Bangla অভিশপ্ত ডায়েরি | Ovishopto Diyeri
Views 256
Replies 89
Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

[-]
Tags
অভিশপ্ত ডায়েরি diyeri ovishopto

Users browsing this thread: 1 Guest(s)
Thread Description
Bangla Voutik Choti Adult Uponnas
#61
পর্ব ২২- সুরঙ্গের অন্তরালেঃ

বংশীঃ আমি একবার এই সুরঙ্গের ব্যাপারে শুনেছিলাম, কিন্তু এটা যে একদম জমিদারবাড়ির ভেতরেই রয়েছে তা আমার জানা ছিলনা। যাই হোক, এই মুহূর্তে আমাদের লোকবলের বিশাল প্রয়োজন। এবং তারসাথে সিপাহীদের সাহায্যর ও খুব দরকার। সিলিং সাহেব আপনাকে আক্রমন করলে সিপাহীরা নিজের থেকেই এগিয়ে আসবে। ওরাও তো একটা যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করে আছে। আপনি কোনও চিন্তা করবেন না, আমি আমার তরফ থেকে সেরা প্রচেষ্টাটা দেওয়ার চেষ্টা করব।
সুপ্রতীকঃ মুশকিল একটাই জায়গায় তা হোল লোকবল। এই এতো কমসময়ে আমরা কি করে যুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় লোক জোগাড় করব।
বংশীঃ জমিদারবাবু এই দায়িত্বটাও আপনি আমায় দিতে পারেন। একসময় আমি জঙ্গলের একচ্ছত্র সম্রাট ছিলাম। সেই দরুন আমার দলে এমন অনেক যোদ্ধাই ছিল যারা লড়াই করতে পিছপা হবেনা। আমায় আপনি একটা ঘণ্টা সময় দিন, আমি আবার নিজের সেই পুরনো দলটা ঐক্যবদ্ধ করতে চাই। আপনি অনুমতি দিলে আমি এখনি বেরিয়ে যাবো।
সুপ্রতীক মাথা নেড়ে নিজের সম্মতি ব্যাক্ত করে। বংশীও আর দেরি না করে বেরিয়ে যায়। বংশী বুঝে গেছে আগুন জ্বলার সমস্ত উপকরন ই মজুদ রয়েছে। শুধু একটা মাচিসের খস করে শব্দ হওয়া বাকি আছে। আর বংশী সেই মাচিসের কাঠিটা নীলকুঠিতেই ফেলতে চায়, আগুনটা ওখানেই আগে জ্বলুক আর তারপর সেই আগুনের রোষে সুপ্রতীক জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। বংশী প্রচণ্ড জোরে হাঁটতে হাঁটতে নীলকুঠীর দিকেই এগিয়ে যায়। নীলকুঠিতে তখন টমাসের শবকে সমাধিস্থ করার বন্দবস্ত করা হচ্ছে। সবাই থাকলেও ওই স্থানে সিলিং সাহেব উপস্থিত ছিলনা। বংশী ভেতরে প্রবেশ করে সোজা ঘরের দিকে চলে যায়। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল টেবিলের ওপর মাথা রেখে সিলিং সাহেব বসে আছেন। হয়ত উনি কাঁদছেন। বংশীর কিছুটা ভয় ই করছিল, তবুও সাহস করে বংশী দরজার বাইরে থেকে মৃদুগলায় বলে ওঠে “সিলিং সাহেব আমি বংশী” টেবিল থেকে মাথাটা উঠিয়ে সিলিং সাহেব বংশীর দিকে তাকান। সিলিং সাহেব যে ওকে দেখে এরকম রুদ্রমূর্তি ধারন করবে তা ও বুঝতেও পারেনি। প্রায় ঝড়ের বেগে ছুটে এসে সিলিং সাহেব বংশীর জামাটা ধরে একটানে ওকে নিচে ফেলে দেয়। বংশী কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সেই সুযোগ ও পায়না, বংশীর টুঁটিটা প্রচণ্ড জোরে টিপে ধরে সিলিং সাহেব বলে ওঠেন
সিলিং সাহেবঃ বল শুয়ারের বাচ্চা, কে মেরেছে আমার ভাইকে। বল নয়ত তোকে এখানেই মেরে ফেলব।
কোনওরকমে বংশী নিজেকে সিলিং সাহেবের কবল থেকে মুক্ত করে বলে ওঠে
বংশীঃ আপনি আমায় সন্দেহ করছেন সাহেব, এতদিন ধরে আমি আপনাকে কত ভেতরের কথা জানিয়ে এলাম। আজ ও তো আমি আপনাকে সবকথা খুলে বলতেই এখানে এসেছি। আমার হাতে বেশি সময় নেই। কেউ যদি জানতে পারে আমি নীলকুঠিতে এসেছি তাহলে আর আমার শরীরে প্রান থাকবে না। আপনি আমায় ছারলে আমি সব খুলে বলব আপনাকে।
বংশীর কথায় সিলিং সাহেবের মেজাজ একটু পরিবর্তন হয়। ওকে ছেড়ে দিয়ে উনি আবার চেয়ারের ওপর গিয়ে বসেন।
বংশীঃ জমিদারবাড়ির ই একদাসি টমাসকে একটা সোনার মুদ্রা দেখিয়ে বলেছিল এটা গুপ্তধন। সেই গুপ্তধনের লোভেই টমাস কাল রাতে ওখানে গেছিল। জমিদারবাড়ির ই কোনও এক লাঠিয়াল এরপর এই ঘটনাটা ঘটিয়েছে। সমস্ত পরিকল্পনাই সুপ্রতীকের। এইভাবে ও প্রজাদের কাছে নিজের সম্মানটা আবার ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেছে। আমি কিছুই জানতাম না, আমি তো কাল গ্রামে ছিলাম। আমি জানলে কি আর এতো বড় সর্বনাশ হতে দিতাম। (দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে একটা মেকি কান্নার চেষ্টা করে বংশী)
সিলিং সাহেবঃ (প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে) আমি জমিদারের মাথা শরীর থেকে আলাদা করে দেবো। ওই জানোয়ারটাকে আমি সবার সামনে হত্যা করব।
বংশীঃ সাহেব, আপনার সামনে একটা সামান্য জমিদার কি আর জিনিস। ওকে হত্যা করলেই কি আপনার সব শোধ মিটে যাবে। আপনার জন্য দারুন একটা খাবার আছে। আজ্ঞা করলে বলব আপনাকে। (চোখের ইশারায় কিছুটা অশ্লীলতা প্রকাশ করে)
সিলিং সাহেব নিজেকে শান্ত করে বংশীর দিকে তাকায়।
বংশীঃ কাল বিকেলে জমিদারের দুই বোন এখানে এসেছে। প্রিয়া ও গার্গী, যমজ দুই বোন। ওদের দেখলে আপনি বলতেই পারবেন না যে ওরা এদেশের মেয়ে। মনে হবে আপনাদের ই জাতের কোনও মেম সাহেব বুঝি। আপনি কি চান তা তো আমি বুঝি, তাই বলছিলাম নীলকুঠিতে ওই দুই অপ্সরাকে নিয়ে আসুন। সমস্ত রাগ জ্বালা জুড়িয়ে যাবে। পরিবারের সম্মানে জমিদার ও কখনো প্রকাশ্যে বলতে পারবেনা যে ওর দুই বোন আপনার কব্জায় রয়েছে।
সিলিং সাহেবের মুখে কামুক শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে। বংশীর ও এটা বুঝতে আর কোনও অসুবিধা থাকেনা যে ওর শেষ পরিকল্পনাটা ১০০ শতাংশ সফল। বংশীও কিছুটা বাঁকা হাসি হেঁসে বলে ওঠে
বংশীঃ আমি ও আমার লাঠিয়ালরা শুধুই একটা লড়াই করার অভিনয় করব। আপনি জমিদারবাড়ি আক্রমন করুন, এবং দুই অপ্সরাকে নীলকুঠিতে এনে ভোগ করুন। আমার তাতে কোনও মাথাব্যাথা নেই। এবার আমায় যেতে আজ্ঞা করুন।
সিলিং সাহেবের মাথা নাড়ার ভঙ্গী দেখে বংশী উঠে পড়ে ও প্রস্থান করার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে যায়। পেছন থেকে সিলিং সাহেব বলে ওঠে
সিলিং সাহেবঃ বংশী, টমাসকে খুনটা কে করেছে?
সিলিং সাহেবের কথা শুনে বংশী কিছুটা চমকেই যায়। বংশী পেছন ঘুরে দেখে একবার। সিলিং সাহেব ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
সিলিং সাহেবঃ তুমি যে এতকিছু করছ, মানে জমিদারের সাথে বেইমানি করে আমার অনুগত হচ্ছ, এতে তোমার কি লাভ?
সিলিং সাহেবের প্রশ্নগুলো বংশীকে একদম ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। কোনরকমে নিজেকে শান্ত করে বংশী বলে ওঠে
বংশীঃ আজ্ঞে, আমি তো আপনাকে বহুবার বলেছি যে জমিদারির অত্যাচার আমরা অনেকেই ভুলতে পারিনি। তাইতো ডাকাত হওয়া, তারপর আপনার সাথে সাক্ষাত হওয়া। আপনার ই আদেশে তো আমি নিজেকে জমিদারবাড়ির অনুগত প্রমান করেছি।
সিলিং সাহেব প্রচণ্ড জোরে হা হা করে হেঁসে ওঠেন আর ইশারা করে বংশীকে চলে যেতে নির্দেশ দেন। বংশীর সেই আত্মবিশ্বাস কোথায় যেন হারিয়ে যায়। বারবার করে ভাবতে থাকে ওর পরিকল্পনায় কোনও ত্রুটি রয়ে গেছে কিনা। টমাসকে যে বংশী নিজের হাতে হত্যা করেছে এব্যাপারে তো কেউ কিছুই জানেনা। সিলিং সাহেবের সন্দেহের তীর যে বংশীর ও দিকে রয়েছে তা বংশীও খুব ভালো করে বুঝেছে। বহুকষ্টে বংশী সব ভুলে গ্রামের দিকে এগিয়ে যায়। ওর ডাকাত দলের বহু সাথী রয়েছে যারা বংশীর এক কথায় লড়াই করতে রাজি হয়ে যাবে। তাদের প্রায় সকলেই এখন ডাকাত দল ছেড়ে সুখি সংসার জীবন পালন করছে। প্রায় আধঘণ্টা ধরে বংশী নিজের সমস্ত পুরনো সাথীকে একত্রিত করে তোলে। ওদের নিজের পরিকল্পনা ও জমিদারের বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিশোধ নিতে হবে সব বুঝিয়ে বলে। বংশী সবাইকে নিয়ে আবার জমিদারবাড়ির দিকে চলতে শুরু করে।
অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই বংশী নিজের সাথীদের নিয়ে জমিদারবাড়িতে প্রবেশ করে। বাইরে তখন সার দিয়ে লাঠিয়ালরা দাঁড়িয়ে ছিল। সবাইকে ওখানে রেখেই বংশী অন্দরমহলে প্রবেশ করে। অন্দরমহলে সুপ্রতীক, নায়েবমশাই ও মালা কোনও ব্যাপারে গভীরভাবে আলোচনা করে যাচ্ছিল। দূর থেকে বংশীর মনে হয় সুপ্রতীক ও নায়েবমশাই মালাকে কিছু বোঝানোর জন্য আকুতি মিনতি করে চলেছেন। মালা ছলছল চোখে মাথা নাড়িয়ে না বলে চলেছে। বংশী ধীরে ধীরে ওদের কাছে এগিয়ে যায়।
সুপ্রতীকঃ এই তো বংশী এসে গেছে। বংশী, কতজন লোক জোগাড় করতে পারলে?
বংশীঃ আজ্ঞে, জমিদারবাবু তা শ দেড়েক লোক হবে। ওরা একসময় আমার সাথী ছিল, ওদের আপনি চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারেন।
সুপ্রতীকঃ (বংশীর দিকে চোখ টিপে, মিথ্যে বলার অভিনয় করে) দেখো বংশী, যুদ্ধ কোনমতেই হবেনা। যতই হোক দেশে একটা আইন কানুন রয়েছে। এইসময় সিপাহীদের বিদ্রোহে ইংরেজরা যথেষ্ট বিপদে পড়েছে। তাই ওরা কোনমতেই যুদ্ধ করতে চাইবেনা। তবুও আমি চাইনা, এই বিপদের মধ্যে বাড়ির মেয়েদের রাখতে। গার্গী আর প্রিয়াকে আমি নায়েবমশাই এর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। আচ্ছা বংশী, তুমি আমায় একবার বলেছিলে না যে জঙ্গলের মধ্যে তোমার কিছু কুঠির রয়েছে। আমি সেখানেই সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে মালাকে রাখতে চাই। এদিকটা একটু শান্ত হয়ে গেলে আবার ওকে নিয়ে আসব। তুমি সাথে আরও ২-৩ জনকে নিয়ে ওর দেখভাল করবে। দেখো মালার সামান্য কোনও অসুবিধা হলে আমি কিন্তু তোমার গর্দান কেটে নেবো।
সুপ্রতীকের কথার জবাবে বংশী কিছু হয়ত বলতে যাচ্ছিল কিন্তু মালা বাধা দেয়। মালা বলে ওঠে
মালাঃ আমি আপনাকে বিপদে ফেলে কোথাও যাবনা। আপনি আমার প্রান নিয়ে নিন, তাও আমি যাবনা।
সুপ্রতীক ও নায়েবমশাই এর মুখের হতাশা দেখে বংশী বুঝতে পারে মালাকে বোঝানোর কাজটা অনেকক্ষণ ধরেই চলে আসছে। মালার দিকে তাকিয়ে বংশী বলে ওঠে
বংশীঃ রানিমা, আপনি এখানে থাকুন। কিন্তু যদি যুদ্ধ শুরু হয় তখন সত্যি ই আপনার জমিদারবাড়ি ত্যাগ করা উচিত। আপনি একটু বুঝে দেখুন, আমরা জমিদারবাবুর সাথে সাথে যদি আপনাকে নিয়েও চিন্তা করি তাহলে কাজটা আমাদের জন্য প্রচণ্ড কঠিন হয়ে যাবে। আপনি এখন থাকুন আমাদের কোনও অসুবিধা নেই। দয়া করে আমার কথাগুলো একটু বুঝুন। আপনি কি মনে করেন আমরা জমিদারবাবুকে যুদ্ধ করতে দেবো। যদি বুঝি আমরা কোনমতেই পেরে উঠছি না তাহলে আপনার মত জমিদারবাবুকেও সুরঙ্গপথ দিয়ে জঙ্গলে পাঠিয়ে দেবো। আমাদের শরীরে প্রান থাকতে উনি নিরাপদ থাকবেন। আমি আপনাকে কথা দিলাম রানিমা।
সুপ্রতীক ও নায়েবমশাই দুজনেই অবাক হয়ে গেলেন, কারন এতক্ষন ধরে যে অসাধ্যসাধনের চেষ্টা ওনারা অক্রে চলেছেন, বংশী সে ব্যাপারে অনেকটাই সফল। বংশীর কথা শুনে মালা একটু শান্ত হয় এবং ভেতরে প্রবেশ করে। মালাকে ভেতরে যেতে দেখে সুপ্রতীক একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে।
সুপ্রতীকঃ চল বংশী, বৈঠকখানায় বসা যাক। আমাদের তৈরি হতে হবে।
বংশী, নায়েবমশাই ও সুপ্রতীক প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে বৈঠকখানায় বসে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ করার ও সিপাহিদের মনোযোগ আকর্ষণ করার পরিকল্পনা করেন। হথাত করে বাইরে থেকে গুলি চলার একটা আওয়াজ ভেসে আসে। ওনারা ৩ জন ই সজাগ হয়ে বৈঠকখানা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। বাইরে ততক্ষনে মালাও বেরিয়ে চলে এসেছে। সুপ্রতীক মালাকে দেখে বলে ওঠে
সুপ্রতীকঃ মালা তুমি দয়া করে বংশীর সাথে যাও। আমার কোনও বিপদ হবেনা। সেরকম কোনও বিপদের আঁচ পেলে আমিও সুরঙ্গ পথে তোমার কাছে চলে আসব। তুমি এখানে থাকলে কাজটা আরও কঠিন হয়ে যাবে।
মালা কিছু না বুঝে চুপ করে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকে। বংশী সামনে এগিয়ে আসে, মালার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে
বংশীঃ রানীমা, আমাদের বিশ্বাস করুন, জমিদার বাবুর কোনও বিপদ হবেনা। সামান্য কোনও বিপদের আঁচ পেলে আমি নিজে সুরঙ্গ পথে জমিদার বাবুকে আপনার কাছে নিয়ে আসব। কিন্তু আপনি থাকলে আমাদের ওনাকে রক্ষা করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
সুপ্রতীক ও বংশীকে সমর্থন করে বলে ওঠে “আমার হুকুম মালা তুমি এখান থেকে চলে যাবে” কিছুটা অসহায়ভাবে মালা একবার সুপ্রতীকের দিকে তাকায়। মালার হৃদয়ের এই যন্ত্রণা, সুপ্রতীকের ও নজর এড়িয়ে যায়নি। স্বামীর আদেশ মত মালা বংশীকে অনুসরন করে। সুপ্রতীক ও নায়েবমশাই পাথরগুলো সরিয়ে দিয়ে ওদের ভেতরে যেতে সাহায্য করে। ওরা ভেতরে প্রবেশ করলে পাথরগুলো আবার সস্থানে রেখে দেওয়া হয়। শেষবারের মত মালা তাকায় নিজের প্রিয়তমর দিকে। সুপ্রতীক ও করুনদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মালার দিকে। সুরঙ্গের অন্ধকারে হারিয়ে যায় মালা। সুপ্রতীকের হৃদয় কেঁদে ওঠে। ও জানেনা সত্যি ও আর নিজের মনের সখাকে কোনোদিন দেখতে পাবে কিনা।


Reply
#62
পর্ব ২৩- মালার বনবাসঃ
সুরঙ্গের ভেতরে নেমে মালা ঠিক ততক্ষন ই ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ ওপরের সামান্য একটা আলোর বিন্দুও ওর চোখে পড়ছিল। নায়েবমশাই ও সুপ্রতীক সুরঙ্গের মুখটায় ভারী পাথরগুলো চাপা দেওয়া অবধি ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকে মালা। হথাত চারপাশে ঘন অন্ধকার নেমে আসে, মালার ভীষণ ভয় লাগতে শুরু করে। সামনের দিকে সামান্য কিছু দেখা যাচ্ছিলোনা। ভয়ে মালা বংশীর হাতটা চেপে ধরে। মালাকে একা পাওয়ার আনন্দে যে দাবানল বংশীর শরীরে জ্বলেছিল মালার কোমল স্পর্শে তা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। বংশী নিজের ডান হাতটা দিয়ে মালার কাঁধটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। দুজনেই ভেতরের দিকে খুব সন্তর্পণে যেতে শুরু করে। একটার পর একটা সিঁড়ি বেয়ে ওরা যে কতটা নিচে নেমে গেছে তা নিজেরাও বুঝতে পারেনি। হথাত ই সিঁড়ি অদৃশ্য হয়ে যায় তার বদলে আসে মসৃণ সমতল। যদিও অন্ধকারের বিভীষিকা ওদের পিছু ছারেনা। অস্ফুট স্বরে মালা বলে ওঠে “আমার খুব ভয় করছে বংশী” নিজের মুখটা বংশী, মালার কানের কাছে নিয়ে যায়। বংশীর নাকে মালার শরীরের সুগন্ধি আতরের গন্ধ ভনভন করে ভেসে আসে। আর সেই সুগন্ধে পাগল হয়ে গিয়ে বংশী ততধিক অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে “ভয়ের কি আছে, আমি আছি তো” কোনও উত্তর দেয়না মালা। ওরা দুজনেই সোজা হাঁটতে থাকে। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর দূর থেকে অস্পষ্ট আলোর ছটা ভেসে আসে। ওরা দুজনেই বুঝে যায় ওরা সুরঙ্গের শেষ অংশে এসে উপস্থিত হয়েছে। ধীরে ধীরে এই আলোর ছটা স্পষ্ট আলোকে পরিনত হয়। মালা ও বংশী দুজনেই দেখতে পায় সামনে ধাপে ধাপে সিঁড়ি ওপরের দিকে উঠে গেছে। ওরা সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। বেশ কিছুটা ওঠার পর বংশী লক্ষ্য করে ওদের ঠিক মাথার ই ওপর নারকেল গাছের শুকনো পাতার একটা ঢিবি। ও বুঝতে পারে, জঙ্গলের মধ্যে যে জায়গায় সুরঙ্গের মুখ রয়েছে তা এইভাবে ঢেকে রাখার ব্যাবস্থা করা হয়েছে।
আশ্চর্য হয়ে যায় বংশী। এই জঙ্গল প্রায় ৫ বছর ধরে ওর রাজত্ব ছিল। অথচ ওর ই রাজত্বের মধ্যে যে এরকম একটা সুরঙ্গ ছিল তা ও কোনোদিন ই জানত না। ওরা দুজনেই সুরঙ্গটার ঠিক মুখে এসে ওঠে। বংশী দুহাত দিয়ে মুখ থেকে পাতার ঢিবিটা ঠেলে সরিয়ে দেয়। সূর্যের তীব্র রোদের তেজে মালা এক হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢাকা দেয়। বংশী আগে ওপরে ওঠে। তারপর নিজের একটা হাত দিয়ে মালার হাত ও আরেক হাত দিয়ে মালার কোমরটা জড়িয়ে ধরে মালাকে টেনে ওপরে তোলে। ওপরে উঠে মালাও একদম আশ্চর্য হয়ে যায়। ওরা ঠিক জঙ্গলের মাঝে এসে পৌঁছেছে, চারপাশে শুধু শাল আর সেগুনের বিশাল বিশাল গাছের সমারোহ। বংশী চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নেয়। এই জঙ্গলকে ও নিজের হাতের তেলোর মত করে চেনে। ও বুঝতে পারে লালডোবার দীঘি থেকে ও খুব একটা দূরে নেই। এই লালডোবার দীঘি ই ছিল একসময়ের ঠাকুর ডাকাতের আস্তানা। গ্রামের গরীব মানুষ জমিদারের ব্যাপারে নিজেদের সমস্ত অভিযোগ নিয়ে এখানেই আসত, মৃত্যুঞ্জয়ের কোনও অনুগামী তাদের ঠাকুর ডাকাতের কাছে নিয়ে যেত। সেই ২০০ বছর আগে থেকেই এই অঞ্চলে মানুষ কোনও বিপদে না পড়লে পা মাড়াত না। হয়ত সেই কারনেই এই লালডোবা দীঘির আস্তানায় কোনও বন্য জানোয়ার ও আসতে ভয় পায়।
বংশী খেয়াল করে আতঙ্কে মালা এখনো ওর হাতটা শক্ত করে ধরে আছে আর ভয়ের সাথে চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। বংশী মালার দিকে তাকায়, মালার বুক থেকে শারিটা অনেকটাই সরে গেছে, নীল ব্লাউজটার হুকগুলোকে হার মানিয়ে সাদা মসৃণ স্তনদুটো অনেকটাই বাইরে বেরিয়ে এসেছে। বংশীর নাক দিয়ে গরম লার্ভার মত উত্তপ্ত নিশ্বাস বাইরে বেরতে লাগলো। ওর হৃদয় একটাই কথা বলছে, এই মুহূর্তে বুনো হাতির মত এই জঙ্গলে মালাকে তাড়া করতে ও খানিকটা লুকোচুরি খেলার ছলে ওর শরীর থেকে একের পর এক পোশাক খুলে নিতে। কিন্তু না, এখনো একটা কাজ বাকি, সিলিং সাহেবকে গার্গী ও প্রিয়ার সন্ধান দিয়ে ওর থেকে জমিদারিটা হাতিয়ে নেওয়া। তারপর বনের এই রাজপ্রাসাদ থেকে মালাকে ও একদম শহুরে রাজপ্রাসাদে নিয়ে গিয়ে তুলবে। মালাকে ছাড়া জমিদারী ও জমিদারী ছাড়া মালা সম্পূর্ণ অর্থহীন। এতক্ষন অবধি যা হয়েছে তা সব ই বংশীর ইচ্ছে মতই হয়েছে। কথায় আছে যার শেষ ভালো তার সব ভালো। ইচ্ছে না থাকলেও বংশী মালার ওপর থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। মালা চারপাশে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। ওরা দুজন সোজা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। মালার হাত তখনও বংশীর হাতের মুঠোয়। এতক্ষন দুজনের মুখ দিয়েই কোনও কথা বেরয়নি। এতক্ষন পর মালা কিছুটা ভয়ার্তকণ্ঠে বলে ওঠে
মালাঃ বংশী, আমার একা এখানে থাকতে ভয় করবে। এই জঙ্গলে আমি একা কি করে থাকবো বংশী?
বংশীঃ আপনাকে আমি একা রাখবনা। আমি থাকবো আপনার সাথে। আমি থাকতে আপনার কোনও বিপদ ই হবেনা। আপনি আমার ওপর ভরসা রাখুন।
ওরা দুজনেই সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। আবার মালা বলে ওঠে
মালাঃ না জানি উনি কেমন আছেন, কি করছেন। আসার আগে জমিদারবাড়িতে গুলির শব্দ পেয়েছিলাম। ওনার কোনও বিপদ হয়নি তো বংশী।
বংশীঃ আমার সাথীরা থাকতে ওনার কোনও বিপদ হবেনা রানিমা। যদি ওরা বুঝতে পারে, জমিদারবাবুর কোনও বিপদ হয়েছে তাহলে ওনাকে সুরঙ্গ দিয়ে এখানে পাঠিয়ে দেবে।
মালাঃ তাহলে চলনা আমরা সুরঙ্গের সামনেই গিয়ে দাড়াই। উনি তো জঙ্গলে এসে পথ হারিয়ে ফেলবেন।
মালার এই ক্রমাগত আকুতি মিনতিতে বংশী কিছুটা বিরক্তি বোধ করে। বংশী ওখানে দাঁড়িয়ে পড়ে। মালার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে
বংশীঃ আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন রানিমা, আগে আমি আপনাকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে আসি তারপর জমিদার বাবুকে রক্ষা করতে যাবো।
মালা আর কোনও কথা বলেনা। বংশী ও মালা দুজনেই নিশ্চুপ হয়ে সোজা হাঁটতে থাকে। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর দেখা যায়, জঙ্গলের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গা। বংশী অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে “রানীমা এই দেখুন এটা আমার রাজ্য, জীবনের অনেকগুলো বছর আমি এখানে কাটিয়েছি” মালা সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে। চোখের সামনে যেন একটা স্বপ্ন ভেসে উঠেছে। এতক্ষন জঙ্গলের যে বিভীষিকাকে মালা ভয় পাচ্ছিল এখন যেন ও তার ই প্রেমে পড়ে গিয়েছে। সামনে একটা বৃত্তাকার অঞ্চল, চারপাশ দিয়ে কাঁটাগাছের মোটা বেড়া। এই বেড়ার প্রশস্তি এতো বেশি যে একে অতিক্রম করে একটা সাপ ও ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেনা। ভেতরেই একটা দীঘি দেখা যাচ্ছে, দুধের মত পরিস্কার ও স্বচ্ছ তার জল। আর দিঘিটাকে বৃত্তাকারে ঘিরে সার দিয়ে একেকটা কুটীর। ভেতরে একটা সামান্য পাতাও পড়ে নেই। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মালা। মালার মনে এই মুহূর্তে ঠিক কি কি প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে তা বংশী বোঝে। মালার মনের দ্বিধাদ্বন্দ্বগুলোকে পরিস্কার করার জন্য বংশী বলে ওঠে
বংশীঃ রানিমা, একসময় এই ছিল আমার ঘর। আপনি চোখের সামনে যা দেখছেন তা সব ই আমার নিজের হাতে তৈরি। আজ সভ্যসমাজে চলে আসলেও আমি আমার পুরনো আস্তানাকে ভুলতে পারিনি। তাই আমার ই নির্দেশে আমার ২-৩ জন সাথী রোজ সকালে এসে এই স্থানটা পরিস্কার করে, দেখভাল করে। আপনার পছন্দ হয়েছে রানিমা?
মালাঃ অসাধারন বংশী, জঙ্গলের মধ্যে এতো সুন্দর এক জায়গা যে থাকতে পারে তা আমি ভ্রুনাক্ষরেও ভাবতে পারিনি। ইস, যদি তুমি আগে আমায় বলতে তাহলে আমি ওনার সাথে এখানে একবার ঘুরতে আসতাম।
হথাত ই মালার মুখটা শুকিয়ে যায়। মালার যে এই মুহূর্তে আবার সুপ্রতীকের কথা মনে পড়ে গেছে তা বংশীও বুঝতে পারে। বংশীর বুকের মধ্যে আগুন জ্বলতে থাকে। মনে মনে বলে ওঠে বংশী “এই সুপ্রতীক আমার পথের কাঁটা। আমার রাজপ্রাসদে রানীকে আনলাম, কিন্তু তাও কোথাও না কোথাও ও আমার পিছু ছাড়ল না”
মালাঃ বংশী, আমার খুব চিন্তা হচ্ছে, ওনার জন্য। তুমি তাড়াতাড়ি আমাকে এখানে রেখে ওনার কাছে যাও। যদি সামান্য কোনও বিপদের গন্ধ পাও তাহলে ওনাকে সুরঙ্গ দিয়ে সোজা এখানেই নিয়ে চলে আসবে।
বংশীর একদম ইচ্ছে করছিল না, মালাকে এখানে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে। অগত্যা ওকে তাই করতে হোল। বাঁশের তৈরি দরজা ঠেলে ওরা ভেতরে এগিয়ে গেলো। ভেতরে ঢুকে মালা বুঝতে পারলো দীঘির চারপাশে মোট কুটিরের সংখ্যা ৭। বংশী তারমধ্যে একটি কুটিরের দরজা ঠেলে খুলে দিল। মালা বুঝল ওর বনবাস জীবনে আশ্রয় এই ছোট্ট কুটিরটি।
বংশীঃ রানিমা, এখানে একটা পিঁপড়ের ও সাহস হবেনা আপনার সামান্য কোনও ক্ষতি করার। মনে রাখবেন আমি এই জঙ্গলের প্রভু, মালিক। এখানে সব কিছু...
মালা, বংশীকে ওর কথা শেষ করতে দিলনা, মালা বলে উঠল
মালাঃ আমাকে নিয়ে চিন্তা করোনা বংশী, আমি ভালোই থাকবো এখানে। তুমি এখন ওনার পাশে গিয়ে দাঁড়াও। আমার মন বলছে ওনার খুব বিপদ। তুমি যেভাবে হোক ওনাকে রক্ষা করে এখানে নিয়ে আসো।
বংশী শুধু মাথা নাড়িয়ে মালাকে আশ্বস্ত করে, ও ওখান থেকে বেরিয়ে যায়। বাইরে বেরিয়ে একবার পেছনঘুরে দেখে বংশী। মালা উদাস দৃষ্টিতে ওর ই দিকে তাকিয়ে আছে। কতকিছু ভেবে এসেছিল বংশী। একসাথে এই দীঘিতে দুজনমিলে স্নান করবে, তারপর জঙ্গলের মধ্যে দৌড়াতে দৌড়াতে মালার শরীর থেকে ভিজে কাপড়গুলো এক এক করে টেনে খুলে নেবে। ওদের মিলনের শব্দে বনের সমস্ত পশুপাখি জেগে উঠবে। সবাইকে সাক্ষী রেখে বংশী মালাকে নিজের পৌরুষ উপহার দেবে। বংশীর ও মনটা ভেঙে গেলো, ও নিজেও জানেনা, কিছুক্ষন পর যখন ও জমিদারবাড়ি থেকে ফিরে আসবে, কি করে মালাকে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করবে। ওর মন কিছুতেই চাইছিল না নিজের রানীকে এভাবে রাজপ্রাসাদে একা ফেলে দিয়ে বাইরে চলে যেতে। অগত্যা ওকে যেতেই হোল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দ্রুত যেতে যেতে বংশী প্রায় গ্রামের কাছাকাছি এসে গেলো।
গ্রামের মধ্যে তখন চারপাশে কিছু একটা ব্যাপার নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বংশীকে দেখেই সবাই কিরকম চুপ করে যাচ্ছে। বংশী বুঝতে পারে কিছু একটা অঘটন ঘটে গেছে এর মধ্যে। বংশী দ্রুত সোজা এগিয়ে যেতে থাকে। কখন যে ও ২ খানা গ্রাম পার করে ফেলেছে তা ওর খেয়াল ও নেই। দূর থেকে লক্ষ্য করে একটা ঘোড়ার গাড়ি ছুটে আসছে। এই গাড়ি বংশী চেনে। বংশী জানে এটা জমিদারবাড়ির ই গাড়ি। বেশ কিছুক্ষন পর বংশী বুঝতে পারে যে গাড়িতে সুপ্রতীক নয় নায়েবমশাই বসে আছে। একদম বংশীর সামনে এসে গাড়িটা দাঁড়ায়। নায়েবমশাই হন্তদন্ত করে গাড়ি থেকে নিচে নেমে আসেন।
নায়েবমশাইঃ বংশী সর্বনাশ হয়ে গেছে। সিলিং সাহেব, জমিদার বাবুকে তুলে নিয়ে গেছেন। উনি জমিদার বাবুকে টমাসের খুনের দায়ে আদালতে তুলবেন। ওনার নাকি ফাঁসি হবে। আমরা কিছুই করতে পারলাম না বংশী। সিলিং সাহেব প্রথমে ভেতরে ঢুকে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেন। বারবার করে বলছিলেন বাড়ির মহিলারা কোথায়। ভাগ্যিস আমরা তোমার উপদেশ মেনেছিলাম। নয়ত আরও বড় একটা অনটন হয়ে যেত। কোনও মেয়েকে না পেয়ে উনি জমিদারবাবুকেই উঠিয়ে নিয়ে গেলেন। আমি যাচ্ছি লক্ষিকান্তপুরে, বিদ্রোহীদের সাথে দেখা করতে। ওদের হাতে পায়ে ধরে বোঝাবো, ওরা যুদ্ধ করতে রাজি হলেই উনি রক্ষা পাবেন।
প্রায় এক নিঃশ্বাসে নায়েবমশাই নিজের কথা শেষ করলেন। বংশীর সমস্ত শরীরে মাদকতা ছেয়ে গেছে। যদিও মালার ওই বন্য শরীরটা ভোগ করতে এই এতটুকু মাদকীয়তা যথেষ্ট নয়। এই মুহূর্তে বংশীর দরকার এক হাঁড়ী মহুয়া। কোনরকমে নায়েব মশাই এর দিকে বংশী বলে ওঠে
বংশীঃ নায়েবমশাই, আপনি সিপাহীদের সাথে কথা বলুন, আমিও আমার লাঠিয়ালদের তৈরি করি। এদিকে রানিমার ও নিরাপত্তা দিতে হবে। আপনি ফিরে আসুন, তারপর আপনার সাথে আবার কথা হবে।
নায়েবমশাই আর সময় নষ্ট না করে সোজা গাড়িতে চেপে বেরিয়ে যান। এদিকে বংশীও জানে, জমিদারবাড়িতে গিয়ে সময় নষ্ট করে কোনও লাভ নেই। ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে মালার নীল ব্লাউজ চিরে বেরিয়ে আসা সাদা মসৃণ স্তন ও কোমল সুস্বাদু নাভী। বংশীর শরীরের আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়ে যায়। এই মুহূর্তে দরকার একটু মহুয়া, প্রায় ৫ বছর নিজেকে এই মহুয়ার থেকে ও দূরে সরিয়ে রেখেছিল। বংশী জানে গ্রামের কোন জায়গায় মহুয়া পাওয়া যায়। বংশী উত্তেজনায় দৌড়াতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় একটা মাটির বাড়ির সামনে। জামার মধ্যে থেকে ২ কড়ি বার করে ছুঁড়ে দেয়, সামনে বসে থাকা লোকটার দিকে। মুহূর্তের মধ্যে ওর হাতের সামনে চলে আসে মহুয়া ভর্তি একটা হাঁড়ী। দুচোখ বন্ধ করে বংশী এক চুমুকে গোগ্রাসে পুরো হাড়িটা শেষ করে দেয়। পরম তৃপ্তিতে চোখ খুলতেই সামনে দেখে। সামনে তখন একটাই জিনিস, পাতলা ফিনফিনে একটা সাড়ি পড়ে অর্ধনগ্ন মালা। গ্রামের ভেতর দিয়ে সাপের মতন কিলবিল করতে করতে এঁকে বেঁকে সামনে এগিয়ে চলে বংশী। ওর রাজপ্রাসাদে যে ওর প্রিয়তমা ওর জন্য অপেক্ষা করে আছে।


Reply
#63
পর্ব ২৪- উল্টোপুরাণঃ
মহুয়া পানের অভ্যাস যে বহুদিন চলে গেছে তা বংশী প্রতি পদে পদে অনুভব করতে থাকে। বংশী নিজেও বোঝে যে ওর চলন মোটেও সরলরেখায় হচ্ছেনা। কোনরকমে ৩ টে গ্রাম এঁকে বেঁকে পার করে বংশী জঙ্গলে প্রবেশ করে। এই জঙ্গল ওর, ও এখানের একচ্ছত্র রাজা। চারপাশে একটা খসখস করে শব্দ ভেসে আসছে। বংশী জানে ওর ভয়াল রূপটা এই জঙ্গলের প্রতিটি হিংস্র জানোয়ার ই চেনে। এই জঙ্গলের সবচেয়ে হিংস্র জানোয়ার ও নিজেই, এবং এই মুহূর্তে ও নিজের শিকারের খোঁজে চলেছে। চোখের সামনে একটাই লক্ষ্য, একটাই ছবি নীল ব্লাউজ আর হলুদ সাড়ি পরিহিত মালা। কিছুক্ষন আগেই ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে সাদা নিটোল স্তনজোড়া ও লক্ষ্য করেছিল, ওর শরীরে যে আগুন জ্বলেনি তা নয়, দাউদাউ করে আগুন জ্বলেছিল। কিন্তু সেই আগুনে ও নিজেই জল ঢেলে দিয়েছে। আসলে মালাকে ও গায়ের জোরে পেতে চায়না। একটা বারের জন্য মালার শরীরটা ভোগ করা ওর উদ্যেশ্য নয়। ও চায় রাজা হতে আর মালা হবে ওর রানী। রাজকাজ সম্পন্ন করে যখন বংশী রাজপ্রাসাদে ফিরে যাবে তখন মালা ছোট একটা কাপড় দিয়ে নিজের শরীরটা কোনরকমে জড়িয়ে ওর জন্য বাগানের সামনে অপেক্ষা করে থাকবে। স্বল্পবসনা মালাকে দেখতে পেয়েই বংশী ছুটে যাবে, এক টানে ওর শরীর থেকে কাপড়টা খুলে বাগানের ভেতর ছুঁড়ে ফেলে দেবে। লজ্জায় মালার দুই কান লাল হয়ে যাবে, কোনরকমে দুই হাত দিয়ে নিজের লজ্জা নিবারন করে মালা ছুটে যাবে বাড়ীর ভেতরে। মালাকে স্পর্শ করার জন্য বংশীও ওর পেছনে ছুটতে শুরু করবে। এই সমস্ত রাজকীয় চিন্তা মাথায় ঘুরতে ঘুরতে কখন যে ওর হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে, নাক দিয়ে গরম লার্ভার মত উত্তপ্ত নিশ্বাস বাইরে বেরিয়ে বনে দাবানল লাগিয়ে দিচ্ছে তা বংশী ভাবতেও পারেনি। অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই বংশী নিজের রাজপ্রাসাদের সামনে পৌঁছে যায়। বাঁদিকের চন্দ্রচুড়া গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষন জিরিয়ে নেয়। ও জানে এখন ওর একটাই কাজ নিজের শরীরের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে মালার শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া। আর মালা সেই আগুনে ঝাঁপ দিলেই ওর মুক্তি।
বংশী নিজেকে শান্ত করে সামনে এগিয়ে যায়। বাঁশের বেড়ার দরজাটা টেনে খুলে সামনে ঢুকতেই ও অবাক। যে কুটীরে ও মালাকে থাকতে বলে এসেছিল তার দরজা সম্পূর্ণ খোলা। বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছে ভেতরটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। বংশীর মনের চঞ্চলতা বেড়ে দ্বিগুন হয়ে যায়। মনে মনে ভাবতে থাকে মালার কোনও বিপদ হয়নি তো। মালা কৌতূহলের বশে এসে জঙ্গলে বেরিয়ে যায়নি তো। এই জঙ্গলে তো বহু হিংস্র জানোয়ার রয়েছে। সত্যি ই যদি মালার কোনও বিপদ হয়ে যায় তাহলে ও কোনোদিন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। হথাত ই একটা টুং টুং করে শব্দ ভেসে আসে। এই শব্দ ওর অতি পরিচিত, মালার দুই হাতের চুড়ি ও শাখাপলাগুলো ধাক্কা খেলে এরকম শব্দ হয়। প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে দিয়ে বংশী ওখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। মালা কুটিরের পেছন থেকে বেরিয়ে এসে দীঘির দিকে যেতে শুরু করে। মালার শরীরের আলগা শাড়ির বাঁধন দেখে বংশীর বুঝতে কোনও অসুবিধা রইলনা যে মালা এই মুহূর্তে স্নান করতে যাচ্ছে। লুকিয়ে মালার শরীরটা উপভোগ করার যে অভ্যাস বংশীর মধ্যে রয়েছে তাকে বংশী কিছুতেই ছাড়তে পারেনি। অতি সন্তর্পণে ভেতরে প্রবেশ করে, একপাশ দিয়ে বংশী হেঁটে হেঁটে সোজা দীঘির কাছে পৌছায়। সামনেই একটা মোটা গাছে ছিল, ওর পেছনে নিজেকে লুকিয়ে শুধু মুখটা বাড়িয়ে মালাকে দেখতে থাকে।
প্রায় বংশীর ই সাথে সাথে মালাও ওইখানে গিয়ে পৌছায়। বংশীও লক্ষ্য করেছে মালা আজ একটু অতিরিক্তই উদাসীন। বংশী এটা চায়না, বংশী চায় ওর কাছে সেই হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল মালা ধরা দিক। মালার ব্যাপারে সামান্য কোনও সমঝোতা ও করতে চায়না। আসলে শুধুই তো শরীরের খিদে নয় একটা সুপ্ত ভালোবাসাও রয়েছে বংশীর মালার প্রতি। আর সেই ভালোবাসা না থাকলে এতক্ষনে যে কতবার ও মালার এই সুস্বাদু শরীরটা হিংস্র সিংহের মত করে খেয়ে নিত তার কোনও ইয়ত্তা নেই। মালা একবার পেছন ঘুরে দরজার দিকে তাকায়। বংশী মুখটা লুকিয়ে নেয়। মনে মনে বংশী ভাবে, মেয়েদের এই লজ্জাশীলতা বড়ই অদ্ভুত, মালা জানে এই নির্জন স্থানে ওর শরীরটা দেখার মত কেউ ই নেই তাও শুধুই নিজের মনকে সন্তুষ্ট করতে পেছন ফিরে দেখা। বংশী সন্তর্পণে আবার নিজের মাথাটা বাইরে বার করে ও সামনের দিকে তাকায়। ততক্ষনে মালার দুই হাত শাড়ির মধ্যে ঢুকে বুকের দুপাশে চলে গেছে। বংশীর শরীর থেকে আগুনের ছলকা চারপাশে ছিটকে ছিটকে পড়তে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে হাতের দুই পাশ দিয়ে টেনে মালা নিজের ব্লাউজটা খুলে ফেলে। হয়ত নির্জন স্থানের ওপর অতিরিক্ত ভরসা থাকার জন্যই মালার শাড়িটা অতিরিক্ত ঢিলে হয়ে থাকে। হাত ও পেটের ফাঁক দিয়ে বিশাল তরমুজের মত গোল শুভ্র স্তনযুগল ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে চলে আসে। দীঘির জলে পা ডুবিয়ে মালা নিজের পা দুটোকে নাড়াতে থাকে। দুই হাত মুঠো করে আঁচলা করে জল নিয়ে নিজের গায়ে ছিটোতে থাকে। ধীরে ধীরে মালার বসনের সাড়ী সিক্ত হয়ে ওঠে, বুকের হলুদ কাপড়ের ওপর দিয়ে সুচাগ্র স্তনের বোঁটা দ্রিশ্যমান হয়। প্রায় ভিজে শালিকের মত কাঁপতে কাঁপতে বংশী মালার সৌন্দর্য ভোগ করতে থাকে। হথাত “আ আ ওমা বাঁচাও” বলে মালা প্রচণ্ড জোরে একটা আর্তনাদ করে ওঠে।
মালার এই আর্তনাদে বংশীর ও সম্বিত ফিরে আসে। বংশী গাছের অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসে। মালা প্রায় দিঘীর জল থেকে পা উঠিয়ে নিয়ে লাফ দিয়ে পাড়ের ওপর পড়ে। বংশী কিছুই বুঝতে পারেনা, মালার সাড়িটা বুক থেকে সরে গিয়ে কোমরের কাছে গিয়ে পড়ে। বংশী আর ওখানে থাকতে পারেনা। দৌড়ে দীঘির দিকে যেতে শুরু করে। মালা ওখানে মাটিতে পড়েই যন্ত্রণায় কাতরাতে শুরু করে। দ্রুত বংশী মালার কাছে গিয়ে পৌছায়। বংশীকে দেখতে পেয়ে যন্ত্রণাক্লিষ্ট অবস্থাতেই মালা কোনরকমে নিজের সাড়িটা বুকে জড়িয়ে নেয়। বংশীর নজরে পড়ে মালার ডান পায়ের পাতা থেকে প্রচুর রক্ত পড়ছে। বংশীর আর বুঝতে কোনও অসুবিধা থাকেনা যে মালাকে সাপে কামড়েছে। যদিও জলের সাপ বিষাক্ত হয়না, তাও বংশী নিজেকে সংবরন করতে পারেনা। মালার পায়ের কাছে বসে মালার পাটা নিজের মুখের কাছে নিয়ে যায়। ভিজে কাপড়টা পা থেকে থাইএর কাছে পৌঁছে যায়। একনজর সেই শুভ্র মাংসল শরীরটার দিকে তাকিয়ে বংশী ক্ষত হওয়া অংশটায় নিজের মুখটা রাখে। প্রচণ্ড জোরে চুষে কিছুটা বদ রক্ত নিজের মুখে টেনে নেয় ও বাইরে ফেলে দেয়। বংশীর এই প্রচণ্ড জোরে চোষার কষ্টে মালা দুহাত দিয়ে বংশীর কোমরটা শক্ত করে ধরে, বংশী একবার মুখটা উঠিয়ে মালার দিকে তাকায়, যন্ত্রণায় মালা দুচোখ বন্ধ করে নিয়েছে। বংশী মালার থেকে নিজের নজরটা সরিয়ে ওর পা থেকে বদ রক্ত চুষে চুষে বাইরে ফেলতে থাকে। এরকম বেশ কিছুক্ষন চলার পর বংশীও শান্ত হয়। বংশী জানে মালা এখন নিরাপদ। বংশী আবার তাকায় মালার দিকে, মালা নিজের দুই চোখ বুজে দিয়েছে, প্রচণ্ড ক্লান্তিতে মালার শরীরটা অবশ হয়ে গেছে। শরীরের ভিজে স্বল্পবসন ওই অবস্থায় যেকোনো পুরুষের ই শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বংশী যে নিজের লক্ষ্যে অবিচল। মালাকে ও একটা ভোগ্যসামগ্রী হিসেবে নয় নিজের প্রিয়তমা হিসেবে চায়। মালার শরীরের এই কষ্ট বংশীর ও পক্ষে সহ্য করা সম্ভবপর ছিলনা। বংশী একটা হাত মালার দুই নিতম্বের কাছে রেখে আরেকটা হাত কাঁধের নিচে রেখে ওকে নিজের কোলে উঠিয়ে নেয়। মালাকে নিজের শরীরে তুলে ও চলতে থাকে কুটিরের দিকে। মালা একবার চোখ খুলে দেখে বংশীর দিকে, কিন্তু সত্যি ই তো ওর কিছুই বলার ছিলনা। এই জীর্ণ শরীর নিয়ে ওর পক্ষেও কুটির অবধি যাওয়া সম্ভবপর ছিলনা। বংশী খুব সন্তর্পণে কুটিরের মধ্যে ঢুকে আগে মালার শরীরটা মাটিতে রাখে তারপর নিজে বসে ওর মাথাটা নিজের কোলের ওপর রাখে। মালা কোনও প্রতিবাদ করেনা। হয়ত ওর প্রতিবাদ করার মত শারীরিক অবস্থাও ছিলনা। বংশী নিজের হাতটা দিয়ে মালার কপালে হাত বোলাতে শুরু করে। পুরুষ হাতের উষ্ণ স্পর্শে মালার ও সমস্ত জন্ত্রনা ধীরে ধীরে অবসান হতে শুরু করে। কোনরকমে চোখ হুলে বংশীর দিকে তাকিয়ে মালা বলে ওঠে
মালাঃ বংশী, তুমি তো জমিদারবাড়ি থেকে ঘুরে এলে, উনি কেমন আছেন? উনি নিরাপদ আছেন তো?
বংশীঃ আপনি এখন বিশ্রাম করুন রানিমা, আপনার শরীর ভালো নেই।
গায়ের জোরে মালা, বংশীর কোল থেকে মাথাটা তোলে, বংশীর দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড চিৎকার করে বলে ওঠে
মালাঃ বংশী, আমি তোমার রানীমা। আমার কথার উত্তর দাও। উনি কোথায় আছেন? কেমন আছেন?
বেশ কিছুক্ষন বংশী নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর মালার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে
বংশীঃ রানীমা, সর্বনাশ হয়ে গেছে। সিলিং সাহেব জমিদারবাবুকে তুলে নিয়ে গেছেন। টমাসকে হত্যার দায়ে ওনার বিচার হবে। হয়ত ওনার ফাঁসি হয়ে যেতে পারে।
মালার চোখদুটো বাইরে ঠিকরে বেরিয়ে আসে। বংশী হয়ত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই নিজের কোমল হাতটা উঠিয়ে মালা সপাটে একটা চড় মারে বংশীর গালে। বংশী হতবম্ব হয়ে যায়। বংশীর দিকে তাকিয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে মালা বলে ওঠে
মালাঃ তোমরা সবাই একেকটা কাপুরুষ। ওনাকে সিলিং সাহেবের হাতে তুলে দিয়ে তুমি এখানে পালিয়ে এলে। এই বীরত্বের বড়াই তুমি করতে বংশী। তোমাকে দেখে আমার লজ্জা হয় বংশী, তুমি কাপুরুষ।
কাপুরুষ শব্দটা যে একজন বীরের কাছে ঠিক কতটা অপমানজনক হয় তা এর আগে সত্যি ই বংশী কখনোই বোঝেনি। রাগে ঘৃণায় বংশীর সমস্ত শরীরে আগুন জ্বলতে শুরু করে। অপমান আর প্রতিশোধের আগুনে বংশীর শরীরের হৃৎস্পন্দন প্রচণ্ড জোরে হতে শুরু করে। বংশীর এই রাগ হয়ত মালা বুঝতেও পারেনি। মালা সেই আগুনে ঘি ঢালার জন্য বলে ওঠে
মালাঃ তোমাদের কিছুই করতে হবেনা। আমি নিজে যাচ্ছি। জমিদারির দায়িত্ব আমি সামলাবো। ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ করে নিজের স্বামীকে আমি মুক্ত করব।
রাগের বশে মালা প্রচণ্ড জোরে ওখান থেকে উঠে চলে যেতে উদ্যত হয়, কিন্তু মালা পারেনা। মালা খেয়াল করে ওর একটা হাত প্রচণ্ড জোরে বংশী ধরে আছে। মালা এতক্ষনে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। মালা সোজা বংশীর দিকে তাকায়। বংশীর দুই চোখ দিয়ে তখন আগুন ঝরে পড়ছে। অত্যন্ত গম্ভীরভাবে বংশী বলে ওঠে
বংশীঃ আপনি কোথাও যাবেন না রানীমা। আপনি এখানেই থাকবেন। আমি আপনাকে স্পর্শ করে আছি। আপনাকে স্পর্শ করে আমি কথা দিলাম, যেকোনো মুল্যে আমি একটা সুখবর নিয়েই ফিরব। আর যদি আমি আপনাকে আশ্বস্ত না করতে পারি তাহলে নিজের মুণ্ডুটা কেটে আপনার পায়ের সামনে রাখবো। কিন্তু আপনি এই কুটিরের বাইরে পা রাখবেন না। কারন একমাত্র এই কুটীরেই আপনি নিরাপদ।
বংশীর চোখে পৌরুষের যে আগুন মালা পেয়েছিল তাকে অস্বীকার করার সাধ্য সামান্য এক নারীর মধ্যে ছিলনা। মালা ওখানেই বসে থাকে, বংশী উঠে দাঁড়ায়, মালার দিকে একবার তাকিয়ে মনে মনে পন করে- “আমি যদি সুপ্রতীককে মুক্ত করার ব্যাবস্থা না করে তোমায় স্পর্শ করি তাহলে আমি পুরুষ নই। আর এটাও আমার প্রতিজ্ঞা রইল, একবার আমি যদি ওকে ছাড়ানোর কোনও ব্যাবস্থা করতে পারি তাহলে তুমি চিরকালের জন্য আমার দাসী হয়ে যাবে। জীবনে কখনো কোনও পুরুষকে দেখলেই তুমি শুধু আমায় ই কল্পনা করবে” মালাও একদৃষ্টিতে ওই দুচোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বংশী আর ওখানে দাঁড়ায় না। সোজা হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে জমিদার বাড়ির দিকে চলতে শুরু করে।
জঙ্গল থেকে জমিদারবাড়ি অবধি এই লম্বা রাস্তায় ওর মাথায় শুধুই একটা কথা বারবার ঘুরছিল, যেভাবে হোক একটা ফন্দি এঁটে প্রিয়া ও গার্গীকে সিলিং সাহেবের হাতে তুলে দেওয়া আর তার বদলে সুপ্রতীককে মুক্ত করা। তারপর হবে মালার সাথে ওর ফুলসজ্জা। আধ ঘণ্টার মধ্যে বংশী জমিদারবাড়িতে পৌঁছে যায়। জমিদারবাড়ির বাহিরমহলে তখন অজস্র লোকের ভিড়। প্রত্যেকেই যে সৈন্য তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সবারমাঝে দাঁড়িয়ে আছেন নায়েবমশাই। বংশীকে দেখামাত্র নায়েবমশাই বলে ওঠেন
নায়েবমশাইঃ এই তো বংশী এখানে। আরে বংশী, চল ভেতরে চল অনেক কথা আছে।
এই দীর্ঘ পথের ধকলে বংশী যথেষ্ট ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল তাই কথা বলার মত অবস্থায় ও ছিলনা। নায়েবমশাইকে অনুসরন করে বংশী অন্দরমহলে প্রবেশ করে।
নায়েবমশাইঃ বংশী, আজি আমরা নীলকুঠি আক্রমন করব। জমিদারবাবুকে যেভাবে হোক আমাদের মুক্ত করতে হবে। অনেক কষ্টে আমি সিপাহীদের মন জয় করতে পেরেছি। ওরা আমাদের সৈন্য জোগান দিয়েছে, ওদের কাছে রাইফেল আছে, পিস্তল আছে। আর কোনও চিন্তা নেই বংশী। আমরা যুদ্ধে জিতবই। আর জানো এই যুদ্ধের সেনাপতি কে হবে? তুমি। জমিদারবাবু জঙ্গলের মধ্যে থেকে এনে তোমাদের সম্মান দিয়েছেন, আজ সব ফিরিয়ে দেওয়ার সময় বংশী।
বংশীর সম্বিত ফিরে আসে। নায়েবমশাই এর দিকে তাকিয়ে বলে
বংশীঃ প্রিয়া দিদি, গার্গী দিদি নিরাপদে আছেন তো?
কথাটা শুনে নায়েবমশাই কিছুটা গম্ভীর হয়ে যান। বংশীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে ওঠেন
নায়েবমশাইঃ বংশী, প্রিয়া গার্গীমা আমার বাড়িতে নেই। জমিদারবাবু ওদের কোনও গুপ্তস্থানে লুকিয়েছেন। ১০ জন পুরনো পেয়াদা ওদের দায়িত্বে আছে। ওরা কোথায় আছে তা কেউ জানেনা, আমিও না।
বংশীর মাথা বনবন করে ঘুরতে শুরু করে। শুধু মালাকে পাওয়ার জন্য নয়, জমিদারিকে পেতে গেলেও ওকে প্রিয়া আর গার্গীকে সিলিং সাহেবের হাতে তুলে দিতে হত। চেঁচিয়ে বলে ওঠে বংশী “জমিদারবাবু কি আমাদের অবিশ্বাস করেন?” ওপাশ থেকে একটা বুদ্ধিমান হাসির সাথে উত্তর আসে “হয়ত করেন” আগামিকাল সিলিং সাহেবের মুখের ওই সন্দেহের হাসি আর নায়েবমশাই এর হাসি কেমন যেন অনুরুপ লাগে বংশীর। মানুষের ৫ টা ইন্দ্রিয় বাদ দিয়ে আরেকটা ইন্দ্রিয় থাকে তা হোল ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়, সে যেন বলে ওঠে “সাবধান বংশী, খেলা ঘুরছে, যা দেখছিস যা ভাবছিস হয়ত সেটা একটা অলীক কল্পনা। পাশা খেলায় সেই যেতে যে সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়। আর বুদ্ধিমান কখনো আত্মবিশ্বাসী হয়না।” বংশীর মাথা বনবন করে ঘুরতে শুরু করে। সমস্ত হিসেবনিকেশ ওলটপালট হয়ে যেতে থাকে।


Reply
#64
পর্ব ২৫- ভু...উ...উ...উ...তঃ

বংশীর কানে নায়েবমশাই এর চাতুরির হাসিপূর্ণ কথাটা বনবন করে ঘুরতে থাকে। এতো বছর ধরে তিলতিল করে যে পরিকল্পনা ও তৈরি করেছিল আর কয়েকটা মিনিট আগে অবধিও যা ধ্রুবসত্যি মনে হচ্ছিল হথাত ই যেন তা তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে যেতে শুরু করে। অজস্র আশঙ্কা বংশীর মনে ঝড় উঠিয়ে দেয়। কি যে সত্য আর কি যে মিথ্যে এই হয়ত এই ইহজগতের সবচেয়ে বড় ছলনা। যা দেখা যায় যা শোনা যায় যা অনুভব করা যায় তা সবসময় সত্য হয়না, একটা ভ্রান্ত মরীচিকাও হয় অনেকসময়। কিন্তু বংশীও তো সুচাগ্র রাজনীতিক, রাজাও বটে। যদিও জঙ্গলের নিষিদ্ধ রাজ্যের রাজা তাও তো রাজা। নিজেকে সর্বশক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রন করে বংশী। বিপদে মানুষ যে আরও ভুল করে ফেলে তা বংশী খুব ই ভালো করে বোঝে। এই মুহূর্তে বংশীর চোখ মুখের অবস্থা দেখলে যে কেউ বুঝে যাবে যে জমিদারবাবুর অন্তর্ধানে নয় অন্য কোনও অজানা কারনেই বংশী বেশি চিন্তিত। নিজের শরীরী ভাষা সম্বন্ধে বংশীও যথেষ্ট অবগত। অন্যমনস্ক ভাবটা কাটিয়ে বংশী পাশের দিকে তাকায়, এতক্ষন এখানেই নায়েবমশাই দাঁড়িয়ে ছিলেন ওকে অন্যমনস্ক দেখে চলে গেছেন। মনে মনে বলে বংশী না ভয় পেলে বা বেশি চিন্তা করলে চলবে না। টমাস এর পর আমার যদি কোনও মুল্যবান গুটি থেকে থাকে তো তা হোল গার্গী ও প্রিয়া। গার্গী ও প্রিয়ার টোপ দিয়ে সুপ্রতীককে মুক্ত করা যাবে। আবার ওদের ই টোপ দিয়ে সুপ্রতীককে সিলিং সাহেবের সাথে যুদ্ধে উদ্যত করা যাবে। এই মুহূর্তে আমার একটাই কাজ যেভাবে হোক ওই দুই রুপসীকে খুঁজে বার করা। এতো অল্প সময়ের মধ্যে ওদের রাজ্যের বাইরে পাঠানো সম্ভব নয়। ওরা আশেপাশের কোনও গ্রামেই আছে। বংশী ভালো করে চিন্তা করতে শুরু করে নায়েবমশাই ছাড়া আর কে আছে যাকে সুপ্রতীক প্রচণ্ড বিশ্বাস করে। যার কাছে ওদেরকে পাঠিয়ে সুপ্রতীক নিশ্চিন্ত হতে পারে। কিছুই মাথায় আসেনা বংশীর।
সামনের দিকে তাকায় বংশী। বাহিরমহলে প্রচুর সিপাহী দাঁড়িয়ে আছে। ওরা সম্ভবত যুদ্ধের মোহড়া দিচ্ছে। একটা ব্যাপার ভেবে অবাক হয়ে যায় বংশী। ওর পুরনো সাথীরা যাদের লাঠিয়াল হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল তারা কোথায়? যারা রয়েছে তারা তো সব ই হয় পুরনো পেয়াদা অথবা সিপাহী। বংশী জানে রহস্য কিছু একটা রয়েছে এবং সেই রহস্যই ওকে ফাঁস করতে হবে। বংশীর চোখ পড়ে নায়েবমশাই এর দিকে। সিপাহীদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে নায়েবমশাই ওর ই দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নায়েবমশাই এর মুখে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা লেগেই আছে। এই হাসির মধ্যে যেন কত অজানা প্রশ্নের ই উত্তর লুকিয়ে আছে। বংশীর মনে এক অন্য সন্দেহ দানা বাঁধে। এরকম নয়ত নায়েবমশাই সব জানেন কিন্তু ওকে কিছু জানাচ্ছেনা। এরকম নয়ত টমাসকে হত্যা করার ব্যাপারটায় নায়েবমশাই ওকে সন্দেহ করেছে। আবার নিজেকে শান্ত করে বংশী। মনে মনে বলে আশঙ্কা করতে থাকলে সব গুলিয়ে যাবে। অঙ্কের সমাধান ও প্রায় করেই এসেছে, শুধু একটাই জায়গায় ও আঁটকে গেছে তা হোল প্রিয়া আর গার্গী। বংশী আবার নায়েবমশাই এর দিকে তাকায়, ওনার মুখে সেই চালাক হাসিটা তখন ও লেগে আছে। মনে মনে ঠিক করে বংশী, এভাবে নায়েবমশাই এর কাছে ধরা দিলে চলবে না। যেভাবে হোক গোপন ব্যাপারটা ওকে জানতে হবেই। বংশী জোর করে মুখে একটা হাসি এনে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
নায়েবমশাই এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বংশী একটু স্ফীত হেঁসে বলে
বংশীঃ আসলে নায়েবমশাই, প্রিয়াদিদি ও গার্গীদিদিকে নিয়ে আমি প্রচণ্ড চিন্তায় আছি। আপনি তো জানেন জমিদারবাবু আমাকে সমস্ত নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। ওনাদের যদি কিছু হয়ে যায় আমি নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারবোনা। আমি জানি নায়েবমশাই আপনি জানেন ওরা কোথায় আছে। হয়ত কোনও কারনে আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। আপনি যদি আমায় বলতেন তাহলে ওদের নিরাপত্তার জন্য আমি কিছু ব্যাবস্থা করতাম। সত্যি বলতে...
নায়েবমশাই এর মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়, বংশীর একটা হাত ধরে ভেতর দিকে যেতে ইশারা করে। বংশীর ও মনে আশার আলো দেখা দেয়। বংশী ভাবতে শুরু করে নিশ্চয়ই এমন কিছু ব্যাপার আছে যার জন্য নায়েবমশাই কিছুতেই ওকে বলতে চাইছিলেন না। ওরা দুজনেই আবার অন্দরমহলে প্রবেশ করে। বংশীর দিকে তাকিয়ে নায়েবমশাই বলে ওঠেন
নায়েবমশাইঃ বংশী ওরা কোথায় আছে তা আমি সত্যি ই জানিনা।
এবার সত্যি ই বংশীর মাথা খারাপ হয়ে যায়, নায়েবমশাই এর অনুরুপ একটা হাসি ফেরত দিয়ে বংশী বাইরে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়। নায়েবমশাই বংশীর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেন। বংশী বোঝে এবার নায়েবমশাই ওকে কিছু বলবেন। বংশী ওখানে দাঁড়িয়ে যান। নায়েবমশাই সামান্য হেঁসে বলেন
নায়েবমশাইঃ বংশী, সুপ্রতীককে আমি নিজের হাতে মানুষ করেছি। ওর যখন ৩ বছর বয়স তখন রানীমা মানে ওর মা মারা যায়। বিনা বিবেচনায় কোনও কাজ ই ও করেনা। ওর পরিকল্পনা আজ অবধি আমি কখনো ব্যর্থ হতে দেখিনি। ওকে আমি নিজে হাতে তৈরি করেছি বংশী।
নায়েবমশাই এর মুখে এই কথা শুনে বংশী কিছুটা চমকে যায়, পরিকল্পনা বলে কি উনি ওকেই ঠেস দিয়ে কিছু বলতে চাইলেন। মনে সাহস এনে বংশী বলে ওঠে
বংশীঃ তারমানে উনি আমায় বিশ্বাস করেন না তাইতো। তাহলে রানীমার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমায় দিলেন কেন? যাই হোক নায়েবমশাই, রানীমা নিরাপদেই আছেন। আপনি এই মুহূর্তে লোক পাঠিয়ে ওনাকে আনার ব্যাবস্থা করুন। আমি জমিদারবাড়ির এই কাজ ছাড়তে চাই। যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে বংশীও নেই।
নিজের এই অগ্নীবান ছুঁড়ে বংশী আশা করেছিল যে এবার কিছু একটা ফলাফল ও পাবে। কিন্তু ওর ধারনাকে ভুল প্রমান করে নায়েবমশাই আবার একটু হেঁসে বলে উঠলেন
নায়েবমশাইঃ বংশী, তুমি তো বহুদিন ডাকাত ছিলে, তুমি তো এই অঞ্চলের ই লোক। জমিদারবাড়ি সম্বন্ধে আগে থেকেই তুমি অনেক তথ্য জোগাড় করেছ। আচ্ছা তুমি কি জানো রানীমার বাপের বাড়ী কোথায়?
নায়েবমশাই এর কথা শুনে বংশী হতবাক হয়ে যায়। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ওনার দিকে। সত্যি ই তো বংশী এই কথা কখনো ভাবেওনি, কারুর মুখে শোনেও নি। বংশী বুঝতে পারে কিছু একটা গণ্ডগোল রয়েছে, আর হয়ত ও নিজেই পাশা খেলার গুটিতে পরিনত হয়েছে। ওর এই ভ্যাবাচাকা খাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে নায়েবমশাই বলে ওঠে
নায়েবমশাইঃ আমিও তোমার ই মত সামান্য ভৃত্য বংশী। এরকম অনেক প্রশ্নই আছে যা করলে তুমি কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলবে। চলো অল্প কিছু বলাই যাক। যাকে তুমি রানীমা বলে ভাবো সে আসলে এই বাড়ির বউ কিনা সেই নিয়েই আমার সন্দেহ আছে। একদিন গভীর রাতে সুপ্রতীক ওকে বাড়িতে এনে তোলে। মাথায় লাল টিপ ও সিঁদুর। আমাদের প্রশ্নের কোনও জবাব কখনোই সুপ্রতীক দেয়নি। বংশী যে বয়সে তুমি কবাডি খেলতে কুস্তি লড়তে সে বয়সে সুপ্রতীক চাণক্যের অর্থশাস্ত্র পড়ত। ও এক অতি বিচক্ষন কূটনীতিক এবং শক্তিশালী পুরুষ। এই জমিদারবাড়ির ওপর অনেক অভিশাপ আছে তাকে দূর করতেই ওর জন্ম।
নায়েবমশাই এর কথাগুলো বংশীর কাছে খানিকটা রুপকথার মত মনে হয়। যে মানুষটাকে এতদিন ও শুধুই পাশার গুটি ভেবে এসেছে আসলে সে যে একজন প্রথিতযশা খেলোয়াড় তা ও আজকের আগে কখনোই বুঝতে পারেনি। আবার নায়েবমশাই বলে ওঠে
নায়েবমশাইঃ বংশী, তুমি বা আমি ওর সামনে নেহাত ই তুচ্ছ, সামান্য শিশু ভাবতে পারো। ও কি ভাবে ও কি করে তা বোঝার বা বিবেচনা করার ক্ষমতা আমাদের এই ক্ষুদ্র শরীরে নেই। বঙ্গদেশে প্রায় সমস্ত জায়গায় জমিদারির অবসান ঘটেছে। কিন্তু এখনো আমাদের জমিদারী বেঁচে রয়েছে, কখনো ভেবে দেখবে কি করে এই দুঃসাধ্য সাধন হোল। বংশী, সুপ্রতীক এযুগের চানক্য। যে সিলিং সাহেবকে নিয়ে তোমরা এতো চিন্তিত সেও সুপ্রতীককে সমীহ করে চলে। হয়ত তোমরা তা কখনো বুঝতে পারনি।
বংশী হতবাক হয়ে ওই স্থানেই দাঁড়িয়ে থাকে। নায়েবমশাই বংশীর কাঁধে একটা হাত রেখে বলেন
নায়েবমশাইঃ সুপ্রতীককে নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র চিন্তিত নই। ও সর্বশক্তিমান, ওর কোনও বিপদ ই হবেনা। তুমি বরং সৈন্যদের সাথে থাকো, আমি ভেতর থেকে আসি, কিছু অর্থের জোগান দিতে হবে।
নায়েবমশাই ভেতরে প্রবেশ করেন। বংশী বেশ কিছুক্ষন হতবাক হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। বংশী বোঝে খেলাটা প্রচণ্ড কঠিন, অতটাও সহজ নয়। কিন্তু বংশীও বীর। সুপ্রতীকের বীরত্ব ওকে ভয় নয় লড়াই করার ই ইন্ধন জুগিয়েছে। এই মুহূর্তে ওকে আগে জানতে হবে গার্গী ও প্রিয়া কোথায়। বংশী দ্রুত জমিদারবাড়ি ত্যাগ করে গ্রামের দিকে যেতে শুরু করে। একেক করে পথচলতি মানুষকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করে বংশী। প্রথমেই এক সাধারন মহিলাকে ও জিজ্ঞেস করে “মা আপনি কি জমিদারবাড়ির দুই মেয়েকে এই পথ দিয়ে যেতে দেখেছেন?” অদ্ভুতভাবে সেই মহিলা কোনও উত্তর না দিয়ে প্রচণ্ড প্রতিহিংসার সাথে বংশীর মুখের দিকে তাকায়। বংশী সামনে এগিয়ে চলে। বংশী খেয়াল করে বংশীকে রাস্তায় চলতে দেখে আশেপাশের লোকজন এক জায়গায় জড় হয়ে ওকে নিয়ে কিছু আলোচনা করছে। বংশী মনে করে এ বোধ হয় ওর মনের ভুল। বংশী আবার এক বৃদ্ধ ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করে “বাবা আপনি কি জমিদারবাড়ির দুই মেয়েকে এই রাস্তায় যেতে দেখেছেন?” সেই ভদ্রলোক অত্যন্ত বাজেভাবে বংশীর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে “ওরে পাপী তোর পতন হবেই রে। তোর দেহ শকুনে ছিরে ছিরে খাবে” এতক্ষনে বংশী প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। আশেপাশের সমস্ত মানুষের দিকে তাকায়, সবাই বংশীর দিকে প্রচণ্ড প্রতিহিংসার সাথে তাকিয়ে থাকে। বংশী বোঝে ওর পেছনে এমন অনেক কিছুই ঘটেছে যা ও জানেনা, ও শুধু এটাই বোঝে যে এই মুহূর্তে ওর সমূহ বিপদ। জঙ্গল ই ওর একমাত্র ভরসা। বংশী, ছুটতে আরম্ভ করে জঙ্গলের দিকে। এক নিঃশ্বাসে কখন যে ও জঙ্গলের একদম ভেতরে প্রবেশ করে যায় তা ওর নিজের ও খেয়াল ছিলনা। বুকের পাঁজরগুলো কষ্টে যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল, সামনেই একটা গাছের নিচে বংশী বসে পড়ে। বংশী বোঝে যা ঘটছে বা যা ঘটবে তা সব ই সুপ্রতীক ও নায়েবমশাই এর পরিকল্পনা অনুযায়ী। এবং এই পরিকল্পনা ওর দীর্ঘ ৭ বছরের পরিকল্পনার থেকে অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী। দৃঢ়চেতা বংশী হারতে জানেনা, পাশাখেলায় সর্বস্ব খুইয়ে দিলেও এখনো এক অতি মুল্যবান সম্পত্তি ওর হাতে রয়ে গেছে তা হোল মালা। বিশ্রাম নিয়ে সময় নষ্ট করা যে মুর্খামি তা বংশী বোঝে। বংশী উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়াতে শুরু করে।
অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ও নিজের কুটীরের কাছে পৌঁছে যায়। বাইরের বাঁশের দরজাটা হাট করে খোলা, বাইরে থেকে বেশ ভালো করেই বোঝা যাচ্ছে যে কুটিরের দরজাও খোলা। এক অনভিপ্রেত আশঙ্কা বংশীর মনে দানা বাঁধতে থাকে। রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে বংশী ভেতরে ঢোকে। কুটিরের দরজার সামনে গিয়ে দেখে সত্যি ই কেউ নেই। ওই অবস্থায় ই দীঘির পাড় বরাবর দৌড়াতে থাকে বংশী। ভালো করে কাঁটাগাছ দিয়ে ঘেরা নিজের নিরাপদ আশ্রয়টা খুঁজে দেখে বংশী, না কেউ নেই। আশঙ্কায় ও চিন্তায় ওর মাথা ছিরে যেতে শুরু করে। মনেমনে নিজেকে দোষারোপ করে বংশী, এতো বড় ভুল আমি কি করে করে ফেললাম। পুরো ব্যাপারটাই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল, ষড়যন্ত্র ওর! পরিকল্পনা ওর! গুটি ওর! কিন্তু খেলোয়াড় ও নয় খেলোয়াড় অন্য কেউ হয়ত সুপ্রতীক। ওর ই হাতে তৈরি সমস্ত ছকটা অন্য কেউ অপহরন করে নিল। বংশী সাহসী, ও জানে এখন একটাই উপায় এই জঙ্গলের মধ্যে যদি মালা সত্যি ই থেকে থাকে তাহলে ওকে খুঁজে বার করা। পাগলের মত ওখান থেকে বেরিয়ে বংশী জঙ্গলের মধ্যে দৌড়াতে শুরু করে। না কোনও পায়ের ছাপ না কোনও চিহ্ন। প্রায় ঘণ্টা ২-৩ অক্লান্ত পরিশ্রমের পর বংশী হাল ছেড়ে দেয়। ও জানে মালা জমিদারবাড়িতে ফিরে গেছে এবং ওর ও জমিদারবাড়িতে ফিরে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ।
একটা মোটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বংশী ভাবতে থাকে কিকরে সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেলো, ওর সাজানো পাশার চালটা কি করে অন্যের হাতে পড়ে গেলো। হতাশা বংশীকে চরমভাবে গ্রাস করে। কিন্তু বংশীও যথেষ্ট সাবধানী, সুপ্রতীককে অবজ্ঞা করে একবার যে ভুল ও করে ফেলেছে দ্বিতীয়বার ও আর তা করতে চায়না। জঙ্গলে ওর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টা প্রকাশ্যে এসে গেছে। কিন্তু এটাই ওর একমাত্র আশ্রয় নয়। এই জঙ্গল ওর দেশ ওর রাজ্য। এরকম অন্তত আরও ১০ টা আশ্রয় এই জঙ্গলেই রয়েছে। এই মুহূর্তে ওকে রক্ষণাত্মক হয়ে যেতে হবে। যা গেছে তা যাক কিন্তু নতুন করে আর কিছু হারানো উচিত নয়। বংশীর খেয়াল পড়ে যায় ওর শেষ সম্বলটুকু যা দীঘির পাশের নারকোল গাছের কাছে পোঁতা আছে। বংশী আবার দৌড়াতে শুরু করে কারন খুব দ্রুত ওকে নিজের স্থান পরিবর্তন করে ফেলতে হবে। এক নিঃশ্বাসে ও নিজের কুটিরে প্রবেশ করে যায়। কুটিরের পেছনে একটা শাবল আর কোদাল সবসময় রাখা থাকে। দ্রুত ওগুলো নিয়ে বংশী চলে যায় দীঘির পাড়ে নারকেল গাছের কাছে। দ্রুত মাটি খুঁড়তে শুরু করে। কিছুক্ষনের মধ্যেই বেরিয়ে আসে একটা চটের বস্তা। এতক্ষনের সমস্ত উৎকণ্ঠার অবসান হয়। দ্রুত বংশী বস্তার মুখের বাঁধন খুলে ভেতরে দেখে। ভেতরে ৪ টে কলসি ই রয়েছে। এগুলোই বংশীর শেষ সম্বল। ডাকাতি করে পাওয়া এই ৪ কলসি সোনা হীরে জহরতের আনুমানিক মুল্য সেই সময়েই কয়েক কোটি টাকা হবে। এতো হতাশার মধ্যেও বংশীর মুখে একটা স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে, কারন ও হয়ত সবকিছু হারিয়ে ফেলেনি। মন মনে একবার বলে ওঠে “সুপ্রতীক বংশী এতো সহজে হার মানেনা, লড়াই এখনো বাকি রয়েছে” কিন্তু ভাগ্য বড়ই নিষ্ঠুর, এই হাসি দীর্ঘস্থায়ী হলনা। পেছন থেকে কিছুটা ইংরেজি ও কিছুটা ভাঙা বাংলায় এক তরুনের মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো
“হ্যালো বানসী! এই তো হামার গুপ্তধন!”
নিষ্ঠুর নির্ভীক বংশীও তাহলে ভয় পায়। আর পাবেওনা কেন? ও মানুষের সাথে লড়তে জানে, হিংস্র জানোয়ারের সাথে লড়তে জানে, কিন্তু অতৃপ্ত আত্মার সাথে? না তার সাথে লড়তে জানেনা। এই কণ্ঠ বংশীর অতি পরিচিত, এ ওর ই পাশাখেলার সবচেয়ে দামী গুটি বেচারা টমাসের। দুহাত দিয়ে কলসিগুলো শক্ত করে ধরে বংশী নিজের শরীরের কাঁপুনিকে লুকাবার চেষ্টা করে, কিন্তু ভুতে ভয় তো সবাই পায়।
ইতিহাস হয়ত পাটিগণিত, বীজগনিত মেনে চলেনা। ইতিহাস মেনে চলে জটিল সম্ভাবনা তত্ব। মানুষ কখনোই নিজের ইতিহাস নিজে লিখতে পারেনা, ইতিহাস লেখে সময়, কারন মানুষ সময়ের ই দাস। বংশীর পতন কি ওর ই বন্য রাজপ্রাসাদে এক অতৃপ্ত আত্মার হাতে?
উত্তরটা কারুর ই জানা নেই, উত্তর জানে একমাত্র সময়। আর এই সময়কে অবজ্ঞা আমরা কেউ ই করতে পারিনা।


Reply
#65
পর্ব ২৬- বিষ্ণু বহুরুপীঃ
জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই ভয় নামক শব্দটি বংশী নিজের অভিধান থেকে মুছে ফেলেছিল। মানুষের একটা হৃদয় থাকে, একটা মন থাকে, বংশী সেই মনটাকেই সযত্নে পাথর বানিয়ে ফেলেছিল। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে স্বপ্ন অনেকেই দেখতে পারে, কিন্তু তাই বলে জীবনের শেষ দিন অবধি ক্ষমতার লোভঃ না এ বংশী ছাড়া অন্য কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়। এই দুহাতে কত নিরপরাধ মানুষকে শেষ করেছে বংশী তার কোনও ইয়ত্তাই নেই। কিন্তু স্বপ্নেও ভুতের ভয় ও পাবে তা কখনো ভাবেনি। কিন্তু সময় বড়ই নিষ্ঠুর, বংশী জানে যে ভয়ঙ্কর জনশূন্য জঙ্গল ওকে জীবনে কখনো ভয় দেখাতে পারেনি আজ সেই জঙ্গল ই ওকে মৃত্যুভয়ে জর্জরিত করে তুলছে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা টমাসের আত্মাকে দেখার মত মানসিক জোর ওর মধ্যে নেই, দুহাতে শক্ত করে কলসিগুলোকে চেপে ধরে বংশী চেষ্টা করে স্বাভাবিক হতে। বংশীর হৃদয় বারবার ওকে একটাই কথা বলে চলেছে- না বংশী এই এতো আত্মত্যাগ, এতো কষ্ট এর ফল তুই পাবি ই পাবি। ভগবানের ক্ষমতা নেই তোকে রুখে দেওয়ার। পেছন থেকে ভেসে আসে আবার সেই তরুনের কণ্ঠ “হ্যালো বানসি এই তো হামার গুপ্তধন” কান খাড়া করে শোনে বংশী, কোথাও যেন কণ্ঠে একটা মেকিভাব রয়েছে। বংশীর শরীরের ৫ টি ইন্দ্রিয় সমানভাবে সজাগ ও সক্রিয়। বারবার ওর মন বলে না এ টমাস নয়, অন্য কেউ, টমাস হতে পারেনা। ইহজগতে ভুত বলে কোনও বস্তুর অস্তিত্ব নেই। এটা অন্য কেউ। কিন্তু পেছন ঘুরে একটি বার সেই অতৃপ্ত আত্মার দিকে তাকানোর মত ক্ষমতাও বংশীর শরীরে ছিলনা।
একটা হাত পেছন থেকে এসে বংশীর কাঁধ স্পর্শ করে। বংশীর শরীরের রোমকূপগুলো ফুলে ওঠে, শীতের রাতে স্নান করার মত বংশীর শরীরে কম্পন শুরু হয়। কিন্তু এই মানুষটার ও নাম তো বংশী। ওর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা বাকি ১০০টা মানুষের থেকে আলাদা। টমাসের সাথে বহুবার ও হাত মিলিয়েছে, ও এখনো অনুভব করে টমাসের স্পর্শ। এতক্ষনে বংশী সজাগ হয়। ওর মন দৃপ্ত কণ্ঠে বলে ওঠে না এ টমাস নয়। পেছন থেকে এগিয়ে আসা সেই অতৃপ্ত হাতটা ক্রমশ ওর কাঁধের ওপর জাঁকিয়ে বসে। বংশী বুঝতে পারে এ টমাস নয়, কোনও প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ। বংশীর শরীরের দ্রুত হৃৎস্পন্দন, থরথর কম্পন সব ই ক্রমশ শান্ত হয়। দ্রুত পেছন ঘুরে তাকায় বংশী।
মুখ ঘুরিয়ে পেছনে যা দেখে সেই দৃশ্য হয়ত ভুত দেখার চেয়েও ভয়ঙ্কর। কারন ভুতকে স্বপ্ন বলে অবজ্ঞা করা যায়, কিন্তু বাস্তবকে নয়। বংশীর ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে নায়েবমশাই, মুখে সেই পরিচিত হাসি। তবে এবারের হাসিটা আর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয় এই হাসির মধ্যে লুকিয়ে আছে চরম অবজ্ঞার লক্ষন। বংশী লক্ষ্য করে আরও কিছুটা পেছনে প্রায় জনা পঞ্চাশেক সৈন্য। বংশী বুঝে যায় ও ধরা পড়ে গেছে। নায়েবমশাই প্রচণ্ড জোরে অট্টহাস্য করে ওঠেন এবং আবার সেই কাঁপুনি ধরানো কথা “হ্যালো বানসি এই তো হামার গুপ্তধন” এবং আবার একটা প্রচণ্ড জোরে অট্টহাসি। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বংশী। এর আগে সিদ্ধান্তহীনতা যে কি জিনিস তা বংশী কখনোই বোঝেনি। এ এক এমন মুহূর্ত যে বংশীর ঠিক কি করা উচিত তা ও কিছুতেই বুঝতে পারছে না। বংশীর মুখের অবস্থা দেখে নায়েবমশাই আবার প্রচণ্ড জোরে একবার হেঁসে ওঠেন
নায়েবমশাইঃ হ্যালো বানসি এই তো হামার গুপ্তধন। ওহ বানসি এতো ভয় কেন পাচ্ছ তুমি? আমি ভুত নই আমি নায়েবমশাই। তোমাদের নায়েবমশাই বিষ্ণুপদ।
বংশী জানে কিছু একটা ওকে করতেই হবে নয়ত সম্পূর্ণভাবে ও শেষ। নিজের মনের প্রতিটা অংশ থেকে সাহস একত্রিত করে বংশী স্বাভাবিক হয়। নায়েবমশাই এর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে
বংশীঃ আপনি আমার থেকে কি চান? আমি তো আপনার কোন ক্ষতি করিনি।
আবার প্রচণ্ড জোরে একবার হেঁসে ওঠে নায়েবমশাই। বংশীর দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবজ্ঞার চোখে বলে ওঠেন
নায়েবমশাইঃ বংশী, প্রচণ্ড ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই কোন ছোট থেকে বহুরূপী সাজতাম। কখনো বাঘ, কখনো সিংহ, কখনো রাম, কখনো সীতা, কি সাজিনি বলতো। দেখবে তুমি দেখবে।
নিজের কথা শেষ করার সাথে সাথেই নায়েবমশাই মুখ দিয়ে একটা বাঘের ডাক বার করলেন
নায়েবমশাইঃ কি বংশী, একবার ও মনে হচ্ছে যে এটা কোনও বাঘের নয় একটা মানুষের ই তৈরি। সব ই প্রতিভা, বংশী। সব ই প্রতিভা। এতো তথ্য জোগাড় করলে অথচ এই তথ্যটা তুমি জোগাড় করলেনা বংশী যে এই বিষ্ণুপদ কে আজও গ্রামের পুরনো মানুষেরা বিষ্ণু বহুরূপী বলে ডাকে। তোমায় কেমন ভয় দেখালাম বংশী?
বংশী এতক্ষনে নিজের সেই পুরনো ঠাণ্ডা মাথার মানুষটাকে উদ্ধার করে ফেলেছে। স্বাভাবিক হতে বংশীর ও বেশি একটা সময় লাগেনা। বংশীও নিজের মুখে দৃপ্ত একটা হাসি ফিরিয়ে এনে উত্তর দেয়
বংশীঃ সব ই বুঝলাম নায়েবমশাই। আপনি সত্যি ই আমায় ভয় দেখিয়েছেন আমি স্বীকার করে নিলাম। আমি এটাও স্বীকার করে নিলাম যে আপনি বিশাল বড় অভিনেতা।
বংশীর কথা শেষ হওয়ার আগেই, নায়েবমশাই প্রচণ্ড জোরে হেঁসে উঠলেন আর বললেন
নায়েবমশাইঃ অভিনেতা? বংশী এই ইহজগতে তোমার চেয়ে বড় অভিনেতা আর কেউ আছে নাকি। আমি তো শুধু জমিদারবাবুর আদেশ পালন করে গেছি। (প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে) বংশী, বেইমানের একটাই শাস্তি তা হোল মৃত্যু।
বংশী বুঝে যায়, নায়েবমশাই নয় আসলে সুপ্রতীক ই আসল খেলোয়াড় আর ওকে এরকম অবজ্ঞা করে বংশী নিজের ইতিহাস নিজেই বিকৃত করে ফেলেছে। কিন্তু বংশীও জানে এরকম প্রতিকুল অবস্থা থেকে কিভাবে নিজের প্রান বাঁচিয়ে ফিরতে হয়। নায়েবমশাই এর দিকে একবার তাকিয়ে বংশী বলে ওঠে
বংশীঃ মাত্র এই কটা সৈন্য দিয়ে আপনি বংশীকে আটক করবেন।
নায়েবমশাইঃ এই কটা কি বলছ, ৫০ জন...
মাথা ঘুরিয়ে নায়েবমশাই পেছনে তাকাতেই বংশী প্রচণ্ড জোরে নায়েবমশাইকে পেছন দিকে একটা ধাক্কা মারে। নায়েবমশাই হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। নায়েবমশাই এর এই আকস্মিক পতনে সৈন্যরাও বিচলিত হয়ে যায়। আর ঠিক এই সুযোগটাই বংশীর দরকার ছিল। বংশী প্রানপনে দীঘির ধার বরাবর দৌড়াতে শুরু করে। বেশ কিছুদুর রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ানোর পর বংশী হথাত দাঁড়িয়ে পড়ে, প্রচণ্ড জোর একটা গুলির আওয়াজ আর গুলিটা একদম ওর গা ঘেঁসে বেরিয়ে যায়। নিজের অজান্তেই বংশীর দুই হাত ওপরের দিকে উঠে যায়। পেছন থেকে নায়েবমশাই এর কর্কশ স্বর ভেসে আসে। “বংশী এটা তোমার লাঠিয়াল বাহিনী নয়, এরা সৈন্য। এদের নিশানা অভ্রান্ত। চাইলেই গুলিটা তোমার মগজে লাগতে পারতো। আমি জমিদারবাবুকে কথা দিয়েছি তোমার সমস্ত ষড়যন্ত্র প্রকাশ্যে নিয়ে আসব। তাই আজ তুমি প্রানে বাঁচলে” অসহায় অবস্থায় বংশী ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। দুজন সৈন্য ওর কাছে গিয়ে প্রায় পাঁজাকোলা করে ওকে ধরে নিয়ে আসে। অসহায় বংশীকে একদম নায়েবমশাই এর মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। এই জঙ্গল ওর রাজ্য, আর নিজের ই রাজ্যে যে এতবড় এক অপমান ওকে সহ্য করতে হবে তা বংশী ভ্রুনাক্ষরেও কখনো ভাবেনি। শান্ত মাথার মানুষ বংশীর ও মাথা এই অপমানে গরম হয়ে যায়। নায়েবমশাই এর দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ও বলে ওঠে
বংশীঃ আমার নাম বংশী, নায়েবমশাই। আর আমার সাথে বেইমানির হিসেব আমি যেভাবে হোক চুকিয়ে নেবো।
প্রায় ঝড়ের বেগে দুপা এগিয়ে আসেন নায়েবমশাই। মুহূর্তের মধ্যে যে বংশীর গালে সপাটে একটা চড় কষিয়ে দেবেন নায়েবমশাই তা বংশী ভ্রুনাক্ষরেও ভাবতে পারেনি। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বংশী। এতক্ষনে নিজের পুরনো হাসিখুশি রূপটা ছেড়ে স্বমূর্তি ধারন করেন নায়েবমশাই। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে বংশীকে বলেন
নায়েবমশাইঃ আমরা সাত পুরুষ ধরে জমিদারবাড়ির অনুগত দাস। আনুগত্য কি জিনিস তা স্বয়ং ভগবান ও আমাদের থেকে শিখতে পারেন। তোর মত একটা পাপিষ্ঠর মুখ থেকে বেইমান শব্দটা শুনতে হবে। যেদিন নিজের চোখে আমি দেখেছিলাম তুই টমাসকে হত্যা করলি সেদিন ই পারলে আমি তোকে মেরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু না, আমরা জমিদারবাড়িকে রক্ষা করতে নিজের প্রান দিতেও প্রস্তুত। সর্বসমক্ষে তোকে দোষী প্রমান করলেই জমিদারবাবু নিজের পুরনো সম্মান ফিরে পাবেন। আর সেই কাজ শুরু ও হয়ে গেছে, গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে তুই ই টমাস কে হত্যা করেছিস। তুই কি ভাবিস তুই একাই বুদ্ধিমান। এই একে নিয়ে চল সুরঙ্গের কাছে। ওখানেই রানীমা আছেন। আজ ই একে ফাঁসিকাঠে চড়াব।
মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ধাক্কা দিতে দিতে সৈন্যরা ওকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করল। নায়েবমশাই বংশীর ই সাথে সাথে হাঁটতে থাকলেন। বারবার করে বংশীর মনে হতে লাগলো জঙ্গলের প্রতিটা পশু, প্রতিটা গাছ যেন ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। এই অপমানের থেকে মৃত্যুও অনেক সুখের। বংশীর দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। বংশী নিজেও কখনো ভাবেনি যে ওর ও চোখ দিয়ে জল পড়বে। বংশীর এই করুন অবস্থা নায়েবমশাই এর ও চোখ এড়িয়ে যায়না। নায়েবমশাই ওর কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে উঠলেন “ব্যাস এতটুকুতেই তোমার মনবল ভেঙে গেলো বংশী? আসল কথাটা শুনলে তাহলে তোমার কি অবস্থা হবে? মনে হয় হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবে” নায়েবমশাই এর এই অপমানজনক কথাগুলো বংশীর একদম শুনতে ভালো লাগছিলনা, বংশী সোজা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। নায়েবমশাই সৈন্যদের দিকে ইশারা করে বলে ওঠেন “তোমরা একটু পেছনে থাকো, আমি ওর সাথে একান্তে কথা বলতে চাই” নায়েবমশাই এর আদেশমত সৈন্যরা কিছুটা পেছনে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। বংশীর দিকে তাকিয়ে কিছুটা মুচকি হেঁসে নায়েবমশাই বলে ওঠেন
নায়েবমশাইঃ বংশী, সুপ্রতীককে সিলিং সাহেব ধরে নিয়ে যায়নি। সুপ্রতীক, গার্গী ও প্রিয়া জমিদারবাড়িতেই রয়েছেন। ওনারা যে জমিদারবাড়িতেই রয়েছেন তা আমি ছাড়া কেউ জানেনা। বলতে পারো অন্দরমহলের এক গোপনস্থানে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। এইসব ই সুপ্রতীকের পরিকল্পনা।
বংশীর মাথা বনবন করে ঘুরতে শুরু করে, সমস্ত কিছু গুলিয়ে যেতে শুরু করে। প্রচণ্ড তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসে। কোনরকমে বংশী নায়েবমশাই এর দিকে করুনদৃষ্টিতে তাকায়, যেন এটাই বলতে চেয়েছিল “কিন্তু কেন?” কিন্তু ওর মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বাইরে বেরোয় না।
নায়েবমশাইঃ মনে পড়ে বংশী, একটি ছেলে তার বোনেদের সিলিং সাহেব উঠিয়ে নিয়ে গেছে সেই ব্যাপারে নালিশ করতে জমিদারবাড়িতে এসেছিল। সেদিনের তোমার সেই অতিসক্রিয়তাই আমাদের সন্দেহ বদ্ধমূল করে দেয়। আসলে সমস্ত পরিকল্পনা শুরু হয় ২ বছর আগে। সিলিং সাহেবের সুতানুটিতে ডেরা বাঁধা ছিল নতুন এক শত্রুর আগমনি বার্তা। সুপ্রতীক জানত যে সিলিং সাহেব আর তুমি ওর এই দুই শত্রুর বন্ধুত্বই হোল সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব চোখের আড়ালে হওয়ার চেয়ে চোখের সামনে হলে খেলার রাশ নিজের হাতে ধরা অনেক সহজ। তুমি ঠিক কি কি করতে পারো কি কি ভাবতে পারো তা সব ই ওর জানা ছিল। কিন্তু তুমি যে টমাসের মত একটা নিরীহ ছেলের প্রান নেবে তা সুপ্রতীক আমি কেউ ই ভাবিনি। তুমি মানুষ নয় বংশী তুমি জানোয়ার।
নায়েবমশাই এর কথায় বংশীর মনের সমস্ত জোর ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সমস্ত ব্যাপারটাই ওর সামনে পরিস্কার হতে শুরু করে। যদিও বেশ কিছু প্রশ্ন রয়েছে কিন্তু নিজের মুখে তা নায়েবমশাইকে জিজ্ঞেস করার ধৃষ্টতা বংশী হারিয়ে ফেলেছে। বংশীর এই উদাসীনতা ভঙ্গ করার জন্য নায়েবমশাই আবার বলে ওঠেন
নায়েবমশাইঃ (আবার সেই মুচকি হাসিটার সাথে) কিন্তু বংশী, সমস্ত বাহবা একা সুপ্রতীককেও দেওয়া উচিত নয়। আজকের পুরোদিনের পরিকল্পনাটা আমার একার। কারন সুপ্রতীক তো লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। আমি জমিদারবাবুকে কথা দিয়েছিলাম যে ওনার পুরনো সম্মান আমি ফিরিয়ে দেবই। আমি সুকৌশলে গ্রামের মধ্যে রটিয়ে দি, তুমি টমাসকে হত্যা করেছ। জমিদারবাবু তোমায় আদেশ দেয়নি। জমিদারবাড়ির প্রতি পুরনো আক্রোশ থেকেই তুমি এই কাজ করেছ।
মাথা নীচু করে বংশী, নায়েবমশাই এর সমস্ত কথা শুনতে থাকে।
নায়েবমশাইঃ আজ সকালে সিলিং সাহেবের সাথে তুমি দেখা করতে যাওয়ার আগে আমি জমিদারের বার্তা নিয়ে ওনার কাছে গিয়েছিলাম। আমি ওনাকে কথা দিয়েছিলাম ২-৩ দিনের মধ্যেই প্রকৃত খুনিকে আমরা খুঁজে বার করব। উনি আমাদের কথা শুনেছেন। এবার বুঝলে তো সিলিং সাহেব ও সুপ্রতীককে কত সমীহ করে চলে। আর তুমি একটা সামান্য ডাকাত হয়ে ওর সাথে লড়তে গেলে।
বংশী বুঝে যায় ওর আর বাঁচার কোনও রাস্তাই নেই। বংশী নায়েবমশাই এর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে
বংশীঃ আর রানীমা? উনি কি সত্যি ই জমিদারের স্ত্রী। আর যদি সত্যি ই জমিদারের স্ত্রী হন তাহলে আমার মত এক সন্দেহভাজন লোকের সাথে উনি নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে কেন দিলেন?
বংশীর এই সহজসরল প্রশ্ন শুনে নায়েবমশাই আবার প্রচণ্ড জোরে হেঁসে ওঠেন।
নায়েবমশাইঃ বংশী, এই ২টো বছরের অর্থাৎ তোমার জমিদারবাড়িতে আসার পর থেকে যা যা রহস্যময় ঘটনা ঘটেছে তার সমস্ত উত্তর লুকিয়ে আছে এই প্রশ্নে।


Reply
#66
পর্ব ২৭- নতুন সমীকরনঃ
অনেকক্ষণ ধরে একের পর এক রহস্যের ঘেরাটোপে পড়ে বংশীর শরীর এমনিতেই হাঁসফাঁস করছিল তার ওপর ওর কামনার দেবী মালাকে নিয়ে নতুন এক রহস্যের ইঙ্গিত। এতক্ষনে বংশী নির্ভয়ে বলে ওঠে
বংশীঃ রানীমা যে সবকিছুই জানেন তা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করিনা। আমি রানীমার সাথে ব্যাক্তিগতভাবে কথা বলেছি। আমি জানি জমিদারবাবুকে নিয়ে উনি অত্যন্ত চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। যাই রহস্য থাক আমি জানি রানীমা নিষ্পাপ।
বংশীর মুখে এই সহজসরল কথা শুনে নায়েবমশাই ফিক করে হেঁসে ফেলেন।
নায়েবমশাইঃ বুঝলে বংশী সবকিছুর ই নষ্টের মুলে হোল নারী। শাস্ত্রে কি এমনি ই নারীকে নিয়ে এতোগুলো কথা লেখা আছে। আমি বামুনের ছেলে, বংশী। যাকে তোমরা রানীমা বল তাকে আমি কিছুতেই রানীমা বলে মানিনা।
অবাক হয়ে বংশী তাকিয়ে থাকে নায়েবমশাই এর দিকে।
নায়েবমশাইঃ তোমাদের রানীমার আসল নাম কাদম্বিনী। ওর এই পরিচয় এই অঞ্চলের কেউ ই জানেনা। একমাত্র আমি ই জানি। সুপ্রতীক কখনো আমায় এব্যাপারে কিছুই বলেনি, যতবার ই জিজ্ঞেস করেছি আমায় এড়িয়ে গেছে। আমার বাপু আবার রহস্য ভেদ করতে না পারলে খাবার হজম হয়না। আমিও নিজের লোকজনকে দিয়ে সমস্ত তথ্য জোগাড় করেই ছাড়লাম...
নায়েবমশাই এর এই কথার মধ্যে যে অন্যগানের সুর রয়েছে তা বিচক্ষন বংশীর বুঝতে বেশি সময় লাগলো না। নায়েবমশাইকে প্রায় থামিয়ে দিয়ে বংশী বলে উঠল
বংশীঃ একি নায়েবমশাই, তাহলে তথ্য আমার মত আপনিও জোগাড় করেন। আপনি এতই যখন অনুগত তাহলে এই গোপনীয়তাটুকু বজায় রাখতেই পারতেন।
বংশীর কথা শুনে নায়েবমশাই এর মুখে সেই পুরনো বুদ্ধিদীপ্ত হাসিটা আবার ফুটে ওঠে।
নায়েবমশাইঃ বংশী, তুমি যে যথেষ্ট বুদ্ধিমান তা আমি আগে থেকেই জানতাম। কম তথ্যতো তোমার ব্যাপারে আমিও জোগাড় করিনি। কিন্তু মনে হয়না তুমি আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান।
নায়েবমশাই এর এই ইঙ্গিতপূর্ণ বক্রোক্তি বংশীর শুনতে খারাপ লাগলেও, এতক্ষন বংশীর চারিপাশে যে কালো মেঘটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল তা কেমন যেন সরে যেতে শুরু করল। বংশীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বারবার করে বলতে লাগলো, না বংশী এতো তাড়াতাড়ি তোর পতন সম্ভব নয়। তুই মরলে যুদ্ধক্ষেত্রে মরবি, বীরের মত মরবি, এরকম কাপুরুষের মত মৃত্যু তোর জন্য নয়। সুচারু বংশীও অপেক্ষা করে নায়েবমশাই এর উত্তরের জন্য।
নায়েবমশাইঃ কি হোল বুঝলেনা তো কেন আমি নিজেকে তোমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান বললাম। শুধু তোমার চেয়ে কেন সিলিং সাহেব বা সুপ্রতীকের চেয়েও আমি তোমায় বেশি বুদ্ধিমান মনে করি। জানো কেন?
কোনও উত্তর না দিয়ে বংশী শুধুই নায়েবমশাই এর মুখের দিকে অবাকদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। যদিও বংশীর মনে তখন অনেকরকম নতুন সম্ভাবনা শুরু হয়েছে। প্রতিটা পোড় খাওয়া রাজনীতিক ই জানেন, রাজনীতি শুধুই সম্ভাবনার খেলা মাত্র। বংশী অপেক্ষা করে থাকে।
নায়েবমশাইঃ তুমি জানতে তোমার প্রতিপক্ষ কারা। সিলিং সাহেব ও সুপ্রতীক। সুপ্রতীককে বধ করে ও সিলিং সাহেবের সাথে হাত মিলিয়ে তুমি ক্ষমতার অন্দরমহলে প্রবেশ করতে চেয়েছিলে। অন্যদিকে সুপ্রতীকের শত্রু ছিল ঠাকুর ডাকাতের দল মানে তুমি ও তোমার দলবল এবং সুতানুটির অত্যাচারী ইংরেজ সিলিং সাহেব। প্রথমে তোমার সাথে বন্ধুত্ব করে শত্রুর সংখ্যা কমানো তারপর তোমাকে ব্যাবহার করে সিলিং সাহেবকে হাত করা, এই ছিল সুপ্রতীকের পরিকল্পনা। অপর দিকে সিলিং সাহেবের শত্রু একা সুপ্রতীক। ওকে শেষ করতে গেলে তোমার প্রয়োজন। আবার তোমার ওপর ও ওর বিশাল একটা বিশ্বাস ছিলনা, কারন সিলিং সাহেব ও তোমার ইতিহাসটা জানেন। তোমাদের রাজনীতিবোধ সত্যি মনে ধরার জন্য। কিন্তু বংশী, তুমি, সিলিং সাহেব ও সুপ্রতীক তিনজনেই একটা সাধারন ভুল করে ফেলেছ। জানো সেই ভুলটা কি?
বংশীর বুদ্ধিমত্তার যে পরিচয় পাওয়া গেছে তা ভুল নয়, বংশীর বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলনা কিন্তু তাও ও সমস্তকিছু নায়েবমশাই এর মুখ থেকে শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকল।
নায়েবমশাইঃ তোমাদের তিনজনের ই সাধারন ভুল হোল এটা যে তোমরা ভেবেছিলে লড়াইটা ত্রিমুখী। (কিছুটা চিৎকার করেই) লড়াইটা কখনোই ত্রিমুখী ছিলনা বংশী। লড়াইটা ছিল চতুর্মুখী। তোমরা কখনো আমাকে ধর্তব্যের মধ্যেই আননি। হয়ত এটাই তোমাদের ৩ জনের সবচেয়ে বড় ভুল।
কিছুটা ভান করার বেশে বংশী বলে ওঠে
বংশীঃ নায়েবমশাই, জমিদারির ওপর লোভ যে আপনার ও আছে তা সত্যিই আমি কখনো ভাবিনি।
নায়েবমশাইঃ কে বলল আমার জমিদারির ওপর লোভ আছে। এই বুড়ো বয়সে জমিদারির ইচ্ছে আমার নেই। আর আমাকে এরাজ্যের প্রজারাও সহজে মেনে নেবেনা। আমার লোভ অন্য জিনিসের ওপর।
আবার একটা নতুন রহস্যের আভাস। এবার সত্যি ই কিছুটা অবাক হয়ে বংশী জিজ্ঞেস করে
বংশীঃ অন্য জিনিসমানে কি? আপনার কিসের ওপর লোভ?
বংশীর কথা শুনে প্রচণ্ড জোরে হেঁসে ওঠে নায়েবমশাই। বংশীর কাঁধে জোরে নিজের হাতটা রেখে বলে ওঠেন
নায়েবমশাইঃ হ্যালো বানসি (আবার কিছুক্ষন হেঁসে নিয়ে) আজ আমি সত্যি ই তোমায় প্রচুর কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। একের পর এক রহস্য। সত্যি এটা তুমি বলেই সহ্য করতে পেরেছ অন্য কেউ হলে এতো সহজে সহ্য করতে পারতো না। চল এবার একএক করে সমস্ত রহস্য উন্মোচন করি। প্রথমেই আসি তোমাদের রানীমা অর্থাৎ কাদম্বিনীর কথায়। কাদম্বিনী কুলীন বামুনের মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল এক মরার খাটে শুয়ে থাকা বুড়োর সাথে। এখন রানীমাকে তোমরা যা দেখছ হয়ত সেই সময় এর চেয়েও সুন্দরী উনি ছিলেন। এই রকম সুন্দরী বউ দেখলে মরার আগে একটাবার কার ই না একটু ওইসব করতে ইচ্ছে হয় বল। ব্যাস নতুন কচি বউএর মুখ দেখে বুড়োর ও শরীর শক্ত হয়ে উঠল। বুড়োর সাধ হোল ফুলসজ্জা করার।
নারী বড়ই অদ্ভুত বংশী। এই নারীর জন্যই ইতিহাস এতো জটিল। পুরুষ মানুষ যে কেন নিজের মন নারীকে দিয়ে বসে কে জানে। এই বুড়োর ও তাই হোল। মনের কথা শুনে শরীরের অসুবিধাগুলো বেমালুম ভুলে গেলো। বুড়োবয়সে বীর্যপাতের চেষ্টা করলে যা হয় আরকি। নতুন বউএর শরীরটার ওপর ই পড়ে থেকে দেহত্যাগ করল।
সে তো বুড়োর মরার ই কথা ছিল। এতক্ষন অবধি কোনও অসুবিধাই ছিলনা। সমস্ত অসুবিধা শুরু হোল এরপর থেকে। বুড়োর ছিল অঢেল সম্পত্তি। সেইনিয়ে আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কামড়া কামড়ি শুরু হয়ে যায়। যদিও বেশ কিছু বিচক্ষন লোকের মধ্যস্থতায় লড়াইটা থামে। আর এরপর ই গৃহীত হয় সেই ঘৃণ্য সিদ্ধান্ত। কাদম্বিনী বেঁচে থাকলে হয় ওকে সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে নয় ওকে দেখভাল করে যেতে হবে। এরচেয়ে তো ওকে মেরে ফেলাই শ্রেয়। তো যেমন ভাবা তেমন কাজ। সতীদাহ প্রথার নাম শুনেছ বংশী? কাদম্বিনীকেও সতি বানিয়ে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হোল।
ব্যাস এখানেই আমাদের গল্পের নায়কের আবির্ভাব। কোনও এক কারনে সেদিন গঙ্গাঘাটে পবিত্র স্নান করার জন্য সুপ্রতীক ও উপস্থিত হয়েছিল। সুপ্রতীক ছোট থেকেই ইংরেজদের মিশনারি স্কুলে মানুষ। এই সব বর্বর প্রথা ও কিছুতেই মানতে পারতো না। কিন্তু সমাজের ভয়ে কিছু করতেও পারতনা। চারিদিকে ঢাকের আওয়াজ, প্রচণ্ড জোরে মানুষের চিৎকার, দুদিকে দুটো চিতায় আগুন লাগানো হয়েছে। হথাত একটা চিতার কাঠগুলো ঠেলে লাফিয়ে পড়ে কাদম্বিনী। রুদ্ধশ্বাসে সামনে দৌড়ায় আর পেছনে উন্মত্ত জনতা। এই দৃশ্য দেখে আধুনিক মনের সুপ্রতীক আর থাকতে পারেনা, দৌড়ে মেয়েটার হাত ধরে ওকে নিয়ে নিজের ঘোড়ার দিকে চলতে শুরু করে। বাকিরা ওদের লাগাম পাওয়ার আগেই সুপ্রতীক কাদম্বিনীকে নিয়ে জমিদারবাড়িতে পৌঁছে যায়। সেই কাদম্বিনীই আজ মালা। কোনোদিন অনুষ্ঠান মেনে ওদের বিয়ে হয়নি। এই কথা আমি স্বীকার করি বংশী, ওদের ভালোবাসা জন্মজন্মান্তরের। ওরা দুজনে দুজনের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে।
নায়েবমশাই এর এই নতুন রহস্যে বংশী সত্যি ই ভীষণভাবে বিচলিত হয়ে যায়। এতো বড় একটা তথ্য যে ও এতদিন জানত না তা ও সত্যি ই বিশ্বাস করতে পারেনা। বংশীর মুখের এই ফ্যাকাসে অবস্থা দেখে নায়েবমশাই বলে ওঠেন
নায়েবমশাইঃ এই রে তোমার তো মন ভেঙে দিলাম মনে হচ্ছে। আমি আবার একটু পাষণ্ড ধরনের মানুষ। এইসব ভালোবাসা টাসা আমার পছন্দ নয়। তুমি যখন লুকিয়ে লুকিয়ে বাগানে হস্তমৈথুন করতে আমি তোমাকে দেখতাম। কেউ কখনো এটা জানল না যে তোমার মালার ওপর এতো বিচ্ছিরি একটা নজর রয়েছে। এই দেখো বংশী, সামান্য একটা ধন্যবাদ ও তুমি আমায় দিলেনা। আমি কিন্তু সুপ্রতীককে কিছুই বলিনি।
সুচারু বংশী খুব ভালো করেই জানে এই মুহূর্তে ও নায়েবমশাই এর পাশাখেলার গুটিতে পরিনত হতে চলেছে। কিন্তু একটাই আশার কথা তা হোল চরম সর্বনাশটা হয়ত ওর হচ্ছেনা। প্রান হয়ত ওর বেঁচেই যাবে। কিন্তু কতদিন সেব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বংশী কিছু না বলে শুধুই নায়েবমশাই এর দিকে তাকিয়ে থাকে।
নায়েবমশাইঃ এই তোমাদের সবচেয়ে বড় অসুবিধা। তোমরা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাওনা। আরে বাপু বিশ্বাস করেই দেখনা অন্য কোনও উপায় ও তো নেই। তোমার মালার ওপর নজর, টমাসকে হত্যা করা, নীলকুঠিতে সিলিং সাহেবের সাথে দেখা করা এই কোনও কথাই সুপ্রতীক জানেনা। আমি ওকে জানাইনি। ও তোমায় প্রথমদিন থেকেই সন্দেহ করে। যে জমিদারবাড়ির ওপর চরম আক্রোশ থেকে তোমার বন্য ডাকাত হওয়া, আবার একদিন হথাত সেই জমিদারবাড়িতেই অনুগত ভৃত্য হওয়া- এই দুটো ঠিক খাপ খায়না বংশী। কিন্তু এটা সন্দেহের পর্যায়েই রয়েছে। টমাসের হত্যার পর ও সুপ্রতীক সম্ভাব্য সন্দেহভাজনের তালিকায় সবার আগে তোমাকেই রেখেছিল। কিন্তু আমি ওকে কখনোই বলিনি যে আমি নিজের চোখে তোমায় হত্যা করতে দেখেছি।
নায়েবমশাই এর কথাগুলো মন দিয়ে শোনার সাথে সাথে বংশীও নিজের পরবর্তী পরিকল্পনা শুরু করে দেয়। ও নিশ্চিত যে অন্তত আজ রাতের জন্য ও প্রানে বেঁচে যাচ্ছে। বংশীর মুখে এতক্ষনে একটা হাসি ফিরে আসে।
বংশীঃ নায়েবমশাই তাহলে সুতানুটির পরবর্তী জমিদার আপনি তাইতো?
প্রচণ্ড জোরে হেঁসে ওঠেন নায়েবমশাই। এই হাসির মধ্যে যে একটা বিশাল রহস্য লুকিয়ে আছে তা বংশী খুব ভালো করেই জানে। বংশীও অপেক্ষা করতে থাকে সেই রহস্য উন্মোচনের।
নায়েবমশাইঃ তুমি কি উন্মাদ বংশী? এই বুড়ো বয়সে জমিদারি? তাছাড়া এটা সবাই জানে যে ফিরিঙ্গীরা আর জমিদারদের পুরনো ক্ষমতা রাখতে দেবেনা। তাহলে জমিদার হয়ে কি লাভ বংশী?
বংশীর নজর স্থির হয়ে নায়েবমশাই এর চোখের দিকে। বংশীর মুখ দিয়ে একটাই অস্ফুট কথা ভেসে উঠল “তাহলে কি চাই আপনার?”
নায়েবমশাইঃ গুপ্তধন। হাঁ হাঁ গুপ্তধন। আমি ঠাকুরদার থেকে বাবার থেকে শুনেছি জমিদারবাড়ির কোনও এক জায়গায় প্রচুর গুপ্তধন লুকানো আছে। ঠাকুর ডাকাতের আবির্ভাব হওয়ার পর থেকেই জমিদারবাড়ির অধিকাংশ মনিরত্ন, গয়না, অর্থ সিন্দুক থেকে সরিয়ে ফেলে কোনও এক গুপ্তস্থানে রাখা হয়। সেই স্থানটা কোথায় তা জানে মাত্র একজন সে হোল সুপ্রতীক। ওর থেকে কথা বার করা সম্ভব নয়। আমি নিজে ব্যাক্তিগতভাবে বহুবার অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছু না পেয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম একসময়। হথাত ই ঈশ্বর আমাকে সেই সুযোগ দিয়ে দিলেন। বংশী, আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই গুপ্তস্থানের কথা মালা জানে। কারন সুপ্রতীকের জীবনের একমাত্র দুর্বলতা হোল মালা। তোমাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছি, পরেও রাখবো- শুধু একটাই কারনে।
বংশী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নায়েবমশাই এর দিকে।
নায়েবমশাইঃ আমাদের লক্ষ্য আলাদা। তাই আমরা শত্রু নই, আবার বন্ধুও নই। দুজন দুজনের ই কাজে লাগতে পারি। তুমি ই হবে সুতানুটির জমিদার, আর আমি পাবো গুপ্তধন। এর জন্য তোমায় মালাকে যেভাবে হোক বশ করতে হবে, ও তোমায় ঠিক বলবে গুপ্তধনের গুপ্তস্থান কোথায়। আপাতত তোমার এই ক্ষুদ্র গুপ্তধন আমার কাছেই থাক। তুমি আমার কাজ করে দাও ফেরত পাবে।
বংশীঃ সব ই বুঝলাম। আপনার কাছে আমাকে বশ করার ওষুধ আছে, কিন্তু আমি আর সুপ্রতীক যদি এক হয়ে যাই। মানে সুপ্রতীককে বশ করার কোনও ওষুধ কি আছে আপনার কাছে?
নায়েবমশাইঃ বংশী, রাজনীতিতে নতুন নতুন সব সমীকরণ তৈরি হয়। সবের জন্যই প্রস্তুত থাকতে হয়। হাঁ ওকে বশ করার ওষুধ ও আছে। গ্রামের মানুষ যদি জানতে পারে, মালা আসলে সতী, তাহলে ধর্মান্ধ মানুষ ই ওকে শেষ করে দেবে আমায় কিছুই করতে হবেনা। তুমি তো প্রচণ্ড বদ লোক বংশী, আমি তোমায় যত উপকার করছি তুমি তত আমায় সন্দেহ করে চলেছ। আচ্ছা ছাড় এসব। মালাকে নিয়ে ভাবো (জিভটা বার করে একটা কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি) কাল সকালে কি হবে তা কেউ ই জানেনা। কিন্তু আজ রাতে মালাকে একটু উলটে পালটে ভোগ করতে ক্ষতি কি। আমি ই মালাকে সুরঙ্গের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছি। চলো তোমার সম্পত্তি তোমার ই হাতে তুলে দি।


Reply
#67
পর্ব ২৮- মানব জনমঃ

চালাকির দ্বারা মহৎ কাজ সম্পন্ন হয়না। সেই কোন আদিমকাল থেকে এই কথাটা চলে আসছে। হয়ত বংশীর মনে এই মুহূর্তে এই কথাটাই বারবার করে ঘোরাফেরা করছে। মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব, কিন্তু অধিকাংশ সময়ে মানুষের এই বুদ্ধিমত্তাই মানুষের বিনাশের কারন হয়ে দাঁড়ায়। কম বুদ্ধিমান বংশীও নয়। জীবনে বহু প্রতিকুল অবস্থায় নিজের তাৎক্ষনিক বুদ্ধিমত্তার জোরে বংশী রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে বংশী সম্পূর্ণ দিশাহারা। ওর কি করা উচিত, যেভাবে হোক জমিদারবাড়ির সেই গুপ্তস্থানের সন্ধান করে নায়েবমশাই এর হাতে সব তুলে দেওয়া নাকি নায়েবমশাই এর বিরুদ্ধে গিয়ে হয় সুপ্রতীক বা সিলিং সাহেব কারুর একপক্ষের কাছাকাছি আসা। কিন্তু ওকে সমর্থন কেনই বা সুপ্রতীক বা সিলিং সাহেব করবেন। সিলিং সাহেব যথেষ্ট বিচক্ষন। উনি জানেন সুপ্রতীকের মত বুদ্ধিমান মানুষ শুধুমাত্র প্রতিহিংসার বসে টমাসকে হত্যা করে নিজের বিপদ ডেকে আনবে না। সেক্ষেত্রে সিলিং সাহেবের সন্দেহের তীর অবশ্যই সুপ্রতীকের কোনও শত্রুর দিকে। সিলিং সাহেবের চোখে নায়েবমশাই নয়, বংশী ই সুপ্রতীকের সবচেয়ে বড় শত্রু। সুপ্রতীকের মনে পড়ে যায়, সিলিং সাহেবের সেই বাঁকা হাসির কথা। অপর দিকে সুপ্রতীক তো একদম প্রথম থেকেই ওকে সন্দেহের চোখে দেখে। সুপ্রতীকের ও সন্দেহের তালিকায় সবার ওপরে বংশী। তাহলে ও কি করবে। নায়েব কে কি ও বিশ্বাস করবে? যে লোক নিজের পুরো জীবনটা আনুগত্যের অভিনয় করে গেছে সে কি কখনো বিশ্বাসযোগ্য? বংশীর হুঁশ ফেরে প্রচণ্ড জোরে ওর কাঁধে একটা হাত এসে পড়ায়।
নায়েবমশাইঃ এই দেখো, তুমি এতো চিন্তা কেন করছ? তোমায় তো আমায় বিশ্বাস করতেই হবে বংশী। তুমি যে নিরুপায়। (আবার সেই বিখ্যাত গা জ্বালানো হাসি) শোন বংশী, অনেক ধকল গেছে। আজ সবার আগে তোমার নারীর সেবা প্রয়োজন। আমি ব্যাবস্থা করে দিচ্ছি।
নারীসেবা ও ব্যাবস্থা এইদুই শব্দের মধ্যে যে কি বিশাল পরিমান ব্যাঙ্গ লুকিয়ে রয়েছে তা বংশী খুব ভালো করেই বোঝে। বংশী নিরুপায়, কিছুই করার নেই ওর। বংশীর সবচেয়ে বড় ভুল কোনটা? টমাসকে হত্যা করা? বাকিরা কি ভাবে বা ইতিহাস কি ভাবে তা জানা নেই, তবে অবশ্যই বংশীর এই মুহূর্তে নিজের একটাই ভুল বারেবারে চোখে ধরা পড়ছে। মালা, জমিদারের কামনাময়ী সুন্দরী স্ত্রী মালা। এই মালার লোভে বংশী যদি না পড়ত তাহলে হয়ত সম্পূর্ণ খেলাটাই অন্যকিছু হত। বংশী জানে আজ রাতের জন্য সত্যি ই নায়েবমশাই মালাকে ওর ই হাতে তুলে দেবে। কিন্তু নারীদেহ ভোগ করার যে মানসিক প্রসন্নতা দরকার এই মুহূর্তে বংশীর তার সিকিভাগ ও নেই। হাঁটতে হাঁটতে ওরা যে কখন সুরঙ্গর সামনে চলে এসেছে তা বংশী খেয়াল করেনি। নায়েবমশাই সুরঙ্গর মুখের কাছে গিয়ে কিছুটা গলা ভারী করেই বলে উঠলেন
নায়েবমশাইঃ রানীমা, রানীমা। বাইরে আসুন, আমি নায়েবমশাই। আর কোনও ভয় নেই আপনার। ফিরিঙ্গীদের সৈন্যরা চলে গেছে। বংশীও ফিরে এসেছে।
নায়েবমশাই এর কথা শুনে বংশী প্রায় চমকে ওঠে, মনে মনে বলে “নায়েব তুমি আমার চেয়েও বড় শয়তান। আমায় তো খলনায়ক দারিদ্র আর মানসিক যন্ত্রণা বানিয়েছে, কিন্তু তুমি জানোয়ার হয়েই জন্মেছ” কিছুটা খোঁড়াতে খোঁড়াতে গুহার ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে মালা। গায়ের কাপড় জবুথবু, ব্লাউজটা এখনো শরীরে নেই, শাড়ির ওপর দিয়ে কোমল স্তনের আভা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মনে মনে প্রচণ্ড রাগ হয় বংশীর। মালার ওপর ওর যতই কুনজর থাক না কেন, কোথাও একটা এই নিষ্পাপ মেয়েটার প্রতি মায়া জন্মে গেছে। হয়ত এই দুর্বলতাই ওর সর্বনাশ করে ছাড়ল। মালার দু চোখে তখন ও জল রয়েছে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে মালা ওদের সামনে আসে। নায়েবমশাই এর দিকে প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হয়ে বলে ওঠে
মালাঃ কি খবর নায়েবমশাই, উনি কেমন আছেন? সব খবর ভালো তো?
বংশী, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নায়েবমশাই এর দিকে। সত্যি লোকটা কি কঠোর আর নিষ্ঠুর। একটা নিষ্পাপ মেয়ের আবেগ জড়ানো আকুতির সামনেও কি করে একটা মানুষ এতো ছল চাতুরি করতে পারে। কিছুটা গম্ভীর হয়ে নায়েবমশাই উত্তর দেন
নায়েবমশাইঃ আমি বুড়ো মানুষ রানীমা। আমি জমিদারবাবুর অবর্তমানে বড়জোর জমিদারী চালাতে পারি। কিন্তু নীলকুঠি থেকে ওনাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা এতো আমার কাছে স্বপ্নাতীত। এই দায়িত্ব বংশী নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। ওই আপনাকে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেবে। আপনি জমিদারবাড়িতে নিরাপদ নয়, আজ ও কষ্ট করে আপনাকে এখানেই কাটাতে হবে। বংশী কথা দিয়েছে ও জমিদারবাবুকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসবে। এবার আপনি আমাদের যেতে আজ্ঞা করুন।
নায়েবমশাই এর মুখ থেকে নিরাশার উত্তর পেয়ে মালা, ভাষাহীন হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। বংশীর দিকে জিভ উলটে আবার একটা অশ্লীল ইঙ্গিত করে নায়েবমশাই নিজের সমস্ত সৈন্য নিয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকেন। সুরঙ্গের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে শুধুই মালা আর বংশী। মাটির দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে মালা। বংশীর গালে এখনো মালার হাতের দাগ দৃশ্যমান। না দাগটা চোখে দেখা যাচ্ছেনা, কিন্তু অপমানটা সমস্ত শরীরে আঠার মত চেপ্টে বসে আছে। এতক্ষনে বংশীর দিকে তাকায় মালা
মালাঃ বংশী তুমি আমায় কথা দিয়েছিলে কোনও সুখবর না নিয়ে আমার কাছে আসবেনা। কি ব্যাপার বংশী চুপ করে আছো কেন? তুমি আমায় ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলে কোনও সুখবর না নিয়ে এখানে আসবেনা।
শেষ কথাটা মালা এতটাই জোরে বলল যে বংশী প্রায় চমকে গিয়ে মালার মুখের দিকে তাকাল। অন্য সময় হলে এই এতো অপমানের প্রতিশোধ স্বরূপ বংশী আরও একটা অপরাধ হয়ত করে ফেলত। হয়ত মালার নরম পবিত্র দেহটা মাটিতে ফেলে চটকে চটকে দলা পাকিয়ে দিত। কিন্তু বংশীও জানেনা কেন ওর মধ্যে এক অন্য মানুষের আবির্ভাব ঘটছে। হথাত করেই ওর মালাকে দেখে প্রচণ্ড স্নেহ হচ্ছে। বারবার এটাই মনে হচ্ছে কেন এতো দুর্নাম আমার? কেন আমি ডাকাত হলাম? জীবনে ভালোবাসা কখনো পাইনি আমি সেইজন্য। একবার যদি পেতাম হয়ত আমিও ভালো ভদ্র মানুষ হতাম। এই জটিল পাশাখেলার ময়দানে সবাই তো জানোয়ার একমাত্র মানুষ তো একজন সে হোল মালা। ওর সাথে সবাই ছলনা করেছে, কিন্তু ও কারুর সাথেই ছলনা করেনি। বংশীর দুচোখ ছলছল করে ওঠে। সত্যি মায়া কি অদ্ভুত জিনিষ। বংশীর মত একটা জানোয়ারকেও কাঁদিয়ে দেয়। বংশীর দুচোখের দিকে তাকিয়ে মালা প্রায় ফুঁপিয়ে ওঠে
মালাঃ তুমি কাঁদছ বংশী? কি হয়েছে বংশী, কোনও বাজে খবর আছে কি? উনি ভাল আছেন তো?
বংশী আর এই নিষ্পাপ শরীরটাকে কষ্ট দিতে পারেনা। মালার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে
বংশীঃ রানীমা, খবর মোটামুটি ভালোই। আমি নিজে সিলিং সাহেবের সাথে দেখা করেছি, কথা বলেছি। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যে উনি কাল সকালে ফিরে আসবেন। কিন্তু এই মুহূর্তে এই স্থানটা আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। আগে আপনি আমার সাথে কুটিরে চলুন তারপর সব কিছু আমি আপনাকে বলব।
ছলছল চোখে মালা তাকায় বংশীর দিকে। এতক্ষনে পূর্ণিমার চাঁদের মত সুন্দর ওই মুখটায় একটা মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে। মালার মুখ দিয়ে শুধু একটাই কথা বোঝা যায় “তুমি সত্যি বলছ বংশী?” বংশী শুধু মাথা নেড়ে ওকে আশ্বস্ত করে। বংশীর কাঁধে নিজের হাতটা রেখে কোনরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকে মালা। মালার এই স্পর্শ আর বংশীর কামরিপুকে উত্তেজিত করেনা। মাঝেমধ্যেই বংশী পাশফিরে মালার দিকে তাকায়, শান্ত স্নিগ্ধ ওই মুখে বংশী পরের জন্মের প্রিয়তমাকে খুঁজে পায়। কারন বংশী জানে যতই আশাবাদী ও হোক না কেন, বাস্তব এটাই যে ও সম্পূর্ণভাবে শেষ। এই মুহূর্তে ও বিভিন্ন খেলোয়াড়ের গুটিতে পরিনত হয়েছে।
অত্যন্ত ধীর গতিতে ওরা দুজনে সামনের দিকে এগোতে থাকে। এ কোন বংশী? যে ঠিক একটা দিন আগে ফুলের মত নিষ্পাপ একটা তরুণকে হত্যা করেছে সেই বংশী? একি সেই পুরনো বংশী, যে সামান্য কিছু গয়নার লোভে এক কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে হত্যা করেছিল। একি সেই বংশী পেছনে যাকে নিজের দলের লোকেরাই জানোয়ার বলে ডাকত? কেন বংশীর এই পরিবর্তন? হয়ত বংশী চোখের সামনে নিজের মৃত্যুকে দেখতে পাচ্ছে। বংশী জানে নায়েবের কথা শোনা বা না শোনা দুটোই অনুরুপ। মৃত্যু ওর হবেই, সারা জীবনের এই কলঙ্কের একটা হিসেব তো হবেই। আবার একবার মালার দিকে তাকায় বংশী। ওর ওই নিষ্পাপ দুই চোখ বংশীকে একটাই কথা বারবার করে বুঝিয়ে দিচ্ছে- বংশী ভালোমানুষীর দাম চিরকাল থাকবে। দেখ মালাকে মেয়েটা একটা মৃত্যুশয্যার বৃদ্ধকে বিবাহ করেছিল, মরার খাট থেকে উঠে এসেছিল তাও প্রকৃত ভালোবাসা ও পেয়েছে। জমিদারবাড়িতে রানীমার মর্যাদা ও পেয়েছে। সুপ্রতীক যতই বিচক্ষন হোক চতুর হোক ও মানুষ হিসেবে বিশাল মাপের। বংশী আজ ই ঠিক কর, সত্য না মিথ্যে কার সাথে থাকবি তুই। যদি এরপর ও সেই পুরনো বংশী ফিরে আসে তুই নরকেও গিয়ে শান্তি পাবিনা। মালাকে নিজের স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দে, ওর মুখের সেই পুরনো হাসিটা আবার ফিরিয়ে দে, দেখবি মরেও শান্তি পাবি। বিবেকের তাড়না বড় অদ্ভুত এক জিনিষ। মানুষকে অন্তর থেকে নাড়িয়ে দেয়। হয়ত বংশীর ও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। কখন যে ওরা ধীরে ধীরে কুটিরের সামনে পৌঁছে গেছে তা দুজনের ই খেয়াল নেই। মালা বিভোর হয়ে আছে এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়, নতুন সূর্যোদয়, সমস্ত চিন্তা ও মানসিক কষ্টের অবসান। বংশী বিভোর হয়ে আছে নতুন এক সূর্যস্নানের, সমস্ত পাপ ধুয়ে যাওয়ার। মৃত্যু, মৃত্যুই এইমুহূর্তে সবচেয়ে সহজ রাস্তা বংশীর কাছে। বংশী খেয়াল করেনি মালা ওর কাঁধের ওপর থেকে হাত সরিয়ে কুটিরের ভেতর প্রবেশ করেছে। বংশী এতক্ষনে মালার দিকে তাকায়, সেই পুরনো মিষ্টি হাসিটা মালার মুখে ফিরে এসেছে
মালাঃ বংশী, তুমি কিছু খেয়েছ? আমার জন্য তো নায়েবমশাই খাবার এনেছিলেন আমি কিন্তু খেয়েছি।
কোনও উত্তর দেয়না বংশী, শুধু মালার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বংশীর দুগাল বেয়ে জল ভেসে আসতে থাকে। অবাক হয়ে মালা তাকায় বংশীর দিকে। হয়ত আরও বেশি অবাক বংশী নিজেই হয়েছে, এ কোন বংশী, নিজের মনেই একবার বলে ওঠে ও “আমি কি মানুষ হয়ে গেলাম মা” হাঁ মা। ও খেয়েছে কিনা, শরীর ঠিক আছে কিনা একথা তো সেই কোন ছোটবেলায় ওর মা ওকে বলত। চোখের সামনে যেন ওর মা দাঁড়িয়ে। এ ওর কি হচ্ছে? যার শরীরকে একবার স্পর্শ করার জন্য ও পাগল হয়ে যেত আজ তার ই মধ্যে মাতৃস্নেহের পরশ খুঁজতে চলেছে। নিজের মনেই বলে বংশী “আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?” অত্যন্ত করুনভাবে ওর দিকে তাকায় মালা। সামনের দিকে এগিয়ে এসে বংশীর দুহাত চেপে ধরে বলে ওঠে
মালাঃ আমায় ক্ষমা কর বংশী। তোমার সাথে আমি অনাচার করেছি। এর শাস্তি ভগবান আমায় ঠিক দেবেন। তুমি কখনো বুঝবে না মনের মানুষের এরকম দুঃসময়ে মেয়েদের মনের কি অবস্থা হয়। আমি পাপ করেছি বংশী।
মালা জানেনা ওর এই কথাগুলো একটা জানোয়ারকে আরও বেশি দুর্বল করে তুলছে, বারবার নিজেকে একবার মানুষের রুপে দেখার ইচ্ছে প্রবলভাবে জাগিয়ে দিচ্ছে। বংশীর মন চাইছে ওর হৃদয়টা যেমন টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেছে সেটা একবার অন্তত একবার মালার সামনে প্রকাশ করতে। লজ্জায় মাথা নিচু করে দেয় বংশী। মালার এই সরলতা ওর শরীরে তীরের মত বিদ্ধ হতে থাকে। মালা আবার ওর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে
মালাঃ আমি তোমায় কাপুরুষ বলেছিলাম বংশী। কিন্তু বিশ্বাস কর ওটা আমার মনের কথা ছিলনা। পুরুষ মানুষের সবচেয়ে বাজে গুন কোনটা জানো। সে নিজেকে পুরুষ মনে করে, শক্তিশালী মনে করে কিন্তু মানুষ মনে করতে পারেনা, চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল বার করতে পারেনা। তুমি মানুষ বংশী।
একবার মুখতুলে মালার দিকে তাকায় বংশী। আর পারেনা বংশী। এতদিন ধরে তিলতিল করে গড়ে তোলা হিংসা, আক্রোশ রাগ সব যেন মুহূর্তের মধ্যে কোথায় হারিয়ে যায়। অন্তর থেকে পাপবোধের তীব্র দংশন ওকে যন্ত্রণায় বিদ্ধ করে তুলতে লাগে। মালার সামনেই হথাত ই ও নিজের হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে বসে পড়ে। দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে দেয়। মালার বুঝতে অসুবিধা থাকেনা বংশী কাঁদছে একটা মানুষ কাঁদছে। ধীরে ধীরে ওর সামনে এগিয়ে যায় মালা। দুহাত দিয়ে বংশীর মাথায় হাত রাখে মালা। বংশীর হৃদয়ে সমুদ্রের এক বিশাল ঢেউ এসে সব বাঁধ ভেঙে দেয়। দুহাত দিয়ে মালার শরীরটা জড়িয়ে ধরে বংশী। নিজের মাথাটা মালার পেটের কাছে রেখে প্রচণ্ড জোরে ফুঁপিয়ে ওঠে। প্রচণ্ড তীব্রতায় অন্তরের সমস্ত বিষ উদ্রেক করে দেয়। মালা মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বার করেনা, শুধু দুহাত দিয়ে ওর চুলে হাত বুলিয়ে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করে। একবারও ওর কঠিন আলীঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেনা, কারন মালা জানে এই আলিঙ্গনে সামান্য কোনও পাপ নেই, যৌনতার আস্ফালন নেই, আছে শুধু স্নেহ, মায়া মমতা। বহুক্ষন বাদে শান্ত হয় বংশী। আসতে আসতে নিজের মাথাটা ওপরের দিকে তুলে ধরে থাকা গলায় বলে ওঠে
বংশীঃ রানিমা, আমার যখন ১০ বছর বয়স, আমার মা মারা যায়। বাবা আবার একটা বিয়ে করে। নতুন মাএর কাছে আমি দুচোখের বিষ ছিলাম। কেন জানিনা আজ এতো বছর পর আপনাকে দেখে মায়ের মুখটা ভেসে উঠল। আপনি হয়ত বুঝবেন না, আমার আয়ু আর বেশিদিন নয়, মনে হয়না কাল এরকম সময়ে আমি এই জগতে থাকবো। এটা সত্যি রানিমা।
মালার ও গলা জড়িয়ে এসেছে। শুধু একটাই কথা ওর মুখ দিয়ে বেরোল “এরকম বলেনা বংশী”
বংশীঃ নতুন মা আসার পর ও আমি ঠিক ছিলাম। কিন্তু একদিন খাজনা দিতে না পারার জন্য জমিদারের পেয়াদা এসে আমার বাপটাকে ধরে নিয়ে গেলো। আমি তখন খুব ছোট। বাবা ফিরে আসলো কিন্তু মাটিতে শরীর ঘষতে ঘষতে। ওরা বাবাকে একদম পঙ্গু করে দিয়েছিল। আমি গুরুকুলে পড়তে যেতাম। সব বন্ধ হয়ে গেলো, সব শেষ হয়ে গেলো। সেদিন ই জমিদার এক ডাকাতের জন্ম দিয়ে দিয়েছিল, বংশী ডাকাত। যে স্বামীর জন্য আপনি আমায় কাপুরুষ বা জানোয়ার বললেন সে মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মেছে। আমি কিছুই পাইনি। জানোয়ার আমিও ছিলাম না। আমিও মানুষ ছিলাম।
দুহাত দিয়ে শক্ত করে বংশীর মাথাটা নিজের শরীরে বেঁধে নেয় মালা। কথাবলার শক্তি তো মালাও খুইয়ে ফেলেছিল।
একি সুবীর বাবু আপনার ও চোখে জল। আরে মশাই একি প্রেমের গল্প নাকি। এখনো অনেক নাটক বাকি। আরে মশাই আপনিও তো দেখছি বংশীর মত নিজের পুরুষসত্বাটা বেমালুম ভুলে ফিচফিচ করে মেয়েলি কান্না কাঁদতে শুরু করলেন। আরে মশাই গল্প এখনো অনেক বাকি। পাটিগণিতের নিয়মে চললে আর অভিশাপ, ষড়যন্ত্র এগুলো কোথায় যাবে। তবে এটা সত্যি বংশী কাল বাঁচবে না বাচবেনা জানিনা, তবে বংশীর মানব জনম যে হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। হয়ত মানব বাবুর বা রাজুর বা সাইদুলের ঠিক এরকম ই একটা মানব জনম দরকার ছিল। আপনারা তো ভদ্রলোক, উচ্চশ্রেনীর উচ্চশিক্ষিত লোক। মালা কি আপনাদের চেয়েও শিক্ষিত? ভেবে দেখুন সুবীরবাবু। সুবীর বাবু মানুষ কখনো জানোয়ার হয়ে জন্মায়না, সমাজ ই বঞ্চনা আর বিভেদের মাধ্যমে মানুষকে জানোয়ার বানায়। ছাড়ুন, আপনার গল্প তো চতুর্থ খণ্ডে আসবে। আপাতত আমরা এরপর কি হয় সেদিকে দেখি।


Reply
#68
পর্ব ২৯- বিবেক দংশনঃ

নিজেকে দ্রুত সামলে নেয় বংশী, মালার শরীর থেকে নিজেকে কিছুটা দুরত্বে নিয়ে যায়। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বংশী। যে শরীরটাকে একটিবার স্পর্শ করার জন্য ও পাগল হয়ে যেত আজ সেই শরীর ই ওকে বটবৃক্ষের মত আশ্রয় দিয়ে হতাশার করুন তীব্র যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিল। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বংশী। একি মালা, নাকি কোনও দেবী। মনে মনে বলে ওঠে বংশী “কেন স্পর্শ করলে এই পাপের শরীরটা, তুমি তো পবিত্র দেবী, গঙ্গা তুমি। যুগে যুগে মানুষ তোমার দিকে আঙুল তুলেছে, বলেছে তুমি অপবিত্র, তুমি তো তা নও মালা” বংশীর হৃদয়ের কোনও এক কোনে এক তীব্র অভিমান লুকিয়ে আছে, সেই অভিমান সুপ্রতীকের জন্য। মনে মনে বলে ওঠে বংশী “সুপ্রতীক তুমি আজও আমার কাছে হারলে, তোমার মালাকে আমি তোমার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে দয়া করলাম। তুমি তো রাজা। আমার মত সামান্য এক জীবকে বোকা বানানোর জন্য নিজের স্ত্রীকে ব্যবহার করলে? এ তুমি কেমন রাজা সুপ্রতীক? যদি আজও আমি জানোয়ার থাকতাম, যদি মালার শরীরটা মাটিতে ফেলে পিষে দিতাম তুমি কি তাকে গ্রহন করতে? তুমি কে মালা? তুমি কি সিতা না তুমি পাঞ্চালী? কেন তোমাদের প্রতিদিন অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে?”
মালা চেয়েছিল এক অনুতপ্ত মানুষের আশ্রয় হতে, মালা চেয়েছিল এক দুর্বল মানুষের আশ্রয় হতে। মালা কি অপরাধ করে ফেলল? যতই হোক পরপুরুষকে স্পর্শ এতো ধর্মের বিরোধী? হয়ত এই প্রশ্নগুলোই মালার মনে ঘুরপাক খেয়ে চলেছিল। উত্তরটা মালা পেয়েছিল কিনা জানিনা। বস্ত্রহরণের পর শুধু কৃষ্ণের দুই চরন স্পর্শ, অথবা মাটির বুক চিরে পাতালে প্রবেশ করা এই তো ওদের ভবিতব্য। পাণ্ডবের সভায় দাঁড়িয়ে পাঞ্চালী চিৎকার করে যুধিষ্ঠিরকে বলছে আমি পন্য নই, আমি পাশাখেলার বাজি নই- এতো স্বপ্নাতীত সুবীরবাবু। ওদের অভিমান করার অধিকার আছে, প্রতিবাদ করার অধিকার নেই। আমাদের ধর্ম, রামায়ন, মহাভারত এই তো আমাদের শিখিয়ে এসেছে। ঠিক বলছি তো সুবীরবাবু। কেন জানেন? রামায়ন মহাভারত দুই ই তো পুরুষের রচনা, ওরা কি আর নারীর সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে দেবে। আর যদি কোনও নারী চায় চিরাচরিত এই সত্যের বিরধিতা করতে তাকে তো আমরা চিতার আগুনে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছি। হয়ত মালার ওইভাবে বংশীকে জড়িয়ে ধরা আপনার ও চোখে অপরাধ, আমি জানি অপরাধ। কিন্তু সুবীরবাবু মালা এর জন্য অনুতপ্ত নয়। হাজারো বার অসহায় মানুষকে আশ্রয় দিতে মালা এভাবেই বংশীকে জড়িয়ে ধরবে। মালা পবিত্র, গঙ্গার মত পবিত্র। সুবীরবাবু মালতি ও মালা হতে চেয়েছিল, আপনারাই ওকে মালা হতে দেননি, কখনো সমাজ, কখনো পরিবারের বন্ধনে আবদ্ধ করে ওকে মালা হতে দেননি। যাই হোক ছাড়ুন আমরা বরং গল্পে চলে আসি।
নতুন এক বীরের জন্ম হয় এই জঙ্গলে যার নাম বংশী, একজন মানুষ বংশী, যে জানে কাল ই তার মৃত্যু আসন্ন। নিজের চোখের সামনে মৃত্যুর বিভীষিকা দেখতে পেয়েছিল বংশী। মরার আগে একটিবার ভালো কিছু করতে চায় বংশী। বংশী নিজের বিবেকের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় মালার সম্মান রক্ষা করে মালাকে সুপ্রতীকের কাছে ও পৌঁছে দেবে। শুধু মালার ই কথা ভেবে ও জমিদারবাড়িকে রক্ষা করবে। এতক্ষনে মালাও শান্ত হয়। ও জানে ওর মাতৃআশ্রয়ে বংশী নিরাপদ, বংশীর হৃদয়ের সমস্ত যন্ত্রণার অবসান হয়েছে। বংশীর দিকে তাকিয়ে মালা বলে ওঠে
মালাঃ বংশী তুমি সকাল থেকে কিছু খাওনি। নায়েবমশাই কিছু খাবার দিয়ে গেছেন। কুটিরের মধ্যে রাখা আছে, আমি নিয়ে আসছি।
মালার দিকে তাকিয়ে একবার হাসে বংশী। এই হাসির মধ্যে সামান্য কোনও কুটিলতা ছিলনা, ছিল শুধুই প্রশান্তি।
বংশীঃ আমি কিছুক্ষন পরে খাবো রানীমা। আগে আমি আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই। জানিনা আপনি কিভাবে গ্রহন করবেন। বলতে পারেন কিছু সত্যি কথা বলতে চাই। এগুলো জানা আপনার দরকার।
মালা শান্ত হয়ে তাকিয়ে থাকে বংশীর দিকে। হয়ত সিলিং সাহেবের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়েও এতো বড় সত্য বংশীর মুখ থেকে নির্গত হতনা, কিন্তু বিবেকের দংশন যে বড়ই জ্বালা দেয়। মাথা উঁচু করে বংশী বলে ওঠে
বংশীঃ রানীমা, সিলিং সাহেবের ভাই টমাসকে আমি ই হত্যা করেছি। জমিদারবাড়ির সবচেয়ে বড় শত্রু আমি। যা করেছি সব শুধুই জমিদারবাড়ির আর জমিদারবাবুর ক্ষতি করার জন্য।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করে বংশী। মালা স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বংশীর দিকে। বংশী পারেনা ওই শান্ত শীতল নজরের সাথে নিজের নজর মিলিয়ে দিতে। মাথা নীচু করে লজ্জায় দাঁড়িয়ে থাকে বংশী।
মালাঃ কেন এরকম করলে বংশী? তোমার সাথে যে অন্যায় হয়েছে তার বদলা নেওয়ার জন্য তুমি নিজেও তো অন্যায় ই করলে বংশী। জমিদারবাড়ির শত্রু কে আমি জানিনা কিন্তু বংশীর সবচেয়ে বড় শত্রু বংশী নিজেই। তুমি ভালো মানুষ হতে পারতে বংশী। অন্যায় আমার সাথেও কম হয়নি।
বংশীর হৃদয়টা মালার কথায় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। বুকের ভেতর থেকে জমে থাকা একরাশ অভিমান বাইরে বেরিয়ে আসে
বংশীঃ আপনার পাশে জমিদারবাবু ছিলেন, জমিদারবাবুর পাশে আপনি ছিলেন। আমার পাশে কে ছিল রানীমা? ক্ষিদের যন্ত্রণা কি তাকি আপনি বোঝেন? ভালোবাসা, সংসার, প্রেম এতো শুধুই বড়লোকের সম্পত্তি রানিমা। আমাদের তো বেঁচে থাকার জন্যই বাঁচা। আমাদের কি আর এতো ভালমন্দের বিচার করলে চলে। আমি আপনাকে দেখে, আপনার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভালমানুষটাকে দেখে পাল্টাইনি রানিমা। আপনি হয়ত এখনো বিশ্বাস করেননা, আমি সত্যি ই নিজের মৃত্যু চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। বংশীর চালাকি ফাঁস হয়ে গেছে। আমি শেষ রানিমা।
মালা কোনও উত্তর দিতে পারেনা। একবার বংশীর দিকে তাকিয়ে আবার মুখ নামিয়ে নেয়।
বংশীঃ কিন্তু আমায় কাপুরুষ ভাববেন না। আমি চাইলে এখনো লড়ে যেতে পারতাম। শেষ নিঃশ্বাস অবধি আমি লড়তে জানি। কেউ হয়ত বিশ্বাস করবেনা, কিন্তু এটা সত্যি এই রনক্ষেত্রে যোদ্ধা অনেকে, কিন্তু মানুষ একজন ই। সে আপনি রানীমা। আপনার চোখের সরলতা আমি দেখেছি। সুরঙ্গের অন্ধকার থেকে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আপনি যখন বাইরে এলেন কে যেন আমার ভেতর থেকে বলে উঠল “কি দরকার বংশী, কি লাভ এই লড়াইতে?” আমি যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করিনি, আমি শুধু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। মানুষ তো একজন ই, সেটা আপনি রানীমা।
অবাক হয়ে বংশীর দিকে তাকায় মালা। একটা কথাও ওর মুখ ফুটে বাইরে আসেনা। মালা যে ধর্মসঙ্কটে পড়ে গেছে। কারপক্ষ ও নেবে? নিষ্ঠাবতী পত্নীর দায়িত্ব সমস্ত কিছু সুপ্রতীককে বলে বংশীকে শাস্তি দেওয়া। আর মানবিক মালার দায়িত্ব এই নতুন বংশীর পাশে থাকা, মায়ের মত আগলে রাখা।
বংশীঃ না রানীমা, আমি আপনার থেকে কিছুই চাইনা, প্রানভিক্ষাও না। কাল সকালেই আমি সিলিং সাহেবের কাছে গিয়ে নিজের দোষ স্বীকার করবো। এতেই সবার মুক্তি। জমিদারবাবু নিজের প্রজাদের মনে আগের জায়গা ফিরে পাবেন, সিলিং সাহেবের সাথে শুরু হওয়া এই দ্বন্দের ও অবসান ঘটবে। আমি মুক্তি চাই রানীমা। আমি মৃত্যুকে আলীঙ্গন করতে চাই রানীমা।
আর পারেনা মালা, বংশীর দিকে এগিয়ে আসে। বংশীর দুহাত ধরে বলে ওঠে “তুমি মানুষ বংশী, তুমি প্রকৃত মানুষ। তুমি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিও” মাথা নিচু করে বংশী বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে। সমস্ত হতাশা, মান অভিমান কাটিয়ে বলে ওঠে
বংশীঃ আমি বেইমানি করেছি একটা অবিচারের জায়গা থেকে। আমি আপনার নজরে, জমিদারবাবুর নজরে খারাপ। কিন্তু রানীমা, আমার চেয়েও বড় জানোয়ার একজন রয়েছে। যে প্রতিমুহূর্তে জমিদারবাড়ির সর্বনাশ করে চলেছে।
নির্বাক হয়ে বংশীর দিকে তাকিয়ে থাকে মালা, হয়ত ওর এই নীরবতা একটাই কথা বলে চলেছে “কে সেই বেইমান বংশী? কে সে”
বংশীঃ ঠাকুর ডাকাতের দল তৈরি হওয়ার পর থেকেই জমিদারবাড়িতে টাকাপয়সা, গয়না এইসব রাখা নিরাপদ ছিলনা। তখন থেকেই শুরু হয় গোপন কোনও স্থানে এইসব সম্পত্তি সরিয়ে ফেলার কাজ। এই গুপ্তধনের গল্প সুতানুটির আকাশে বাতাসে এখনো ঘুরে বেড়ায়। এই গুপ্তধনের ই লোভ জমিদারবাড়ির সবচেয়ে বড় শত্রুর জন্ম দেয়। সে আর কেউ নয় আমাদের নায়েবমশাই। কি অদ্ভুত এই পৃথিবী, আমি তো খলনায়ক হয়েছি একটা অসুস্থ সমাজের জন্য আর নায়েবমশাই সবকিছু পেয়েও শুধুই অর্থের লোভে জানোয়ার হয়েছেন।
প্রায় চমকে ওঠে মালা। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে “নায়েবমশাই!” বংশীর কথা প্রথমবারেই হয়ত মালার বিশ্বাস হয়না কিন্তু মালা জানে বংশী মিথ্যে বলছেনা।
বংশীঃ রানীমা, নায়েবমশাই সব জানেন। উনি ইচ্ছে করেই আপনাকে জমিদারবাড়িতে নিয়ে যাননি। ওই মিষ্টি হাসিটার অন্তরালের লোকটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর আর ভয়ঙ্কর। আমাদের হাতে সময় খুব কম রানীমা। এই জঙ্গলে আমার সাথে আপনাকে একা রেখে দেওয়ার পেছনেও নায়েবমশাইএর নিশ্চয়ই কোনও চাল আছে। কাল ভোরের আলো ফোঁটার আগেই আমাদের এখান থেকে রওনা দিতে হবে।
স্থির দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে মালা। এই যুদ্ধক্ষেত্র ও চায়নি, এই রাজনীতি এতো মিথ্যাচার এও ও চায়নি। ও চেয়েছিল দুদণ্ড শান্তি আর নিজের স্বামীর একটু ভালোবাসা। হয়ত জীবনটা এরকম ই হয়। নিজেকে শান্ত করে মালা। যে লোকটা আজ জমিদারবাড়ির সবচেয়ে বড় বন্ধু কাল অবধি সেই ছিল ওদের সবচেয়ে বড় শত্রু। আর বন্ধু ভেবে যাকে ওরা নির্ভর করে চলেছে সেই হোল সবচেয়ে বড় শত্রু। এই জটিলতা থেকে মালা একটু মুক্তি চায়। সতির চিতা থেকে ঝাঁপ দেওয়ার সময় ও একবার ও ভাবেনি যে বেঁচে যাবে। এক মহানুভব পুরুষ ওকে রক্ষা করেছিল। প্রান বাঁচলেও ভাবেনি ওর আশ্রয় হবে। অবশেষে আশ্রয়ের সাথে সাথে স্ত্রীর মর্যাদাও ও পেয়ে যায়। মালা চেয়েছিল সেই মহান মানুষটাকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালবাসতে। ভাবেনি এতবড় দুর্দিনের মধ্যে তার মনের মানুষকে পড়ে যেতে হবে। কে মিত্র কে যে শত্রু তা নিয়ে আর ভাবার মানসিক শক্তি মালার শরীরে অবশিষ্ট নেই। মালা শুধু এটাই জানে ওর শত্রু একজন, শুধুই একজন, সে হোল সমাজ। এই সমাজ ই ওকে সতি বলে চিতার আগুনে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল, এই সমাজ ই একটা মৃত্যুশয্যার বৃদ্ধর স্ত্রী বানিয়ে ওর জীবনটা শেষ করেছিল। হয়ত মনে মনে একবার বলে মালা “ভগবান আর কতকাল আমরা এভাবে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে যাবো”
মালার এই ভাবুক মুখটার দিকে একনজরে তাকিয়ে থাকে বংশী। বংশীর হৃদয়ে বিবেক যন্ত্রণার আর সামান্য কণাটুকু অবশিষ্ট নেই। নিজের সমস্ত পাপ মালার সামনে উদ্রেক করে ও আজ মুক্ত। মরতেও ওর আর কোনও ভয় নেই। মালার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে
বংশীঃ রানিমা কোনও চিন্তা করবেন না। আমি থাকতে জমিদারবাবুর বা আপনার কোনও বিপদ ই হবেনা। আপনি নিশ্চিন্তে কুটিরের মধ্যে গিয়ে বিশ্রাম নিন। আমিও খাওয়া দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নি। কাল ভোরের আলো ফোঁটার আগেই আমরা এখান থেকে চলে যাবো।
বংশীর দিকে তাকিয়ে একবার স্ফীত একটা হাসি হাসে মালা। বংশী জানে এই হাসির মধ্যে হয়ত সেই প্রানবন্ততা নেই কিন্তু রয়েছে গভীর বিশ্বাস। দীঘির দিকে এগিয়ে যায় বংশী। একটা ফুরফুরে হাওয়া ওপাশ থেকে বয়ে আসছিল, বংশী জানেনা এই বাতাস ওর জীবনের শেষ আমেজ কিনা। নিজের বিবেকের কাছে জয়ী হয়ে সেই প্রানবন্ত হাওয়ার সাথে নিজেকে মিশিয়ে দেয় বংশী। কতক্ষন যে এভাবে ও ছিল নিজেও খেয়াল করেনি, পেছন ঘুরে দেখে মালা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে খাবারের পাত্র। বংশীর দিকে তাকিয়ে মালা বলে ওঠে
মালাঃ খেয়ে নাও বংশী। কাল যা হবে তা কাল ই দেখা যাবে। কিন্তু এখন খেয়ে নাও।
মালার হাত থেকে খাবারের পাত্রটা গ্রহন করে বংশী। সামান্য হেঁসে মালা ফিরে যায় কুটিরের দিকে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বংশী। ওপরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে “পরের জন্মে আমায় মানুষ করে পাঠিও ভগবান” বেশকিছুক্ষন ওখানে দাঁড়ানোর পর বংশীও কুটিরের দিকে যেতে শুরু করে। কুটিরের ফাঁক হয়ে থাকা দরজাটা দিয়ে বোঝা যায় মালা শুয়ে পড়েছে। বাইরের চাতানে বংশীও নিজের শরীরটা ফেলে দেয়। সারাদিনের ক্লান্তি হতাশা ধীরেধীরে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। চোখ দুটো বুজে আসে।
ঘুম যখন ভাঙ্গে তখন প্রায় ভোর হয়ে গেছে। সমস্ত জঙ্গল জুড়ে পাখিদের কুহুতান শুরু হয়ে গেছে। ধীরেধীরে উঠে বসে বংশী। ঘুমের আবরণটা শরীর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দীঘির দিকে এগিয়ে যায়। হাতে আঁচলা করে জল নিয়ে ভালো করে মুখে ঝাপটা দেয়। ওদের খুব দ্রুত এই স্থান ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু কোথায় যাবে ওরা? জমিদারবাড়ি? যদি কালরাতে বংশীকে মালার কাছে ছেড়ে দেওয়াটা নায়েবমশাই এর কোনও ষড়যন্ত্র হয় তাহলে? হথাত ই বংশীর পিঠে প্রচণ্ড শক্ত একটা লোহার নল স্পর্শ করে। প্রায় চমকে গিয়ে পেছনঘুরে দেখে বংশী। হয়ত এরকম ই একটা কোনও আশঙ্কা করেছিল বংশী। বংশীর ঠিক পেছনে সিলিং সাহেব, পেছনে ব্রিটিশ সৈন্যদের বিশাল একটা দল। আর কিছুটা দূরে সেই পরিচিত শয়তানি হাসিটার সাথে নায়েবমশাই। হয়ত বংশী জানত এরকম ই কিছু একটা হবে, তাই হয়ত স্বাভাবিক ভীতিবোধটা প্রকাশ না করে নায়েবমশাইকে অনুরুপ একটা হাসি ফেরত দিল। ওর এই হাসি সিলিং সাহেবের যে সহ্য হবেনা তা ও জানত।
সিলিং সাহেবঃ বংশী, আর কোনও চালাকি নয়। জমিদারের বউকে আমার হাতে তুলে দাও। তার বদলে আমি তোমায় প্রানভিক্ষা দিতে পারি।
ভাবলেশহীন হয়ে দীঘির পাড়ে একিভাবে বসে রইল বংশী।


Reply
#69
পর্ব ৩০- বীরের মৃত্যুঃ

বন্দুকের নলের মুখে কি সত্যি মানুষ এতো নির্বিকার হতে পারে। অবাক হয়ে যায় সিলিং সাহেব, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নায়েব মশাই। একটা বেলা আগেই এই মানুষটাকে পাশা খেলার হিসেব ওলট পালট করে দেওয়ার জন্যে ছটপট করতে দেখেছে নায়েবমশাই। বংশীর মুখের স্ফীত হাঁসি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ভাবিয়ে তোলে নায়েবমশাইকে। গম্ভীর বদনে সামনে এগিয়ে আসেন নায়েবমশাই।
নায়েবমশাইঃ শোন বংশী, তুমি যদি এটা ভেবে থাকো আবার কোনও চালাকি করবে তাহলে তুমি বিশাল ভুল করে ফেলছ।
নায়েবমশাই এর মুখের দিকে তাকিয়ে বংশী প্রায় ওনার ই অনুরুপ একটা হাঁসি ফেরত দেয়। গা রিরি করে ওঠে নায়েবমশাই এর। ওনার দুই চোখ অপমান ও অবজ্ঞায় লাল হয়ে ওঠে। বংশী তাকিয়ে থাকে সেই দুই বিস্ফোরিত চোখের দিকে। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে বলে ওঠেন নায়েবমশাই
নায়েবমশাইঃ বংশী, তুমি কি ভাবলে রানীমাকে লুকিয়ে দিলে তুমি প্রানে বেঁচে যাবে...
নায়েবমশাইকে কথা শেষ করতে দেয়না সিলিং সাহেব। সামনে এগিয়ে এসে প্রায় ধমকের সুরে নায়েবমশাইকে বলে ওঠেন
সিলিং সাহেবঃ লুকিয়ে দিয়েছে মানে? আপনি কিন্তু আমায় কথা দিয়েছেন জমিদারের দুই বোন আর বউকে আমার হাতে তুলে দেবেন। একবার কোনও মেয়ের দিকে আমার নজর পড়লে...
সিলিং সাহেবকে নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে দেন না নায়েবমশাই, প্রচণ্ড হতাশার সুরে চেঁচিয়ে ওঠেন
নায়েবমশাইঃ বল বংশী, মালা কই? রানীমাকে তুই কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস?
রাগে ফোঁস ফোঁস করতে থাকে নায়েবমশাই। সিলিং সাহেব প্রচণ্ড হতাশায় পায়চারি করতে শুরু করে দেন।
নায়েবমশাই এর মুখের দিকে তাকিয়ে আবার একটা স্ফীত হাঁসি হেঁসে বলে ওঠে বংশী
বংশীঃ নায়েবমশাই আপনি তো গুপ্তধন খুঁজতে বলেছিলেন। গুপ্তধনের সন্ধান দিতে বলেছিলেন। আমি তো সেইকাজ ই করেছি। রানীমার থেকে গুপ্তধনের সন্ধান নিয়েছি।
চোখদুটো চিকচিক করে ওঠে নায়েবমশাই এর। মুখে সেই পুরনো হাসিটা আবার ফিরে আসে
নায়েবমশাইঃ বংশী তুমি সত্যি কথা বলছ, সত্যি তুমি জানো কোথায় আছে সেই গুপ্তধন! আমায় বল বংশী, তার বদলে আমি তোমায় প্রানে বাঁচাবো। তোমায় কেউ কিছু করবেনা বংশী।
সিলিং সাহেব সমস্ত কিছু ওখানে দাঁড়িয়েই শুনছিলেন। নায়েবের কথা শুনে প্রায় উন্মাদের মত ওখানে দৌড়ে আসেন সিলিং সাহেব। প্রচণ্ড জোরে নায়েবের কাঁধটা ধরে ওকে মাটিতে ফেলে দেয় সিলিং সাহেব। বয়স কম হয়নি নায়েবমশাইএর। আচমকা সিলিং সাহেবের এই আক্রমনে নায়েবমশাই ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায়। সিলিং সাহেব তাকান বংশীর দিকে। সিলিং সাহেবের চোখের ওই আগুন বংশীকে বারবার করে এটাই বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে উনি টমাসের হত্যার ব্যাপারে সমস্তকিছুই জেনে গেছেন। নির্বিকার হয়ে চেয়ে থাকে বংশী। মৃত্যুভয় যে ওর শরীর থেকে বহু আগেই চলে গেছে।
সিলিং সাহেব নিজের হাতের বন্দুকটা সোজা বংশীর বুকে তাক করে থাকেন। সিলিং সাহেবের অগ্নিসম চাহুনি সোজা বংশীর দিকে। একবার নিজের দুচোখ বন্ধ করে বংশী ঈশ্বরকে বলে ভগবান আমায় মাফ কর। বংশী জানে ওর মৃত্যু আসন্ন।
সিলিং সাহেবঃ তুই যে একটা গদ্দার সে তো আমি অনেক আগে থেকেই জানতাম। তাই বলে তুই এক ব্রিটিশকেও হত্যা করতে পারিস তা আমার জানা ছিলনা।
সিলিং সাহেবের নাক থেকে ঘন নিঃশ্বাস বংশীর মুখে এসে পড়ে। বংশী জানে হয়ত কিছুক্ষনের মধ্যেই বন্দুকের নল থেকে কয়েকটা গুলি বেরিয়ে এসে ওর পাঁজরকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। সে দিক, মরতে আর ওর কোনও ভয় ও নেই, আফসোস ও নেই।
সিলিং সাহেবঃ বল কি দোষ করেছিল ওই বাচ্চা ছেলেটা। বল শুয়োরের বাচ্চা।
শেষ কথাটা ঠিক এতটাই জোরে সিলিং সাহেব বললেন যে বংশী বুঝে যায় এই জীবনে ওর শোনা শেষ শব্দ এই দুটোই “শুয়োরের বাচ্চা”। জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তে দুচোখ বন্ধ করে নেয় বংশী। মুহূর্তের মধ্যে জঙ্গল কাপিয়ে দিয়ে গুলির দু থেকে তিনবার কর্কশ শব্দ। যেখানেই লুকিয়ে থাক মালা, বুকটা ওর ও কেঁপে উঠেছিল। ও যে এক প্রকৃত মানুষ বংশীকে দেখেছিল। আর হয়ত সেই মানুষটাই আজ ওকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণটা হারিয়ে দিল।
গুলির শব্দে বংশীর শরীরটা কেঁপে উথলেও দুচোখ খুলে সামনের দিকে দেখে বংশী। নায়েবমশাই কখন যে মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সিলিং সাহেবের দুহাত শক্ত করে জাপটে ধরেছেন তা বংশী ও সিলিং সাহেব দুজনেই বুঝতে পারেনি। সিলিং সাহেবের পশুসুলভ শক্তির সাথে যে নায়েবমশাই পেরে উঠবেন না তা বংশীর জানা। সমস্ত গায়ের জোরে বন্দুকটা চেপে ধরে আছে নায়েবমশাই। মুচড়ে যাওয়া শরীরটা থেকে শুধু একটাই কথা বের হচ্ছে “না সিলিং সাহেব না, আমার গুপ্তধন না পেলে ও মরতে পারেনা”
বংশী মরতে ভয় পায়না। কিন্তু দুটো পশুর হাতে মরার চেয়ে বেশি যন্ত্রণার বোধ হয় আর কিছুই নেই। যে বিশেষ ক্ষমতার জন্য বংশীর এতো নাম সেই তাৎক্ষনিক বুদ্ধি প্রয়োগ করে বংশী। হয়ত নায়েবমশাই বা সিলিং সাহেব কেউ ই এটা আশা করতে পারেননি। প্রথমে নায়েবমশাই এর কাঁধে প্রচণ্ড জোরে একটা থাবা আর ঠিক তার ই সাথে সিলিং সাহেবের পেটে সজোরে একটা ঘুসি। মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দুই শরীর। বংশীর হাতে বন্দুক।
ভয়ার্ত চোখে বংশীর দিকে তাকায় নায়েবমশাই ও সিলিং সাহেব দুজনেই। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যর দল বংশীর দিকে তাকিয়ে বন্দুক তাক করে। ওদের দিকে তাকিয়েই বংশী নিজের বন্দুকটা সিলিং সাহেবের বুকে চেপে ধরে। রনাঙ্গনের এই পট পরিবর্তনের নাটক হয়ত তখনও সবাই ঠিক করে মেনে নিতে পারেনি। বিস্ফারিত চোখে বংশীর দিকে তাকিয়ে থাকে সিলিং সাহেব। বংশীও যে কাপুরুষ নয় তা ওর শান্ত শীতল চাহুনি দিয়ে সিলিং সাহেবকে বুঝিয়ে দেয়। শ্মশানের এই নীরবতা প্রথম ভঙ্গ করে নায়েবমশাই। নায়েবমশাই প্রায় ডিগবাজি খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। প্রচণ্ড হাসিখুশি মুখে বংশীর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে
নায়েবমশাইঃ সাবাশ বংশী, তোমায় তো আমি প্রথমদিন ই চিনে গেছিলাম। তুমি বীর বংশী।
নায়েবমশাই এর মুখের দিকে তাকিয়ে শুধুই একটা মিষ্টি হাঁসি ফিরিয়ে দেয় বংশী। নায়েবমশাই জানেন এই হাসির মধ্যে চরম অবজ্ঞা আছে।
বংশীঃ যে বংশীকে আপনি চিনতেন সে মারা গেছে এ অন্য বংশী। এই বংশী জানোয়ার নয়, আপনাদের মত জানোয়ার নয়।
নায়েবমশাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বংশীর দিকে।
বংশীঃ আমি বেঁচে থাকতে রানীমার কিছুই হবেনা। জমিদারবাবুর সাথে হয়ত অনেক বেইমানি ই আমি করে ফেলেছি। কিন্তু আর নয়। আমি রানীমাকে জমিদারবাবুর কাছে ফিরিয়ে দেবো। আমি সর্বসমক্ষে স্বীকার করবো আমি ই টমাসকে হত্যা করেছি। এবং তা করেছি শুধুই জমিদারবাবুকে বিপদে ফেলার জন্য। দেশে এখনো আইন বলে একটা জিনিষ রয়েছে। জমিদারবাবুর কিছুই হবেনা। ব্রিটিশ আমায় শাস্তি দিক, আমি মাথা পেতে নেবো।
বংশীর কথাগুলো নায়েবমশাই এর বিশ্বাস হয়না। নায়েবমশাই এর মনে হয় উনি যেন স্বপ্ন দেখছেন।
নায়েবমশাইঃ (বংশীর কাঁধে হাত রেখে) আরে বংশী তুমি কি পাগল হলে নাকি? এ তুমি কি বলছ? আমাদের দুজনের এতদিনের সব পরিকল্পনাই জলে মিশে যাবে। বংশী, আমার জমিদারী চাইনা। তুমি জমিদার হও, আমি তোমায় তোমার সম্পত্তি ফিরিয়ে দেবো এমনকি গুপ্তধনের ও অর্ধেক দিয়ে দেবো। তুমি চাইলে...
নায়েবমশাই নিজের কথা শেষ করতে পারেনা। নায়েবমশাই এর গালে প্রচণ্ড জোরে সপাটে একটা চড় কষিয়ে দেয় বংশী। ক্ষনিকের মধ্যে যে বংশী ওকে এভাবে একটা চড় মারবে তা নায়েবমশাই ভ্রুনাক্ষরেও ভাবতে পারেন নি। নায়েবমশাই এর মনে পড়ে যায় ঠিক, ঠিক এই জায়গায় কয়েকঘণ্টা আগে উনি বংশীকে এইভাবেই চড় মেরেছিলেন। মাথা নিচু করে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে নায়েবমশাই।
বংশীঃ কি নায়েব মনে পড়ে, ঠিক এখানেই তুই আমার গালে সবার সামনে চড় মেরেছিলি। আর কি বলেছিলি মনে পড়ে। বেইমান। কে বেইমান নায়েব? আমি না তুই? আমার পেটে ক্ষিদে ছিল, মনে হতাশা ছিল তাই আমি ডাকাত তাই আমি বেইমান। তোর কিসের অভাব ছিল? হাঁ অভাব ছিল তা হোল মানবিকতার।
নায়েবমশাই মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে থাকে। বংশী একবার সিলিং সাহেব ও একবার নায়েবের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে থাকে। সিলিং সাহেব বংশীর এই রনমূর্তি কখনো কল্পনাও করতে পারেননি। বংশী নিজের এক পা সিলিং সাহেবের বুকের ওপর রাখে, প্রায় লজ্জায় মরে যাওয়ার অবস্থা হয় সিলিং সাহেবের। এক ব্রিটিশের বুকের ওপর সামান্য ভারতীয়র পা, এতো কল্পনাতীত। আজ বংশী বিদ্রোহী, আজ বংশী মানুষ। সিলিং সাহেব সত্যি ই বুঝতে পারেনি বংশী কেন ওনার বুকের ওপর পা টা রাখল। হাতের বন্দুকটা সিলিং সাহেবের দিক থেকে আসতে আসতে নায়েবমশাই এর দিকে নিয়ে যায় বংশী। ভিজে পায়রার মত থরথর করে কাঁপতে থাকে নায়েবমশাই। নিজের দুহাত বংশীর সামনে এনে হাত জড় করে প্রানভিক্ষা চাইতে শুরু করে নায়েবমশাই। যদিও ওর মুখ থেকে সামান্য একটা শব্দ ও বাইরে আসেনা। বংশীর এই রনমূর্তি ওকে বারবার করে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, প্রানভিক্ষা ও পাবেনা। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে ওঠে বংশী
বংশীঃ নায়েব, তুই মানুষ নয়, তুই মানুষ হবিও না। রানীমা আর জমিদারবাবুর ভালোর জন্য তোর মৃত্যু দরকার।
প্রচণ্ড জোরে দুটো গুলির শব্দ। সাথে নায়েবের জড়িয়ে আসা গলার আর্তনাদ।
নায়েবের শরীরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এর সাথেই ভেসে আসে এক রমনীর চাপা আর্তনাদ। বংশী বন্দুকটা আবার সিলিং সাহেবের দিকে তাক করে, চিৎকার করে ওঠে, “রানীমা আপনার কোনও চিন্তা নেই, আপনি বাইরে বেরিয়ে আসুন, আমি আপনাকে নিরাপদে জমিদারবাড়িতে পৌঁছে দেবো”
কিছুটা দূরে একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে মালা। সিলিং সাহেব একবার তাকায় মালার দিকে। কিন্তু তাকিয়ে থাকতে পারেনা কারন ওর বুকে বন্দুক ঠেকানো রয়েছে। বংশী তুমি বীর, আমি নারী, আমি তোমায় আজ বীরের মর্যাদা দিলাম। হয়ত এই কথাই বলতে চেয়েছিল মালা। কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় মালা প্রায় বাকরুদ্ধ। বংশীও চায়না ওর দেবীকে এরকমভাবে এক রক্তাক্ত পরিস্থিতির সাক্ষী করতে। সিলিং সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে বংশী
বংশীঃ ভয় নেই আমি আপনার কোনও ক্ষতি করবো না। আপনাকে চাইলে আমি এখানেই মেরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু ওই আমায় যে জমিদারবাবুকে নিরপরাধ প্রমান করতে হবে। সবার সামনে স্বীকার করতে হবে আমি ই আসল অপরাধী, আমি ই টমাসকে হত্যা করেছি। সিলিং সাহেব আমরা এবার জমিদারবাড়ির দিকে যাবো, আপনি উঠে দাঁড়ান আর দয়া করে আপনার সৈন্যদের বলুন নিরাপদ দুরত্বে সরে দাঁড়াতে, নয়ত আপনি তো দেখলেন আমি কি করতে পারি
কয়েক মুহূর্ত আগের ভয়াবহতায় সৈন্যরাও হয়ত বিশ্বাস করে নিয়েছিল এই মানুষটা সব ই পারে। সিলিং সাহেবের পিঠে বন্দুক ঠেকিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে বংশী। ওর পাশে স্থির হয়ে মালা ওর সাথেই চলতে শুরু করে। মালা মাঝেমধ্যেই বংশীর দিকে তাকায় ও মনে মনে বলে ওঠে তুমি কে বংশী? তুমি তো অর্জুন নয় তুমি রাম ও নয়। ওরা তো নারীর কষ্ট এভাবে বোঝেনি। তুমি কে? কিকরে তুমি একজন নারীর জন্য নিজের সব ত্যাগ করতে পারলে। তুমি কে বংশী? বংশী নির্বাক, ওর মুখ ফুটে একটাও কথা বাইরে আসেনা। কখন যে ওরা ঠিক সুরঙ্গের কাছে এসে পৌছায় তা ওরাও খেয়াল করেনি। সজাগ হয়ে যায় বংশী। পেছন ঘুরে একবার ইশারা করে। ওর ইশারাই যথেষ্ট ছিল। ব্রিটিশ সৈন্য অনেকটা দুরেই দাঁড়িয়ে যায়। প্রায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বংশী সিলিং সাহেবকে সুরঙ্গের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। বংশীর সাথে সাথে মালাও নেমে আসে। প্রায় ১ টা দিন পর মালা ফিরে আসে জমিদারবাড়িতে। এই একটা দিনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট হতাশা সব যেন কোথায় হারিয়ে যায়।
ওরা তিনজনেই জমিদারবাড়িতে প্রবেশ করে। ভেতরে প্রবেশ করেই প্রায় বিজয় উল্লাসের ঢঙে চিৎকার করে ওঠে বংশী “জমিদারবাবু আমরা ফিরে এসেছি” মুহূর্তের মধ্যে হুড়মুড় করে সুপ্রতীক ওদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। সুপ্রতীককে দেখে মালা প্রায় দৌড়ে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়ায়। মালার এই তীব্র ব্যাকুলতা সুপ্রতীকের ও নজরে আসে। কিন্তু বন্দুক হাতে বংশী ও সিলিং সাহেবের উপস্থিতি ওকে সজাগ করে দেয়। কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ায় মালা। বংশী সুপ্রতীকের দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে বলে ওঠে
বংশীঃ জমিদারবাবু আমি ই সেই ঘরশত্রু বিভীষণ যে টমাসকে হত্যা করেছে। নায়েবমশাই আপনাকে হয়ত এতক্ষনে সব ই বলে দিয়েছে। কিন্তু জমিদারবাবু নায়েবমশাইকে চিনতে আপনি ভুল করেছেন...
নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে পারেনা বংশী। কখন যে সিলিং সাহেব উঠে দাঁড়িয়েছেন তা কেউ ই খেয়াল করেনি। সামনেই একটা লাঠি পড়েছিল, তা দিয়ে বংশীর মাথায় সজোরে একটা আঘাত আর বংশীর হাত থেকে বন্দুক পড়ে যাওয়া দুটো ঘটনাই এতো দ্রুত ঘটে যায় যে কারুর ই কিছু বোঝার অবস্থা থাকেনা। দ্রুত বন্দুক নিজের হাতে উঠিয়ে নেন সিলিং সাহেব। একহাত মাথার পেছনে দিয়ে সিলিং সাহেবের দিকে ঘুরে দাঁড়ায় বংশী।
সিলিং সাহেবঃ জমিদার, বংশী নায়ক হতে চেয়েছিল। বংশী সব স্বীকার করে তোমায় বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু...
আবার একটা গুলি, মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বংশী। নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা মালা। দৌড়ে যায় বংশীর দিকে। বংশীর দুই চোখ মালার দিকে, ধীরে ধীরে শরীরের ভেতর থেকে প্রানটা বেরিয়ে যাচ্ছে। মালার বুকটা খণ্ড বিখণ্ড হয়ে যেতে থাকে। অবশেষে বংশীর শরীরটা পাথরে পরিনত হয়। মালার বুকের ভেতর থেকে একটা আওয়াজ বাইরে আসে “বংশী” মালা আরও কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু ওর কথা শোনার ক্ষমতা আর বংশীর শরীরে ছিলনা। একটা মানুষ বীরের মৃত্যুবরন করল। একদৃষ্টিতে বংশীর নিথর শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকে মালা।


Reply
#70
পর্ব ৩১- যুদ্ধক্ষেত্রঃ
বংশীর মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মালা। বংশীর দুই চোখ মালার ই দিকে তাকিয়ে আছে। যেন মরে গিয়ে বংশী প্রমান করে দিল ও নায়ক। এই গল্পের নায়ক শুধু ওই। মানুষের জীবন অনেক চড়াই উতরাই এর মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়। আর জীবনের এই উত্থান পতনের ব্যর্থ ইতিহাসে প্রকৃত নায়ক তারাই যারা অন্যের জন্য কিছু করে যায়। প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠা এক চক্রান্ত বংশী নিজের হাতে শেষ করে মালার সম্মান রক্ষা করতে চেয়েছিল। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মালা। বহুবার, সহস্রবার ও জমিদারবাড়ির অন্দরমহলে বংশীকে লক্ষ্য করেছে। আড় চোখে বংশীর কুনজর ও অনুভব করেছে। কখনো ওর কাছে গিয়ে বুঝিয়ে বলেনি বংশী তুমি অপরাধ করছ। এতো কথা বলার অধিকার কি সমাজ নারীকে দেয় নাকি। মালার দুই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। “বংশী তুমি কাপুরুষ, তাই এভাবে নিজের কর্তব্য পালন না করে এখানে এসে গেছো” নিজের ই করা এই উক্তিটা বারবার ওর কানের সামনে ভনভন করতে থাকে। মনে পড়ে যায় বংশীর গালে সজোরে একটা চড় মারার ঘটনা। হয়ত এই চড়টাই ওর প্রাপ্য ছিল। কেন কেউ ওকে এভাবে একটা চড় মারেনি। অনেক আগেই ওর গালে সজোরে একটা চড় দরকার ছিল। দরকার ছিল একজন অভিভাবকের। মাথার ওপর সেই আশ্রয়টা কোনোদিন বংশী পায়নি। তাই হয়ত সমাজের চোখে বংশী ই খলনায়ক। কেউ কোনোদিন এগিয়ে আসেনি বংশীকে সমাজের মুলস্রোতে ফিরিয়ে নিতে। বংশী শুধুই অন্যের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। না একজন ছিল যে বংশীর জন্য ভেবেছিল, সত্যি ই অন্তর থেকে বংশীর জন্য ভেবেছিল।
সে আর কেউ নয়, সে হোল মালা। বংশীর গালে সজোরে চড়টা মারার পর বংশীর মধ্যে ও এক মানুষকে খুঁজে পেয়েছিল। যে এক নারীর শরীর স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করেছিল তার স্বামীকে সযত্নে তার কাছে ফিরিয়ে দেবে। বংশী নিজের কথা রেখেছিল। মালার হৃদয় ও এটাই বিশ্বাস করেছিল কোনও সুখবর নিয়েই বংশী ফিরবে। তারপর বিবেকের চরম যন্ত্রণায় ওর ভেঙে পড়া, এ মালাকেও আঁটকে রাখেনি। মালা ওকে জড়িয়ে ধরেছিল। সমাজ, ধর্ম, রক্ষনশীলতা সমস্ত কিছুকে প্রায় দূরে ঠেলে দিয়ে একটা মানুষকে প্রকাণ্ড বটগাছের মত আশ্রয় দিয়েছিল। মালা দেখেছিল কিভাবে একজন মানুষ নিজের দুই চোখে নিজের মৃত্যুকে দেখতে পায়। এক রমনীকে তার পুরনো সুখি জীবন ফিরিয়ে দিতে নিজের প্রান বিসর্জন দেওয়া এতো একজন মহাপুরুষ ই পারে। নিজের সমস্ত পাপ স্বীকার করে বংশী পবিত্র হয়েছিল। “বংশী তুমি তো সম্রাট অশোক, কলিঙ্গের ভয়াবহ যুদ্ধ এক মানুষের জন্ম দিয়েছিল, তুমি সেই মানুষ বংশী” মালার মুখ দিয়ে এই কথাগুলো বাইরে বেরিয়ে আসেনি, কারন ওর গলা দিয়ে একটাও শব্দ বেরোনোর অবস্থা ছিলনা।
সত্যি ই কি কোনোদিন কেউ বংশীর জন্য ভাবেনি। বংশীর একার ই কি অভিমান ছিল। না অভিমান আরও একজনের আছে, সে আর কেউ নয় মালা। বংশী তো পুরুষ, নিজের হৃদয়কে উজাড় করে সব কথা অন্যের সামনে বলে ফেলতে পারে। কিন্তু মালা তো বেচারা নারী, মালা অসহায় এক নারী। নিজের মনের একটা কথাও বংশীকে বলতে পারেনি মালা। সেই সুযোগটুকু ওকে বংশী দিলনা। মরার আগে মালার দিকে তাকিয়ে বংশী কি ভাবল কিজানি। হয়ত মনে মনে বলল মালা তুমি স্বার্থপর, মালা তুমি শুধুই নিজেকে আর সুপ্রতীককে নিয়ে ভাবলে। একবারও ভাবলে না আমিও বাঁচতে চেয়েছিলাম। কি দরকার ছিল তোমাদের জন্য নিজের প্রাণটা এভাবে সঁপে দেওয়ার। তোমরা আমার কে? কতদিন আর আমি তোমাদের চিনি? না মালাও ভেবেছিল বংশীর জন্য। সেদিন রাতে বংশী তো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিল কিন্তু মালা সারারাত ঘুমায়নি। শুধু ভেবে গেছে যে মানুষটা ওদের জন্য নিজের প্রাণটাও দিতে প্রস্তুত সে এতো সহজে মরতে পারেনা। সারারাত ও ভেবেছে কি করে বংশীকে বাঁচানো যায়। ভেবেছিল জমিদারবাড়িতে ফিরে গিয়ে জমিদারবাবুর কাছে অনুরোধ জানাবে বংশীর জীবন রক্ষা করতে। মালা বংশীর মধ্যে নিজের দাদাকে খুঁজে পেয়েছিল, একজন মানুষকে খুঁজে পেয়েছিল। ভাগ্য ওকে সেই সুযোগ দিলনা। কি বিশাল অভিমান ওর বংশীর ওপর রয়েছে হয়ত সেই কথাও ও কোনোদিন আর বংশীকে বলতে পারবে না। এতক্ষনে মালার ভেতর থেকে কয়েকটা শব্দ বাইরে বেরিয়ে এলো “না বংশী না” বংশীর বুকের ওপরের কাপড়টা প্রায় জড়িয়ে ধরে মালা ওর বুকে লুটিয়ে পড়ল। অবাক হয়ে সুপ্রতীক ও সিলিং সাহেব দুজনেই তাকিয়ে থাকে মালার দিকে। সুপ্রতীকের হয়ত হৃদয়টা খানখান হয়ে যাচ্ছে। এক পরপুরুষের বুকের ওপর ওর স্ত্রী ওর প্রিয়তমা লুটিয়ে পড়েছে। সুপ্রতীক জানেনা এমন অনেক সম্পর্কই হয় যার কোনও নাম নেই। কখন যে প্রিয়া ও গার্গী ছাদের ওপর এসে গেছে তা সুপ্রতীক ও খেয়াল করেনি। ওরা যে প্রচণ্ড ভাবে স্তম্ভিত হয়ে গেছে তা ওদের মুখ দেখলেই বোঝা যায়। এতক্ষনে সিলিং সাহেব মুখ খুললেন। কয়েকটা মুহূর্তের এই আবেগঘন পরিস্থিতিতে সিলিং সাহেব ও চুপ করেছিলেন।
সিলিং সাহেবঃ এবার কি হবে জমিদার। আমার হাতে বন্দুক। বংশী মৃত। আমার ভাই টমাসকে কে হত্যা করেছে তা তুমি কি করে প্রমান করবে?
সুপ্রতীক বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সত্যি ই তো ও প্রচণ্ড অসহায় হয়ে গেছে, কি করবে এই মুহূর্তে ও নিজেও জানেনা। শোকাতুর মালার কানে একটাও শব্দ প্রবেশ করছে না। ওর শরীরটা প্রচণ্ড কম্পনে কেঁপে উঠছে, অন্তরের যত ক্ষোভ, অভিমান সব বাইরে বেরিয়ে আসছে। হথাত ই সিলিং সাহেব একবার ওপরের দিকে তাকান। নিজের কামাতুর জিভটা ঠোঁটের ওপর ঘষে একবার প্রিয়া ও গার্গীকে দেখে নেন।
সিলিং সাহেবঃ দেখো সুপ্রতীক, তোমার দুই বোনকে এমনকি তোমার এই সুন্দরী বউকেও আমার খুব পছন্দ। তুমি তো জানো মেয়েদের ওপর আমার একটু বেশি ই...
প্রায় দৌড়ে আসে সুপ্রতীক। কিন্তু সিলিং সাহেব নিজের হাতের বন্দুকটা সোজা করে ওর দিকে তুলে ধরে। দাঁড়িয়ে যায় সুপ্রতীক। আবার নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মালা কিছুটা সজাগ হয়ে পড়ে। নিজেকে কোনরকমে নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে।
সুপ্রতীকঃ আমি বেঁচে থাকতে তুমি কিছুই করতে পারবে না সিলিং। মনে রেখো আমিও এই অঞ্চলের জমিদার। ক্ষমতা আমারও আছে। সৈন্য আমারও আছে। সাবধান সিলিং।
সুপ্রতীকের এই স্পর্ধা কোনমতেই মেনে নেওয়া সিলিং সাহেবের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। সিলিং সাহেবের চোখদুটো আবার লাল হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড জোরে গর্জন করে বলে ওঠেন সিলিং সাহেব
সিলিং সাহেবঃ তুমি জমিদার? জমিদার তুই? তুই বেঁচে থাকলে আমি কিছুই করতে পারব না তাইতো। ঠিক আছে তোকে আমি বাঁচিয়ে রাখবো ও না।
সিলিং সাহেবের বন্দুক আবার ওপরের দিকে ওঠে। আবার কয়েকটা গুলি চালানোর প্রচেষ্টা। কিন্তু গুলি একটাই ছিল এবং সেটাই বেরিয়ে আসে বন্দুকের নল থেকে। সিলিং সাহেব, প্রিয়া, গার্গী এমনকি সুপ্রতীক ও বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।
যুদ্ধ কি ভয়ঙ্কর। আবার একটা নিষ্পাপ প্রান ঝড়ে গেলো। কিছুক্ষন আগের এইসব উত্তেজনার আঁচ মালাও পেয়েছিল। হয়ত সেই কারনেই নিজেকে ও নিজের আবেগকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। না মালা বংশীর মত নিজের মৃত্যু দেখতে পায়নি। পেলেও হয়ত উঠে দাঁড়াত। সুপ্রতীক মাটির দিকে চেয়ে থাকে। বেশ কিছুক্ষন ছটপট করে ওর শরীরটা। গুলিবিদ্ধ শরীরটা মৃত্যুর আগে ঠিক কতটা কষ্ট পেয়েছিল তা জানিনা, কিন্তু নিজের চোখের সামনে নিজের প্রিয়তমার শরীরটা এরকমভাবে শেষ হয়ে যেতে দেখে সুপ্রতীকের হৃদয়টা যে আরও অনেক বেশি কষ্টে বিদ্ধ হয়েছিল তা হলফ করে বলতে পারি। সুপ্রতীক স্তব্ধ হয়ে যায়, চিতার আগুন থেকে ওকে বাঁচিয়ে এনেছিল সুপ্রতীক, কিন্তু ভাবেনি ওর চোখের ই সামনে আরও একবার ওকে মরতে হবে। বংশীকে হারাতে, বংশীকে শেষ করতে সুপ্রতীকের সবচেয়ে মোক্ষম চাল ছিল মালা। আজ অবধি নিজের স্ত্রীকে, নিজের প্রিয়তমাকে এভাবে ব্যাবহার করার জন্য ওর হৃদয় একবার ও কেঁপে ওঠেনি। কিন্তু এই প্রথমবার হয়ত ওর ও মনে হয়, অনেক অনেক অভিমান বুকে নিয়ে মালা ওকে ছেড়ে চলে গেলো।
ওপর থেকে জোরে একটা আওয়াজ আসে “দাদা বন্দুক” সুপ্রতীক ভেজা চোখে ওপরের দিকে চায়। প্রিয়া একটা বন্দুক ওপর থেকে ওর দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। সুপ্রতীক নিজের মনটা শক্ত করে। প্রতিশোধ ওর চাই। দুহাতে বন্দুকটা ধরে সিলিং সাহেবের দিকে তাক করে। সিলিং সাহেব নিজের প্রানভিক্ষা চাওয়ার ও সুযোগটুকু পেলেন না। আরও একটা মৃতদেহ। সত্যি ই যুদ্ধ কি ভয়ঙ্কর। সামনের দিকে তাকায় সুপ্রতীক ততক্ষনে ব্রিটিশ সৈন্য জমিদারবাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে গেছে সাথে বেইমান লাঠিয়াল বাহিনী। সুপ্রতীক জানে মৃত্যু ওর দোরগোড়ায়। তবুও শেষ মুহূর্ত অবধি ও লড়ে যাবে। রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে সুপ্রতীক ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতর থেকে ফটক বন্ধ করে দেয়। ততক্ষনে মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ শুরু হয়ে গেছে। আবার একটা আর্তনাদ সুপ্রতীকের কানে ভেসে আসে। ও জানে এই যুদ্ধে এক এক করে সমস্ত স্বজনকেই ও হারিয়ে ফেলবে। দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যায় সুপ্রতীক।
সিঁড়ির কিছুটা ওপরেই ওর দুই বোন প্রিয়া ও গার্গীর রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। দুই বোনের নিথর দেহর সামনে সুপ্রতীক নিজেও নিথর হয়ে পড়ে। ও জানে ও বাঁচবে না। কিন্তু যতটুকু সময় আর বাঁচবে, সেই সময়টার জন্য ও পৃথিবীতে একা। ভীষণ একা। আপন আর কেউ ওর নেই।
সুপ্রতীক ধীরে ধীরে ভেতরের ঘরের দিকে চলতে শুরু করে। এই মুহূর্তে একটাই কর্তব্য ওর রয়েছে তা হোল জমিদারবাড়ির গুপ্তধনের সন্ধান গোপন করে রাখা। এমন জায়গায় এই সন্ধান রেখে যাওয়া যাতে কখনো কোনও ভালো মানুষের হাতে এই গুপ্তধন আসে। জমিদারবাড়ির সমস্ত সম্পত্তিতে গরীব মানুষের রক্ত লেগে আছে। কত অত্যাচার কত নিপীড়নের ফসল এই গুপ্তধন। এই গুপ্তধন কোনও বাজে মানুষের হাতে পড়লে কি আর জমিদারবাড়ির অভিশাপ দূর হবে।
সুপ্রতীক হয়ত প্রচণ্ড আধুনিকমনস্ক মানুষ ছিলেন। কিন্তু রাজপুরোহিতের করা সেই ভবিষ্যৎবানী সুপ্রতীক ও জানত। জমিদার বংশ যে ওর ই সময় ধ্বংস হবে তা ওর আগে থেকেই জানা ছিল। তবুও সুপ্রতীক শেষ অবধি একটা চেষ্টা করে গিয়েছিল।
সুবীরবাবু যে টেবিল চেয়ারের ওপর বসে আপনি ডায়েরিটা পড়া শুরু করেছিলেন সেখানেই সুপ্রতীক কিছু কথা লিখে গিয়েছিল। এই কথাগুলো যে আপনার ই জন্য লেখা। কারন আপনি ই তো এই বংশের উত্তরাধিকারী। জমিদার বংশের পাপ ধুয়ে ফেলার কাজ তো আপনার ই।
সুবীর বাবু এতক্ষন জমিদারবাড়ির গল্প আর যুদ্ধের রোমহর্ষক বর্ণনায় প্রায় হারিয়ে গেছিলেন। নিজের মনে সমস্ত জোর সঞ্চার করে উনি বলে ওঠেন
সুবীর বাবুঃ হাঁ আমি আপনার সবকথাই শুনলাম। প্রথমে মৃত্যুঞ্জয়, অনুরাধা, দেবেন্দ্র, সত্যেন্দ্র এবং তারপর মালা, সুপ্রতীক, বংশী, সিলিং এদের গল্প আমি মন দিয়ে শুনলাম। কিন্তু সত্য বাবু এদের সাথে আমার কি সম্পর্ক। কস্মিনকালেও আমি কোনও মানুষের কোনও ক্ষতি করিনি...
সুবীর বাবুকে নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে দেয়না সত্য বাবু। সেকি সুবীর বাবু আপনি কোনোদিন কোনও মানুষের ক্ষতি করেন নি। হাঁ তা করেন নি, নারীরা কি আর মানুষ নাকি? বর্ণালীর সাথে কি আপনি সুবিচার করেছিলেন সুবীর বাবু?
প্রায় চমকে ওঠেন সুবীর বাবু। ওনার মুখ দিয়ে একটাই অস্ফুট স্বর বাইরে আসে “বর্ণালী!”
সুবীর বাবুঃ মানব কি সেই কারনেই আমার ক্ষতি করতে চায়। মানবের কি ঠিক সেই কারনেই দুটো আলাদা মুখ। একটা বন্ধুর আরেকটা...
সত্য বাবুঃ থাক সুবীর বাবু এই মুহূর্তে আর বর্ণালী নামক নতুন চরিত্রটা টেনে এনে আমি এই ডায়েরীর গল্পটাকে জটিল করে তুলতে চাইনা। বর্ণালী তো আছেই এই গল্পে, ঠিক যেমন ভাবে সুপ্রতীকের কাছে মালা, মৃত্যুঞ্জয়ের কাছে অনুরাধা ঠিক সেরকম ই আপনার কাছে বর্ণালী। সুবীর বাবু কখনো ভেবে দেখেছেন তরোয়ালের আঘাতে অনুরাধাকে মৃত্যুর কোলে পাঠিয়ে দেওয়ার আগে মৃত্যুঞ্জয়ের মনে একবারও কি কোনও প্রশ্ন জেগেছিল, অনুরাধা কি সত্যি ই পাপ করেছিল? বংশীর সাথে মালাকে জঙ্গলে পাঠিয়ে কি সুপ্রতীক মহান কোনও কাজ করেছিল? বীরত্ব এটা নয় সুবীর বাবু। একিরকম আপনি তো মেধাবী মানুষ, কিন্তু সাধারন থেকে মেধাবী হওয়ার লড়াইতে আপনিও তো একিভাবে কাউকে ব্যাবহার করেছেন। হয়ত কেউ বংশী হতে চেয়েছিল আপনি ই তাকে মানুষ হতে দেননি।
ডায়েরীর অভিশাপটা কি? কেন ওনার ই জীবনে এটা নেমে এলো, তা সত্য বাবুর সামান্য কিছু ইঙ্গিত ই সুবীর বাবুকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়।
সত্য বাবুঃ সুবীর বাবু আমি চাইলে সুপ্রতীকের গল্পটা আপনাকে নাও বলতে পারতাম। কিন্তু আসল নায়ক কে? সুপ্রতীক না বংশী? এই প্রশ্নটা আপনার হৃদয়ে জাগিয়ে তোলা প্রচণ্ড দরকার ছিল। এই প্রশ্নটা ছাড়া তো বিবেকের দংশন আপনি উপলব্ধি করতে পারতেন না। আপনার মুখের অভিব্যাক্তি বলছে বর্ণালীর নামটা আপনার মধ্যে সেই বিবেক দংশন শুরু করে দিয়েছে। কি সুবীর বাবু বুঝলেন তো ডায়েরীর আসল রহস্য জমিদারবাড়িতে নয় আপনার ই জীবনে লুকিয়ে আছে। সুবীরবাবু বংশীর নিথর দেহটা সবাই ঘৃণাভরে সৎকারের উদ্দেশ্যে নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সুপ্রতীক পেয়েছিল চন্দন কাঠ। কেন এতো বৈষম্য সুবীর বাবু? আপনারা অভিজাত বা উচ্চশিক্ষিত বা মেধাবী তাই? বংশীরা কি নায়ক হয়েও খলনায়ক হয়ে থাকবে চিরকাল।
সুবীরবাবু যে ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছেন তা সত্যবাবু বেশ ভালোই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। প্রায় চিৎকার করে বলে ওঠেন সুবীরবাবু
সুবীরবাবুঃ আমি কোনও অন্যায় করিনি, ওই সিদ্ধান্তটা নিতে আমি বাধ্য হয়েছিলাম। মেনে নিলাম এটা অপরাধ, কিন্তু তার ফল কেন আমার স্ত্রী ও কন্যাদের ভোগ করতে হবে?
সত্য বাবুঃ কারন সেই অভিশাপ, জমিদার বাড়ির রক্ত যে আপনার শরীরে। কে যে নায়ক আর কে যে খলনায়ক এই তো বিশ্বসংসারের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন সুবীরবাবু। যা আপনার চোখে সামান্য এক ভুল তাই হয়ত কারুর চোখে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। বর্ণালী কি খুব একটা অপরাধ করেছিল, আর মানববাবু? সেই সময় তো ওটা অন্য মানব ছিল।
মাথা নিচু করে থাকেন সুবীর বাবু।
সত্য বাবুঃ না সুবীর বাবু গল্পে আর নতুন কোনও মোড় দিতে চাইনা। বর্ণালীর প্রসঙ্গ একদম শেষে আসবে। আপাতত আমরা চলে যাই সেই অশরীরী ও মালতী দেবীর কাছে। কে সেই অশরীরী? কেন মালতী দেবী ওর মধ্যে মানব বাবুকে দেখতে পান। সুবীর বাবু মানসিকভাবে প্রস্তুত হন। আপনাকে প্রস্তুত হতেই হবে।
মাথা নিচু করে থাকে সুবীর বাবু।
সত্য বাবুঃ সুবীর বাবু আমরা ডায়েরীর চতুর্থ খণ্ডে এসে উপস্থিত। দয়া করে আমাকে আর বাধা দেবেন না। কারন আপনি তো জানেন শরীর ধারন করে সত্যি ই বেশিক্ষন থাকা সম্ভব নয়।
(তৃতীয় খণ্ড শেষ ও চতুর্থ খণ্ড শুরু)


Reply


Forum Jump:

Users browsing this thread: 1 Guest(s)