Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

[-]
Tags
অঙ্ক dbitiyo দ্বিতীয় onko

Bangla দ্বিতীয় অঙ্ক | Dbitiyo Onko
Thread Description
adult bangla coti golpo
#21
নবম পর্বঃ প্রবাহিণীর পায়ের ছাপ। (#2)




বুধাদিত্য বলতে গিয়েও দুঃখের কথা বলতে পারেনা। ঝিলামকে হেসে বলে, “সমীরকে সারপ্রাইস দেবে কি খালি হাতে?”

ঝিলাম মিষ্টি হেসে বলে, “না না, যাওয়ার আগে ওর জন্য একটা বোকে কিনে নেব। অইত আসার সময় একটা জায়গায় দেখলাম একটা দোকান খোলা আছে।”

হেসে ফেলে বুধাদিত্য, “শীতকাল ডিয়ার, রাতে ফেরার সময়ে সেই দোকান খোলা পাবেনা।”

মুখ শুকিয়ে যায় ঝিলামের, “তাহলে কি হবে? আমি যে কিছুই কিনি নি।”

মনে মনে বলে, তুমি থাকতে আর ফুলের কি দরকার, নিজেই ত একটা ফুলের ডালি সাজিয়ে বসে। বাঁকা হাসি হেসে বলে, “তাহলে গাড়ি ঘুড়িয়ে নেই, বোকে কিনে আবার দেখা যাবে।”

খুশি হয়ে যায় ঝিলাম, “হ্যাঁ হ্যাঁ গাড়ি ঘুড়িয়ে নাও, আমি ওর জন্য বোকে কিনবোই, খালি হাতে সারপ্রাইস দিতে ঠিক মন মানছে না।”

বুধাদিত্য যেন চালক আর ঝিলাম কর্ত্রী। বুধাদিত্য গাড়ি ঘুড়িয়ে নেয়, দোকানের সামনে এসে ফুলের বোকে কিনে আবার উঠে পরে গাড়িতে। সবে দশ’টা আরও অনেক সময় আছে হাতে। হাতে বোকে, ঠোঁটে হাসি, ফুলের চেয়ে ওর ঠোঁট গুলি বেশি মিষ্টি দেখায়। বুধাদিত্য একবার ঝিলামের হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে আবার গাড়ি চালাতে শুরু করে দিল। 

ঝিলাম, “এবারে বেশি দুরে যেওনা, তাহলে কিন্তু ঠিক সময়ে ফিরতে পারব না।”

বুধাদিত্য, “জো হুকুম মালকিন, আপনার আদেশ শিরোধার্য।” হেসে ফেলে দু’জনেই।

ঝিলাম, “আমরা দু’জনে তোমাকে খুব জ্বালাতন করি তাই না?”

বুধাদিত্য হাসতে হাসতে উত্তর দেয়, “তা করো বইকি, খুব জ্বালাতন করো। ছোটোবেলায় হস্টেলে তেলু শালা জ্বালাতন করেছে, বিয়ের পরে ওর বউ জ্বালাতন করে মারছে।” 

ঝিলাম হেসে বলে, “না আর জ্বালাতন করব না তোমাকে। সত্যি বলছি, আমাকে নামিয়ে দাও এখানে তাহলে।”

বুধাদিত্য, “পাগল হলে? সমীর ছেড়ে দেবে আমাকে? গলা টিপে মেরে ফেলবে তাহলে।”

ঝিলাম, “ওর আগে আমি তোমাকে মেরে ফেলব।”

বুধাদিত্য একবার ভাবে, খুব বাধে গো খুব বাধে, বেশি করে বাধে। হেসে বলে, “তুমি বললে আর আমি নামিয়ে দেব, ভাবলে কি করে? এত সুন্দর করে রান্না করে রেখে গেলে, তারপরেও স্বার্থপরের মতন তোমাকে ছেড়ে দেব, হতেই পারে না।”

ঝিলাম ঘড়ি দেখে, গল্প করতে করতে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। বুধাদিত্যের দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখ করে বলে, “বুধাদিত্য, আমার মনে হয় এবারে আমাদের এয়ারপোর্টের দিকে যাওয়া উচিত। এগারোটা বাজতে যায়।” ফুলের তোড়া’টা নাকের কাছে আনে গোলাপ আর অন্য ফুল মেশানো, ঘ্রান টেনে নেয় ঝিলাম। “উম্মম, জানো খুব ভালো লাগছে। পরের মাসের দশ তারিখের মধ্যে জীবনের প্রথম মাইনে পাবো। সবটা দুহাতে খরচ করে দেব।” গলার স্বর বেশ উৎফুল্ল, “সমুর জন্য একটা কালো চামড়ার জ্যাকেট কিনব, তোমার জন্য কিছু কিনব, বাড়ির সবার জন্য কিনব।” 

বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে, “নিজের জন্য কিছু কিনবে না?”

ঝিলাম মাথা নাড়ায়, “না, প্রথম মাইনে দিয়ে আমি কি কিনব? যা কেনার সমু কিনে দেবে আমাকে।”

এয়ারপোর্ট এসে যায়, ঘড়িতে এগারোটা বাজে। সামনের বড় এল.সি.ডি তে লক্ষ্য করল যে বম্বের ফ্লাইট ল্যান্ড করে গেছে একটু আগে। ঝিলাম সমীরকে ফোন করে জানল যে কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে যাবে। ঝিলামের চোখে মুখে উত্তেজনা ফেটে পড়ছে, সমীরকে জানায় নি যে ওর জন্য এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছে ঝিলাম। উৎকণ্ঠায় বারেবারে ঘড়ি দেখে, মনের মধ্যে উশখুস ভাব। বুধাদিত্যকে বারেবারে জিজ্ঞেস করে, এত দেরি কেন? বুধাদিত্য বুঝিয়ে হাল ছেড়ে দেয়। 

কিছুপরে সমীর গেট থেকে বেড়িয়ে আসে। ঝিলাম ওকে দেখে প্রায় দৌড় লাগিয়ে হাত ধরে ফেলে। সমীর ঝিলামকে দেখে ভুত দেখার মতন চমকে ওঠে। বুধাদিত্য কিছু দুরেই দাঁড়িয়ে ছিল, ওদের প্রগাড় আলিঙ্গন দেখে বুকের ভেতর একটু চিনচিন করে ওঠে। ক্ষণিকের জন্য ওদের ভালোবাসা দেখে হিংসে হয় বুধাদিত্যের। কাউকে ভালোবাসা হয়ত ওর কপালে আর নেই। সমীর ঝিলামকে একহাতে জড়িয়ে ধরে, তারপরে কিছু দুরে দাঁড়িয়ে থাকা বুধাদিত্যের দিকে চোখ যায়। সমীরের চোখে একটু যেন ধরাপরে যাওয়ার একটা ভীতি লুকিয়ে আছে, সেটা বুধাদিত্যের চোখ এড়াতে পারেনা। বুধাদিত্যের সন্দেহ চেতন মন কিছুর একটা গন্ধ পায়।

সমীর মিচকি হেসে বলে বুধাদিত্যকে, “কিরে, আমার বউ তোকে খুব জ্বালাচ্ছে, তাই না?”

বুধাদিত্য হেসে ফেলে, “সেই বিকেল থেকে মাথা খেয়ে রখেছে, কখন আসবে কখন আসবে।” ঝিলামের দিকে তাকিয়ে বলে, “এবারে শান্তি, এসে গেছে তোমার প্রানে বাতাস ঢালতে।”

ঝিলাম লাজুক চোখে সমীরের দিকে তাকিয়ে শিশুসুলভ গলায় আব্দার করে, “কিছু এনেছে আমার জন্যে?”

সমীর ওর কাঁধে হাত দিয়ে টেনে বলে, “নিশ্চয় ডার্লিঙ, সেটা কি করে ভুলে যাই।”

ঝিলাম উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কি এনেছ?” 

গোলাপি নরম গালে আলতো করে নাক ঘষে বলে, “বম্বে থেকে একটা জুয়েলারি সেট।”

আনন্দে ঝিলাম ওর বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে বলে, “সত্যি আমার কথা মনে ছিল তাহলে?”

সমীর উত্তর দেয়, “হ্যাঁ মনে ছিল।” স্ত্রীকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় সমীরের চোখ একদিক ওদিক ঘোরাফেরা করতে থাকে, মনে হয় কাউকে যেন খুঁজছে এই ভিড়ে। 

বুকের কাছে জড়িয়ে থাকা ঝিলাম সমীরের চোখ দেখে জিজ্ঞেস করে, “কি হল, কাউকে খুঁজছ নাকি?”

সমীর, “কই না ত। না না, আমি এমনি দেখছিলাম এদিক ওদিক। চল বাড়ি চল, অনেক রাত হয়ে গেছে আর ঠাণ্ডা টাও বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে।” বুধাদিত্যের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কাল তোর ছুটি না অফিস যেতে হবে?”

বুধাদিত্য হেসে ফেলে, সেই প্রথম রাতের কথা মনে পরে যায়, না আর নয়, এই একবার যা ঘটে গেছিল আবার যদি পেছল খায় তাহলে আবার সেই প্রেমকেলি রত স্বামী স্ত্রীর খেলা দেখতে হবে। কান লাল হয়ে যায় বুধাদিত্যের, চাপা হেসে বলে, “কাল ছুটি, তবে আমি তোদের বাড়ি নামিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে যাব।”

ওরা তিনজনে মিলে গাড়ি পারকিঙ্গের দিকে হাঁটতে শুরু করে দেয়। সমীরের হাত জড়িয়ে ঝিলাম আগে আগে হেঁটে যায়, বুধাদিত্য ওদের পেছন পেছন হাঁটে। বুধাদিত্য লক্ষ্য করে বেশ কিছু দুরে এক মহিলা দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। দুরে দাঁড়ান সেই মেয়েটাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বুধাদিত্য, মনে করতে চেষ্টা করে, ওকে কি আগে কোথাও দেখেছে? না দেখেনি। পারকিঙ্গে ঢোকার মুখে সমীর পেছন দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে আলতো করে মাথা দোলায়। দুরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা প্রত্যুত্তরে আলতো করে মাথা দোলায়। চোয়াল শক্ত হয়ে যায় বুধাদিত্যের, মনের কোনে এতক্ষণ যে সন্দেহের মেঘ জমে এসেছিল সেটা সুনিশ্চিত হয়ে যায়। ঝিলামকে নিয়ে সমীর গাড়িতে উঠে পরে। বুধাদিত্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দুরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার নিরীক্ষণের দৃষ্টিতে ছবি এঁকে নেয়। এখন নয়, পরে সময় হলে জিজ্ঞেস করবে এই ব্যাপারে। ঝিলামকে দেখে খুব কষ্ট হয়, বুকে কত আশা বেঁধে স্বামীর হাত ধরে পেছনের সিটে বসে, আর এই ছেলে শেষে কিনা অন্য কারুর সাথে? জানে সমীরের উত্তর, মিথ্যে কথা বলে দেবে সোজা। 

ওদের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে বুধাদিত্য বাড়ি ফিরে যায়। সমীর আর ঝিলাম বারবার বলে রাতে থেকে যেতে, কিন্তু হেসে ফেলে বুধাদিত্য, চোখ টিপে ঝিলামের দিকে তাকায়। ঝিলাম বুঝে যায় বুধাদিত্যের চোখের ইঙ্গিত, সেই প্রথম দিনের কথা। আকর্ষণীয় কমনীয় যৌবনের ডালি নিয়ে সেই রাতে ভিজে স্লিপ পরে বাথরুম থেকে বেড়িয়ে বুধাদিত্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ঝিলাম লজ্জায় লাল হয়ে যায়, মুখ ঘুড়িয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। বুধাদিত্য চলে আসে ওদের ছেড়ে।

একদিন বিকেল বেলা, বুধাদিত্য চুপ করে বসে টিভি দেখছিল, এমন সময়ে কলিং বেল বাজে। ঠাণ্ডা কমে এসেছে, ছুটির দিন, কোন কাজ নেই। আজকাল আর বারে বসে মদ গেলা হয় না, কোন নারীসঙ্গে আর মন নেই। দরজা খুলে দেখে ঝিলাম দাঁড়িয়ে হাতে বেশ কয়েকটা শপিং ব্যাগ। ধবধবে সাদা জিন্স আর গাড় নীল রঙের টপে দারুন দেখাচ্ছে ঝিলামকে। পেছনে দাঁড়িয়ে সমীরের, তাঁর হাতেও বেশ কয়েকটা শপিঙ্গের ব্যাগ। বুধাদিত্য বুঝে যায় যে ফেব্রুয়ারির দশ তারিখে ঝিলাম প্রথম বেতন পেয়েছে আর সেই খুশিতে সারা বাজার কিনে ওর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। সমীর মুখ কাচুমাচু করে পেছনে দাঁড়িয়ে। 

হেসে ফেলে বুধাদিত্য, “শালা এতদিনে পরে তোকে দেখে মনে হচ্ছে কলুর বলদ। আয় আয় ভেতরে আয়।”

ঝিলাম ভেতরে ঢুকেই ওর হাতে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দেয়, বলে, “এক বার খুলে দেখত পছন্দ হয়েছে কিনা? তোমার চয়েস ত আবার অনেক বড় বড়, জানি না বাবা মনে খুব খুত খুত ছিল কেনার সময়ে।”

বুধাদিত্য সমীর আর ঝিলামকে বলে, “শালা এই সব করতে গেলি কেন?”

সমীর, “অনেক হয়েছে, অনেক দেখিয়েছিস তুই। জানি শালা তুই অনেক বড়লোক এবারে একবার খুলে দেখ, পছন্দ কিনা। সারা বাজার আমার মাথা খেয়ে ফেলল এই নিয়ে।”

ব্যাগ খুলে দেখে একটা ছাই রঙের দামী সুটের পিস। মাথায় হাত বুধাদিত্যের, আলমারিতে প্রায় গোটা দশ বারো সুট আছে, তারপরে আবার। সমীর হেসে জিজ্ঞেস করে পছন্দ কিনা? বুধাদিত্য ঝিলামের দিকে তাকিয়ে জানায় যে উপহার খুব পছন্দ হয়েছে, ঝিলামের মুখ দেখে কি আর না বলা যায়। সমীর জানায় যে ঝিলাম সব পয়সা শপিং করে শেষ করে দিয়েছে। ওর জন্য একটা সুট পিস কিনেছে। বাড়ির সবার জন্য জামা কাপড় বা কোন না কোন উপহার কেনা হয়েছে। সমীর বলে যে বুধাদিত্যকে পুজোতেও কিছু দেওয়া হয়নি তাই ওর সুট ঝিলাম কিনেছে। দুই বন্ধু মিলে বসে গল্প করে, ঝিলাম রান্না ঘরে ঢুকে ওদের জন্য কফি বানিয়ে আনে। বুধাদিত্যের ফাঁকা বাড়ি ঝিলামের হাসির কল্লোলে ভরে ওঠে। 

কফি খেতে খেতে ঝিলাম সমীরকে বলে, “যাও ত বাজারে একটু মাংস নিয়ে এস, রান্না করে রেখে যাই ওর জন্য।”

সমীর বুধাদিত্যকে বলে, “আরে শোন, আজ রাতে আমার বাড়ি চল।”

ঝিলাম কপট রাগ দেখিয়ে বলে, “ওকে বলে লাভ নেই, ও যাবেনা আমাদের বাড়ি।” একটু ঠেস দিয়ে কাষ্ঠ হেসে বলে, “একাএকা ঘুরে বেড়াবে, একা একা সব করবে, থাকুক একা। তুমি যাও।”

বুধাদিত্য ঝিলামের সাথে পেরে ওঠে না। সমীর ওর কথায় সায় দেয়, কিছুপরে দুই বন্ধু মিলে বাজারে বেড়িয়ে যায়। বুধাদিত্য একবার ভাবে যে এয়ারপোর্টে দাঁড়ান সেই মেয়েটার কথা একবার জিজ্ঞেস করে, বিকেলের কথা ভেবে আর জিজ্ঞেস করেনা, এই সুন্দর বিকেল মাটি করে দিতে মন করেনা। 

বুধাদিত্য সমীরকে বলে, “হুম শালা বেশ আনন্দে আছিস, কি বল। তা এত খরচ করতে গেলি কেন?”

সমীর, “নারে বাবা, খরচা আর কি। তুই শালা এত করিস, আর এইটুকু আমরা করব না? জানি বাবা জানি তুই শালা অনেক বড়লোক, আমাদের দুজনের মাইনে মিলিয়ে হয়ত তোকে ছুঁতে পারব না।”

বুধাদিত্য হাল্কা হেসে বলে, “ছাড় ওই সব কথা, আছিস কেমন তাই বল?”

সমীর, “ভালো আছি, একদম মস্ত। আজকাল একটু কাজের চাপ বেড়ে গেছে। মাঝে মাঝেই বাইরে যেতে হয়, তবে ঝিলামের জন্য রাতে থাকিনা, সেদিনেই ফিরে আসি। তবে এবারে ভাবছি, একটু কাজে মন লাগাতে, ঝিলামের চাকরি হয়ে গেছে, এবারে ও শান্ত হয়ে যাবে। এবারে একটু কাজের দিকে মন দিতে হবে।”

বুধাদিত্যের একবার বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, কাজের দিকে না অকাজের দিকে? চেপে যায় সেই প্রশ্ন। মাংস কিনে বাড়ি ফিরে আসে। ওদের গল্প চলাকালীন ঝিলাম রান্না সেরে ফেলে। অনেকক্ষণ এইসেই, কাজের গল্প, অকাজের গল্প করে খাওয়াদাওয়া সেরে ঝিলাম আর সমীর বারি ফিরে যায়। যাওয়ার সময়ে বুধাদিত্য করুন চোখে ঝিলামের দিকে তাকিয়ে থাকে, মনে হল যেন ঘর ফাঁকা করে কেউ চলে গেল। সেই করুন চোখের চাহনি, ঝিলামের চোখে পরেনা। ঝিলাম বেশ খুশি, সমীর অনেক দিন পরে ওর সাথে শপিং করতে বেড়িয়েছে, জীবনের প্রথম মাইনে পেয়ে সবার জন্য জিনিস কিনেছে। 
Reply
#22
নবম পর্বঃ প্রবাহিণীর পায়ের ছাপ। (#3)





সারা অফিস মাতামাতি একটা বেশ বড় প্রজেক্ট নিয়ে। পরে মাসে হয়ত আবার একটা ট্রিপ আছে। সারা অফিস মাতামাতি একটা বেশ বড় প্রজেক্ট নিয়ে। এবারে হয়ত সিডনি না হয় মেলবোর্ন যেতে হবে। টেকনিকাল কিছু প্রেসেন্টেসান দেবার আছে, সাথে সি.ই.ও বিশ্বনাথ আহুজা, সি.টি.ও অরুন ঠাকুর এবং আরও কিছু মার্কেটিঙের লোক যাবে। অফিসে বেশ ব্যাস্তই থাকে, তবে দুপুরের দিকে নিজেকে কয়েক ঘন্টার জন্য খালি রাখে, কখন প্রিয় বান্ধবী, ঝিলামের ডাক পরে ঠিক নেই। একবার ভেবেছিল একটা ড্রাইভার রাখবে, কিন্তু দুপুরে ঝিলামকে বাড়ি পৌঁছে দেবার আনন্দ হারাতে চায় না বুধাদিত্য। ঝিলাম মাঝে মাঝেই হানা দেয় বুধাদিত্যের অফিসে। অগত্যা বুধাদিত্যকে কিছু সময়ের জন্য অফিস ছেড়ে বেড়িয়ে ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হয়। বাড়ির পথে ওর সারাদিনের স্কুলের গল্প শুনতে হয়, চুপ করে শুনে যায়, মাঝে মধ্যে কিছু মন্তব্য করে। কোন কোন সময় কোন স্কুলের কোন লোক ওর দিকে তাকাল, কেমন ভাবে তাকাল সেইসব কথা হয়। দুজনে সেই সব কথা শুনে বেশ হাসি ঠাট্টা করে।

একদিন সমীর কে ফোন করে দেখা করতে বলে বুধাদিত্য, জানতে চায় যে এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মহিলা কে। বুধাদিত্য জানত সমীরের উত্তর, তাও জিজ্ঞেস করে। সমীর অকাট মিথ্যের প্রশ্রয় নিয়ে জানিয়ে দেয় যে কেউ ওর জন্য এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে ছিল না। সমীর হেসে জানিয়ে দেয় যে অন্য কোন নারীর প্রতি ওর কোন টান নেই, ওর বুকের মাঝে শুধু মাত্র ঝিলামের ছবি আঁকা। বুধাদিত্য সমীরের ফাঁকা হাসি বুঝতে পেরে যায়। সমীরের সাথে বাকবিতন্ডে যায় না বুধাদিত্য, একটু খানি সাবধান করে মাত্র, বলে যে, মদে আর নারীসঙ্গে যেন নিজেকে ডুবিয়ে না দেয়।

মার্চের শেষের সপ্তাহ, ঠাণ্ডা চলে গেছে দিল্লীর আকাশ থেকে। হোলি পেরিয়ে গেছে। বাতাসে বেশ একটা গরম ভাব এসে গেছে। বুধাদিত্যের জন্মদিন। প্রতিবছরের মতন সাতসকালে বুবাইয়ের ফোন আসে, মামাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়। তারপরে অনিন্দিতাদি ফোন ধরে শুভেচ্ছা জানায়। মামিমা, প্রমীলা দেবী একটু দেরি করেই ফোন করেন প্রতিবারের মতন। ওর জীবনের বাধা ধরা নিয়ম। মামা, মামি, বুবাই আর অনিন্দিতাদি ছাড়া আরও একজন ওকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাত, আয়েশা, কিন্তু দেশ ছেড়ে, বুধাদিত্যকে ছেড়ে চলে গেছে। এমন সময়ে ফোন বেজে ওঠে, বুধাদিত্য বেশ খুশি হয়, নিশ্চয় আয়েশার ফোন। ফোন তুলেই থমকে যায় বুধাদিত্য, ওপর পাশে এক নারী কণ্ঠস্বর, সেই স্বর ঝিলামের নয়, সেই স্বর আয়েশার নয়। কণ্ঠস্বর মিস্টার সুবির গুহ’র দ্বিতীয় ভার্যা, দেবস্মিতার। ক্ষণিকের জন্য চোখ বন্ধ করে বুকের মাঝে ছলকে ওঠা উত্তপ্ত রক্ত সামলে নেয় বুধাদিত্য।

দেবস্মিতা, “মেনি মেনি হ্যাপি রিটারন্স অফ দা ডে; হ্যাপি বার্থডে, শরীর কেমন আছে? সব ঠিকঠাক?” সেই পুরানো, ভাববাচ্যে কথা। দু’জনেই দু’জনকে কি’ভাবে সম্বোধন করবে সেটা ঠিক করতে পারে না। কণ্ঠস্বরে মধুঢালা তাও যেন কানের কাছে বড় বাজে। বুধাদিত্যকে চুপ থাকতে দেখে দেবস্মিতা হেসে বলেন, “কি হল? কথা বলা মানা, আমাদের সাথে? মিস্টার গুহ কথা বলতে চান।”

বুধাদিত্য চিবিয়ে উত্তর দেয়, “ঠিক আছে।”

সুবিরবাবু ফোন ধরে বলেন, “কেমন আছো?”

সুবিরবাবুর গলার আওয়াজে পুরো দিনটা মাটি হয়ে গেল বলে মনে হল বুধাদিত্যের। চিবিয়ে উত্তর দেয়, “ভালো আছি, খারাপ থাকার ত প্রশ্ন ওঠে না। এতদিন পরেও যে মনে রেখেছ এই বড় কথা।” বিশেষ কথা বাড়াবার ইচ্ছে ছিলনা বুধাদিত্যের। কিন্তু একটা শিশুর গলার আওয়াজ পাচ্ছিল পেছন থেকে, বায়না ধরেছে কথা বলবে। দেবস্মিতার গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, বারন করে চলেছে বাপ্পাদিত্যকে, কিন্তু সেই ছোটো বাচ্চা শুনতে নারাজ, এই কেঁদে ফেলে প্রায়। বুঝে গেল বুধাদিত্য যে, বাপ্পাদিত্য কথা বলতে চায়। বুধাদিত্যের মন একটু নরম হয়ে গেল সেই কাঁদো কাঁদো গলার আওয়াজ শুনে, সুবিরবাবুকে বলে, “বাপ্পাদিত্যকে ফোন দাও, কি বলছে একটু শুনি।”

হেসে ফেলেন সুবিরবাবু। বাপ্পাদিত্য ফোন ধরেই চেঁচিয়ে ওঠে, “তুমি কে? তোমার নাম কি? আমাকে মা জানো একটা প্লেন কিনে দিয়েছে কালকে। আমি না পরে গেছি, পায়ে খুব ব্যাথা তাই আজকে আর স্কুল যাইনি।”

সেই শিশুর মিষ্টি গলা শুনে বুধাধিত্যের মন গলে যায়, হেসে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় পরে গেছ? কোথায় লেগেছে?”

বাপ্পাদিত্য, “বাগানে খেলছিলাম, আর না, ধুপ করে পরে গেছি। আচ্ছা আমি আসছি, বাই।” বলেই ফোন সুবিরবাবুকে ধরিয়ে দেয়।

বুধাদিত্য কিছু বলার আগেই সুবিরবাবু ওকে বলেন, “ভালো থেকো, আর কি বলব।”

বুধাদিত্য, “তোমরা ভালো থেক।” ফোন রেখে দেয়। চুপ করে মায়ের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বাঁধানো কাঁচের ভেতর থেকে মঞ্জুষাদেবী মিটিমিটি হেসে বুধাদিত্যকে তিরিশ বসন্তের শুভেচ্ছা জানায়। 

অফিসে দিন মোটামুটি কেটে যায়, অনেকের শুভেচ্ছা, বিশেষ করে যারা নিচে কাজ করে তাদের একটু তেল মারার স্বভাব বেশি থাকে। লাঞ্চের পরে আশা করে বসে থাকে ঝিলামের হয়ত ফোন আসবে কিম্বা হয়ত নিজেই এসে উপস্থিত হবে বাড়ি পৌঁছে দেবার বায়না ধরবে। লাঞ্চ পেরিয়ে যাবার পরেও ঝিলামের ফোন আসেনা। একবার ভাবে নিজেই ফোন করবে, কিন্তু ফোন করতে গিয়েও মন খুতখুত করে ওঠে, ঠিক যেন সাহস জুগিয়ে পায়না। এমনি দিনে যদি কাজ থাকত তাহলে ফোন করে দিতে দ্বিধা বোধ করত না। এই যেমন সপ্তাহ দুই আগে, সি.এম.ও’র ফেয়ারওয়েল পার্টির জন্য ঝিলামকে জিজ্ঞেস করেছিল যে কি দেওয়া যায়। ঝিলাম ওকে বুদ্ধি দিয়েছিল যে চাঁদা তুলে একটা দামী হাতঘড়ি দিতে। তাই করেছিল বুধাদিত্য, অফিসের সবাই সেই বুদ্ধিতে মত দিয়েছিল। কারুর একজনার পকেট থেকে বেশি টাকা খসেনি, উপরন্তু একটা ভালো উপহার কিনে দিতে পেরেছিল ওরা সবাই। বুধাদিত্য রাতের বেলা অবশ্য ঝিলামকে ফোন করে সেই বুদ্ধি দেবার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছিল। ঝিলাম হেসে বলেছিল, মাঝে মাঝে একটু যেন ওর কথা শোনে। লাঞ্চ পেরিয়ে বিকেল হয়ে যায়, অফিস ছুটিও হয়ে যায়। মনের কোনে ক্ষীণ এক ব্যাথা নিয়ে বাড়ি ফেরে বুধাদিত্য। বাড়ি ফিরে নিজের মনেই হেসে ফেলে, ওর জন্মদিন নিয়ে, ঝিলাম বা সমীরের সাথে কোনদিন কোন কথা হয়নি, সুতরাং ওদের জানার কোন প্রশ্ন ওঠে না। জামা কাপড় খুলে যথারীতি, কফি বানিয়ে চুপ করে ল্যাপটপ খুলে মেইল দেখে। মিয়ুসিক সিস্টেমে মান্না দের গান, তার সাথে কোল্ড ড্রিঙ্কস আর সিগারেট। এমন সময় দরজায় দুমদুম শব্দ। চমকে ওঠে বুধাদিত্য। দরজা খুলে দেখে সমীর আর ঝিলাম।

সমীর হাতে একটা বড় প্যাকেট, একটা ফুলের তোড়া। ঝিলাম পেছনে দাঁড়িয়ে লাজুক হাসে। সমীর এক লাথি মেরে ওকে দরজা থেকে সরিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকে পরে। 

সমীর, “বোকা... আজকের দিনে জন্মেছিস শালা পার্টি কি না তোর দেবার কথা আর দিচ্ছি বাড়া আমরা। নে শালা কেক কাট।”

অবাক হয়ে যায় বুধাদিত্য, ঠিক কি হচ্ছে বুঝে উঠতে পারে না। ঝিলামের দিকে তাকায়। ঝিলাম জানায় যে অনির্বাণ নাকি সমীরকে দুপুর বেলা ফোন করেছিল, ওর কাছ থেকে জানতে পারে জন্মদিনের কথা। কিন্তু তারিখ ঠিক মনে ছিল না অনির্বাণের। সমীর বাড়ি ফিরে ওর পুরানো ডায়রি ঘেঁটেঘুটে ঠিক তারিখ উদ্ধার করে। 

বুধাদিত্য, “শালা শত্রুর জন্মদিন কি লিখে রেখেছিলি ডায়রি তে?”

সমীর, “না শালা, শত্রু বা বন্ধু নয়, আমার একটা ডায়রিতে স্কুলের সবার জন্মদিনের তারিখ লেখা আছে রে। নে কুত্তা, এবারে কেক কাট, দেখি। তোর জন্য স্পেশাল অর্ডার দিয়ে কেক বানিয়ে এনেছি।”

বুধাদিত্য, “তোরা পাগল নাকি যে এখন আমি কেক কাটবো? বুড়ো হতে চললাম, শালা।”

ঝিলাম, “হ্যাঁ হয়েছে, তুই তিরিশে বুড়ো। বোকা... দেখ গিয়ে বিদেশে, শালা পঞ্চাস বছরে লোকে বিয়ে করে বাচ্চা পারছে।”

কথাটা খুব গায়ে লাগে বুধাদিত্যের, নিজের বাবা, সুবির গুহ, মনে হয় পঞ্চাসে গিয়ে দ্বিতীয় বার পিতা হয়েছেন। তবে সঠিক জানেনা, আদৌ বাপ্পাদিত্য কার ঔরসজাত, ওর বাবার না অন্য কারুর? 

বুধাদিত্য মিচকি হেসে বলে, “ঠিক আছে বাবা, কেক কাটলাম তারপরে?”

ঝিলাম “তাঁর আর পর নেই, নেই কোন ঠিকানা। জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে বের হও, বেশি দুরে নয়, ওই ইস্ট অফ কৈলাসেই একটা ভাল রেস্টুরেন্ট আছে সেখানে খাওয়াবে চল।” 

বুধাদিত্য, “সেখানে কেন? আরও ভালো জায়গা আছে। বল ত পান্ডারা রোড নিয়ে যেতে পারি।”

সমীর, “চল শালা যেখানে নিয়ে যাবি সেখানে যাব, তবে তোর পকেট মারব আজকে।”

হেসে ফেলে বুধাদিত্য, ঝিলামের হাসির জন্য, পকেট কেন বুকের পাঁজর খুলে দিতে বললে খুলে দেবে। কিছুক্ষণের মধ্যে বেড়িয়ে পরে। পান্ডারা রোডের একটা নামি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার সারে। খাবার সময়ে সমীর আর বুধাদিত্য সেই পুরানো দিনের স্কুলের কথা নিয়ে আবার শুরু হয়ে যায়। ঝিলাম অগত্যা বসে থাকে মাঝে মাঝে ওদের সেই কীর্তি কলাপ শুনে হাসে আর মন্তব্য করে। খাওয়া শেষ সমীরদের বাড়ি পৌঁছে দেয়। গাড়ি থেকে নামার পরে সমীর ঝিলামের দিকে একটু তাকিয়ে কিছু ইঙ্গিত করে। ঝিলাম একটা ছোটো বাটি বের করে ওর কাঁধের ব্যাগ থেকে। বুধাদিত্য ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। 

সমীর বুধাদিত্যের হাতে সেই বাটি ধরিয়ে দিয়ে বলে, “একটু পায়েস খাস ঝিলাম বানিয়েছে তোর জন্য। তুই ত বেশ বড়লোক মানুষ। পায়েস খাবি কি খাবি না, তাই দিতে একটু কেমন লাগছিল।” বুধাদিত্য ঝাপসা চোখে সমীর আর ঝিলামের দিকে তাকায়। সমীর ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “হ্যাঁ রে, কি হল? মাসিমার কথা মনে পরে গেল? ঝিলাম বলল পায়েসের কথা, না হলে আমার মনেও আসত না।”

বুধাদিত্য দুহাত বাড়িয়ে দু’জনকে জড়িয়ে ধরে বুকের কাছে। ধরা গলায় বলে, “শালা, বন্ধুতের মধ্যে কি বড়লোক, কি গরিব লোক রে?”

ওর কথা শুনে ঝিলামের চোখে একটু জল চলে আসে। একটু হাসি, একটু কাঁপা গলায় বলে, “সমু মাসিমার কথা বলল তাই আমার পায়েসের কথা মনে পরে গেল। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে পায়েস বানিয়েছিলাম, খেয়ে দেখ।”

ভীষণ খুশি মনে বুধাদিত্য সেই পায়েসের বাটি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। সারারাত ঘুমাতে পারেনা বুধাদিত্য, শুধু মায়ের কথা খুব মনে পরে। হস্টেলে থাকার সময় প্রতি বছরে মা ওর জন্য পায়েস বানিয়ে নিয়ে যেত, আর সেই পায়েস ওর ক্লাসের সবাই খেত। সারারাত পায়েসের বাটি হাতে করে মায়ের ছবির সামনে বসে থাকে। সকালে কাজের লোক এসেছিল, কাজ করে গেছে, রান্না করে গেছে। তারপরে আবার ঘুমিয়ে পরে বুধদিত্য। যথারীতি পরেরদিন দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। 

ঠিক দুপুর আড়াইটে নাগাদ ঝিলামের ফোন, অপাশ থেকে চেঁচানি, “তুমি কোথায়? আমি তোমার অফিসে এসে শুনলাম তুমি অফিসে আসোনি। কি হয়েছে?”

বুধাদিত্য ঘুমচোখে উত্তর দেয়, “চেঁচাচ্ছ কেন, আমি কানে কালা নাকি? ঘুমাচ্ছিলাম আমি, এই উঠলাম।”

ঝিলাম, “কেন শরীর খারাপ নাকি? আমি এখুনি আসছি।”

বুধাদিত্য মজা করে বলে, “না মানে তোমার পায়েস খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কিছু মিশিয়ে দিয়েছিলে নাকি পায়েসের মধ্যে?”

ঝিলাম, “ধ্যাত, সত্যি বল, শরীর খারাপ?”

বুধাদিত্য, “না আমার শরীর খারাপ হতে যাবে কোন দুঃখে? আমি ভাল আছি, আসল কথা কাল রাতে ঠিক ঘুম আসেনি তাই দেরি ওরে উঠেছি।”

ঝিলাম একটু নিচু গলায় বলে, “আমি জানি কেন তোমার কাল রাতে ঘুম হয়নি। মাসিমার কথা খুব মনে পড়ছিল তাই না?” বুধাদিত্য চুপ করে থাকে, সত্যি কাল রাতে মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল। অন্যদিন হলে হয়ত নিজেকে মদে ডুবিয়ে নিত আর এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ত। কিন্তু মদ ছেড়ে দিয়েছে তাই ব্যাথায় আর ঘুম আসেনি, চোখ বন্ধ করলেই মায়ের মুখ সামনে চলে আসে। ঝিলাম অনুধাবন করে বুধাদিত্যের মনের অবস্থা, বুঝে যায় যে বড় ব্যাথার জায়গায় ঘা দিয়েছে, হয়ত নাড়া দেওয়া ঠিক হয়নি। একটু ক্ষমার সুরে বলে, “প্লিস উলটো পাল্টা কিছু করো না, ভালো থেক। পরে দেখা হবে।” 

ঝিলামের পায়ের ছাপ সোজা বুধাদিত্যের বুকের ওপরে এসে পরে। ঝিলাম আর বুধাদিত্যের মাঝে এক প্রগাড় বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে ওঠে। 
Reply
#23
দশম পর্বঃ নোনাধরা প্রাচীর। (#1)





এপ্রিলের মাঝামাঝি বুধাদিত্য দুই সপ্তাহের জন্য অস্ট্রেলিয়া যায় অফিসের কাজে। সমীর ঝিলাম দুজনেই ওকে এয়ারপোর্টে ছাড়তে গিয়েছিল। সেই নিয়ে বুধাদিত্যের কি হাসি, বলে ওকি অগস্ত্য যাত্রা করছে নাকি যে একেবারে দল বেধে ছাড়তে এসেছে। অগস্ত্য যাত্রার কথা শুনে ঝিলামের চোখ ছলছল করে ওঠে। সমীর না থাকলে ঝিলাম ওকে জড়িয়ে ধরে বলত, যে ওইরকম কথা বলতে নেই। যাবার আগে ঝিলাম বারবার ওকে জানায় যে ওখানে পৌঁছে অন্তত একটা এস.এম.এস যেন করে দেয় যে ঠিক করে পৌঁছে গেছে, আর যেন ওর ঘুমের ব্যাঘাত না করে। অপেক্ষা করে থাকবে ওর পৌঁছানর খবরের জন্য। বুধাদিত্য ওকে জানিয়ে দেয় যে পৌঁছে ফোন করে দেবে। বুধাদিত্য মেলবোর্ন পৌঁছেই ফোন করেছিল। ভোরেরবেলা মেলবোর্ন পৌঁছায়, তখন ঝিলাম ঘুমিয়েছিল, মাথার কাছেই ফোন রেখে দিয়েছিল। এক ডাকেই ফোন ধরে ঘুম ঘুম চোখে ওকে বলে, “ভালো করে পৌঁছে গেছ? এবারে আর আমাকে জ্বালাতন করো না একটু ঘুমাতে দাও।” বুধাদিত্য হেসে ফেলে ওর ঘুম জড়ানো মিষ্টি গলার আওয়াজ শুনে। হাজার মাইল দূর থেকে সেই গলার আওয়াজ শুনে ফোন বুকের কাছে ধরে বুধাদিত্য। এখানে ওকে কেউ দেখতে যাচ্ছে না, ও কি করছে। মোবাইলে ওর ছবিটা খুলে একবার দেখে ছোটো একটা চুমু খায়। 

সিডনি থেকে সমীরের জন্য একটা জিন্স কেনে আর ঝিলামের জন্য একটা ভারসাসের কাঁধের ব্যাগ কেনে। তার সাথে ঝিলামের জন্য একটা হাল্কা বেগুনি রঙের খুব সুন্দর ইভিং গাউন কেনে। মনের কোনায় সযত্নে একটা স্বপ্ন একে নেয়, ভবিষ্যতে কোনদিন এই গাউন ঝিলামকে পরাবে, তবে সমীরের সামনে নয়। সেদিন শুধু ঝিলাম আর বুধাদিত্য থাকবে, জানেনা সেইদিন কোনদিন আসবে কি না, কিন্তু স্বপ্ন দেখতে ক্ষতি নেই। ফিরে এসে এয়ারপোর্টে নেমেই সমীরকে ফোন করে জানিয়ে দেয় যে দিল্লী পৌঁছে গেছে। সমীর আর ঝিলাম দুজনেই ওর বাড়িতে এসেছিল সেইদিন বিকেলবেলায়। সমীর আর ঝিলাম ওর আনা উপহার পেয়ে খুব খুশি, সমীরের জন্য আলাদা করে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে এনেছিল এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি দোকান থেকে। ইচ্ছে করেই মদ কেনেনি, কেননা ঝিলামকে কথা দিয়েছিল। 

দিনেদিনে সমীরের অফিসের কাজ বেড়ে যায়, মাঝে মাঝেই অফিসের ট্রিপে বাইরে চলে যায় একদিন দুদিনের জন্য। ঝিলাম সেই নিয়ে বিশেষ কথা বাড়ায় না, কেননা কাজের জন্য যায় সমীর। একদিন অস্ত্রেলিয়া থেকে এক ক্লায়েন্ট আসে, বুধাদিত্য আর সি.টি.ও তাকে নিয়ে লাঞ্চে বের হয়, হোটেল সাংরিলা, অরিয়েন্টাল এভিনিউ’তে। দিল্লীর বেশ নামী দামী হোটেল। তিনজনে বসে নিজেদের কাজে গল্পে মশগুল হটাত চোখ পরে দুরে একটা টেবিলে। পেছন থেকে দেখে মনে হয় যেন লোকটাকে কোথায় দেখেছে। লোকটার সামনে এক সুন্দরী মেয়ে বসে। দুজনের হাবভাব আচার আচরনে দেখে মনে হল বেশ ভালভাবে পরস্পরকে চেনে আর বেশ হেসে কথা বলছে দুজনে। কিন্তু বুধাদিত্যের চোখ আটকে থাকে সেই লোকটার দিকে। ওর দিকে পিঠ থাকার দরুন মুখ দেখতে পায়না। পেছন থেকে সমীরের মতন দেখতে। বাথরুমে যাবার আছিলায়, ঝিলামকে ফোন করে জানে যে সমীর নাকি আহমেদাবাদ গেছে কোন অফিসের কাজে। কিছু বলেনা বুধাদিত্য, বাথরুম থেকে বেড়িয়ে সেই লোকের মুখোমুখি হয়ে যায়। থমকে দাঁড়িয়ে পরে সমীর, যেন ভুত দেখার মতন চমকে ওঠে, সামনে বুধাদিত্য। বুধাদিত্য চুপ করে একবার ওর লাল মুখের দিকে তাকায় আর দুরে টেবিলে বসা সেই মেয়েটার দিকে তাকায়। ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে যে সেই মেয়েটা কে? সমীর আমতা আমতা করে জানায় যে অফিস কলিগ। বুধাদিত্য ওকে জানতে দেয় না যে ঝিলামের কাছে আগে থেকেই সমীরের আহমেদাবাদ যাবার খবর আছে। শুধু একটা কথা বলে চলে যায়, মিথ্যেটা না বললেই ভালো হত। বলে যে, পরে এই নিয়ে কথা হবে। সমীরের যেন বুকের রক্ত শুকিয়ে যায়। বুধাদিত্যের দিকে এক পা এগিয়ে হাত ধরতে যায়, কিন্তু ততক্ষণে বুধাদিত্য নিজের টেবিলে গিয়ে বসে পরে। ঝিলামকে এইসব কথা কিছুই জানায় না। ভাবে একবার সোজা সমীরের সাথে কথা বলে দেখবে আগে। 

একদিন দুপুরে ঝিলাম অফিসে না ঢুকে ফোন করে বুধাদিত্যকে নিচে আসার জন্য। গলার স্বরে একটু আহতভাব। নিচে নেমে দেখে যে ঝিলাম বাইরে গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে। অন্যদিনে রিসেপ্সানে বসে থাকে, পেপার বাঁ কোন ম্যাগাজিন পড়ে যতক্ষণ না বুধাদিত্য নেমে আসে। ঝিলামের মুখের ভাব দেখে বুঝে যায় যে সমীরের সাথে হয়ত কোন বিষয়ে মনমালিন্য ঘটেছে। গাড়ি চেপে বাড়ি ফেরার সময়ে ঝিলাম অস্বাভাবিক ভাবে চুপ। বুধাদিত্য আড় চোখে ওর দিকে তাকায় আর গাড়ি চালায়। 

ঝিলামের উচ্ছল গলার আওয়াজ না পেয়ে বড় আহত হয়, জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে? সমীরের সাথে ঝগড়া হয়েছে?”

ঝিলাম মাথা দুলিয়ে বলে, “কই না ত।” ঠোঁটে জোর করে হাসি টেনে বলে, “কেন আমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে নাকি?”

বুধাদিত্য হেসে বলে, “তোমার চোখ মুখ বলছে যে কিছু একটা ঘটেছে আর সেটা সমীরের সাথেই। কি হয়েছে আমাকে বলবে না?”

ঝিলাম একটু আহত গলায় বলে, “একটু দেরি করে অফিসে ফিরলে তোমার অসুবিধে আছে?”

বুধাদিত্য গাড়ি ঘুড়িয়ে নেয় অফিসের দিকে। ঝিলামের ম্লান চেহারা বুকের ভেতর কাঁপিয়ে দেয়, ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেন কি হয়েছে?”

ঝিলাম নিচু স্বরে বলে, “জানো, কাল ওর একটা ক্রেডিট কার্ডের বিল এসেছিল। সেটা খুলে দেখেছি বলে কত কথা শুনিয়ে দিল আমাকে। আমি যেন ওর কেউ না, এমন একটা ভাব দেখাল সমু।” চোখের কোল ভিজে এসেছে ঝিলামের। “মাঝে মাঝে আজকাল কি রকম আলগা আলগা ব্যাবহার করে আমার সাথে। আজকাল আবার মদ খাওয়া ধরেছে, কিছু বলতে গেলেই রেগে যায়।”

বুধাদিত্যের চোয়াল শক্ত হয়ে যায় ঝিলামের কথা শুনে। অফিস পৌঁছে নিজের ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে পরে। বাড়ি না ফিরে ওকে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে ফাঁকা এন.এইচ-১ হাইওয়ে ধরে। ঝিলাম চুপ করে পাশে বসে থাকে, কোথায় যাচ্ছে কেন যাচ্ছে কিছুই জিজ্ঞেস করে না। বিকেল গড়িয়ে আসে, দুজনে চুপ। ঝিলামের বুকের মধ্যে একটা চিনচিন ব্যাথা শুরু হয়। 

বুধাদিত্য ওকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি সমীরকে সোজাসুজি প্রশ্ন কেন করছ না?”

ঝিলাম ওর দিকে তাকিয়ে বলে, “কি জিজ্ঞেস করব?”

বুধাদিত্য, “সোজাসুজি জিজ্ঞেস কর, যে ওর কি কাউকে মনে ধরেছে নাকি?”

বুধাদিত্যের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ঝিলাম। সমীর ওকে ছেড়ে অন্য কাউকে, না ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না, ঝিলাম। বুধাদিত্যকে বলে, “না না, এটা নয়, হয়ত ওর কাজের জন্য খুব ব্যাস্ত থাকে তাই হয়ত মাঝে মাঝে মদ খায় আর রাত করে বাড়ি ফেরে।”

বুধাদিত্য, “একবার জিজ্ঞেস করে দেখ কি বলে।”

ঝিলাম, “তোমার ত বন্ধু, তুমি না হয় একবার জিজ্ঞেস কর। 

বুধাদিত্য চুপ করে থাকে, একবার সমীরকে হাতেনাতে ধরতে হবে, প্রমান যোগাড় করে ওর সামনে দাঁড়াতে হবে। না হলে সমীর প্রতিবারের মতন কিছু না কিছু আছিলায় এড়িয়ে যাবে বুধাদিত্যের প্রশ্নবান আর কোন এক গল্প বানিয়ে বলে দেবে। ঝিলামের মন ভোলানোর জন্য ওকে জিজ্ঞেস করে স্কুলের কথা, বাড়ির কথা। বাড়ির জন্য শপিং করেছিল কিন্তু বাড়ি যাওয়া হয়নি। ঝিলাম ভেবে রেখেছে যে গরমের ছুটিতে দুর্গাপুর যাবে। অবশ্য সে কথা এখন সমীরকে জানায়নি, তবে ইচ্ছে আছে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে একটু রাত হয়ে যায়। ঝিলাম সমীরকে ফোন করে কিন্তু ফোন রিং হয়ে যায়। ঝিলাম বার কয়েক ফোন করার পরে আর করে না। ঝিলামে কে নামিয়ে দেবার পরেও ঝিলাম দাঁড়িয়ে থাকে। বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে। ঝিলাম ওকে ঘরে আসতে বলে। ঝিলামের মুখ দেখে বুধাদিত্য আর পিছিয়ে থাকতে পারে না। গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে ওর সাথে হাঁটতে শুরু করে। ঝিলাম কিছু কেনাকাটা করে, বুধাদিত্য ওকে সেই সব ব্যাগ নিতে সাহায্য করে। পাশে বুধাদিত্যকে পেয়ে ঝিলামের মনে যেন একটু বল আসে। বাড়িতে ঢুকেই আগে বুধাদিত্যের জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে আনে। বেশ কিছুক্ষণ গল্প করার পরে ঝিলামের মন একটু হাল্কা হয়। বুধাদিত্য বাড়ি ফিরে যায়।
Reply
#24
দশম পর্বঃ নোনাধরা প্রাচীর। (#2)





বুধাদিত্য একদিন সমীরকে সোজাসুজি ফোনে জিজ্ঞেস করে হোটেল সাংরিলায় দেখা মেয়েটার কথা। প্রথমে একটু আমতা আমতা করে সমীর। বুধাদিত্য চেপে ধরে সমীরকে কোন ঠাসা করে বলে দেয় যে সেদিন ঝিলামকে ফোন করে জেনে নিয়েছিল যে সমীর নাকি আহমেদাবাদ গেছে। সমীর ধরা পরে যায়, বিকেলে দেখা করার কথা বলে। বিকেলে দেখা হয় দুই বন্ধুর। বুধাদিত্যকে সমীর জানায় যে ওই মেয়েটা আর কেউ নয়, ওদের বম্বের অফিসের একজন। বুধাদিত্য ঠিক মানতে পারে না, পাল্টা জিজ্ঞেস করে যে, যদি অফিস কলিগ হয়ে থাকে তাহলে কেন এত লুকোচুরি, কেন ঝিলামকে বলেছিল যে আহমেদাবাদ যাচ্ছে? সমীরের কাছে সেই প্রশ্নের কোন উত্তর থাকে না। বুধাদিত্য ওকে সাবধান করে দেয়, বলে যে, নারীসঙ্গ করছ কর, বুধাদিত্য নিজে কিছু কাল আগে পর্যন্ত অনেকের সাথে শুয়ে কাটিয়েছে। কিন্তু কাউকে মনে ধরলে যেন একবার ভেবে দেখে সমীর, ঘরে একজন বউ আছে। সমীর চুপ করে ওর কথা শুনে যায়। শেষে জানায় যে শুধু মাত্র শারীরিক সম্পর্ক আছে সেই মেয়েটার সাথে। বুধাদিত্য জানতে চায় সেই মেয়েটার নাম আর ঠিকানা, সমীর এড়িয়ে যায়। বলে যে একদিনের দেখা, এত প্রশ্ন বাণে কেন জর্জরিত করছে? সব ভুলে এবার নতুন করে ঝিলামকে কাছে টেনে নেবে সমীর। বুধাদিত্য ওকে বাড়ি ছাড়ার আগে শেষ বারের মতন সাবধান বানী দেয়। 

সেদিনের পরে ঝিলামের মুখে আবার হাসি ফিরে আসে। সমীর মাঝে মাঝেই আজকাল তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে, ঝিলামকে নিয়ে মাঝে মাঝে বাজারে বের হয়। ঝিলাম বেশ খুশি সমীরের আচরনে। ঝিলামের অফিসে হানা দেওয়া একটু কমে গেছে। আগে যেখানে পাঁচ দিনে চারদিন হানা দিয়ে আব্দার করত বাড়ি পৌঁছে দাও সেখানে আজকাল হয়ত দু’দিন অফিসে আসে। সমীর নতুন বাইক কিনেছে, মাঝে মাঝই ঝিলামকে স্কুল থেকে নিতে আসে। সমীর ঝিলামকে নিতে আসলে মাঝে মাঝে দু’জনে মিলে বুধাদিত্যের সাথে দেখা করে যায়। ঝিলামের মুখে হাসি দেখে বুধাদিত্যের বেশ ভালো লাগে। মাঝে মাঝে আলমারি খুলে অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা সেই ইভিনিং ড্রেস টা দেখে আর ম্লান হাসে। মনের মধ্যে যে স্বপ্ন গুছিয়ে রেখে দিয়েছিল, সেটা হয়ত এই যাত্রায় আর সফল হবে না। সমীরের এই আচরনে বুধাদিত্যের ভাল লাগে তবে মনের কোনে একটু ব্যাথাও জাগে। 

এক মাস কেটে যায়। সমীর আর ঝিলামের সাথে দেখা সাক্ষাৎ অনেক কমে যায়। ঝিলাম মাঝে সাঝে ফোন করে, খবরা খবর নেয়। বুধাদিত্যকে ধন্যবাদ জানায় ঝিলাম, মনে মনে বোঝে যে সমীরের সাথে নিশ্চয় বুধাদিত্য কথা বলেছে তাই সমীর বদলে গেছে। 

দেশের খুব বড় একটা মোবাইল অপারেটারের সাথে মিটিং করতে একবার পুনে যায় বুধাদিত্য, দিন দুয়েকের কাজ। এবারে যাবার আগে ঝিলাম বা সমীরের সাথে কোন কথা হয়না। রাতের বেলা কাজের শেষে একদিন বুধাদিত্য অফিসের বাকি লোকদের নিয়ে একটা ভালো রেস্টুরেন্টে যায় কাজের খুশিতে পার্টি দেবার জন্য। সেখানে সমীরের মুখোমুখি হয়। বুধাদিত্য প্রথমে একটু অবাক হয়ে যায় সমীরকে দেখে, জিজ্ঞেস করে কি কারনে পুনেতে? যথারীতি সমীর এক উত্তর দেয় যে অফিসের কাজে এসেছে। রাতের বেলা ঝিলামকে ফোন করে জানতে পারে যে সমীর পুনে গেছে অফিসের কাজে। অনেকদিন পরে ঝিলাম ওর গলার আওয়াজ পেয়ে খুব খুশি হয়, জানায় যে সমীর অনেক বদলে গেছে নাকি। তবে আজকাল অফিসের কাজে হামেশাই বাইরে থাকে। একটু সন্দেহ হয় বুধাদিত্যের, কিছু বলে না, শুধু জানায় যে সমীরের সাথে দেখা হয়েছে ওর। সেটা শুনে ঝিলাম একটু অবাক হয়ে যায়। বুধাদিত্যকে জানায় যে কিছু আগে নাকি সমীরের সাথে কথা হয়েছিল, কিন্তু ওদের দেখা হওয়ার ব্যাপারে সমীর ওকে কিছুই জানায় নি। সমীরকে জিজ্ঞেস করা হয়নি যে কোন হোটেলে উঠেছে না হলে একবার দেখা করে আসত বুধাদিত্য। ঝিলামের কথা শুনে ওর নাকে একটা সন্দেহের গন্ধ আসে। সমীর খুব বড় একটা খেলা খেলছে ঝিলামের সাথে। 

পরেরদিন ভাগ্যবশত সমীরের সাথে একটা চাইনিজ রেস্তুরেন্টে দেখা হয় বুধাদিত্যের। এবারে বুধাদিত্য লক্ষ্য করে যে ওর সাথে সেই মেয়েটা যাকে ও হোটেল শাংরিলতে দেখেছে। সমীরের ওপরে যা সন্দেহ করেছিল সেটা চোখে দেখে প্রতীত হয় যে সমীর অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলেছে। লুকিয়ে লুকিয়ে ওদের বেশ কয়েকটা ছবি তোলে নিজের মোবাইলে। একটা ভিডিও তুলে নেয়, যেখানে সমীর বেশ গা এলিয়ে মেয়েটার সাথে হাসছে গল্প করছে, কাঁটা চমচে নুডুলস তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। মেয়েটা বেশ হাত ধরে আছে সমীরের, দেখে মনে হল ওদের প্রেম অনেক গভীর খাদে বয়ে চলেছে। চোখের সামনে ঝিলামের চেহারা ভেসে ওঠে। খাবার পরে বুধাদিত্য সোজা ওদের টেবিলে যায় আর সমীরের সামনে দাঁড়িয়ে পরে। সমীর ওকে দেখে ভুত দেখার মতন থমকে যায়। এবারে হাতেনাতে ধরা পরে গেছে সমীর। পাশে বসা মেয়েটা ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে ব্যাপারটা। বুধাদিত্য সমীরকে বাইরে ডাকে কিছু কথা বলার জন্য। 

বাইরে যেতেই বুধাদিত্য সমীরকে চেপে ধরে, “কি ব্যাপার একটু খোলসা করে জানা আমাকে।”

সমীর একটু রেগে যায় ওর কথায়, “তোর সব ব্যাপারে মাথা গলাবার কি দরকার। আমি আমার জীবন নিয়ে কি করব না করব সেটা তোকে জানিয়ে করতে হবে নাকি?”

বুধাদিত্যের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, চোখের সামনে ঝিলামের হাসি মাখানো মিষ্টি মুখ ভেসে ওঠে। সমীরকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বাইকে বসে ঝিলাম। বুধাদিত্য চিবিয়ে চিবিয়ে সমীরকে বলে, “তোদের দুজনকে দেখে ত মনে হয় না যে তোদের সম্পর্ক শুধু মাত্র শারীরিক। মানসিক দিক থেকেও তুই ওই মেয়েটার দিকে ঝুঁকে গেছিস বলে মনে হচ্ছে?”

সমীর প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিতে চায়, “না রে, তোকে বলেছিলাম ত, এই ব্যাস ফ্লারটিং, শালা আর কি, এক রাত ব্যাস কাম খালাস।”

বুধাদিত্য, “এটা এক রাতের ব্যাপার নয় সেটা ভালো করে বোঝা যাচ্ছে সমীর। এই মেয়ে হোটেল শাংরিলাতে ছিল, এই মেয়ে হয়ত কাল তোর সাথে ছিল।”

সমীর কিছু বলতে যাবার আগেই বুধাদিত্যের সব সন্দেহ দূর করে মেয়েটা সমীরের পেছনে দাঁড়িয়ে ওকে জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে সমু, এনি প্রবলেম?”

বুধাদিত্য চোখ বন্ধ করে নেয়। চোয়াল শক্ত হয়ে যায় ওর, যাক কানে শুনে সন্দেহের ভিত অনেক মজবুত হয়ে গেছে। সমীর মেয়েটাকে ভেতরে যেতে বলে। ওকে বলে যে অনেক পুরানো এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে, তাই একটু কথা বলেই টেবিলে ফিরে যাবে। মেয়েটা একবার বুধাদিত্যের মুখের দিকে তাকায় একবার সমীরের মুখের দিকে তাকায়, তারপরে চলে যায় ভেতরে।

মেয়েটা চলে যেতেই সমীর বুধাদিত্যকে বলে, “ঝিলাম যা চায় সেটা ও পেয়ে গেছে। আমি আমার জীবনে কি করছি না করছি সেটা ওর দেখার দরকার নেই।”

বুধাদিত্য, “সমীর, ঝিলাম তোর বিয়ে কর বউ, তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা? আমি তোর সেক্সুয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন করব না, ছেলে হয়েছিস যখন তখন যে শালা এদিকে ওদিকে মুখ মারবি সেটা আর নতুন কি? কিন্তু শালা মুখ মারতে গিয়ে প্রেমে পড়বি আর বাড়িতে বউ একা থাকবে?”

সমীর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপরে জিজ্ঞেস করে রাতে খালি আছে কিনা? বুধাদিত্য নিজের হোটেলের ঠিকানা দিয়ে দেয় আর বলে রাতে ওর জন্য অপেক্ষা করবে। বিস্তারিত ভাবে কথা বলতে চায় সমীর ওর সাথে। রাতে সমীর ওর হোটেলের ঘরে আসে। বুধাদিত্য ওকে পরিষ্কার জিজ্ঞেস করে যে দুজনে একসাথে এক রুমে থাকছে কি না। মাথা দুলিয়ে মেনে নেয় সমীর, যে মেয়েটা আর সমীর এক রুমে আছে। বুধাদিত্যের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। বুধাদিত্য কারন জানতে চায়, কেন সমীর ঝিলামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। সমীরের সাথে কথাবার্তা টেপ করার জন্য চুপিচুপি মোবাইলে ভয়েস রেকর্ডার চালিয়ে দেয় বুধাদিত্য। 

সমীর বুক ভরে এক নিঃশ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করে, “আগেও তোকে জানিয়েছিলাম ঝিলামের কথা। জানিনা তোর মনে আছে কি না। চাকরি পাওয়ার পরে ঝিলাম যে আরও বদলে যাবে সেটা আমি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম। ও সুন্দরী, ও ভীষণ আকর্ষণীয়, তার চেয়ে বেশি ও ভীষণ জেদি আর বদরাগী। চাকরি পাওয়ার পরে নিজের অস্তিত্ব জাহির করে সবসময়ে। সকাল পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠে, স্কুলে বেড়িয়ে যায় আমি ঘুম থেকে ওঠার আগেই। রাতে আমার দেরি হয় ফিরতে, সেই নিয়ে ওর কথা শুনতে হয়। ওর কথা সারে আট’টার মধ্যে খেয়ে নিতে হবে, সাড়ে ন’টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। এত নিয়ম কানুন মেনে চলা বড় কঠিন। আমি হাঁপিয়ে উঠেছি এই দুই, তিন মাসে। জোর করে গাড়ি কেনার জন্য, কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত বাইক কিনি। আজকাল আবার আমার পয়সার হিসাব চায়। কই, আমি’ত ওর চাকরির পয়সার হিসাব চাই না? আমার আতে লাগে যখন আমার খরচ খরচার ওপরে হাত লাগাতে চায়।” 

বুধাদিত্য চুপচাপ শুনে যায়। সমীর বলে চলে, “আজকাল জানিস আর আমাদের সেক্স হয়না। কোলকাতায় থাকাকালীন ঝিলাম উদ্দাম ছিল, প্রচন্ড উচ্ছল ছিল, সেই ঝিলাম অনেক বদলে গেছে। আমি বাড়ি ফিরি, ঝিলাম ঘুম চোখে দরজা খুলে আমার জন্য খাবার গরম করে শুতে চলে যায়। আমি চুপচাপ ওকে না ঘাটিয়ে নিজের খাবার খাই। এমত অবস্থায় আর কি একসাথে থাকা যায়? তুই জানিস না, এই দিল্লী এসেই ওর একটা মিস্ক্যারেজ হয়েছিল। তারপরে আমাদের শারীরিক সম্বন্ধ অনেক কমে যায়। আমাকে দোষ দেয় যে আমার নাকি স্পারম কাউন্ট কম।” 
বুধাদিত্য, “তুই কি সে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছিলি কোনদিন?”

সমীর, “না আমার কিছু হয়নি, ওর মা হবার ক্ষমতা নেই। ওর গাইনি দেখে বলেছিল যে ওর গর্ভাশয়ে কিছু সমস্যা আছে।”

বুধাদিত্য, “দ্যাখ, আমি সেসব বিশেষ জানি না, তবে আমার মনে হয় তোর একবার ডাক্তার দেখান উচিত। তবে আমি এইটুকু বলতে পারি যে একটা মিস্ক্যারেজের পরে একটা মেয়ের মনে বড় আঘাত লাগে, সেই আঘাত কাটতে একটু সময় লাগে। তুই কি সেই সময় টুকু ঝিলামকে দিয়েছিস?”

সমীর চুপ করে থাকে, বুধাদিত্যের বুঝতে কষ্ট হয় না যে ঝিলামের দিকে তারপরে হয়ত আর ফিরেও তাকায়নি ঠিক ভাবে। বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে বম্বের সেই মেয়েটার কথা। বুধাদিত্য দু’টো সিগারেট জ্বালায়, একটা সমীরকে দেয়। সমীর সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলে, “বম্বে অফিসে নন্দিতার সাথে দেখা।” মাথা নাড়ায় বুধাদিত্য, অবশেষে সমীরের জীবনের নতুন নারীর নাম জানা গেল, নন্দিতা। সমীর বলে চলে, “এক বিকেলে মিটিঙ্গের পরে আমার মাথায় এই সব চিন্তা ভাবনা ঘোরে, আমি খুব ড্রিঙ্ক করি। আর ড্রিঙ্কের বশে নন্দিতাকে মনের কথা বলে দেই, সেদিন রাতে দু’জনে আমার রুমে এসে পাগলের মতন সহবাস করেছিলাম। আমি তারপরে ওর প্রতি ঝুঁকে যাই। নন্দিতাকে ফেলে দেওয়ার এখন উপায় নেই। আমি সেইজন্য নন্দিতাকে দিল্লীতে ট্রান্সফার করিয়ে নিয়ে এসেছি। একদিকে ঝিলাম, একদিকে নন্দিতা। একজন কে ছাড়তে পারিনা বাড়ির চাপে, আত্মীয় সজ্জনের চাপে, অন্যজনকে ছাড়তে পারিনা কেননা মন মানে না।”

সব কথা বলে সমীর চুপ করে থাকে। বুধাদিত্যের কান লাল হয়ে যায় সব কথা শুনে, জিজ্ঞেস করে সমীরকে, “কি করতে চাস তুই? এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। এই রকম দুই নৌকায় পা দিয়ে ত চলা যায় না।”

সমীর সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বলে, “মাঝে মাঝে মনে হয় ডিভোর্স দিয়ে দেই। কিন্তু ওর পরিবার, আমার পরিবার ডিভোর্সের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, এমন কি ঝিলাম আমাকে ডিভোর্স দিতে চাইবে না। আমার সেক্সুয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন করেছিল ঝিলাম, অনেক বার করেছিল। আমি ঝিলামকে দেখাতে চেয়েছিলাম যে আমি এক সবল পুরুষ, যেকোনো নারীকে সঙ্গমের সুখ দিতে পারি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি নন্দিতাকে ভালোবেসে ফেলি। আমি ঝিলামের সেক্সুয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন করব না কোনদিন। ও আমার সেক্সুয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন করতে পারবে না কোনদিন। আমি কোথায় কি করছি, না করছি সেটা ওর জেনে দরকার নেই। আমিও দেখতে যাবো না ও কার সাথে ঘুরছে, কার সাথে রাত কাটাচ্ছে।”

ঝিলামের মতন মিষ্টি, পবিত্র মেয়ের নামে ওই কথা শুনে রেগে আগুন হয়ে যায় বুধাদিত্য। মনে হয় এক থাবরে মাথা ফাটিয়ে দেয় সমীরের, গর্জে ওঠে বুধাদিত্য, “ঝিলাম কি কোনদিন তোকে ছাড়া বাড়ির বাইরে রাত কাটিয়েছে? ঝিলাম কি কোনদিন তোকে ছাড়া কোথাও ঘুরতে গেছে? ঝিলামের নামে এই কথা বলার আগে তোর বুকে একবারের জন্য বাঁধল না? তোকে বুকে আগলে বাঁচিয়ে এনেছে আর তুই মাদা... শালা শুয়োরের বাচ্চা, শেষ পর্যন্ত, বউয়ের নামে এত জঘন্য অপবাদ দিলি?”

সমীর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, “সারা জীবন ধরে কি আমাকে সেই এক কথা শুনাতে চাস? ঝিলামের প্রতি তোর অত দরদ কিসের বোকা... তুই কি আমার বউয়ের সাথে শুয়েছিস?”

রাগে কাঁপতে শুরু করে বুধাদিত্য, কান মাথা ভোঁভোঁ করতে শুরু করে দেয়। সত্যি ওর বুকের অনেকটা জায়গা জুড়ে ঝিলাম বসবাস। যদিও ঝিলাম সেই কথা এখন জানেনা জানলেও হয়ত এই জানে যে বুধাদিত্যের মনে কোন পাপ নেই। মনকে শক্ত করে বেঁধে নেয় বুধাদিত্য, হৃদয়ের টান যেন চোখে না এসে যায়। বুধাদিত্য চিবিয়ে চিবিয়ে সমীরের প্রশ্নের উত্তর দেয়, “মাদার... কুত্তারবাচ্চা, এই কথা বলতে তোর একবার বাধল না? গত ছয় বছর পরে তোদের পেয়ে আমার মনে হয়েছিল যে, দিল্লীতে আমার নিজের বলতে কেউ আছে। আজ আমার বুকের সেই আশা সেই ভালোবাসা খানখান করে দিলি তুই।” সমীররে মুখ চোখ লাল হয়ে যায়। সমীর মনেপ্রানে জানে যে বুধাদিত্য ওকে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছে সেই রাতে। চুপ করে থাকে, সমীর, বুধাদিত্য গর্জে ওঠে, “বেড়িয়ে যা শালা, বোকা... এখুনি বেড়িয়ে যা আমার রুম থেকে, আমার চোখের সামনে থেকে। মাদা... একবার ভেবেছিলাম তোদের থেকে দুরে চলে যাব, কিন্তু যাবো না এবারে। তোর জ্বলানো এই আগুনের খেলার আমি শেষ দেখে যাব। ঝিলামের চুলের ডগা যদি এই আগুন ছোঁয়, কথা দিচ্ছি, তুই শালা পরের দিনের সূর্যোদয় দেখতে পাবি না।”

সমীর উঠে দাঁড়িয়ে পরে, রাগে, দুঃখে দুচোখ লাল হয়ে গেছে ওর। রোষ ভরা নয়নে বুধাদিত্যের দিকে তাকিয়ে বলে, “হ্যাঁ আমি চলে যাচ্ছি, আর তুই যদি আমাদের মাঝে আসিস তাহলে সেই আগুনে তোকে জ্বালিয়ে দেব।” সমীর দরজা খুলে বেড়িয়ে যায়, বুধাদিত্য হাতের মুঠি শক্ত করে চেয়ারে বসে থাকে। ভীষণ রাগে সারা শরীর কাঁপতে শুরু করে দেয়, একবার মনে হয় সমীরকে খুন করে ওর কবল থেকে ঝিলামকে ছাড়িয়ে নিজের বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু সেই পদক্ষেপ ওকে আইনের চোখে, ঝিলামের চোখে নিচ, ঘৃণ্য অপরাধী বলে প্রমানিত করবে। মাথা কাজ করে না বুধাদিত্যের। 
Reply
#25
একাদশ পর্বঃ অপ্রকাশিত বন্ধন। (#1)





কাজের চাপ ভীষণ ভাবে বেড়ে যায়, প্রায় দিন অফিসে রাত কাটাতে হয়। বাড়ি ফিরলেও শুধু মাত্র স্নান আর একটু ঘুমানোর জন্য। পুনে থেকে ফিরে ঝিলামের সাথে দেখা করা হয়ে ওঠে না। ওর সান্নিধে যদি ঝিলামের প্রতি কোন বিরূপ আচরন করে সমীর, তাহলে ঝিলাম বুধাদিত্যকে দোষারোপ করবে ওদের সুখের সংসারে আগুন লাগানোর জন্য। মাথার মধ্যে শুধু ঝিলামের চিন্তা ঘুরে বেড়ায়। একবারের জন্য মনে হয় যে মোবাইলে তোলা ছবি, ভিডিও আর ওদের কথোপকথন ঝিলামকে শুনিয়ে দেয়। কিন্তু ভয় হয়, সব শুনে ঝিলাম যদি আত্মহত্যা করে ফেলে তাহলে? বেশ কিছু দিন এমন ভাবে কেটে যায়। কোনদিক থেকে কোন খবরা খবর আসে না। প্রত্যেক দিন ভাবে এই ঝিলামের ফোন আসবে, কিন্তু সেই খবর আর আসে না। একবার ভাবে যে সমীরের বাড়ি যাবে দেখে আসবে ঝিলামকে, কিন্তু সমীরের শেষ বাক্য ওকে বাধা দেয়। সমীর সেই আগের তেলু নেই, অনেক বদলে গেছে, অনেক হিংস্র আর কুটিল হয়ে উঠেছে। 

গ্রীষ্ম কাল, সকাল বেলার কাঠ ফাটা রোদ শান্ত পরিবেশ ঝলসে দেয়। সবে অফিস পৌঁছেছে বুধাদিত্য, এমন সময়ে ঝিলামের ফোন আসে। গলার স্বর শুনে মনে হল, খুব ক্লান্ত। ওর ক্লান্ত গলার আওয়াজ শুনে বুধাদিত্যের বুক হুহু করে ওঠে। বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে ঝিলাম কোথায়? ঝিলাম জানায় যে স্কুলে এসেছে কিন্তু স্কুল করার ইচ্ছে নেই ওর। ব্যাগ হাতে করে বেড়িয়ে পরে বুধাদিত্য, ঝিলামের গলার স্বর শুনে মনে হয় আর অফিস করে দরকার নেই, এবারে কিছু একটা বিহিত করা উচিত। 

ঝিলাম স্কুলের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, কাঁধে ব্যাগ, পরনে হাল্কা নীল রঙের সুতির শাড়ি। দূর থেকে দেখলে সবাই সুন্দরী বলবে, কিন্তু শুধু বুধাদিত্য জানে যে ওই কাজল কালো দু’চোখের পেছনে লুকিয়ে আছে হৃদয় ভাঙ্গার শত সহস্র টুকরো। বুধাদিত্যের গাড়ি দেখে ছোটো পায়ে এগিয়ে এসে, গাড়ির দরজা খুলে সামনের সিটে এসে বসে পরে। চোখের পাতা ভিজে, ফর্সা গাল লাল, নাকের ডগা লাল। চোখে দেখে মনে হল যেন ঘুম হয়নি গত রাতে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে বুধাদিত্য। ঝিলাম মাথা নিচু করে আঙ্গুলের নখ খোটে কিছুক্ষণ। তারপরে ওর দিকে জলভরা চোখে তাকিয়ে বলে, “একটু বিষ দিতে পার আমায়?”

চোয়াল শক্ত হয়ে যায় বুধাদিত্যের, চাপা গলায় বলে, “শুয়োরের বাচ্চাটা কোথায়?”

ঝিলাম উলটো হাতে চোখের কোল মুছে উত্তর দেয়, “আজ সকালের ফ্লাইটে বম্বে গেছে, এবারে নাকি অনেক লম্বা টুর। বম্বে থেকে আরও অনেক জায়গা নাকি যাবার আছে। ফিরবে সাত আট দিন পরে।” 

ঝিলাম রাতের কথা বলতে শুরু করে। বেশ কয়েকদিন ধরে সমীর রোজ রাতে মদে চুড় হয়ে আসে। ঝিলাম কিছু বলতে গেলেই ওকে বলে যে, ঝিলাম নিজের মতন থাকতে পারে আর ওকে যেন ওর কোন চালচলন নিয়ে না ঘাটায়। সমীর সোজাসুজি ঝিলামকে জানিয়ে দেয় যে পরস্পরের যৌনজীবন যেন কেউ আঘাত না করে। ঝিলামের সাথে তুমুল ঝগড়া হয় সমীরের, সারা রাত দুজনের কেউ ঘুমায়না। রাতে একবার বুধাদিত্যের কথা মনে পড়েছিল ঝিলামের, ফোন করতে যায়। কিন্তু সমীর ধমকে ওঠে, হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে বলে বুধাদিত্য ওর মাথা খেয়েছে, এর মধ্যে যেন ওকে না ডাকা হয়। 

ডুকরে কেঁদে ওঠে ঝিলাম, শেষ পর্যন্ত সমীর ওকে বলে যে যদি ডিভোর্স চায় তাহলে সমীর ওকে ডিভোর্স দিয়ে দেবে। সেই শুনে ওর পায়ের নিচের মাটি সরে যায়। আত্মহত্যা করার ভয় দেখিয়েছিল; সেই শুনে সমীর বলে আত্মহত্যা করতে হলে যেন ও চলে যাবার পরে করে। সকালবেলা চলে যাবার আগে জানিয়ে যায়, যে টুর থেকে এসে বাড়ির লোকজন ডেকে একটা বিহিত করবে। ঝিলাম জানায় যে ওর বাবা মা হয়ত সব শুনে ওকে বলবে চাকরি ছেড়ে স্বামীর সেবা করতে। এত সব হয়ে যাবার পরে সেটা করতে পারবে না ঝিলাম। 

দুচোখে অঝোর ধারায় জল পরে যায়, কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমার আজকাল ওর সাথে কথা বলতে, এক ছাদের নিচে থাকতে পর্যন্ত খারাপ লাগে। মনে হয় দুটি অজানা অচেনা প্রাণী এক ঘরের মধ্যে আটকে পরে আছে। দম বন্ধ হয়ে যায় আমার।” 

বুধাদিত্য চুপ করে সব কথা শুনে তারপরে বলে, “শুয়োরের বাচ্চাটা আসুক তারপরে একটা বিহিত করা যাবে।”
বুধাদিত্য গাড়ি চালিয়ে ঝিলামের বাড়ির নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। ঝিলাম চুপ করে গাড়িতে বসে থাকে। বুধাদিত্য ওর কাঁধে হাত রাখে, ওর হাতের পরশে কেঁপে ওঠে ঝিলাম। 

চোখে জল, ঠোঁটে একটু খানি হেসে নিয়ে বুধাদিত্যের দিকে তাকিয়ে বলে, “খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার। তোমাকে বলে মনের দুঃখ কেটে গেছে। আমাকে আবার স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এস।”

বুধাদিত্য হেসে ফেলে, “পাগলি মেয়ে কোথাকার।” কাঁধের গোলায় আলতো চাপ দিয়ে বলে, “ঠিক করে বল, আবার স্কুলে গিয়ে বলবে যে বাড়ি নিয়ে যাও তাহলে কিন্তু রাস্তার মাঝে ছেড়ে দেব।”

চোখের জল মুছে হেসে ফেলে ঝিলাম, “না সত্যি বলছি। ফালতু একটা সি.এল মেরে লাভ নেই, আমাকে স্কুলে ছেড়ে দাও প্লিস।” ঝিলামের চোখ মুখ কুঁচকে “প্লিস” বলাতে, বুধাদিত্যের মনে হল জড়িয়ে ধরে ওই লাল গোলাপের কুঁড়ির মতন ঠোঁটে চুমু খায়। 

অগত্যা বুধাদিত্যকে গাড়ি ঘুড়িয়ে নিয়ে আবার স্কুলে ফিরে যেতে হয়। স্কুলের গেটের সামনে নামিয়ে দিয়ে বুধাদিত্য ঝিলামকে পেছন থেকে ডেকে বলে, “ঝিল্লি, স্কুল শেষ হলেই অফিসে চলে এস।”

ঝিলাম ওর কথা শুনে মাথা নাড়ায়, হ্যাঁ। কিন্তু পরক্ষনে কানে বেজে ওঠে “ঝিল্লি” নাম। থমকে দাঁড়িয়ে বুধাদিত্যের দিকে তাকায় বড় বড় চোখ করে। বুধাদিত্যের খেয়াল হয় যে ঝিলামকে আদর করে “ঝিল্লি” বলে ডেকে ফেলেছে, দাঁত চেপে হেসে ফেলে। ঝিলাম নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখের লাজুক ভাব লুকিয়ে গেটের ভেতরে ঢুকে যায়। 

সারা সকাল কাজে মন বসাতে পারে না বুধাদিত্য, ল্যাপটপ সামনে খোলা। অগুনতি মেইল আসে, কয়েকটার উত্তর দেয়। মাঝে মাঝেই ঘড়ি দেখে, কখন দুটো বাজবে আর ঝিলাম ওকে এসে ডাক দেবে। সময় যেন কাটতে চায় না আর। অফিসের কয়েকজনের সেই ইতস্তত ভাব চোখে পরে যায়। অনেকেই জিজ্ঞেস করে, সুকৌশল উত্তর দিয়ে এড়িয়ে যায় সবার প্রশ্ন। 

ঠিক লাঞ্চের পরেই ঝিলামের আবির্ভাব। চেহারার বিষণ্ণ ভাব কেটে বেশ খুশির জোয়ার খেলে বেড়ায়। স্কুল থেকে রোদে হেঁটে আসার ফলে ফর্সা ঝিলাম লাল হয়ে গেছে। বুধাদিত্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ওর গালের লালিমা উপভোগ করে। বড় বড় চোখ করে ইঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে যে কি দেখছে? মিচকি হেসে ফেলে বুধাদিত্য। গাড়িতে করে ঝিলামকে বাড়িতে নিয়ে যায়। 

বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ঝিলামকে বলে, “একা একা বাড়িতে থাকবে?”

ঝিলাম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “কি করব আর, এর পর থেকে একাই হয়ত কাটাতে হবে।”

সেই দীর্ঘশ্বাস বুধাদিত্যের বুকে বড় বাজে, একটু নিচু গলায় বলে, “যদি কিছু মনে না কর তাহলে একটা কথা বলতে পারি।” ঝিলাম ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি কথা? বুধাদিত্য একটু ইতস্তত করে বলে, “জামা কাপড় প্যাক করে আমার বাড়িতে চলে এসো।”

বুধাদিত্যের সাহস দেখে ক্ষণিকের জন্য থমকে যায়। তারপরে হেসে ফেলে বলে, “বিকেলে অফিস ফেরত আমাকে নিয়ে যেও, আমি তৈরি থাকব।”

উত্তর শুনে বুধাদিত্যের হৃদয় খুশিতে নেচে ওঠে। দু’চোখ চকচক করে ওঠে, কিন্তু চোয়াল শক্ত করে সেই অভিব্যাক্তি চেহারার ওপরে আনতে দেয় না। ঝিলামের চোখ এড়ায় না, ওর দুই চোখের ভাষা। ঝিলাম ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের খুশি চেপে রাখে। ঝিলাম ফ্লাটে ঢোকার জন্য পা বাড়ায়, বুধাদিত্য দাঁড়িয়ে থাকে গাড়ির কাছে। সুন্দরী অপ্সরা যতক্ষণ না দরজা দিয়ে ঢুকে যায়, ততক্ষণ চেয়ে থাকে ওর যাওয়ার পথে। অফিসে ফিরে কাজে মন বসাতে চেষ্টা করে বুধাদিত্য। এর মাঝে সি.টি.ও ডাক আসে, কিছু প্রেসেন্টেসানের জন্য। এক ঝটকায় ঝিলামকে মাথার থেকে বের করে আবার কাজে ডুবে যায়। হাতে দু’দুটো প্রোজেক্ট, একটা অস্ট্রেলিয়ার, একটা পুনের, মাথায় বাজ পড়েছে। দ্বিতীয় অর্ধে কাজে ডুবে গিয়ে সময়ের দিকে আর খেয়াল থাকে না বুধাদিত্যের। 

সময়ের খেয়াল পরে ঝিলামের ফোনে। ওপাশ থেকে ধমকে ওঠে “ঝিল্লি”, “সাড়ে ছটা বাজে, সময়ের খেয়াল আছে? আমাকে নাকি নিতে আসছিলে? কোথায় মরতে বসেছ?” বুধাদিত্যের তখন খেয়াল পরে যে ঝিলামকে নিয়ে বাড়ি যেতে হবে। একদম ভুলে গেছিল সে কথা। বুধাদিত্য ক্ষমা চাইতেই ঝিলাম অভিমানী সুরে ধমক দেয়, “সব পুরুষ মানুষ এক রকমের। দেরি হবে তা একবার ফোন করে জানাতে পার নি? আর আসতে হবে না তোমাকে।” ভীষণ রেগে গেছে ঝিলাম, রেগে মেগে ফোন রেখে দেয়। 

বুধাদিত্য তড়িঘড়ি করে ব্যাগ কাঁধে ফেলে গাড়ি ছুটিয়ে দেয়। খুব ভয়ে ভয়ে দরজায় টোকা মারে। অভিমানিনী ঝিলাম দরজা খুলে ভেতর দিকে হাটা দেয়। ঝিলামের চুরিদারের ওড়না দরজার ছিটকিনিতে আটকে টান পরে যায়। ঝিলাম কেঁপে ওঠে এক অজানা ভয়ে, একা পেয়ে বুধাদিত্য ওর সতীত্ব হরন করতে চলেছে? রেগে মেগে চেঁচিয়ে ওঠে ঝিলাম, “তোমার এত সাহস যে আমাকে একা পেয়ে শেষ পর্যন্ত...” হাত উঠিয়ে বুধাদিত্যকে থাপ্পর মারতে যায়। থাপ্পরটা হাওয়ায় ঘুরে দরজায় লাগে। বুধাদিত্য কিছুই বুঝতে পারেনা। পেছনে দাঁড়িয়ে ঝিলামের এই অধভুত আচরনের মানে খুঁজতে চেষ্টা করে। ঝিলাম দরাজায় থাপ্পর মারার পরে বুঝতে পারে যে ওড়না ছিটকিনিতে আটকে গেছে। লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে ওড়না ছিটকিনি থেকে খুলে নেয়। বুধাদিত্য হেসে ফেলে ওর লাল নাকের ডগা দেখে। 

বুধাদিত্য, “তোমার মারা পেটা হয়ে গেলে, একটু বাড়ির দিকে রওনা দিতে পারি।”

খিলখিল করে হেসে ফেলে ঝিলাম, পেছনে সরে গিয়ে ওকে সোফার ওপরে বসতে বলে। মাথা তুলে বুধাদিত্যের চোখে চোখ রাখতে লজ্জা করে, নিজের আচরনের জন্য। রান্না ঘর থেকে দু’কাপ কফি নিয়ে এসে ওর হাতে ধরিয়ে দেয় এক কাপ। মিষ্টি লাজুক গলায় ওকে বলে, “একটু বসো, আমি এখুনি তৈরি হয়ে আসছি।”

বুধাদিত্য, “আর কি তৈরি হবে, ভালোই ত কাপড় পরে আছো বেশ ত লাগছে। একে গাড়িতে ত যাবে, পায়ে হাওয়াই চটি পরে গেলেও কেউ জানতে পারবে না।”

হেসে ফেলে ঝিলাম, “দাঁড়াও বাবা, এখুনি অফিস থেকে এসেছ, একটু ত বসবে নাকি?”

বুধাদিত্য, “সে’ত ওই বাড়ি গিয়েও বসা যাবে।”

ঝিলাম মাথা নাড়ায়, “তুমি না সত্যি... ঠিক আছে চল।” নিজের ঘর থেকে ব্যাগটা নিয়ে বেড়িয়ে পরে।

সারাটা রাস্তা ঝিলামের কল্লোলে বুধাদিত্যের কান গুঞ্জরিত হয়। সারাদিনের স্কুলের গল্প বলতে শুরু করে। গাড়ি চালায় আর আড় চোখে দেখে ঝিলামকে। অর্ধেক কথা কানে যায়, অর্ধেক কথা কানের পাশ দিয়ে বেড়িয়ে যায়। বুধাদিত্য শুধু তাকিয়ে থাকে ওর লাল ঠোঁটের দিকে, তোতাপাখীর মতন কিচিরমিচির করে কথা বলছে আর নড়ছে, সেই সাথে নরম পাতলা আঙ্গুলের নড়াচড়া। শরীরের সুগন্ধে গাড়ির ভেতর ভরে গেছে, ওই মাদকতা ময় রুপের কাছে হার মেনে গেছে বুধাদিত্য। পুরানো ঝিলাম ফিরে এসেছে এক নতুন করে। পারলে বুকের এক কোনায় লুকিয়ে রেখে দেবে এই তরঙ্গিণীকে।
Reply
#26
একাদশ পর্বঃ অপ্রকাশিত বন্ধন। (#2)





প্রচন্ড গরম, ঘরে ঢুকেই এসি চালিয়ে দেয় বুধাদিত্য। ঝিলামের থাকার জন্য বুধাদিত্য নিজের শোয়ার ঘর ছেড়ে দেয়। প্রথম বার নিজের শোয়ার ঘরে অন্য একজনের পায়ের ছাপ। ঝিলাম ওকে জিজ্ঞেস করে কোথায় শোবে, উত্তর বুধাদিত্য জানায় যে গেস্ট রুমে থাকবে এই কটা দিন। বুধাদিত্য ওর ব্যাগ আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখে নিজের জামা কাপড় নিয়ে বেড়িয়ে যায়। ঝিলাম বাথরুমে ঢুকে পরে। বুধাদিত্য মনের মধ্যে আনন্দের খই ফোটে, অবশেষে ভালোলাগার রমণী ধরা দিয়েছে। কয়েকটা দিনের জন্য হলেও, চোখের সামনে থাকবে “ঝিল্লি”। হাত মুখ ধুয়ে বারমুডা আর গেঞ্জি পরে বসার ঘরে বসে থাকে। মন বারেবারে উঁকি মারে শোয়ার ঘরে, ঝিলামের অপেক্ষায় এক মিনিট যেন এক বছর বলে মনে হয়। কাঁধে তোয়ালে, চোখ মুখ তরতাজা, সকালের বিষণ্ণতার লেশ মাত্র নেই শরীরে। সারা অঙ্গে এক নতুন মাদকতা, এক নতুন প্রাণশক্তি নিয়ে ঝিলাম বেড়িয়ে আসে বাথরুম থেকে। পরনে একটা ঢিলে টপ আর গাড় নীল রঙের স্লাক্স। ওর যৌবনের ডালি ফুলে ফুলে ভরা। সেই রুপসুধা দুই চোখে আকণ্ঠ পান করে বুধাদিত্য। 

ঝিলাম ফ্রিজ খুলে বলে, “কাঁচা বাজার ত কিছু নেই, একটু বাজারে গিয়ে কিছু নিয়ে এস।”

বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে, “খাসির মাংস নিয়ে আসি?”

ঝিলাম আলতো ধমক দেয়, “এই গরমে খাসির মাংস খেতে হবে না। পারলে সি.আর.পার্ক না হয় গোবিন্দপুরি থেকে ট্যাঙরা মাছ নিয়ে এস।”

বুধাদিত্য, “আমি ট্যাঙরা ফ্যাংরা চিনিনা, কাটা কাতলা না হলে রুই নিয়ে আসব।”

ঝিলাম, “চেন টা কি, তাহলে? বাঙালি হয়ে মাছ চেন না?”

বুধাদিত্য, “ছোটো বেলা থেকে হস্টেলে মানুষ, মাছ চেনাবার মতন কেউ কোনদিন পাশে ছিল না।”

ঝিলামের মনে পরে যায় বুধাদিত্যের অতীতের কথা। মন কেমন করে ওঠে ওর চোখ দেখে, মিষ্টি গলায় বলে, “আজ তাহলে সামনে থেকে কিছু কাঁচা বাজার করে নিয়ে এস, কাল মাছের বাজার যাওয়া যাবে।”

বুধাদিত্য, “যথাআজ্ঞা ঝিল্লিরানী।” খিলখিল করে হেসে ফেলে ঝিলাম, ওর মুখে “ঝিল্লি” নাম শুনে বুকের ভেতরে প্রজাপতি পাখা মেলে নেচে ওঠে। বুধাদিত্য গায়ে একটা টিশার্ট পরে বাজারে বেড়িয়ে যায়। সাধারণত সপ্তাহে একদিন বাজার করলে ওর চলে যায়, কিন্তু এবার থেকে মনে হয় ঝিলাম প্রত্যকে দিন বাজারে পাঠাবে। কাঁচা সবজি কিনে বাড়ি ফিরে দেখে রান্না ঘরে ঝিলাম। ঘরে যা ছিল তাই দিয়ে রাতের খাবার তৈরি করে ফেলেছে প্রায়। বুধাদিত্যকে দেখে বলে, সবজি গুলো ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিতে। রাতে তাড়াতাড়ি খেতে হবে। বুধাদিত্য মুখ কাচুমাচু করে জানায় যে রাত দশটা এগারোটার আগে ও খায় না। ধমকে দেয় ঝিলাম, রাতে তাড়াতাড়ি খেতে হয় তারপরে না হয় টিভি দেখতে পারে বা নিজের কাজ করতে পারে। ঝিলামকে সকালে উঠতে হয় স্কুল যাবার জন্য। পরেরদিন শনিবার, ছুটি, কি করবে অত সকালে উঠে, সেই শুনে ঝিলাম একটু শান্ত হয়। বুধাদিত্য কাতর চোখে এক কাপ কফির আবেদন করে, ঝিলাম কপট রেগে জানিয়ে দেয় এত রাতে কফি খেলে ভাত খেতে পারবে না। বুধাদিত্য বুঝতে পারে যে ওর জীবনের অঙ্ক এক নতুন খাতায় আঁচর কাটতে শুরু করেছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিলাম কে দেখে যায়। হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত খালি, ফর্সা পায়ের গুলির মসৃণ ত্বক আলোতে চকচক করছে, পরনের কাপড় এঁটে বসে ওর কোমরের নিচে। জড়িয়ে ধরে ওর ফর্সা গোলাপি গালে চুমু খেতে ইচ্ছে করে। কোনোরকমে সেই মনোবৃত্তি সামলে নেয়। 

রাতের খাওয়া দাওয়া ঝিলামের চাপের ফলে তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে হয়। খাওয়ার পরে নিজের ঘরে ঢুকে যায় ঝিলাম। 

ঝিলাম, “এসি বন্ধ করে দাও, এই দুদিনে এসি তে থেকে আমার অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। পরে ত আর এসি পাবো না।” 

বুধাদিত্য, “আমার অভ্যেস খারাপ করে দিচ্ছ যে? অত সকালে উঠতে পারব না আমি।”

ঝিলাম, “ঠিক আছে, শুধু ছুটির দিনে ছুটি, উইক ডেইসে কিন্তু আমার সাথে উঠতে হবে।”

বুধাদিত্য, “অত সকালে উঠে আমি কি করব?”

ঝিলাম, “কাজের লোক সকালে আসে তার সাথে দাঁড়িয়ে থেকে ঘর পরিষ্কার করাবে।”

বুধাদিত্য, “বাপরে, ওই সব আমার দ্বারা হয় না। কুতুব মিনার থেকে লাফ দিতে বললে লাফ দিয়ে দেব।”

ঝিলাম, “ঠিক আছে তোমাকে দেখতে হবে না। কাল এলে আমি ওকে বলে দেব বিকেলে আসতে। আমিও স্কুল থেকে ততক্ষণে ফিরে আসব, তারপরে ওকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেব।”

বুধাদিত্য, “তাহলে আমার টিফিনের কি হবে?”

ঝিলাম, “স্কুল বের হবার আগে তোমার টিফিন বানিয়ে দিয়ে যাব।”

বুধাদিত্য ম্লান হেসে বলে, “কতদিন ঝিলাম, কতদিন করবে?”

হটাত ওই কথা শুনে হারিয়ে যায় ঝিলাম। বুকের ভেতর হুহু করে কেঁদে ওঠে, কতদিন এই সুখ? হয়ত ক্ষণিকের। দুজনেই মনের ভাব ব্যাক্ত করে না। শুধু চোখে চোখে কথা হয়। ঝিলাম চোখ নিচু করে ঘরের আলো বন্ধ করে শুয়ে পরে। বুধাদিত্য চুপচাপ বসার ঘরে বসে টিভি চালিয়ে দেয়। চোখের সামনে বিশাল টিভির স্ক্রিনে আলাস্কার সবুজ, নীল অধভুত সুন্দর নরদান লাইটস ঝকমক করছে, মনের ভেতরে ঝিলামের চোখের জল ভেসে যায়। চুপ করে সিগারেট জ্বালিয়ে একটার পর একটা সিগারেট টানতে থাকে। সময়ের খেই হারিয়ে ফেলে বুধাদিত্য, ডিসকভারি চ্যানেলে কি চলছে, কি চলছে না, কিছুই মাথায় ঢোকে না। চিন্তাশক্তি লোপ পেয়ে গেছে ওর, মাথা শূন্য। কি করে ওই ইতর, নীচ, বিশ্বাসঘাতক সমীরের কবল থেকে মুক্ত করা যায় এই ফুলের কুঁড়িকে। একমাত্র উপায়, যদি ওদের ডিভোর্স হয়, না হলে এই জীবনে ঝিলামকে বুকে পাওয়ার স্বপ্ন শুধু মাত্র স্বপ্ন থেকে যাবে। অতি সযত্নে রাখা সেই সুন্দর ইভিনিং ড্রেসিংগাউন আলমারির কোনায় পরে থাকবে। 

“কি হল এখন ঘুমাতে যাও নি?” ঝিলামের ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বর শুনে বুধাদিত্য আচমকা সোজা হয়ে বসে। শোয়ার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ঘুমঘুম চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, “পারে বটে মানুষটা। রাত একটা বাজে যাও ঘুমাতে যাও। ডিসকভারিতে আর কিছু নতুন দিচ্ছে না।” নিরুপায় বুধাদিত্য, ঝিলামের আদেশের সামনে নিজেকে সমর্পণ করে শুতে চলে যায়। 

এতদিন সকাল বেলা একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারত বুধাদিত্য। সুন্দরী এক নদীর ঝঙ্কারে সকাল থেকে বাড়ি মুখরিত। কাজের লোক সকাল বেলা এসে যায়। তাকে নিয়ে ব্যাস্ত বাড়ির নতুন রাজ্ঞী “ঝিল্লি”। বিছানায় শুয়ে আধোঘুমে আধজাগরন, “ঝিল্লি”র কলতান কানে ভেসে আসে, “সারা বরতন ধোকে পেহেলে স্লাব পে রাখ দেনা, ফির পানি ঝড়নে কে বাদ উঠাকে রাখনা।” “ইয়ে সোফা কে নিচে ঠিক সে ঝাড়ু লাগা, উওহ কোনে মে ক্যায় হ্যায়, উধর নেহি কিয়া ক্যা? ইয়হান পোছা মার ঠিক সে, নেহি দুবারা মার।” সেই কলতান মধুর করে তোলে পায়ের নুপুরের আওয়াজ। গতকাল ছিল না, সকালে হয়ত পড়েছে। বুধাদিত্য টের পায়, ওর ঘরে ঢুকে ওর গায়ের ওপরে চাদর একটু টেনে দেয়্*। এসি বন্ধ করে, ফ্যান চালিয়ে দেয়। নিচু স্বরে কাজের লোককে আদেশ দেয়, “সাব কা বিস্তর কে নিচে ঠিক সে ঝাড়ু পোছা লাগা দেনা।” বুধাদিত্য আধাচোখ খুলে নতুন রাজ্ঞীর রুপ দর্শন করে। সকালেই মনে হয় স্নান সেরে নিয়েছে, ভিজে চুল পিঠের ওপরে মেলে ধরা, চেহারায় ভোরের সূর্য ঝলমল করছে পরনে ঢিলে প্যান্ট, গায়ে ঢিলে একটা জামা। ওর চোখ খোলা দেখে মিষ্টি হেসে, ঘুম থেকে উঠতে বলে। মুক্ত সাজান দাঁতের ঝিলিক দেখে বুধাদিত্য কাতর চোখে আবেদন করে, একটু ঘুমাতে দাও? মাথা নাড়ায় ঝিলাম, ঠিক আছে, কিন্তু মাত্র এক ঘন্টা, ন’টার সময়ে উঠিয়ে দেবে। তাইসই, মাথার নিচের বালিস মাথার ওপরে চেপে ধরে আবার স্বপ্নের মধ্যে ডুবে যেতে চেষ্টা করে বুধাদিত্য। স্বপ্নে তলিয়ে যায় প্রান, তরঙ্গিণীর সুরে তালে নেচে ওঠে পাগল বুধাদিত্য। তপ্ত বালুকাবেলায় আবার জেগে ওঠে ভালোবাসার মরূদ্যান। 

“দাঁত মেজে নাও এবারে, কফি বানিয়ে ফেলেছি।” দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আদেশ দেয় ঝিলাম, “কি হল, ওদিকে ফিরে আর শুতে হবে না। কাল মাংস খাবে বলছিলে? আনতে যাবে না?” 

অগত্যা বুধাদিত্য উঠে পরে। অর্ধখোলা চোখের সামনে ঝিলামকে দেখে মনে হয় ভাসাভাসা মেঘের আড়ালে দাঁড়িয়ে স্বর্গের অপ্সরা ওর দিকে তাকিয়ে হাসে। কফি হাতে বসার ঘরে বসে ঝিলামকে দেখে, সারা ঘর নেচে বেড়ায় সেই সুন্দরী তরঙ্গিণী। থেকে থেকেই কানে ভেসে আসে ঝিলামের কণ্ঠস্বর, “চা খাও না? শুধু কফি! ধুর, আমার কফি একদম ভালো লাগে না। বিকেলে আমাকে নিয়ে একটু বাজারে বেরিয়, অনেক কিছু কেনার আছে।” “শুধু রান্না ঘরটা বড়, হাড়ি কড়া বলতে কিছুই নেই। কি করে কাটালে এত দিন?” “একি, জ্যামটা শুকিয়ে চিনির দলা হয়ে গেছে? খাও না যখন ফালতু কিনতে যাও কেন?” “বরফের ট্রে ভেঙ্গে গেছে, একটা কিনতে পার না?” “স্টাডির টেবিল সিগারেট খেয়ে পুড়িয়ে দিয়েছ? মরন আমার, আশট্রে কোথায়?” “ওয়াশিং মেশিনের কভার কোথায়? দাগ পরে গেছে সারা গায়ে। বাড়িতে একটা কলিন্স নেই।” একটা কাগজ পেন ছুঁড়ে দেয় ওর দিকে, “একটা লিস্ট বানাও আমি বলছি, বিকেলে কিনতে যেতে হবে।” “জিরে, ধোনে, শুকনো লঙ্কা, লঙ্কা গুরো, কালা মিরচ, জাবিত্রি, জায়ফল, গোলাপ জল, কালো জিরে, মুগ ডাল, মটর ডাল, ছোলার ডাল, অরহর ডাল, সানফ্লাওয়ার তেল, সরষের তেল...”

বুধাদিত্য লিখে চলে চুপচাপ, ফর্দ তৈরি হয়ে গেলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “আর কিছু বাকি আছে? না না, মনে করে নাও।”

ঝিলাম, “মনে পড়লে আবার বলব, কাগজ টা ওখানে রেখে দিয়ে এবারে দই আর মাংস নিয়ে এস।”

বুধাদিত্য, “তোমার দরকার পড়লে নিজে লিখে নিও, আমাকে জ্বালাতে যেও না।”

ঝিলাম হেসে বলে, “আহা রাগ দেখ। ঠিক আছে আমি লিখে নেব। উঠে পড়ো আর মাংস আনতে যাও।”

দুপুরে খাওয়ার পরে ঝিলাম বুধাদিত্যকে বলে বিকেলে বাজার করার পরে ওর বাড়িতে নিয়ে যেতে। জানায় যে ওই বাড়ি থেকে আরও জিনিস পত্র আনতে হবে, বুধাদিত্যের রুকস্যাক আর একটা সুটকেস খালি করতে বলে। ঝিলাম জানায় যে ওর একটা বড় আলমারি চাই। বুধাদিত্য বড় আলমারি খুলে দেয়, সারিসারি সুট টাঙ্গানো আর ওর কিছু জামাকাপড় ছাড়া আর কিছু নেই। একপাসে ভাঁজ করে রাখা ঝিলামের দেওয়া সুট পিস। সেটা দেখে ঝিলাম একটু রেগে যায়, বুধাদিত্য জানায় যে সময়ের অভাবে আর সেটা বানানো হয়নি। ফের আদেশ হয় যে বিকেলে বেড়িয়ে বাজার করে, সুটের মাপ দিয়ে ওকে যেন একবার ওর বাড়িতে নিয়ে যায়। ঝিলাম ব্যাগ থেকে জিনিস পত্র বের করে আলমারি সাজিয়ে নেয়।

বিকেল বেলা ঝিলামের সাথে বাজার করতে যেতে হয় অগত্যা বুধাদিত্যকে, তারপরে কাল্কাজির একটা নামকরা সুটের দোকানে ঢুকে ওর সুটের মাপ দেওয়া হয়। সবশেষে ঝিলামের বাড়ি গিয়ে ব্যাগ আর সুটকেস ভর্তি করে নিজের জিনিস। দুটি ব্যাগ, একটা সুটকেস, একটা মেকআপ বাক্স, সব নিয়ে ভালো করে তালা দিয়ে ঝিলাম বেড়িয়ে পরে। ওর মুখ দেখে মনে হয় যেন এই বাড়িতে আর পা রাখার মন নেই। সমীর এলে ওর সাথে একটা বিহিত করতে চায়। এই একদিনে ওর মনের জোর অনেক বেড়ে গেছে, ওর পাশে ওর সব থেকে বড় শক্তি দাঁড়িয়ে, বুধাদিত্য। 
Reply
#27
একাদশ পর্বঃ অপ্রকাশিত বন্ধন। (#3)





রাতের খাওয়ার পরে ঝিলাম শোয়ার ঘরে ঢুকে বুধাদিত্যকে ওর মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে। বলে যে সমীরের কাছে শুনেছিল যে ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে ওর মা মারা যান। সেই শুনে ঝিলাম সেদিন পায়েস বানিয়ে এনেছিল। বুধাদিত্য চুপ করে মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে, ছোটো বেলার কথা মনে পরে যায়, মায়ের কথা মনে পরে যায়। চোখের কোনে একচিলতে জল ছলকে আসে। ঝিলাম ওর কাঁধে হাত রাখতেই শক্ত হয়ে যায় বুধাদিত্য। হেসে জানায় যে পুরানো ব্যাথা জাগিয়ে কি হবে। ঝিলাম ওই চোখের আড়ালে ঘন কালো মেঘের দেখা পায়। জিজ্ঞেস করে ওর বাবা কোথায়? চোয়াল শক্ত হয়ে যায় বুধাদিত্যের, ক্রুর চোখে তাকায় ঝিলামের দিকে, মনে হয় যেন ইচ্ছে করেই ধাক্কা দিল ঝিলাম। সুবির গুহ’কে যত বার ভুলে যেতে চায় ততবার কেউ কেন ওকে মনে করিয়ে দিতে আসে। আরও রেগে যায় যখন দেবস্মিতার মুখ ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। চোয়াল চেপে ঝিলামকে বলে, যে এক সুন্দরী নারীর কবলে পরে ওর বাবা ওকে ছেড়ে, ওর মাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। ঝিলামের বুক কেঁপে ওঠে বুধাদিত্যের ব্যাথার কাহিনী শুনে। হাত বাড়িয়ে ওকে ছুঁতে যায়, কিন্তু বুধাদিত্য কারুর অনুকম্পায় বাঁচতে নারাজ। গত চোদ্দ বছরে একা থেকে ওর হৃদয় পাথরের মতন কঠিন হয়ে গেছে। বুধাদিত্য বেড়িয়ে আসে ঘর থেকে। ঝিলাম চুপ করে থাকে, ভাবে একি করে ফেলল। 

ঝিলাম ওর পাশে বসে নিচু গলায় বলে, “আমি সরি, আমি জানতাম না এই সব। সত্যি বলছি জানলে আমি আঘাত দিতাম না তোমাকে।”

ম্লান হেসে বলে, “জানি তুমি জানতে না, ঠিক আছে ছেড়ে দাও ও সব কথা। আমি মিস্টার সুবির গুহ’র ব্যাপারে কোন কথা বলতে চাই না।”

ঘরের আবহাওয়া সেই পুরানো ব্যাথার কাঁপুনিতে বদ্ধ হয়ে ওঠে। ঝিলাম চেষ্টা করে সেই বদ্ধ ভাব কাটিয়ে দিতে, বুধাদিত্যকে বলে, “এই, আইস্ক্রিম খেতে যাবে?”

বুধাদিত্য, “পাগল হলে নাকি? এত রাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আইস্ক্রিম খাবে?”

ঝিলাম, “ধুর বোকা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কে আইস্ক্রিম খাবে। ইন্ডিয়া গেট গিয়ে আইস্ক্রিম খাবো, প্লিস চলো না, একদম না করবে না।”

কাষ্ঠ হাসি হাসে বুধাদিত্য, “সবাই তাদের বউ না হয় গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ওখানে আইস্ক্রিম খেতে যায়।”

ঝিলাম, “বাঃরে, আমি তোমার বান্ধবী নই? আমি মেয়ে আবার বান্ধবি, ব্যাস ইংরাজি মানে গার্লফ্রেন্ড।” ঝিলাম ইংরাজির শিক্ষিকা, সেও জানে সে কি বলেছে আর বুধাদিত্য জানে সে কি শুনেছে। দু’জনের মুক ভাষা পরস্পরের বুকের মাঝে হাজার বাক্য রচনা করে চলে। ঝিলাম দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে নিজের জন্য একটা স্টোল আর বুধাদিত্যের জন্য একটা টিশার্ট নিয়ে আসে। স্টোল নিজের গলায় জড়িয়ে ওর হাতে টিশার্ট ধরিয়ে দিয়ে বলে, “চলো।”

হাঁ করে তাকিয়ে থাকে বুধাদিত্য, “সত্যি তুমি যাবে?” আপাদমস্তক একবার ঝিলামকে দেখে নেয়। ঢিলে প্যান্ট ঢিলে শার্ট, মাথার চুল একটা রবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে নেয়। ঝিলাম ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে বলে, চল, দাঁড়িয়ে কেন? নিজের পরনে শুধু একটা বারমুডা আর টিশার্ট। 

ইনোভা দাঁড় করায় রাজপথে। রাত প্রায় এগারোটা বাজে, সারা দিল্লী ঘুমিয়ে শুধু রাজপথে লোকের ভিড়, সবাই গাড়ি চেপে এসেছে এখানের হাওয়া খেতে আর আইস্ক্রিম খেতে। হলদে আলো সাড় বেঁধে দাঁড়িয়ে, ইন্ডিয়াগেটের অমর জাওান জ্যোতি থেকে সেই প্রেসিডেন্ট ভবন পর্যন্ত। চারদিকে লোকের ভিড়। গাড়ি থেকে নেমেই ছোটো মেয়ের মতন দৌড় লাগায় আইস্ক্রিম ঠ্যালা দেখে। বুধাদিত্য গাড়ি বন্ধ করার আগেই দুটি আইস্ক্রিম কিনে আনে। ঝিলাম গাড়ির পাশে ঠেস দিয়ে মনের আনন্দে আইস্ক্রিম চাটে আর সামনের দিকে তাকিয়ে আলো আর মানুষ দেখে। বুধাদিত্য ভাবে আইস্ক্রিম চাটবে না ঝিলামের ফর্সা গাল। গোলাপি নরম গালে একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করে, একটু ছুঁতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছেটা বড় প্রবল হয়ে ওঠে বুধাদিত্যের, ওর দিকে হাত বাড়িয়ে ওর গাল থেকে চুলের গোছা সরিয়ে দেয়। আচমকা গালের ওপরে উষ্ণ হাতের পরশে কেঁপে ওঠে ঝিলাম, ভুরু কুঁচকে বুধাদিত্যের দিকে তাকায়। 

বুধাদিত্য মিচকি হেসে বলে, “গালের পাশে একটা কিছু লেগে ছিল সেটা সরিয়ে দিলাম।” 

ঝিলাম ছোটো মেয়ে নয়, ওর বোঝার ক্ষমতা আছে যে কোন আছিলায় বুধাদিত্য ওর একটু পরশ চায়। বুকের মাঝে এক অব্যাক্ত টান অনুভব করে, বৈধ না অবৈধ জানেনা। ঝিলাম ওর উষ্ণ আঙ্গুলের পরশে একটু গলে যায়, ওর পাস ঘেঁসে দাঁড়ায়। বাজুর সাথে বাজু ছুঁয়ে যায়, শরীরের সাথে শরীর মৃদু চেপে যায়। দুই তৃষ্ণার্ত নরনারীর শরীরে উত্তাপ ছড়াতে বেশি দেরি হয় না। বুধাদিত্যের কঠিন বাজুরে পেশির ওপরে মাথা হেলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতরে এক নিরাপত্তার ভাব জেগে ওঠে। 

ঝিলামকে আলতো ধাক্কা মেরে বলে, “আরও কয়েকটা আইস্ক্রিম কিনে নিয়ে এস, যাও।”

ঝিলামের মুখে হাসি আর ধরে না, প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, “সত্যি!!!”

বুধাদিত্য মাথা নাড়ায়, “হ্যাঁ সত্যি... যাও তারপরে গাড়ি ওঠ।”

ঝিলাম দৌড়ে গিয়ে আরও দুটি আইস্ক্রিম কিনে নিয়ে আসে। ততক্ষণে বুধাদিত্য গাড়ির মধ্যে উঠে পরে। ঝিলাম কাতর চোখে তাকিয়ে অনুরোধ করে যে এখুনি বাড়ি যেতে চায় না। বুধাদিত্য বলে, বাড়ি ওরা যাবে না, আজ একটা লম্বা ড্রাইভে যাবে। সেই শুনে উচ্ছল তরঙ্গিণীর মতন নেচে উঠে গাড়ির মধ্যে ঢুকে পরে। 

ঝিলামের চোখে মুখে আনন্দের ফোয়ারা, প্রানবন্ত সুরে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় যাবো?”

বুধাদিত্য, “সকালে উঠে তোমার স্কুল যাবার তাড়া নেই, আমার অফিস যাবার তাড়া নেই। কাজের লোক আসার তাড়া নেই, ছেলে পিটিয়ে ঘোড়া বানানোর তাড়া নেই, পয়সার পেছনে দৌড়ানোর তাড়া নেই। একদিন সব তাড়া ছাড়িয়ে, এমনি সারা রাত গাড়ি চালাব, ব্যাস।”

বুধাদিত্যের গাড় গলার আওয়াজ ঝিলামকে নিয়ে যায় এক স্বপ্নপুরীতে। চোখের কোনা চিকচিক করে ওঠে, “চল নিয়ে, দাঁড়িয়ে কেন?”

গাড়ি ছুটিয়ে দেয়, বিকাজিকামা পেরিয়ে, জয়পুর হাইওয়ে ধরে। ঝিলাম গিয়ারের পাস ঘেঁসে বসে থাকে। খালি রাস্তায়, রাত বারোটা, গাড়ি উদ্দাম গতি নিয়ে ছুটতে শুরু করে। বুধাদিত্যের ইচ্ছে করে এই গাড়ি না থামিয়ে ওকে নিয়ে এই সব সংসারের পাঁক থেকে দুরে কোথাও নিয়ে চলে যায়। ঝিলামের শরীরের উত্তাপ ওর কাঁধে এসে লাগে, ঝিলামের মাথার চুল উড়ে এসে ওর চোখে মুখে কালো পর্দা ফেলে দেয়। নাকে ভেসে আসে সুন্দর মাদকতা ময় এক ঘ্রান। এসি বন্ধ করে দেয় ঝিলাম, গাড়ির কাঁচ নামিয়ে দিয়ে রাতের হাওয়ায় নিজেকে ভাসিয়ে দেয়। গাড়ি প্রথম টোলগেট পার হবার পরে একশো ছুঁয়ে যায়। সামনের সাড়ি সাড়ি ট্রাক, একের পর এক বাসের লাইন, বুধাদিত্যের গাড়ি আজ উন্মাদ ঘোড়ার মতন ছুটছে। একের পর এক গাড়ি পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় টোলগেট পার হবার পরে স্পিডমিটারের কাঁটা একশো কুড়ি, একশো তিরিশের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে। ঝিলামের বুকে জেগে ওঠে এক নব মুক্তির স্বাদ, পাশে বসা এই উন্মাদ ঘোড়ার সাথে হারিয়ে যাবার ইচ্ছে প্রবল ভাবে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। 

হটাত গুনগুন করে গান গেয়ে ওঠে ঝিলাম, “কেন কিছু কথা বলো না... শুধু চোখে চোখ রেখে, যা কিছু চাওয়ার আমার নিলে চেয়েয়ে, একি ছলনা, একি ছলনা... কেন কিছু কথা বলো না... যত দূর দূর থাকো, শুধু চেয়ে চেয়ে থাকো, সে চাওয়া আমার, আকাশ আমার বাতাস ভরে রাখো, একি ছলনা, একি ছলনা... কেন কিছু কথা বলো না...”

গানটা শুনে বুধাদিত্যের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, গাড়ির গতি ধিরে করে ঝিলামের দিকে তাকায়। ঝিলাম, গাড়ির অন্যদিকের জানালা দিয়ে ছোটো মেয়ের মতন মাথা বের করে গান গেয়ে চলেছে। এ যেন এক অন্য ঝিলামকে দেখছে, বুধাদিত্য। হটাত বাঁপাশ দিয়ে একটা গাড়ি খুব জোরে হর্ন দিয়ে ছুটে আসে। বুধাদিত্য জোরে ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে দেয়। বাঁ হাতে ঝিলামের জামা টেনে ধরে ভেতর ঢুকিয়ে নিয়ে আসে। টানের ফলে ঝিলাম সোজা বুধাদিত্যের বুকের ওপরে আছড়ে পরে। গাড়ির গা ঘেঁসে পাশের গাড়িটা ছুটে বেড়িয়ে যায়। ঝিলামের হাত ভেঙ্গে যেত একটু হলে, বুধাদিত্যের জামার কলার চেপে ধরে কেঁপে ওঠে ঝিলাম। ঝিলামের কোমল শরীর ওর বুকের ওপরে চেপে যায়, সারা শরীরে বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে চলে। আসন্ন বিপদ দেখেতে পেয়ে ঝিলামের বুক ভয়ে দুরুদুরু কাঁপে। মুখ লুকিয়ে রাখে বুধাদিত্যের প্রসস্থ বুকের ওপরে। নরম গাল চেপে থাকে বুকের পেশির ওপরে, কানে ভেসে আসে বুধাদিত্যের বুকের ধুকপুক শব্দ। সেই শব্দ যুদ্ধের দামামার মতন প্রবল। বুধাদিত্য বাঁ হাতে ঝিলামকে প্রগাড় ভাবে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে থাকে। চিবুক দিয়ে চেপে ধরে ওর মাথা, বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলতে চায় এখুনি। সময় থমকে দাঁড়িয়ে পরে দুজনের বুকের মাঝে। চোখ বন্ধ করে সেই উষ্ণতার রেশ সারা অঙ্গে মাখিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে ঝিলাম, কিন্তু পারেনা শুধু বিবেকের টানাপড়েনে। 

কিছু পরে জামা ছেড়ে ওর বাহু পাশ ছেড়ে নিজেকে ঠিক করে নেয় ঝিলাম। বুধাদিত্যের বুকের ওপরে ওর মিষ্টি গন্ধ, নরম শরীরের পরশ লেগে থাকে। অলঙ্ঘনীয় কোন স্বাদের দিকে হাত বাড়ানোর ছায়া বুকের মধ্যে বিধে যায়। গান থামিয়ে, জানালার বাইরে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকে ঝিলাম। চুপচাপ আবার গাড়ি চালাতে শুরু করে দেয় বুধাদিত্য, গাড়ির গতি কমিয়ে দেয়। মনের ভেতরে একটা উদ্দাম ভাব ছিল সেটা হটাত করে উধাও হয়ে গেল। ঝিলামের দিকে তাকানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে বুধাদিত্য। সামনের দিকে তাকিয়ে শূন্য বুকে গাড়ি চালায়। কিছু পরে রাস্তা অনেকটা ফাঁকা হয়ে আসে, রাত অনেক গভীর, সামনে আলো যায় কিন্তু ফিরে আসেনা এমন কালো অন্ধকার। উলটো দিক থেকে শুধু ট্রাকের সারি আর গুমগুম আওয়াজ। হুহু করে ওঠে বুকের মাঝে, শূন্য হৃদয় নিয়ে গাড়ি চালাতে থাকে। অনেক পরে মনে হয় একটু ঝিলামকে দেখে। ঘাড় ঘুড়িয়ে লক্ষ্য করে যে ঝিলাম জানালায় হাত রেখে তার ওপরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। চোখের কোল বেয়ে সরু একটা শুকনো জলের রেখা নাক পর্যন্ত বয়ে গেছে। রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে একটা সিগারেট জ্বালায়। বুক ভরে ধোয়া টেনে নেয়, চোয়াল শক্ত করে বলে, এই বুকে এই ধোয়া ছাড়া আর কিছু নেই। 

বুধাদিত্যের সম্বিৎ ফিরে আসে ঝিলামের মৃদু ডাকে, “সকাল চারটে বাজে, বাড়ি ফিরবে না?”

কেউই পরস্পরের মুখের দিকে তাকাতে পারেনা। ঝিলাম এখনো সমীরের বউ, জানেনা ঝিলামের মনে কি আছে, সোজাসুজি জিজ্ঞেস করার মতন সাহস নেই বুধাদিত্যের। আয়েশার সাথে সঙ্গমের সময়ে বুধাদিত্যের সেই অবৈধ প্রেম বুকের ভেতরে চরম উত্তেজনা জাগিয়ে তুলেছিল। ঋজু বুধাদিত্য, গত চোদ্দ বছর ধরে দুঃসাহসের সাথে লড়াই করে গেছে জীবনের সঙ্গে, কোন বাঁধা তাকে আজ পর্যন্ত আটকাতে পারেনি, সেটা নারীসঙ্গ হোক, বা জীবনযুদ্ধ হোক। আজ এই ফুলের মতন ললনার সামনে বুধাদিত্য অতিব ভীতু হয়ে যায়। মাথা নিচু করে গাড়িতে উঠে পরে বুধাদিত্য। সারা রাস্তা দুজনে চুপচাপ, শুধু মাত্র গাড়ির আওয়াজ ছাড়া আর কিছু কানে যায় না। গাড়ির আওয়াজ ছাড়া দুজনের কানে অন্য এক আওয়াজ ভেসে আসে, ফাঁকা এক হৃদয়বিদীর্ণ কান্নার আওয়াজ।
Reply
#28
একাদশ পর্বঃ অপ্রকাশিত বন্ধন। (#4)





বাড়ি ফিরে দু’জনে নিজের নিজের ঘরের মধ্যে ঢুকে পরে। বুধাদিত্যের ঘুম আর আসেনা, বুকের বেদনা প্রবল হয়ে ওঠে। দরজা, জানালা বন্ধ করে এসি চালিয়ে দেয়, চেষ্টা করে দিনের আলো সরিয়ে দিয়ে রাত নামিয়ে আনতে। চেষ্টা করে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়তে। কিন্তু বাথরুম থেকে জলের আওয়াজে আর ঘুম হয় না। বুঝতে পারে যে ঝিলাম এক জ্বালায় জ্বলছে, জলে ভরা নদী কিন্তু নিজের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য জল তার কাছে নেই। বুধাদিত্য বিছানায় শুয়ে শুনতে পায় ওর নুপুরের আওয়াজ। ঝিলামের চোখে ঘুম নেই, বাড়ির কাজে নিজেকে ব্যাস্ত রাখতে প্রবল চেষ্টা করে। সারা বাড়ি যেন আজ চকচকে করে দেবে। নিজেই ঝাড়ু পোছা শুরু করে দেয়। আলমারি খুলে সব নোংরা বিছানার চাদর, বালিশের কভার, সোফার কভার নিয়ে কিছু অয়াশিং মেশিনে কিছু নিজের হাতে কাচতে শুরু করে। নিজের ওপরে অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে চলে, মন কিছুতেই শান্ত হয় না। চোয়াল শক্ত করে চোখ বন্ধ করে বিছানায় পরে থাকে বুধাদিত্য। বুঝতে পারে যে ওর ঘরে ঢুকে আলমারি খুলে কাপড় চোপড় নিয়ে গেছে। চোখ খুলে ওকে দেখার শক্তি টুকু নেই। 

অনেকক্ষণ পরে ঝিলাম ওর ঘরের দরজায় টোকা মেরে বলে, “স্নান সেরে নাও, খাবার তৈরি হয়ে গেছে।”

বুধাদিত্য চুপচাপ বিছানা ছেড়ে উঠে স্নান সেরে খাবার টেবিলে বসে পরে। বাড়ির চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখে, অনেক দিন আগে অনিন্দিতাদি এসে সোফার কভার আর ঘরের পর্দা কিনে দিয়ে গেছিল। সেই গুলো কোথায় পড়েছিল জানত না, ঝিলাম সেই সব গুলি আলমারি থেকে বের করে ঘর সাজিয়ে ফেলেছে। মেঝে চকচক করছে, টেবিল চকচক করছে, ব্যাল্কনিতে একগাদা কাপড় মেলে রাখা। আড় চোখে ঝিলামের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করে যে তাঁর মুখ থমথমে, গম্ভির, চোখের কোন চিকচিক, দুই চোখ একটু লাল। টেবিলে একটা থালা তাতে বুধাদিত্যের খাবার বাড়া। 

বুধাদিত্য গম্ভির স্বরে জিজ্ঞেস করে, “তোমার থালা কোথায়?”

ঝিলাম গম্ভির স্বরে উত্তর দেয়, “তুমি খেয়ে নাও আমি পরে খাব।”

বুধাদিত্য, “সকাল থেকে কিছু খাওনি’ত, বসলে কি ক্ষতি আছে?”

ঝিলাম ওর কথার উত্তর না দিয়ে বলে, “ভাত ভাঙ্গ, ডাল দেব।”

বুধাদিত্য, “কালকের মাংসের কিছু বেঁচে ছিল সেটা কোথায়?”

ঝিলাম, “সারা রাত ঘুমাও নি, রাতভর গাড়ি চালিয়েছ, সকালে বাড়ি ফিরে ঘুমাও নি। শরীর খারাপ করে মরার ইচ্ছে আছে?”

বুধাদিত্য আর ঘাঁটাতে সাহস পায়না ঝিলামকে। চুপচাপ খেতে শুরু করে। ঝিলামকে উলটো দিকের চেয়ারে বসে ওকে খেতে দেয়। কেউ কারুর চোখের দিকে সোজাসুজি তাকায় না, একজন যখন তাকায় তখন অন্যজনের মুখ অন্যদিকে থাকে। নিঃশব্দে কথা বলে মানসিক দ্বন্দ। 

বুধাদিত্য কিছু পরে জিজ্ঞেস করে, “তোমার গরমের ছুটি কবে থেকে?”

ঝিলাম, “কেন?”

বুধাদিত্য, “না, বাড়ি যাবে বলছিলে, তা টিকিট কাটা হয়ে গেছে?”

ঝিলাম, “আসছে শুক্রবার, তারপরের শুক্রবার থেকে ছুটি। সমীরকে বলেছিলাম টিকিট কাটতে, এর মাঝে...” কথাটা বলেই ফর্সা মুখখানি বেদনায় পাংশু হয়ে যায় ঝিলামের। উলটো হাতে নাক মুছে নেয়, চোখের কোনে যে জলের ফোঁটা চিকচিক করছিল সেটা ওর চোখের লম্বা পাতা ভিজিয়ে দেয়। একটু ধরা গলায় বলে, “খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি।”

বুধাদিত্য চুপচাপ খেয়ে উঠে চলে যায়। স্টাডিতে ঢুকে ল্যাপটপ খুলে বসে পরে অফিসের কাজ করতে। কাজে মন ডুবিয়ে দিতে চেষ্টা করে। কিছুতেই মন বসাতে পারেনা, চোখের সামনে ল্যাপটপ খোলা পরে থাকে। কিছুপরে জল খাবার জন্য খাবার ঘরে এসে দেখে, ঝিলাম একাএকা বসে খাবার খাচ্ছে। খেতেখেতে বারেবারে নাক, চোখ মুছে চলেছে। বুধাদিত্য ওকে না ঘাটিয়ে জলের বোতল নিয়ে স্টাডিতে ঢুকে পরে। 

প্রজেক্টের কাজে নিজেকে ডুবিয়ে দেয় বুধাদিত্য, সময়ের খেয়াল থাকেনা। দুপুর গড়িয়ে, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে যায়। খেয়াল পরে যখন ঝিলাম ওর ঘরে ঢুকে ওর সামনে এক কাপ কফি রেখে চলে যায়। পেছন থেকে দেখে ঝিলামের চলে যাওয়া। হটাত চুড়িদার কামিজ পড়েছে, সাধারণত বাড়িতে থাকলে এই কাপড় পরে না। একবার মনে হল জিজ্ঞেস করবে কিন্তু আর জিজ্ঞেস করা হয় না। অফিসের কয়েকজনের ফোন, প্রেসেন্টেসানের কাজ, কিছু সারভার খুলে দেখা, এই করতে করতে সময় কেটে যায়। মাঝেমাঝে কান পেতে ঝিলামের পায়ের আওয়াজ শুনতে চেষ্টা করে। কিন্তু সেই নুপুরের রিনিঝিনি শব্দ আর শুনতে পায়না। কিছু পরে সামনের দরজা বন্ধ করার আওয়াজ শুনতে পেয়ে চমকে ওঠে। বাইরে বেড়িয়ে দেখে, হাতে একটা প্লাস্টিক, ঝিলাম জুতো খুলে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। 
জিজ্ঞেস করে ঝিলামকে, “কোথায় গেছিলে?”

উত্তর দেয় ঝিলাম, “মাছের বাজারে। দুপুরে নিরামিষ খেয়েছ তাই ভাবলাম একটু মাছ আনি।”

বুধাদিত্য, “আমাকে বললেই পারতে আমি নিয়ে আসতাম।”

ঝিলাম, “তুমি কাজে ব্যাস্ত ছিলে তাই আর তোমাকে বিরক্ত করিনি।”

বুধাদিত্য, “আচ্ছা, তোমার প্লেনের টিকিট কেটে দিলে হবে?”

ঝিলাম, “দুর্গাপুরে প্লেন নামে না। পূর্বা’তে তৎকালে টিকিট কেটে নেব।”

বুধাদিত্য, “প্লেনের টিকিট কেটে দেব খানে। কোলকাতা থেকে গাড়ি ঠিক করে দেব, তোমাকে দুর্গাপুর পৌঁছে দেবে। আসার দিনেও সেই গাড়ি তোমাকে নিয়ে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দেবে।”

ঝিলাম ঘাড় ঘুড়িয়ে বুধাদিত্যের চোখের দিকে তাকায়, অনেকক্ষণ পরে পরস্পরের চার চোখ এক হয়। ঝিলাম ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, দুই চোখ তখন চিকচিক করে। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে থাকে, বুকের ঝড়কে শান্ত করার প্রবল চেষ্টা। ঝিলাম কিছু পরে ওকে বলে, “দেখি ভেবে দেখব খানে।”

আবার সারা বাড়ি নিস্তব্ধতায় ঢেকে যায়। টিভি দেখতে মন করে না, সোফায় বসে খবরের কাগজে মুখ ডুবিয়ে বসে থাকে বুধাদিত্য। কানে ভেসে আসে অতিপরিচিত নুপুরের ঝঙ্কার, কিন্তু সেই নদীর কলতান যেন হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে খবরের কাগজ থেকে মাথা তুলে দেখে ঝিলামকে। সময়ের সাথে সাথে নিজেদের স্বত্তায় ফিরে আসে দুজনে। রাতে দু’জনে এক সাথে খেতে বসে। 

ঝিলাম ওকে বলে, “বাড়ির ডুপ্লিকেট চাবিটা দিও।”

বুধাদিত্য, “কেন?”

ঝিলাম, “তোমার অফিসে অনেক কাজ থাকে, রোজ দিন অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায় আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে। আমি অটো করে একাই চলে আসব।” 

বুধাদিত্য কিছু বলে না, মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেয় যে দিয়ে দেবে। কিছু পরে বলে, “কাল দেখি, একটা ড্রাইভারের ব্যাবস্থা করে নেব।”

ঝিলাম, “খাবার পরে একটু ল্যাপটপ’টা দিও ত, একটু মেইল দেখার আছে আর স্কুলে কিছু কাজ করার আছে।”

একটু অবাক হয়ে যায় বুধাদিত্য, ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “তোমার ল্যাপটপ নেই?”

ঝিলাম চিবিয়ে উত্তর দেয়, “তোমার মতন বড়লোক নই যে ল্যাপটপ কিনতে পারব।”

বুধাদিত্যের সহ্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়, চাপা গলায় বলে, “কি করেছি একবার বলতে পার? কেন এমন করে কথা বলছ?”

ঝিলাম থালা থেকে মুখ উঠিয়ে ওর চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তারপরে চাপা গম্ভির গলায় বলে, “কিছু করনি। আমার ভুল, আমি তোমার সাথে এখানে এসেছি। ঠিক আছে, আমি ব্যাগ ঘুছিয়ে নিচ্ছি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এস।”

ঝিলামের চাপা কান্না বুকে বেঁধে রাখে, বুধাদিত্য চেপে যায় বুকের ব্যাথা, ওর কথার কোন উত্তর দেয় না। 
পরেরদিন সকাল বেলা উঠে দেখে যে ঝিলাম স্কুলের জন্য বেড়িয়ে গেছে। ফ্রিজের ওপরে একটা হলদে স্টিকনোটে লেখা, “কফি, মাইক্রো তে রাখা, কুড়ি সেকেন্ড গরম করে নেবে। উপমা বানিয়ে রেখে গেছি, একটু গরম করে খেয়ে নিও। টিফিন তৈরি করে খাবার টেবিলে রাখা, লাঞ্চের আগে পারলে একবার গরম করে নেবে।”

অফিসে গিয়ে জানতে পারে যে বুধবার অফিসের কাজে চন্ডিগড় যেতে হবে। নিজেকে সেই কাজে ডুবিয়ে দেয়। দুপুরে একবার ভাবে ঝিলামকে ফোন করবে, কিন্তু ইতিস্তত ভাবে আর করা হয়না। প্রোডাক্টের ম্যানাজার, রাকেশ সান্ডিল্য, ওকে মজা করে জিজ্ঞেস করে যে ওর গার্লফ্রেন্ড এল না। ওর কথা হেসে উরিয়ে দেয়। অফিসের মোটামুটি সবাই আচ করে ঝিলাম আর বুধাদিত্যের সম্পর্কের ব্যাপারে। কিন্তু রাকেশ ছাড়া অন্য কেউ ওকে ঘাঁটানোর বিশেষ সাহস করেনি কোনদিন। মাঝেমাঝেই রাখেশ মজা করে, কিন্তু বুধাদিত্য ওর সব কথা মজার ছলে উরিয়ে দেয়। লাঞ্চের কিছুপরে নেহেরু প্লেসে গিয়ে ঝিলামের জন্য একটা দামী ল্যাপটপ কেনে। রমণীর অভিমান কিছু করে ভাঙ্গাতে হবে না হলে বাড়ির পরিবেশ দমবন্ধ হয়ে আসছে।

বিকেল পাঁচটায় ঝিলামের ফোন আসে, ফোন ধরতে গিয়ে এক অন্য উত্তেজনায় হাত কেঁপে ওঠে। বুধাদিত্য, “কি হয়েছে?”

ঝিলাম, “কখন বাড়ি ফিরবে?” গলার স্বর অনেক স্বাভাবিক হয়ে গেছে “ঝিল্লি”র।

বুধাদিত্য চাপা হেসে বলে, “কফি বানাও, আমি এই এখুনি আসছি।”

হেসে ফেলে ঝিলাম, “কফি গরম থাকতে থাকতে না পৌঁছালে কিন্তু কফি পাবে না।”

বুধাদিত্যের মন নেচে ওঠে ঝিলামের হাসি শুনে, “একটা সারপ্রাইস গিফট আছে তোমার জন্য।”

ঝিলাম হেসে বলে, “আগে বাড়ি এসে আমাকে উদ্ধার কর, তারপরে দেখব খানে।”

বুধাদিত্য আর দাঁড়ায়না, ব্যাগ উঠিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। দরজা খুলে দাঁড়ায় ঝিলাম, সেই পুরাতন ঝিলাম, উজ্জ্বল দুই চোখে হাসি ফিরে এসেছে, গালের লালিমা ফিরে এসেছে। উচ্ছল তরঙ্গিণী আবার নিজের মত্ততায় মেতে উঠেছে। 

হেসে বলে বুধাদিত্যকে বলে, “কফি বানানোর আগেই উপস্থিত দেখছি। অফিসে কাজ ছিল না নাকি?”

বুধাদিত্য ওর দিকে ঝুঁকে বলে, “কফির কথা শুনে আর থাকতে পারলাম না।”

ঝুঁকে পড়ার জন্য ঝিলামের মুখের ওপরে উষ্ণ শ্বাস বয়ে যায়, বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে, “হ্যাঁ অনেক হয়েছে।”
“একটা সারপ্রাইস আছে” বুধাদিত্য ওর হাতে ল্যাপটপের বাক্স ধরিয়ে দিয়ে বলে, “তোমার জন্য।”

হাতে ল্যাপটপের বাক্স নিয়ে একটু অবাক হয়ে যায়, তারপরে হেসে ফেলে ঝিলাম, “হটাত কি মনে করে? তোমাকে কিছু বলা মানে তুমি সারা পৃথিবী নিয়ে আসবে মনে হচ্ছে।”

বুধাদিত্য ঘরে ঢুকে বলে, “আমার ল্যাপটপে যাতে আর হানা না দেওয়া হয় তাই নিয়ে এলাম।”

ঝিলাম মজা করে বলে, “কেন তোমার গার্লফ্রেন্ডেদের সাথে কবে কোথায় কিকি কেচ্ছাকলাপ কি করেছ সেই সব ছবি তুলে রেখেছ নাকি? চিন্তা নেই আমি চোখ বন্ধ করে নিতাম ওই ফটো দেখলে।”

চাপা হেসে ফেলে বুধাদিত্য, শুধু মাত্র আয়েশার কয়েকটা ফটো আছে ল্যাপটপে তা ছাড়া অসংখ্য পর্ণ মুভি’ত আছেই। ঝিলামের কাঁধে একটু ধাক্কা মেরে বলে, “দেখার সখ আছে নাকি?”

কপট রাগ দেখিয়ে বলে, “জাঃ শয়তান।” বুধাদিত্যের পিঠে আলতো করে চাঁটি মেরে বলে, “যাও ফ্রেস হয়ে নাও, আমি তোমার জন্য চা খাব বলে বসেছিলাম।”

বুধাদিত্য তাড়াতাড়ি জামাকাপড় ছেড়ে বসার ঘরে এসে বসে। শনিবার রাতে বাজার থেকে চা কিনে আনা হয়েছিল। ঝিলাম নিজের জন্য চা বানায় আর বুধাদিত্যের জন্য কফি। 

চা খেতে খেতে ঝিলাম জিজ্ঞেস করে, “কত দাম নিয়েছে ল্যাপটপের?”

বুধাদিত্য, “কেন দাম দেবে নাকি?”

ঝিলাম ভুরু কুঁচকে বলে, “হ্যাঁ টাকা জমিয়ে নিয়ে তোমাকে ফিরিয়ে দেব।” তারপরে হেসে বলে, “শয়তান, আমাকে নিয়ে যেতে পারলে না, ল্যাপটপ কেনার সময়ে, একটু দেখে নিতাম।”

বুধাদিত্য, “একদম ভালোটা এনেছি, এইচ.পি’র বেশ ভালো ল্যাপটপ। অফিস থেকে সব লোড করে নিয়ে এসেছি। নিয়ে আস সব দেখিয়ে দিচ্ছি।”
Reply
#29
একাদশ পর্বঃ অপ্রকাশিত বন্ধন। (#5)




ঘরের পরিবেশ আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়, দু’জনে ল্যাপটপ খুলে বসে পরে, ঝিলামের হাজার প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়, “এটা কি? ওটা কি করে খুলতে হয়? একটা হেডফোন আনতে পারনি, একটু কানে লাগিয়ে গান শুনতাম।”

বুধাদিত্য বলে, “বাড়িতে দামী ফাইভ পয়েন্ট অয়ান মিউসিক সিস্টেম আছে, কবার গান শুনেছ বলতে পার?”

ঝিলাম ওর কাঁধে আলতো চাঁটি মেরে হেসে বলে, “পরশু দিন কাজে চলে গেল। কাল থেকে মাথার ওইত খিচুরি করে রেখে দিয়েছিল। তারমধ্যে গান, হ্যাঁ।”

বুধাদিত্য হেসে বলে, “ওকে বাবা সরি। আচ্ছা একটা কথা আছে, বুধবার সকাল বেলা আমাকে চণ্ডীগড় যেতে হবে।”

ঝিলাম, “গাড়িতে যাবে না শতাব্দীতে?”

বুধাদিত্য, “গাড়িতে যাবো, মিটিং শেষ হলেই আবার যাতে ফিরতে পারি।”

ঝিলাম ধমকে ওঠে, “না অত দূর গাড়ি চালিয়ে যেতে হবে না, শতাব্দী করে যেও।”

বুধাদিত্য কোনদিন চণ্ডীগড় ট্রেনে যায়নি, যেতেও চায় না। গাড়ি চালাতে খুব ভালোবাসে বুধাদিত্য। মিটিঙ্গে কেউ না কেউ ওর সাথে যায়, পথে তাই কোন কষ্ট হয় না। এবারে রাকেশ যাবে ওর সাথে। বুধাদিত্য ওকে বলে, “না কোন প্রবলেম নেই গাড়ি চালাতে।”

ঝিলাম, “ড্রাইভার খুঁজে পেয়েছ?”

বুধাদিত্য একদম ভুলে গেছিল ড্রাইভারের কথা, জিব কেটে বলে, “জাঃ একদম ভুলে গেছি।”

ঝিলামের আরও এক চাটি বুধাদিত্যের পিঠের ওপরে, রেগে মেগে বলে, “আগে একটা ড্রাইভার খুজবে। যদি কালকের মধ্যে ড্রাইভার পাও তাহলে গাড়িতে যাবে না হলে ট্রেনে যাবে। একা গাড়িতে আমি যেতে দেব না। ব্যাস শেষ কথা।”

বুধাদিত্য, “আচ্ছা বাঃবা, আমি ফোন করে দেখছি।”

ঝিলাম, “ড্রাইভার পঁয়তাল্লিশ পঞ্চাসের কাছাকাছি হতে হবে, তাঁর পুলিস ভেরিফিকেশান করাতে হবে।”

বুধাদিত্য ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “অত বয়স কেন?”

ঝিলাম, “একটু বয়স্ক ড্রাইভার ভালো গাড়ি চালায়, ধিরে সুস্থে গাড়ি চালায়, আর অন্তত এদিক ওদিক তাকায় না।”

হেসে ফেলে বুধাদিত্য, বুঝতে পারে ঝিলাম কি বলতে চায়, “তুমি আর বল না, তুমি রাস্তা দিয়ে হাটলে, আবালবৃদ্ধবনিতা তোমার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারে না। সে আমি বুড়ো আনি কি জোয়ান ড্রাইভার আনি।”

ঝিলাম লজ্জায় লাল হয়ে যায়, “ধুত, অনেক হয়েছে তোমার। যা বলছি সেটা করো। আমি রান্না করতে চললাম।”

ঝিলাম উঠে পরে রান্না করতে চলে যায়। অগত্যা বুধাদিত্যকে বেশ কয়েক জনকে ফোন করতে হয় ড্রাইভারের জন্য, না হলে আর গাড়ি নিয়ে যেতে দেবে না। এমনিতে একটা ড্রাইভারের দরকার ছিল, ঝিলামকে স্কুল থেকে আনার জন্য। আগে যখন ছেড়ে আসতে হত তখন মাঝে মাঝে বুধাদিত্যকে মিটিং ছেড়ে বা কোন কাজ ছেড়ে আসতে হত। ড্রাইভার থাকলে সেই অসুবিধে গুলো হবে না। যাদের ফোন করেছিল, তারা জানায় যে পরেরদিন বিকেলের মধ্যে ড্রাইভার যোগাড় করে দেবে। 

পরেরদিন যথারীতি কেটে যায় কাজে কর্মে। বিকেলবেলায় দুটি ড্রাইভার আসে, তাদের মধ্যে একজনের কথাবার্তা শুনে আর কাজের কথা শুনে ঝিলাম তাকে কাজে নিযুক্ত করে। ড্রাইভার বিহারী নাম কালিনাথ, বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ। ঝিলাম ওকে কাজ বলে দেয়, যে সকালবেলা, বুধাদিত্যকে অফিসে ছেড়ে দিতে হবে, তারপরে দুপুরে ওকে স্কুল থেকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আবার অফিসে যেতে হবে। বিকেলে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তবে ছুটি, যদি কখন বিকেলে কাজ থাকে তাহলে দেরি করে ছুটি পাবে। বুধাদিত্য চুপচাপ ঝিলামকে দেখে, অতি নিপুণ হস্তে সব কিছু করে চলেছে। ড্রাইভার চলে যাবার পরে বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে যে এবারে ওর মন শান্তি হয়েছে কিনা। হেসে ফেলে ঝিলাম, বলে যে তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়তে, পরেরদিন চণ্ডীগড় যেতে হবে।

পরেরদিন বুধবার, সকালবেলা ঝিলাম ঠেলে বুধাদিত্যকে উঠিয়ে দেয়। ঘুম চোখে উঠে স্নান সেরে তৈরি হয়ে নেয়। ঝিলাম ওর আগেই উঠেছে দেখে একটু অবাক হয়ে যায়। অবশ্য ওর অনেক সকালে ওঠার অভ্যাস আছে। কফি বানিয়ে দেয়। কালিনাথ কে বারবার বলে দেয় ঠিক ভাবে গাড়ি চালাতে। ম্যাডামের কথা অমান্য করে না। বুধাদিত্যের আঁকাবাঁকা রেখার জীবন সরল রেখায় চলতে শুরু করে। চণ্ডীগড় পৌঁছান মাত্র ঝিলাম ফোন করে জেনে নেয় যে ঠিক ভাবে পৌঁছেছে কিনা। সারাদিন কাজের মধ্যে খুব ব্যাস্ত থাকে, সারাদিনে আর ফোন করা হয়ে ওঠেনি। রাখেশ ফেরার পথে ফোঁড়ন কাটে, কিরে শালা, গার্লফ্রেন্ড কে ফোন করে জানাবি না? তখন বুধাদিত্যের মনে পরে ঝিলামকে ফোন করা হয়নি। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি ফোন করে ঝিলামকে। ঝিলাম ফোন তুলেই একটু সাবধান বানী শুনিয়ে দিল, যে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে আর কালিনাথ কে ধিরে সুস্থে গাড়ি চালাতে। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়, ঝিলাম ওর জন্য না খেয়ে বসে থাকে। বাড়ি ফিরে ঝিলামের মুখের হাসি দেখে সারাদিনের ক্লান্তি কেটে যায় এক নিমেষে। ঝিলাম ওর হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে স্টাডিতে রেখে দেয়, ওর জন্য জল এনে দেয়। বুধাদিত্যের বড় ইচ্ছে করে নিবিড় আলিঙ্গনে বাঁধতে, আবার ওই পুরানো দ্বিধা বোধ ওকে আটকে দেয়। ওই মিষ্টি হাসি হারাতে চায় না, সময়ের ওপরে সব ছেড়ে দেয়। 

শুক্রবার সকালবেলা ঝিলাম যথারীতি স্কুলে বেড়িয়ে গেছে। এই কদিনের মধ্যে সমীরের বা অন্য কারুর ফোন আসেনি, ঝিলামের খোঁজ নেবার জন্য। ঝিলামকে জিজ্ঞেস করেনি, সমীরের কথা, ফোন করেছিল কিনা সেটাও জানা হয়নি। বুধাদিত্য অফিসের কাজে ব্যাস্ত, ঠিক লাঞ্চের পরে ঝিলামের ফোন আসে। গলা শুনে মনে হল খুব ত্রস্ত আর উদ্বেগ মাখা।

ঝিলামের গলা কাঁপছে, “বাড়ি আসতে পার এখুনি?”

বুধাদিত্য, “তুমি কোথায়?”

ঝিলাম, “আমি বাড়িতে, গাড়ি তোমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।”

বুধাদিত্য, “কি হয়েছে?”

ঝিলাম, “সমীর এসেছে বাড়িতে, তুমি প্লিস এখুনি বাড়ি আস।”

সমীরের নাম শুনেই মাথায় রক্ত চড়ে যায় বুধাদিত্যের। চোয়াল শক্ত করে ঝিলামকে বলে, “সামনের দরজা খোলা রেখে দেবে, আর বসার ঘরে বসিয়ে রাখবে। ফোন অন রাখ, কিছু হলে যেন আমি শুনতে পাই।”

ঝিলাম কাতর কণ্ঠে ডাক দেয়, “প্লিস, তাড়াতাড়ি এস।”

তাড়াতাড়ি ব্যাগ নিয়ে কালিনাথ কে গাড়ি চালাতে বলে। বাড়িতে ঢোকার আগে, প্যাসেঞ্জার সিটের নীচ রাখা বাক্স থেকে পিস্তল’টা বের করে প্যান্টের পেছনে গুঁজে নেয়। একটু এদিক ওদিক করলে সমীরের মাথার মধ্যে সব কটা গুলি নামিয়ে দেবে, তারপরে যা হবার হবে, যদি মরতে হয় তাহলে বুকের মাঝে ঝিলামের ভালোবাসা নিয়ে মরবে। দৌড়ে তিনতলার সিঁড়ি চড়ে। বাড়িতে এসে দেখে, ঝিলাম কথা মত বাড়ির সদর দরজা হাঁ করে খুলে রেখেছে। সমীর মাথা নিচু করে সোফার ওপরে বসে আর ঝিলাম বেশ কিছু দুরে খাবার টেবিলের পাশে চেয়ারে বসে। বুধাদিত্য একবার সমীরের দিকে তাকায়, একবার ঝিলামের দিকে তাকায়। ওকে দেখে, ঝিলাম প্রানে বল পায়। সমীর ওর দিকে মাথা তুলে তাকায়, চোখ মুখ বিধ্বস্ত পরাজিত সৈনিকের মতন। দুই চোখ লাল, কিন্তু সেই করুন চোখ, মিনতি ভরা চাহনি বুধাদিত্যকে শান্ত করতে পারে না।

ওর সামনের সোফায় বসে ধির গম্ভির গলায় সমীর কে জিজ্ঞেস করে, “কি মনে করে এখানে আসা হয়েছে?”

সমীর মাথা নিচু করে উত্তর দেয়, “আমি বড় পাপী, ঝিলামকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। তার প্রায়শ্চিত্ত করতে এসেছি।”

বুধাদিত্য চোয়াল চেপে দাঁত পিষে জিজ্ঞেস করে, “হটাত এই বোধোদয় হওয়ার কারন? নন্দিতা কি লাথি মেরেছে তোর গাঁড়ে?”

সমীর আলতো মাথা দুলিয়ে বলে, হ্যাঁ। বুধাদিত্য ঘাড় ঘুড়িয়ে ঝিলামের দিকে তাকায়। ওর চোখে জল, একবারের জন্য ভেবেছিল যে সমীর অন্য কারুর সাথে শুতে পারে। কিন্তু সেই কথা স্বামীর মুখে শুনে স্থম্ভিত হয়ে গেছে ঝিলাম। স্বামী এক অন্য মেয়ের প্রেমে পরে ওকে ছেড়ে দিয়েছিল, আর সেই স্বামী আবার ফিরে এসেছে। কি করবে ঝিলাম, কিছু বুঝে উঠতে পারে না।

বুধাদিত্য, “তোর বাবা মা’র সাথে কথা বলতে চাই, তারপরে ঝিলামকে এই বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে পারবি।”

সমীর নিচু গলায় বলে, “বাবা মায়ের সাথে কথা হয়েছে আমার। আমার কার্যকলাপে তাঁরা মর্মাহত।”

বুধাদিত্য চিবিয়ে বলে, “এই বোকা... আমাকে গরু পেয়েছ? তুই শুয়োরের বাচ্চা, বললি আর আমি বিশ্বাস করে নিলাম। এখুনি শালা ফোন লাগা কোলকাতায়, লাউডস্পিকারে দে, আমি কথা শুনতে চাই।” ঝিলামকে ইঙ্গিত করে যে পাশের সোফায় এসে বসতে। ঝিলাম ধির পায়ে বুধদিত্যের পাশের সোফায় এসে বসে পরে। 

নিরুপায় সমীর প্রথমে ইতস্তত করে, কিন্তু বুধাদিত্যের লাল চোখের সামনে ঝুঁকে যায়। ফোন লাগায় কোলকাতায়, সমীরের মা ফোন ধরেন। ফোন ধরা মাত্রই ঝিলাম ওর হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সব কিছু বলে দেয়। সমীরের মা চুপ করে কিছুক্ষণ শোনেন সব কথা। তারপরে সমীরকে উত্তমমধ্যম বকা দিতে শুরু করেন। বলেন যে, ঝিলাম যদি চাকরি করতে চায় সে ভালো কথা, ওকে চাকরি করতে দিতে হবে, আর ঝিলামকে যদি কোনদিন কষ্ট দেয় তাহলে এক কথায় তাজ্যপুত্র করে দেবেন। সমীরের বাবা প্রচন্ড রেগে যান, এক কথায় জানিয়ে দেন, যে মা লক্ষ্মীর মতন মেয়ে ঝিলামকে যদি একটুও চোখের জল ফেলতে দেখে তাহলে সমীরকে বাড়িতে ঢুকতে দেবে না। সমীরের চোখে জল, মুখ থমথমে, বুকের মাঝে পরিতাপের ছায়া। সব কথা শোনার পরে লুটিয়ে পরে ঝিলামের পায়ের কাছে। 

পা ধরে বলে, “শেষ বারের মতন ক্ষমা করে দাও ঝিলাম। দয়া করে আমাকে ফিরিয়ে নাও।”

সমীরের বুক ফাটা কান্না দেখে ঝিলাম কেঁদে ফেলে, একবার বুধাদিত্যের মুখের দিকে তাকায়। বুধাদিত্যে সামনে ওর ভালোবাসা চলে যায়, বুধাদিত্য চোয়াল শক্ত করে ঠোঁটে হাসি আনে। মাথা দুলিয়ে সমীরের সাথে যাবার সম্মতি দেয়। বুক ভেঙ্গে আবার টুকরো টুকরো হয়ে যায়। ভেবেছিল সময়ের সাথে সাথে ঝিলামকে ওর কোলে টেনে নেবে, কিন্তু সমীরের কান্না আর পরিতাপের ডাক শুনে সেই স্বপ্ন দূর অস্ত। ঝিলাম চুপচাপ উঠে নিজের ঘরে চলে যায় কাপড় পড়ার জন্য আর ব্যাগ গুছানোর জন্য। 

সমীর চোখের জল মুছে হাত জোর করে বুধাদিত্যের সামনে বসে থাকে। বুধাদিত্য গর্জে ওঠে ওর মুখ দেখে, “মাদা... ওই কুমিরের কান্না আমাকে দেখাবি না। শালা তোকে আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস হয় না, শুধু মাত্র ঝিলামের মুখ দেখে তোকে ছেড়ে দিলাম।” পিস্তল বের করে টেবিলে ওপরে রেখে দেয়। সমীরের নাকের সামনে তর্জনী নাড়িয়ে বলে, “ভাবিস না তোকে ছেড়ে দিলাম আমি। ঝিলামের চুল যদি বাঁকা হয়, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, এই পিস্তলের সব গুলি তোর মাথার মধ্যে নামিয়ে দেব। আমার আগে পেছনে কাঁদার কেউ নেই, বুঝলি। আমি তোকে খুন করে জেলে যেতে রাজি।”

ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে থাকে সমীর, কাতর কণ্ঠে বলে, “না রে, আমি তোর পায়ে ধরে ক্ষমা চাইছি।”

বেশ কিছুপরে ঝিলাম শাড়ি পরে, হাতে একটা সুটকেস নিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে। জল ভরা চোখে বুধাদিত্যের দিকে তাকায়, একবার সারা বাড়ির দেয়ালের দিকে তাকায়। বুধাদিত্য চুপ করে বসে থাকে, চোখের সামনে ঝিলামকে ছেড়ে দিতে বুক কেঁপে ওঠে। কালিনাথ কে ডেকে বলে ওদের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসতে। ঝিলাম ওর সামনে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু কথা বলতে পারে না, দু’চোখে অঝোর ধারায় বন্যা বয়ে চলে। বুধাদিত্য মাথা তুলে তাকাতে পারেনা ঝিলামের মুখের দিকে। ঝিলাম ওর মাথায় আলতো করে হাত ছোঁয়ায়, তারপরে ধির পায়ে সমীরের পেছন পেছন ঝিলাম বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। কালিনাথ ঝিলামের ব্যাগ নিয়ে আগেই নিচে নেমে যায়। ঝিলাম চলে যাবার পরে দরজা খোলা পরে থাকে। স্বপ্ন দেখেছিল বুধাদিত্য, ঝিলামকে ওই দরজা দিয়ে এই বাড়ির গৃহিণী করে আনার। সেই ঝিলামকে শেষ পর্যন্ত সমীরের হাতে সঁপে দিতে হয়। মন মানে না, কিন্তু ঝিলাম যে সমীরের বিয়ে করা, আইনসিদ্ধ স্ত্রী। বাড়ির চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে বুধাদিত্য, বাড়ির আনাচে কানাচে ঝিলামের হাতের ছোঁয়া লেগে। সব জায়গায় ঝিলামের নাম লেখা। একবার মনে হয় এই শোয়ার ঘর থেকে ঝিলাম বেড়িয়ে আসবে।

খানিক পরে দেখে ঝিলাম ওর দরজায় দাঁড়িয়ে। মৃদু হেসে মাথা নাড়ায় বুধাদিত্য, সত্যি পাগল হয়ে গেছে ঝিলামের প্রেমে, দরজায় দাঁড়িয়ে ঝিলামের ছায়া। সম্বিৎ ফিরে পায় যখন রক্ত মাংসের ঝিলাম দৌড়ে এসে ওর বুকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পরে জড়িয়ে ধরে। বুধাদিত্যের বুক সেই প্রেমের পরশে হুহ করে কেঁপে ওঠে। প্রানপন শক্তি দিয়ে ঝিলামকে জড়িয়ে ওর মাথার ওপরে ঠোঁট চেপে ধরে। ঝিলাম দুই হাতে আঁকড়ে ধরে থাকে বুধাদিত্যের ঋজু দেহ। এই বুকের ওপর থেকে যেন মৃত্যুই ওকে ছিনিয়ে নেয় আর কারুর ক্ষমতা থাকে না ওকে বিচ্ছিন্ন করার। 

বেশ কিছু পরে ধরা গলায় ঝিলাম ওকে বলে, “সুট’টা কিন্তু কাল দেবে, মনে করে নিয়ে এস যেন। বড় আলমারির লকারে আমার সব গয়না আর আমার সার্টিফিকেট গুলো রাখা। আমার জিনিস গুলো ছড়িয়ে দিও না আবার। দরকার পড়লে নিয়ে যাব, না হলে এখানেই থাক।” বুকের ওপরে ঠোঁট চেপে ধরে ঝিলাম, কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমি চলে যাবার পরে প্লিস আর মদ খেও না।” বহু কষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “আমি চললাম বুধো, ভালো থেক।”

“বুধো” নাম শুনে চোখ বন্ধ করে নেয় বুধাদিত্য, আলতো করে ওর গালে হাত দিয়ে বলে, “চলি বলতে নেই ঝিল্লিরানি, বলে আসছি।”

“ঝিল্লিরানী” কোন রকমে “বুধো”র হাত ছাড়িয়ে দরজা দিয়ে বেড়িয়ে যায়। বেড়িয়ে যাবার আগে একটু বহু কষ্টে ঠোঁটে হেসে টেনে বলে, “সোমবার গাড়ি পাঠাতে ভুলোনা, আমি অপেক্ষা করে থাকব।”
Reply
#30
দ্বাদশ পর্বঃ কলুষিত দেবী। (#1)





ঝিলাম চলে যাবার পরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে বুধাদিত্য। চোখের সামনে থেকে চলে যায়নি ভেবে ওর বুকে এক নব পল্লব অঙ্কুরিত হয়। নিজের না হোক, দূর থেকে দেখে অন্তত শান্তিতে থাকতে পারবে। পরের দিন বিকেলে ঝিলামের বাড়িতে যায়। ওকে দেখে ঝিলামের মন খুশিতে ভরে যায়। বুধাদিত্য সমীরকে জিজ্ঞেস করে, ঝিলামকে নিয়ে দুর্গাপুর কবে যাবে? ওকে জানায় যে সামনের সপ্তাহে ঝিলামের গরমের ছুটি পরে যাবে। সমীর ওকে জানায় যে এই সবের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য দুর্গাপুর যাবার আগে ঝিলামকে নিয়ে ঘুরতে যাবে, আবার একবার হানিমুন করার ইচ্ছে আছে। জানায় যে ট্রেকিং যাবার ইচ্ছে আছে, যেখানে শুধু সমীর আর ঝিলাম, আর কেউ ওদের সাথে থাকবে না। সব ভুলের মাশুল গোনার জন্য তৈরি সমীর, তাই কোন দূর পাহাড়ের কোলে ওকে নিয়ে গিয়ে ওর সাথে কয়েকটা দিন কাটাবে। বুধাদিত্য জিজ্ঞেস করে যে কোথায় যেতে চায়, তাঁর উত্তরে সমীর জানায় যে জায়গা এখনো ঠিক নেই তবে কিছুদিনের মধ্যে ঠিক করে নেবে। বুধাদিত্যের মনে জাগে অপার শূন্যতা। ঝিলাম শেষে সমীরের সাথে, একা দূর পাহাড়ের কোলে, ঠিক ভেবে উঠতে পারেনা বুধাদিত্যের মাথা। বেশ কিছু সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

রাতের বেলা বুবাইয়ের ফোন, “মামু নেক্সট উইক আমার গরমের ছুটি। মাম্মা বলেছে এবারে আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে।”

ভাগ্নির গলার আওয়াজ শুনে ফাঁকা মন আনন্দে ভরে যায়। বুবাইকে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তোর মা?”

বুবাই, “জানি না মামা, তবে সেখানে নাকি অনেক বড় একটা শিবের মন্দির আছে।”

অনিন্দিতাদি মেয়ের হাত থেকে ফোন নিয়ে বলে, “কিরে কেমন আছিস তুই?”

বুধাদিত্য, “এই বেশ ভালো আছি, ত হানিমুনে যাচ্ছ নাকি?”

অনিন্দিতাদি হেসে ফেলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, মেয়েটাকে তুই দেখ, তাহলে আমি যেতে পারি আমার বরের সাথে।”

বুধাদিত্য, “চলে এস এখানে, ডালহৌসি নিয়ে যাব তোমাকে।”

অনিন্দিতাদি, “যাবোরে, তবে এবারে সুব্রত নেপাল নিয়ে যাচ্ছে।”

বুধাদিত্য, “হুম, বেশ বেশ ঘুরে এস।”

অনিন্দিতাদি একটু চুপ করে গলা নিচু করে বলে, “তোকে একটা কথা বলার আছে। সুবির পিসেমশাই আমাকে কয়েক দিন আগে ফোন করেছিল, তোর ঠিকানা জানতে চেয়েছিল।” কথা শুনে একটু থমকে যায় বুধাদিত্য। অনিন্দিতাদি বলে, “শোন বুধি, উনি তোর বাবা। একবার ত ঠিক ভাবে কথা বলা উচিত অনার সাথে, শোনা উচিত কি বলতে চান। গতবার ঠিক ভাবে কথা না বলে চলে এসেছিলি। মনে হয় তোর ওখানে যেতে চায়, আমি পিসেমশাইকে তোর ঠিকানা দিয়েছি। মাথা ঠাণ্ডা করে একটু ভেবে দেখিস বুধি।” 

বুধাদিত্যের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, “তোমরা, মা মেয়েতে কি শুরু করেছ বলতে পার? আমার ফোন নাম্বার একজন বারোয়ারী বানিয়ে দিয়েছে, আর তুমি আমার ঠিকানা দিয়ে আমার বাড়ি’টাকে ধর্মশালা বানিয়ে দেবে।” রাগ হজম করে হেসে বলে, “আমার পমুসোনা কেমন আছে?”

অনিন্দিতাদি হেসে বলে, “মা ভালো আছে, আমাকে এবারে বলছিল কেদার বদ্রি নিয়ে যেতে।” অনিন্দিতাদি আরও কিছুক্ষণ বাড়ির কথা, মা বাবার কথা বলে ফোন রেখে দেয়। 

সোমবার যথারীতি বুধাদিত্য নিজে যায় ঝিলামের স্কুলে, ওকে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয়। ওর পাশে দাঁড়িয়ে ঝিলামের বুকে নিরাপত্তার এক বাতাস বয়ে যায়। হয়ত পাশে দাঁড়ানোর অধিকার নেই, কিন্তু মনে প্রানে জানে যে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবে বুধাদিত্য। গাড়িতে সারা রাস্তা ঝিলাম বুধাদিত্যের পাশ ঘেঁসে বসে থাকে। ঝিলাম জানায় যে সমীরের আচরন অনেক বদলে গেছে, গতকাল ওকে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছিল। মনের মধ্যে একটু সংশয় ছিল কিন্তু সমীর ফিরে আসাতে ঠিক খুশি হবে না দুঃখিত হবে ভেবে পাচ্ছে না, ঝিলাম। বুধাদিত্য চুপ করে শুনে যায় ওর কথা। ঝিলামের চোখ দুটি ভাসাভাসা, ঝিলামের মনের দ্বন্দ বুঝতে দেরি হয় না। নিচু গলায় ওকে জানায় যে সমীর যখন বদলে গেছে তখন ওর কাছেই ফিরে যেতে। ঝিলামকে জিজ্ঞেস করে যে কোথায় বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে, ঝিলাম মাথা নাড়িয়ে জানায় যে জানেনা। সমীর বলেছে যে একটা বড় চমক দেবে ওকে, একদম নতুন কোন জায়গায় নিয়ে যাবে, যেখানে মানুষ কম যায়। ঝিলামকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দেবার সময়ে বলে বুধাদিত্য সবসময়ের জন্য ওর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবে। ঝিলামের চোখ দুটি ছলছল করে ওঠে, ধির পায়ে বাড়ির মধ্যে চলে যায়।

মাঝে একবার সমীরের অফিসে যায় বুধাদিত্য। সমীরকে জিজ্ঞেস করে যে ওরা কোথায় ঘুরতে যেতে চায়। বুধাদিত্যের প্রশ্নের সামনে সমীর জানায় যে ঝিলামকে একটা চমক দিয়ে চায় এক নতুন জায়গায় নিয়ে গিয়ে। ভালো কথা, কিন্তু বুধাদিত্যকে পুরো যাত্রার পরিকল্পনা না জানালে ঝিলামকে ওর সাথে ছাড়বেনা। বুধাদিত্য জানায় যে সমীরের ওপর থেকে ওর বিশ্বাস উঠে গেছে। সমীর ওকে জায়গার নাম, দিনক্ষণ সব জানায়, আর অনুরোধ করে যে ঝিলামকে যাতে না জানায় ওর পরিকল্পনা। বুধাদিত্য কথা দেয় যে ঝিলামকে জানাবে না, কিন্তু সেই সাথে সাবধান করে দেয় যে কোনরকম চালাকি যেন না করে। সমীর করজোড়ে জানায় যে ফিরে পেয়েছে যখন তখন ঝিলামকে আগলে রাখবে। দিন কয়েক আর দেখা করে না ঝিলামের সাথে, তবে সকাল বিকেল ফোনে খবরাখবর জেনে নেয়। ঝিলাম বারবার বলে দেখা করতে, কিন্তু ইচ্ছে করেই পিছিয়ে যায় বুধাদিত্য, ঝিলাম যদি চোখের সামনে ওকে বারবার দেখে তাহলে হয়ত সমীরকে আবার নিজের করে নিতে পারবে না। ঝিলাম একটু খুশি, সমীর ওকে নিয়ে বেড়াতে যাবে। প্রত্যকে বিকেল ফাঁকা হৃদয় নিয়ে বাড়ি ফেরে বুধাদিত্য। মনে মনে ঠিক করে নেয় যে একবার সমীরের সাথে ঝিলামের সম্পর্ক ঠিক হয়ে গেলে, দিল্লী ছেড়ে, দেশ ছেড়ে অন্য কোন জায়গায় চাকরি নিয়ে চলে যাবে।

একদিন বিকেলে বুধাদিত্যের কাছে এক অপ্রত্যাশিত ফোন আসে, ওপর পাশে দেবস্মিতার কণ্ঠস্বর শুনে অবাকের সাথে একটু বিরক্ত হয়ে যায়। অনিন্দিতাদির কথা মনে পরে ধির স্থির গলায় জিজ্ঞেস করে কারন।

দেবস্মিতা বলেন, “যদি বিশেষ কাজ না থাকে, তাহলে কি একবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এসে দেখা করা যেতে পারে?” 

বুধাদিত্য অবাক, দেবস্মিতা দিল্লীতে আর তিনি হোটেলে উঠেছেন। উলটে জিজ্ঞেস করে বুধাদিত্য, “মিস্টার সুবির গুহ কি সাথে এসেছেন?”

দেবস্মিতা, “না, আমি আর বাপ্পা এসেছি। ব্যস্ত কি খুব? একটু সময় বের করে দেখা করলে বড় ভালো হত।”

বুধাদিত্য, “কবে আসা হয়েছে?”

দেবস্মিতা, “আজ রাজধানিতে। দুপুরে ভেবেছিলাম ফোন করব কিন্তু পরে ভাবলাম যে বিকেলে ফোন করা নিরাপদ।”

বুধাদিত্য, “হটাত এই রকম ভাবে না জানিয়ে দিল্লী আসা আর এসে হোটেলে থাকা, কারন জানতে পারি কি?”

দেবস্মিতা একটু হেসে বলেন, “এমনিতে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা হয়, বারেবারে চেষ্টা করেও ধরতে পারলাম না। তাই একবার ভাবলাম যে না জানিয়ে গিয়ে যদি একটু দর্শন পাওয়া যায় এই ব্যাস্ত মানুষের। কিছু কথা ছিল, আসলে বড় ভালো হত।”

দেবস্মিতার হাসি আর নরম কণ্ঠস্বর শুনে একটু নরম হয়ে যায় বুধাদিত্য। যতই এড়িয়ে যেতে চায় ততই যেন কাছে ডাকে ওর ফেলে আসা অতীত। ভাবে যে বাড়িতে নিয়ে আসাই ভালো তাই দেবস্মিতাকে বলে, “আচ্ছা ঠিক আছে। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে হোটেল পৌঁছে যাব। চেক আউট করে নিলে ভালো হয়, আমি বাড়িতে নিয়ে আসব বাপ্পাকে।”

শুনে একটু খুশি হন দেবস্মিতা, ওকে বলেন, “ঠিক আছে আমি ব্যাগ গুছিয়ে বাপ্পাকে নিয়ে তৈরি থাকব। লবিতে এসে জানিয়ে দিলে আমরা নেমে আসব।”

আধা ঘন্টার মধ্যে হোটেলে পৌঁছে যায় বুধাদিত্য। লবিতে গিয়ে দেবস্মিতাকে ফোন করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেবস্মিতা বাপ্পাদিত্যর হাত ধরে নেমে আসেন। বুধাদিত্যকে দেখেই মায়ের পেছনে লুকিয়ে যায় বাপ্পাদিত্য। বাপ্পাদিত্যের জন্য বুধাদিত্য চকলেট এনেছিল, সেগুলো এগিয়ে দিতে, ছোটো ছোটো পায়ে এগিয়ে আসে বুধাদিত্যের কাছে। দেবস্মিতা চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখে ওদের। বুধাদিত্য ধরে ফেলে সেই শিশুশাবক কে, খিলখিল করে হেসে ওঠে বুধাদিত্যের কোলে উঠে। বুধাদিত্য আপাদমস্তক দেবস্মিতাকে নিরীক্ষণ করে। পরনের শাড়ি বেশ দামী, সাজগোজ আড়ম্বরহীন নেই অথচ অধভুত সুন্দরী দেখতে। এই বয়সে নিজের দেহের গঠন বেশ সুন্দর করে রেখেছেন। ভদ্রমহিলাকে দেখতে দেবীপ্রতিমার মতন, তা সত্তেও ভদ্রমহিলাকে মন থেকে মেনে নিতে কষ্ট হয়। মুখে হাসি মাখিয়ে ওকে গাড়িতে উঠতে বলে। হোটেলের লোক গাড়িতে ওদের ব্যাগ রেখে দেয়। 

গাড়িতে উঠে দেবস্মিতা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “নিজের গাড়ি?”

মাথা নারে বুধাদিত্য, “হ্যাঁ” তারপরে জিজ্ঞেস করে, “মিস্টার গুহ জানেন যে বাপ্পা এখানে এসেছে?”

দেবস্মিতা, “হ্যাঁ জানেন, তিনি আসতে চাইছিলেন। কিন্তু শরীর একটু খারাপ তাই ঠিক সাহস পেলাম না নিয়ে আসার। মনে একটু ইতস্তত ভাব ছিল যে দেখা আদৌ হবে কি না, তাই।”

হেসে ফেলে বুধাদিত্য, দেবস্মিতাকে বলে, “কেন এলে তাড়িয়ে দিতাম নাকি?”

বাড়ি পৌঁছে কালীনাথকে ব্যাগ নিয়ে যেতে বলে। বাড়ি ঢুকে দুই ঘরের এসি চালিয়ে দেয়। দেবস্মিতা একটু অবাক হয়ে চেয়ে থাকেন এত বড় বাড়ি দেখে, “এত বড় বাড়িতে একা থাকা হয়? বিয়েথা করা হয়নি?”

কাষ্ঠ হেসে উত্তর দেয় বুধাদিত্য, “মনে হয় আমার কপালে বিয়ের কথা ভগবান লিখতে ভুলে গেছেন।”

দেবস্মিতা, “চা খাবে?” সেই প্রথম ভাববাচ্য ছেড়ে বুধাদিত্যকে “তুমি” বলে সম্বোধন করেন দেবস্মিতা। বুধাদিত্য তাকিয়ে থাকে দেবস্মিতার দিকে। দেবস্মিতা “তুমি” বলে ফেলার পরেই হেসে বলেন, “আর ভাব বাচ্যে কথা বলতে পারছি না। আপত্তি থাকলে আপনি বলে ডাকতে পারি।”

বুধাদিত্য হেসে দেয়, “না তুমি শুনতে আপত্তি নেই, যদি তোমার না থাকে। আমি চা খাই না, তবে অতিথিদের জন্য চা রাখা আছে। তুমি বস, আমি বানিয়ে দিচ্ছি।”

দেবস্মিতা, “একটু দুধ পেলে ভালো হয়, বাপ্পাকে খাইয়ে দিতাম।”

বাপ্পাকে কোল থেকে নামিয়ে দেয় দেবস্মিতা। বাপ্পা বায়না ধরে টিভি দেখবে, বুধাদিত্য টিভি চালিয়ে দেয়। দেবস্মিতাকে গেস্টরুম দেখিয়ে দেয়, দেবস্মিতা ঢুকে যান গেস্টরুমে। বুধাদিত্য কালীনাথকে বাজার থেকে দুধের প্যাকেট নিয়ে আসতে বলে। বাপ্পার শিশু কলতানে ঘর ভরে ওঠে, বুধাদিত্যকে ওর হাজার প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়, “আমার বাড়িতে এত্ত বড় একটা টিভি আছে জানো।” “ড্যাডা টিভিতে শুধু তাইগার আর দিয়ারের লড়াই দেখে, আমার একদম ভালো লাগে না।” “তুমি আমাকে এত্তা বেনতেন কিনে দেবে, আমি উমঙ্গসর হয়ে সব দুত্তু লোককে মেরে দেব।” “তোমার ফ্রিজে ক্যাডবেরি আছে?” “আমার জন্য একটা কাইট এনে দেবে?” “রাতে তোমার বাড়িতে ব্ল্যাক বেবে আসে?” “তুমি দুধ খাও?” “দুধ খেলে হিম্যান হয়?”
Reply


Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)