধারদেনা করে আমাকে নারসিং পড়িয়ে ছিলেন। হসপিটালে থাকতে আমার যেন কেমন মনে হত, সবাই যেন আমার দেহ’টাকে খাবলে খুবলে দু’চোখে ধর্ষণ করছে। এতসব ভেবে, শেষ পর্যন্ত সেই ডাক্তারের কথা শুনে আর মিস্টার গুহ’র কথা শুনে আমি হসপিটালের চাকরি ছেড়ে দিলাম। সেই সাথে আমাকে হস্পিটালের কোয়ার্টার ছেড়ে দিয়ে হয়। আমার থাকার জায়গা ছিলনা, মিস্টার গুহ আমাকে তাঁর বাড়িতে থেকে যেতে বলেন। সেই সময়ে নতুন বাড়ি তৈরি করেছেন তিনি, বিশাল বাড়ি, বেশ কয়েকজন চাকর বাকর। আমি নিচের একটা ঘরে থাকতাম আর মিস্টার গুহ ওপরের ঘরে থাকতেন। ওই বাড়িতে আমি নিজেকে নিরাপদ বলে মনে করি। চাকর থাকা সত্তেও তিনি আমার হাতে ছাড়া আর কারুর হাতে ওষুধ খাবেন না। কয়েক মাস আমার যত্নে ধিরে ধিরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।”

“সুস্থ হবার পরে আমি চিন্তায় পরে যাই যে আমার কাজ এই বাড়িতে শেষ, আমাকে আবার পথে নামতে হবে। হস্পিটাল আমাকে ফিরিয়ে নেবে কিনা সেই সংশয়ে ছিলাম। মিস্টার গুহ সেই সময়ে একটা নতুন ব্যাবসা শুরু করে, হেভি আরথ মুভারস ভেহিকেলেসে ব্যাবসা। অনেক টাকা ঢেলে দিয়ে সেই ব্যাবসা শুরু করেছিলেন, কয়লার খনিতে, বড় বড় কস্ট্রাক্সানে গাড়ি আর মেসিনারি ভাড়া দিতেন তিনি। মিস্টার গুহ আমাকে প্রস্তাব দিলেন যে আমি নারসিং ছেড়ে ওনার ব্যাবসাতে সাহায্য করি। আমি ব্যাবসার কিছুই জানতাম না, তিনি আমাকে সেক্রেটারি হিসাবে নিযুক্ত করেন, প্রথমে। নতুন কাজ, নতুন জীবন, বুকের মাঝে এক নতুন দিগন্ত মেলে ধরে। আমি তাঁর কথা মেনে কাজে যোগ দিলাম।”

“মিস্টার গুহ, কোনদিন তাঁর অতীতের কথা কাউকে বলতেন না। আমি সেই ডাক্তারের কাছে শুনেছিলাম যে মিস্টার গুহ’র পত্নি ছিলেন আর এক পুত্র আছে। মিস্টার গুহ যখন বাড়িতে থাকতেন না, তখন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে সারা বাড়ি তাদের চিনহ খুঁজে বেড়াতাম, কিন্তু সেই বাড়িতে মঞ্জুষা’দির চিনহ বা তোমার কোন চিনহ ছিল না।” 

বুধাদিত্যের খুব খারাপ লাগে সেই কথা শুনে, যে মিস্টার গুহ, জীবন থেকে তাঁর মাকে, তাকে মুছে দিয়েছে। দেবস্মিতা বলতে থাকেন, “সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার পরে তিনি স্বকীয় রুপ ধারন করেন। দিনে রাতে আবার মদ খেতে শুরু করে দেন। কাজের আছিলায় মাঝে মাঝে বাড়ির বাইরে থাকতেন। বেশির ভাগ দিন বাড়িতে তাঁর বন্ধুরা আসত, তাদের সাথে বসে মদ খাওয়া হত, আমি চুপ করে নিজের ঘরে বসে কোম্পানির কাজে ডুবে থাকতাম। মিস্টার গুহ’র প্রচুর নারীসঙ্গ ছিল। আমি নিজে চোখে অনেক কে ওই বাড়িতে দেখেছি। এমন দেখেছি যে, কোন ম্যানেজারের বউ মিস্টার গুহ’র বিছানায় পরে মদে চুড়। রাগে দুঃখে, ব্যাথায় আমার বুক ভেঙ্গে যেত। শুধু ভগবান কে ডাকতাম, যে এই নরক থেকে নিয়ে যাও। ভয় হত যে একদিন হয়ত নেশায় মত্ত হয়ে আমার শ্লীলতাহানি করবেন।”

পিতার আসল পরিচয় চোখের সামনে ভেসে ওঠে বুধাদিত্যের। ঘৃণায় শরীর রিরি করে ওঠে। দেবস্মিতা বলেন, “আমি বুঝতে পারতাম যে আমার কমনীয় আকর্ষণীয় দেহ টাকে মাঝে মাঝেই আড় চোখে মিস্টার গুহ দেখেন। কিন্তু মিস্টার গুহ একবারের জন্যেও আমার দিকে হাত বাড়াননি। মনে হয় আমার সেবার ফল যে তাকে বাঁধা দিত আমার দেহখানি ছিন্নভিন্ন করতে। মিস্টার গুহ’র কাজে যোগ দেবার পরে আমি সেই খোলামেলা জীবন থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলাম। আমার বয়ফ্রেন্ড, রথিন, একদিন আমাকে ছেড়ে চলে যায়। হ্যাঁ, বাবা মায়ের সাথে দেখা করতে যেতে পারতাম আমি। মিস্টার গুহ এতই বদনাম ছিলেন যে বাইরে বের হলে মানুষ আমাকে কেমন একটা চোখে দেখত। রথিন আমার বাড়িতে সেই সব কথা বলে দেয়। আমি নিস্পাপ নিস্কলঙ্ক ছিলাম কিন্তু বাড়ির কেউ আমার কথা শুনতে নারাজ ছিল। আমার যাবার আর কোথাও জায়গা ছিলনা, অগিত্যা আমাকে ফিরে আসতে হয় সেই জীবনে, যা ছিল আমার কপালে লেখা।”
Reply
#32
দ্বাদশ পর্বঃ কলুষিত দেবী। (#3)




“সেদিনের কথা আমার মনে আছে, কালী পুজোর দিন। বিকেলবেলা রথিনের সাথে হিরাপুরে দেখা করার কথা ছিল। মিস্টার গুহ আমাকে গাড়িতে করে হিরাপুরে নিয়ে যান। গাড়ি থেকে নামার সময়ে আমার হাত ধরে বলেন, আমি যেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরি, তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবেন। সেই প্রথমবার মিস্টার গুহ আমাকে ছুঁয়েছিলেন, কিন্তু সেই কথা বাইরের লোক জানত না। সেই দৃশ্য দেখে রথিন রেগে যায়। আমার কথা শোনার আগেই আমার ওপরে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়, আমাকে নীচ, জঘন্য, মিস্টার গুহ’র রক্ষিতা বলে গালাগালি দেয়। এতই বদনাম ছিলেন মিস্টার গুহ, যে তাঁর হাতের একটু ছোঁয়া আমার দুই বছরের সম্পর্ক ভেঙ্গে দেয়। রথিন আমার কোন কথা শুনল না, চলে গেল মুখ ঘুড়িয়ে। সেদিন বুঝেছিলাম, বিস্বাসের আসল মানে। হয়ত আমাদের ভালোবাসার মধ্যে সেই বিশ্বাস ছিল না তাই ভেঙ্গে গেল।”

বুধাদিত্য মাথা নিচু করে দেবস্মিতার ধরা গলার কাহিনী শুনে যায়। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেবস্মিতার দিকে তাকিয়ে দেখে দুই চোখ জলে ভরা, গাল বেয়ে টসটস করে বড়বড় ফোঁটায় শ্রাবনের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। মাথা দোলায় বুধাদিত্য, সত্যি এই ভদ্রমহিলাকে অনেক ভুল বুঝেছে সে। চোখের জল মুছে বুক ভাঙ্গা হাসি টেনে বলে, “ভাবছ যে এই মেয়েটা তোমার সামনে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে, তাই না। কি দরকার আমার এত দূর এসে তোমাকে বানিয়ে গল্প শুনানোর, বল বুধাদিত্য?” 

বুধাদিত্য চুপ করে থাকে, ভাষা হারিয়ে এক নতুন রুপ দেখছে এই দেবী প্রতিমার। ঠিক সেই সময়ে কলিংবেল বাজে, চাইনিজ খাবার নিয়ে লোক এসে যায়। বুধাদিত্য টাকা মিটিয়ে খাবারের প্যাকেট দেবস্মিতার হাতে ধরিয়ে দেয়। বাপ্পাদিত্য ম্যাগি দেখে খুব খুশি। বাপ্পাকে কোলে নিয়ে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে থাকে বুধাদিত্য, বুকের ভেতরে এক শীতল মনোরম বাতাস বয়ে যায়। এই ছোট্ট শিশুর মুখে হাসি দেখে সব দুঃখ, সব কষ্ট নিভে যায় বুধাদিত্যের। চাইনিজ খেতে খেতে বাপ্পার গল্প শুরু হয়, উমংসর নাকি অনেক “ফাইত” করে, অনেক “রাইত” খায়, মাম্মা ওকে বলে পড়াশুনা করলে বড় হয়ে ওকে উমংসরের কাছে নিয়ে যাবে। খাবার পরে বাপ্পাকে নিয়ে শুতে চলে যায় দেবস্মিতা। বুধাদিত্য চুপচাপ বসে থাকে বসার ঘরে, সব কিছু ঠিক, কিন্তু এইসব কথা তাকে এত দিন পরে জানানোর কি দরকার? সেই অঙ্ক মিলাতে পারছে না, বুধাদিত্য। সে’ত মিস্টার গুহ’র সম্পত্তিতে ভাগ বসানোর জন্য হাত পাতেনি। বারেবারে অঙ্ক মিলাতে চেষ্টা করে বুধাদিত্য।

“ব্লাক কফি খাবে?” দেবস্মিতা বুধাদিত্যকে জিজ্ঞেস করেন। তাঁর গলার স্বর শুনে অঙ্ক মিলাতে ভুলে যায় বুধাদিত্য। মাথা নাড়িয়ে ইঙ্গিত করে যে, হ্যাঁ। দেবস্মিতা রান্না ঘরে ঢুকে দু কাপ ব্লাক কফি বানিয়ে আনেন। আবার বসে পড়েন বুধাদিত্যের সামনের সোফায়। 

বুধাদিত্য চেয়ে থাকে দেবস্মিতার দিকে, জিজ্ঞেস করে, “বাপ্পা ঘুমিয়ে গেছে?” মাথা নাড়ায় দেবস্মিতা, হ্যাঁ। বুধাদিত্য বড় শ্বাস নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “এমন কি হল যে চোদ্দ বছর পরে আমার কথা মনে পড়েছে, মিস্টার গুহ’র? তাঁর জীবন’ত ভালোই চলছিল, তবে?”

দেবস্মিতা ওর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, এই তবের প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি এসছি, বুধাদিত্য। রথিনের সাথে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়, আমি নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিলাম। মাস পার হয়ে বছর ঘুরে যায়। দিনেদিনে মিস্টার গুহ’র মদের নেশা আর নারীসঙ্গ বেড়ে যায়। আমি চোখ কান বন্ধ করে নিচের ঘরে পরে থাকতাম আর বাড়ির চাকরদের তদারকি করতাম। মিস্টার গুহ’র ব্যাবসার ম্যানেজার, তরুন সিনহা আমাকে কাজ শিখতে অনেক সাহায্য করেন। কোম্পানির কাজ আমার ঘাড়ে এসে পরে, কেননা মিস্টার গুহ তাঁর অফিস আর মদ নিয়ে পরে থাকতেন। দিনেদিনে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। একদিন মিস্টার গুহ’র সাথে এই নিয়ে প্রচন্ড মনমালিন্য হয়। আমি কড়া গলায় জানিয়ে দিয়েছিলাম, যে আমাকে যদি কাজে রাখতে হয় তাহলে বাড়িতে মেয়ে ঢুকতে দেওয়া হবে না। নেশায় চুড় মিস্টার গুহ আমাকে সেদিন আমার জায়গা দেখিয়ে বলেছিলেন যে এক বেতনভুক্ত চাকর। আমি ওই বাড়িকে নিজের বলে ভাবতাম। মিস্টার গুহ’র কথা শুনে আমি ভেঙ্গে যাই। নিজের ঘরে ঢুকে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করি আমি।”

“ঠিক সেই সময়ে চাকর এসে আমার দরজা ধাক্কা দেয়, চেঁচিয়ে বলে যে দিদিমনি বড়বাবুর কিছু হয়েছে। আমি আত্মহত্যার কথা ভুলে দৌড়ে উপরের ঘরে গিয়ে দেখি যে মিস্টার গুহ রক্তাক্ত অজ্ঞান অবস্থায় মেঝেতে পরে। চারদিকে কাঁচ ছড়ান, গ্লাস বোতল ভাঙ্গা। মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। আমি ওনার মাথা কোলের ওপরে তুলে শাড়ির আঁচল দিয়ে বেঁধে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে চাকরকে বললাম তরুন বাবু আর এম্বুলেন্সকে খবর দিতে। মিস্টার গুহ’কে হসপিটালে ভর্তি করা হল। এবারে আর কাছ ছেড়ে যেতে পারলাম না আমি। চোখের সামনে দেখতে পেলাম যে আমার ভবিষ্যৎ মিস্টার গুহ’র সাথে বাঁধা। আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম আমি, কিন্তু ভগবান আমাকে তাঁর পাশে দাঁড় করিয়ে দেন। আমি চোখ বন্ধ করে মেনে নিলাম আমার ভবিতব্যের লেখন।”

“দ্বিতীয় বার ফিরিয়ে আনলাম মিস্টার গুহ’কে, কিন্তু এবারে মন শক্ত করে নিলাম, আমি মিস্টার গুহ’কে আর বিপথে যেতে দেব না। তাঁর মদ খাওয়া, নারীসঙ্গ সব বন্ধ করে দিলাম। সুস্থ হয়ে ওঠার পরে তিনি অফিস যেতে শুরু করেন। ড্রাইভারের প্রতি কড়া নির্দেশ ছিল যে শুধু মাত্র অফিস আর বাড়ি ছাড়া আর কোথাও যেন না নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে একটু দোনামনা ভাব দেখিয়ে ছিলেন কিন্তু আমি তাঁর মিনতির সামনে নরম হয়ে যাইনি। সময়ের সাথে সাথে মিস্টার গুহ বদলে যান। অফিস থেকে ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরতেন। ওনার প্রতি যে শ্রদ্ধা ভাব ছিল আমার মনে, সেটা এক ভালোবাসায় পরিনত হয়। মাঝে মাঝে অফিস থেকে আসার সময়ে অহেতুক ফুলের তোড়া, আমি চকলেট খেতে ভালবাসতাম, তাই মাঝে মাঝে চকলেট কিম্বা কোন উপহার নিয়ে আসতেন। আমাদের সম্পর্কে এক নতুন মোড় নেয়। আমি জানতাম যে আমাদের বয়সের ব্যাবধান অনেক, আমি জানতাম ভালোভাবে যে আমি কোন পথে চলেছি, কিন্তু আমি সেই ভালোবাসা উপেক্ষা করতে পারিনি। ওনার চোখে, ওনার আচরনে আমি আমার ভালোবাসা পুনরায় খুঁজে পাই। সেই পুরানো কচি মেয়েটা আবার আমার মধ্যে জেগে ওঠে, বুক ভরে মুক্তির শ্বাস নিলাম আমি।”

“মিস্টার গুহ’র সাথে দেখা হওয়ার প্রায় দু’বছর পরে, একদিন বিকেলে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। আমি তাঁর ভালোবাসা উপেক্ষা করতে পারলাম না, সম্মতি জানালাম তাঁর প্রস্তাবে। আমি মিস্টার গুহ’র সামনে একটা শর্ত রাখলাম, আমাকে বিয়ে করতে হলে আমাকে তাঁর অতীত জানাতে হবে। তিনি রাজি হলেন, যে আমাকে তাঁর অতীতের কথা, মঞ্জুষা’দির কথা, তোমার কথা, সব বলবে। আমরা দু’জনে আমার বাড়ি চিত্তরঞ্জনে গেলাম, বাবা মা আমাদের বিয়ের ব্যাপারে সম্মতি দেন না। বলেন যে, মিস্টার গুহ আমার চেয়ে কুড়ি বছরের বড়, সেমত অবস্থায় এই বিয়ে হতে পারে না। আমার দৃঢ়সঙ্কল্প’র সামনে বাবা মা শেষ পর্যন্ত ঝুঁকে যান, এবং আমাদের বিয়েতে আসেন। আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান খুব ছোটো করে হয়েছিল, গোটা কুড়ি বাইশ জন খুব কাছের লোক ছাড়া কাউকে বলা হয়নি সেই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে। আমার স্বপ্ন ছিল আমার খুব বড় করে বিয়ে হবে, কিন্তু পাশে যখন ভালোবাসার মানুষকে পেলাম তখন আর সেই অলিক স্বপ্ন ছেড়ে মিস্টার গুহ’কে বুকে টেনে নিলাম।”

“সেই প্রথম রাতে আমি মিস্টার গুহ’কে তাঁর প্রতিজ্ঞার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলাম। তাকে জানিয়েছিলাম যে তাঁর অতীতের কথা না জানালে তিনি আমাকে চিরতরে হারাবেন। আমার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আমার হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে তাঁর অতীতের কালো পাতা মেলে ধরে। টাকা-পয়সা, প্রতিপত্তি আর নারীসঙ্গের পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজেকে এই পাঁকের মধ্যে ডুবিয়ে ফেলেছেন। মঞ্জুষাদি’র শত বারন সত্তেও কোন কথা কানে দেননি তিনি। নিজের মনে যা ইচ্ছে হত তাই করতেন, শেষ পর্যন্ত মঞ্জুষাদি’কে একদিন বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেন, বলেন যে সে আর তাঁর পুত্র তাঁর চাহিদার মাঝে দাঁড়িয়ে, তাদের তিনি মুখ দেখতে চাননা। তোমাকে তাঁর আগেই হস্টেলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। চোখে জল, বুকে অনুতাপ, কাঁধে অসীম পাপের বোঝা, ঝুঁকে পড়েছেন মিস্টার গুহ। আমার হাত ধরে কাতর মিনতি করেন তাকে সেই পাপের বোঝা থেকে মুক্ত করতে। আমি তাঁর চোখের জলে, তাঁর নতুন রুপের সামনে গলে গিয়ে বুকে টেনে নিলাম। আমি তাকে বলি যে সেদিন থেকে তাঁর সব কষ্ট সব দুঃখ আমি বরন করে নিলাম। সেইদিন আমি বাড়ির নাম মঞ্জুষা মন্দির রাখি। সেটাই আমার উচিত মনে হয়েছিল।” 

“একটা অতি পুরানো কাঠের বাক্স থেকে একটা এ্যালবাম বের করে আমার হাতে দিয়ে বলেন, তাঁর অতীত সেই হলদে কাগজে আটকা পরে আছে। আমাকে মঞ্জুষাদি’র ছবি আর তোমার ছবি দেখিয়ে বললেন যে তিনি সব হারিয়েছেন। আমি বুকে টেনে বলি যে আমি তাঁর হারিয়ে যাওয়া জীবন হয়ত ফিরিয়ে দিতে পারবোনা, তবে ওনার ভবিষ্যৎ নিজে হাতে সুন্দর করে তুলবো।” 

“দিন যায়, বাড়ির নতুন রানী আমি। আমি ব্যাবসার কাজে ডুবে গেলাম, নিজে হাতে সেই কোম্পানির ভার নিলাম। মিস্টার গুহ’র দুই দুই বার হার্টঅ্যাটাক হয়েছে, তাই তাকে শুধু অফিস আর বাড়ি করতে নির্দেশ দিলাম। একটি নরম মেয়ে ধিরে ধিরে এক কোম্পানির কর্ণধারে পরিনত হল। আমি আমার সংসার আমার কাজ নিয়ে মেতে উঠলাম। আমাদের ভেতর থেকে মঞ্জুষাদি হারিয়ে গেল। বিয়ের পাঁচ বছর পরে বাপ্পার জন্ম হয়। আমি বাপ্পার নাম রেখেছিলাম তোমার নামের সাথে মিলিয়ে, হয়ত কোনদিন ওর দাদার সাথে দেখা হবে না, তবে নামের মধ্যে হয়ত জানবে যে ওর একটা দাদা এই পৃথিবীতে আছে। বাপ্পা জন্মাবার পরে মিস্টার গুহ চাকরি থেকে ভলেন্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে নিলেন, সারাদিন বাড়িতে থাকতেন আর বাপ্পার সাথে সময় কাটাতেন। কোন কোন দিন দুপুরে যদি অফিস থেকে বাড়ি আসতাম তাহলে দেখতাম যে বাপ্পা মিস্টার গুহ’র পেটের ওপরে শুয়ে ঘুমিয়ে। ওদের দুজনকে দেখে আমার খুব ভালো লাগত।”

বুধাদিত্য ঘাড় ঘুড়িয়ে গেস্টরুমের ভেতরে তাকিয়ে দেখে, কচি শিশু বাপ্পা, বিশাল বিছানায় উলটে শুয়ে, লাল পদ্মের মতন গোল মুখ, টোপা টোপা নরম গাল, ঠোঁট জোড়া ঈষৎ খোলা, গায়ের ওপরে চাদর। দেবস্মিতার চোখের কোনা চিকচিক করছে, বাপ্পাকে আর বুধাদিত্যকে দেখে। 

দেবস্মিতা চোখের কোল মুছে বুধাদিত্যকে বলেন, “গত বছর, জুলাই মাসে, আমি অফিসের কাজে একটু ব্যাস্ত ছিলাম। বাপ্পা আমার পায়ের কাছে, টেবিলের নিচে খেলছিল। খুব বায়না ধরে লুকোচুরি খেলার জন্য, ওর সাথে বিশেষ সময় কাটাতে পারতাম না, তাই লুকোচুরি খেলতে বসে গেলাম। বাপ্পা লুকিয়ে গেল একটা আলমারির ভেতরে। আমি খুঁজতে গিয়ে সেই আলমারির নিচে খুঁজে পেলাম সেই পুরানো কাঠের বাক্স। বাক্স খুলে এ্যালবাম হাতে নিয়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। পাতা উলটাতেই আমার সামনে মঞ্জুষাদি’র ছবি আর তোমার ছবি চলে এল। কাগজের ভেতর থেকে তোমার আর মঞ্জুষাদির চোখ আমার দিকে এক ভাবে তাকিয়ে হাসছে। সেই ছবি দেখে আমার চোখে জল চলে আসে, আমি বাপ্পার দিকে তাকালাম। এই বিশাল পৃথিবীতে কোন এক কোনায় এক মাতৃহীন ছেলে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই নিস্পাপ ছেলেটা যদি আমার বাপ্পা হত তাহলে...” কেঁপে ওঠে দেবস্মিতার গলা, মুখে হাত চেপে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নেন তিনি। 
Reply
#33
দ্বাদশ পর্বঃ কলুষিত দেবী। (#4)




দেবস্মিতা ধরা গলায় বলেন, “সেই ছেলেটার কি দোষ, সেও চেয়েছিল এক সুন্দর জীবন, সেও চেয়েছিল ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে, অন্যের পাপের বোঝা ঘাড়ে করে কেন সেই ছেলেটা এই বিশাল পৃথিবীতে একা একা ঘুরে বেড়াবে। আমি সেদিন সেই ছবি নিয়ে মিস্টার গুহ’র সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মিস্টার গুহ’র হাত বাপ্পার মাথায় রেখে বললাম, যে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে, তোমাকে ডাকতে, তোমার প্রাপ্য তোমাকে ফিরিয়ে দিতে। মিস্টার গুহ ইতস্তত করেন, তিনি জানান যে তিনি তোমার কোন খবর জানেন না। আমি তাঁর কথা মানতে পারলাম না, আমি জানিয়ে দিলাম যে তিনি যদি তোমার সাথে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপন না করেন তাহলে আমি বাপ্পাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। মিস্টার গুহ বাপ্পাকে বুকে জড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে, বলেন যে তিনি সচেষ্ট হবেন তাঁর পুত্রের সাথে যোগাযোগ করতে। সাথেসাথে তিনি এটাও জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তাঁর পুত্র তাকে ক্ষমা করে দেবে না। আমি জানিয়ে দিলাম, যে ক্ষমার প্রশ্ন এখানে উঠছে না। তাঁর অতীতের জন্য আমি তাকে ক্ষমা করতে পারিনা, কেউ যদি পারে তিনি মঞ্জুষা’দি আর বুধাদিত্য।”

“অনেক জোর করার পরে মিস্টার গুহ রঞ্জন বাবুকে ফোন করেন। তোমার মামিমা ফোন ধরে অবাক হয়ে যান, বেশ কিছুক্ষণ তিনি কথা বলতে পারেন না। আমি বুঝতে পারি তোমার মামিমার রাগ আর বিদ্বেষ। আমি মিস্টার গুহকে তাঁর সামনে অনুরোধ করতে বললাম, যে একবারের জন্য তিনি যেন তোমার ফোন নাম্বার দেন। তোমার মামিমা, শেষ পর্যন্ত তোমার ফোন নাম্বার দিলেন। আমি মিস্টার গুহকে সেইক্ষণেই তোমাকে ফোন করতে বললাম। হাত কাঁপছিল তাঁর, চোখে অনুতাপের অশ্রু নিয়ে ফোন করেছিলেন তিনি। তাঁর পরের ঘটনা তুমি জানো ভালো করে। তোমার সাথে কথা বলার সময়ে তিনি জানতেন যে তুমি মিস্টার গুহ’কে ছেড়ে কথা বলবে না, সব দোষ আমার ওপরে পরবে আর আমার ছেলে বাপ্পার ওপরে পরবে।”

বুধাদিত্য বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়, চোখে জল নেই, বুক ফাঁকা, ধিরে ধিরে জীবনের অঙ্ক মিলছে চোখের সামনে। বুধাদিত্যের সামনে এক কলুষিত দেবী বসে, সমাজ অনেক ঘৃণ্য নাম দিয়েছিল তাঁকে। সেই সব পার করে, এক পাপী আত্মা কে বুকে করে পাঁকের জীবন থেকে টেনে তুলেছে এই দেবী। দেবস্মিতা দেবীর মতন হেসে ওর দিকে জল ভরা চোখে তাকিয়ে বলেন, “তুমি আমাদের বাড়িতে এলে, তোমার আচরন দেখে মনে হল না যে তুমি আমাদের ক্ষমা করতে পেরেছ। আমি তোমার চোখ দেখে বুঝতে পারি যে তুমি আমাকেই দোষী সাবস্ত্য করেছ। আমি মিস্টার গুহ’র যখন অর্ধাঙ্গিনী তখন তাঁর পাপ ভাগ করে নিয়েছি আমি। আমি শেষ চেষ্টা করতে তৎপর হয়ে উঠলাম, শেষবারের জন্য তোমার সাথে দেখা করে সব কথা খুলে বলার জন্য। তোমার ঠিকানা জানার জন্য মিস্টার গুহ’কে দিয়ে অনিন্দিতাকে ফোন করালাম। তোমাকে এখানে না জানিয়ে আসার একটাই কারন, তোমাকে জানালে তুমি হয়ত আমাদের আসতে বারন করতে। তাই ভাবলাম একবারে এখানে এসে তোমার সাথে যোগাযোগ করা, চোখের সামনে দেখে অন্তত ফেলে দিতে পারবে না আমাদের।”

বুধাদিত্যের সামনে মিনতির সুরে ধরা গলায় বলেন, “আমি যখন মিসেস গুহ হবার জন্য সম্মতি দিয়েছিলাম, সেই সময়ে আমি জানতাম মিস্টার গুহ কি রকম মানুষ ছিলেন। তিনি বদলে গেছেন, বুধাদিত্য। আজ তিনি এক অন্য মানুষ। আমি জানিনা, তুমি তাঁকে ক্ষমা করতে পারবে কিনা, কেননা তিনি তোমার অতীত তোমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না।” দুই হাত জোর করে কেঁদে বলেন, “আমার ছেলেটা কোন পাপ করেনি, বুধাদিত্য। তোমার বিদ্বেষের অভিশাপ যেন ওর কাছে না আসে। শুধু তোমার একটু আশীর্বাদ চাইতে এসেছি, বুধাদিত্য, দয়া করে ফিরিয়ে দিও না আমাকে। আমি ভিক্ষে চাইছি, বুধাদিত্য।” দুই হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলেন দেবস্মিতা। 

বুধাদিত্য ঘাড় ঘুড়িয়ে বাপ্পাকে দেখে, এই শিশু কি সত্যি পাপ করতে পারে? ছোট্ট একটি ফুলের কুঁড়ি, এখন জীবন পরে আছে সামনে। বুধাদিত্য ত ভুলেই গিয়েছিল ওর বাবার কথা, তাঁর নতুন জবনের কথা। সামনে বসা এই দেবী প্রতিমা যদি এগিয়ে না আসত, তাহলে হয়ত কোনদিন যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হত না। 

বুধাদিত্য কিছু পরে দেবস্মিতাকে বলে, “চিন্তা করো না, আমি তোমাদের মাঝে কোনদিন আসব না।”

চাপা আঁতকে ওঠেন দেবস্মিতা, “না, তুমি আমাদের ছেড়ে যেতে পার না। ধানবাদের যা কিছু আছে তাতে বাপ্পার যেমন অধিকার তোমার সেই এক অধিকার। আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি।”

বুধাদিত্য ম্লান হেসে বলে, “আমি কোথাও যাইনি, আমাকে কোথায় ফিরিয়ে নেবে?”

দেবস্মিতা, “তোমার বাবার কাছে, মিস্টার গুহ’র কাছে।” 

বুধাদিত্য ম্লান হেসে চুপ করে মাথা দোলায়, কিছু পরে বলে, “তুমি সত্যি একজন দেবী। সব কিছু জেনেশুনে একজন পাপী আত্মার বিষ বুকে টেনে তাঁকে শুদ্ধ করে দিয়েছ। তোমার কথা কি করে ফেলব। ঠিক আছে আমি ছুটি পেলে নিশ্চয় যাব ধানবাদ। আমি তোমাদের সাথে যোগাযোগ রাখব। কিন্তু আমি মিস্টার গুহ’র এক পয়সা নেব না, ক্ষমা করে দিও। আমার সম্পত্তি আমার মা, আমার সাথে আছেন, তাতেই আমি শান্তিতে আছি। আমাদের এই নতুন সম্পর্কের মাঝে টাকা পয়সা নিয়ে না আসাটাই শ্রেয়।”

দেবস্মিতা চোখের জল মুছে ধরা গলায় বলেন, “আমি বড় আশা করে এসেছিলাম, তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য।”

বুধাদিত্য, “না ম্যাডাম, সেটা সম্ভব নয়। দয়া করে সেই অনুরোধ দ্বিতীয় বার করো না, আমি মায়ের সামনে মুখ দেখাতে পারব না তাহলে।”

দেবস্মিতা, “আর বাপ্পা?”

বুধাদিত্য হেসে ফেলে, “বুধাদিত্যের ভাই বাপ্পাদিত্য, আমার আশীর্বাদ সব সময়ে ওর সাথে। সত্যি বলছি, আমি ধানবাদ না গেলে জানতেই পারতাম না যে আমার একটা ভাই আছে।”

দেবস্মিতা অবশেষে চোখের জল মুছে হেসে বলেন, “আমি তাহলে মিস্টার গুহ’কে ফোন করে জানিয়ে দেই যে আমি শেষ পর্যন্ত আমার কারজে সফল হয়েছি।”

বুধাদিত্য ঠিক বুঝতে পারে না, জিজ্ঞেস করে, “মানে?” ঘড়ি দেখে সকাল প্রায় চারটে বাজে, “তুমি এখন ফোন করবে?”

দেবস্মিতা, “হ্যাঁ, তিনি জেগে আছেন। তিনি খুব চিন্তায় ছিলেন, দাঁড়াও একটু কথা বল তাঁর সাথে। তোমার গলার আওয়াজ শুনে হয়ত একটু ঘুমাতে পারবেন।”

হেসে ফেলে বুধাদিত্য, “বয়স হয়েছে, ফোন করে ঘুমাতে বল এখন। কাল কথা হবে।”

দেবস্মিতা ফোন করেন সুবির বাবুকে, “ওষুধ খেয়েছিলে? রতন ঠিকঠাক খাবার দিয়েছিল?” “হ্যাঁ, বাপ্পা ঘুমাচ্ছে।” “হ্যাঁ, আমার সামনে বসে আছে।” “চিন্তা করো না। আমি কথা দিয়েছিলাম, ফিরিয়ে এনেছি আমি।” “না, সেটা আর হল না। তোমার ছেলে অনেক ঋজু, নিজের আত্মসন্মান আছে।” “তুমি এখন শান্তিতে ঘুমাও, পরে ফোন করব।” “কথা বলবে? ঠিক আছে দিচ্ছি।” ফোন বুধাদিত্যের হাতে ধরিয়ে বলেন, “একটু কথা বল না হলে ঘুমাবেন না।”

সুবির বাবুর গলা কেঁপে ওঠে, “কেমন আছো?”

বুধাদিত্য হেসে বলে, “এক প্রশ্ন কয় বার করবে। ঘুমাতে যাও, আর পারলে কালকে বা পরশুর ফ্লাইট ধরে চলে এস।”

কেঁদে ফেলেন সুবর বাবু, “তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।”

বুধাদিত্য, “ঠিক আছে, চলে এস। এখন ত ঘুমাও” ফোন দেবস্মিতাকে ফিরিয়ে দেয়। 

ভোরের নবীন ঊষার আলো, খোলা জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে আসে। 

দেবস্মিতা ফোন রেখে ওর দিকে হেসে বলেন, “মিসেস গুহ হিসাবে যে সম্পর্ক আমাদের হওয়া উচিত সেই মর্যাদা তুমি দেবে না আমি জানি আর সেটা চাইতেও আসিনি।” হাঁ করে থাকিয়ে থাকে বুধাদিত্য। আবার কোন নতুন হেঁয়ালি শুরু করল দেবস্মিতা, সেই ভাবতে থাকে। দেবস্মিতা বলে, “আমি বাড়ির ছোটো ছিলাম, খুব ইচ্ছে ছিল আমার একটা ভাই হোক। কিন্তু সেই সম্পর্ক আমাদের মাঝে হতে পারে না। তাই না?”

বুধাদিত্য বুঝতে পারে কি বলতে চায় দেবস্মিতা। হেসে বলে, “তুমি দেবী, সুতরাং তুমি আমার নাম ধরে ডাকবে আমি তোমাকে দেবী বলে ডাকব ব্যাস। আর সম্পর্কের অলগলিতে ঘুরতে চাই না।”

স্বস্তির শ্বাস নিলেন দেবস্মিতা, জিজ্ঞেস করেন “কফি খাবে?”

বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে, “তোমার ঘুম পাচ্ছে না?”

দেবস্মিতা হেসে বলেন, “দশ বছর অপেক্ষা করেছিলাম এই দিন’টার জন্য। আমার না ঘুমালেও চলবে, তুমি ঘুমাতে যেতে পার।”

দেবস্মিতা রান্না ঘরে ঢুকে দু’কাপ কফি বানিয়ে এনে বুধাদিত্যের সামনে বসে। কফির কাঁপে চুমুক দিয়ে বুধাদিত্যকে প্রশ্ন করে, “একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি, যদিও প্রশ্ন টা অনেক ব্যাক্তিগত, তাও উত্তর জানালে একটু খুশি হব।”
বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে, “কি?”

দেবস্মিতা মৃদু হেসে বলে, “তোমার রান্নাঘর, সোফার কভার, বাড়ির দেয়াল ইত্যাদি দেখে মনে হয় তোমার জীবনে কেউ আছে, সত্যি কি না জানিনা।”

হেসে ফেলে বুধাদিত্য, শেষ পর্যন্ত দেবীর কড়া নজরে ধরা পরে গেছে। হেসে বলে, “কি জানি ঠিক জানিনা, আছে কি নেই।”

দেবস্মিতা, “কি ব্যাপার, কি অসুবিধে একটু জানতে পারি কি?”

বুধাদিত্য একটু খানি চুপ করে থেকে বলে, “আমি একজনকে ভালোবাসি।” শেষ পর্যন্ত নিজের হৃদয়ের কথা ভালোবাসার মানুষকে না জানিয়ে অন্য কাউকে জানাতে হচ্ছে। বুকের ভেতর চিনচিন করে এক অব্যাক্ত ব্যাথা শুরু হয় বুধাদিত্যের।

দেবস্মিতা বড় বড় চোখ করে হেসে বলে, “বেশ ভাল কথা, কবে বিয়ে করছ?”

বুধাদিত্যের মুখ শুকিয়ে যায় ঝিলামের কথা ভেবে, “বিয়ে হয়ত হবে না আমাদের।” ঝিলাম কিছুদিন পরে সমীরের সাথে বেড়াতে যাবে, ঝিলাম আর সমীরের সুখের সংসার থেকে দুরে সরে যেতে যায়।

দেবস্মিতা, “কেন? অসুবিধে কোথায়?” বুধাদিত্য মাথা নিচু করে বসে থাকে। দেবস্মিতা ওর পাশে বসে ওর পিঠের ওপরে হাত রেখে মৃদু সুরে বলে, “দেবী বলে ডেকেছ, আর নিজের মনের কষ্ট একটু জানাবে না?”

নরম হাতের পরশে মায়ের কথা মনে পরে যায় বুধাদিত্যের, চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে বেদনায়। কোনোরকমে আবেগ সামলে বলে, “বড় প্যাঁচালো সম্পর্ক, দেবী। জানিনা শুনলে তুমি আমাকে কি বলবে। আমি যাকে ভালোবাসি সে আমার বন্ধুর বৌ, নাম ঝিলাম। সমীরের সাথে বিয়ে হয় বছর তিন আগে। এই গত বছর দিল্লীতে দেখা, এখন দিল্লীতে থাকে। সমীর আর ঝিলামের মধ্যে সম্পর্ক বেশ কিছুদিন ধরে খুব টানাপড়েনের মধ্যে চলে। সমীর কাউকে ভালোবাসে বা ভালবাসত। আমি ভেবেছিলাম যে হয়ত ওদের মাঝে ডিভোর্স হয়ে যাবে আর আমি ঝিলামকে আমার করে নিতে পারব। কিন্তু কিছুদিন আগে সমীর ফিরে আসে ঝিলামের জীবনে। আমি সেই একা।”

দেবস্মিতা পিঠের ওপরে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কোনদিন তোমার মনের কথা ঝিলামকে জানিয়েছ?” বুধাদিত্য মাথা দোলায়, “না।” দেবস্মিতা জিজ্ঞেস করে, “ঝিলাম তোমাকে ভালোবাসে?” বুধাদিত্য শূন্য চোখে দেবস্মিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। দেবস্মিতা বুঝে যায় যে বুধাদিত্য অথবা ঝিলাম কেউ পরস্পরকে মনের কথা জানায়নি। চিন্তায় পরে যায় দেবস্মিতা, “সত্যি বড় প্যাঁচালো সম্পর্ক। এখানে কিছু করা মানে সবার চোখে পাপী, ব্যাভিচারি হয়ে যাওয়া, এক অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পরা। কি করবে ভেবেছ?” 

বুধাদিত্য মাথা দোলায়, “জানিনা, দেবী। আমি সত্যি নিজের কাছে হেরে গেছি। ওদের মাঝে যেদিন বুঝব যে ভালোবাসা ফিরে এসেছে, সেদিন আমি দিল্লী ছেড়ে, দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও চাকরি নিয়ে চলে যাব। আমি জানি, আমি যদি ঝিলামের চোখের সামনে থাকি তাহলে সমীরকে মেনে নিতে ঝিলামের বড় কষ্ট হবে। আমি চাই না ওদের ভালোবাসার মাঝে কাটা হয়ে দাঁড়াতে।”

দেবস্মিতা মিষ্টি হেসে বলে, “তুমি হারতে পার না, বুধাদিত্য। আমার মন বলছে, একদিন এই কালো মেঘের মাঝ খান থেকে এক নতুন সূর্য উঠবে, তোমার মনের সব কালিমা দূর করে দেবে। সত্যি যদি তোমাকে কোথাও যেতে হয়, তুমি আমার কাছে চলে এস। আমার বাড়ি, তোমার বাবার বাড়ির দরজা তোমার অপেক্ষায় দিন গুনছে বুধাদিত্য।”

বুধাদিত্য ম্লান হেসে বলে, “ভেবে দেখব দেবী। যাও একটু বিশ্রাম করো, আমাকে নিজের ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দাও।”

সকাল বেলায় বুধাদিত্য মামাকে ফোন করে সব কথা বলে। প্রমীলা দেবীর মন একটু খারাপ হয়ে যায়। বুধাদিত্য বুঝতে পারে যে মামিমা ভাবছেন যে ছেলে বাবা পেয়ে হয়ত তাকে ভুলে যাবে। বুধাদিত্য মামিমাকে আসস্থ করে, “পমুসোনা”র জায়গা ওর জীবনে অন্য কেউ নিতে পারবে না। বাবাকে হয়ত ফিরে পেয়েছে, কিন্তু রঞ্জনবাবুকে জানায় যে সুবিরবাবু কর্মে নয়, শুধু মাত্র জন্ম দিয়েছেন বলে তাঁর বাবা। তৎক্ষণাৎ প্লেনের টিকিট কেটে পাঠিয়ে দেয় মামা মামীকে। বিকেলের মধ্যে প্রমীলাদেবী আর রঞ্জনবাবু দিল্লী আসেন। প্রমীলাদেবী দেবস্মিতাকে দেখে তার সাথে কথা বলে আসস্থ হন। বাপ্পাকে দেখে বেশ খুশি হন। রাতের মধ্যে সুবিরবাবু দিল্লী পৌঁছান। বাড়ি লোকজনের সমাগমে মুখর ওঠে, ছোট্ট বাপ্পা মায়ের কোলে চেপে নতুন লোকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। 

সুবিরবাবু অনেক চেষ্টা করেন ছেলেকে ধানবাদে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার। বুধাদিত্য সুবিরবাবুকে শোয়ার ঘরে মায়ের ছবির সামনে দাঁড় করিয়ে জানিয়ে দেয়’যে ওর মা ওর সাথেই আছে, আর এই সম্পত্তি নিয়ে অথবা ধানবাদ যাওয়া নিয়ে যেন কথা না বলে। জানায় যে, নতুন সম্পর্কে টাকা পয়সা না আসলেই ভালো, মায়ের আত্মা শান্তি পাবে না। বুধাদিত্যের জীবনে সব আছে নতুন আর কিছু চায় না।
Reply
#34
ত্রয়োদশ পর্বঃ পুনরুজ্জীবিত। (#1)




কয়েকদিন আগেই বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেছে। দেবস্মিতা আর সুবিরবাবু ধানবাদ ফিরে গেছেন। বুধাদিত্য তাদের কথা দিয়েছে যে আগামি ছুটিতে ধানবাদ গিয়ে কয়েকদিন থেকে আসবে। রঞ্জনবাবু আর প্রমীলাদেবীকে থেকে যেতে বলে, বলে যে কেদার বদ্রি ঘুরাতে নিয়ে যাবে। প্রমীলাদেবী জানান যে অনিন্দিতাদি নেপাল থেকে ফিরে এলে পরের বার সবাই মিলে যাওয়া যাবে। 

ঝিলামের গরমের ছুটি শুরু হয়ে গেছে। বুধাদিত্যকে ফোন করে জানিয়ে দেয় যে সমীর ওকে নিয়ে কয়েকদিনের মধ্যে কোথাও একটা ঘুরতে যাবে। সমীর বুধাদিত্যকে জানিয়েছিল যে ঝিলামকে নিয়ে অরুনাচলের তাওয়াং উপত্যকা দিন পাঁচেকের জন্য ঘুরতে যাবে। সমীরের অনুরোধ রাখে বুধাদিত্য, ঝিলামকে ওর পরিকল্পনা জানায়নি। ভেবেছিল যে স্বামী যখন তাঁর স্ত্রীকে ভালোবেসে একটা চমক দিতে চলেছে, তাহলে সেই আনন্দে বাধা দিয়ে তার লাভ নেই। সেই সাথে বুধাদিত্যের মনে সন্দেহ জেগে ওঠে, পাঁচ দিনে অরুনাচল ঘুরে ফিরবে? সমীরকে জানিয়ে দেয় যে কোন রকম দুরাভিসন্ধি মাথায় রাখলে মেরে ফেলবে সমীরকে। সমীর হেসে জানায় যে ওর মাথায় কোন বাজে পরিকল্পনা নেই। তাও সমীরকে ঠিক ভাবে বিশ্বাস করে উঠতে পারে না বুধাদিত্য। ঝিলামের হাসি মুখ দেখে সন্দেহের বীজ বুকের মধ্যে রেখে দেয়। 

সকালে অফিস বের হবার আগে ঝিলাম জানায় যে রাতে নাকি ওর বেড়িয়ে যাবে। ঝিলাম ঘুরতে যাওয়ার জন্য তৈরি, ব্যাগ ঘুছিয়ে নিয়েছে। কণ্ঠস্বরে একটু উদ্বেগের ছোঁয়া, বুধাদিত্য আসস্থ করে নিরুদ্বেগে বরের সাথে ঘুরতে যেতে, কিছু হলে বুধাদিত্য দেখে নেবে। রাতের বেলা ঝিলামের এস.এম.এস আসে, “আমরা বেড়িয়ে গেছি। ভালো থেক।” বুধাদিত্য সেই এস.এম.এস পড়ে স্তব্ধ হয়ে যায়, ভালোবাসার পাত্রী “ঝিল্লি” তাঁর স্বামীর সাথে মনের আনন্দে ঘুরতে বেড়িয়ে গেছে। মোবাইলে ওর ছবি খুলে দেখে, বুকের বাঁ দিকটা চিনচিন করে ওঠে, ঝিলামকে এই জীবনে এই বুকের মধ্যে আর পাওয়া আর হল না। ঘুম আসেনা বুধাদিত্যের, চোখ বন্ধ করলেই ঝিলামের মিষ্টি মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বুকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পরেছিল ঝিলাম, কিন্তু আটকাতে পারেনি বুধাদিত্য। বুকের ওপরে ওর ঠোঁটের পরশ এখনো লেগে। আলমারি খুলে ওর জামা মুখের ওপরে মেলে ধরে গায়ের গন্ধ বুকে টেনে নেয়। 


ঘন্টা চারেক পরে আবার একটা এস.এম.এস, “আমারা গড়গঙ্গা পার হচ্ছি। জানিনা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তবে খুব খুশি আমি।” খবরটা পড়ে মাথা ঘুরে যায় বুধাদিত্যের, সমীর জানিয়েছিল যে ঝিলামকে নিয়ে অরুনাচল ঘুরতে যাবে। দিল্লী ছাড়ার চার ঘন্টা পরে, ঝিলাম গড়গঙ্গার কাছে কি করছে? সমীরের পরিকল্পনার সাথে অঙ্ক মেলাতে পারে না। ঝিলামকে একটা এস.এম.এস করে জিজ্ঞেস করে গাড়ির নাম্বার আর গাড়িতে কে কে আছে। পরের এস.এম.এসে’র কোন উত্তর না পেয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পরে বুধাদিত্য।

রাত প্রায় বারোটা বাজে, সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভার কালীনাথকে ফোন করে ডেকে নেয়। বুধাদিত্য তাড়াতাড়ি জামাকাপড় পরে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরে। কালীনাথ জিজ্ঞেস করে কারন, কোথায় যেতে হবে। বুধাদিত্য সংক্ষেপে জানায় যে গন্তব্য স্থলের ঠিক নেই তবে ঝিলাম বিপদে। কালীনাথ এতদিন বুধাদিত্যের সাথে থেকে বুঝে গেছে, যে সাহেবের জীবনে ঝিলাম মেমসাহেব খুব বড় স্থান দখল করে রেখেছে। দরজার তালা ভেঙ্গে সমীরের বাড়ি ঢোকে। সব ঘর তছনছ করে ফেলে, সমীরের দুরাভিসন্ধি ধরার জন্য। শেষ পর্যন্ত ওদের শোয়ার ঘরের বিছানার তলায় একটা বড় হলদে খামে দুটি প্লেনের টিকিট, সমীরের পাসপোর্ট আর ভিসার কাগজ, বেশ কয়েক হাজার ডলার পায়। প্লেনের টিকিট, একটা সমীরের নামে অন্যটা নন্দিতার নামে। তারিখ পনেরো দিন পরের, গন্তব্য স্থান, মরিশাস। তার মানে, ঝিলামকে পথ থেকে সরিয়ে দিয়ে দেশের বাইরে চলে যেতে চায় সমীর। চোয়াল শক্ত হয়ে যায় বুধাদিত্যের, পুরানো বন্ধু না শত্রু বলা ভালো, এক ভয়ঙ্কর ধূর্ত সমীর হয়ে ফিরে এসেছে। মাথায় রক্ত চড়ে যায় বুধাদিত্যের, ঝিলামের সাথে এত বড় বিশাস ঘাতকতা। ঝিলাম না জেনে হাসতে হাসতে বিপদের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছে, সারা শরীর টানটান হয়ে ওঠে বুধাদিত্যের। খাম’টা নিজের সাথে নিয়ে নেয়। ঝিলামকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেট জানার জন্য সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায় কোন সুত্র যদি পায় কিন্তু তার চিনহ পায় না। মাথা চেপে বসে পরে, কেন মরতে সমীরের কথায় বিশ্বাস করে ঝিলামকে পাঠিয়েছিল। বড় অনুশোচনা হয় বুধাদিত্যের। একবারের জন্য মনে হয় নিজের মাথার মধ্যে পিস্তলের সব কটা গুলি নামিয়ে দিতে। দরজার শব্দে বাড়ির মালিক পৌঁছে যায় কি হচ্ছে দেখার জন্য। বুধাদিত্য তাঁকে ঝিলাম আর সমীরের কথা জিজ্ঞেস। বাড়ির মালিক জানায়, যে এই কদিনে ওদের বাড়িতে বাইরের লোক কেউ আসেনি। সমীরের আচরনে কোনোরকমে মনে হয়নি যে সমীর আর ঝিলামের মাঝে কোন দ্বন্দ আছে। দুজনে বেশ ভালোই ছিল এই কটা দিন। বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে যে কোথায় বেড়াতে গেছে, সেই ব্যাপারে কিছু জানে কি না। উত্তরে বাড়ির মালিক বলেন যে, একটা সাদা সুমো ভাড়ার গাড়ি চেপে ওরা বেড়াতে বেড়িয়েছে, গাড়িতে দিল্লীর নাম্বার। কোথায় বেড়াতে গেছে কিছু বলে যায়নি সঠিক, তবে দিন পাঁচেক পরে ফিরবে বলে গেছে। বাড়ির দরজায় একটা নতুন তালা লাগিয়ে বেড়িয়ে পরে বুধাদিত্য।

চার ঘন্টা পেরিয়ে গেছে, এতক্ষণে ঝিলামকে নিয়ে অনেক দূর পার হয়ে গেছে সমীর। গা হাত পা জ্বলছে বুধাদিত্যের, রাগে থরথর কাঁপতে শুরু করে। সমীরকে একবার হাতের কাছে পেলে মেরে ফেলবে। ফুলের মতন সুন্দরী মেয়েটা মনে প্রানে স্বামীর কথায় বিশ্বাস করে আবার ফিরে যায়, সেই বিশ্বাস ভেঙ্গে দেয় ব্যাভিচারি ইতর সমীর। বুধাদিত্য ঝিলামকে ফোন করে, কিন্তু ফোন সুইচ অফ বলে, উন্মাদ হয়ে ওঠে বুধাদিত্য। পিস্তল বের করে কোমরে গুঁজে নেয়। সাথে দুটো অতিরিক্ত ম্যাগাজিন। কিছু দূর যাবার পরে কালীনাথকে পাশে বসতে বলে নিজেই গাড়ি ছুটিয়ে দেয়, প্রথম গন্তব্যস্থল গড়গঙ্গা। বুকের মাঝে একটাই আশা এর মাঝে যেন ঝিলামকে আঘাত না করে। ঘন্টা আড়াইয়ের মধ্যে গড়গঙ্গা পৌঁছে যায়। দুই তিনটে ধাবা খোলা ছিল, তাদের জিজ্ঞেস করে যে একটা সাদা সুমো গাড়ি থেমেছিল কিনা। একটা ধাবার লোক জানায় যে কয়েক ঘন্টা আগে একটা সাদা সুমো থেমেছিল তার ধাবায়। বুধাদিত্য মোবাইলে ঝিলামের ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে যে সেই গাড়িতে এই মহিলা ছিল কিনা? ধাবার লোক জানায় যে হ্যাঁ, ওই গাড়িতে ছবির ভদ্রমহিলা ছিলেন। গাড়িতে স্বামী স্ত্রী ছাড়া আর কেউ ছিল না। সমীর ধাবার মালিকের কাছে মুরাদাবাদের রাস্তা আর আলমোড়ার রাস্তা জিজ্ঞেস করেছিল। সমীরের হাতে একটা উত্তরাখণ্ডের ম্যাপ ছিল। বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে ওদের দেখে কি কোন রকম সন্দেহ হয়েছিল ধাবার মালিকের? মাথা নাড়িয়ে বলে, না, এক নববিবাহিত দম্পতির মতন পরস্পরের সাথে হেসে খেলে গল্প করছিল। চোয়াল শক্ত করে সব তথ্য মাথার মধ্যে এঁকে নেয় বুধাদিত্য। মুরাদাবাদ পর্যন্ত পাগলের মতন গাড়ি চালায়, কিন্তু সেই সাদা সুমোর দেখা পাওয়া যায়না কিছুতেই। সে গাড়ি যে অনেক আগে বেড়িয়ে গেছে। ঝিলাম আর সমীর কে বারেবারে ফোনে ধরতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুপরে দুটো ফোন সুইচ অফ বলে। প্রবল এক ঝড় বুকের রক্ত উথাল পাতাল করে তোলে। চোখের সামনে বারেবারে ঝিলাম এসে দাঁড়িয়ে পরে, কানে ভেসে আসে ঝিলামের মিষ্টি হাসি, রাঙ্গা পায়ের নুপুরের রিনিঝিনি সঙ্গীত, উচ্ছল তরঙ্গিণীর মধুর ঝঙ্কার। 

কালীনাথ বারন করা সত্তেও বুধাদিত্য গাড়ি চালিয়ে যায়। ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে ভোরের দিকে নইনিতাল পৌঁছায়। নইনিতাল পেরিয়ে একটা চায়ের দোকান দেখে সেখানে দাঁড়ায়। আলমোড়া যাবার একটাই রাস্তা, চা খাবার সময়ে দোকানিকে সমীরদের গাড়ির কথা জিজ্ঞেস করে। দোকানি জানায়, যে একটা সাদা সুমো কয়েক ঘন্টা আগে ওর দোকানে থেমেছিল। গাড়ির ভদ্রমহিলা বেশ হাসি খুশি ছিলেন, গাড়ির ভদ্রলোকের সাথে বেশ গল্প করছিলেন। দোকানি জানায় যে রাতে ওর দোকানের পেছনের হোটেলে রাত কাটিয়েছে। বুধাদিত্য গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল আবার। চোখে ঘুমে নেই, কিন্তু সারা রাত গাড়ি চালিয়ে একটু ক্লান্তি ভর করে আসে শরীরে। কালীনাথ নিপুণ হাতে পাহাড়ি রাস্তার মধ্যে গাড়ি চালাতে শুরু করে। পাহাড়ি রাস্তায় একটু ধিরে ধিরে গাড়ি চালাতে হয়। গাড়ি ধিরে ধিরে এঁকে বেঁকে, পাহাড়ের চড়াই উঠতে সুর করে। বেশ কিছু দূর যাবার পরে একটা গাড়ি ওদের পেছন থেকে হর্ন দেয়। কালীনাথ পেছনের গাড়িটাকে আগে যাবার জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়। পেছনের গাড়ি পাশ দিয়ে যাবার সময়ে গাড়ির ভেতরে আচমকা চোখ যায় বুধাদিত্যের। ভেতরে নন্দিতা আর একজন লোক বসে। মাথার মধ্যে সমীরের পরিকল্পনার ছবি আঁকতে শুরু করে দেয়। চোখের সামনে কুয়াশা কেটে দুরাভিসন্ধির কুটিল জল্পনা কিছুটা পরিষ্কার দেখা দেয়, সেই ছবি দেখে বুক কেঁপে ওঠে বুধাদিত্যের। বুধাদিত্য কালীনাথকে সামনের নন্দিতাদের গাড়ির পিছু নিতে বলে। কালীনাথ জিজ্ঞেস করাতে বুধাদিত্য জানায় যে সামনের গাড়িতে সমীরের গার্লফ্রেন্ড নন্দিতা বসে। কালীনাথের বয়স হয়েছে, অনেক কিছু দেখেছে। বুধাদিত্যের ওই কথা শুনে সব বুঝে যায়। 

দুপুরের কিছু আগে আলমোড়া পৌঁছে যায়। বুধাদিত্য লক্ষ্য করে যে একটা খাবারের হোটেলের সামনে নন্দিতাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে। বুধাদিত্য গাড়ি থেকে নামে না, নন্দিতা ওকে পুনেতে দেখেছিল, আবার দেখতে পেয়ে চিনতে পেরে যাবে, সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। এখানে যদি দেখে তাহলে ওদের গাড়ির পিছু করতে পারবে না। কালীনাথ সেই গাড়ির ড্রাইভারের সাথে বন্ধুত্ত পাতিয়ে খবর নেয় যে নন্দিতাদের গাড়ি মুন্সিয়ারি যাবে। বুধাদিত্য চুপ করে বসে কিছুক্ষণ ভাবতে চেষ্টা করে পরবর্তী পদক্ষেপ। বেশ কয়েকটা সিগারেট জ্বলে যায়। মনে মনে ঠিক করে যে সমীরকে এখুনি যদি ধরে, তাহলে সমীর সব কিছু এড়িয়ে যাবে। এতক্ষণে ভালোবাসার প্রবল নাটক রচে, ঝিলামের নরম হৃদয় গলিয়ে নিজের করে নিয়েছে। সেই পর্দা এক ঝটকায় সরান একটু কঠিন হবে, তবে দেখা যাক কত নীচ পর্যন্ত নামতে পারে সমীর। কালীনাথ দুই কাপ চা নিয়ে আসে। চা খেতে খেতে বুধাধিত্যকে বলে, “সাহেব, একটু দূর থেকে গাড়ি ফলো করব। যখন কান পেয়ে গেছি, তাহলে মাথা পেতে দেরি হবে না। কানের পেছনে যাই।” কালীনাথ আরও জানাল যে কথাবার্তা শুনে মনে হল নন্দিতার সাথের লোক সমীরকেও চেনে। চা খেয়ে আবার যাত্রা শুরু, মুন্সিয়ারি পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। পাহাড়ি রাস্তায় বিশেষ চৌমাথা আসেনা, তাই কালীনাথ আবার ঘোড়ার গতিতে গাড়ি চালিয়ে দেয়। নন্দিতাদের গাড়ি টপকে বুধাদিত্যের গাড়ি আগেই মুন্সিয়ারি পৌঁছে যায়। 
Reply
#35
ত্রয়োদশ পর্বঃ পুনরুজ্জীবিত। (#2)




সন্ধ্যেবেলায় মুন্সিয়ারি পৌঁছায় বুধাধিত্য। সামনে তুষারে ঢাকা পাঁচমাথা পঞ্চচুলি দাঁড়িয়ে, তাঁর নিচে, পাহাড়ের কোলে খুব ছোটো শহর মুন্সিয়ারি। গরমের ছুটির জন্য সেই জায়গায় লোকের সমাগম, কিলবিল করছে পর্যটক, রাস্তায় গাড়ির ভিড়, হোটেলে মানুষের ভিড়। বুধাদিত্যের চোখ সমীরকে খুঁজে বেড়ায় আর কালীনাথের চোখ সেই সাদা সুমো খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু চারপাশে সাদা রঙের ভাড়ার গাড়ির সমাগম। হতাস হয়ে যায় দুজনেই, এর মধ্যে কোন গাড়িটা সমীরদের বুঝে উঠতে পারেনা। কয়েকটা হোটেলে গিয়ে ফটো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু বেশির ভাগ হোটেলের লোক যাত্রীদের নাম বলতে পরিচয় জানাতে নারাজ। কিছুপরে নন্দিতাদের গাড়ি দেখে আসস্থ হয় বুধাদিত্য, সমীর মুন্সিয়ারিতে আছে, অন্য কোথাও যায়নি। নন্দিতাদের গাড়ি মুন্সিয়ারি ছাড়িয়ে একটু নিচের দিকে চলে যায়। কালীনাথ খবর নিয়ে আসে, যে নিচের দিকে কিছু ছোটো হোটেল আছে, সেখানে হয়ত সমীর ঝিলামকে নিয়ে উঠেছে। 

ঘন কালো রাত নেমে আসে পাহাড়ের কোলে, সেই রাতের মধ্যে আর ভিড়ের মধ্যে মিশে যায় বুধাদিত্য। কালীনাথ একাএকা নন্দিতাদের গাড়ির পেছনে যায়। বুধাদিত্য ইতিমধ্যে মুন্সিয়ারি শহর তদারকি করে আসে, দেখে আসে যে পুলিস আছে কিনা। বাজারের একদিকে একটা পুলিস পিকেট দেখে আসস্থ হয় বুধাদিত্য। কিছু হলে অন্তত পুলিস খবর পায়। কিন্তু কাছের শহর বলতে বাগেশ্বর বা আলমোড়া সেখান থেকে অনেক দুরে। সাহায্য আসতে অনেক দেরি হবে। কিছু পরে কালীনাথ এসে জানায় যে, নন্দিতাদের গাড়ি নিচের একটা হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে। সেই হোটেলের আশেপাশের হোটেলের সামনে আরও বেশ কয়েকটা সাদা সুমো দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে সমীরের গাড়ি চেনা অসম্ভব।

কালীনাথ উদ্বেগের সাথে বুধাদিত্যকে বলে, “সাহেব, সমীর যদি মেমসাব কে রাতে মেরে ফেলে তাহলে?” বুধাদিত্য চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ, সমীর এত কাঁচা কাজ করবেনা। সমীরকে ছোটো বেলা থেকে চেনে বুধাদিত্য, খুব নিখুঁত ভাবে নিজের কার্যসিদ্ধি করবে সমীর। সেই জন্য ঝিলামকে এত দুরে, এক পর্যটক ভর্তি জায়গায় বেড়াতে নিয়ে এসেছে। ভাবতে বসে যে সমীর ঝিলামকে কি ভাবে আক্রমন করতে পারে। মাথার সব শিরা উপশিরা জেগে ওঠে একসাথে, চঞ্চল হয়ে ওঠে গায়ের রক্ত। মুন্সিয়ারিতে মোবাইল ফোন চলছে না যে কাউকে খবর দেবে। সমীর বেশ নিখুঁত ফন্দি এঁটে ঝিলামকে বশ করেছে। 

সারারাত কালীনাথ আর বুধাদিত্য পালা করে গাড়ির মধ্যে জেগে বসে থাকে। সকাল হলে কালীনাথ বুধাদিত্যের জন্য চা জল খাবার নিয়ে আসে। কোন রকমে হাত মুখ ধুয়ে চা জল খাবার খেয়ে গাড়ি অন্য জায়গায় নিয়ে যায় কালীনাথ। বুধাদিত্য পর্যটকদের সাথে মিশে যায়। কিছু পরে হোটেলের ভেতর থেকে নন্দিতা আর সাথের লোকটা ঘুরতে বের হয়। বুধাদিত্য আড় চোখে কালীনাথকে ওদের পিছু নিতে ইঙ্গিত করে। বুধাদিত্যের চোখ শুধু ঝিলাম আর সমীরকে খুঁজে বেড়ায়। প্রচন্ড বিদ্বেষে গায়ের রক্ত তরল লাভায় পরিনত হয়ে গেছে, এক বার হাতের নাগালে পেলে পিস্তলের গুলি মাথার মধ্যে পুরে দেবে। 

কিছু পরে কালীনাথ বুধাদিত্যের কাঁধে হাত রাখে, কানেকানে জানায় যে নন্দিতা ফিরে এসেছে হোটেলে। কিন্তু ঝিলাম আর সমীরের দেখা পায়নি কালীনাথ। কিছু পরে হোটেল থেকে নন্দিতা আর সাথের লোক বেড়িয়ে এসে মুন্সিয়ারির দিকে না হেঁটে অন্যদিকে পা বাড়ায়। সন্দেহ হয় বুধাদিত্যের, কালীনাথের সাথে ওরা নন্দিতার পিছু নেয়। বুকের মাঝে ধুকপুক বেড়ে ওঠে, মাথার রগ ফুলে ওঠে, কিছু একটা ভয়ঙ্কর ঘটতে চলেছে এই সুন্দর নির্মল পরিবেশে। বুধাদিত্য বাম পাশের পাহাড়ে উঠে যায়। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, উঁচু উঁচু গাছের পেছন দিয়ে এগিয়ে নন্দিতাকে অনুসরণ করে। একবার যখন কান পেয়েছে, মাথা পেতে দেরি হবে না। নিচের রাস্তায় অনেক লোকজন, সবাই ঘুরতে বেড়িয়েছে। 

হাঁটতে হাঁটতে ওরা একটা ঝরনা পেরিয়ে যায়। পিচের রাস্তা শেষ, মাটির একটা রাস্তা একদিকে নিচে নেমে গেছে, অন্যদিকে একটি সরু রাস্তা পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে। সেই সরু পাথুরে রাস্তায় পর্যটকের ভিড় অনেক কম, কিছু সংখ্যক পর্যটক কোন একদিকে ট্রেকিঙ্গের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। ঘন জঙ্গলের ভেতর থেকে বেশ কিছু দুরে এগিয়ে যায় বুধাদিত্য আর কালীনাথ। চারপাশে সবুজ ঝোপঝাড়, আর বড় বড় গাছ। মাথার ওপরে নীল আকাশ, আকাশে বাতাসে একটু ঠাণ্ডার আমেজ, আবহাওয়া বেশ মনোরম। ভেবে পায়না বুধাদিত্য, এই রকম মনোরম পরিবেশে একটা নৃশংস কোন ঘটনা ঘটবে। অনেকের হাতে ক্যামেরা, অনেকেই ছবি তুলছে, দুরে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চচুলির। হটাত বুধাদিত্যের চোখ পরে কিছু দুরে হেঁটে যাওয়া সমীর আর ঝিলামের দিকে। ঝিলামের মুখ বেশ হাসিখুশি। চেহারা দেখে বোঝা যায় যে সমীর ফিরে আসাতে আর ওকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কারনে ওর মনের আনন্দ বহুগুন বেড়ে গেছে। সমীর ঝিলামের সাথে গল্প করতে করতে ধিরে ধিরে ওকে খাদের ধারে নিয়ে যায়। সরু রাস্তার ওইপাসে গভীর খাদ, নিচে বয়ে চলেছে একটা সরু পাহাড়ি নদী। 

বুক কেঁপে ওঠে বুধাদিত্যের, আকাশ কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে ঝিলামের নাম ধরে, “ঝিল্লিরানী দাঁড়িয়ে যাও।” 

সেই আওয়াজ ওদের কানে পৌঁছায়না। সমীর ঝিলামকে জড়িয়ে ধরে ওর কানেকানে কিছু বলে। ঝিলাম অবিশ্বাস্য বেদনা ভরা পাংশু চোখে সমীরের দিকে তাকায়। সমীর আলতো করে কুনুই দিয়ে ঝিলামকে ঠেলে দেয়। 

ঝিলাম চিৎকার করে ওঠে, “শেষ পর্যন্ত তুমি... নাআআআআআ...” কথা শেষ করতে পারেনা, পা পিছলে খাদের মধ্যে পরে যায় ঝিলাম। 

সমীর কপট চিৎকার করে সাহায্যের জন্য নিচের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। বুধাদিত্য মাটি থেকে একটা বড় পাথর নিয়ে সমীরের পা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারে। হটাত পায়ের ওপরে পাথরের মার খেয়ে সমীর টাল সামলাতে পারেনা। ঝিলামের সাথেসাথে সমীর খাদের ভেতরে গড়িয়ে পরে যায়। চেঁচামেচি শুনে সবাই ছুটে আসে। বুধাদিত্য আর কালীনাথ পাহাড় বেয়ে নিচে দিকে নেমে আসে। বুধদিত্য রোষকষিত চোখে একবার নন্দিতার দিকে তাকায়, সেই ভীষণ চোখের চাহনি দেখে নন্দিতার শরীরের রক্ত জল হয়ে যায়। 

বুধাদিত্য কিছু না ভেবেই খাদের মধ্যে ঝাঁপ দেয়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে যায় নিচের দিকে। কিছু দুরে নিচে একটা পাথরে আটকা পরে থাকে ঝিলামের দেহ। মাথা ফেটে গেছে, চেহারা রক্তাক্ত, ঘাড় একদিকে কাত, ঝিলামের ক্ষত বিক্ষত দেহ কাঁপতে থাকে। আরও কিছু নিচের দিকে একটা ছোটো ঝোপের ডাল ধরে ঝুলে রয়েছে সমীর। রাগে ঘৃণায় দুচোখ থেকে রক্ত বেড়িয়ে আসার যোগাড় বুধাদিত্যের। ভগবানের কাছে কাতর আবেদন জানায়, ঝিলামকে কেড়ে নিও না। ঝিলামকে পাথরের উপর থেকে তুলে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে। বুকের ওপরে পিষে মিলিয়ে নেয় ওর রক্তাত শরীর, বুকের কাছে কান পেতে শোনে ওর হৃদয়ের ধুকপুক। ঝিলাম বহু কষ্টে দুচোখ মেলে বুধাদিত্যের দিকে তাকায়। ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। রক্তাক্ত হাত উঠিয়ে বুধাদিত্যের জামা খামচে ধরে, ঝিলাম ওর বুকের ওপরে মুখ গুঁজে অজ্ঞান হয়ে যায়। গায়ের জামা খুলে ঝিলামের মাথায় বেঁধে দেয়, রক্তক্ষরণ কিছুটা কমে যায়। বুকের কাছে জড়িয়ে ওর মুখের ওপরে ঝুঁকে কপালে ঠোঁট চেপে ধরে ক্ষমা চায়। 

বুধাদিত্য সমীরের দিকে তাকায়। খাদের মধ্যে গড়িয়ে পড়ার সময়ে সমীরের মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত বের হয়, হাত পা কেটে রক্ত বের হয়। রক্তাক্ত সমীর বুধাদিত্যের দিকে মিনতি ভরা চাহনি নিয়ে তাকিয়ে সাহায্যের ভিক্ষা চায়। 

বুধাদিত্যের মাথা গরম হয়ে যায়, চাপা গর্জন করে ওঠে সমীরের দিকে, “তুই ফুলের মতন নিস্পাপ মেয়েটাকে মেরে ফেলার উপক্রম করবি সেটা ভাবতে পারিনি। তুই পাপী, এই জগতে তোর বেঁচে থেকে লাভ নেই। আজ তুই নন্দিতার জন্য ঝিলামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিস, কাল তুই অন্য কোন মেয়ের জন্য নন্দিতার সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পিছপা হবি না। বেঁচে থাকার চেয়ে তোর মরাই ভালো।” 

সমীরের আঁকড়ে থাকা ঝোপের গোড়াতে জুতো দিয়ে মারে বুধাধিত্য। ঝোপ উপড়ে যায়, সাথে সাথে সমীর সেই খাদের ভেতরে গড়িয়ে যায়। বুধাদিত্য কপট চেঁচিয়ে ওঠে, সাহায্যের হাত বারিয়েও যেন বাচাতে পারে না। ওপরের সবাই চেঁচিয়ে ওঠে, ততক্ষণে সমীরের প্রাণহীন দেহ নিচের পাহাড়ি নদী গ্রাস করে নেয়। ততক্ষণে কালীনাথ আর কয়েকজন স্থানিয় লোক নেমে আসে দড়ি বেয়ে। সবার অলক্ষ্যে কালীনাথ বুধাদিত্যের পেছন থেকে পিস্তল বের করে লুকিয়ে ফেলে। 

ঝিলামের রক্তাক্ত অজ্ঞান দেহ বুকের কাছে জড়িয়ে উপরে উঠে আসে। চারপাশে লোকের ভিড় জমে যায়। সবার চোখের সামনে একটি দুর্ঘটনা ঘটে যায়। কেউ কেউ বলে যে একটু অসাবধানতার জন্য এই রকম ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে। পুলিস পিকেট থেকে পুলিস এসে যায়। বুধাদিত্যকে জিজ্ঞেস করে, ঘটনার কথা। বুধাদিত্য জানায় যে দম্পতিকে বুধাদিত্য চেনে। এরা দিল্লী থেকে এখানে ঘুরতে আসে। অসাবধানতার বশে দুজনে খাদে পরে যায়, স্বামী প্রান হারিয়েছে এবং স্ত্রী গুরতর আহত। সাব ইন্সপেক্টার আখিলেশ আশেপাশের লোকেদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। সবাই মোটামুটি এক কথাই জানায় যা তারা চোখে দেখেছে। পুলিস সবার কথামত রিপোর্ট লিখে ফেলে। বুধাদিত্যকে জানায় যে লোক নামিয়ে খাদ থেকে সমীরের দেহ উদ্ধার করতে কিছু সময় লাগবে। বুধাদিত্য জানায় যে আগে আহত ঝিলামের কিছু ব্যাবস্থ করতে। শুধু মাত্র বুধাদিত্য আর নন্দিতা জানে এই দুর্ঘটনা কতটা কপট মস্তিষ্কের অভিসন্ধি। নন্দিতা সেই ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে মুখ চাপা দিয়ে কেঁদে ফেলে। সেই কান্না বুধাদিত্যের মন গলাতে পারে না, একবার ভাবে সব সত্যি বলে নন্দিতাকে ধরিয়ে দেয়, কিন্তু একবার ভাবে যে, নন্দিতা বেঁচে গেছে সেটাই বড়। এই পৃথিবীর বুক থেকে একটা ধূর্ত লোকে কমিয়ে দিতে পেরেছে। 

মুন্সিয়ারির ডাক্তার খানায় নিয়ে যাওয়া হয় ঝিলামকে। ডাক্তার ঝিলামকে পরীক্ষা করে জানায় মাথার আঘাত গুরুতর। এত উপর থেকে পড়ার ফলে হয়ত মাথার ভেতরে আঘাত লাগতে পারে, সিটি স্ক্যান করতে হবে আর সেইজন্য এখুনি ঝিলামকে নিয়ে আলমোড়া যেতে হবে। রক্তক্ষরণ থামানর জন্য মাথায় স্টিচ করে দেন আর হাত পায়ের কাটায় ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেন। 

সাব ইন্সপেক্টর অখিলেশ কে সাথে নিয়ে বুধাদিত্য রওনা দেয় আলমোড়ার দিকে। বুধাদিত্যের কোলে অজ্ঞান ঝিলাম। দু’হাতে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে গাড়ির পেছনের সিটে বসে থাকে। বারেবারে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আর বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। গোলাপি গাল ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, চোখের কোনে কালো হয়ে গেছে। ঠোঁট কেটে গেছে, লাল ঠোঁট জোড়া ফ্যাকাসে গোলাপি। নরম ঠোঁটের ওপরে ঠোঁট নামিয়ে ছোটো একটা চুমু খায় বুধাদিত্য। কেন সমীরের কথায় বিশ্বাস করে বুকের পাঁজর কেটে পাঠিয়ে দিয়েছিল ঝিলামকে? কালীনাথ উন্মাদ হয়ে গেছে, মেমসাহেবের প্রান যেন ওর স্টিয়ারিরঙ্গের ওপরে নির্ভর। মুন্সিয়ারি থেকে আলমোড়া অনেকটা পথ। সামনে পুলিসের জিপ, পেছনে বুধাদিত্যের ইনোভা পাহাড়ের গা বেয়ে ধেয়ে চলে। 
Reply
#36
ত্রয়োদশ পর্বঃ পুনরুজ্জীবিত। (#3)




সন্ধ্যের সময়ে আলমোড়া পৌঁছে যায়। সাব ইন্সপেক্টার অখিলেশ ওদের নিয়ে সোজা সদর হস্পিটালে চলে যায়। এমারজেন্সিতে ভর্তি করা হয় ঝিলামকে। হস্পিটালে শুধু মাত্র রেসিডেন্ট ডাক্তার ছাড়া আর কোন বড় ডাক্তার নেই সেই সময়ে। রেসিডেন্ট ডাক্তার প্রাথমিক পরীক্ষা করে বলে যে বড় ডাক্তার সকালে এসে দেখবে। বুধাদিত্যের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, গর্জন করে ওঠে, রাতে যদি এই আহত ঝিলামের কিছু হয়ে যায় তাহলে? মন মানতে চায়না কিছুতেই। আখিলেশ ওকে শান্ত করে কোনোরকমে। বুধাদিত্যের খেয়াল হয় যে দেবস্মিতা একবার জানিয়েছিল যে ধানবাদের এম.পি ওর চেনাজানা, সেই সুত্রে যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায়। হটাত বুধাদিত্যের ফোন পেয়ে দেবস্মিতা অবাক। সংক্ষেপে জানায় দুর্ঘটনার ব্যাপার, সেই সাথে জানায় যে ঝিলাম গুরুতর আহত, কিছু সাহায্য চাই। সব শুনে দেবস্মিতা কিছুক্ষণ চুপ থাকে তারপরে জানায় যে কিছু একটা উপায় বের করবে। কয়েক ঘন্টার মধ্যে আলমোড়ার এক রাজনৈতিক দলের নেতা, বেশ কয়েক জন ডাক্তার নিয়ে পৌঁছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ঝিলামকে আই.সি.ইউ তে ভর্তি করে চিকিতসা শুরু হয়। 

দেবস্মিতাকে ফোন করে বুধাদিত্য, “দেবী আমি কি বলে তোমাকে ধন্যবাদ জানাব ভেবে পাচ্ছি না।”

দেবস্মিতা, “এখন ঝিলাম কেমন আছে?”

বুধাদিত্য, “জানি না দেবী।”

দেবস্মিতা, “আমি আলমোড়া আসছি।” তখন রাত প্রায় একটা বাজে। 

বুধাদিত্য বলে, “না না, তোমাকে আসতে হবে না, আমি সামলে নেব। তোমার অনেক কাজ, অত কাজ ফেলে আসতে হবে না।”

দেবস্মিতা, “এমন কোন কাজ নেই যেটা তোমাদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তুমি ওখানে একা, নিশ্চয় পুলিস এসেছে, এরপরে ঝিলামের বাবা মা, সমীরের বাবা মা আসবে। সবাইকে সামলাবে কি করে?”

বুধাদিত্য বুক ভরে এক শ্বাস নিয়ে বলে, “দেবী, ঝিলামের জন্য আমি সবকিছু করতে রাজি।”

সি.টি স্কানে কিছু ধরা পরে না, ডাক্তার জানায় যে চোট যদিও একটু গভীর তবে ভয়ের কারন নেই। শুধু জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আই.সি.ইউ সামনে চুপ করে বসে থাকে বুধাদিত্য, মাথায় ভর করে আসে হাজার চিন্তা, ঝিলামের জ্ঞান ফিরে এলে কি করবে? বড় আঘাত পেয়েছে ঝিলাম, ধাক্কা মারার আগে সমীর মুখের মুখোশ খুলে ফেলে দিয়েছিল। চোয়াল শক্ত করে বসে থাকে বুধাদিত্য, এমন সময়ে সাব ইন্সপেক্টার অখিলেশ ওর পাশে এসে বসে।

অখিলেশ ওকে জিজ্ঞেস করে, “মিস্টার বুধাদিত্য, কিছু কথা ছিল আপনার সাথে।”

বুধাদিত্য অখিলেশের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে, “জিজ্ঞেস করুন, সাধ্য মত উত্তর দেব।”

অখিলেশ, “আপনার এত জানাশোনা ছিল আগে বলেন নি ত?”

ম্লান হাসে বুধাদিত্য, “আমার দেবী, ধানবাদের খুব বড় ব্যাবসায়ি সেই সুত্রে একটু উপর মহলে জানাশোনা আছে।”

মৃদু হাসে অখিলেশ, “আগে বললে একটু ভালো হত। তাহলে ওখানেই গাড়ির ব্যাবস্থা করে দিতাম।”

বুধাদিত্য, “না তার দরকার ছিল না, আমার চোখের আড়াল করতে চাই না ওকে।” 

অখিলেশ ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আরও কিছু প্রশ্ন আছে আমার।”

বুধাদিত্য, “কি?”

অখিলেশ, “ম্যাডামের জ্ঞান ফিরলে তার একটা স্টেটমেন্ট নিতে হবে। তবে আমার মনে হয়, যে এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়।”

বুধাদিত্য অখিলেশের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে, “কি বলতে চাইছেন আপনি? সবার চোখের সামনে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, আপনি কি দেখে বলছেন যে এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়?”

অখিলেশ, “বন্ধুর বউ, কিন্তু আপনি যে ভাবে ম্যাডামকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে ছিলেন তাতে অঙ্ক মেলাতে একটু কষ্ট হয়। আর একটা ব্যাপার আমার চোখ এড়িয়ে যেতে পারেনি, ওই ভিড়ের মধ্যে লক্ষ্য করেছি একজন মহিলাকে কাঁদতে। এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়, মিস্টার বুধাদিত্য, কি সত্যি বলছি?”

বুধাদিত্য চোয়াল শক্ত করে গম্ভির গলায় উত্তর দেয়, “না সেই রকম কিছু নেই। আমি ওদের চিনি সমীর আমার ছোটোবেলার বন্ধু আর ঝিলাম আমার বন্ধু পত্নি ব্যাস। আর আপনি কাকে দেখেছেন সে কি করছিল সেটা লক্ষ্য করার মতন মানসিক অবস্থা আমার ছিল না।”

অখিলেশ ওর কাঁধে হাত রেখে বলে, “আমি পুলিস হয়ে নয়, একজন বন্ধু হিসাবে যদি জিজ্ঞেস করি তাহলে কি সঠিক উত্তর পাবো?”

অখিলেশকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনা বুধাদিত্য, “এটা নিছক একটি দুর্ঘটনা, সবাই সেই স্টেটমেন্ট দিয়েছে, ইন্সপেক্টার।”

অখিলেশ আসস্থ করে বলে, “আপনি যা বলছেন আর সবাই যা দেখেছে, সেটা পুলিস রিপোর্ট। এক অখিলেশ যদি এক বুধাদিত্যকে প্রশ্ন করে তাহলে কি উত্তর পাবে? কেননা, সমীরের মৃতদেহের ময়না তদন্ত হবে। সমীরের বাবা মা আসবেন তাঁরা নতুন করে এই কেসের ফাইল খুলে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন, তখন কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেড়িয়ে যেতে পারে।” 

বুধাদিত্য বুক ভরে এক শ্বাস নিয়ে অখিলেশের দিকে তাকায়, অখিলেশ চোখ টিপে ইঙ্গিত করে সব ঠিক হয়ে যাবে। বুধাদিত্য কালীনাথকে ডেকে গাড়ির পেছন দিক থেকে সেই হলুদ বড় খাম নিয়ে আসতে বলে। সেই হলুদ খাম অখিলেশের হাতে তুলে দিয়ে বলে, “এই খামে দুটি প্লেনের টিকিট আছে। একটা সমীরের অন্যটি সেই মহিলার যিনি কাদছিলেন, তাঁর নাম নন্দিতা।” অখিলেশ খাম খুলে টিকিট বের করে দেখে যে বুধাদিত্য সত্যি কথা বলছে। খামের মধ্যে কিছু ডলার আর সমীরের পাসপোর্ট পায়। সেই সব দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে এসবের মানে। বুধাদিত্য বলে, “সমীর আমার ছোটোবেলার বন্ধু। ঝিলামের সাথে প্রায় তিন বছর আগে সমীরের বিয়ে হয়। সমীর কোলকাতায় থাকত, গত বছরের মাঝামাঝি দিল্লীতে কাজের সুত্রে আসে। দিল্লীর অফিস আবহাওয়া সমীরকে অনেক স্বপ্ন দেখায়, আর সমীর সেই অলিক স্বপ্নে হারিয়ে যায়। মদে ডুবে নারীসঙ্গে ডুবে নিজের বউকে উপেক্ষা করে। একদিন সমীর মদ খেয়ে একটা পার্টিতে এক নারীর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়, সেই দৃশ্য ঝিলাম দেখে ফেলে। তা সত্তেও ঝিলাম সমীরকে ক্ষমা করে দেয়, শুধু এই ভেবে যে মদের ঝোঁকে হয়ত করে ফেলেছে। কয়েকদিন পরে ঝিলাম আর সমীরের প্রচন্ড ঝগড়া হয়। সমীর ঝিলামকে আত্মহত্যা করতে প্ররচিত করে, আমি যদি ঠিক সময়ে না পৌঁছাতাম তাহলে হয়ত ঝিলাম সেদিন আত্মহত্যা করত। ঝিলাম তারপরে চাকরি করতে চায়, আর সেদিন থেকে ঝিলাম আর সমীরের সম্পর্কে চিড় ধরে। সমীর বউ ছেড়ে এই মহিলা, যার নাম নন্দিতা, তার সাথে প্রথমে শারীরিক পরে প্রেমের সম্পর্কে মেতে ওঠে। এই দুজনে মিলে ঝিলামকে নিজেদের মাঝখান থেকে সরিয়ে দিতে তৎপর হয়ে ওঠে। সমীর ঝিলামের সাথে ভালোবাসার নাটক করে এখানে নিয়ে আসে। ঝিলাম আমাকে জানায় যে ওকে নিয়ে সমীর কোথাও বেড়াতে যাবে। আমি ওদের পেছন পেছন এখানে আসি। হ্যাঁ, আমি ঝিলামকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি তাই ওর পেছন পেছন এখানে এসেছিলাম। ওদের চোখে চোখে রাখলাম, কি করে সেটা দেখার জন্য। মিলাম গ্লেসিয়ার যাবার পথে, সবার চোখের সামনে ঝিলামকে খাদে এমন ভাবে ধাক্কা মারে যাতে মনে হয় যে ঝিলাম পা ফসকে খাদে পরে মারা গেছে। একদম নিখুঁত অভিসন্ধি, সাপ মরবে কিন্তু লাঠি ভাঙ্গবে না। পথের কাঁটা, ঝিলাম সরে যাবে সমীর আর নন্দিতার মাঝখান থেকে। আমি উপরের পাহাড় থেকে ওদের লক্ষ্য করি আর সমীরের পা লক্ষ্য করে একটা পাথর ছুঁড়ে মারি। সমীর সেই পাথরের চোটে খাদে পরে যায়। আমি ঠিক সময়ে ঝাঁপিয়ে পরি সেই খাদে। ভাগ্যক্রমে ঝিলাম একটা পাথরে আটকে ছিল তাই বেঁচে যায়। সমীর আমার পায়ের কাছে একটা ঝোপ ধরে আটকে ছিল। ওকে দেখে আমার শরীর ঘৃণায় রিরি করে ওঠে। সেই ঝোপে এক লাথি মারলাম আমি, ঝোপ মাটি থেকে উপড়ে গেল আর সমীরকে নিয়ে তলিয়ে গেল খাদের ভেতরে। বাকি আপনার সামনে।”

অখিলেশ ওর হাতে হলুদ খাম ফিরিয়ে দিয়ে বলে, “ম্যাডামের জ্ঞান ফিরলে একবার ম্যাডামের সই নিতে হবে স্টেটমেন্টে।”

বুধাদিত্যের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, “আমি আপনাকে সব সত্যি বললাম আর আপনি শেষ পর্যন্ত...”

অখিলেশ ওর কাঁধে হাত রেখে হেসে বলেন, “আপনি কিছু বলছিলেন নাকি? কই শুনিনি’ত। ম্যাডাম অসাবধানতায় পা ফসকে খাদে পরে গেছিলেন। সমীর ওকে বাচাতে গিয়ে খাদে পরে মারা গেছে আর আপনি ম্যাডামকে বাচিয়েছেন।” অখিলেশ টুপি হাতে বুধাদিত্যের কাঁধে হাত রেখে বলেন, “ম্যাডামের সই নিতে হবে, ব্যাস। আমি স্টেটমেন্টটা তৈরি করে আসি, আপনি বসুন।” বুধাদিত্য ওর সামনে হাত জোর করে দাঁড়ায়। অখিলেশ ওর হাত ধরে বলে, “মশাই, আপনি এই জগতে থেকে একটা পাপীর অবসান করিয়েছেন। আপনাকে তাঁর জন্য ধন্যবাদ জানাই।”

চুপচাপ আই.সি.ইউ সামনে বসে থাকে বুধাদিত্য, ঘড়ির কাঁটা যেন আর সরেনা। ডাক্তার এসে বলে যায় যে চিন্তার বিশেষ কারন নেই। ভাইটালস সব সাধারন আছে, ভয়ের কোন কারন নেই। বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে যে জ্ঞান ফিরবে কখন, উত্তরে ডাক্তার জানায় যে রাতের মধ্যে জ্ঞান ফেরার আশা আছে। বুধাদিত্যের চোখে ঘুম আসেনা। অখিলেশ একবার এসে দেখা করে যায়, বলে রাতে ও সদর পুলিস স্টেসানে থাকবে, কিছু অসুবিধে হলে ফোন করতে। বুধাদিত্য বারান্দায় পায়চারি করে, কখন ঝিলাম একটু চোখ মেলে তাকাবে, সেই অধীর অপেক্ষায় প্রহর গোনে। 

রাত প্রায় দুটো নাগাদ নার্স এসে জানায় যে ঝিলামের জ্ঞান ফিরেছে। বুধাদিত্য আস্তে করে আই.সি.ইউ তে ঢুকে পরে। ঝিলামের মাথায় ব্যান্ডেজ, মুখের কাটার দাগ, ঠোঁটে একটু ফেটে গেছে, হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ। একদিনে সেই উচ্ছল তরঙ্গিণী তার রুপ হারিয়ে এক স্রোতহীন চোরাবালির নদীতে পরিনত হয়ে গেছে। একটা টুল টেনে ওর পাশে বসে। ঝাপসা চোখের সামনে বুধাদিত্যকে দেখে ঠোঁট কেঁপে ওঠে ঝিলামের। বুধাদিত্য ওর কোমল হাত দুটি নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে গালে চেপে ধরে। ঝিলাম জল ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। বুধাদিত্যের হাতখানি টেনে বুকের ওপরে চেপে ধরে ঝিলাম কেঁদে ফেলে। ঝিলাম পাশ ফিরে ওর হাত বুকের ওপরে চেপে চোখ বন্ধ করে দেয়। বুধাদিত্য হাতের তালুর উপরে ঝিলামের হৃদস্পন্দন অনুভব করে, ধুকধুক-ধুকধুক। ঝিলাম ওর হাত আরও আঁকড়ে ধরে থাকে, হাতের উষ্ণতা সারা বুকের ওপরে সারা শরীরে মাখিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়। 

ঝিলাম ঘুমিয়ে পড়ার পরে বুধাদিত্য ধিরে ধিরে হাত ছাড়িয়ে আই.সি.ইউ থেকে বেড়িয়ে আসে। ডাক্তার জানায় যে ঝিলামের আর কোন বিপদ নেই। ঝিলাম একটু সুস্থ হলেই ওরা দিল্লী ফিরে যেতে পারে। শরীর বড় ক্লান্ত, হস্পিটাল থেকে বেড়িয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায় বুধাদিত্য। কালীনাথ গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। বুধাদিত্যের পায়ের আওয়াজ পেয়ে জেগে ওঠে। বুধাদিত্য জানায় যে ঝিলাম এখন ভালো আছে। কালীনাথ ভগবানের উদ্দেশ্যে একটা প্রনাম করে বলে, রাখে হরি মারে কে। গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বুধাদিত্য একটা সিগারেট জ্বালায়। মাথার ওপরে গাড় নীল রাতের আকাশ, সেই গাড় নীল আকাশের বুকে কোটি কোটি তারা চকমক করছে। এক নতুন দিগন্তের আলো দেখায় সেই তারামণ্ডল। 

সকালবেলা বুধাদিত্য কোলকাতায় প্রমীলাদেবীকে ফোন করে সব সংক্ষেপে ঘটনা জানায়। প্রমীলাদেবী জানিয়ে দেন যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি দিল্লী পৌঁছে যাবেন। দেবস্মিতা সকাল বেলা বুধাদিত্যকে ফোন করে ঝিলামের খবর জানতে চায়। অখিলেশ সকালবেলা হস্পিটাল চলে আসে। ঝিলাম ঘুম থেকে ওঠার আগেই বুধাদিত্য ওর পাশে চলে যায়। অখিলেশ এসে ঝিলামকে কিছুই জিজ্ঞেস করে না, আগে থেকে লেখা একটা স্টেটমেন্টে সই দিতে বলে। 

অখিলেশ বুধাদিত্যকে হেসে বলে, “এবারে এই হাত আর ছাড়বেন না যেন।” বুধাদিত্য হেসে ফেলে ওর কথা শুনে। অখিলেশ বলে, “রেডিওতে মুন্সিয়ারি পোস্টের সাথে কথা হয়ে গেছে। ওখান থেকে আপনাদের জিনিস নিয়ে বেড়িয়ে গেছে, দুপুরের পরেই আপনার কাছে পৌঁছে যাবে বলে মনে হয়। আজ চেষ্টা করে দেখা হবে যদি বডি পাওয়া যায়।” কানের কাছে মুখ এনে খুব নিচু গলায় বলে, “সমীরের বডি পাওয়া যাবে না, কথা দিচ্ছি আপনাকে। ওর বাবা মা এলে আমি সামলে নেব। আপনি বিচক্ষণ ব্যাক্তি তারপরের ব্যাপার কিন্তু আপনাকে সামলাতে হবে।”

সকালবেলা আই.সি.ইউ থেকে ঝিলামকে রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সারাক্ষণ বুধাদিত্য ওর পাশে থাকে, এক মনিটের জন্য চোখের আড়াল করে না ঝিলামকে। সমীরের বিশ্বাস ঘাতকতার আঘাত ঝিলামের বুকের ভেতরে এত জোর বেজে ওঠে যে কথা বলার মতন শক্তি হারিয়ে ফেলে। যেই চোখ মেলে সেই যেন মনে হয় যে ওকে সমীর ধাক্কা মারছে। কেঁপে কেঁপে ওঠে বারংবার আর বুধাদিত্যের হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। 

ঝিলামে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “এত বড় বিশ্বাস ঘাতকতা করল আমার সাথে?”

বুধাদিত্য ওর মাথার ওপরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, “একটু ঘুমাও।”

ঝিলাম, “আমার যে আর ঘুম আসছে না। চোখ বন্ধ করলেই যে আমাকে ধাক্কা মারে?” 

বুধাদিত্য, “ঝিল্লি, আমি এখানেই আছি।”

ঝিলাম কাঁপা গলায় বলে, “ও যখন আমাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল, তখন তুমি কোথায় ছিলে, বুধো?”

বুধাদিত্য, “আমি তোমার পাশেই ছিলাম, ঝিল্লিরানী, এখন ঘুমাও।”

ঝিলাম, “আমি ঘুমিয়ে পড়লে তুমি চলে যাবে না ত? এবারে হাত ছাড়লে আমার মরা মুখ দেখবে।”

বুধাদিত্য হেসে ওর কপালের ওপরে ঠোঁট চেপে বলে, “ছেড়ে যাবো বলে এই হাত ধরিনি আমি।”

ঝিলাম ওর হাত বুকের ওপরে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পরে। ঘুমন্ত মুখের ওপরে শান্তির নির্মল ছায়া, বুধাদিত্য নিস্পলক চোখে তাকিয়ে থাকে সেই সুন্দর মুখখানির দিকে। ওর শূন্য হৃদয় ভরিয়ে তুলতে এক উচ্ছল তরঙ্গিণী ফিরে এসেছে। পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পারিয়ে দেয় সেই নিস্তেজ অপ্সরাকে। একটু ঝুঁকে ওই গোলাপি গালে চুমু খায় বুধাদিত্য। 
Reply
#37
চতুরদশ পর্বঃ মুক্তির স্বাদ। (#1)





ইতিমধ্যে সমীরের বাবা মাকে খবর পাঠানো হয় পুলিসের তরফ থেকে। বুধাদিত্য ফোন করে জানায় সেই ঘটনা, সাথে সাথে জানায় ঝিলামের শারীরিক অসুস্থতা। দুই দিনের মধ্যে সমীরের বাবা, মা আলমোড়া পৌঁছে যান। সমীরের বাবা মা সোজা হসপিটালে এসে বুধাদিত্যের সাথে দেখা করে। বুধাদিত্যকে জড়িয়ে ধরে পুত্র শোকে সমীরের মা কেঁদে ফেলেন। বুধাদিত্য আসল ঘটনা চেপে শুধু মাত্র দুর্ঘটনার কথা জানায় সমীরের বাবাকে। সমীরের বাবার সাথে দেখা করার জন্য মুন্সিয়ারি থেকে অখিলেশ পৌঁছে যায় আলমোড়া। পুলিসের মুখে সবিস্তারে দুর্ঘটনার কথা শুনে খেই হারিয়ে ফেলেন সমীরের বাবা। অখিলেশ জানায় যে, পাহাড়ি নদী সমীরের মৃত দেহ গ্রাস করে নিয়েছে। দুই দিন লোক নামিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজে পাওয়া যায়নি ওর মৃত দেহ। সমীরের মা মর্মাহত হয়ে যান, পুত্রের শেষ দেখা দেখতে পারেন না বলে আফসোস করেন। সমীরের বাবা, ঝিলামকে কোলকাতা নিয়ে যাবার কথা বলেন, সাথে এও জানায় যে ঝিলামের বাবা মাকে খবর দেওয়া হয়েছে। পরের দিন ঝিলামের বাবা আর দুই দাদা আলমোড়া পৌঁছে যান। সবাইকে সামাল দিতে দিতে বুধাদিত্য হিমসিম খেয়ে যায়। একদিকে অসুস্থ ঝিলাম বিছানায় পরে, অন্যদিকে ঝিলামের বাড়ির লোক আর সমীরের বাবা মা। হস্পিটালের বিছানায় শুয়ে চারপাশে নিজের লোকের ভেতরে ঝিলামের চোখ শুধু বুধাদিত্যকে খুঁজে বেড়ায়। সবার সামনে বুধাদিত্য ওর পাশে যেতে একটু দ্বিধা বোধ করে। 

দিন চারেক পরে ঝিলাম সুস্থ হয়ে ওঠে। ঝিলামের বাবা ঝিলামকে দুর্গাপুরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। বাবার কথা শুনে ঝিলাম ভাষা হারিয়ে ফেলে, পুরানো জীবনে ফিরে যেতে নারাজ ঝিলাম। চোখ মেলে তাকালেই আশেপাশের লোকজন ওকে সমীরের কথা মনে করিয়ে দেয় আর সেই সাথে সমীরের বিশ্বাস ঘাতকতার কথা মনে পরে যায়। মুখ চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে বারেবারে। ঝিলাম কিছুতেই সেই মনোভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনা, তার ওপরে সবাই মনে করিয়ে দেয় যে ঝিলাম আর সেই ঝিলাম নেই। জল ভরা কাতর চোখে বুধাদিত্যর দিকে তাকিয়ে থাকে। 


ঋজু বুধাদিত্য চোখ বন্ধ করে বুক ভরে এক লম্বা শ্বাস নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভির স্বরে বলে, “ঝিলাম কোথাও যাবে না। ঝিলাম আমার সাথে দিল্লী যাবে।”

সবার চোখে হাজার প্রশ্ন, কেন ঝিলাম বুধাদিত্যের সাথে থাকবে? বুধাদিত্য কিছু বলার আগে, ঝিলাম ধরা গলায় বলে, “সমীর আমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে। আমাকে কত ভুলিয়ে প্রেমের ভান করে এখানে নিয়ে এসেছে। ওর অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে। আমাকে খাদের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। ধাক্কা মারার আগে আমাকে বলে, যে আমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম তাই আমাকে মারতে নিয়ে এসেছে এখানে।” সবাই হাঁ করে ঝিলামের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঝিলামের কথা কেউ বিশ্বাস করতে পারেনা। ঝিলাম বলে, “আমি ওর সাথে ঘুরতে যাব, সেই খুশিতে ছিলাম। এত মিষ্টি করে আমাকে বলল যে আমাকে নিয়ে দুরে বেড়াতে যাচ্ছে তাই আমি যেন কাউকে কিছু না জানাই, আর সেই কথায় আমি ভুলে গেলাম। ও নিজের মোবাইল আর আমার মোবাইল নিয়ে বন্ধ করে দিল।” ঝিলাম বুধাদিত্যের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে, “ভাগ্য বশত ওকে আমি একটা এস.এম.এস পাঠিয়েছিলাম তাই আজ বেঁচে আছি।”

সমীরের মা চাপা আঁতকে ওঠেন, ধিক্কার দিয়ে ঝিলামকে বলেন, “আমার ছেলের নামে তুমি মিথ্যে কলঙ্ক রটাচ্ছ?” 
ঝিলাম বলে, “আমি মিথ্যে বলছি না, শুধু মাত্র আমার কাছে কোন প্রমান নেই আমি নিরুপায়।”

নিরুপায় বুধাদিত্য হলদে খাম থেকে প্লেনের টিকিট আর পাসপোর্ট সমীরের বাবার হাতে তুলে দেয়। মোবাইল থেকে সেই ফটো আর রেকর্ড করা কথোপকথন শুনিয়ে দেয়। সেই সব দেখে, শুনে আর ঝিলামের কথা শুনে ভেঙ্গে পড়েন সমীরের বাবা মা। চোখের সামনে সমীরের ব্যাভিচারের অকাঠ্য প্রমান দেখে ভাষা হারিয়ে ফেলেন। অনেকক্ষণ পরে সমীরের মা, ঝিলামের মাথায় হাত রেখে বলেন, “আমার পেটের সন্তান গেছে বলে দুঃখ আছে সেটা থাকবে। কিন্তু তোমার মতন লক্ষ্মীকে মেরে ফেলার কথা চিন্তা করতে পারে যে, সেই ছেলের আমার দরকার নেই। আমি তোমাকে আশীর্বাদ করি, ভবিষ্যতে তুমি সুখী হবে।” বুধাদিত্যের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুই ওর ছোটবেলার বন্ধু, একসাথে খেলা করেছিস, একসাথে বড় হয়েছিস। একবারের জন্য ওর মতিগতি ফেরাতে পারলি না?” এই বলে বুধাদিত্যের সামনে কেঁদে ফেলে সমীরের মা। বুধাদিত্য সমীরের মাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। সমীরের মা চোখের জল মুছে ওকে বলে, “তুই ভালো থাকিস। আমি চললাম রে। পারলে এই লক্ষ্মীকে দেখিস।” সমীরের বাবা মায়ের সাথে সেই শেষ দেখা। ঝিলামকে শেষ আশীর্বাদ করে, সমীরের বাবা মা চলে যান আলমোড়া ছেড়ে। 

ইতিমধ্যে প্রমীলা দেবীর ফোন আসে, “তুই কোথায় রে? আমি দিল্লী পৌঁছে গেছি। তোর বাড়িতে তালা মারা।”

বুধাদিত্য ভাবতে পারেনি যে মামিমা এত তাড়াতাড়ি চলে আসবেন, “আমি আলমোড়া, ঝিলামকে নিয়ে আজ রাতে দিল্লীর দিকে রওনা দেব। কাল রাতের মধ্যে দিল্লী পৌঁছে যাব। তুমি আজ রাতে হোটেলে থেকে যাও।”

বুধাদিত্য ঝিলামের বাড়ির লোককে বুঝিয়ে বলে সব কথা। বিকেল বেলায় ঝিলামকে নিয়ে দিল্লীর দিকে রওনা দেয়। ঝিলামের দাদাদের কাঠগোদামে নামিয়ে দিল, তাঁরা বাড়ি ফেরার ট্রেন ধরে। সাড়া রাস্তা ঝিলাম চুপ করে পেছনের সিটে বাবার পাশে বসে থাকে। পরের দিন বিকেল বেলায় দিল্লী পৌঁছে যায়। প্রমীলাদেবী ছাড়া বুধাদিত্যের মনের কথা বোঝার এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। বুধাদিত্য প্রমীলাদেবী কে ঝিলামের ব্যাপার সব কথা খুলে বলে, জানায় যে ঝিলামকে ভালোবাসে। 

ঝিলাম নিজেকে গুটিয়ে নেয় শামুকের খোলের মধ্যে। সারাদিন নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখে, কারুর সাথে কথা পর্যন্ত বলতে চায় না। আশেপাশে লোক দেখলে চমকে ওঠে, মানুষের ওপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে ঝিলাম। চোখে আতঙ্কের ছায়া, চোখ বন্ধ করলেই চমকে ওঠে, বারেবারে আঁতকে ওঠে, “শেষ পর্যন্ত তুমি... নাআআআআ”। প্রমীলাদেবী ঝিলামকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে সাড়া রাত জেগে থাকে। বাপ্পাকে সঙ্গে নিয়ে সুবিরবাবুর সাথে দেবস্মিতা দিল্লী চলে আসেন। ঝিলামের আঘাতের ফলে, বাড়ি ভর্তি লোকের চেহারায় চিন্তার ছাপ। 

ঝিলামের বাবা কি করবেন কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। প্রথমে ইতস্তত করেন অমিত বাবু, সমাজের দোহাই দিয়ে বলেন, যে মেয়েকে এখানে রাখা ঠিক হবে না। প্রমীলা দেবী অমিত বাবুকে সব কথা বুঝিয়ে বলাতে তিনি মেনে নেন বুধাদিত্য আর ঝিলামের সম্পর্ক। প্রমীলা দেবী জানিয়ে দেন যে ঝিলামের মানসিক অবস্থার উন্নতি হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। 

প্রমীলাদেবী সব কথা শুনে অমিত বাবুকে বলেন, “জীবন কখন এক ধাক্কায় শেষ হয়ে যায় না। এই ভদ্রমহিলা” দেবস্মিতাকে দেখিয়ে বলেন “বুধাদিত্যের বাবাকে দ্বিতীয় বার বাঁচার সুযোগ দিয়েছে। তার অপার ভালোবাসা দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে সেই লোক কে যে একসময় প্রেম ভালোবাসা তুচ্ছ বলে মনে করত। সমাজের সামনে আজ আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, শুধু মাত্র এই দেবী’র জন্য। আমি হলফ করে বলতে পারি যে আমার বুধি আপনার মেয়েকে ঠিক সেই রকম ভাবে রাখবে। বর্তমানে ঝিলাম মানসিক দিক থেকে খুব ভেঙ্গে পড়েছে, তাই বুধাদিত্যের কাছে থাকা শ্রেয়। বুধাদিত্যের ভালোবাসা আর প্রেম ঝিলামকে সেই অন্ধকার খাদ থেকে টেনে তুলবে।”

বুধাদিত্য প্রমীলাদেবী কে জড়িয়ে ধরে বলে, “পরের বার কথা দিচ্ছি মামি, তোমার কোলে জন্ম নেব।”

বাপ্পা বুধাদিত্যকে জিজ্ঞেস করে, “এই আন্টি আমার সাথে গল্প করবে না কেন? আন্টির মন খারাপ তাই? এই আন্টি তোমার কে হয়? আন্টি কবে ভালো হবে?”

শিশুর প্রশ্নবাণে জর্জরিত বুধাদিত্য বাপ্পাকে কোলে করে বলে, “আন্টির শরীর খারাপ তাই। আন্টি ভাল হয়ে গেলে তোমার সাথে গল্প করবে, তোমার সাথে খেলবে।”

বাপ্পা বুধাদিত্যের কানেকানে বলে, “তুমি আন্টিকে জড়িয়ে ধরে পেটে কাতুকুতু দাও দেখবে আন্টি ঠিক হয়ে যাবে, আন্টি আবার হাসবে আর তোমার সাথে কথা বলবে।”

বুধাদিত্য ভুরু কুঁচকে বাপ্পাকে জিজ্ঞেস করে, “কে বলেছে তোমাকে?”

বাপ্পা, “বাঃ রে, আমি জানি। মাম্মা যখন খুব রেগে যায় তখন ড্যাডার সাথে কথা বলে না চুপ করে থাকে। আর ড্যাডা মাম্মাকে জড়িয়ে ধরে পেটের ওপরে কাতুকুতু দেয় আর মাম্মা হেসে ফেলে ব্যাস।”

বাপ্পার কানেকানে কথা’টা বেশ জোরেই ছিল, আশেপাশের সবাই শুনতে পায়। বুধাদিত্য দেবস্মিতার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। দেবস্মিতা লজ্জা লুকানোর জন্য সুবির বাবুর দিকে তাকায়। চোখের ইশারায় জানায়, দেখেছ তোমার ছেলের কান্ড।

বুধাদিত্য কথা দেয় অমিত বাবুকে তাঁর মেয়েকে কোন আঘাত ছুঁতে পারবে না। মেয়ের মুখ দেখে পিতার হৃদয় শেষ পর্যন্ত বুধাদিত্যের কথা মেনে নেন। বাড়ির অনেকেই নিজের নিজের কর্ম স্থলে ফিরে যান, কিন্তু অমিত বাবু আর প্রমীলা দেবী, ঝিলামের মুখ দেখে থেকে যান। ঝিলাম, বাবার উপস্থিতি দেখে আর কুঁকড়ে যায়। 

একদিন বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পরে ঝিলাম বুধাদিত্যকে ঘরের মধ্যে ডেকে নিয়ে যায়। বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে?

ঝিলাম খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি সত্যি আমাকে দুর্গাপুরে পাঠিয়ে দেবে?” 

বুধাদিত্য ওর মুখ আঁজলা করে নিজের দিকে তুলে নিয়ে বলে, “কে বলেছে যে আমি তোমাকে দুর্গাপুরে পাঠিয়ে দেব? তুমি সর্বদা আমার বুকের মধ্যে থাকবে। কেউ তোমাকে এই বুক থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না, ঝিল্লি।” 

ওর উষ্ণ হাতের পরশে ঝিলাম গলে যায় বলে, “সবাইকে বাড়ি যেতে বলে দাও। শুধু তুমি পাশে থাকলেই আমি ঠিক হয়ে যাব।”

বুধাদিত্য, “তোমার শরীর খারাপ তাই সবাই আছে। তা ছাড়া তোমার বাবা তোমার জন্য একটু চিন্তিত তাই আছেন, তুমি ঠিক হয়ে গেলেই তাঁরা চলে যাবেন।”

ঝিলাম ওর বুকের ওপরে মাথা চেপে ধরে বলে, “সেই রাতে তুমি না এলে আমি ওই ফার্ম হাউসে আত্মহত্যা করতাম। আমি যেদিন সত্যি আত্মহত্যা করতে গেছিলাম ওর সামনে, তখন তুমি দরজা ভেঙ্গে ঢুকলে। আমি চাকরি করতে চেয়েছিলাম, বাড়ির সবাই আমাকে অনেক কথা শুনিয়ে আমাকে ক্ষান্ত করে দিল। শেষ পর্যন্ত তুমি এসে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলে, তোমার শক্তি বুকে করে আমি স্বাধীনতার স্বাদ খুঁজে পাই। আমার এই জীবন তোমার দেওয়া। আমাকে যদি ভালো হতে হয়, তাহলে তোমার কাছেই হব, আমাকে যদি মরতে হয় তাহলে তোমার কোলে মরব। আমার আর কারুর দরকার নেই, বুধো।”

বুধাদিত্য ঝিলামকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বলে, “ঠিক আছে, তাই যদি চাও আমি সবাইকে বলে দিচ্ছি চলে যেতে।” 

“হ্যাঁ রে, তোর কি সারা বিকেল এখানে দাঁড়িয়ে থাকবি” প্রমীলা দেবীর গলার আওয়াজে দুজনে পরস্পকে ছেড়ে দাঁড়ায়। ঝিলাম একটু লজ্জা পেয়ে প্রমীলা দেবীর পেছনে মুখ লুকিয়ে নেয়। বুধাদিত্য মামিমার দিকে এক বার তাকিয়ে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। প্রমীলা দেবী বুধাদিত্যকে ডেকে হেসে বলেন, “আমি অজান্তেই তোদের কথোপকথন একটু খানি শুনে ফেলেছি। তোদের ভালতেই আমাদের ভালো, তোরা যাতে সুখে শান্তিতে থাকতে পারিস সেটাই হবে। আমি অমিতবাবু কে বলে দেব খানে। তুই আমাদের বাড়ির ফেরার ব্যাবস্থা করে দে কাল।” পরেরদিন ঝিলাম আর বুধাদিত্যকে বিদায় জানিয়ে প্রমীলা দেবী আর অমিত বাবু বাসস্থলে ফিরে যায়। বুধাদিত্য ওদের প্লেনের টিকিট কেটে দেয়। 
Reply
#38
চতুরদশ পর্বঃ মুক্তির স্বাদ। (#2)




দিন দুই পরে, বুধাদিত্য ঝিলামকে জিজ্ঞেস করে যে ওদের বাড়ির জিনিস পত্রের কি করা যায়। ঝিলাম জানিয়ে দেয় যে ওই বাড়িতে ওর কোন কিছু নেই। যেদিন বুধাদিত্যের বাড়ি এসেছিল, নিজের সব জিনিস সাথে নিয়ে এসেছিল। সমীরের সাথে যাবার দিনে শুধুমাত্র কয়েক জোড়া জামা কাপড় নিয়ে গেছিল। ভেবেছিল পরে এসে সব নিয়ে যাবে, কিন্তু ভালোই হয়েছে যে দ্বিতীয় বার সেই কষ্ট করতে হয়নি। ঝিলাম জানিয়ে দেয় ওই বাড়ির সব কিছু বিক্রি করে তার টাকা কোন নারী শক্তির এন.জি.ও কে দান করে দিতে। এই দেশে অনেক মেয়েরা তাদের স্বামীর হাতে নিপীড়িত, হয়ত কিছুটা সাহায্য করতে পারবে ঝিলাম। বুধাদিত্য ওর কথা মত সমীরের বাড়ি সব জিনিস পত্র বিক্রি করে সেই টাকা একটা এন.জি.ওতে গিয়ে সব দান করে দেয়। 

কাজের লোককে বলা হয় দিনে দুই বার আসার জন্য। ভোরবেলা এসে কাজেরলোক রান্না বান্না করে রেখে যায়, দুপুরের পরে এসে বাকি ঘরের কাজ করে। সকালে উঠে ঝিলামের মাথার ব্যান্ডেজ করা, স্নান করিয়ে দেওয়া সব বুধাদিত্য নিজের হাতে করে। দিনে দিনে ঝিলামের মানসিক এবং শারীরিক সাস্থ্যের উন্নতি হয়। ঝিলামের গলায় সেই উৎফুল্ল ফিরে আসেনি, সেই নিয়ে বুধাদিত্য বেশ চিন্তায় থাকে। ঝিলাম শোয়ার ঘরে ঘুমিয়ে পড়ার পরেও বুধাদিত্য চুপ করে স্টাডিতে বসে কান পেতে থাকে, যদি ঝিলাম মাঝ রাতে কেঁদে ওঠে তাহলে। অনেক রাত কেটে যায়, বুধাদিত্য এক নয় সোফায় ঘুমিয়ে পরে না হয় স্টাডির টেবিলে ঘুমিয়ে পরে। সকাল বেলায় লক্ষ্য করে যে গায়ের ওপরে চাদর টানা। বুঝে যায় যে ঝিলাম রাতের বেলা উঠে ওর গায়ের ওপরে চাদর দিয়ে চলে গেছে। ঝিলামের সেই মিষ্টি হাসির কলতান শোনার জন্য বুধাদিত্যের হৃদয় ছটফট করে, ভেবে পায় না কি করে ওই আঁধার চোখে আবার আলোর রেখা মাখাবে। মাঝে মাঝে বেড়াতে যেতে বললে, ঝিলাম মানা করে দেয়। বাড়ির বাইরে পা রাখতে নারাজ ঝিলাম, এমন কি সামনের বাজারে পর্যন্ত যেতে চায় না। সাধারনত ঝিলাম বাড়িতে যে রকম জামা কাপড় পরে থাকত, সেই সব বদলে গেছে। চুড়িদার কামিজ বা শাড়ি ছাড়া আর কিছু পরে না আজকাল। উচ্ছল, উদ্দাম হাসি খুশি ঝিলামের জায়গায় বুধাদিত্যের সামনে অতীব শান্ত এবং সঙ্কুচিত এক নারী। 

বুধাদিত্যের ভয় যে স্কুল শুরু হয়ে গেলে কি করে ঝিলাম স্কুলের সাথে মানিয়ে নেবে। ভিশাল স্যার আর শমিতা ম্যাডামকে সব জানিয়ে দেওয়া হয়। স্কুলের প্রিন্সিপাল এসে বাড়িতে দেখা করে যান। সব কিছু শুনে জানিয়ে দেন যে যত দিন ঝিলাম সম্পূর্ণ রুপে সুস্থ হয়ে না ওঠে ততদিন স্কুল ওকে ছুটি দিয়ে দেবে। স্কুল শুরু হতে তখন কিছু দিন বাকি, কিন্তু চিন্তায় বুধাদিত্যের রাতের ঘুম হয় না। বাড়ি থেকে কেউ ফোন করলে বিশেষ কারুর সাথে ঠিক করে কথা বলে না। ঝিলামের বাবা মা খুব চিন্তিত সেই নিয়ে, কিন্তু ঝিলামকে দুর্গাপুর নিয়ে আসবে তার উপায় নেই। একবার বুধাদিত্য চেষ্টা করেছিল ঝিলামের সাথে সেই বিষয়ে কথা বলতে, ঝিলাম চুপ করে ছিল কোন উত্তর না দিয়ে না খেয়ে দরজা বন্ধ করে বসেছিল দুইদিন। সেদিনের পর থেকে আর দুর্গাপুর যাবার কোন কথা বলেনি। সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিল বুধাদিত্য, যাতে কেউ ঝিলামকে বাড়ি ছাড়ার কথা না বলে।

সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে বুধাদিত্যের একটু দেরি হয়ে যায়, রাত আট’টা বেজে যায়। বুধাদিত্য ফোন করে ঝিলামকে জানিয়ে দেয় যে বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হবে। ঝিলাম কোন কথা না বলে চুপচাপ শুনে ফোন রেখে দেয়। দরজায় টোকা মারতে, চুপচাপ দরজা খুলে দেয় ঝিলাম। মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে যে ঝিলামের মুখ থমথমে, চোখের পাতা ভিজে, নাকের ডগা লাল। ঝিলামকে জিজ্ঞেস করে যে কেন কাঁদছিল, ঝিলাম কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ রান্না ঘরে ঢুকে ওর জন্য কফি বানাতে চলে যায়। সেই মুখের করুন চাহনি দেখে বুধাদিত্যের বুক কেঁপে ওঠে, ভয় হয় ঝিলাম কিছু না করে বসে। বুধাদিত্য জানায় যে অফিসে কাজের চাপের জন্য বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে। চুপ করে ওর কথা শুনে নেয়, কোন উত্তর দেয় না। ঝিলামের শীতল নিস্তব্ধতা বুধাদিত্যের বুকে বড় বেজে ওঠে। অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি শান্ত ঝিলাম, খাওয়ার সময়ে কোন কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে নেয়। বুধাদিত্য বসার ঘরে বসে চিন্তায় ডুবে যায়। একা একা রেখে যাওয়া ঠিক নয়, কিন্তু ঝিলামের কথা মত সবাইকে পাঠিয়ে দিয়েছিল, এখন যদি ঝিলাম আবার কিছু করে বসে। ঝিলাম নিজের ঘরে ঢুকে আলমারির খুলে কিছু খুঁজতে শুরু করে। আলমারির সব জিনিস বের করে তোলপাড় করে ফেলে। বুধাদিত্য অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করে যে ঝিলাম আলমারির মধ্যে কিছু খুঁজছে। কিন্তু যখন দেখে যে আলমারি খালি করার পরে আবার আলমারি গুছাতে বসেছে, তখন বুধাদিত্য আর চুপ করে বসে থাকতে পারে না। 

বুধাদিত্য ওর পেছনে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রাখে, “ঠিক করে বল, কি খুঁজছ।”

ওর দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে, “তোমার ঝিল্লিকে খুঁজছি, কিছুতেই পাচ্ছি না।”

বুধাদিত্য ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে, ঝিলাম ওর বুকের ওপরে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ফেলে। ঝিলামের মাথার ওপরে ঠোঁট চেপে বলে, “বোকা মেয়ে, নিজেকে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত আলমারি খুলতে হয়।” ওর মুখ আঁজলা করে নিজের দিকে তুলে ধরে। ঝিলাম শক্ত করে চোখ বন্ধ করে থাকে। বুধাদিত্য দুই বুড়ো আঙুল দিয়ে নরম গালের ওপর দিয়ে জলের ফোঁটা মুছে দিয়ে বলে, “আমার চোখের দিকে তাকাও।” ভিজে চোখের পাতা ধিরে ধিরে খুলে যায়, পদ্ম ফুলের পাপড়ি মেলে ধরে ঝিলাম। বুধাদিত্য ওর দিকে ঝুঁকে বলে, “এই চোখের ভেতরে দেখ, নিজেকে খুঁজে পাবে, ঝিল্লিরানী।” ঝিলামের লাল নাকের ডগায় আলতো করে নাক ঘষে দেয় বুধাদিত্য। ঝিলামের উষ্ণ শ্বাস ভাসিয়ে দেয় বুধাদিত্যের ঠোঁট, চিবুক। ঝিলাম ওর বুকে দশ আঙ্গুলে খামচে ধরে। বুধাদিত্য ধিরে ধিরে ঠোঁট নামিয়ে আনে ঝিলামের লাল নরম ঠোঁটের ওপরে। আলতো করে ছুঁইয়ে দেয় ওই নরম গোলাপ পাপড়ির ওপরে। ঝিলাম ঠোঁট চেপে ধরে বুধাদিত্যের ঠোঁটে, আবেগের বশে দুই চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। চোখ বন্ধ করে প্রেমের চুম্বন ঘনীভূত করে নেয়। নিজেকে চেপে ধরে বুধাদিত্যের প্রসস্থ বুকের ওপরে চেপে ধরে নিজেকে। বুধাদিত্য ওর নিচের ঠোঁট নিজের ঠোঁটের মাঝে নিয়ে চুষতে শুরু করে। শরীর ছেড়ে যায় ঝিলামের, সারা শরীর সেই মধুর চুম্বনের ফলে অবশ হয়ে আসে। বুধাদিত্য ঝিলামের কোমল দেহ দু’হাতে জড়িয়ে নিজের শরীরের ওপরে পিষে ধরে। ঝিলাম বুক ছেড়ে দুই হাতে বুধাদিত্যের গলা জড়িয়ে ধরে। ভালোবাসার আলিঙ্গন বদ্ধ দুই চাতক চাতকির চারপাশে সদময় থমকে দাঁড়ায়।

কিছু পরে ঝিলাম ঠোঁট ছেড়ে মিষ্টি হেসে বলে, “খুঁজে পেয়েছি... বুধো’র ঝিল্লিকে।”

বুধাদিত্য হেসে ফেলে, “আইস্ক্রিম খেতে যাবে?” ঝিলাম মাথা নাড়ায়, হ্যাঁ। বুধাদিত্য বলে, “চলো কাপড় পরে নাও তাড়াতাড়ি।”

ঝিলাম বেশ সুন্দর একটা চুড়িদার কামিজ পড়েছিল তাই ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কেন, চুড়িদারে অসুবিধে কি?”

বুধাদিত্য ওর দেহে আলতো চেপে বালে, “এটা বুধো’র ঝিল্লি নয়, এটা বুধাদিত্যের ঝিলাম। তুমি বলেছ যে বুধো’র ঝিল্লি।”

ঝিলাম, “মানে?”

বুধাদিত্য ওকে ছেড়ে আলমারি থেকে একটা সাদা জিন্সের কাপ্রি আর একটা গোলাপি টপ হাতে ধরিয়ে বলে, “পরো। আর হ্যাঁ নুপুরটা পরে নিও, বড় মিষ্টি লাগে তোমার পায়ের রিনিঝিনি সুর, ঝিল্লিরানী।”

ঝিলাম লাজুক হেসে ওর হাত থেকে জিন্স আর টপ নিয়ে বলে, “ঘর থেকে বের হও তবে ত ড্রেস চেঞ্জ করব।”

বুধাদিত্য ওকে জড়িয়ে ধরে বলে, “দেখলে ক্ষতি আছে।”

আদর করে বুকের ওপরে আলতো এক চাঁটি মেরে বলে, “শয়তানি করার সময় হয়নি, বুধো।” তারপরে ঠেলে ঘর থেকে বের করে দেয়। বুধাদিত্য গালের ওপরে একটা চুমু খেয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। 

ঝিল্লির কণ্ঠস্বরে সেই উচ্ছল ঝঙ্কার ফিরে এসেছে। অবশেষে বেড়াতে যাবে, মন খুশিতে নেচে ওঠে বুধাদিত্যের। তাড়াতাড়ি একটা টিশার্ট গলিয়ে নেয়। গ্রীষ্ম কাল রাত দশ’টা বাজে, বাইরের আবহাওয়া একটু গুমোট। গাছের পাতা পর্যন্ত নড়ছেনা। বুধাদিত্যের যেন আর তর সইছেনা, কখন ঝিলামকে স্বমহিমায় দেখতে পাবে। 

বুধাদিত্য রুমের দরজায় টোকা দিয়ে বলে, “তাড়াতাড়ি...” 

ঝিলাম ওপর পাশ থেকে ধমকে ওঠে, “এতদিন পরে বয়ফ্রেন্ডের সাথে আইস্ক্রিম খেতে যাব, একটু সাজতে দেবে না নাকি?”

বুধাদিত্য, “অনেক সাজ হয়েছে, প্লিস তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে এস। আমার আর তর সইছে না। প্লিস প্লিস... ঝিল্লি।”

ঝিলাম দরজা খুলে বাঁ হাত কোমরে দিয়ে একটু বেঁকে দাঁড়ায়। ভুরু নাচিয়ে, নিচের ঠোঁট কামড়ে জিজ্ঞেস করে, কেমন? 

বুধাদিত্য হাঁ করে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে স্বপ্নের সুন্দরীকে। মাথার চুল একপাস করে আঁচড়ান, ভুরু জোড়া কালো চাবুকের মতন। চোখের কোনে একটু কাজল মেখে চোখের ভাষা দ্বিগুন করে নিয়েছে। গোলাপি ঠোঁট চকচক করছে গোলাপি লিপ্সটিকে। মরালী গর্দানে একটা সরু সোনার চেন, উন্নত বুকের খাঁজের মাঝে একটা লাল রুবির লকেট দুলছে। ছোটো হাতার গোলাপি টপ ওর উরধাঙ্গের সাথে চেপে বসে। দুই ফর্সা হাতের ত্বকে যেন মাখনের প্রলেপ দেওয়া। সাদা জিন্সের ক্যাপ্রি হাঁটুর কাছে এসে শেষ হয়ে গেছে। ফর্সা পায়ের গুলি এত মসৃণ মনে হয় যেন মাছি বসলে পিছলে পরে যাবে। রাঙ্গা পায়ের গোড়ালিতে রুপোর নুপুর বাঁধা। আলতো পা দুলিয়ে ওকে ইচ্ছে করে শুনিয়ে দিল নুপুরের ছনছন আওয়াজ। 

বুধাদিত্য ঝিলামকে জড়িয়ে ধরার জন্য ওর দিকে এগিয়ে যায়, ঝিলাম হেসে দৌড়ে পালিয়ে যায়। ফাঁকা বাড়ি আবার ভরে ওঠে ঝিলামের নুপুরের আওয়াজে। দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয় মিষ্টি হাসির আওয়াজ। চাবির থোকা থেকে গাড়ির চাবি উঠিয়ে দরজা খুলে দাঁড়ায়। 

খিলখিল করে হেসে বলে, “তুমি না এলে কিন্তু আমি গাড়ি চালিয়ে চলে যাব। জানই ত আমি গাড়ি চালালে কি হবে।”

বুধাদিত্য দরজা দিয়ে বেড়িয়ে পরে। ঝিলাম তালা বন্ধ করে ওর বাঁহাত বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে হাঁটতে শুরু করে। পুরানো ঝিলামের নতুন রুপ দেখে মুগ্ধ বুধাদিত্য। ওর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারে না। বারেবারে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। গাড়িতে উঠে গাড়ি চালিয়ে দেয় ইন্ডিয়া গেটের দিকে। বুধাদিত্য ঝিলামের ডান হাত ধরে গিয়ারের ওপরে রেখে তাঁর ওপরে বা হাত চেপে ধরে। ঝিলাম যত বার হাত ছারাবার চেষ্টা করে ততজোরে চেপে ধরে হাত। 

ঝিলাম ওর হাতের ওপরে চিমটি কেটে বলে, “গাড়ি চালাও ঠিক করে, পাগলামি করতে হবে না।”

বুধাদিত্য, “উম্মম্মম্ম...... তোমাকে যা সেক্সি লাগছে না। আমি চোখ ফেরাতে পারছি না, ঝিল্লি।” 

ঝিলাম হাত ছাড়িয়ে বুধাদিত্যের গা ঘেঁসে বসে কানেকানে বলে, “সেক্সি আজ লেগেছে না যেদিন প্রথম দেখেছিলে সেদিন লেগেছিল, শুধু মুখে আজ বলছ, তাই ত।”

বুধাদিত্য হেসে ফেলে ওর কথা শুনে, “দুষ্টু মেয়ে, অনেক কিছু লক্ষ্য করো দেখছি, হ্যাঁ।”

ঝিলাম দুষ্টু মিষ্টি হেসে বলে, “সেদিন রাতে আমি যখন স্নান করে বেড়িয়েছিলাম তখন অনেক কিছু দেখেছিলে তাই ত।”

বুধাদিত্য ধরা পরে গেছে, লজ্জা লুকিয়ে সামনে দেখে বলে “কবে কি দেখেছি, প্রায় দশ মাস আগের কথা মনে আছে দেখছি।”

ঝিলাম আলতো করে বুধাদিত্যের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে, “ইসস, এই ছেলে আবার লজ্জা পায়। দেখ দেখ, কেমন লাল হয়ে গেছে মেয়েদের মতন। প্লিস আরও একটু লজ্জা পাও বুধো, তোমাকে না দারুন দেখায়।”

লজ্জায় বুধাদিত্যের কান গরম হয়ে যায় ঝিলামের কথা শুনে। ঝিলামের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলে, “এবারে যদি না থাম তাহলে কিন্তু খারাপ হয়ে যাবে।”

গাল টিপে ধরে নাড়িয়ে দেয় ঝিলাম, বলে, “কি করবে, হ্যাঁ শুনি।”

বুধাদিত্য, “গাড়ি থামিয়ে রাস্তার মাঝে তোমাকে একটা চুমু খাবো।”

ঝিলাম, “আচ্ছা তাই নাকি?”

বুধাদিত্য, “দেখতে চাও আমি কি করতে পারি।”

ঝিলাম বুধাদিত্যের নাকের ওপরে বুড়ো আঙুল টিপে, “তুমি ঘেচু কলা করতে পার, ওই ত বুকের পাটা। আজ যদি আলমারি না খুলতাম তাহলে ত খুজেই পেতে না।”

বুধাদিত্য, “প্লিস ঝিল্লি গাড়ি চালাতে দাও না হলে এক্সিডেন্ট করে দেব।”

ঝিলাম ওর গলা জড়িয়ে বলে, “ওকে বাবা, আমি আর ডিস্টার্ব করব না, চল।”

গাড়ি ইন্ডিয়া গেট পৌঁছে যায়। গাড়ি ঠিক ভাবে পার্ক করার আগেই নেমে যায় ঝিলাম। দৌড়ে গিয়ে দুটি আইস্ক্রিম কিনে নিয়ে আসে। ওর দৌড়ানো দেখে বুধাদিত্যের মন চঞ্চল হয়ে ওঠে, মাথার চুল মেঘের মতন উড়ে যায়। অতীব আকর্ষণীয় দেহপল্লব দৌড়ানোর ফলে মদিরার ন্যায় ছলকে ওঠে। মাতাল হয়ে যায় বুধাদিত্য ওই তরঙ্গিণীর চাল দেখে। গোলাপি জিব বের করে আইস্ক্রিম খায় আর বুধাদিত্যের গাঁ ঘেঁসে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে আগের সেই সঙ্কোচ নেই, নেই কোন দ্বিধা, সত্যি ভালোবাসার মানুষ আজ পাশে দাঁড়িয়ে। ঝিলামের মনে হয়, ওই কঠিন বুকের মাঝে লুকিয়ে পড়লে বেশ ভালো হত, দুই বলিষ্ঠ বাহুর আলিঙ্গনে হারিয়ে যেতে বড় আনন্দ।

বুধাদিত্য বাঁ হাতে ঝিলামকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে, “ঝিল্লি, বেড়াতে যাবে।”

ঝিলাম, “কোথায়?”

বুধাদিত্য, “ওই সেদিনের মতন গাড়িতে, খালি তুমি আর আমি।”

ঝিলাম ওর বুকের ওপরে চিমটি কেটে বলে, “কেন কাল অফিস নেই?”

সেই চিমটি টা বড় ব্যাথা দেয়, তবে একদম বুকের বাম দিকে, বুধাদিত্য ককিয়ে বলে, “উফফফ... তোমার চিমটি খাবার জন্য কাল আর অফিস যেতে ইচ্ছে করছে না।”

ঝিলাম ভুরু নাচিয়ে দুষ্টু হেসে বলে, “বুঝতে পারছি বাড়ি ফিরলেই আমার কপালে বিপদ আছে। চল বেড়াতে যাই...”

বুধাদিত্য ওর কথা ধরতে পেরে বলে, “ইসসসস... কেন যে মরতে লঙ ড্রাইভের কথা উঠাতে গেলাম...”

ঝিলাম গাড়ির দরজা খুলে গাড়িতে উঠে পরে। ওর দিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলে, “ভদ্রলোকের এক কথা বুধো সোনা, গার্লফ্রেন্ডকে এই রকম ভাবে ওয়েট করাতে নেই।”

বুধাদিত্য মাথা চুল্কাতে চুল্কাতে গাড়ি চালাতে শুরু করে। গাড়ি কিছুক্ষণের মধ্যে দিল্লী ছেড়ে বেড়িয়ে চণ্ডীগড়ের হাইওয়ে ধরে। পানিপথ ছাড়াবার পরেই গাড়ি হাওয়ার সাথে গান করে। ঝিলাম ওর কাঁধ ঘেঁসে বসে থাকে আর মাঝে মাঝে ওর চুলের মধ্যে বিলি কেটে দেয়। 

ঝিলাম কানের ওপরে ফুঁ দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আর সেদিন কি দেখেছিলে?”

বুধাধিত্য, “খুব জানতে ইচ্ছে করছে মনে হয়।”

ঝিলাম নিচের ঠোঁট কামড়ে বলে, “শুনি না একটু।”

বুধাদিত্য, “উম্মম্মম...ওই স্নান করার আগের দৃশ্য দেখেছিলাম।” চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য, “উফফফ যা লাগছিল না।”

ঝিলাম মাথার পেছনে আদর করে চাঁটি মেরে বলে, “ছিঃ শুধু অন্য লোকের বউয়ের দিকে নজর। আয়েশা ছাড়া আর কটা কে? হ্যাঁ একটু শুনি ত।”

লজ্জায় বুধাদিত্যের কান মুখ গরম হয়ে যায়, কথা ঘুড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, “আজ আর গান গাইবে না...”

ঝিলাম হেসে ফেলে, “তুমি শুনতে চাইলেই গাইব।” 

বুধাদিত্য, “না আর গান গেয়ে কাজ নেই, এবারে এক্সিডেন্ট করে বসব কিন্তু।”

ঝিলাম, “কেন আমি কি বেসুরা গাই নাকি?”

বুধাদিত্য, “না না, আমার কথার মানে সেটা নয়। আমি কব্জিতে বেলফুলের মালা জড়িয়ে মদ খাব আর তুমি আমার সামনে বসে গান গাইবে, বেশ একটা অন্য আমেজ আসবে।”

ঝিলাম কানের লতিতে চুমু খেয়ে বলে, “ছেলের শখের বলিহারি, গার্লফ্রেন্ডকে শেষ পর্যন্ত বাইজি।”

ফাঁকা রাস্তার ওপর দিয়ে, ঘন কালো রাতের অন্ধকার চিড়ে গাড়ির বাতাসের সাথে খেলা করে চলে। খোলা জানালা দিয়ে ভেসে আসে মধ্যরাত্রের ঠাণ্ডা বাতাস। ঝিলাম দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বুকের মধ্যে সেই ঠাণ্ডা বাতাস ভরে নিয়ে প্রেমঘন সুরে বলে, “আজ মুক্তির স্বাদ পেলাম তোমার ছোঁয়ায়। আজ আমি সত্যি কারের মুক্ত, সত্যি কারের স্বাধীন।” হটাত ঝিলাম হাঁটু গেড়ে বসে পরে সিটের ওপরে। বুধাদিত্যের দিকে ফিরে ওর মুখ আঁজলা করে ধরে নিজের দিকে ঘুড়িয়ে নেয়। মাথা নামিয়ে আনে ওর মুখের ওপরে, গোলাপি নরম ঠোঁট চেপে ধরে পুরু ঠোঁটের ওপরে। চোখের সামনে ঝিলামের মুখ, চেহারার ওপরে ঝিলামের কালো রেশমি চুলের পর্দা ছাড়া রাস্তা দেখতে পারে না বুধাদিত্য। সমস্ত শক্তি দিয়ে ব্রেকে পা চেপে দেয়, গাড়ি জোর আওয়াজ করে ঘুরে গিয়ে রাস্তার পাশে থেমে যায়। ঝিলাম দুই হাতে বুধাদিত্যের গলা জড়িয়ে ধরে আরও জোরে ঠোঁট বুধাদিত্যর ঠোঁটের ওপরে চেপে ধরে। পরস্পরের মুখের লালা ভিজিয়ে দেয় পরস্পরের ঠোঁট, চোখ বন্ধ করে, প্রগার আলিঙ্গনে বদ্ধ হয়ে দুজনে ভেসে যায় প্রেমের জোয়ারে।
Reply
#39
পঞ্চদশ পর্বঃ দ্বিতীয় অঙ্ক। (#1)





আগস্ট মাসের শেষের দিকে। দুপুরের পর থেকেই ঝড় শুরু হয়ে গিয়েছিল, এই বছর মনে হয় অন্য বছরের চেয়ে একটু বেশি বৃষ্টি হবার সভাবনা আছে। অফিসে ওর বস, শান্তনুর সাথে একটু মনমালিন্য হয়েছিল, সেই নিয়ে একটু চিন্তায়। কাজের চাপের বুধাদিত্যকে কোনদিন ঝোঁকাতে পারেনি কিন্তু বসের সাথে মাঝে মাঝেই এই মনমালিন্য ঠিক আর পেরে উঠছেনা বুধাদিত্য। প্রান প্রেয়সী, ঝিলাম আবার স্কুল কলিগদের নিয়ে লাজপত নগর গেছে, শপিং করতে। সাথে গাড়ি টাও নিয়ে গিয়েছিল তাই বুধাদিত্যকে অটো করে বাড়ি ফিরতে হয়। শপিঙ্গে বেরনোর আগেই ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল ঝিলাম যে ফিরতে দেরি হতে পারে। বাড়ি ঢোকা মাত্রই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। অগত্যা একা বসে টিভি দেখা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। রাত প্রায় ন’টা বাজতে চলল, বৃষ্টি যেন আরও জোরে শুরু হয়ে গেছে। দুই বার ফোন করে পেল না ঝিলামকে, একটু চিন্তায় পড়ে গেল বুধাদিত্য, এই বৃষ্টিতে কিছু হল নাকি গাড়ির অথবা ঝিলামের? গাড়ির কিছু হলে কালীনাথ ফোন করে জানিয়ে দিত। শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরে কালীনাথের ফোনে ফোন করে বুধাদিত্য।

কালীনাথ ঝিলামকে ফোন ধরিয়ে দেয়। বুধাদিত্য ফোন ধরেই বকা দেয়, “কি হল সেই কখন থেকে ফোন করে যাচ্ছি। ফোন ধরতে পার না তাহলে রেখেছ কেন?”

ঝিলাম বেগতিক দেখে রুদ্র রুপ ধারন করে, জানে এই রুপেই একমাত্র বুধাদিত্য বশ মানবে না হলে আরও চোটপাট শুরু করে দেবে তাই চেঁচিয়ে উত্তর দেয়, “চেচিয় না, আমি আগেই বলে দিয়েছিলাম যে আমার ফিরতে দেরি হবে। আর ফোন ধরতে পারিনি কেননা আমার দু’হাতে মেহেন্দি লাগানো, তাই।”

বুধাদিত্য নরম হয়ে যায় রুদ্র দেবীর সামনে, “না মানে এত রাত হয়ে গেল, এত বৃষ্টি তাই একটু চিন্তায় ছিলাম।”

ঝিলাম হেসে ফেলে, অসুধে কাজ হয়েছে, “উম্ম কত চিন্তা যেন আমার জন্য। যাই হোক আমি রাস্তায়, মনামি কে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসছি।”

বুধাদিত্য, “আজ হটাত মেহেন্দি লাগাতে গেলে, তাও আবার লাজপত নগর গিয়ে?”

ঝিলাম, “আরে বাবা, সব জেরা কি এখানে করবে নাকি। বাড়ি এসে বলছি সব কথা। ফ্রিজ থেকে খাবার গুলো বের করে গরম করে রেখ আর প্লিস সোনা, মিষ্টি সোনা, দুষ্টু সোনা, আমার জন্যে একটু স্যালাড বানিয়ে রেখ।”

বুধাদিত্য প্রশ্ন করে, “রাতে স্যালাড কেন খাবে?”

ঝিলাম কড়া সুরে উত্তর দেয়, “যেটা বলা হয়েছে সেটা কর, আমি বাড়ি ফিরে বাকি কথা বলব।”

হেসে ফেলে বুধাদিত্য, “জি মালকিন, আপনার আদেশ শিরধার্য। আমি আপনার আদেশ মান্য করিব। শুধু আপানার চাঁদ মুখের কিঞ্চিত তাড়াতাড়ি দর্শন পাইলে আমি অতীব পুলকিত হইতাম। যদি দয়া করে আপনার সারথিকে একটু তড়িৎ বেগে বাহন চালাইতে আদেশ দেন তাহলে...”

হেসে ফেলে ঝিলাম, “ওকে, বাবা, আমি এখুনি আসছি, কিন্তু জানত বৃষ্টি হলে রাস্তায় কত জ্যাম হয়।”

ঝিলাম স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে রান্না সেরে তারপরে ঘুরতে বেড়িয়েছে। বুধাদিত্য ফোন রেখে ফ্রিজ খুলে দেখল যে ভাত ডাল তরকারি সব বানানো। ডিপ ফ্রিজে খান চারেক মুরগির ঠ্যাঙ রাখা। বুধাদিত্য ভাবল এই বৃষ্টির রাতে নুডুলসের সাথে চিকেন লেগ বেশ ভালো জমবে। নুডুলস ঝিলামের খুব পছন্দের খাদ্য, বানিয়ে রাখলে ঝিলামকে একটু অবাক করে দেওয়া হবে। ওর জীবনে ঝিলাম পা রাখার পরে কোনদিন রান্না ঘরে ঢোকেনি বুধাদিত্য। বাইরে থেকে রান্না ঘর দেখে আর চেনা যায় না যে এটা তার ছন্নছাড়া রান্না ঘর ছিল। 

রান্না ঘরে ঢুকে নুডুলস আর চিকেন রান্না করতে করতে গত কয়েক মাসের ছবি বুধাদিত্যের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ঝিলামকে সেই মৃত্যুর কবল থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। শামুকের খোলে লুকিয়ে থাকা ঝিলামকে প্রেয়সী “ঝিল্লিরানী” তে পরিবর্তন করা। নিজের জীবন তাঁর হাতে সঁপে এক নতুন “বুধো”র আগমন। বুক ভরে শ্বাস নেয়, বারেবারে “দেবী”র কথা মনে পড়ে যায়, দেবস্মিতা ওর বাবাকে পাঁকের জীবন থেকে তুলে এনে এক নতুন জীবন প্রদান করে এখানে দুজনে দুজনা কে আঁকড়ে নতুন জীবনের আস্বাদ নেয় প্রতিদিন। হারিয়ে যাওয়া প্রেয়সীকে পেয়ে বুধাদিত্য সব ভুলে নিজেকে ঝিলামের হাতে সমর্পণ করে দিয়েছে। এই নতুন খুঁজে পাওয়া মুক্তির স্বাদে ঝিলাম এক নতুন নারী, দ্বিতীয় জীবনে অবশেষে মনের মানুষ খুঁজে পেয়ে ঝিলাম অতীব আনন্দিত। ভাগ্য সবার হয়ত সহায় হয়না তাই ঝিলাম এই জীবন দু’হাতে আঁকড়ে ধরে থাকে, তিলেতিলে সাজিয়ে সুন্দর করে তুলতে তৎপর। ঘরের দেয়াল, বিছানার চাদর, জানালার পর্দা, সোফার কভার, টেবিলের থালা বাটি গ্লাস পর্যন্ত যেন এই বাড়ির নব রাজ্ঞীর অধীন, এই প্রাসাদের রানীর ছোঁয়ায় ঝলমল করছে সর্বদা। রান্না শেষ, খাবার টেবিলে তিনটে মোমবাতি রাখে, একটা বড় কাঁচের বাটির মধ্যে কিছু ছোটো ছোটো সুগন্ধি প্রদীপ ভাসিয়ে দেয়। 

সোফার ওপরে বসে পড়ে বুধাদিত্য, চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই প্রেমের দৃশ্য আর চনমন করে ওঠে বুধাদিত্যের শরীর। পরের দিন আর অফিস যেতে পারেনি বুধাদিত্য। ঝিলামের তীব্র অধর দংশন ওকে নিয়ে যায় এক অচিন পুরীতে, এক স্বপ্নের রাজ্যে। সেই রাতে বাড়ি ফিরে পরস্পরকে প্রান ঢেলে, হৃদয় উজাড় করে ভালোবাসার শেষ কণা টুকু পরস্পরে অঙ্গে মাখিয়ে দিয়েছিল। বাড়ি ফিরতে সেদিন অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল, ঘরে ঢুকতেই পরস্পরকে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরে যেন একটাই শরীর। দুই প্রেমে উন্মাদ নাগ আর নাগিনী পরস্পরকে ছাড়তেই চায়না। সে যেন প্রেমের এক নবীন যুদ্ধ, কে কাকে হারিয়ে দেয় এই ভালোবাসার খেলায়। কেউ কাউকে ছাড়তে চায়না, চুম্বনে, মর্দনে, পেষণে সোহাগে ভরিয়ে বারেবারে সেই সুখের সাগরে ভেসে গিয়েছিল দুই প্রান। রাগরস সারা অঙ্গে মাখিয়ে ভোরের দিকে পরস্পরকে আলিঙ্গনে বেঁধে শোয়ার ঘরের মেঝের ওপরে ঘুমিয়ে পড়েছিল দুই ক্লান্ত কপোত কপোতী। পরের দিন সকালে ঝিলামের শরীরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে এক নতুন রুপ অপার তৃপ্তিতে, বুধাদিত্য অবশেষে খুঁজে পায় তার ভালোবাসার শীতল মলয়।

কলিং বেল শুনে সম্বিৎ ফিরে পায়। দরজা খুলে প্রেয়সীকে সাদর আহবান জানায়। ফর্সা হাত দুটি মেহেন্দি ঢাকা, দুই কাজল কালো চোখে দুষ্টুমির হাসি। কালীনাথ পেছন পেছন ব্যাগ নিয়ে ঘরে রেখে চলে যায়। বুধাদিত্য চুপ করে দাঁড়িয়ে একবার ঝিলামের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে। ছাতার মতন বড় ঘেরের লম্বা সাদা রঙের কামিজ আর আঁটো চুড়িদার পরনে। 

বুধাদিত্য হেসে জিজ্ঞেস করে, “কি ব্যাপার বলত, হটাত মেহেন্দি লাগাতে গেলে?”

ঝিলাম ওর বুকের ওপরে কুনুই দিয়ে গুত মেরে বলে, “এমনি ইচ্ছে হল তাই সাজলাম একটু।” বুধাদিত্য ওর কোমর জড়িয়ে ধরে বুকের কাছে টেনে আনে। ঝিলাম চেঁচিয়ে ওঠে “এই ছাড়ো ছাড়ো, হাতের মেহেন্দি ঘ্যেচে যাবে যে।” বুধাদিত্য ওর গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। ঝিলাম অগত্যা নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, “এবারে সত্যি বলছি হাতের মেহেন্দি কিন্তু মুখে মাখিয়ে দেব, তখন বুঝবে।”

বুধাদিত্য হেসে উত্তর দেয়, “তুমি নিতাই গৌরাঙ্গ হয়েছ তাই ত একটু দুষ্টুমি করার সুযোগ পেলাম।”

ঝিলাম, “প্লিস সোনা, করো না।”

বুধাদিত্য, “তা কতক্ষণে এই মেহেন্দি তোমার হাত থেকে ছাড়াবে?”

ঝিলাম, “একটু লেবু কেটে নিয়ে এস না, প্লিস।”

বুধাদিত্য, “এই সাদা ড্রেস পড়ে তুমি মেহেন্দি ছাড়াবে, যদি কাপরে লেগে যায় তাহলে?”

ঝিলাম নিচের ঠোঁট চেপে হেসে ফেলে, “সত্যি বলছ যে দুষ্টুমি করবে না?” বুধাদিত্য মাথা নাড়ায়, না করব না। ঝিলাম কানেকানে বলে, “সালোয়ার নামিয়ে দাও।”

বুধাদিত্য ঝিলামের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ওর মুখের দিকে তাকায়। ঝিলামের মুখ লাল হয়ে যায় একটু লজ্জায়। বুধাদিত্যের হাত ওর পায়ের সালোয়ারের ওপর দিয়ে ওর বক্র পায়ের গুলির উপরে আদর করে কামিজ উপর দিকে উঠিয়ে দেয়। ঝিলামের শরীর শিরশির করে কেঁপে ওঠে সেই প্রেমের পরশে। বুধাদিত্য ওর কোমরে হাত নিয়ে ওর নগ্ন পেটের ওপরে আলতো করে চেপে ধরে। ঝিলাম আলতো কোমর নাড়ায়, আর বুধাদিত্য দুই পাশে হাত রেখে ওর পাতলা কোমর চেপে ধরে। 

সারা অঙ্গে এক বিদ্যুৎ খেলে যায় ঝিলামের, কঠিন তপ্ত আঙুল ওর নরম পেটের ওপরে খেলা করতে শুরু করে। ঝিলাম মৃদু কণে আদেশ দেয়, “বুধো প্লিস, আমি কিন্তু খুব মারব এবারে।” 

বুধাদিত্য ধিরে ধিরে ওর চুড়িদারের দড়ি খুলে দেয়, গোড়ালির কাছে টেনে নামিয়ে দেয় পরনের চুড়িদার। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঝিলাম, ওর নগ্ন কোমরে বুধাদিত্যের তপ্ত আঙুল নরম পেটের ওপরে খেলা করে চলে। কোমরবন্ধনীর পাশে হাত রেখে আলতো করে আঙুল দিয়ে চাপ দেয়। ঝিলামের সারা শরীর অবশ হয়ে আসে, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে উত্তেজনায়। কোনরকম সামনে ঝুঁকে বুধাদিত্যের মাথার ওপরে কুনুই দিয়ে ঠ্যালা মারে। বুধাদিত্যের হাত কোমর ছাড়িয়ে ঝিলামের কোমল নিটোল নিতম্বের তপ্ত ত্বক স্পর্শ করে। ঝিলামের দুই উরুতে কাপন ধরে, দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারাতে থাকে ললনা। বুধাদিত্য দুই হাতের থাবার মধ্যে দুই সুডৌল নিটোল ভারী নিতম্বে আলতো চাপ দিয়ে ওর মুখের কাছে টেনে ধরে ঝিলামের পেট। 

ঝিলামের সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে, মৃদু কণে বলে, “বুধো প্লিস, সোনা এখন না।” বুধাদিত্য কামিজের ওপর দিয়ে ওর নরম পেটের ওপরে সুগভীর নাভির ওপরে ঠোঁট চেপে ধরে। ঝিলাম মৃদু শীৎকার করে ওঠে, “শয়তান ছেলে, ছাড়ো প্লিস।”

বুধাদিত্য প্রেয়সীকে আরও উত্যক্ত করে তোলে, দুই হাতের দশ আঙুলে চেপে ধরে কোমল নিতম্বের মাংস। গরম ত্বকের ওপরে গরম আঙ্গুলের পেষণে ঝিলামের উরু কেঁপে ওঠে। ঝিলাম যদি নিজেকে এই প্রগাড় আলিঙ্গন থেকে নিজেকে না ছাড়িয়ে নেয় তাহলে এখুনি চেতনা হারিয়ে লুটিয়ে পড়বে বুধাদিত্যের কোলে। হাঁটু দিয়ে বুধাদিত্যের মুখের ওপরে ঠেলে দেয়, কোনোরকমে সরিয়ে দেয় বুধাদিত্যকে। বুধাদিত্য ওকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, আর সেই ক্ষণে ঝিলাম দৌড়ে পালিয়ে যায় ঘরের মধ্যে।

বাথরুমে ঢুকে মৃদু বকুনি দেয় দয়িতকে, “তুমি না, একদম জানো, মস্ত শয়তান।”

বুধাদিত্য, “উফফফ... তোমার ওই সেক্সি শরীর থেকে হাত সরাতে ইচ্ছে করে না যে।”

ঝিলাম, “আমি স্যালাড কেটে রাখতে বলেছিলাম, সেটা করেছ?”

বুধাদিত্য, “না, স্যালাড কেন খাবে? আমি নুডুলস আর চিকেন বানিয়েছি তোমার জন্য।”

ঝিলাম অবাক সুরে জিজ্ঞেস করে, “কি! তুমি রান্না ঘরে ঢুকেছিলে? জিনিস পত্র পেলে খুঁজে?”

বুধাদিত্য, “হ্যাঁ খুঁজে নিলাম।”

ঝিলাম, “দাঁড়াও আমি এখুনি আসছি”

ঝিলাম হাত ধুয়ে কাপড় বদলে খাওয়ার ঘরে এসে দেখে যে টেবিলে মোমবাতি রাখা, একটা কাঁচের বড় বাটিতে সুগন্ধি গোলাপ জল আর তাঁর মাঝে কয়েকটা ছোটো ছোটো প্রদীপ জ্বালান। টেবিলে দুটি প্লেট সাজানো। টেবিলের মাঝে দুটি কাঁচের বাটিতে নুডুলস আর চিলি চিকেন রাখা। ঝিলামের দুই চোখ ছলছল করে ওঠে। বুধাদিত্য ঝিলামকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। ঝিলাম ওর হাতের ওপরে হাত রেখে নিজের শরীরের শক্ত করে বেঁধে নেয় ওই দুই কঠিন হাতের বন্ধন। মাথা পেছন দিকে হেলিয়ে ওর কাঁধের ওপরে রাখে, শক্ত করে ঠোঁট চেপে কঠিন চোয়ালের ওপরে। 

বুধাদিত্য ফিসফিস করে বলে, “মাঝে মাঝে প্রেমিকাকে একটু রেস্ট দিতে হয়, তাই ভাবলাম ডিনার আমি বানিয়ে রাখি।” 

ঝিলাম, “তুমি রান্না করেছ, ঝাল হোক, পোড়া হোক। তুমি যদি বিষ দাও তাও খাবো আমি।”

বুধাদিত্য, “ঝিল্লিরানি প্লিস ওই কথা বল না। অনেক কষ্টে কুড়িয়ে পাওয়া এই দ্বিতীয় জীবন।”

ঝিলাম ছলছল চোখে দুই হাত ওর চোখের সামনে মেলে ধরে বলে, “দেখ, মেহেন্দির রঙ কত গাড় হয়েছে, তাই না।”

বুধাদিত্য ওর গালে গাল ঘষে বলে, “ফর্সা হাতের ওপরে দারুন মানিয়েছে। শালা যে লোকটা ওই হাত ধরে এঁকেছিল তাঁর ওপরে হিংসে হচ্ছে।”

ঝিলাম আলতো কামড় দেয় বুধাদিত্যের গালে, “ধুত, তুমি না, সত্যি...”

বুধাদিত্য, “কিন্তু তুমি স্যালাড কেন খেতে চেয়েছিলে?”

ঝিলাম একটু আহত সুরে বলে, “আমি মোটা হয়ে যাচ্ছি, জানো আমার ওজন বেড়ে গেছে, ছাপ্পান কিলো হয়ে গেছে তোমার ঝিল্লিরানী।”

বুধাদিত্য ওকে দুই হাতের মধ্যে পিষে ধরে বলে, “না ঝিল্লি, কে বলেছে তুমি মোটা। তোমার ঠিক জায়গায় ঠিক ঠিক বেড়েছে, আমার সুবিধা হয়েছে একটু নরম নরম আদর করতে।”

ঝিলাম লাজুক হেসে বলে, “ইসসস... তুমি না... সবসময়ে উলটোপালটা ভাব। ছাড়ো এখন।” বুধাদিত্যের আলিঙ্গনের মাঝে ওর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, “খেতে দেবে না তোমার প্রেমিকাকে? আমার যে খিধেতে পেট জ্বলছে গো।”
Reply
#40
পঞ্চদশ পর্বঃ দ্বিতীয় অঙ্ক। (#2)





বুধাদিত্যের জীবনশৈলী আমুল বদলে দিয়েছে ঝিলাম, কড়া শাসন, রাত ন’টার মধ্যে রাতের খাওয়া সেরে ফেলতে হয়। ঝিলামকে সকাল সকাল উঠে স্কুল যেতে হয় তাই রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। শুধু মাত্র ছুটির দিন গুলতে সেই নিয়ম একটু শিথিল হয়। খাওয়া শেষে বুধাদিত্য সোফার ওপরে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে, আগামিকাল শনিবার, দুজনের ছুটি। বাইরে ঝড়ের তান্ডব বেড়ে যায়। বুধাদিত্যের হৃদয় আকুল হয়ে ওঠে প্রেয়সীকে ক্রোরে নিয়ে খেলার জন্য। ঝিলামের নুপুরের শব্দে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকায় ওর দিকে। পরনে একটা পাতলা মোলায়ম স্লিপ, সারা অঙ্গে মাদকতার ছন্দ তুলে ওর দিকে দুষ্টু মিষ্টি হেসে এগিয়ে আসে। চলনের তালে তালে দুই নিটোল ভারী নিতম্ব দোল খায়। স্লিপের নিচের অংশ বারেবারে জানুসন্ধি থেকে সরে গিয়ে দেখা দেয় পরনের গোলাপি ক্ষীণ প্যান্টি। নারীসুধার দ্বারে চেপে বসে অবয়াব ফুটে উঠেছে ওই পাতলা কাপড়ের ভেতর থেকে। দুই উরু যেন দুই মসৃণ স্ফটিকের থাম, বসার ঘরের মৃদু আলোতে চকচক করছে শরীরের ত্বক। ওর মুখের দিকে তাকাতেই ঝিলাম হেসে ফেলে। ঠোঁট দুটি অতীব গোলাপি আর মধুভরা। স্লিপের ভেতর থেকে দুই উন্নত বক্ষ সামনের দিকে ঠিকরে বেড়িয়ে এসেছে। ভেতরে কোন বখবন্ধনি পরেনি ঝিলাম, তাই দুই পীনোন্নত বক্ষের আবছা অবয়াব দেখা যায়। কোমল বক্ষের উপরে স্থিত দুই শক্ত বৃন্ত যেন দুটি ছোটো রসালো ফল, বুধদিত্যের চুম্বনের অধীর প্রতীক্ষায় ওর দিকে উন্মুখ হয়ে চেয়ে। 

ঝিলাম ওর পাশে বসে আলতো ঠেলে বলে, “এই একটু সর, আমি শোব।”

বুধাদিত্য দুই হাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরে প্রেয়সীকে। ঝিলাম ওর বুকের ওপরে মাথা রেখে বুধাদিত্যের শরীরের ওপরে শুয়ে পড়ে। দয়িতার হাত নিজের হাতের মুঠির মধ্যে নিয়ে ছোটো ছোটো চুমু খায় ঝিলাম। বুধাদিত্য বাম হাতে ঝিলামের পেটের ওপরে রেখে জড়িয়ে ধরে থাকে। বুধাদিত্যের হাতের চাপে কেঁপে উতে ঝিলাম ওর ডান হাত মুখের কাছে এনে আঙ্গুলে কামড় বসিয়ে দেয়। দুই হাতে আস্টেপিস্টে চেপে ধরে ঝিলামকে, সাপের মতন একেবেকে নড়ে ওঠে ঝিলাম, নিটোল নিতম্বের নিচে উঁচিয়ে ওঠে বুধাদিত্যের সুদীর্ঘ কঠিন সিংহ। বুধাদিত্যের হাত ছাড়িয়ে ওর বুকের ওপরে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে ঝিলাম। নড়ার ফলে নিতম্ব থেকে স্লিপ উপরে উঠে কোমর চলে আসে। বুধাদিত্য এক হাতে ঝিলামের পিঠ ধরে নিজের বুকের সাথে স্তনজোড়া চেপে দেয় অন্য হাতে নিতম্ব চেপে জানুসন্ধিতে নিজের কঠিন সিংহ স্পর্শ করিয়ে দেয়। সেই তপ্ত শলাকার স্পর্শে ঝিলাম অবশ হয়ে যায়। আবেগের বশে গলা চেপে ধরে বুধাদিত্যের আর নিজের উরু মেলে ধরে নারীসুধার দ্বারে চেপে ধরে বুধাদিত্যের কঠিন সিংহ। বিশাল টিভি স্ক্রিনে কোন এক মারদাঙ্গা ইংরাজি সিনেমা চলছে, সেদিকে বিশেষ কারুর মন নেই, দুজনে পরস্পরের আদরে সোহাগে, অনুরাগে তরী ভাসাতে ব্যাস্ত। 

ঝিলাম বুকের কাছে হাত ভাঁজ করে মাথা উঠিয়ে বুধাদিত্যের নাকের ডগায় আঙুল বুলিয়ে বলে, “বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে জানো।”

বুধাদিত্য, “হুম সেত অনেক ক্ষণ ধরে হচ্ছে।”

ঝিলাম, “তুমি আজ হটাত করে রান্না করতে গেলে?”

বুধাদিত্য, “তুমি হটাত করে সাজতে পার তাহলে আমি রান্না কেন করতে পারি না।”

ঝিলাম, “গাড়িতে তেল শেষ নাহলে ঘুরতে নিয়ে যেতে বলতাম। বেশ কোথাও ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দু’জনে বৃষ্টিতে ভিজতাম।”

বুধাদিত্য, “তারপরে তোমার জ্বর হত আর আমার অফিস মাঠে মারা যেত।”

ঝিলাম, “ধুর পাগল বৃষ্টিতে ভিজলেই কি জ্বর হয় নাকি? ছোটো বেলায় অনেক ভিজেছি, দুর্গাপুরে বর্ষা কালে খুব বৃষ্টি হয়।” 

ঠিক তখন ঝিলামের মোবাইল বেজে ওঠে, ভাটা পড়ে ওদের সোহাগের খেলায়। ওপাশে অনিন্দিতাদি, “কিরে তোরা কি ঘুমিয়ে পড়েছিস নাকি রে?”

ঝিলাম এক হাতে ফোন অন্য হাত বুধাদিত্যের হাত নিজের বুকের ওপরে টেনে ধরে বলে, “দিদিভাই, কেমন আছো তোমারা?”

অনিন্দিতাদি, “আমরা ভালো আছি। তোরা কি আমাদের একটু শান্তি দিবি।”

ঝিলাম অবাক, “কেন কি হল?”

অনিন্দিতাদি হেসে ফেলে, “তোদের ছেলে কি শেষ পর্যন্ত তোদের বিয়ে খেতে যাবে?”

ঝিলাম লজ্জায় পড়ে যায়। বাবা মা গত মাসে এসে ঘুরে গেছেন, দেখে গেছেন মেয়ের নতুন রুপ। একটু ইতস্তত করেছিলেন ঝিলামের বাবা মা, বুধাদিত্য আর ঝিলামের এখন বিয়ে হয়নি এবং একসাথে আছে, এদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলেন। ঝিলাম নিজের বাবা মাকে বলেছিল যে, লাল চেলি আর সিল্কের জোড়ের বাঁধন শুধু কাপড়ের গিঁট মাত্র। নিজের জীবন দিয়ে সেই গিঁটের সত্যতা বুঝেছে। দুই হৃদয়ে যদি গিঁট না পরে তাহলে কাপড়ের গিঁট বেঁধে কি লাভ? বুঝিয়ে বলেছিল বিয়ে করলেই যে ছেড়ে যাবে না আর বিয়ে না করলেই যে মানুষের ছাড়াছাড়ি হয়ে যেতে পারে, সেই সব অবান্তর ধারনা। যেখানে দুই হ্রদয়ের বন্ধন মজবুত হয় সেই সম্পর্কে বিয়ে হোক বা না হোক কিছু এসে যায় না। ওর বাবা মা, সমাজের একটু দোহাই দেন, ঝিলাম ওদের আসস্থ করে বলেছিল যে, সময় হলে ঠিক বিয়ে করে নেবে। ঝিলামের নতুন চাকরি আর দুই মাস আগে বুধাদিত্য ওর শরীর খারাপের সময় অনেক ছুটি নিয়েছিল, ছুটির ব্যাবস্থা করে একদিন সবাইকে ডেকে রেজিস্ট্রি সেরে নেবে। মেয়ের জীবনে আনন্দ আর হাসি মুখ দেখে বেশি কথা বাড়ায়নি ওর বাবা মা। 

ঝিলাম লজ্জায় পড়ে যায়, “না না সে রকম কিছু হবে না, চিন্তা নেই।”

অনিন্দিতাদি, “কেন রে ঝগড়া করেছিস নাকি তোরা?”

বুধাদিত্যের হাত দুটি ঝিলামের নিটোল নিতম্বের ওপরে খেলা করে, বুধাদিত্যের দিকে ঠোঁট কুঁচকে একটা চুমু খেয়ে অনিন্দিতাদিকে উত্তর দেয়, “বুধোর সাথে ঝগড়া’ত আমাদের দিনের একটা নিত্য কাজ, সে আবার নতুন কি।”

অনিন্দিতাদি, “বাপরে, প্রেমে মরে গেলাম। এবারে বিয়টা করে ফেল। ভাই কোথায়?”

বুধাদিত্য ঝিলামকে আদর করতে করতে বলে, “আমি এখানেই আছি, বল আমি সব শুনতে পাচ্ছি।”

অনিন্দিতাদি গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কোলে নিয়ে শুয়ে নাকি?”

ঝিলাম বুধাদিত্যের নাকের ওপরে নাক ঘষে বলে, “দিদিভাই, তুমি না, আবার শুরু করে দিলে।”

অনিন্দিতাদি, “আচ্ছা বাবা, এবারে বল কবে বিয়ে করছিস তোরা?”

ঝিলাম, “বিয়ে’ত শুধু একটা অনুষ্ঠান মাত্র, অত তাড়াহুড়ো করার কি আছে। সময় হলেই হয়ে যাবে, আর আমাদের অতশত কিছু করার নেই, শুধু দু’জনে একটা সই দেব ব্যাস, কয়েক ঘন্টার ব্যাপার। জানিয়ে দেব তোমাদের, চিন্তা নেই।”

অনিন্দিতাদি হেসে বলে, “তার মানে তোর ছেলে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে যে বাবার বিয়ে দেখেছি।”

বুধাদিত্য, “তোমার কি শুরু করেছ বলত।”

দেবস্মিতা, “বাপ্পা দাদার বিয়ে দেখতে চায়।”

ঝিলাম আর বুধাদিত্য দু’জনেই অবাক, অনিন্দিতাদির বাড়িতে দেবস্মিতা, ব্যাপার বুঝতে একটু কষ্ট হয়। অনিন্দিতাদি হেসে বলে, “কি রে চমকে গেলি নাকি? দেবস্মিতা আজ বিকেলে বাপ্পা আর পিসেমশায়কে নিয়ে বাড়িতে এসেছে। আমরা সবাই মায়ের বাড়িতে।”

ঝিলাম অবাক, “তোমার সবাই কি পন্ডিতিয়ায়? দাও দাও মাকে একটু ফোন দাও।” ঝিলাম প্রমীলা দেবীকে মা বলে ডাকে। 

প্রমীলা দেবী ফোন ধরেই ঝিলামকে জিজ্ঞেস করে, “তোর শরীর কেমন আছে রে? ঠিক মতন আয়রন ট্যাবলেট খাচ্ছিস তুই? গত সপ্তাহে ডাক্তারের কাছে যাবার কথা ছিল, গিয়েছিলি কি?”

ঝিলাম বেমালুম ভুলে গেছিল গায়নকলজিস্টের কথা, তাই জিব কেটে বলল, “না মা, একদম ভুলে গেছিলাম। প্লিস রাগ করোনা সোনা মা। আমি পরের সপ্তাহে দেখিয়ে নেব।”

প্রমীলাদেবী মৃদু বকুনি দিয়ে বলেন, “দে’ত ছোঁরা টাকে ফোন দে। তোকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যেতে পারল না? কি এমন কাজ করে দেখি।”

ঝিলাম প্রমীলা দেবীকে বলে, “না না, বুধোর দোষ নয়। ওকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।”

বুধাদিত্য অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “শোনো পমুডার্লিং তোমার আর ঝিল্লীর কথার মধ্যে আমাকে একদম জড়াবে না। ঝিল্লি আমাকে ডাক্তাররে ব্যাপারে কিছু বলে নি।”

ঝিলাম নাক কুঁচকে, বুধাদিত্যের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলে, “সরি বুধো।” তারপরে প্রমীলাদেবীকে জিজ্ঞেস করে, “কি ব্যাপার তোমরা বেশ মজা করছ তাই না।”

প্রমীলা দেবী, “জামাই ষষ্টির সময়ে সুব্রত বাইরে ছিল, আসতে পারে নি। সুবিরকে ও কোনদিন ডেকে খাওয়ান হয়নি। তাই ওদের সবাইকে একসাথে ডেকেছি। এমনিতে দেবস্মিতা খুব ব্যাস্ত থাকে, সময় নিয়ে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল এই আর কি।”

দেবস্মিতা, “না কি করে মজা করি বলত, তোমরা দু’জনে যে নেই।”

ঝিলাম, “তুমি বাপ্পাকে নিয়ে চলে এস এখানে।”

দেবস্মিতা, “আমার বুড়টাকে কে দেখবে, তুমি? যদি বলি সাইটে গাড়ি পাঠাও তাহলে আমার গাড়ি সাইটে পাঠিয়ে দেয় আর ওয়ার্কারদের ভ্যান পাঠায় আমাকে আনতে, এই ত আমার বুড়ো। ছেড়ে কি আর যেতে পারি, বল।”

বুধাদিত্য, “তোমরা সবাই একসাথে বসে কি জল্পনা করছ বলত?”

অনিন্দিতাদি, “তোদের এবারে বিয়েটা দিয়েই ছারব আমরা, তাঁর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বাড়ি বসে।”

প্রমীলাদেবী, “শোন রে, বুধি, ঝিলামের জন্মদিনের দুই দিন পড়ে একটা ভাল দিন আছে। ঠিক বিয়ের নয় তবে ভালো দিন, শুভ কাজ করা যায়। তোরা ত আর বিয়ের তারিখ মেনে বিয়ে করবি বলে মনে হয় না তাই ভাবলাম যে ওই দিনে যদি...”

ঝিলাম প্রমীলাদেবীর কথা টেনে নিয়ে বলে, “ঠিক আছে মা, তোমার এত ইচ্ছে তাহলে আমরা করেই নেব।”

দেবস্মিতা, “উফফফ হাঁফ ছেড়ে বাচলাম শেষ পর্যন্ত। তাড়াতাড়ি তাহলে সব শুরু করতে হয় আর ত মোটে দিন কুড়ি। বিয়ে কিন্তু ধানবাদ থেকে হবে।”

বুধাদিত্য ঝিলাম এক সুরে বলে ওঠে, “না, আমরা দিল্লীতেই বিয়ে করব। আর বিয়েতে শুধু বাড়ির লোক ছাড়া কেউ আসবে না।”

প্রমীলা দেবী আঁতকে ওঠেন, “মানে? দিল্লীতে হলে আমরা যাব কিকরে? তোর বাবা মা দাদারা দিদিরা কি করে যাবে? তুই নিয়ে যাবি?”

ঝিলাম ক্ষণিকের জন্য চিন্তায় পর যায়, অদের পরিবার অনেক বড়, দিল্লীতে নিয়ে আসা বেশ খরচ সাপেক্ষ। দেবস্মিতা হেসে বলে, “ঝিলাম এত চিন্তা করছ কেন? আমার বন্ধুর বিয়ে বলে কথা, বল’ত রাজধানি বুক করে দেব।”

ঝিলামের চোখ বন্ধ করে দেবীর মুখ স্মরন করে, একবারের জন্য দেখেছিল সেই সময়ে। ধরা গলায় বলে দেবস্মিতাকে, “তুমি সত্যি দেবী।”

দেবস্মিতা, “তাহলে তারিখ সেটাই থাকল, আমরা সবাইকে নিয়ে তোমার জন্মদিনের দিন পৌঁছে যাব দিল্লী। বেশ মজা হবে তোমার জন্মদিন আর দুই দিন পড়ে তোমার বিয়ে।”
Reply


Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)